সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

নগ্ন সত্যের সন্ধানী – লিওপোল্ড ফন র‍্যাঙ্কের ইতিহাসচর্চা সম্পর্কে কিছু কথা

নগ্ন সত্যের সন্ধানী – লিওপোল্ড ফন র‍্যাঙ্কের ইতিহাসচর্চা সম্পর্কে কিছু কথা

অর্কপ্রভ সেনগুপ্ত

নভেম্বর ৫, ২০২২ ১০০৩ 0

লিওপোল্ড ফন র‍্যাঙ্কে জন্মগ্রহণ করেছিলেন জার্মানির স্যাক্সনি প্রদেশের থুরিঞ্জিয়ায় উইহা শহরে। তাঁর পরিবার বহু প্রজন্ম ধরে এই প্রদেশে নিয়োজিত ছিলেন লুথারিয়ান যাজক হিসেবে। এই ঐতিহ্য ভঙ্গ করেছিলেন র‍্যাঙ্কের পিতা, গটলব র‍্যাঙ্কে। তিনি পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন আইন। পরবর্তীকালে এই কাজে গটলব যাজকবৃত্তির মানসিক শান্তি খুঁজে না পেলেও র‍্যাঙ্কে পরিবারের আর্থিক অবস্থা এতে প্রভূত উন্নতি হয়। গটলব এবং ফ্রিডরিকে র‍্যাঙ্কের প্রথম সন্তান জন্মগ্রহণ করেন ১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দের ২১ ডিসেম্বর। স্যাক্সনিতে তখন পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যে তার পূর্বের প্রভাব অনেকটাই হারিয়েছে। একদা স্যাক্সনির রাজবংশ পোলিশ-লিথুয়ানিয়ান কমনওয়েলথের রাজপদে প্রতিষ্ঠিত ছিল, পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যে তাঁদের আলাদা মর্যাদা ছিল। সেই দিন তখন আর ছিল না। প্রাশিয়া, অস্ট্রিয়া এবং রাশিয়া পোল্যান্ডের ভাগাভাগি করে নেওয়ার সময় থেকেই স্যাক্সনির পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের প্রতি দায়বদ্ধতা আলগা হতে শুরু করে। তবুও তা তখনও সাধারণ মানুষের মন থেকে একেবারে মুছে যায়নি। সেই কারণেই তৎকালীন পবিত্র রোমান সম্রাট দ্বিতীয় লিওপোল্ড-এর নামে গটলব তাঁর প্রথম পুত্রের নাম রাখেন লিওপোল্ড।

লিওপোল্ড বড় হয়ে ওঠেন এক লুথারিয়ান ধর্মীয় আবহের মধ্যে যেখানে সহজ ভাবে জীবনধারণ এবং উচ্চ চিন্তাকে গুরুত্ব প্রদান করা হত। তিনি পড়াশোনাও করেছিলেন স্থানীয় ল্যাটিন স্কুলে, যা লুথারিয়ান ধর্মীয় পরিবেশের মধ্যে শিক্ষাপ্রদানের জন্য বিখ্যাত ছিল। এই সময় ফরাসি বিপ্লবের ঝড় বয়ে যাচ্ছে সমগ্র ইউরোপের উপর দিয়ে। নেপোলিয়ঁ উল্টে দিচ্ছেন একের পর এক ইউরোপের রাজসিংহাসন, যুক্তিবাদের প্রবল আক্রমণ নেমে আসছে চিরাচরিত ধর্মের উপর। লিওপোল্ড, ধর্মীয় আবহের মধ্যে বড়ো হয়ে ওঠার কারণেই হোক বা বালক বয়সেও রক্ষণশীল চিন্তাধারার প্রতি আকর্ষিত হওয়ার কারণেই হোক, ফরাসি বিপ্লব প্রসূত ভাবনা, যা তাঁর কাছে অতিরিক্ত যুক্তিবাদ সর্বস্ব বলে মনে হয়েছিল, কোনও কালেই পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করতে পারেননি। যদিও সেই সময়ে ইউরোপে বসবাসকারী যে কোনও অল্পবয়সী বালকের মতোই নেপোলিয়ঁর প্রতি তাঁর গভীর আকর্ষণ ছিল। তাঁর সমর অভিযানের খুঁটিনাটি যেটুকু যা খবর পাওয়া যেত সবই তিনি রাখতেন। একবার স্যাক্সনিতে কুচকাওয়াজরত ফরাসি সেনার মধ্যে তিনি একঝলক স্বয়ং নেপোলিয়ঁকেও হয়তো দেখেছিলেন বলে স্মৃতিচারণ করেছেন পরবর্তীকালে। তবে ‘প্রভাত দিনের আভাস দেয়’ এই আপ্তবাক্যটি লিওপোল্ডের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তিনি নিজেই বারে বারে লিখেছেন ইতিহাসের প্রতি তাঁর খুব গভীর আকর্ষণ অল্প বয়সে ছিল না। যুদ্ধের প্রতি সব বালকেরই একটি বালকসুলভ উত্তেজনাপূর্ণ আকর্ষণ থাকে, তার বাস্তবকে উপলব্ধি না করেই আর নেপোলিয়ঁ তাঁর কাছে কোনও বইয়ের পাতার শুষ্ক ঐতিহাসিক চরিত্র ছিলেন না, তিনি ছিলেন মূর্তিমান বাস্তব, যার উত্থান ও পতনের সঙ্গে জড়িয়েছিল তাঁর জন্মভূমি স্যাক্সনির স্বাধীনতার প্রশ্ন। তাই পরবর্তীকালে যে অনেক জীবনীকার তাঁর নেপোলিয়ঁ এবং তৎকালীন ইউরোপিয়ান যুদ্ধ নিয়ে বালক র‍্যাঙ্কের আকর্ষণকে তাঁর একজন মহান ঐতিহাসিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পূর্বাভাস হিসেবে দেখেছেন, সে ধারণা আমরা বর্জন করতে পারি।

