সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

আদিম জনজাতি চেঞ্চুদের কথা

আদিম জনজাতি চেঞ্চুদের কথা

তুষার মুখার্জী

জানুয়ারি ৬, ২০২৪ ২২৯ 2

ভারতে বর্তমানে বিতর্ক চলছে আদিবাসীদের কেন আদিবাসী বলব তাই নিয়ে। আদিবাসীরা যদি সত্যিই আদিবাসী তথা আদি বাসিন্দাই হয়, তবে গোটা ভারতের বাদবাকি মানুষ কি পরে আসা বহিরাগত? গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এর সাথে নানা আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক সমস্যা জড়িয়ে যাওয়ায় এই প্রশ্ন খুবই জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাধারণ ভাবে বাংলায় বসে আদিবাসী বলতে আমরা সাঁওতালদের কথা সবার আগে ভাববো। তার সাথে মাথায় ঘুরবে অতি পরিচিত আরও কয়েকটি জনজাতিরও নাম।

যদিও বর্তমানে পূর্ব-ভারতের আদিবাসী বলে পরিচিতরা, মুলত, অস্ট্রো-এশিয়াটিকদের মাতৃক্রমে ভারতীয় আবার পিতৃক্রমেও দক্ষিণ পূর্ব এশীয়দের সাথে ঠিকঠাক মেলে না, তবু তারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে জলপথে এসেছিল, এমন একটা প্রস্তাবিত তত্ত্ব প্রবল ভাবে জনপ্রিয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সমুদ্রতট থেকে অনেক ভেতরে পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দা অস্ট্রো-এশিয়াটিকরা হঠাৎ কেন পূর্ব-ভারতে আসবে, বা কেমন করে তারা সমুদ্রপাড়ি দেবার মত জলযান তৈরি করে প্রয়োজনীয় নৌবিদ্যাও অর্জন করেছিল তারও কোনও ব্যাখ্যা নেই। আবার যদি ভাবা হয় জলপথের বদলে তারা এসেছিল স্থলপথে, তবু সেই স্থলপথে পরিযানের অবধারিত দীর্ঘকাল, নারী বিবর্জিত থেকেও একটি জনগোষ্ঠী কেমন করে তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখলো তারও ব্যাখ্যা কিন্তু এখনো অধরা রয়ে গেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশীয়দের সাথে পূর্ব ভারতীয় অস্ট্রো-এশিয়াটিকদের একটাই মিল তারা অস্ট্রো-এশিয়াটিক। বর্তমানের জনপ্রিয় তত্ত্বে পূর্বভারতের অস্ট্রো-এশিয়াটিকদের চার সাড়ে হাজার বৎসর আগে প্রবেশ করা বহিরাগত বলে ধরে নেওয়ার ফলেই, কেন তাদের আদিবাসী বলা হবে তাই নিয়ে চলছে প্রবল বিতর্ক।

কিন্তু আদিবাসী বলতে কেবল পূর্ব-ভারতের কয়েকটি জনগোষ্ঠীই নয়, গোটা ভারতের আরো বহু বহু জনগোষ্ঠীকেই একত্রে বোঝায়। এই সব পাহাড়-জঙ্গলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর প্রায় সবাই অস্ট্রালয়েড, নেগ্রিটো, মঙ্গোলয়েড, এমন সব নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে পড়বে। পূর্ব ভারত বাদ দিলে, এদের বেশিরভাগই বর্তমানে মধ্য-ভারতে, দক্ষিণ-ভারতে বসবাস করে। তা হলে কি আমরা সমতলের ভারতবাসী বাদে বাকি সব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকেই বহিরাগত বলবো? তারা কেউ ভারতের আদি বাসিন্দা নয়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে জানতে হবে কেমন ছিল অতীত থেকে বর্তমানের জনবিন্যাস ও সমাজগঠনের রূপরেখা?

সুদুর অতীতে শৈত্যযুগের অন্তে কৃষিকাজ শুরু হলে শিকারি-সংগ্রাহক মানুষদের অনেকেই কৃষিকাজে লিপ্ত হয়ে কৃষিকাজের প্রয়োজনেই বসবাস শুরু করে নদীর অববাহিকাতে। যেসব জনগোষ্ঠী কৃষিকাজ অপছন্দ করে শিকারি-সংগ্রাহক হয়েই থেকে গিয়েছিল, স্বভাবতই তারা পাহাড়ে বনে-জঙ্গলেই থাকতে পছন্দ করেছিল। ক্রমে পর্যাপ্ত খাদ্য শস্যের দৌলতে কৃষক সমাজের দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির দরুণ তাদের দখলে চলে যায় সমতলের উর্বর ভুমিগুলো। তারই সাথে অপ্রয়োজনীয় বোধে সমতলের বন-জঙ্গলও তারা নির্মুল করে দিতে থাকে। শিকারি-সংগ্রাহকরা সরে যায় আরো দূরে, আরো গভীরে, বনে পাহাড়ে।

