সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

সম্পাদকীয়

জানুয়ারী ২, ২০২৩

জানুয়ারির ভাবনাচিন্তা – সাত দশকের গণতন্ত্রের ইতিহাস চর্চা   

আর একটি ছাব্বিশে জানুয়ারি এসে পড়ল। যে দিনটিতে স্বাধীন ভারতের সংবিধান কার্যকর হয়েছিল, ভারতের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্মদিন হিসাবে স্বীকৃত সেই দিনটির পর আরও বাহাত্তর বছর পার হয়ে গেল। এত দিনে বোধ হয় আধুনিক ভারতের গণতান্ত্রিক শাসনকাল নিয়ে চর্চার দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নয়, ঐতিহাসিকদেরও গ্রহণ করার সময় এসে গেছে। তবে, ইদানিং ইতিহাস চর্চায় ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের প্রবল প্রভাব দেখে ভয় হয় ভারতে গণতন্ত্রের ইতিহাসের যুক্তিসম্মত চর্চার কাজটি বোধ হয় খুব সহজ হবে না।

ভারতে গণতন্ত্রের জন্মক্ষণ নির্ধারণের জন্য অবশ্যই প্রথমে ভারতের গণতন্ত্রের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও মূল বৈশিষ্ট্যগুলিকে চিহ্নিত করতে হবে। ভারতের স্বাধীনতার আগেই ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন ভারতের মানুষদের প্রথম প্রাদেশিক আইনসভার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সুযোগ করে দেয়। এর পর ১৯৪৬ সালে এই আইনসভার সদস্যদের ভোটেই গণ পরিষদ নির্বাচিত হয়। ১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর ভারতের গণতান্ত্রিক সংবিধান যে গণ পরিষদে গৃহীত হয়, তার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আইন ও নির্বাচন হয়েছিল ঔপনিবেশিক আমলে, ব্রিটিশ পার্লামেন্টে গৃহীত আইনের ভিত্তিতে। আবার ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি ভারতের গণতান্ত্রিক সংবিধান স্বীকৃত হওয়ার আগেই সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে স্বাধীন ভারতের প্রথম খসড়া ভোটার তালিকা তৈরির কাজ প্রায় সম্পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। এমনকি ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসের শেষে যখন গণ পরিষদের সচিবালয় এই খসড়া ভোটার তালিকা তৈরির প্রস্তুতি শুরু করে, তখন স্বাধীন ভারতের নাগরিকত্ব কীভাবে স্থির হবে বা ভোটদানের বয়স কী হবে, তাও চূড়ান্ত হয়নি। উল্লেখনীয়, ভোটার তালিকা তৈরি বা প্রথম সাধারণ নির্বাচনের আয়োজনের দায়িত্বে ছিলেন ঔপনিবেশিক আমলের কয়েকজন উচ্চপদস্থ আমলা, কোনও রাজনৈতিক নেতৃত্ব নয়। এরই পাশাপাশি, স্বাধীনতার অব্যবহিত পর, গণ পরিষদে যখন সংবিধানের খসড়া নিয়ে আলোচনা চলছে, তখন ভারতের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ ৫৫২টি দেশীয় রাজ্যের শাসকদের অধীনে, সেখানে কোনও দিন গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বহাল করা সম্ভব হবে কিনা জানা ছিল না। আবার, এই একই সময়ে তেলেঙ্গানা ও অন্যত্র কমিউনিস্টদের সশস্ত্র অভ্যুত্থানের পথ গ্রহণ করতে দেখা গিয়েছিল। ভারতের গণতন্ত্রের জন্মলগ্ন নির্ধারণ করতে গেলে আমাদের এই সম্পূর্ণ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকেও মনে রাখতে হবে।