স্কুল শিক্ষা শেষ করে র‍্যাঙ্কে উচ্চশিক্ষার জন্য গেলেন লাইপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইতিহাস নয়, তাঁর পাঠের মূল বিষয় ছিল ধর্মতত্ত্ব এবং ধ্রুপদী ভাষাতত্ত্ব। প্রাচীন ভাষাতত্ত্ব বোঝার সূত্র ধরে ইতিহাসেরও কিছু ক্লাস তিনি করেছিলেন। তাতে মান্ধাতার আমলের পড়ানোর কৌশল এবং শুষ্ক তথ্যের পাহাড় ছাত্রদের মাথায় চাপিয়ে দেওয়ার রেওয়াজ দেখে তিনি বিষয়টির প্রতিই বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েন। এখানে র‍্যাঙ্কের ইতিহাস শিক্ষক ছিলেন অধ্যাপক ওয়েইল্যান্ড। তিনি মানুষ হিসেবে যত ভালো ছিলেন, ইতিহাসের শিক্ষক হিসেবে ততটাই খারাপ। কথা বলতে গেলেই তিনি এত থুতু ছেটাতেন, প্রথম বেঞ্চের ছাত্ররা একদিন লেকচারের সময় লাল ছাতা খুলে বসেছিল। ওয়েল্যান্ড অবশ্য ছাত্রদের তিরস্কার না করে ব্যাপারটা হেসে উড়িয়ে দেন। চার্চের ইতিহাসের ক্লাসগুলি র‍্যাঙ্কের কাছে অপেক্ষাকৃত অধিক মনোগ্রাহী ছিল। ওল্ড টেস্টামেন্টের ধর্মভিত্তিক ইতিহাসের প্রতি র‍্যাঙ্কের আগেই আকর্ষণ ছিল, ধর্মতত্ত্বের প্রতি তাঁর ভালোবাসার সূত্র ধরে। তাই এই ইতিহাস তাঁর মন্দ লাগেনি, তবে খুব আগ্রহও সৃষ্টি করেছিল এমন না। ইতিহাসের প্রতি তাঁর আগ্রহ নিভু নিভু হয়েও টিকে ছিল তাঁর ভাষাতত্ত্বের শিক্ষক গটফ্রিড হার্মানের মধ্যে দিয়ে। হার্মান প্রাচীন গ্রিসের ভাষা ও সাহিত্য, বিশেষ করে পিন্ডার বোঝানোর সূত্র ধরে র‍্যাঙ্কেকে থুকিডিডিস রচিত পেলোপনেশীয় যুদ্ধের ইতিহাস পড়তে বললেন। হার্মান ঐতিহাসিক ছিলেন না, কিন্তু এই অসাধারণ শিক্ষকের পড়ানোর গুণে র‍্যাঙ্কের ইতিহাসের প্রতি নিভন্ত আগ্রহের আগুনের চুল্লি দপ করে জ্বলে উঠল। এরই মধ্যে জার্মানিতে আবির্ভাব হয়েছে ঐতিহাসিক বার্থোল্ড জর্জ নিবুরের। প্রাচীন রোমের ইতিহাস বিশারদ বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক পূর্বতন আদর্শ বা ভাবনার দিকে জোর দিয়ে লেখা রেনেসাঁ ইতিহাস চর্চার ধারার বিরুদ্ধে কলম শানিয়েছেন তথ্যসূত্র বিশ্লেষণ-এর দ্বারা ইতিহাস লেখার প্রক্রিয়া জনপ্রিয় করার মাধ্যমে। রেনেসাঁ ইতিহাস চর্চার আইডিয়ালিস্টিক ঐতিহ্য থেকে সরিয়ে ইতিহাসকে একটি তথ্যসূত্র বিশ্লেষণ, ভাষা বিশ্লেষণ ও তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত বিষয় হিসেবে জার্মানিতে প্রতিষ্ঠা করার কাজে তিনিই ছিলেন পথপ্রদর্শক। তাঁর বিখ্যাত ‘Roman History’ র‍্যাঙ্কে এই সময়েই পাঠ করেন, যদিও ইতিহাসে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের কৌশল প্রয়োগে এই গ্রন্থের অগ্রগামী ভূমিকা তিনি তখনও উপলব্ধি করতে পারেননি।