সমতলবাসী কৃষকদের প্রয়োজন ছিল হাতিয়ারের। প্রথমে পাথরের হাতিয়ার পরে ধাতব হাতিয়ার। পাথর বা ধাতু, কিছুই নদীর পলিসমৃদ্ধ অববাহিকায় পাওয়া যায় না। পাথর আর ধাতুর জোগান আসবে পাহাড়ি এলাকা থেকে। প্রথমে সমতলবাসীদের প্রয়োজনভিত্তিক চাহিদা মেটাতে পাহাড়িরা নিয়মিত জোগান দিতে থাকে পাথর ও ধাতু, যৎসামান্য খাদ্যশস্য অথবা বিলাসদ্রব্যের বিনিময়ে। ক্রমে সমতলবাসীদের পাথর, ধাতু, কাঠ, পশুচর্মের চাহিদা বৃদ্ধির হতে থাকলে তারা পাহাড়িদের উপর নির্ভরশীল না থেকে পাহাড়িদের আরো দূরে হঠিয়ে ঐ সব প্রাকৃতিক সম্পদ নিজেদের দখলে নিতে থাকে।

ঠিক এই পর্যায়ে এসে প্রশ্ন উঠবে এইসব প্রাকৃতিক সম্পদের প্রকৃত অধিকারী কারা? সাধারণ যুক্তি বলবে যারা গোড়া থেকে ঐ সম্পদসমৃদ্ধ এলাকার বাসিন্দা, তারাই প্রকৃত অধিকারী। সমস্যা হল সেই সম্পদসমৃদ্ধ এলাকার বাসিন্দারা ততদিনে হয়ে গেছে একাধিক বিচ্ছিন্ন ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী। তাদের এই বিপুল সম্পদের প্রয়োজন নেই। কিন্তু তারা অধিকার ছাড়বে না। তাই এবার প্রয়োজন হল অন্য যুক্তির। সে যুক্তি হল বন পাহাড় এলাকার জনগোষ্ঠীরা বহিরাগত। তাই তাদের এই সব সম্পদে অধিকার নেই। সভ্যসমাজ চলে আইনি বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে। আইন প্রণেতারা সকলেই সমতলবাসী ‘সভ্য’ সমাজের প্রতিনিধি। ফলে প্রতিটি আইন তৈরি হল তাদেরই স্বার্থরক্ষার জন্য। তাদের তৈরি আইনের সাহায্যে, আইনসঙ্গত ভাবেই বলা হল সমস্ত প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকারী সমতলবাসীরা।

শুধু মাত্র ভারতের ইতিহাস ঘাঁটলেই দেখা যাবে ‘ভারতীয়’দের উন্নয়নের প্রয়োজনে ‘আইনসঙ্গত পদ্ধতিতে’ ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলো সমস্ত প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ক্রমাগত উৎখাত হয়েছে তাদের চিরাচরিত বাসভুমি থেকে। তারই সাথে ক্রমে শক্তিশালী সংখ্যাগুরু ‘সভ্য’ সমাজের প্রতিবেশীদের চাপে ও প্রভাবে, ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়, ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলোর ভাষা সংস্কৃতি ধর্মাচরণ লোপ পাচ্ছে। যদিও অনেকেরই ধারণা লোপ পেলে ক্ষতি কি? অতীতের বনে-জঙ্গলে যে সমাজ ব্যবস্থা, ধর্মাচার, ভাষা প্রচলিত ছিল বা এখনও আছে, বর্তমানের অত্যাধুনিক প্রযুক্তির যুগে এমনিতেই তো সেগুলো অচল। তাই আগেকার সংস্কৃতি লোপ পেলে তবেই তারা আধুনিক সংস্কৃতি গ্রহণ করে ‘উন্নত সভ্য’ সমাজের অংশ হয়ে যেতে পারবে।

কিছুকাল আগে সমাজ মাধ্যমে এমনি এক সমস্যা নিয়ে এক ক্ষুদ্র-জনগোষ্ঠীর চেঞ্চু যুবকের একটি আবেগমথিত খোলা চিঠি প্রকাশিত হয়। ‘সভ্য’ ভারতীয়দের প্রণীত আইনিধারার সহায়তা অলভ্য বলেই এই চিঠি কেবলই আবেগমথিত। যেহেতু ‘আইন’ এই চেঞ্চু যুবকের পক্ষে নেই, তাই তার আবেদনে কারওর কর্ণপাত না করারই কথা। তবু…..

