সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

লেখক: অর্কপ্রভ সেনগুপ্ত

অর্কপ্রভ সেনগুপ্ত
সহকারী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, গভর্নমেন্ট জেনারেল ডিগ্রি কলেজ, নারায়ণগড়।
জীবনে প্রথম রেলগাড়ি দেখার অভিজ্ঞতা এইভাবেই তাঁর সুনিপুন অক্ষরের নকশায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন রাস্কিন বন্ড। সেই বয়সেই তাঁর দেখার চোখ ছিল। পরিতাপের বিষয়, এই ঈশ্বরপ্রদত্ত দৃষ্টি, বর্তমান লেখকের কস্মিনকালেও ছিল না। তবুও এইটুকু মনে আছে, ছোটবেলায় পুজোর সময় ভোরবেলার আকাশ যখন আস্তে আস্তে গোলাপী হয়ে উঠত, তখন হ্যামলিনে বাঁশির মতো রেলগাড়ির হর্নের মায়াবী সুরের টানে বাবা মা-এর হাত ধরে দাঁড়াতাম শেয়ালদার কোনও প্ল্যাটফর্মে। আরব্য রজনী থেকে উঠে আসা এক আশ্চর্য যান প্রবল বেগে ছুটে চলত গন্তব্যের দিকে। জানলা দিয়ে অবাক হয়ে দেখতাম গাছ, বাড়ি, পুকুর, মানুষ, ধানক্ষেত – সবেরই পেছন দিকে দৌড়। আর যখন জুবিলি সেতু আসত, রেলগাড়ি তার উর্ধ্বশ্বাস দৌড় থামিয়ে, ধীর শ্বাস ফেলতে ফেলতে, সকালের সোনাগলানো রোদে চিকচিক করতে থাকা গঙ্গা পার হতো, তখন রাস্কিনের মতোই, পুরো ব্যাপারটাই মনে হতো রূপকথার বইয়ের পাতা থেকে উঠে আসা।
কাকে বলে ইতিহাস? প্রশ্ন অতি সহজ এবং প্রাথমিক। কিন্তু উত্তর? না, এর উত্তর প্রদান করা সহজ নয় মোটেই। যুগে যুগে দেবী ক্লিও-এর সেবকরা প্রচেষ্টা করেছেন এই মোক্ষম প্রশ্নের একটি সর্বজনগ্রাহ্য সরল উত্তর খোঁজা। যে বিষয়ের জন্য তাঁরা পুরো জীবন উৎসর্গ করছেন, তার মূলগত চরিত্র কী, সন্ধান করেছেন বহু ঐতিহাসিক। বোঝার প্রচেষ্টা করেছেন তার বৃহত্তর উদ্দেশ্য। নির্ণয় করতে প্রয়াসী হয়েছেন, তা কি ব্যক্তির কাহিনী বলে, না সমাজের? তাতে নৈতিক বিচারের স্থান আছে না নেই? তার কি কোনো বৃহত্তর অর্থ আর ছন্দ আছে না তা একেবারেই খামখেয়ালী এক প্রবাহ যার ‘নাইকো মানে নাইকো সুর’? গত শতকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসবেত্তা অধ্যাপক ই.এইচ. কার-এর ‘হোয়াট ইজ হিস্ট্রি?’ (‘What is History?’) ছিল এইপ্রকারই এক উত্তর সন্ধানের প্রচেষ্টা।
লিওপোল্ড ফন র‍্যাঙ্কে জন্মগ্রহণ করেছিলেন জার্মানির স্যাক্সনি প্রদেশের থুরিঞ্জিয়ায় উইহা শহরে। তাঁর পরিবার বহু প্রজন্ম ধরে এই প্রদেশে নিয়োজিত ছিলেন লুথারিয়ান যাজক হিসেবে। এই ঐতিহ্য ভঙ্গ করেছিলেন র‍্যাঙ্কের পিতা, গটলব র‍্যাঙ্কে। তিনি পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন আইন। পরবর্তীকালে এই কাজে গটলব যাজকবৃত্তির মানসিক শান্তি খুঁজে না পেলেও র‍্যাঙ্কে পরিবারের আর্থিক অবস্থা এতে প্রভূত উন্নতি হয়। গটলব এবং ফ্রিডরিকে র‍্যাঙ্কের প্রথম সন্তান জন্মগ্রহণ করেন ১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দের ২১ ডিসেম্বর। স্যাক্সনিতে তখন পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যে তার পূর্বের প্রভাব অনেকটাই হারিয়েছে। একদা স্যাক্সনির রাজবংশ পোলিশ-লিথুয়ানিয়ান কমনওয়েলথের রাজপদে প্রতিষ্ঠিত ছিল, পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যে তাঁদের আলাদা মর্যাদা ছিল। সেই দিন তখন আর ছিল না। প্রাশিয়া, অস্ট্রিয়া এবং রাশিয়া পোল্যান্ডের ভাগাভাগি করে নেওয়ার সময় থেকেই স্যাক্সনির পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের প্রতি দায়বদ্ধতা আলগা হতে শুরু করে। তবুও তা তখনও সাধারণ মানুষের মন থেকে একেবারে মুছে যায় নি। সেই কারণেই তৎকালীন পবিত্র রোমান সম্রাট দ্বিতীয় লিওপোল্ড-এর নামে গটলব তাঁর প্রথম পুত্রের নাম রাখেন লিওপোল্ড।
২০২১ সালে মহা ধুমধাম সহযোগে পালিত হল আমাদের দেশ ভারতের ৭৫তম স্বাধীনতা দিবস। স্বাধীনতা এমনি এমনি আসেনি, তাকে আমরা লাভ করেছি লক্ষ লক্ষ মানুষের শোণিতের বিনিময়ে। বহু ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষের আত্মত্যাগের এই অর্জন। আমাদের দুর্ভাগ্য এই অসংখ্য মানুষের অধিকাংশই দেশবাসী কর্তৃক বিস্মৃত। তাঁদের জীবন, তাঁদের সংগ্রাম আলোচনার বাইরেই থেকে যায়। এমনই এক মানুষ, চট্টগ্রামের সুবোধ রায়, প্রখ্যাত বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেনের সুযোগ্য শিষ্য। তাঁর স্বাধীনতা পূর্ব জীবন ও সংগ্রামে আলোকপাত করার উদ্দেশ্যেই এই সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধের অবতারণা। বিপ্লবী সুবোধ রায়ের স্বাধীনতা পরবর্তী জীবনের আলোচনা এই সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধে সম্ভবপর না। এই কারণে এই বিশ্লেষণ তাঁর স্বাধীনতা পূর্ববর্তী কার্যকলাপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।