সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

কত্থক নৃত্যের কথকতা

কত্থক নৃত্যের কথকতা

লিপিকা ঘোষ

জুন ১০, ২০২৩ ৮৩২ 7

বিশ্বসংস্কৃতির আঙ্গিনায় ভারতীয় সংস্কৃতি এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। প্রাচীনকাল থেকেই এই ভারতীয় সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় সম্পদ যে সাহিত্য, সঙ্গীত, চিত্রকলা, নৃ্ত্যকলা তা আর আলাদা করে উল্লেখের আপেক্ষা রাখে না। তবে এসবের মধ্যে নৃত্যকলাকেই সংস্কৃতির প্রাচীন ধারা হিসাবে মেনে নেওয়া হয়। এই নৃ্ত্যকলা প্রাচীনকাল থেকেই ভারতীয় জনজীবনকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে এসেছে। ভরতনাট্যম, কত্থক, কুচিপুড়ি, মণিপুরি, ওড়িশি, মোহিনীঅট্টম, কথাকলি — এই সাতটি শাস্ত্রীয় নৃ্ত্য ছাড়াও বর্তমানে অসমের সত্রীয়া নৃ্ত্যকেও শাস্ত্রীয় নৃ্ত্যের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। ভারতের এই সাতটি শাস্ত্রীয় নৃ্ত্যই আজ বিশ্বের দরবারে প্রশংসিত। আর ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃ্ত্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রশংসিত যে কত্থক নৃ্ত্যকলা তাতে সন্দেহ নেই। ভারতীয় সংস্কৃতির অন্যতম ধারক ও বাহক কত্থক তার আপন তালের ঝংকারে আপন ঠাটের মহিমায় সদা উজ্জ্বল!

কত্থক নৃ্ত্য বহু প্রাচীনকাল থেকেই ভারতে প্রচলিত। তার প্রমাণ পাওয়া যায় প্রাচীন গ্রন্থ থেকে। ব্রহ্মমহাপুরাণে অভিনেতা গায়ক ও নর্তকের ক্ষেত্রে এই ‘কত্থক’ শব্দটি পাওয়া যায়। ‘সঙ্গীত রত্নাকর’ গ্রন্থে, পাণিনির ‘সিদ্ধান্ত কৌমুদী’ গ্রন্থে এবং ‘শব্দার্থ- চিন্তামণি’, ‘বাচস্পত্যকোষ’, ‘শব্দকল্পদ্রুম কোষ’ প্রভৃতি অভিধানে ‘কত্থক’ সম্প্রদায়ের উল্লেখ আছে। আবার জৈন ধর্মগ্রন্থ ‘অভিধান রাজেন্দ্র কোষ’ এ কত্থক সম্প্রদায়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। উল্লেখ পাওয়া যায় রামায়ণ, মহাভারত, হরিবংশপুরাণ সহ তুলসী দাসের ‘বিনয় পত্রিকা’তেও।

এদিকে লক্ষণ সেনের সভায় বিদ্যুত্প্রভা, শশীকলা নামের কত্থক শিল্পীরও উল্লেখ পাওয়া যায়। গীতগোবিন্দের রচয়িতা কবি জয়দেবের পত্নী পদ্মাবতীও কত্থক নৃ্ত্যে পারদর্শী ছিলেন বলে জানা যায়। কত্থক সম্প্রদায়ের দেখা পাওয়া যায় সংস্কৃত সাহিত্যে ‘কথাকার’, পালি সাহিত্যে ‘কথিকা’, জৈনধর্ম গ্রন্থে ‘কুহক’ রূপে।

‘কত্থক’ শব্দটি এসেছে ‘কথা’ শব্দ থেকে। ‘কত্থক’ এর আভিধানিক অর্থ হল কথাকার বা গাথাকার। যে কথা বলে বা গাথা বলে বা গল্প বলে সেই কত্থক বলে ধরে নেওয়া হয়। প্রাচীন কালে যারা গল্পের মাধ্যমে পৌরাণিক দেবদেবীর লীলামাহাত্ব প্রচার করত তাদের কত্থক সম্প্রদায় বলা হত। সে যুগে কত্থক সম্প্রদায় সাধারণত ব্রাহ্মণ পণ্ডিত সম্প্রদায় থেকে আসত তাই তাদের কত্থক ঠাকুরও বলা হত। তখন এই সম্প্রদায়ের লোকেরা পৌরাণিক কাহিনিগুলোকে নৃ্ত্য ও গীতের সাহায্যে গল্পের ছলে পরিবেশন করত। কত্থক সম্প্রদায় নামটি থেকেই কত্থক নৃ্ত্য নামটি এসেছে বলে অনেকের ধারণা।

কথিত আছে শ্রীকৃ্ষ্ণ এই নৃ্ত্য বৃন্দাবনের যমুনার ধারে এক বটগাছের তলায় শুরু করেন। আবার কেউ বলেন কালীয়দমনের সময় শ্রীকৃষ্ণ কালীয় নাগের মাথার ওপর যে নৃত্য করে সেই নৃ্ত্য থেকেই ‘তা’, ‘থেই’, ‘তৎ’ ধ্বনির সৃষ্টি। এই ধ্বনি থেকে তৈরি ছন্দ ‘নটবর’ নামে পরিচিত। তবে বিশেষভাবে এই নৃ্ত্যে রাধাকৃ্ষ্ণের লীলা ও শ্রীকৃ্ষ্ণের মাহাত্ব প্রচার করা হত। এই নৃত্যের শ্রেষ্ঠ শিল্পী হিসাবে শ্রীকৃ্ষ্ণকে ‘নটনাট্যরসিকবর’ রূপে কল্পনা করা হয়। রাধাকৃ্ষ্ণের লীলাকাহিনী কত্থক নৃ্ত্যধারার মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। ভরতমুণির নাট্যশাস্ত্রে হল্লীসক, চর্চরী, নাট্যরাসক প্রভৃতি থেকে রাধাকৃ্ষ্ণ লীলাবিষয়ক যে নাট্যপদ্ধতির রূপের কথা জানা যায় তা পরবর্তীতে কত্থক নৃ্ত্যে দেখা যায়। কাব্য, সঙ্গীত ও অভিনয় সহযোগে তখন কত্থকনৃ্ত্য রাসনৃ্ত্য ধারার মতো পরিবেশিত হত। তবে বর্তমানে প্রচলিত কত্থকনৃ্ত্যের সঙ্গে তৎকালীন সমাজের কথিকাশ্রয়ী ধর্মভিত্তিক কত্থকনৃ্ত্যের বৈশিষ্ট ও চরিত্রগত পার্থক্য আছে। যখন বৈষ্ণব ধর্মের ক্রমবর্ধমান প্রসারের ফলে কত্থকনৃ্ত্যেরও প্রসার ঘটেছিল, তখন তার এক শুদ্ধ রূপ পাওয়া গেছে। ধ্রূপদ ও ধামার সঙ্গীত পদ্ধতিকে অনুসরণ করা এই নৃ্ত্যধারা প্রচলিত ছিল। দধি, নটুয়া, চরণ, কলাবন্ত, রসধারী প্রভৃতি নর্তকরা এই শুদ্ধ পদ্ধতির কত্থকনৃ্ত্য পরিবেশন করত।

