সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

সামাজিক ইতিহাস

কলকাতার খুব কাছেই গঙ্গার অন্য তীরে হাওড়ায় প্রায় আড়াই শো বছর প্রাচীন ভোটবাগান (অর্থাৎ তিব্বতি উদ্যান) মঠ আজ সবার স্মৃতি থেকে প্রায় বিলুপ্ত। অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে স্থাপিত শৈব মঠে রূপান্তরিত এই বৌদ্ধ মঠ নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত উত্তর ভারতের শৈব দশনামী গোসাঁই সাধু পূরণ গির, যিনি বাংলার ইংরেজ কোম্পানির শাসকদের প্রতিনিধি হয়ে কলকাতা থেকে ভুটান, তিব্বত ও চীনে যাত্রা করেছেন, তাঁর কথাই বা কতজন মনে রেখেছেন? আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, বাংলার মাটিতে একমাত্র তিব্বতি মঠের নির্মাণ কাহিনির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস আর তিব্বতের তত্কালীন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রধান পাঞ্চেন লামা। আজ অবহেলা আর উপেক্ষার পরিণামে জরাজীর্ণ অবস্থায় বিদ্যমান সেই মঠ আর তার মঠের প্রতিষ্ঠাতা গোসাঁই সাধু পূরণ গিরকে নিয়ে বাংলা ভাষায় বিগত শতাধিক বছর ধরে বেশ কয়েকটি নিবন্ধ ও একটি বই লেখা হলেও১ এই মঠ আর সাধুর ইতিহাস আজও অনেকের কাছেই অজানা। তাই আড়াই শতকের ইতিহাসের দিকে আর একবার ফিরে দেখা যেতে পারে।
প্রত্যেকেই নিজেকে সুন্দর দেখতে চায়। বলা ভালো দেখাতে চায়। অলংকার এবং পোশাক হচ্ছে নিজেকে সাজিয়ে তোলার মূল উপাদান। এরই সঙ্গে আধুনিক স্টাইলে ট্যাটুর গুরুত্ব বেশ বেড়েছে। এই যে সাজসজ্জা, তা কি শুধুই নিজেকে সুন্দর দেখানোর জন্যে সৃষ্টি হয়েছিল? মানুষের সুন্দরের প্রতি সহজাত তীব্র আকর্ষণই কি এর কারণ? একটু খেয়াল করলে দেখি অঞ্চল ভেদে, অবস্থান এবং জাতিগত তারতম্যে সাজসজ্জার তারতম্য ঘটে। তবে ফ্যাশন বা কায়দা ব্যাপারটা নির্ভর করে ব্যক্তি মানুষের রুচির উপরে। আবার ব্যক্তিগত সাজসজ্জার বাইরে দাঁড়িয়ে দেখতে পাই, প্রথা-সংস্কার আর কিছু রীতিনীতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে থাকে পোশাক, সাজসজ্জা এবং উল্কি বা ট্যাটু। আর এই ব্যাপারটার সঙ্গে একাত্ম হয়ে আছে অঞ্চল, অবস্থান, জাতি বা আরও একটু বিশদভাবে বললে গোষ্ঠী।
রাত প্রায় দশটা। হুগলি নদীর বুকে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে একটি ছোটো ফেরি। দিনের আলোয় এই ফেরিঘাট ছিল কোলাহলপূর্ণ—ব্যবসা, যাত্রী, দরকষাকষি, হিসাবের কোলাহলে আলোকিত। কিন্তু এখানে রাত নামতেই দৃশ্য বদলে যায়। চারপাশে অন্ধকার, কেবল জলের শব্দ আর দূরের শহরের অস্পষ্ট আলো। ফেরির এক পাশে বসে থাকা মাঝিটি সারাদিনের পরিশ্রম শেষে আবার কাজে নেমেছে। তবে তার এই শ্রম দিনের নয়—অন্ধকার রাতের। আর এই রাতই তার কাজকে ইতিহাসের চোখে ভিন্ন অর্থ দেয়। দিনের আলোয় যে শ্রম ছিল স্বাভাবিক জীবিকা, রাতের অন্ধকারে সেই শ্রমই হয়ে ওঠে সন্দেহজনক। ইতিহাসে রাত যেন কেবল একটি সময় নয়—একটি নৈতিক সীমারেখা, একটি রাজনৈতিক নির্মাণ।
আমাদের প্রাচীন সাহিত্যগুলি পাঠ করলে বোঝা যায় যে সন্তানের জন্মদান মানব মানবী উভয়ের ক্ষেত্রেই ছিল একটি ধর্মীয় ও সামাজিক কর্তব্য। প্রায় ৩.৫ হাজার বছর আগের ঋগ্বেদ-এর স্তোত্রে বলা হয়েছে, বংশধারাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নরনারীর দৈহিক মিলন আবশ্যিক কর্তব্য। বিবাহের উদ্দেশ্য ছিল কুলরক্ষা অর্থাৎ সন্তান উৎপাদন। ঋগ্বেদ দশম মন্ডল-এর সূর্যা বিবাহ স্তোত্রে প্রজাপতিকে আহ্বান করা হয়েছিল এই বলে যে, সন্তান উৎপাদনের দ্বারা আমরা যেন এগিয়ে যেতে পারি। প্রায় ২ হাজার বছর আগের মনুস্মৃতিতে বলা হয়েছে, নারীর জন্ম সন্তান উৎপাদনের জন্য ও পুরুষের বংশগতি রক্ষা করার জন্য। স্বামী-স্ত্রীর যৌথ নৈতিক ও ব্যবহারিক আদর্শ এটাই।