সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

বাংলার ইতিহাস

নীল কমিশনের সামনে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে নদীয়ার চাষি হাজি মোল্লা বলেছিলেন- ‘ভিক্ষা করে খাব তবু নীল বুনব নি’। দিনু মণ্ডল বলেছিলেন- ‘আমার গলা কেটে ফেললেও নীল বুনব না’। নীলকর সাহেবদের মধ্যে এই নদীয়ার নিরক্ষর, সহজ, সরল চাষিদের ঠকানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল সেই ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই। নীল বিদ্রোহের সময় জেলার হিন্দু মুসলমান চাষিরা একজোট হয়ে সিপাহী বিদ্রোহের নিভে যাওয়া মশাল নতুন করে জ্বালিয়েছিলেন। জেলার মালিয়াপোতার খ্রিস্টান চাষিরাও একজোট হয়েছিল নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধে। ১৮০০ থেকে ১৮৬০ এর মধ্যে মোট তিনটি ধাপে বিদ্রোহ করে সারা বাংলার নীলচাষীদের জাগিয়ে তুলেছিল। জেলার গ্রাম্য নিরক্ষর চাষিরা দেখিয়ে দিয়েছিল তারা ইতিহাস পড়তে না জানলেও ইতিহাস গড়তে জানে। পরাধীন ভারতের অবিভক্ত বাংলার কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, রানাঘাট, কৃষ্ণনগর মহকুমা নিয়ে তখন বিরাট নদীয়া জেলা।১
আরম্ভ করা যাক শান্তিনিকেতনের আদি যুগের একটি কাহিনী দিয়ে। ব্রহ্মাচর্যাশ্রমের প্রথম দিকের ছাত্ররা সকলেই দেখেছেন লিকলিকে রোগা, দন্তহীন, গালে-টোপ-খাওয়া এক বৃদ্ধকে। আশ্রমের রূপ ও বিকাশ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ নিজে যাঁর সম্বন্ধে লিখেছিলেন, "আশ্রমের রক্ষী ছিল বৃদ্ধ দ্বারী সর্দার, ঋজু দীর্ঘ প্রাণসার দেহ। হাতে তার লম্বা পাকাবাঁশের লাঠি, প্রথম বয়সের দস্যুবৃত্তির শেষ নিদর্শন।"১ কেবলমাত্র রক্ষীর কাজই নয়, খাটো ধুতির উপর চামড়ার কোমরবন্ধ পরে খালি গায়ে লাঠি হাতে তিনি শান্তিনিকেতন আর বোলপুর যাতায়াত করতেন দিনে দু’বার করে। তিনি ছিলেন বিশ্বভারতীর ডাকহরকরাও। সবাই তাঁকে সর্দার বলে ডাকতেন। তাঁর জীবনের গল্প শুনিয়েছেন সুধীরঞ্জন দাস। সে গল্পের কতোটা ইতিহাস আর কতোটাই বা কিংবদন্তি, তা বোধহয় আজ আর কেউ বলতে পারবেন না।
"মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা। তোমার কোলে, তোমার বোলে, কতই শান্তি ভালবাসা।" রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল পুরস্কার পাওয়া উপলক্ষে ১৯১৩ সালে বাঙালি এবং বাংলা ভাষার প্রতি গভীর প্রেম ও শ্রদ্ধা নিবেদন করে এই গানটি রচনা করেছিলেন অতুল প্রসাদ সেন। তিনি হয়তো কখনো কল্পনাও করেননি তার রচনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে একটি দেশ প্রথমে ভাষা আন্দোলন ও তারপর মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে যাবে। ভাষাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ভাবে স্বাধীনতা আন্দোলনে যুক্ত হওয়া ও পরে স্বাধীনতা পাওয়ার দৃষ্টান্ত মানব সভ্যতার ইতিহাসে কমই আছে। বাঙালিরা এর অন্যতম পথিকৃৎ। হবে নাই বা কেন? মাতৃভাষার চেয়ে সুমধুর আর কি হতে পারে? তবে যাইহোক, বাংলা ভাষার আজকের যে রূপ আমরা দেখতে পাই তার বহুলাংশই আধুনিক কালে সৃষ্টি। বিদেশি সাহেব ও দেশীয় পণ্ডিতের কখনো সচেতন, কখনো অতিসচেতন, আবার কখনো অসচেতন কার্যক্রমের মধ্য দিয়েই আজকের বাংলা ভাষার উৎপত্তি হয়েছে।