তবে মুসলমানরা উত্তর ভারত আক্রমণ করলে এই নৃ্ত্য-গীতের চর্চা সাময়িকভাবে থেমে যায়। স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার উদ্দেশ্যে ব্রাহ্মণ পণ্ডিত ও কত্থক সম্প্রদায় দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে মুঘল সম্রাটরা ভারতে সাম্রাজ্য বিস্তার করলে এই নৃ্ত্যের পৃষ্টপোষকতা করেন। উত্তর ভারতের আচার-ব্যবহার, সংস্কার-সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসতে শুরু করেছিল ত্রয়োদশ শতাব্দীর পর থেকেই। আর এই পরিবর্তন মুঘল আক্রমণের ফলে আরো বেশি করে চোখে পড়ে। স্থানীয় হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কারের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামদের ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কারের একটা সহবস্থানের পরিবেশ তৈরি হতে থাকে।

মুঘল আমলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে শিল্পীরা এদেশে এসে মুঘল দরবারে স্থান নিয়েছিল। ষোড়শ শতকের মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য রাজ শাহ শিল্পকলাকে ঘৃণা করতেন বলে তাঁর রাজত্বকালে সেই দেশের শিল্পীরা অন্যদেশে চলে যেতে বাধ্য হয়। ১৫৫০ সাল নাগাদ আব্দাল সামাদ ও মীর সামাদ নামে দুজন চিত্রকর ও অন্যান্য শিল্পীরা ভারতে এসে সম্রাট হুমায়ূন এর আশ্রয় নেন। তাঁর রাজসভায় চিত্রকলা ও সঙ্গীতের চর্চা শুরু হয়। চিত্রকলা ও সঙ্গীতচর্চার প্রসার ঘটেছিল মুঘল আমলেই। সম্রাট হুমায়ুন পারস্য দেশ থেকে নৃ্ত্যশিল্পীদের নিয়ে আসতেন তাঁর দরবারে। মুঘল সম্রাটরা নৃত্যপটিয়সীদের বিশেষ সমাদর করতেন। তাঁরা মনে করতেন শিল্পকলা সুন্দরী নারীদের দ্বারা পরিবেশিত হলে তা অনেক বেশি রুচিশীল হবে। এই সময় চার শ্রেণীর নর্তকীর আবির্ভাব হয় – লোলোনীস, ডোমনীস, হর্কিনিস ও হেনসিনিস। বাদশাহের রাজমহলে এই নৃত্য পটিয়সীদের অনেকে বংশ পরম্পরায় কত্থক নৃত্যের ধারক ও বাহক ছিল। মূলত পারস্য থেকে সুন্দরী মহিলা কিনে আনা হলেও অন্যান্য দেশও থেকে এদের সংগ্রহ করা হত। যেহেতু এরা ক্রীতদাসী হয়ে এখানে আসত সেহেতু প্রভূর ইচ্ছায় অন্দর মহলে থাকতে বাধ্য হত এবং সঙ্গীতচর্চা করত। শ্রীবিনয় ঘোষ রচিত ‘বাদশাহী আমল’ গ্রন্থে লিখেছেন,

 “দেশের বাইরে থেকে বাদশাহরা সুন্দরী নারী নিয়ে আসতেন। তাদের ‘কাঞ্চন’ বলা হত। কাঞ্চনবর্ণা সুন্দরী মহিলা ছিল তারা। নৃত্য, গীতেও পারদর্শী ছিল। তাল মাত্রা জ্ঞানও ছিল অতুলনীয়। কণ্ঠ ছিল অতুলনীয় মিষ্টতায় ভরা”।

মুঘল সম্রাট হুমায়ুন ও আকবরের আমলে এখানকার প্রাচীন সংস্কার ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁদের সংস্কার ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটে। মোঘল সাম্রাজ্যের নৃত্যের প্রতিপালনের কথা জানা যায় আবুল ফজল রচিত আইন-ই-আকবরি গ্রন্থ থেকে। জানা যায় আকবরের আমলে শিল্পকলা বিশেষ সমাদর পেয়েছিল সে কথাও। এই সময় কত্থক নৃ্ত্যের রূপ ও রসে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। আইন-ই-আকবরিতে নাটুয়া, সেজেতালি, কঞ্জরী, ভোগেলি প্রভৃতি নৃ্ত্য সম্প্রদায়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। আকবরের দরবারে নৃ্ত্যচর্চার কারণে শুদ্ধ কত্থক নৃ্ত্যের অবয়ব ও আভ্যন্তরীণ রূপের আমূল পরিবর্তন হলেও বৈষ্ণব ধর্মীয় প্রভাব বর্তমান ছিল।

সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে স্বামী হরিদাসজী দিল্লিতে কত্থক নৃত্যের প্রচার শুরু করেন। এই সময় কত্থক নৃ্ত্যে পৌরাণিক কাহিনি ও রাধাকৃ্ষ্ণের লীলার সঙ্গে সম্রাটের মনোরঞ্জনের জন্য ভিন্ন বিষয়ও যুক্ত হয়। সেই সঙ্গে যুক্ত হয় নতুন নতুন ভঙ্গি। তানসেন ও অন্যান্য শিল্পীরা এই নৃ্ত্যের গীতরসকে সমৃদ্ধ করলেন। পরিবর্তন আনলেন পাখোয়াজের বোলের। নৃ্ত্যের আঙ্গিক ও ধারণার পরিবর্তন করে নতুন করে সাজিয়ে তুললেন কত্থক নৃ্ত্যকে। তাঁর সভার বিশিষ্ট গুণী শিল্পীর হাতে সেজে ওঠা এই নৃ্ত্য দেখে মোহিত হলেন সম্রাট।

মুসলমান শাসক ছাড়াও উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের হিন্দু রাজাদের মধ্যেও দ্রুত জনপ্রিয় হতে শুরু করল এই নৃত্য। আকবরের সমসাময়িক অল বদাউনির ‘মুন্তেখব উত্তোয়ারিখ’ গ্রন্থেও নৃ্ত্য চর্চার কিছু উল্লেখ পাওয়া যায়। সুলতান মুহম্মদ আদিল শাহ নৃত্যে পারদর্শী ছিলেন। মারাঠার শাসক ছত্রপতি শাহু (১৭০৭-২৯) তার রাজ্যে নৃ্ত্যশিল্পী এনে ‘নাচনেবালী মহল’ করেছিলেন। পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাওয়ের রাজ্যেও নৃ্ত্যশিল্পীর সমাদরের কথা জানা যায়। পাঞ্জাব কেশরী রণজিৎ সিং নৃ্ত্যশিল্পের অনুরাগী ছিলেন। তিনি কাশ্মীর, পারস্য, খোরসান সহ অন্যান্য দেশ থেকে দেড়শো সুন্দরী নৃ্ত্য পটিয়সী এনেছিলেন তাঁর রাজ্যে। এই সমস্ত রাজা বাদশাদের অনুসরণ করে দেশের ছোট রাজা বা জমিদাররাও তাদের সাধ্যমত নৃ্ত্যশিল্পী আনা শুরু করে। ততদিনে কত্থক নৃত্যশিল্পীদের নাচনেওয়ালী নাম হয়ে যায়। পরবর্তীতে রাজকর্মচারী ও ধনিব্যক্তিরাও আমোদ প্রমোদের জন্য নাচনেওয়ালীদের পৃষ্টপোষকতা দান করতে থাকে। সেই সময় সারা ভারতে ছড়িয়ে ছিল রমজানি, মিশারি, বাঈ, দোমনি, খেলানি, নারীয়ালি, মস্তানি, ঝুমারি প্রভৃতি নামের নাচনেওয়ালীরা। কত্থকনৃ্ত্যের স্থান হল মন্দির থেকে দরবারে। সম্রাটদের পৃষ্ট পোষকতার ফলে দিল্লি, আগ্রা ও লক্ষ্ণৌতে এবং হিন্দু রাজাদের পৃষ্টপোষকতায় রাজস্থানে নৃ্ত্য চর্চা শুরু হল। ধীরে ধীরে যা কত্থক নৃ্ত্য চর্চার প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠল।