১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে উচ্চশিক্ষা সমাপ্ত করে র‍্যাঙ্কে পড়াতে গেলেন ফ্রাঙ্কফুর্ট অন ওডার-এ। তাঁর পড়ানোর বিষয়বস্তু ছিল ল্যাটিন, গ্রিক এবং ধ্রুপদী সাহিত্যের ইতিহাস। অচিরেই তিনি আবিষ্কার করলেন এই বিষয়গুলির জন্য যে বাজারচলতি বইগুলি ছাত্ররা পড়ছে, তা একেবারেই যথাযথ নয়। র‍্যাঙ্কে সিদ্ধান্ত নিলেন, যথাযথ ও তথ্যনিষ্ঠ ইতিহাসের গ্রন্থ রচনার। এই কারণে ফাঁকা সময়ে তিনি ডুবে গেলেন প্রাচীন গ্রিক ও রোমান ঐতিহাসিকদের লেখায়। এতদিন ধরে যে ইতিহাস তাঁর কাছে বিশৃঙ্খল তথ্যের পাহাড়ের বেশি কিছু মনে হয় নি, এখন সেই ইতিহাস তাঁর কাছে মূল গ্রন্থ পাঠের মধ্যে দিয়ে ধরা দিল এক এমন বিষয় হিসেবে যাতে তিনি স্বয়ং ঈশ্বরের ছায়া দেখতে পেলেন। দেবী ক্লিও এইভাবেই লাভ করলেন তাঁর শ্রেষ্ঠতম সেবায়েতের একজনকে।

২৬ বছর থেকে ৩২ বছর বয়স – ফ্রাঙ্কফুর্টের এই ছয় বছর র‍্যাঙ্কের জীবন পাল্টে দিয়েছিল। এখানেই তাঁর ঐতিহাসিক হিসবে পরবর্তীকালের খ্যাতির ভিত্তি গড়ে ওঠে। ইতিহাস সাধনায় তিনি যেন তাঁর জীবনের অর্থ খুঁজে পেয়েছিলেন। এই সময় ইতিহাস সম্পর্কিত তাঁর নোট দেখে অনেক সময়ই মনে হত যেন এক একনিষ্ঠ ভক্ত দেবতার সাধনা করছে। আধ্যাত্মিকতা ও লুথারিয়ান ধর্মীয় চেতনা র‍্যাঙ্কের ইতিহাস ভাবনার সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে। পূর্বেই বলা হয়েছে ইতিহাসের মধ্যে তিনি বারে বারে ঈশ্বরের ছায়া দেখেছিলেন, কিন্তু তা তাঁকে কখনই ধর্মান্ধ করে দেয়নি। বরং সত্যের প্রতি তাঁর গভীর নিষ্ঠার পরিচয় পাওয়া গেছে তাঁর নিরপেক্ষ ইতিহাস লেখার প্রচেষ্টায় (এই বিষয়ে বিতর্ক রয়েছে, যা পরে আলোচিত হবে)। ১৮২৪ সালে আমরা দেখি তিনি বার্লিন, ভিয়েনা, মিউনিখ, জুরিখ, পারি, রোম সব শহরে খুঁজে বেড়াচ্ছেন প্রাচীন পাণ্ডুলিপি। তিনি ভাইকে এই সময়ে চিঠি লিখে জানাচ্ছেন তাঁর অবস্থা মরুভূমিতে ভ্রমণরত মোজেসের মতো, যে জানে লাঠির আঘাত দিলেই ফোয়ারার মতো উঠে আসবে এমন জলের ভাণ্ডার এখানেই আছে।

ফ্রান্সেসকো গুইচার্দিনি এবং পাভলো জিওভিও-এর রচনা সেই আমলে ইতালির ইতিহাসের সর্বশেষ কথা বলে বিবেচিত হত। কিন্তু এঁদের কাজ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে র‍্যাঙ্কে দেখলেন বহু ক্ষেত্রেই এই দুই ঐতিহাসিকের রচনার মধ্যে মূল তথ্যের বিরোধ রয়েছে। সত্য কি, এই অনুসন্ধানেই তিনি প্রাথমিক উপাদানের উপর ভিত্তি করে ইতিহাস রচনা করতে সচেষ্ট হলেন। এরই ফল হল তাঁর প্রথম ইতিহাস বই ‘Geschichten der romanischen und germanischen Völker von 1494 bis 1514’ বা ‘Histories of the Latin and Teutonic Peoples 1494-1514’। স্মৃতিকথা, দিনপঞ্জি, চিঠি, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ সহ বিপুল সংখ্যক প্রাথমিক উপাদান ব্যবহার করে লেখা অতিকথন বর্জিত তথ্যনিষ্ঠ এমন ইতিহাস গ্রন্থ সেই আমলে ছিল বিরল। র‍্যাঙ্কে লিখেছেন এই বই রচনার ক্ষেত্রে তাঁর কাছে – ‘The strict presentation of the facts, no matter how conditional and unattractive they might be is undoubtedly the supreme law.’। এই বইয়ের কল্যাণে ঐতিহাসিক হিসেবে র‍্যাঙ্কের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল। তিনি বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করার ডাক পেলেন।

চিত্র ১: ‘Geschichten der romanischen und germanischen Völker von 1494 bis 1514’

বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয় তখন মধ্য-ইউরোপের জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র। তার আইন বিভাগে স্যাভিনি, দর্শন বিভাগে হেগেলের মতো তৎকালীন অ্যাকাডেমিক জগতের রথী-মহারথীদের বিচরণ। কিছুকাল আগে অবধিও তার ইতিহাস বিভাগ সমৃদ্ধ হয়েছে অধ্যাপক নিবুরের উপস্থিতিতে। এইখানে নিজের জায়গা করে নেওয়া তরুণ অধ্যাপকের পক্ষে সহজ ছিল না। কিন্তু এই কঠিন কাজটিই র‍্যাঙ্কে সম্ভব করে দেখালেন। বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে নিযুক্ত থাকাকালীনই তিনি রাজকীয় গ্রন্থাগারে আবিষ্কার করলেন ভেনিসের বৈদেশিক সম্পর্ক সংক্রান্ত দুষ্প্রাপ্য নথির আটচল্লিশটি ফোলিও। এই উপাদান এর পূর্বে আর কেউ ব্যবহার করেনি। র‍্যাঙ্কে তাঁর সমগ্র মন নিয়োজিত করলেন এই তথ্যের খনি থেকে ইতিহাসের আকর তুলে আনতে। ছুটলেন ভেনিশিয়ান মহাফেজখানা খুঁজে প্রাপ্ত তথ্যগুলির বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করতে। পরবর্তী সাড়ে তিন বছর ভেনিস, ফ্লোরেন্স, রোম, নেপলস ঘুরে, অসংখ্য মহাফেজখানা ঘেঁটে, অনেক সময় নিজের অর্থ খরচ করে পুথি সংগ্রহ করে র‍্যাঙ্কে তাঁর দ্বিতীয় গ্রন্থ প্রকাশ করলেন ১৮২৭ সালে। ‘Fürsten und Völker von Süd-Europa im sechzehnten und siebzehnten Jahrhundert’ বা ‘Princes and Peoples of Southern Europe, The Ottomans and the Spanish Monarchy’ নামে এই বই প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সাড়া পড়ে গেল। ধর্মে লুথারিয়ান প্রোটেস্ট্যান্ট হওয়ার কারণে তিনি ভ্যাটিকানের মহাফেজখানা ব্যবহার করার অনুমতি পাননি, কিন্তু এছাড়া তিনি উত্তর ইতালির বাকি সব মহাফেজখানা প্রাথমিক উপাদানের সন্ধানে প্রায় চষে ফেলেছিলেন। এই বই লেখার সময় ভিয়েনায় থাকাকালীন তিনি সার্বিয়ান বিপ্লবের উপরও উপাদান সংগ্রহ করেন। পরবর্তীকালে এই উপাদানের উপর ভিত্তি করেই তিনি রচনা করেন ‘History of Serbia and the Serbian Revolution’। এই বইগুলির মধ্যে দিয়েই র‍্যাঙ্কে শুধু জার্মানির নয়, ইউরোপের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। এই সময় থেকে পরবর্তী পাঁচ দশকের অধিক সময় তিনি নির্বাহ করেন একনিষ্ঠ ইতিহাসচর্চায়। একে একে প্রকাশিত হয় তিন খণ্ডে ‘History of the Popes (1834-36)’, পাঁচ খণ্ডে ‘German History at the Time of the Reformation (1839-45)’, ‘Nine Books of Prussian History’, ‘History of France’, ‘History of England’, ‘The Origins of the Wars of Revolution’ প্রভৃতি কালজয়ী গ্রন্থ। যখন র‍্যাঙ্কের তিরাশি বছর বয়স, যখন তিনি প্রায় অন্ধ, পড়তে পারেন না আর লেখেন সেক্রেটারির সাহায্য নিয়ে, যে বয়সে লোকে মৃত্যুর জন্য দিন গোনে আর আধ্যাত্মিক বই পাঠ করে পরলোকের কথা ভাবে, সেই বয়সে এই কর্মবীর একটি বিশ্ব ইতিহাস লেখার কাজে হাত দিলেন। ১৮৮০-এর শেষে এই Weltgeschichte বা World History-এর দুই খণ্ড প্রকাশিত হয়। এরপর আরও চারটি খণ্ড র‍্যাঙ্কে প্রকাশ করে যেতে পারেন। ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যুর পর আরও একটি খণ্ড প্রকাশিত হয়। তাঁর নোট ও বক্তৃতার উপর ভিত্তি করে র‍্যাঙ্কের ছাত্র ও পরবর্তীকালে তাঁর জীবনীকার অ্যালফ্রেড ডোভ এই বিশ্ব ইতিহাসের কাহিনি ১৪৫৩ অবধি নিয়ে যেতে পেরেছিলেন। র‍্যাঙ্কে শেষ যে কাজে হাত দিয়েছিলেন তা অসমাপ্তই রয়ে যায়, কিন্তু তিনি যে এই কাজে এই বয়সে এত উৎসাহের সঙ্গে হাত দেওয়ার সাহস দেখিয়েছিলেন, এই ঘটনাই প্রমাণ করে কেন তিনি উনিশ শতকের সর্বশ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিকদের মধ্যে একজন বলে গণ্য হন।

চিত্র ২: ‘Französische Geschichte’

