সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

লেখক: অর্কপ্রভ সেনগুপ্ত

অর্কপ্রভ সেনগুপ্ত
সহকারী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, গভর্নমেন্ট জেনারেল ডিগ্রি কলেজ, নারায়ণগড়।
পূর্ব শতাব্দীগুলিতে এই আনাতোলিয়ার উপর দিয়েই পারসিক বাহিনি অভিযান চালিয়েছে পশ্চিমে। তাদের মূল প্রতিপক্ষ – গ্রিক নগর-রাষ্ট্র সমূহ। এই আনাতোলিয়ার উপর দিয়েই গ্রিসের অভিমুখে ধাবিত হয়েছে শাহেনশাহ্‌ প্রথম দারায়ুস আর জারাক্সিজের বাহিনি। আমরা যে সময়ের কথা বলছি, তখন সেনাবাহিনির পদচালনায় আবারও কেঁপে উঠছে আনাতোলিয়ার মাটি। কিন্তু সেনাবাহিনির গতি এইবার উল্টো দিকে—গ্রিস থেকে পারস্যের অভিমুখে। বিগত এক বছর ম্যাকেডোনিয়ার তরুণ রাজা আলেকজান্ডার পারস্য সাম্রাজ্যের মাটিতে অভিযান চালাচ্ছেন, এই বাহিনি তার-ই। তার পতাকা তলে সমবেত হয়েছে গ্রিসের বিভিন্ন নগররাষ্ট্রের সেনা। পারস্যের সঙ্গে শক্তি পরীক্ষায় তারা উদগ্রীব।
সৃষ্টি যেদিন ধ্বংস হয়ে যাবে, সেই দিন কেমন হবে? এর বর্ণনা বিভিন্ন ধর্ম দিয়েছে বিভিন্ন ভাবে। অনেক সময়, এক-ই ধর্মের মধ্যেই পাওয়া যায় এই সৃষ্টি শেষের মহাপ্রলয়ের ভিন্ন ভিন্ন বিবরণ। খ্রিস্ট ধর্মের ঐতিহ্যেও শেষের সে দিন কেমন, তার বিবিধ বর্ণনা মেলে। তবে এর মধ্যে সর্বাপেক্ষা বিখ্যাত প্রলয়ের ভাষ্যের হদিশ সম্ভবতঃ রয়েছে বাইবেলের ‘বুক অফ রিভিলেশন’-এ। বলা হয়েছে প্রলয়কালে ধরায় অবতীর্ণ হবেন চার অশ্বারোহী। এই প্রলয়ের অশ্বারোহীদের পরিচয় কী ও তাঁরা ঠিক কীসের প্রতিক, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে সর্বাপেক্ষা প্রচলিত মত অনুসারে এই চার সওয়ার হলেন যথাক্রমে পেস্টিলেন্স বা মহামারী, ওয়ার বা যুদ্ধ, ফেমিন বা দুর্ভিক্ষ এবং সর্বোপরি ডেথ বা মৃত্যুর প্রতীক। ঠিক এই কারণেই, আপনি যদি সপ্তদশ শতকের ইউরোপের বাসিন্দা কোনও ধার্মিক খ্রিস্টান হতেন, তাহলে এ’কথা আপনার মনে হওয়া অতি স্বাভাবিক ছিল যে, মহাপ্রলয়ের কাল সমাগত।
ইউরোপ, এমনকি মহাসাগরের ওপারে ইউরোপীয় সভ্যতারই সম্প্রসারিত রূপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কল্পনা ও মননে রোমের পতনের দীর্ঘ ছায়া আজও বিদ্যমান। আজও ‘পশ্চিম’-এর পতন সংক্রান্ত যে কোনও বিতর্কে হামেশাই রোমের পতনের সঙ্গে তুলনা টেনে আনা হয়। বিশেষজ্ঞরা আলোচনা করেন রোমান সাম্রাজ্যের মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরও কোনও একদিন পতন হবে কিনা, ইউরোপের অতি-দক্ষিণপন্থীরা বর্বর আক্রমণের সঙ্গে তুলনা টানেন অভিবাসনের। মোট কথা, ‘পতন’ বলতেই ইউরোপীয়দের (এবং আমেরিকানদের) মননে প্রথম যে চিত্রটি ভেসে ওঠে, তা প্রাচীন রোম-সংক্রান্ত। এই প্রসঙ্গে বলে নেওয়া ভালো, রোমের পতন বলতে খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকের শেষের দশকে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতনের কথা আমরা বলছি। পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য, যা ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দ অবধি বজায় ছিল, তার সম্পর্কে ইউরোপের ঐতিহাসিক স্মৃতি ও ধারণা অন্যপ্রকার, সে এই আলোচনার বিষয় নয়। এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য, আধুনিক ইউরোপের বদলাতে থাকা ঘটনাবলী রোমের পতন সংক্রান্ত ঐতিহাসিক আলোচনাকে কিভাবে প্রভাবিত করেছে, তার একটি সংক্ষিপ্ত ধারণা প্রদান করা।
সময়টা সাধারণাব্দের চতুর্থ শতকের শেষ, পঞ্চম শতকের শুরু। ইউরোপীয় ইতিহাসচর্চায় তখনও গ্রিকো-রোমান ধারারই রমরমা। প্রায় হাজার বছর আগে হেরোডোটাস চিন্তার যে নতুন রাজপথ খুলে দিয়েছিলেন, তাতে ইতিহাসের রথ চালিয়ে চলে গেছেন গ্রিকদের মধ্যে থুকিডিডিস, পলিবিয়াস আর রোমানদের মধ্যে লিভি, প্লুটার্ক আর তাসিতুসদের মতো রথী মহারথী। প্রায় হাজার বছর ধরে ইউরোপীয় ইতিহাস চিন্তার জগতে একাধিপত্য করে চলেছে গ্রিকো-রোমান ইতিহাস চর্চার এই রথ। হঠাৎ এই রথের পথরোধ করে দাঁড়ালেন কয়েকজন। এতদিন ইতিহাস আলোচনার কেন্দ্রে ছিল মানুষ ও তার কাহিনী। সময়ের ধারণা ছিল চক্রাকার। মনে করা হত ইতিহাসের ঘটনাগুলি পূর্বেও ঘটেছে, ভবিষ্যতেও ঘটবে। গ্রিকো-রোমান ধারায় ইতিহাস লেখার উদ্দেশ্যই তো ছিল ভবিষ্যতে যখন একই ঘটনা আবার ঘটবে, তখন মানুষ যাতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে আর ভুল সিদ্ধান্ত থেকে দূরে থাকে তা নিশ্চিত করা।