সম্রাট আকবর

সম্রাট আকবর, জাহাঙ্গীর, শাজাহানও সঙ্গীতের বিশেষ অনুরাগী হওয়া সত্ত্বেও সম্রাট ঔরঙ্গজেবের রাজত্বকালটি নৃ্ত্য – গীতের জন্য এক অভিশপ্ত কাল ছিল। মুঘল সম্রাটদের আমলে কত্থক নৃ্ত্যচর্চার প্রসার ঘটলেও ঔরাংজেবের আমলে তাতে বাধা পড়ে। শাসক পরিবর্তিত হবার সঙ্গে সঙ্গে নৃ্ত্যশিল্পীদেরও ভাগ্য পরবর্তিত হতে লাগল। তাঁর দরবার থেকে গুণী শিল্পীদের বিতাড়িত করলেন। তবে তাঁর ও তাঁর পারিপার্শিকদের মনোরঞ্জনের জন্য কিছু কৃ্তদাসী নৃ্ত্যশিল্পীকে রাখলেন। এই কৃ্তদাসীরা নতুন করে নতুনভাবে নৃ্ত্য শিক্ষা নিতে বাধ্য হল এবং সেখানে এরাই নাচনেওয়ালি বলে পরিচিত হতে থাকল। এই সময় নৃ্ত্যের মান খুব নিচে নেমে যায়। এমনও জানা যায় নৃ্ত্যশিল্পীরা এই ধরনের নৃ্ত্য পরিবেশন করতেও লজ্জা পেত। যে নৃ্ত্যকলা একসময় দেবতাকে তুষ্ট করার জন্য পরিবেশিত হত সেই নৃত্যকলা রাজা বাদশার মনোরঞ্জনের জন্য পরিবেশিত হতে লাগল আর নৃ্ত্যশিল্পীরা রাজা/ বাদশার ভোগবিলাসের বস্তু হয়ে উঠল। ধীরে ধীরে নৃ্ত্যশিল্পীরা যৌনকর্মীতে পরিণত হল। রাজা বাদশাদের পৃষ্টপোষকতায় এই নৃ্ত্য সমৃদ্ধ হলেও কালের প্রবাহে এর ভাগ্য পরিবর্তিত হয় আর রাজা বাদশাদের ইচ্ছায় নৃ্ত্যশিল্পীরা তাঁদের ভোগবিলাসের সামগ্রী হয়ে ওঠে। পরে সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে বাঈজি নাম নেওয়া এই নৃ্ত্যশিল্পীদের জায়গা হয় কুঠীবাড়িতে। কিছু শিল্পী যৌনকর্মী হতে বাধ্য হয়, শিল্প থেকে তারা বিচ্ছিন্ন হয়। পরে ব্রিটিশ আমলে রাজা বাদশার বিলুপ্তি ও ভারতীয় নৃ্ত্যশিল্পীদের প্রতি তাদের অবহেলার ফলে নৃ্ত্যশিল্পীদেরও অবস্থা আরো করুণ হয়।

ঔরংজেবের আমলে শিল্পী ও শিক্ষকরা দিল্লি থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর থেকেই অসহায় হয়ে আশ্রয় খুঁজছিল নিশ্চিন্তে শিল্পচর্চায়। সম্রাট ঔরাঙ্গজেবের নৃত্য – গীতের প্রতি বিদ্বেষ ও অবহেলার জন্য হরিদাসজীর শিষ্য ঈশ্বরীপ্রসাদ দিল্লি থেকে লক্ষ্ণৌ গিয়ে বসবাস শুরু করেন এবং সেখানেই ওয়াজেদ আলির পিতামহ নবাব আসাফ- উদ- দৌলার রাজত্বকালে তাঁর সভাতে নৃত্যচর্চা করতে থাকেন। কথিত আছে ঈশ্বরী প্রসাদজি যিনি দিল্লি থেকে লক্ষ্ণৌ এসে নৃ্ত্যচর্চা শুরু করেন তিনি শ্রীকৃষ্ণদেবের স্বপ্নাদেশ নটবরী নৃ্ত্যের ভাগবত রচনা করেন এবং নৃত্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। তিনি এই নৃত্যের নাম নটবরী নৃত্য রাখেন। অবশ্য শেষ পর্যন্ত বহু মতান্তরের পর ১৮৮৩ সালে এই নৃত্যের নামকরণ হয় ‘কত্থক নৃত্য’।

ওয়াজেদ আলির সমাদরে এই নৃ্ত্যকলা ও শিল্পীরা পুনরায় সমাদৃত হয়। অযোধ্যার নবাব ওয়াজেদ আলি ও রায়গড়ের চক্রধর সিং নৃ্ত্য ও নৃ্ত্যশিল্পীদের পৃষ্টপোষক ছিলেন। মূলত এঁদের পৃষ্ট পোষকতার কারণে আদি কত্থক শিল্পীদের নৃত্যকলা শেষ পর্যন্ত রক্ষা পেয়েছিল। ওয়াজেদ আ্লি শাহ জন্ম গ্রহণ করেন ১৮২৩ সালের ১৯ জুলাই আর ১৮৪৭ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি সিংহাসনে বসেন। তিনি একাধারে কবি, গীতিকার, উচ্চাঙ্গ সেতার বাদক ছিলেন। তিনি সারাজীবন যেমন সঙ্গীতচর্চা করেছেন তেমনি শিল্পীদের সমাদরও করেছেন। তাঁর আমলেই কত্থক নৃত্যের বিশেষ প্রসার ঘটেছিল। পিতামহের মত তিনিও বিভিন্ন জায়গা থেকে তাঁর সভায় নৃত্য, গীতে পারদর্শীদের এনে সভা অলঙ্কৃত করতেন। তিনি রীতিমত নৃ্ত্য- গীতের উৎসব করতেন। তিনি হোলিয়া উৎসব করতেন, তবলার উৎসব করতেন। তিনিই প্রথম কত্থক নৃ্ত্যের সঙ্গে পাখোয়াজের বদলে তবলার বাদ্যের প্রচলন করলেন।

নবাব ওয়াজেদ আলী

ব্রিটিশ গভরনর লর্ড ডালহৌসির চক্রান্তে ওয়াজেদ আলি শাহ মাত্র তেইশ বছর বয়সে ক্ষমতাচ্যুত হন। একরকম বাধ্য হয়েই বছরে বারো লক্ষ টাকা পেনশন নিয়ে ১৮৫৬ সালের এপ্রিলে কলকাতা চলে আসেন। কলকাতার প্রাক্তন প্রধান বিচারপতির ১১ নম্বর বাড়ি কিনে নিয়ে তৈরি করেন মেটিয়াবুরুজের নিজস্ব বাড়ি। বাড়িতেই ২৩টি বাঘ, সিংহ, চিতা, কয়েক হাজার পাখি সহ চিড়িয়াখানা তৈরি করেন। কলকাতাতেই গড়ে তোলেন আর একটি লক্ষ্ণৌ। তিনি সিপাহি বিদ্রোহের সময় কিছুদিন ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গে বন্দি থাকতে বাধ্য হন। এখান থেকে বেরিয়ে এসে দেখলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির রাজত্ব শেষ হয়ে রানির রাজত্ব শুরু হয়েছে তাই তাঁর হারানো রাজ্য ফিরে পাবার আশাও চলে গে্ল। তখন পাকাপাকিভাবে কলকাতায় থাকার সিদ্ধান্ত নেন এবং এখানে পুরোপুরি সঙ্গীতচর্চায় নিজেকে উত্সর্গ করেন। শুধু নৃ্ত্যগীত নয়, তিনি সাহিত্য অনুরাগীও ছিলেন, নিজে অসংখ্য কবিতা ও গান রচনা করতেন। এই সময় তিনি লিখেছিলেন ‘হুজনে আখতার’ নামে একটি ছোট পদ্য আখ্যান। আখতার ছিল ওয়াজেদ আলি শাহের ছদ্মনাম। তাঁর রচিত ৪৬টি গ্রন্থ মেটিয়েবুরুজের ছাপাখানা ‘মৎবাই সুলতানী’ থেকে প্রকাশ করতেন। তাঁর রচিতগ্রন্থগুলি তিনি বিক্রি না করে পরিচিতদের উপহার দিতেন। তিনি উর্দু, অবধি ও ব্রজবুলি ভাষাতে গান ও কবিতা রচনা করতেন। এই সংস্কৃতিমনস্ক উদার নবাবের রচিত সেই জনপ্রিয় গান  ‘যব ছোড় চলি লক্ষৌ নগরী/ তব হালাদ পর ক্যায়া গুজরি’ এ প্রজন্মকেও উদাস করে।