র‍্যাঙ্কে যদি শুধু কতগুলি উৎকৃষ্ট ইতিহাসের গ্রন্থ রচনা করেই থেমে যেতেন, তাহলেও আজকে তাঁর কথা হয়তো আমরা, আজকের ইতিহাসের ছাত্ররা, পড়তাম। কিন্তু তিনি তাঁর অমরত্বের আসন ইতিহাসের জগতে পাকা করেছেন শুধু উৎকৃষ্ট ইতিহাস রচনার মধ্যে দিয়েই নয়, যাকে আমরা র‍্যাঙ্কিয়ান ইতিহাস চর্চার ধারা বলে অভিহিত করি, তার প্রবর্তনের মধ্যে দিয়ে। র‍্যাঙ্কে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ দানের সময় প্রথম তাঁর বাড়িতে নিয়মিত সেমিনারের বন্দোবস্ত করেন। হাতে গোনা অনধিক দশজন ছাত্র এই সব সেমিনারে উপস্থিত থাকত (সর্বোচ্চ একদা আঠারো জনের উপস্থিতির কথা আমরা জানতে পারি)। তারা একত্রে গবেষণা পত্র পাঠ করত, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলত, পরস্পরের সমালোচনা করত। যে ছাত্রের গবেষণা পত্রের স্বয়ং র‍্যাঙ্কে সমালোচনা করতেন, সে নিজেকে ধন্য মনে করত। ১৮২৪ থেকে ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় ধারাবাহিক ভাবে চলা এই সেমিনারের মাধ্যমে পরবর্তী তিন প্রজন্মের শ্রেষ্ঠ জার্মান ঐতিহাসিকদের র‍্যাঙ্কে নির্মাণ করেছিলেন। তাঁরাই তাঁদের শিক্ষকের কর্মপদ্ধতি ও ইতিহাস চর্চার ধারার পতাকা বহন করে নিয়ে গেছে প্রথমে সমগ্র জার্মানিতে, তারপরে কালক্রমে সমগ্র বিশ্বে। এই সেমিনার থেকেই র‍্যাঙ্কের পদতলে বসে ইতিহাস শিক্ষা করে উঠে এসেছিলেন উইলহেলম ফন গিসব্রেখট, জর্জ ওয়েইৎজ, হাইনরিখ ফন জুবেলের মতো খ্যাতনামা ঐতিহাসিকরা।

চিত্র ৩: History of England

র‍্যাঙ্কিয়ান ইতিহাস চর্চার ধারা, যা বর্তমানে বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস চর্চার ভিত্তি নির্মাণ করে, তা প্রতিষ্ঠিত প্রাথমিক উপাদান ও তথ্যের স্বতন্ত্রতার উপর। র‍্যাঙ্কে তাঁর ইতিহাসচর্চার উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছিলেন, “To history has been assigned the office of judging the past, of instructing the present for the benefit of future ages. To such high offices this work does not aspire; it wants only to show what actually happened.”। এই ‘what actually happened’ বা ‘wie es eigentlich gewesen ist’ পরবর্তী কালে র‍্যাঙ্কিয়ানদের, বিশেষ করে মার্কিন দেশে র‍্যাঙ্কের অনুগামীদের রণহুংকার হয়ে উঠবে। আদৌ নিরপেক্ষ ভাবে ‘যা হয়েছিল তাই’ ইতিহাসের মাধ্যমে তুলে ধরা সম্ভব কিনা, তা নিয়েও পরবর্তীকালে অনেক ঐতিহাসিক র‍্যাঙ্কের বিপরীতে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, যাঁদের মধ্যে ই.এইচ. কারের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। এই সমালোচনার যুক্তি আছে, সত্যি কথা বলতে একজন ঐতিহাসিক সমাজ বা ইতিহাসের বাইরে নন। তিনি যদি তথ্যনিষ্ঠও হন, কোন তথ্য তিনি তাঁর ইতিহাস রচনায় ব্যবহার করছেন আর কোনটি করছেন না, তার দ্বারাও কিন্তু তাঁর রচিত ইতিহাসে পক্ষপাতিত্বের ছায়া এসেই পড়ে। র‍্যাঙ্কের নিজের ইতিহাসেও তাঁর প্রাশিয়ান রাজবংশের শাসনের প্রতি অনুরুক্তি, রক্ষণশীল রাজনীতির প্রতি স্বাভাবিক সমর্থন এবং বিপ্লববাদের বিরোধিতার ছায়া কি একেবারেই পড়েনি? অবশ্যই পড়েছিল। তাহলে নিরপেক্ষ ভাবে ‘যা হয়েছিল তাই’ কি লেখা সম্ভব? আসলে এই সমগ্র বিতর্কটিই র‍্যাঙ্কের আংশিক পাঠের ফল। র‍্যাঙ্কে কখনওই বলেননি কোনও ঐতিহাসিকের লেখা ইতিহাস সবসময় যা হয়েছিল, তার নিখুঁত প্রতিবিম্ব। তাঁর বিরুদ্ধে যে নিরস, শুষ্ক, দলিল ঘাঁটা ইতিহাস রচনার অভিযোগ আনা হয়, তাও ঠিক নয়। বরং গ্যেটে ভক্ত র‍্যাঙ্কে মনে করেছিলেন ঐতিহাসিক ইতিহাসের পুনর্নির্মাণের সময় কবির ভূমিকা পালন করবে। শুষ্ক ইতিহাস দূরে থাক, স্ট্রাউস তাঁর ইতিহাসে র‍্যাঙ্কের প্রিয় কবি পিন্ডারের ছায়া দেখেছেন। তাঁর ‘what actually happened’ আপ্তবাক্যটি প্রকৃতপক্ষে ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে নয়, উপাদান সংগ্রহের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। একজন ঐতিহাসিকের ব্যাখ্যা বহুপ্রকার হতে পারে, তার ইতিহাসের নির্মাণও নানা রূপ ধারণ করতে পারে কিন্তু সেই নির্মাণ যে তথ্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হবে, তার দৃঢ় বাস্তব ভিত্তি থাকা চাই। মনগড়া তথ্যের উপর কোনও ইতিহাস রচনার র‍্যাঙ্কে তীব্র বিরোধী ছিলেন। তিনি নিজে তো তাঁর তথ্য বারে বারে নানাভাবে যাচাই করে নিতেনই, স্বচ্ছতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে প্রধান ইউরোপীয় ঐতিহাসিকদের মধ্যে প্রথম তথ্যসূত্র ও পুস্তকতালিকা প্রকাশ করার রীতি চালু করেন, যাতে পাঠকও ইচ্ছে করলে তাঁর দাবি যাচাই করে দেখতে পারেন। প্রাথমিক উপাদানের ক্ষেত্রেও তিনি কোন উপাদান কতটা ভরসাযোগ্য, তার একটি স্পষ্ট রূপরেখা নির্মাণ করেন। যেমন কোনও লিখিত প্রাথমিক উপাদান তাতে বর্ণিত ঘটনার যত নিকট সময়ের প্রেক্ষিতে সেই সূত্র তত ভরসাযোগ্য। দুটি সমান প্রাচীন লিখিত উপাদান যদি পরস্পর বিপরীত ইতিহাসের সাক্ষ্য দেয় তাহলে বিবেচনা করতে হবে লেখকদের উদ্দেশ্য এবং আর্থ-সামাজিক এবং রাজনৈতিক অবস্থান। উপাদানের অভ্যন্তরীণ সমালোচনা জরুরি এবং তা করতে গেলে প্রয়োজন ভাষাতত্ত্ব সম্পর্কে জ্ঞানের।

