সম্পাদকীয়
ব্রিটিশ ভারতে প্রাথমিক নির্বাচনী ব্যবস্থা
রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন সমাগত। এই ফাঁকে ব্রিটিশ ভারতে নির্বাচনী ব্যবস্থার শুরুর দিনগুলির ইতিহাস নিয়ে একটু আলোচনা করলে মন্দ হবে না। ১৯২০ সালে ব্রিটিশ আমলে সারা দেশে প্রথম প্রাদেশিক আইনসভার নির্বাচন হয়৷
তখন নির্বাচনী ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত জটিল। নির্বাচনে ভোটার হিসেবে যোগ্যতা অর্জনের জন্য ব্যক্তিকে সম্পত্তির বা জমির মালিকানা, শিক্ষাগত যোগ্যতা অথবা আয়কর বা পৌরকর দেবার প্রমাণপত্র রাখতে হত। ফলে এই ব্যবস্থাতে মূলত ধনী, পশ্চিমা-শিক্ষিত ভারতীয়দেরই ভোট দেওয়ার অধিকার থাকত। নারীদের ভোট দানের অধিকার খুবই সংকুচিত ছিল। আজকের সর্বজনীন ভোটাধিকারের তুলনায় তখনকার ভোটাধিকার ছিল সীমিত সংখ্যক মানুষের—জনসংখ্যার ১০ শতাংশেরও কম মানুষ ভোট দিতে পারতেন।
নির্বাচনী এলাকা ও তার নির্বাচকমণ্ডলী নিয়ে আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ দিকের কথা আলোচনা করা জরুরি। ব্রিটিশ ভারতে নির্বাচনী এলাকাগুলি ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত ছিল। ১৯০৬ সালে সেই সময়ের মুসলিম রাজনীতির অন্যতম প্রধান নেতা আগা খানের নেতৃত্বে এক প্রতিনিধি দল ব্রিটিশ বড়লাট লর্ড মিন্টোর সাথে দেখা করে পৃথক মুসলিম নির্বাচন ব্যবস্থা দাবি করেন। ১৯০৯ সালের ভারত সরকারের আইন অনুযায়ী মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচনী এলাকা বা ‘পৃথক প্রতিনিধিত্ব’ দেওয়া হল। এই আইন মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচনী এলাকা তৈরি করে; সেখানে শুধুমাত্র মুসলমান ভোটাররা তাদের প্রতিনিধিদের ভোট দিতেন। এর ফলে ধর্মের ভিত্তিতে সাম্প্রদায়িক প্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু হল। মনে রাখা দরকার, যখন ১৯০৯ সালের ভারত সরকারের আইন অনুযায়ী মুসলমানদের পৃথক নির্বাচনী এলাকা দেওয়া হয়েছিল তখনও কিন্তু জিন্নাহ কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী ভারতের রাষ্ট্রব্যবস্থার উপর এক সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল এমন ধারণা প্রতিষ্ঠা করা যে, হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য এক অমূলক চিন্তা। হিন্দু ও মুসলমানদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক স্বার্থ যে স্বতন্ত্র, তা জনমানসে প্রতিষ্ঠা করার সহজ উপায় ছিল মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচনী এলাকা বা ‘পৃথক প্রতিনিধিত্ব’ বজায় রাখা।
১৯১৯ সালে শিখ, ইউরোপীয় এবং অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য এই আইন সম্প্রসারিত করা হয়।
এটা সম্ভব যে নোয়াখালীর মুসলমানদের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যাদের মধ্যে বিশিষ্ট ছিলেন মোশাররফ হোসেন, ১৯১৯ পরবর্তী রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং তাদের সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক অবস্থানের উন্নতি ও শক্তিশালী একটি উপায় হিসেবে দেখেছিলেন।
১৯২০ সালের নভেম্বর মাসে ব্রিটিশ ভারতে কেন্দ্রীয় আইনসভা এবং প্রাদেশিক আইনসভাগুলোর সদস্য নির্বাচনের জন্য সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচন ছিল আধুনিক ভারতীয় ইতিহাসের প্রথম নির্বাচন, ১০৪টি কেন্দ্রীয় আইনসভার নির্বাচিত আসনের জন্য ভোটাভুটি হয়েছিল। এই আসনগুলোর মধ্যে অবশ্য ৩৮টি ইউরোপীয়দের জন্য সংরক্ষিত ছিল। বোঝাই যায় এই নির্বাচনে মূল ক্ষমতা রয়ে গেছিল সামান্য সংখ্যক ইউরোপীয়দের কাছেই। এই সময়ে পাশাপাশি প্রাদেশিক আইনসভার ৬৩৭টি আসনের জন্যও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
১৯৩২ সালে পৃথক নির্বাচকমণ্ডলীকে অবদমিত শ্রেণী (বর্তমানে তফসিলি জাতি নামে পরিচিত) এবং অন্যান্য সংখ্যালঘুদের জন্য সম্প্রসারিত করা হয়।
এছাড়াও ব্রিটিশ ভারতে বিভিন্ন পেশাজীবী ও বিশেষ স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য আইনসভায় আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা ছিল। বণিক, জমিদার, শ্রমিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ইত্যাদিদের জন্য কিছু সংরক্ষিত আসন ছিল।
১৯০৯ সালের ‘মর্লি-মিন্টো সংস্কার’ থেকেই জমিদারদের জন্য বিশেষ নির্বাচকমণ্ডলী ও সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করা হয়। ব্রিটিশ পুঁজি ও বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষার জন্য বণিক সভা বা চেম্বার অব কমার্সগুলোর মাধ্যমে প্রতিনিধি পাঠানোর ব্যবস্থা ছিল। উচ্চশিক্ষিতদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের জন্য আলাদা নির্বাচকমণ্ডলী বা আসন সংরক্ষিত থাকত।
১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনে প্রথমবারের মতো শ্রমিক বা শ্রমিক প্রতিনিধিদের জন্য প্রাদেশিক আইনসভায় সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করা হয়। এসব ক্ষেত্রে প্রাথমিক নির্বাচন হত, সেই নির্বাচিত সদস্যরা আবার পুনরায় ভোট দিয়ে নির্বাচনী ক্ষেত্রের প্রার্থীকে নির্বাচন করতেন।
পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী নীতি কংগ্রেসের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করেছিল। এই জটিল সময়ে বাংলা তথা ভারতের রাজনীতিতে হিন্দু-মুসলমান এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার কাজটা সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া দরকার ছিল। এই বিষয়ে চিত্তরঞ্জন দাশ ও তাঁর অনুগামীরা কংগ্রেসের ভেতর থেকেই স্বরাজ্য দল বলে আলাদা একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেন।
দুর্ভাগ্যবশত ১৯২৫ সালে তাঁর অকাল মৃত্যু হিন্দু-মুসলমান ঐক্য নিয়ে জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক আন্দোলনকে পিছিয়ে দেয়।