তিনি লক্ষ্ণৌ থেকে বিখ্যাত শিল্পীদের কলকাতায় এনে সঙ্গীতের আসর বসাতেন। লক্ষ্ণৌ থেকে শিল্পীরা কলকাতায় এসে দীর্ঘদিন থাকতেন এবং সঙ্গীত পরিবেশন করতেন। এই শিল্পীদের জন্য তিনিই অর্থ ব্যয় করতেন। ওয়াজেদ আলি তাঁর পেনশনের সমস্ত টাকা এই সঙ্গীত চর্চাতেই খরচ করেছেন। তাঁর দাক্ষিণ্যে কলকাতায় সঙ্গীত চর্চার জোয়ার এসেছিল। সঙ্গীতের প্রতি তাঁর পৃষ্টপোষকতা কলকাতাকে নতুনভাবে সঙ্গীত চর্চায় অনুপ্রাণীত করেছিল। তাঁর ইচ্ছায় মেটিয়াবুরুজের তবলার তালে বাংলাদেশে শুরু হল কত্থকের রেওয়াজ। সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক মানসিকতার নবাব কলকাতায় একত্রিশ বছরে মোট তেইশবার সঙ্গীত উৎসবের আয়োজন করেন। তাঁর আগ্রহে বিশেষচর্চার মাধ্যমে কত্থকনৃ্ত্যের ধারাটি আবার উৎকর্ষতা লাভ করল। বাংলায় তথা সারা উত্তর ভারতে কত্থক নৃ্ত্যের চর্চা এবং বিকাশ মূলত তাঁর উত্সাহে হয়েছে। তিনিই কত্থকনৃ্ত্যকে আগের সম্মানের জায়গা ফিরিয়ে দিয়েছেন।

নতুন সাজে, নতুন ব্যাকরণে কত্থকনৃ্ত্য-

যে কত্থকনৃত্য বর্তমানে দেখা যায় তার মধ্যে ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতির বৈশিষ্ট ওতোপ্রতভাবে মিশে আছে। পোশাক পরিচ্ছদ ও আঙ্গিকের পরিভাষাগুলিও প্রভাবিত হয়ে পরিবর্তিত হয়েছে। প্রাচীন বিশুদ্ধ কত্থক নৃত্যের ‘রাধা’ হয়েছে ‘সাকী’, ‘আগমন’ হয়েছে ‘আমোদ’, ‘প্রস্তুত’ হয়েছে ‘অদা’, ‘নমস্কারী’ হয়েছে ‘সেলামি’। প্রাচীন কালে কত্থকঠাকুররা যে ধরনের পোশাক পরত তা পরবর্তীতে মুসলমান শাসকদের নিজস্ব সংস্কৃতির ছোঁয়ায় অনেকটাই পরিবর্তিত হয়েছে। আগে কত্থক নৃত্য পরিবেশনের সময় পুরুষরা ধুতি পরত। এর সঙ্গে কাঁধ থেকে কোমর পর্যন্ত দোপাট্টা দেওয়া থাকত। দেবদেবীর চরিত্র অনুযায়ী পোশাক অর্থাৎ ধুতি পরা হত। শ্রীকৃষ্ণের লীলা পরিবেশনের সময় হলুদ রঙের রেশমি ধুতি, সবুজ রঙের দোপাট্টা, মাথায় ময়ূরের পেখম দেওয়া মুকুট, অল্প গহনা পরত। 

পরবর্তীতে এই নৃ্ত্যের বেশভূষায় পারস্যের পোশাকের প্রভাব চলে এল। যেহেতু মুসলমান শাসকরা এর পৃষ্টপোষক ছিলেন সেহেতু তাঁদের পছন্দ অনুযায়ী পোশাক নির্দিষ্ট হল। এই সময় থেকে পুরুষরা চুড়িদার বারাবন্দি বা পাজামা ও ঘেরদার বারাবন্দি বা জামা পরা শুরু করল। এই জামার সঙ্গে শেরওয়ানি পরা হল। একটি দোপাট্টা কাঁধ থেকে কোটিদেশ পর্যন্ত তির্যকভাবে বেঁধে দেওয়া হল। মাথায় চুনট অর্থাৎ সাটিনের বা জরির টুপি উঠল। তবে শিব তান্ডবের ভাব প্রদর্শনের সময় পাতলুন আর শ্রীকৃষ্ণের ভাব প্রদর্শনের সময় আচকান পরার নিরদেশ রইল। মহিলাদের জন্যও একই রকম পোশাক স্থির করা হল। বিশেষ পোশাকের সঙ্গে বিশেষ অলঙ্কারও যোগ করা হল। গলায় বিভিন্ন আকারের হার, হাতে রতনচূড়, কঙ্কন, আংটি, পায়ে নূপুর, আঙ্গুটি, মেয়েদের নাকে নথ, মাথায় চুনটের সঙ্গে টিকলি বা ঝাপটা প্রভৃতি অলঙ্কার পরা শুরু হল। বিশেষভাবে তাল রক্ষার জন্য শিল্পীর পায়ে দেওয়া হল দড়ি দিয়ে বাঁধা কয়েকশো ঘুঙুর। বাদশাহী দরবারে এই নতুন পোশাকে সরেঙ্গী, ঘুঙুর, পাখোয়াজের শব্দের সঙ্গে পরিবেশিত হল নতুন ছন্দে কৃ্ষ্ণলীলা।

নতুন কত্থকনৃত্যের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল বাদ্যযন্ত্রের তালের সঙ্গে পায়ের ঘুঙুরের ঝংকারের মিলন। পায়ের দ্বারা তাল ও লয়ের সামঞ্জস্য রেখে জটিল মনোরম রূপ পরিবেশিত হল এই নৃ্ত্যে। তাল, লয়ের বিভিন্ন পর্যায়ে এই নৃত্য পরিবেশিত হল। সঙ্গীতের সঙ্গে নৃত্য, নৃত্ত ও নাট্যের এমন পরিবেশন শুধু কত্থকনৃত্যের ক্ষেত্রে দেখা যায়। তবলা ও পাখোয়াজ-এর বোলের প্রয়োগও এই নৃত্যের আরও এক বৈশিষ্ট্য। ভাবের স্বরূপ রাগের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয় তাই এই নৃত্যে গায়ক ও নৃত্যশিল্পী একই পদকে বিভিন্ন প্রকারে প্রকাশ করে থাকে। যেহেতু কত্থকনৃত্যের ভাব মূলত শৃঙ্গার রসের সঙ্গে পরিবেশিত হয় আর শৃঙ্গার রস ঠুমরির সঙ্গে মিশে বিশেষ মাত্রা পায় সেহেতু মুঘল আমলে বেশকিছু ঠুমরি লেখা শুরু হল। লেখা হয়েছে ব্রজবুলী ভাষাতেও। ঠুমরিতে নৃত্যের মাধ্যমে অভিব্যক্তি (প্রেম, মাধুর্য, কোমলতা, করুণা, নিরাশা) প্রকাশ করতে সুবিধা হল।