চিত্র ৪: History of the Popes

র‍্যাঙ্কিয়ান ইতিহাসচর্চার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল, যাকে জি.পি. গুচ বলেছেন ‘জুডিশিয়াল টেম্পার’। ঐতিহাসিকের সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ হওয়া সম্ভব নয়, একথা র‍্যাঙ্কেও জানেন। কিন্তু তিনি এও মনে করতেন ঐতিহাসিককে ইতিহাস লেখার সময় জাতি ও ধর্ম – দুইয়ের মোহই ত্যাগ করতে হবে। এ বিষয়ে র‍্যাঙ্কের কাজই তাঁর বাণী। তিনি যখন পোপতন্ত্রের ইতিহাস রচনা করেন, তখন নিজে লুথারিয়ান প্রোটেস্ট্যান্ট হয়েও কাউন্টার রিফর্মেশন ও প্যাপাসির এমন নিরপেক্ষ বিবরণ দেন যে বহু ক্যাথলিক বুদ্ধিজীবীই তাঁর ভক্ত হয়ে পড়েন। অবশ্য প্রোটেস্ট্যান্টদের অনেকে তিনি ক্যাথোলিক তোষণ করছেন বলে নিন্দা করেন, অন্যদিকে আবার ক্যাথলিকদেরও একটি বড়ো অংশ র‍্যাঙ্কের ন্যায্য সমালোচনাতেও বিষম ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। এইভাবে দুইপক্ষেরই উগ্রবাদীদের চটিয়ে দিয়ে র‍্যাঙ্কে প্রমাণ করেন, তিনি সত্যিই ‘জুডিশিয়াল টেম্পার’-এর অধিকারী।      

