সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

পুরনো সম্পাদকীয়

স্বাধীনতার আগে জওহরলাল নেহরু ১৯৪৬ সালে তাঁর ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া বইতে সায়েন্টিফিক টেম্পার বা বিজ্ঞান মনস্কতার কথা লিখেছিলেন। স্বাধীনতার পর প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জওহরলাল ভারতের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশে বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গড়ে তোলার বিষয়ে উৎসাহী ছিলেন। নেহরু তাঁর বইতে লিখেছিলেন, ‘দেশের আপামর জনসাধারণের জন্য বিজ্ঞানের প্রয়োগ আজ আবশ্যিক, একে এড়িয়ে যাবার কোনো উপায় নেই, কিন্তু প্রয়োগের পর আরও কিছু করা দরকার—তা হল বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা গড়ে তোলা, দুঃসাহসী জটিল বৈজ্ঞানিক মেজাজ, সত্য ও জ্ঞানের জন্য অনুসন্ধান; কোনো কিছু পরখ, যাচাই না করে গ্রহণ না করা এবং নতুন প্রমাণ সামনে এলে পুরানো সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করার তৎপরতা; আগে থেকে ঠিক করা ধারণার উপর নয়, পর্যবেক্ষণলব্ধ সত্যের উপর আস্থা, মনের কঠোর শৃঙ্খলা—এসবই আজ প্রয়োজন। শুধু বিজ্ঞানের প্রয়োগের জন্য নয়, জীবনের জন্যও এবং তার সমস্যা সমাধানের জন্যও। বৈজ্ঞানিক মেজাজ ও দৃষ্টিভঙ্গি এক জীবনশৈলী, চিন্তা প্রক্রিয়া, কার্যধারা এবং সহ-নাগরিকদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার পদ্ধতি হওয়া উচিত। বিজ্ঞানমনস্কতা যে পথ তৈরি করে সেই পথ দিয়ে মানুষের হাঁটা দরকার। বিজ্ঞান কেবল ইতিবাচক জ্ঞানের চর্চা করে, কিন্তু বিজ্ঞানমনস্কতা যে প্রভাব তৈরি করে তা পাশফেলের চেয়ে অনেক সুদূরপ্রসারী।’
২০২৬ সাল শুরু হল। নতুন বছরের শুরুতে বাংলায় ইতিহাস চর্চার একটি বিশিষ্ট ঘরানাকে নিয়ে নতুন কিছু চিন্তা ভাবনা করা যেতে পারে। বিগত দুই শতকে বাংলায় ইতিহাস চর্চা শাসকদের কেন্দ্র করে আবর্তনের কক্ষপথ ত্যাগ করে সাধারণ মানুষের জীবনচর্যার অন্বেষণের দিকে অনেক দূর এগিয়ে এসেছে। এগিয়ে চলার পথে বাংলার জেলাভিত্তিক ইতিহাস চর্চার বিশাল স্রোতের পাশাপাশি গড়ে উঠেছে স্থানিক ইতিহাস চর্চার ধারা। আজ বাংলার তথ্যভিত্তিক ইতিহাস চর্চার পরিধির মধ্যে চলে এসেছে অনেক গ্রাম ও শহর, জনগোষ্ঠী ও সমাজ, খাদ্য ও পরিধান এবং স্থানিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। বাংলার বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক ও স্থানিক ইতিহাস চর্চার জন্য গঠিত সংগঠন ইতিমধ্যেই তাদের উল্লেখনীয় কাজের জন্য সম্মান ও স্বীকৃতি অর্জন করেছে। পশ্চিমবঙ্গের প্রায় প্রত্যেক জেলায় ইতিহাস চর্চার সঙ্গে যুক্ত সংগঠনগুলি যেভাবে গুরুত্ব দিয়ে তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কাজ নিরলস ভাবে করে চলেছে তারই পরিণামে আজ সামগ্রিক ভাবে বাংলার ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ রূপ ধারণ করতে সমর্থ হয়েছে।
বাঙালির প্রবল ভ্রমণ পিপাসার কথা বোধ হয় সারা ভারতের সব রাজ্যের অধিবাসীদের কাছেই সুবিদিত। শুধুমাত্র আর্থিকভাবে স্বচ্ছল পরিবার নয়, অনেক স্বল্পবিত্ত বাঙালি পরিবারের নিজেদের সাধ্যাতীত ব্যয় করেও ভ্রমণ করার দৃশ্য বিরল নয়। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের জনপ্রিয় পর্যটন স্থলগুলিতে, বিশেষত ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থলগুলিতে গেলে বাংলা ভাষায় কথোপকথন না শুনতে পাওয়ার সম্ভাবনা কম। কিন্তু বাংলার ভৌগোলিক সীমার মধ্যে অবস্থিত ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলিকে যখন অনাদর আর অবহেলার মধ্যে পড়ে থাকতে দেখা যায়, তখন এক অদ্ভুত বৈপরীত্য অনুভূত হয়। সাগর থেকে পাহাড়, বাংলার দীর্ঘ ইতিহাসের অনেক সাক্ষী আজ জরাজীর্ণ চেহারা নিয়ে টিকে রয়েছে, প্রতিনিয়ত মুছে যাচ্ছে লোকচক্ষু থেকে। বাংলার মানুষের দেখার আগ্রহ আর জানার কৌতূহলের অভাবের কারণে বাংলার বহু অভাবনীয় পুরাকীর্তি, অনেক অসামান্য প্রত্নসম্পদ আজ বিস্মৃতির অন্তরালে চলে গেছে।