কত্থকনৃত্যের অঙ্গ বা নৃত্যাঙ্গের বিশেষ পরিবর্তন হল। নৃত্যরত ভঙ্গিকে অঙ্গ বলা হয়। প্রত্যেকটি অঙ্গের নির্দিষ্ট নাম ও ব্যবহার রয়েছে। কত্থকনৃত্যের মোট তেরো রকমের অঙ্গ নির্দিষ্ট হল। এই অঙ্গ গুলি হল স্তুতি, উরমই, সুলপ, উরপ, তিরপ, শুদ্ধমুদ্রা, লাগ, ডাট, ধীলাঙ্গ, থরে, পুহুপ মঞ্জুরী, পিরমলু জমনকা।

নৃত্যের শুরুতে শিল্পী যে ভঙ্গীতে দেবতার উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করে গুরু প্রণাম, ভূমি প্রণাম ও বাদ্যযন্ত্রকে প্রণাম করে তাকে স্তুতি বলে। নৃত্যের ভঙ্গিতে লাফিয়ে একদিক থেকে অন্য দিকের মাটিতে পা ফেলাকে বলে উরমই। এই অঙ্গের আর এক নাম উরমই-সুরমই, তাণ্ডব নৃত্যে এই অঙ্গের ব্যবহার বেশি হয়। লাস্য ভাবাপন্ন ভঙ্গিতে নৃত্যের অঙ্গকে সুলপ বলে। যে ভঙ্গিতে অতি আনন্দের ভাব প্রকাশ করা হয় তাকে উরপ বলে। শিল্পী যখন তির্যক ভঙ্গিতে নৃত্য করে তখন তাকে তিরপ বলে। হাত ও আঙুলের বিভিন্ন সংকেতকে শুদ্ধ মুদ্রা বলে। দুটি অঙ্গ মিলে একটি মুদ্রা বা একটি অঙ্গ তৈরি হলে তাকে লাগ বলে। নৃত্যের যে ভঙ্গিতে আত্মগর্বের ভাব প্রকাশ করা হয় তাকে ডাট বলে। নৃত্যের সময় একটি জায়গায় দাঁড়িয়ে লাফিয়ে ভঙ্গি করাকে ধীলাঙ্গ বলে, তাণ্ডব নৃত্যে এই অঙ্গের ব্যবহার দেখা যায়। নৃত্যের যে ভঙ্গিতে পায়ের আঙুলের সাহায্যে ঘুঙুরের শব্দ বার করে তাল রক্ষা করা বা ভাব প্রকাশ করা হয় তাকে থরে বলে। শিল্পী সভা/ মঞ্চে এসে যে ভঙ্গিতে পুষ্পাঞ্জলী দেয় তাকে পুহুপ মঞ্জুরী বলে। তবলা ও পাখোয়াজ এর বোলের সঙ্গে নৃত্যের সংমিশ্রণে পিরমলু অঙ্গের ব্যবহার করা যায়। মূলত এই বোলকেই পিরমলু বলে। নৃত্যের যে ভঙ্গিতে শিল্পী ঠুমরি গানের ভাব প্রকাশ করার জন্য প্রথম বসতে হয় তাকে জমনকা বলে।

এই অঙ্গের সঙ্গে যোগ হয় মুদ্রার ব্যবহার। কত্থকনৃত্যের টুকরা, পরণ, তোড়া, চক্রদার প্রভৃতি পর্যায়ে যে সব মুদ্রার ব্যবহার হয় তা ছন্দের বিশিষ্ট রূপ অনুযায়ী হয়। কোনো ভাবত্মক কবিতা বা কথানক ইত্যাদির ভাব হাতের মুদ্রার সাহায্যে প্রকাশ করা হয়। এগুলি স্বাভাবিক ভাব প্রকাশকারী মুদ্রা। কত্থকনৃত্যে দেবতার তাণ্ডবনৃ্ত্যে নৃ্ত্যশাস্ত্র অনুসারে নির্দিষ্ট মুদ্রা ব্যবহার করা হয়। শিবতাণ্ডবের ক্ষেত্রে ডমরু, কৃষ্ণতাণ্ডবের ক্ষেত্রে বংশী, বিষ্ণুতাণ্ডবের ক্ষেত্রে শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্ম প্রভৃতি শাস্ত্রীয় মুদ্রা ব্যবহার করা হয়।

কত্থক নৃ্ত্যের পরিবেশনেও নতুনত্ব দেখা দেয়। সেই নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী এই নৃ্ত্য পরিবেশনের আগে থেকেই লহরা বাজানো হয়। এর পর তবলায় চক্রদার পরণ বাজায়, তারপর শিল্পী সভা/ মঞ্চে প্রবেশ করে। সভায় এসে শিল্পী প্রথমে নিকাশ ও আমদ দেখায়। এর পর বিভিন্ন ঠাট (দাঁড়িয়ে বিভিন্ন ভাব ও মুদ্রার প্রদর্শন) পরিবেশন করে। এই সময় পাখোয়াজে/ তবলায় সাধারণ ঠেকা বাজানো হয়। অনেক সময় বাদক ছোট ছোট মোহর বা তিহাই দিয়ে সম এ ফিরে আসে। এর পরে শিল্পী সেলামী বা নমস্কার টুকরা প্রদর্শন শুরু করে। সেলামীর পর তোড়া, পরণ, তিহাই দেখানো হয়। তোড়া পরিবেশন করার আগে হাতে তাল দেখাতে হয়। বিভিন্ন লয়ে তিহাই ও তিহাই ছাড়া তোড়াতে অঙ্গসঞ্চালন ও পায়ের বোল দেখানো হয়। অনেক সময় তবলার সঙ্গে শিল্পীর পায়ের বোলের প্রতিযোগীতাও চলে। এরপর তবলাবাদক ছোট ছোট কবিতা তালে তালে আবৃত্তি করে পরে সেটাকে হাতের মুদ্রা, পায়ের কাজ ও ভাব ঠেকার সাহায্যে পরিবেশন করা হয়। এই সময় দ্রুত লয়ে নৃ্ত্য পরিবেশন হলেও তবলায় সাধারণভাবে ঠেকা বাজে। গৎ-ভাও এর পর্যায়ে খুব ছোট ছোট কাহিনিকে শিল্পী মুদ্রা ও ভাবের মাধ্যমে অঙ্গসঞ্চালন করে তুলে ধরে। এই কাহিনিগুলি সাধারণত মহাভারতের কাহিনি বিশেষ করে রাধাকৃ্ষ্ণের কাহিনি থেকে নেওয়া হয়, যেমন- মাখনচুরি, কালিয়দমন, রাসলীলা, হোলি প্রভৃতি। এরপর একটি ছোট টুকরা দেখিয়ে সম এ আসতে হয়। পরের পর্যায়ে দ্রুত লয়ে তৎকার দেখানো হয়। তৎকারে লয় ক্রমাগত দ্রুত হতে থাকে। লয় এক্ষেত্রে দ্বিগুণ, তিনগুণ, চতুর্গুণ, আড়, কুঁয়াড়, বিয়াড় প্রভৃতি সব লয়ে দেখানো হয়। সবশেষে শিল্পী তিহাই দিয়ে নৃ্ত্য পরিবেশন সমাপ্ত হয়।

