সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

সম্পাদকীয়

আগস্ট ২, ২০২৩

রাজার জাতবদল

হিন্দুত্ববাদীরা ইতিহাস বদলায়, নাম বদলায়, সুযোগ পেলে লোকের জাতও বদলে দেয়। “গুর্জর-প্রতিহার” সাম্রাজ্য। এভাবেই আমরা ইতিহাসে পড়ে এসেছি। নবম শতকে তখনও রাজপুত‌ বলে কিছু ছিল না। হরিয়ানার কৈথলে গুর্জর-প্রতিহার সম্রাট মিহিরভোজের মূর্তি উন্মোচনের পর সপ্তাহখানেক আগে স্থানীয় রাজপুত হিন্দুত্ববাদী নেতা ও কর্মীরা আন্দোলন শুরু করে মূর্তির নাম থেকে গুর্জর শব্দ বাদ দেবার দাবিতে। “গুর্জর প্রতিহার সম্রাট” কথাটাকে “প্রতিহার সম্রাট” নয়তো “হিন্দু সম্রাট” করতে হবে – এরকমই ছিল তাদের দাবি।‌

তাদের দাবি মিহিরভোজ গুর্জর জাতের নন, রাজপুত জাতের। মজা হল প্রতিহার বংশকে তাদের প্রতিবেশীরা গুর্জর বলেই ডাকত, তার প্রমাণে শিলালেখও আছে, আর সেযুগে রাজপুত নামের কোনো জাত ছিলই না। স্থানীয় গুর্জর বিধায়কের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে একই দলের রাজপুত কর্মীরা গণপদত্যাগের হুমকি দিয়েছে। বিষয়টা মুখ্যমন্ত্রী অবধি গড়িয়েছে এবং তাঁর নির্দেশে মিহিরভোজের মূর্তি থেকে গুর্জর বাদ দেয়া হয়েছে। এতে অবশ্যই গুর্জররা অসন্তুষ্ট।

বিষয়টা প্রতিবেশী রাজ্য উত্তর প্রদেশেও পৌঁছে গেছে। সেখানে সাহারাণপুরে মিহিরভোজের মূর্তি থেকে রাতের অন্ধকারে গুর্জর-প্রতিহার লেখা বোর্ড চুপিসারে সরিয়ে নিয়ে গেছে পুলিশ! কিছুদিন আগে সেখানে মিহিরভোজ জয়ন্তীর দিন দুই জাতের মধ্যে হট্টগোল হয়েছে। এদিকে দুই নৌকায় পা দিয়ে চলা শুরু হয়েছে  – কারণ হরিয়াণা ও দিল্লিতে গুজ্জররা সংখ্যায় ভারি, রাজস্থানে দুটো জাতিই সমান সমান, আর উত্তর প্রদেশে রাজপুতরা ভারি।

অতীতে আরেকজন রাজার জাতি পরিচয় নিয়ে টানাটানি হয়েছে। তিনি রানা পুঞ্জা। তিনি ভীল না রাজপুত সেই নিয়ে ছিল বিবাদ। এখনও সেই বিবাদ চলছে।‌

গুপ্ত পরবর্তী প্রাচীন উত্তর ভারতের শিল্পকলার সিংহভাগই এসেছে গুর্জর-প্রতিহারদের মাধ্যমে অথবা তাদের শিল্পস্থাপনার প্রভাবে। ভারতে মুসলমান আক্রমণ প্রতিরোধে গুর্জর-প্রতিহারদের উজ্জ্বল ভূমিকা ছিল।

এইভাবে বিভিন্ন জাতি ও উপজাতির মধ্যে হাঙ্গামা বাঁধালে তাৎক্ষণিক কিছু নির্বাচনী লাভ হয়তো দলগুলোর জোটে, ভারত যে বিভক্ত হয়। ইতিহাসের বিকৃতি পরিত্যাজ্য। কারণ ইতিহাস কেবল তথ্যের ভাণ্ডার নয়, অতীতের ঘটনাবলীর বিবরণ নয়। এক নির্দিষ্ট সময়ের ঘটনাবলীর তথ্যনিষ্ঠ বিবরণ বিশ্লেষণ করে ইতিহাস। আবার ইতিহাসের ছায়ায় আমরা অনুধাবন করি আজকের ঘটনাক্রম। অতীতের সাথে মিলিয়ে নিই বর্তমানকে। একটা সময়ে ইতিহাস লেখা হয়েছে পরাক্রমশালী রাজন্যের প্রশ্রয়ে। আজকে গণতান্ত্রিক দেশে  কি তা লেখা হবে সংখ্যাগরিষ্ঠের ইশারায়!