সম্পাদকীয়
অধ্যাপক শিরিন রত্নাগারের প্রয়াণে শ্রদ্ধাঞ্জলি
অধ্যাপক শিরিন রত্নাগার ভারতের অন্যতম বিশিষ্ট প্রত্নতত্ত্ববিদদের একজন। অল্প কিছুদিন অসুস্থ থাকার পর মঙ্গলবার, ২৫ মে মুম্বাইয়ে তিনি মারা গেলেন। তিনি ছিলেন হরপ্পীয় সভ্যতার এক বিশেষজ্ঞ।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন,
‘আসলে, আমি ইতিহাস খুব একটা পছন্দ করতাম না, কারণ আমার মনে হয় না এই বিষয়ে শিক্ষা দেবার পদ্ধতি খুব অনুপ্রেরণাদায়ক ছিল। আমি ভূগোল খুব ভালোবাসতাম, কারণ বইগুলোতে প্রচুর ছবি থাকত।…(একবার) আমাদের পাশের কলেজে স্যার মর্টিমার হুইলার বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। পরিবারের সবাই তাঁর বক্তৃতা শুনতে গিয়েছিল, কিন্তু কোনো এক কারণে আমি যাইনি। এর কিছুদিন পরেই আমার বোন তাঁর লেখা ‘আর্কিওলজি ফ্রম দ্য আর্থ’ (১৯৫৪) বইটি জন্মদিনে আমাকে উপহার দেয়। বইটি পড়লাম এবং আমার মাথায় কিছু একটা খেলে গেল। আমি পরিবারকে না জানিয়ে বইটি স্কুলে নিয়ে গেলাম। আমার বিজ্ঞান শিক্ষিকাকে (আমি তাঁকে আদর্শ মানতাম) বললাম, আমি প্রত্নতত্ত্ব নিয়েই কাজ করতে চাই। ততদিনে আমি নবম শ্রেণিতে পড়ি…।’
যাহোক, পুণের ডেকান কলেজ এবং ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন-এর ইনস্টিটিউট অফ আর্কিওলজিতে মেসোপটেমীয় প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ে পড়াশোনা করার পর, পরবর্তীতে রত্নাগার দিল্লির জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেট করেন ‘সিন্ধু সভ্যতার মানুষ ও মেসোপটেমিয়ার মধ্যকার বাণিজ্য’ বিষয়ে। পরে সেখানেই তিনি সেন্টার ফর হিস্টোরিক্যাল স্টাডিজ-এ প্রত্নতত্ত্ব ও প্রাচীন ইতিহাসের অধ্যাপক হন। ১৯৯৮ সালে তিনি হরপ্পা ও মহেঞ্জো-দারোতে গিয়ে কয়েকদিন ছিলেন।
তাঁর কয়েকটি বইয়ের উল্লেখ করা দরকার, হরপ্পীয় সভ্যতা নিয়ে যারা চর্চা করেন, গবেষণা করেন, তাদের কাছে এই বইগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বইগুলোর মধ্যে রয়েছে, এনকাউন্টার: দ্য ওয়েস্টার্লি ট্রেড অফ দ্য হরপ্পা সিভিলাইজেশন (১৯৮১), এনকোয়ারিজ ইনটু দ্য পলিটিক্যাল অর্গানাইজেশন অফ হরপ্পান সোসাইটি (১৯৯১), দ্য এন্ড অফ দ্য গ্রেট হরপ্পান ট্র্যাডিশন (২০০২), ট্রেডিং এনকাউন্টারস: ফ্রম দ্য ইউফ্রেটিস টু দ্য ইন্ডাস ইন দ্য ব্রোঞ্জ এজ (২০০৪), আন্ডারস্ট্যান্ডিং হরপ্পা: সিভিলাইজেশন ইন দ্য গ্রেটার ইন্ডাস ভ্যালি (২০০৬)। হরপ্পীয় সভ্যতার কিছু চলে আসা ব্যাখ্যাকে তিনি চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, যেমন মহেঞ্জো-দারোর ‘নর্তকী’ ব্রোঞ্জ ভাস্কর্যটিকে পুনর্মূল্যায়ন করেছিলেন। এখানকার বিখ্যাত স্নানাগারের সিঁড়ির ধাপগুলির সঙ্গে দক্ষিণ ভারতের মন্দির সংলগ্ন পুকুরের সিঁড়িগুলির তুলনা করেছেন।
২০০০ সালে অবসর গ্রহণের পর, তিনি মুম্বাইতে স্বাধীন গবেষণা চালিয়ে যান। যারা তাঁর বিভিন্ন সাক্ষাৎকার দেখেছেন তারা জানেন, কত সোজাসুজি তিনি নির্দিষ্ট বিষয়ে চলে আসতেন এবং বলিষ্ঠ মতামত দিতেন। অনেক সময়ে তাঁর কিছু মতের সঙ্গে অন্যদের মতের তারতম্য হতে পারে, তবুও তাঁর যুক্তিবোধ এবং সাহসিকতাকে শ্রদ্ধা জানাতে হয়।
শিরিন রত্নাগার পেছনে রেখে গেছেন তাঁর কাজের এক বিশাল ভাণ্ডার—হরপ্পার বাণিজ্য, নগরায়ন, রাজনৈতিক সংগঠন, প্রযুক্তি এবং প্রত্নতত্ত্বের উপর লেখা বই। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে স্থায়ী উত্তরাধিকার হয়তো অ্যাকাডেমিকের চেয়ে নৈতিক। তিনি ভারতকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, অতীত কোনো রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার মতো সম্পদ নয়। অতীত অনুসন্ধানের একটি ক্ষেত্র, যার জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, সততা এবং বৌদ্ধিক শৃঙ্খলা। তাঁর হাতে প্রত্নতত্ত্ব হয়ে উঠেছিল গণতান্ত্রিক দায়িত্ববোধের এক কার্যক্রম—কল্পকাহিনী থেকে প্রমাণকে এবং অপপ্রচার থেকে জটিল ইতিহাসকে রক্ষা করার এক উপায়।
একমাত্র তিনিই হাতে একটা পাথর নিয়ে ক্লাসে ঢুকে জিজ্ঞেস করতে পারতেন, ‘এটা কী?’ আর কেউ ‘পাথর’ বলে বিড়বিড় করলে গর্জন করে উঠতেন, ‘না, এটা শুধু একটা পাথর নয়, এটি পাথরের সরঞ্জাম।’
অধ্যাপিকা শিরিন রত্নাগারের প্রয়াণ ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ব এবং প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।