ঘরানা

এই কত্থক নৃ্ত্য বেশ কয়েকটি ঘরানায় বিভক্ত। ঘরানা অনুযায়ী নৃ্ত্যশৈলীরও ভিন্ন হয়ে থাকে। শাস্ত্রীয় নৃত্যের ব্যাকরণ ঠিক রেখে শিক্ষক/ গুরুর নিজস্ব প্রতিভা দিয়ে কোনো শিল্পশৈলীকে নতুন বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ করাকেই ঘরানা বলে। যিনি এক্ষেত্রে মুন্সিয়ানার পরিচয় দেন তাঁর নামে ঘরানার নাম হয়। সেই গুরুর শিষ্যরা এই ঘরানাকে বহন করে চলেন। এ ভাবেই নৃ্ত্য, গীত, বাদ্যে নিজস্ব ঘরানা তৈরি হয়। আর এই ভাবেই কত্থকনৃত্যের কয়েকটি ঘরানার বিশেষ প্রচলন হয়। কত্থক নৃত্যের মোট তিনটি ঘরানার পরিচয় পাওয়া যায়। বর্তমানে এই নৃত্যের যে তিনটি ঘরানা দেখতে পাওয়া যায় তা হল লক্ষ্ণৌ, জয়পুর ও বেনারস ঘরানা।

লক্ষ্ণৌ ঘরানা-

ভজন, ঠুমরি, কবিতা, সহযোগে অভিনয় তাল ও ছন্দের সামঞ্জস্যের মেলবন্ধন এই ঘরানা। আচার্য ঈশ্বরী প্রসাদের সময়ে এই ঘরানার উৎপত্তি হয়। ঈশ্বরীপ্রসাদ এলাহাবাদের হাঁড়িয়া তালুক নিবাসী ছিলেন। কথিত আছে ভগবান শ্রীকৃ্ষ্ণের স্বপ্নাদেশে তিনি নটবরী কত্থক নৃ্ত্যকে পুনরুদ্ধার করেন এবং তিনিই এই নৃ্ত্যের ভাগবত রচনা করেন। ঈশ্বরী প্রসাদের তিন পুত্র – অউড়গুজি, খড়গুজি, তুলগুজি (তুলারাম)। এরা সকলেই পিতার কাছে নৃত্যশিক্ষা নিয়েছিলেন। আড়গুজির তিন পুত্র ছিল- প্রকাশজি, দয়ালজি, হরিলালজি। তাঁরা পিতা আড়গুজির মৃত্যুর পর লক্ষ্ণৌ চলে যান। প্রকাশজি লক্ষ্ণৌ রাজ আসিফ-উদ-দৌল্লার সভানর্তক ছিলেন। তিনি ওয়াজেদ আলিরও নৃত্যগুরু ও সভানর্তক ছিলেন। এই সময় থেকেই লক্ষ্ণৌ ঘরানা বিকশিত হয়। সে যুগে তাঁর ‘গনেশ পরন’ খুব বিখ্যাত ছিল। তিনিই এই নৃত্যের নামকরণ করেন “কত্থক নটবরী”। ১৮৫৬ সালে প্রকাশজির মৃত্যু হলে তাঁর তিন পুত্র  দুর্গা প্রসাদ, ঠাকুর প্রসাদ, মানুজি নৃ্ত্যের ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যান। এই দূর্গাপ্রসাদের তিন পুত্র ছিল- মহারাজ বিন্দাদীন, কালিকাপ্রসাদ, ও ভৈরীপ্রসাদ। তারাও এই নৃ্ত্যে বিশেষ দক্ষতার পরিচয় দেন। আর দুর্গাপ্রসাদের অন্য ভাই ঠাকুর প্রসাদজির পরে এই নৃত্যধারা বজায় রাখেন মহারাজ কালিকা প্রসাদ, বিন্দদীন মহারাজ প্রমুখ। এদের বংশধর অচ্ছন মহারাজ, লচ্ছু মহারাজ, শম্ভু মহারাজ পরবর্তিতে অসামান্য দক্ষতার সঙ্গে এই ধারাকে বয়ে নিয়ে চলেন। এই ঘরানার শ্রেষ্ঠ শিল্পী বিরজু মহারাজ তাঁর সুনিপুণ নৃত্য কৌশল বিশ্বব্যাপী প্রভূত খ্যাতি অর্জন করেছেন। এই ঘরানায় চটুল দেহভঙ্গিমা, সূক্ষ্ম ভাবকে বিকশিত করে, এই ঘরানার নৃত্য মূলত লাস্য পর্যায় ভুক্ত। এই নৃ্ত্য তবলার বাজনার সঙ্গে তাল রেখে পরিবেশন করা হয়। এই নৃত্যে ছোট ছোট শ্রুতি মধুর বোল এবং ভজন, ঠুমরি, কবিতার সঙ্গে পরিবেশন করা হয়।

বিরজু মহারাজ

 এই ঘরানার উল্লেখযোগ্য শিল্পী হলেন বিন্দাদীন মহারাজ, তিনি নবাব ওয়াজেদ আলির দরবারে তৎকালীন ভারতের বিখ্যাত পাখোয়াজ বাদক কুদউ সিং এর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে বিশেষ কৃ্তিত্ব দেখিয়ে বিজয়ী হন। তিনি ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের সময় বিন্দাদীন মহারাজ লক্ষ্ণৌ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন। তবে এই সময় ভূপালের নবাব এবং নেপালের মহারাজা তাঁদের পরিবারকে বহু ধন সম্পত্তি দিয়ে সাহায্য করেন। সাধারণ জীবন যাপনে অভ্যস্ত কৃষ্ণভক্ত বিন্দাদীন মহারাজ বহু ঠুমরী ও ভজন রচনা করেছেন। অপুত্রক বিন্দাদীন মহারাজ তাঁর ভাতুষ্পুত্রদের নৃত্যশিক্ষা দিয়ে যান। ভাই কালিকাপ্রসাদের পুত্র আচ্ছন মহারাজ, শম্ভু মহারাজ ও লচ্ছু মহারাজ তার কাছে নৃ্ত্যশিক্ষা করেন।  

 বিশিষ্ট কত্থক শিল্পী শম্ভু মহারাজের মুখের ভাব বা অভিনয় ক্ষমতা ছিল অত্যন্ত সুন্দর। তিনি কত্থক নটবরী নৃ্ত্যে শোক, আশা, নিরাশা, ঘৃণা, প্রেম, ক্রোধ প্রভৃতি ভাব প্রকাশ করতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। তিনি নৃ্ত্যে রাষ্ট্রপতি পুরস্কার এবং পরবর্তীতে পদ্মশ্রী উপাধীও পান। তিনি দিল্লির ভারতীয় কলাকেন্দ্রের নৃ্ত্য বিভাগের আচার্যের পদে আসীন ছিলেন।

  কত্থক নৃ্ত্যের বিশেষ আঙ্গিক রচনায় বিরজু মহারাজের অবদান অনস্বীকার্য। তিনি বিশেষ কিছু পৌরাণিক কাহিনিকে কথকের আঙ্গিকে ব্যালের রূপ দেন, যেমন – ফাগ লীলা, গোবর্ধন লীলা, কুমারসম্ভব, মালতীমাধব প্রভৃতি। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে, তবলা ও পাখোয়াজ বাদনেও তিনি বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। তিনি খুব দ্রুত দক্ষ নৃ্ত্যশিল্পী হয়ে উঠেছিলেন তাইই নয়, তেরো বছর বয়সে নৃ্ত্যশিক্ষক হন। দিল্লির ভারতীয় কলাকেন্দ্রে অধ্যাপনা করেন দীর্ঘদিন। তিনি ১৯৬৪ সালে সর্বকনিষ্ঠ শিল্পী হিসাবে সঙ্গীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার পান, ১৯৮৬ সালে পদ্মবিভূষণ পুরস্কার ও ১৯৮৭ সালে কালিদাস সম্মান পান। হিন্দি চলচ্চিত্রে সেরা নৃ্ত্য পরিচালনার জন্য জাতীয় পুরস্কার ও ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কার পান। বিশ্বের দরবারে কত্থক নৃ্ত্যকে জনপ্রিয় করে তুলতে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।

