সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

সম্পাদকীয়

আগস্ট ২, ২০২৬

চলো আমরা চাঁদের দেশে যাই

আমরা এড়িয়ে যাই। আমরা যুদ্ধের কথা, সংঘাতের কথা শুনতে চাই না, দেখতে চাই না, বলতে তো মোটেই চাই না।

তবুও আমাদের এড়িয়ে যাওয়া জগতে যুদ্ধ ও সংঘর্ষে মৃত্যু বেড়েই চলেছে। সম্প্রতি সুইডেন-এর উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক সংঘাত ঘটেছে ২০২৫ সালে। এখনও পর্যন্ত। ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডার গণহত্যার পর থেকে সর্বোচ্চ সংখ্যক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে গত বছরে। অনেকের হয়তো খেয়ালে আছে, নব্বইয়ের দশকে রুয়ান্ডায় হুতু চরমপন্থীরা জাতিগত সংঘাতে সংখ্যালঘু টুটসি সম্প্রদায় ও মধ্যপন্থী হুটুদের নির্বিচার হত্যা করেছিল; তারা মাত্র ১০০ দিনে ৮ লাখ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল।

উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘উপসালা কনফ্লিক্ট ডেটা প্রোগ্রাম’ (ইউসিডিপি)-এর গবেষকদের মতে, ২০২৫ সালে মোট ৬৫টি সক্রিয় সংঘাত ঘটেছিল। এই প্রোগ্রাম বিশ্বজুড়ে হিংসা বিষয়ক তথ্যের অন্যতম প্রধান উৎস। ২০২৫ সালে বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি সংঘাতের সংখ্যা ২০২৪ সালের তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছিল। সেই ১৯৪৬ সালে ইউসিডিপি-র তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরুর পর থেকে এ ধরনের সংঘাতের সর্বোচ্চ সংখ্যা ছিল ২০২৫ সালে। এর মধ্যে রয়েছে রাশিয়া ও ইউক্রেন-এর পুরোমাত্রায় যুদ্ধ যা চলছে ২০২২ সাল থেকে। রয়েছে ইরান ও ইজরায়েল-এর মধ্যকার যুদ্ধ; পাশাপাশি চলেছে থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যকার সংঘাত এবং সিরিয়া ও ইয়েমেন-এর সঙ্গে ইজরায়েলের সংঘাত। এছাড়াও সেই সময়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যের সাময়িক সংঘাতকেও তারা ধরেছে। গত বছর সর্বশেষ দুটি সংঘাত হল—আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যকার সীমান্ত সংঘাত এবং লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে ইয়েমেন-এর হুথিদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সংঘাত।

তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সংঘাতের কারণে প্রায় ২.৪৪ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, যা ১৯৯৪ সালের পর থেকে সর্বোচ্চ মৃত্যুর সংখ্যা। এর আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালে সংঘাতের কারণে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১.৮৭ লক্ষ।

  • এর মধ্যে রয়েছে ‘আন্তঃরাষ্ট্রীয় যুদ্ধ’—অর্থাৎ বিভিন্ন দেশের মধ্যকার যুদ্ধ।
  • এরপর রয়েছে ‘অ-রাষ্ট্রীয় সহিংসতা’; একই দেশের মধ্যে দুটি পক্ষের মধ্যকার সংঘাত—যেমন পাকিস্তানে বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক সংঘাত কিংবা মেক্সিকোতে অপরাধী চক্রের সন্ত্রাস।
  • তৃতীয় আরেক ধরনের ভয়ানক হিংস্রতা দেখা যায়, যা একেবারেই একপাক্ষিক, ‘একতরফা সহিংসতা,’ যেমন নাইজেরিয়া বা গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রতে বেসামরিক নাগরিকদের উপর হামলা।

গত বছর এই সব যুদ্ধের মধ্যে রাশিয়া-ইউক্রেন, ইজরায়েল-হামাস, সুদানের গৃহবিবাদ ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বজুড়ে এমন তীব্র ও সুদূরপ্রসারী সংঘাত দেখা গেছে, যার মাত্রা গত কয়েক দশকের মধ্যে নজিরবিহীন।

এই বছর যুদ্ধের উন্মাদনা কমছে না; বরং বেড়েই চলেছে। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক সামরিক অভিযান প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে; তিনি ও তাঁর স্ত্রী এখনও মার্কিন দেশে বন্দি হয়ে রয়েছেন। একই সময়ে গ্রীনল্যান্ড-এর উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেভাবে ইউরোপীয় দেশগুলিকে হুমকি দিচ্ছিলেন তাতে মনে হয়েছিল আরেক ভয়ানক অস্থিতিশীলতার দিকে আমরা চলেছি। অবশ্য শেষ পর্যন্ত তিনি পিছিয়ে গেলেন। ইউরোপ বলে কথা।

তবে রাশিয়া-ইউক্রেন লড়াই অব্যাহত রয়েছে। ভোট পূর্ববর্তী ট্রাম্প-এর আশ্বাসবাণী কোনো কাজে লাগেনি। তিনিও শান্তির নোবেল পুরস্কার থেকে দূরে আরও দূরে চলে যাচ্ছেন।

সবচাইতে গুরুতর ঘটনা ঘটল এই বছর ২৮ ফেব্রুয়ারি মাসে। দুই পক্ষের আলোচনা চলাকালীন ইরান-এর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল যৌথ বিমান হামলা চালায়। এই যুদ্ধের ফলে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে নৌ-চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে; এই প্রণালী দিয়েই বিশ্বের অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ এবং অন্যান্য পণ্য যাতায়াত করে। ইরান-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে মারাত্মকভাবে পড়ছে; জ্বালানির মূল্য দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সশস্ত্র সংঘাত এখন আমাদের সময়ের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। সংঘাতের পরিধি বাড়ছে, এর স্থায়িত্ব দীর্ঘ হচ্ছে এবং পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে। আর বেসামরিক নাগরিকরাই এর ফলে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হচ্ছেন।

আমাদের দেশের মিডিয়াতে এই খবরগুলো আসে কম, ফলে বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠা কষ্টকর হয়ে ওঠে। এমনকী যারা অপ্রত্যাশিতভাবে প্রকাশিত সংবাদ শিরোনামের মাধ্যমে যুদ্ধের খবর জানতে পারছেন অথবা পারছেন না, যারা যুদ্ধ ও সংঘাতের সংবাদ এড়িয়ে চলেন না অথবা চলেন, তাদের সকলের জন্যই আজকের সংঘাতগুলো এমন এক ভবিষ্যৎ গড়ে তুলছে যা আমাদের প্রত্যেকের জীবনযাত্রার উপরে প্রভাব ফেলবে। শুধু জীবনযাত্রা নয় নৈতিকতা ও মূল্যবোধের উপরেও এর প্রভাব অনস্বীকার্য।

যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিশ্ব মানব , সাধারণ মানুষ একত্রিত হতে পারলাম না। বরং চলুন যুদ্ধকে এড়াতে আমরা চাঁদের দেশে যাই।

চলো আমরা চাঁদের দেশে যাই

চলো আমরা সময় থাকতে যে যার দেশের জাতীয় পতাকা

চাঁদের দেশের সবার চাইতে উঁচু পাহাড়টার

চূড়ায় দিই উড়িয়ে, তার মাটিকে করি সোনার চেয়ে দামী!