ভারতের গণতন্ত্রের বিগত সাত দশকের ইতিহাস নিয়ে চর্চার সময় সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে নাগরিকদের প্রান্তিক অংশের কাছে গণতন্ত্র কতটা পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে, তার তথ্য সংগ্রহে। স্বাধীনতার আগে ভারতের প্রান্তিক মানুষদের কাছে ‘গান্ধিরাজ’ ছিল এক শোষণহীন সার্বিক অধিকারযুক্ত ভারতের স্বপ্ন। উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রান্তিক মানুষদের সেই স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, বা কী পরিমাণে বহুসংখ্যকবাদী চিন্তা অনুসৃত হয়েছে, তার বিশ্লেষণ ঐতিহাসিকদের করার প্রয়োজন আছে। স্বাধীনতার পর বেশ কয়েকটি গণহত্যার ঘটনা ঘটেছে – ১৯৮৩ সালে নেলি, ১৯৮৪ সালে দিল্লি, ১৯৮৯ সালে ভাগলপুর, ১৯৯২ সালে মুম্বই, ২০০২ সালে গুজরাত বা ২০১৩ সালে মুজফ্ফরনগর – ভারতের গণতন্ত্রের ইতিহাসে এই গণহত্যাগুলির প্রভাব ঐতিহাসিকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। উনিশশো ষাট-সত্তরের দশক এবং তার পরবর্তীকালের কৃষক ও আদিবাসীদের সশস্ত্র আন্দোলনগুলি ভারতের প্রান্তিক নাগরিকদের মননে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি ধারণার কোনও পরিবর্তন ঘটিয়েছে কিনা সেই প্রশ্নেরও তথ্যভিত্তিক উত্তর ইতিহাসবিদদের খুঁজে বার করতে হবে। ১৯৭৫-১৯৭৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির সময় ছাড়া সরকারিভাবে ভারতের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কখনও সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়নি। কিন্তু, ভারতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা রক্ষার জন্য যে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলি স্বাধীনতার পর গঠিত হয়েছিল, তাদের সাম্প্রতিক কালের ভূমিকা সম্পর্কে  নিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা যে আলোচনা করছেন, তাও বোধ হয় এই ইতিহাস চর্চার পরিধির মধ্যে নিয়ে আসার দরকার। বিগত এক শতক ধরে গণতন্ত্রের ইতিহাস নিয়ে পশ্চিমে যে চর্চা হয়েছে, সেখানে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা দীর্ঘদিন টিকে থাকার জন্য নাগরিকদের স্বাচ্ছল্য, শিক্ষার উন্নত মান ও জাতিগত বৈচিত্র্যের অনস্তিত্বকে প্রাথমিক উপাদান বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল। ভারতের ক্ষেত্রে এই তিনটি উপাদানের অভাব সত্ত্বেও কীভাবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এত দিন ধরে বজায় আছে, তার কারণও ইতিহাসবিদদের খুঁজে বার করতে হবে। ভারতের ধর্ম, জাতি ও বর্ণে বিভক্ত সমাজ কীভাবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করেছে তার মূল্যায়নের কথাও ঐতিহাসিকদের ভাবতে হবে। পশ্চিমের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সুশীল সমাজের ভারতে উপস্থিতি ও ভূমিকা সম্পর্কেও ইতিহাসের গবেষকদের চর্চার প্রয়োজন আছে। সংবিধানের শুরুতেই ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রীয় বলা হলেও বিগত সাত দশকে ভারতের শাসন কাঠামোর প্রকৃত চেহারাটা গণতান্ত্রিক যুক্তরাষ্ট্রীয়তা ও কেন্দ্রিকতার মধ্যে কোন দিকে বেশি ঝুঁকেছে তারও বিশ্লেষণ দরকার। পশ্চিমের বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্রের সঙ্গে ভারতের গণতন্ত্রের তুলনামূলক চর্চারও যথেষ্ট প্রয়োজন রয়েছে। ভারতের সংবাদ মাধ্যম, বিশেষত সাম্প্রতিক কালে দ্রুত প্রসরমান সামাজিক মাধ্যমের জনমত গঠনে ভূমিকাকেও উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।    

একুশ শতকের শুরু থেকে ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সম্পর্কে বেশ কিছু গবেষণামূলক রচনা আমাদের সামনে এসেছে। ২০০১ সালে অতুল কোহলির সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘দ্য সাক্সেস অফ ইন্ডিয়ান ডেমোক্র্যাসি’ বইতে ভারতের গণতন্ত্র নিয়ে ঐতিহাসিকের দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা একাধিক নিবন্ধের দেখা পাওয়া যায়। ২০০৭ সালে প্রকাশিত রামচন্দ্র গুহের ‘ইন্ডিয়া আফটার গান্ধি: দ্য হিসট্রি অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’স লারজেস্ট ডেমোক্র্যাসি’ গণতান্ত্রিক ভারতের ইতিহাস নিয়ে একটি বৃহৎ গবেষণামূলক রচনা। এই একই বছরে প্রকাশিত উজ্জ্বল কুমার সিংহের ‘দ্য স্টেট, ডেমোক্র্যাসি অ্যান্ড অ্যান্টি-টেরর লস ইন ইন্ডিয়া’ ভারতের গণতন্ত্রে স্বৈরতান্ত্রিক আইনের প্রয়োগ নিয়ে উল্লেখনীয় লেখা। ২০১৭ সালে প্রকাশিত অর্নিট শানির ‘হাউ ইন্ডিয়া বিকেম ডেমোক্র্যাটিক: সিটিজেনশিপ অ্যান্ড দ্য মেকিং অফ দ্য ইউনিভার্সাল ফ্র্যানচাইজ’ ভারতীয় গণতন্ত্রের সূচনাপর্ব নিয়ে একটি অত্যন্ত তথ্যসমৃদ্ধ রচনা। ২০১৮ সালে উদিত ভাটিয়ার সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘দ্য ইন্ডিয়ান কনস্টিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলি: ডেলিবারেশনস অন ডেমোক্র্যাসি’ গণ পরিষদে ভারতের সংবিধান নিয়ে বিতর্ক ও ভারতের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর নির্মাণপ্রক্রিয়া নিয়ে তথ্যপূর্ণ আলোচনায় সমৃদ্ধ। ২০১৯ সালে প্রকাশিত উজ্জ্বল কুমার সিংহ ও অনুপমা রায়ের যৌথ প্রয়াস ‘ইলেকশন কমিশন অফ ইন্ডিয়া: ইন্সটিটিউশনালাইজিং ডেমোক্র্যাটিক আনসারটেইনটিজ’ স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক কাঠামোয় নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে একটি অভিনবত্বপূর্ণ লেখা।  

‘ইতিহাস-আড্ডা’ পোর্টালের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার কাছে অনুরোধ, আসুন, নতুন বছরে ভারতের গণতন্ত্রের সাত দশকের ইতিহাস নিয়ে চর্চা শুরু করা যাক। বাংলা ভাষায় স্বাধীনতার পরবর্তী ভারতের গণতন্ত্রের ইতিহাস নিয়ে এমন লেখা সৃষ্টি হোক, যা এই বিষয়ে অনাগ্রহী পাঠকদেরও পড়তে ও ভাবতে উদ্বুদ্ধ করবে।