জয়পুর ঘরানা-

রাজস্থানে শ্যামল দাস নামে এক বিখ্যাত নৃত্য শিল্পী ছিলেন। তাঁর নামে ঘরানাও ছিল। পরে সেটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়- জয়পুর ঘরানা ও জানকী প্রসাদ ঘরানা। প্রায় ১৫০ বছর আগে ভানুজি মহারাজের দ্বারা জয়পুর ঘরানার প্রতিষ্ঠা হয়। এক সাধুর কাছ থেকে শিব-তাণ্ডব নৃত্য শিক্ষা নিয়েছিলেন এবং নিজেও শৈব ছিলেন। তাঁর পুত্র মালুজিকে তিনি নৃত্য শিক্ষা দেন। মালুজির দুই পুত্র- লালুজি, ও কালুজি। এই কালুজি বৃন্দাবনে এসে বসবাস করেন, সেখানে নৃত্যশিক্ষা করে আচার্য পদ লাভ করেন। কানুজির প্রপ্রৌত্র হনুমান প্রসাদের তিন পুত্র ছিল- মোহন লাল, চিরঞ্জী লাল ও নারায়ণ প্রসাদ। হনুমান প্রসাদের ভাই হরিপ্রসাদও কত্থকনৃত্যে নিপুন ছিলেন। হরিপ্রসাদের খুল্লতাত পুত্র চুনিলালের তিন পুত্র ছিল- জয়লাল, সুন্দর প্রসাদ, মালুলাল। এঁরা জয়পুর ঘরানায় নৃত্যাচার্য ছিলেন। তাঁরা এই ঘরানার বিশেষ উন্নতি ও প্রসার করেন। জয়নালের দুই সন্তান জয়কুমারী ও রামগোপাল, সুস্মিতা মিশ্র, কুমুদিনী লাখিয়া, রোশনকুমারী এই ঘরানার অসাধারণ নৃত্য শিল্পী ছিলেন। জয়পুর ঘরানার নৃ্ত্যে মূলত তাণ্ডব নৃ্ত্যের প্রাধান্য রয়েছে। সেই কারণে শব্দের গাম্ভির্য আনার জন্য নৃ্ত্যের সহযোগী বাদ্য হিসাবে পাখোয়াজ বাজানো হয়। এই ঘরানায় তাল ও লয়ের কঠিন কাজ পরিবেশন করা হয়। বর্তমানে কিছু গত্ভাও পরবেশিত হয়। তবে এই ঘরানায় ভাব ও লাস্যের প্রাধান্য কম থাকে।

 হনুমান প্রসাদের পুত্র নারায়ণ প্রসাদ জয়পুর ঘরানার অন্যতম শাখা ভানুজী প্রবর্তিত শাখার নৃ্ত্যশিল্পী ছিলেন। তিনি কৃষ্ণের লীলা বিষয়ক কবিতা ও ঠুমরি রচনা করেন। তিনি ১৯৫৮ সালে বেলগাওয়ের গান্ধর্ব মহাবিদ্যালয় থেকে নৃ্ত্যাচার্য উপাধী পান। তাঁর ঘরানা তাঁর ছাত্র ছাত্রীরা দক্ষতার সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। তাঁর ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হল- কুন্দলাল, হাজারীলাল, শংকর ঝা, পুষ্পা মাথুর, রানি কর্ণা প্রমুখ। 

   বেনারস ঘরানা

বেনারস ঘরানার কত্থকনৃত্য মূলত রাজস্থানের শ্যামল দাস ঘরানার অন্যতম বিভাগ জানকীপ্রসাদ ঘরানা থেকে এসেছে। এই ঘরানার উদ্ভব রাজস্থানে হলেও বিকশিত হয়েছিল বেনারসে তাই একে বেনারস ঘরানা বলা হয়। বিখ্যাত শ্যামলদাস ঘরানার একটি জয়পুর ঘরানা নামে বিখ্যাত হয় আর অন্যটি অর্থাৎ জানকী প্রসাদ ঘরানাটি বেনারস ঘরানা নামে খ্যাতি লাভ করে। জানকীপ্রসাদ ঘরানা যার নামানুসারে সেই জানকীপ্রসাদের দুই ভাই দুলহীরাম ও গণেশীলাল বেনারসে এসে বসবাস শুরু করেন এবং এখানেই নৃত্যচর্চা শুরু করেন। এদের প্রচেষ্টাতে জানকীপ্রসাদ ঘরানা খ্যাতি লাভ করেছিল। পরে এদের শিষ্য চুন্নিলাল, এই ঘরানার আরো প্রসার ঘটান। দুলহীরামের তিন পুত্র বিহারীলাল, পুরনলাল ও হীরালাল এই ধারাকে দক্ষতার সঙ্গে বহন করেন। এদের মধ্যে বিহারীলাল ইন্দোরের রাজসভার নর্তক ছিলেন। এই বিহারীলালের তিনপুত্র কিষাণলাল, মোহনলাল ও সোহনলাল দেরাদুনে চলে যান। আর পুরনলালের পুত্র মদনলাল ও রামলাল পরে পাতিয়াল চলে যান। যে কারণেই হোক এই ঘরানার শিল্পী খুব কম। জয়পুর ঘরানায় বোলের মৌলিকতা ও সৌদর্য লক্ষ্য করা যায়। এই নৃ্ত্যে তবলা ও পাখোয়াজ তাল রক্ষা করে থাকে। তবে অন্য ঘরানার সঙ্গে এই ঘরানার তাল, লয় ও নৃ্ত্যশৈলীর পার্থক্য দেখা যায়। এই ঘরানায় বাদ্যযন্ত্রের বোলের থেকে নৃ্ত্যের বোলকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়।

