সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

লেখক: লিপিকা ঘোষ

লিপিকা ঘোষ
পেশা শিক্ষকতা। সাহিত্য ও ইতিহাস নিয়ে স্নাতকোত্তর স্তরে পড়াশুনো করেছেন। ধ্রুপদী নৃত্য চর্চা করছেন ছোটবেলা থেকেই। ভালোবাসেন অভিনয় ও লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত থাকতে। গ্রুপ থিয়েটার, টেলিফিল্ম ও দূরদর্শনের পর্দায় অভিনয় করেছেন। লিখেছেন সানন্দা সহ বিভিন্ন পত্রিকায়। গল্প, কবিতার পাশাপাশি লোকসাহিত্য নিয়ে লেখালেখিতে বিশেষ আগ্রহী।
ঋত্বিক ঘটক তাঁর ছবির মধ্য দিয়েই বুঝিয়েছেন তিনি নির্ভীক, নিষ্ঠাবান, আপসহীন শক্তিশালী পরিচালক। ছবি নির্মাণে প্রথাগত ব্যাকরণ ভেঙ্গে নিজেই নতুন ব্যাকরণ তৈরি করেছেন। কাহিনি, সংলাপ, চরিত্রচিত্রণ, আবহসঙ্গীত, ক্যামেরা সবেতেই তাঁর প্রতিভা ও যত্নের ছাপ রয়েছে। উচ্চাঙ্গ সংগীতের পাশাপাশি রবীন্দ্র সঙ্গীত, লোকসঙ্গীতকেও ব্যবহার করেছেন তাঁর ছবিতে। বারবার এনেছেন দেশভাগের কথা, উদ্বাস্তু মানুষের যন্ত্রণার কথা, দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতায় মানুষের বলি হওয়ার কথা। বেশির ভাগ প্রধান চরিত্র রামায়ণ, মহাভারত ও পুরাণ থেকে নিয়েছেন, শঙ্কর, ভৃগু, রাম, অভিরাম, ঋষি, ঈশ্বর, নীলকণ্ঠ তাঁর ছবির চরিত্র। নারী চরিত্রগুলিও এনেছেন সেভাবে। নামকরণের ক্ষেত্রে রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ থেকে এনে আধুনিক যুগের কালানুগ করে তুলেছেন। সীতা, অনুসূয়া, উমা, শকুন্তলা, জগদ্ধাত্রী ভারতীয় সংস্কৃতির শাশ্বত চরিত্র। তাঁর কয়েকটি ছবিতে প্রধান নারী চরিত্রের নামকরণ হয়েছে এদের নামে। সীতা, দুর্গা, উমা একাধিকবার এসেছে তাঁর ছবিতে। সেকালের নারী চরিত্ররা একালের দেশ, কাল ও সামাজিক পরিবেশে কতটা প্রাসঙ্গিক হতে পারে তা দেখিয়েছেন।
শাসক শ্রেণির পৃষ্ঠপোষকতায় রচিত ইতিহাস ও সাহিত্যে তাদেরই জয়গান গাওয়া হয়, তাদের দৃষ্টিতে রাষ্ট্রের ও জনগণের অবস্থার বিশ্লেষণ করা হয় কিন্তু সেই শাসকের রাজ্যে বসবাসকারী জনগণের, বিশেষ করে প্রান্তিক মানুষের প্রকৃত আর্থ-সামাজিক অবস্থান বা জীবন যাপন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় না। প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলার নিম্নবর্গীয় মানুষের, শাসক শ্রেণির বিপরীত মেরুতে শ্রেণিবদ্ধভাবে অবস্থানকারী মানুষের জীবনধারার পরিচয় পাওয়া যায় নির্দিষ্ট কতগুলি গ্রন্থে। প্রাচীন বাংলার নিম্নবর্গের ইতিহাস পাওয়া যায় চর্যাপদ, মঙ্গলকাব্যের মতো কিছু সাহিত্যে, কিছু ধর্মীয় গ্রন্থে। আর মধ্যযুগীয় বাংলার পূর্বাঞ্চলের নিম্নবর্গের ইতিহাস পাওয়া যায় মৈমনসিংহ-গীতিকা, পূর্ব্ববঙ্গ-গীতিকার মতো লোকসাহিত্য সংকলনে। লোকসাহিত্যই নিম্নবর্গের মানুষের ইতিহাসের আকর। এই মৈমনসিংহ–গীতিকা তেমনি একটি আকর গ্রন্থ।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মৈমনসিংহ গীতিকার প্রকাশ এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দীনেশচন্দ্র সেন সম্পাদিত শতবর্ষ পুরানো মৈমনসিংহ গীতিকা প্রকাশিত হয়েছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এই সময় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সম্পর্ক ছিল নিবিড়, যা ছিল ঐতিহাসিকও। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তার বছর চল্লিশের ‘শৈশবকালে’ আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের মতো অভিভাবকের হাতে এসে পড়েছিল। তাঁর বুদ্ধিমত্তা, কর্মোদ্যম, শিক্ষাসচেতনতা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে অতি দ্রুত দেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্মান এনে দিয়েছিল। প্রচলিত ধারণাকে নস্যাৎ করে দেওয়ার মতো বাংলা সমাজ জীবনের দলিল মৈমনসিংহ গীতিকার প্রকাশ আর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা স্নাতকোত্তর বিভাগের ঐতিহাসিক দ্বারোদ্ঘাটন প্রায় সমসাময়িক ঘটনা।