র‍্যাঙ্কে মনে করতেন আসল ইতিহাস হচ্ছে রাজনৈতিক ইতিহাস, বৈদেশিক সম্পর্কের ইতিহাস, রাষ্ট্রের ইতিহাস – staatengeschichte। সামাজিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় বা দার্শনিক ইতিহাকে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেননি। র‍্যাঙ্কে নিজে কখনওই উগ্র জাতীয়তাবাদী না হলেও ভুললে চলবে না, তিনি উনিশ শতকের ইউরোপের মানুষ, জাতীয়তাবাদের যুগের হাওয়া তাঁর রক্ষণশীল হৃদয়কেও প্রভাবিত করেছিল। র‍্যাঙ্কে মনে করতেন বাগানে যেমন সার, জল এবং পরিচর্যায় নানা রঙের ফুল ফোটে, তেমনই মানব সমাজের নানা জাতিগোষ্ঠীও তাদের বিশেষ প্রবণতার উপর ভিত্তি করে একেকটি জাতিরাষ্ট্র গড়ে তুলেছে। এই জাতিরাষ্ট্রগুলির বিকাশ প্রাকৃতিক, তাই তাদের প্রতিষ্ঠানগুলি স্বাভাবিক। প্রত্যেক রাষ্ট্রেরই এই নিজস্ব প্রবণতার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা কাঠামো আছে। তার শিকড় সন্ধান করাই ইতিহাসের উদ্দেশ্য। এই ভাবনা থেকেই বোঝা যায় যে কেন রক্ষণশীল হলেও ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাস আলোচনার সময় র‍্যাঙ্কে বিপ্লবী ফ্রান্সের প্রতি এতটা সহানুভূতি দেখিয়েছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন ফরাসি বিপ্লব ফরাসি জাতি ও রাষ্ট্রের বিবর্তনের যে প্রাকৃতিক ধারা তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু এই একই ধাঁচা যে ইউরোপীয় উদারপন্থীরা ইউরোপের সব দেশে প্রয়োগ করতে চায়, তা একেবারেই ইতিহাস সম্মত নয় – অতএব বর্জনীয়। যা ফরাসি জাতি ও রাষ্ট্রের অমৃত তাই জার্মান জাতি ও রাষ্ট্রের কাছে হলাহল। যাই হোক, র‍্যাঙ্কের এই সামগ্রিক জাতি সংক্রান্ত ধারণার উপর ভিত্তি করেই স্পষ্ট যে কেন তিনি রাজনৈতিক ইতিহাসকে ধ্যানজ্ঞান মনে করেছিলেন। এর ফলে র‍্যাঙ্কিয়ান ইতিহাসচর্চার ধারায় একটি বড়ো ফাঁক তৈরি হয়েছে, যা তাঁর পরবর্তীকালের অনুগামীরাও ভালো ভাবে পূরণ করতে পারেননি।

র‍্যাঙ্কে ইতিহাসে ব্যক্তির ভূমিকায় আস্থা রাখতেন। এমন তিনি কখনও মনে করেননি যে ব্যক্তি এককভাবে ইতিহাসের গতি নির্ধারণ করে। কিন্তু একথা তিনি বারে বারেই বলেছেন যে অবশ্যই কোনও ঐতিহাসিক ঘটনার পেছনে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় কারণ থাকে – কিন্তু এই কারণ যে সম্ভাবনাগুলির জন্ম দেয় তার মধ্যে কোনটি বাস্তবায়িত হবে তা নির্ধারণ করে ব্যক্তি। তাঁর ভাষাতেই – ‘On the summit of deep, universal, tumultuous movements appear nature cast in a gigantic mould which rivet attention of the centuries. General tendencies do not alone decide; great personalities are always necessary to make them effective.’ ইতিহাসের বৃহত্তর পটভূমিতে ব্যক্তিকে স্থাপন নিয়ে এসে তার গুরুত্ব তুলে ধরার অসামান্য ক্ষমতা র‍্যাঙ্কের ছিল। এই প্রসঙ্গে আগাথা রাম বলেছেন – ‘He ‘Ranke’ showed imagination in his reconstruction of chatacter, dramatic sense in choosing when to introduce a particular person into the story. His narrative art is well worth study.’

র‍্যাঙ্কে একই সঙ্গে সর্বজনীন ইতিহাসের সমর্থক ছিলেন, আবার ছিলেনও না। সর্বজনীন ইতিহাস বলতে যদি ক্রমঅগ্রসরমান পরমকারণবাদী হেগেলিয়ান ইতিহাসের ধারণা বোঝায়, র‍্যাঙ্কে তার কখনই সমর্থক ছিলেন না। তাঁর কাছে ইতিহাস কোনও একক ক্রমঅগ্রসরমান বিষয় নয়। ইতিহাস তাঁর কাছে ধরা দিয়েছে একবচন হিসেবে নয়, বহুবচন হিসেবে। প্রত্যেক যুগেরই সেই যুগের প্রেক্ষিতে একটি ইতিহাস বর্তমান এবং তাঁর মতে প্রত্যেক যুগের ইতিহাসেরই অবস্থান ঈশ্বরের সিংহাসনের বাম-পার্শ্বে চুড়ান্ত সম্মানের আসনে। পেছনের দিকে তাকিয়ে সেই যুগের প্রেক্ষিতকে উপলব্ধি না করে হোলিয়ার দ্যন দাউ মনোভাব নিয়ে ইতিহাসের কোনও যুগের বা ব্যক্তির সমালোচনার র‍্যাঙ্কে বিরোধী ছিলেন। তাঁর মতে ইতিহাস চর্চা অপরাধীর আদালতে বিচার নয়। প্রত্যেক কালপর্বের একটি যুগের নিয়ম, Zeitgeist, থাকে, এই Zeitgeist-কে উপলব্ধি করে ইতিহাস লেখাই ঐতিহাসিকের কর্তব্য। তাঁর ভাষায় – ‘…each epoch must be seen as something valid for its own sake and as most worthy of consideration…All generations of mankind are equally justified in the sight of God.’। কিন্তু এই পাশাপাশি তাঁর মতো করে র‍্যাঙ্কে আবার সর্বজনীন ইতিহাসের সমর্থক ছিলেনও বটে। তিনি ইতিহাসের সর্বজনীনতা দেখেছিলেন হেগেলের মতো কোনও পরমকারণের মধ্যে নয় বরং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর যুগে যুগে একে অপরের সঙ্গে আদানপ্রদানের মাধ্যমে প্রাকৃতিক ভাবে বিবর্তনের মধ্যে। এই আদানপ্রদানকে গুরুত্ব দিতেন বলেন র‍্যাঙ্কে বৈদেশিক নীতির আলচনার প্রতি এতখানি গুরুত্ব প্রদান করেছিলেন। রক্ষণশীল হলেও, তিনি আশা রাখতেন একদিন এমন যুগ আসবে, যেদিন স্থানীয় ইতিহাস যেভাবে জাতীয় ইতিহাস হয়েছে, তেমনই জাতীয় ইতিহাস মানুষের ইতিহাস হয়ে ঊঠবে। তাঁর ভাষায় – ‘The final goal – not yet realized, always remains the conception and composition of a history of mankind.’