শাড়ি পরে কত্থক নৃত্য

   পরিশেষে- 

   ভারতীয় নৃ্ত্যশিল্পীদের প্রতি ব্রিটিশদের অবহেলা শুধু কত্থক নৃ্ত্যশিল্পীদের নয়, অন্যান্য শাস্ত্রীয় নৃ্ত্যশিল্পীদেরও কঠিন লড়াইয়ের সামনে দাঁড় করিয়েছিল। অনেক আইনের লড়াইয়ের পর দেবদাসীদের যেমন সমাজের অভিশাপ থেকে উদ্ধার করা হল তেমনি ‘নাচনেওয়ালী’ নামক অভিশপ্ত শব্দের থেকে নারী ও কত্থক নৃ্ত্যকে বার করে আনা সম্ভব হল। কত্থক নৃ্ত্যকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে শম্ভু মহারাজ, লচ্ছু মহারাজ, বিরজু মহারাজের অবদান ছাড়াও ম্যাডাম মেনকা ও দময়ন্তী যোশীরও অবদান রয়েছে। কত্থকনৃ্ত্য নিয়ে গবেষণা ও তাকে পুনরায় শিল্পের মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে ম্যাডাম মেনকার অবদান বিশেষ উল্লেখযোগ্য। বাংলার বরিশালের প্যারিলাল রায় ও লোলিতা রায়ের কন্যা লীলা রায় যিনি পরবর্তিতে ম্যাডাম মেনকা নামে পরিচিত হন তিনি লন্ডন থেকে উচ্চশিক্ষা লাভ করে বেহালা বাদনে বৃত্তিলাভ করেন এবং রাশিয়ার ব্যালে নৃ্ত্যশিল্পী আনা পাবলোভার দ্বারা অনুপ্রাণীত হয়ে ব্যালে ও ভারতীয় নৃত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ অনুভব করেন। তিনি যেমন ভারতীয় পদ্ধতিতে পূর্ণাঙ্গ ব্যালে প্রযোজনা করে বিশেষ কৃ্তিত্বের পরিচয় দেন তেমন তিনি কত্থকনৃ্ত্য নিয়ে গবেষণা করেন এবং নিজে একটি নৃ্ত্য সম্প্রদায় গড়ে তোলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত নৃ্ত্যসম্প্রদায় ১৯৩৫ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভারতীয় নৃ্ত্য হিসাবে কত্থক নৃ্ত্য পরিবেশন করেন। ১৯৪১ সালে ‘নৃ্ত্যলয়ম’ বলে একট নৃ্ত্যের আবাসিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন। মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর নামে কত্থক নৃ্ত্যের বিশেষ পারদর্শিতার জন্য পুরস্কার প্রদান করে থাকে। তাঁর দত্তক কন্যা তথা ছাত্রী দময়ন্তী যোশিও কত্থক নৃ্ত্যকে ভারতে জনসাধারণের মধ্যে জনপ্রিয় করে তুলতে ও বিশ্বের দরবারে পরিচিত করে তুলতে বিশেষ অবদান রাখেন। তিনি আচ্ছুন মহারাজ, লচ্ছু মহারাজ ও শম্ভু মহারাজের কাছে লক্ষ্ণৌ ঘরানার কত্থক শেখেন। এছাড়া জয়পুর ঘরানার নৃ্ত্যশৈলীও শেখেন এবং খুব অল্প দিনেই পারদর্শী হয়ে ওঠেন। তিনিই প্রথম শাড়িকে কত্থক নৃ্ত্যের পোশাক হিসাবে ব্যবহার করেন। তিনি খয়তরাগড়ের ইন্দিরা কলা বিশ্ববিদ্যালয় ও লক্ষ্ণৌর কত্থক কেন্দ্রে নৃ্ত্য শিক্ষা দেন। কত্থক নৃ্ত্যে বিশেষ অবদানের জন্য পদ্মশ্রী ও সংগীত একাডেমি পুরস্কার পান।

বিংশ শতাব্দিতে এসে কত্থক নৃ্ত্যকে জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য দেশের বিভিন্ন জায়গায় নৃত্যশিক্ষাকেন্দ্র স্থাপিত হয়। দিল্লিতে ভারতীয় কলা কেন্দ্র, ইন্দিরাগান্ধি কলা কেন্দ্র, চণ্ডীগড়ের প্রাচীন কলা কেন্দ্র সহ অসংখ্য শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে ওঠায় সাধারণের মধ্যে এই নৃত্যের চর্চা শুরু হয়, শিল্পীদের সমাদর বাড়ে। এর ফলে অচীরেই কত্থকনৃ্ত্যের প্রচার ও প্রসার বৃ্দ্ধি পায়। এ ছাড়াও সীতারা দেবী, রোশন কুমারী, শাশ্বতি সেন, শোভনা নারায়ণ, মায়া রাও, কুমুদিনী লাখিয়া, বন্দনা সেন প্রমুখরা কত্থকনৃ্ত্যের প্রচার ও প্রসারকে তাঁদের সাধনার বিষয় হিসাবে বেছে নিয়েছেন।

বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই নৃ্ত্যের সমাদর ও চর্চা বেড়েই চলেছে। বিশ্বের দরবারে দুই ভিন্ন সংস্কৃতির অপূর্ব মেলবন্ধনে তৈরি হওয়া এই ভারতীয় শাস্ত্রীয়নৃ্ত্য ভারতের নিজস্ব সংস্কৃতির দৃষ্টান্ত হয়েই পরিবেশিত হয়। একদিকে নৃ্ত্যশৈলী, পোশাক, অলংকারে ইসলামীয় প্রভাব অন্যদিকে ভাবাভিনয়ের জন্য কাহিনিতে হিন্দু তথা বৈষ্ণবদের রাধাকৃ্ষ্ণলীলা, রাসলীলার প্রভাব সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নিদর্শন বহন করে চলেছে। সাম্প্রদায়িকতা, হানাহানি তখনও ছিল, এখনও আছে। সম্প্রীতি তখনও ছিল, এখনও আছে। ভারতের বহু স্মৃতিসৌধের মত কত্থকনৃ্ত্য সেই সম্প্রীতির ফসল। সংস্কৃতি যদি কোনো জাতির জনজীবনের উত্কৃ্ষ্ট নির্যাসটুকু হয় তাহলে ভারতীয় নামক জাতির সেই প্রাক্তন জনজীবনের উত্কৃ্ষ্ট নির্যাস এই কত্থকনৃ্ত্য। আজ সাম্প্রদায়িক তাণ্ডবের দিনেও সারা বিশ্বের সংস্কৃতির তীর্থক্ষেত্র ঘুরে ঘুরে কত্থকনৃ্ত্য প্রমান করে চলেছে, শিল্প- সংস্কৃতিই পারে ধর্ম-সম্প্রদায়ের বিচ্ছেদ-সাগর পেড়িয়ে মানব জাতির মিলনের সেতু গড়ে তুলতে।    

তথ্যসূত্র-

১) ড সুরেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, ড ছন্দা বন্দ্যোপাধ্যায়, ভরতনাট্যশাস্ত্র, নবপত্র প্রকাশনা, ১৯৫৬।

২) অনিতেশ চক্রবর্তী, কলকাতার নবাবের নকল রাজত্ব, বঙ্গদর্শন, ২৭ নভেম্বর ২০১৯

৩) শ্রীপান্থ, মেটিয়াবুরুজের নবাব, আনন্দ পাবলিশার্স, অষ্টম সংস্করণ ২০১৬

৪) ড. গায়ত্রী চট্টয়োপাধ্যায়, ভারতের নৃত্যকলা, করুণা প্রকাশনী, ২০১৬

৫) অনুপ শংকর অধিকারী, নৃ্ত্যবিতান, সঙ্গীত প্রকাশন, ১৯৯৯

৬) শম্ভুনাথ ঘোষ, অনিন্দিতা ঘোষ, কত্থক নৃ্ত্যের রূপরেখা, সঙ্গীত প্রকাশন, ২০২০

মন্তব্য তালিকা - “কত্থক নৃত্যের কথকতা”

  1. কত্থক নৃত্যের ইতিহাস!! দারুণ লাগল। এমনিতেই সংস্কৃতির ইতিহাস আমার অন‍্যতম প্রিয় বিষয়, তার ওপর এমন সুলিখিত ও তথ‍্যসমৃদ্ধ প্রবন্ধ হলে তো কথাই নেই। অনেকদিন আগে একটা ব‍্যক্তিগত প্রয়োজনে ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত‍্যগুলো নিয়ে লেখা তৈরি করছিলাম। সেটা অবশ‍্য বেশিদূর এগোয়নি আমার কুঁড়েমির জন্য। এখন এই লেখাটা পড়ে আবার সেসব বইপত্রগুলো বের করার ইচ্ছা জেগে উঠলো।

  2. স্বল্প পরিসরে কত্থক নৃত্য সম্পর্কে নির্মোহভাবে ঐতিহাসিক বর্ণনা এক কথায় চমৎকার।আপনার প্রতিটি লেখাই অনেক মূল্যবান।
    আপনার জন্য রইলো অনেক শুভকামনা। আমাদের জন্য আরো লিখে যাবেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।