সামগ্রিক ভাবে বলা চলে, ইতিহাসচর্চার র‍্যাঙ্কিয়ান ধারা একদিকে হেগেলিয়ান ধারার ইতিহাসকে এক বিজ্ঞানের রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টা থেকেও দূরত্ব তৈরি করেন আবার অন্যদিকে ইতিহাসকে নিছক কলা হিসেবে দেখার রোম্যান্টিক ধারা থেকেও সরে আসেন। তিনি বলেন ইতিহাস বিজ্ঞান এবং কলাকে একস্থানে নিয়ে এসে একটি তৃতীয় উপাদান সৃষ্টি করে – ‘…together in a third element peculiar only to itself. History is neither the one nor the other, but demands as union of the intellectual forces active in both philosophy and poetry under the condition that two be directed from their concern with the ideal to the real.’।  জীবন ও জ্ঞানের মধ্যে যে বৈপরীত্য আছে, তার ইতিহাসের মাধ্যমে অবসান ঘটানো সম্ভব বলে র‍্যাঙ্কে মনে করতেন। তাই দেখি বিজ্ঞান ও কলা, বিশেষ ও সাধারণ, বিষয়গত এবং বিষয়ীগত, স্বাধীনতা এবং প্রয়োজনীয়তা – এই সবের মধ্যেই এক সামঞ্জস্যবিধানের প্রচেষ্টা তিনি আজীবন করে গেছেন। এমন কখনই বলা চলে না তাঁর ইতিহাস চর্চার ধারণার মধ্যে কোনও ত্রুটি ছিল না। তাঁর রক্ষণশীল স্থিতাবস্থার প্রতি দায়বদ্ধতা, তাঁর দলিল-দস্তাবেজ ও নথিকে অতিরিক্ত গুরুত্ব প্রদানের প্রবণতা, তাঁর রাষ্ট্রকে মানব সমাজের আলোচনার একমাত্র একক হিসেবে মনে করা, তাঁর ভয়ংকর রকম ইউরোপ কেন্দ্রিকতা, তাঁর রাজনৈতিক ইতিহাস ব্যতীত আর সকলপ্রকার ইতিহাসকে অবহেলা – প্রভৃতি যথেষ্ট সমালোচিত হয়েছে, কিছু তো তাঁর সমসাময়িক বন্ধু ও ছাত্রদের দ্বারাই। তার পরেও বলা চলে লিওপোল্ড ফন র‍্যাঙ্কে ঐতিহাসিক হিসেবে তথ্যনিষ্ঠতার, নিরপেক্ষতার এবং জাতি-ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে ইতিহাস রচনার যে স্বর্ণমান রেখে গিয়েছিলেন, তা আজও সমান প্রযোজ্য ও অনুকরণযোগ্য। আজকে ভারতে ইতিহাসচর্চা যখন রাজনৈতিক টানাপোড়েনে প্রবল সংকটের মুখে, তখন এই মহান ইউরোপীয় ইতিহাসবিদকে আমরা যারা দেবী ক্লিওর ভক্ত, তাঁদের স্মরণ করা প্রয়োজন। শেষ করা যাক তাঁরই আরেকটি উদ্ধৃতি দিয়ে – ‘We on our side have another concept of history. Naked truth without any embellishment; painstaking research into the particular; the rest lies in the hands of God; let us reject all fiction even in the smallest matter and reject any fantasy whasoever’। আমাদের বর্তমান সময়ের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উপদেশ।  

তথ্যসূত্র

1. E. Sreedharan, ‘A Textbook of Historiography – 500 BC to AD 200’; Orient Blackswan, 2017.

2. Shashi Bhushan Upadhyay, ‘Historiography in the Modern World’; Oxford University Press, 2016.

3. Leopold von Ranke, ‘The Theory and Practice of History’, translated by Wilma A. Iggers and Konrad von Moltke; Bobbs-Merill Company, 1973.

4. Edward Gaylord Bourne, “Leopold von Ranke”, ‘The Sewanee Review’, vol. 4, no. 4; Jon Hopkins University Press, 1896, pp. – 385 – 401.

5. Andreas D. Boldt, ‘Leopold von Ranke – A Biography’; Routledge, 2019.

6. Kasper Risbjerg Eskildsen, “Leopold von Ranke (1795-1886) : Criticizing an Early Modern Historian”, ‘History of Humanities’, vol. 4, no. 2; The University of Chicago Press, 2019, pp. – 257-262.         

এম.ফিল গবেষক, ইতিহাস বিভাগ, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।