একটি খোলা চিঠি

খোলা চিঠি

আমরাবাদ টাইগার রিজার্ভ ফরেষ্টের চেঞ্চু আদিবাসীদের তরফ থেকে:

যিনি এই বিষয়ে সম্পর্কিত তাঁর প্রতি:

যাঁরা শহরে বাস করেন তাদের কাছে বন হল এক বিপদজনক এলাকা। বন এমন একটা এলাকা যেখানে ভয়ানক বন্য প্রাণীরা বাস করে। কিন্তু আমরা চেঞ্চুরা বহু শতাব্দী ধরেই এই ভয়ঙ্কর বিপদজনক বন্য প্রাণীদের সাথেই সহাবস্থানে অভ্যস্ত। বনকে ভালো রাখা আমাদের কর্তব্য বলেই মনে করি। বনের গাছপালা আর প্রাণীর ক্ষতি না করা, তাদের রক্ষা করাই আমাদের কর্তব্য বলে মনে করি। এই বনই আমাদের ঘর-দুয়ার, আমাদের বসতবাটি। এই বনের সমস্ত লতাপাতা, প্রতিটি কীট-পতঙ্গ আমাদের পরিবারের সদস্য। এই বসতবাটি ত্যাগ করার কথা আমরা ভুলেও কখনও ভাবিনি, এখনও ভাবি না, ভবিষ্যতেও ভাববো না। নিজের বাড়ি কেই বা ছাড়তে চায়? এত বৎসর যেখানে বাস করেছি সেই বাড়ি কি করে ছাড়বো? আমরা না থাকলে বন বাঁচবে না, বন না থাকলে আমরাও বাঁচবো না। শহরে সামান্য কয়েকদিন থাকাটাও আমাদের কাছে এক দুঃস্বপ্ন। আজ যদি আমাদের শহরে থাকতে বলেন, তবে আমরা কেউ বাঁচবো না। আমাদের বন ছেড়ে চলে যেতে বলার অধিকার কারওর নেই, আজ যদি তা বলেন তবে বুঝবো ঘুরিয়ে বলছেন- তোমরা মর।

রাজাদের আমলে, ব্রিটিশদের আমলে, আমরা ছিলাম স্বাধীন, আর আজ এই স্বাধীন ভারতে আমরা আমাদের স্বাধীনতা হারালাম। বিদেশীরা আমাদের গুরুত্ব স্বীকার করে বনে স্বাধীন ভাবে বসবাসের অধিকার দিয়েছিল। আজ আমাদের নিজেদের দেশবাসী আমাদের সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। দেশের স্বাধীনতা আমাদের স্বাধীনতা হরণ করল।

অভিযোগ, যেহেতু আমরা শিকারি তাই বন্যপ্রাণীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। আমরা এই অপবাদ অস্বীকার করছি, এই অভিযোগ সর্বতোভাবে মিথ্যা। বন্যপ্রাণীদের আমরা পরিবারের সদস্য হিসাবেই দেখে এসেছি। যদি কোনও বাঘ বা চিতাবাঘ আমাদের কোনও গরু ছাগল খেয়ে ফেলে, আমরা মনে করি ভাই বাড়ি এসে নিজের মনে করে খাবার খেয়ে গেছে। আমরা কোনও বন্যপ্রাণী হত্যা করি না। আমরা আমাদের বড় ভাই (বাঘ বা চিতাবাঘ)-এর হত্যা করা অভুক্ত খাবার খাই।

যতক্ষণ এই বনে আছি ততক্ষণ আমরা নিজেদের নিরাপদ মনে করি। জানি বনেই আমরা নিরাপদ। এই বনের বাইরে গেলেই আমরা দিশেহারা হয়ে যাই। বনে বাস করি বাইরের জগতের সাথে সম্পর্কহীন হয়ে। আমাদের পরস্পরের মধ্যে আছে গভীর ভালোবাসা আর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বাঁধন। কিন্তু বনের বাইরে তো তেমনটি নেই। বনের বাইরে সব সম্পর্ক আর্থিক সম্পর্ক। টাকা না থাকলে খাবার নেই, জলও নেই। টাকা না থাকলে বাসস্থান নেই, বস্ত্র নেই। শহর এক নির্লজ্জ জগত। শহরে কোনও কিছুই নির্মল নয়। শ্বাসের বায়ু, গড়ে তোলা সম্পর্ক, সব সব বিষাক্ত।

এই বনে তেমন নয়। আমাদের পূর্বপুরুষেরা আমাদের বলে গেছেন, শিখিয়েছেন বনকে শ্রদ্ধা করতে, ভালোবাসতে। আর তবেই বন আমাদের সব প্রয়োজন মেটাবে। আর তাই এখনও বনে বেঁচে থাকার জন্য অর্থের কোনও প্রয়োজন হয় না। বনের ছন্দে ছন্দ মিলিয়ে আমরা বসবাস করি, খাবার খাই। সদা নির্মল বায়ু আর স্বচ্ছ জলে অভ্যস্ত আমরা। দুষিত বায়ু দুষিত জল, দুর্গন্ধময় পরিবেশ, কোলাহল মুখর লোকালয় ভরা শহরে আমাদের বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। আমরা অসুস্থ হয়ে পড়বো আর দ্রুত মরে যাবো। যদি শহরের লোককে আমরা বলি আপনাদের বাকী জীবন বনে কাটান, পারবেন? পারবেন না। ঠিক একই ভাবে আমরাও আমাদের বন ছেড়ে, ঘর ছেড়ে থাকতে পারবো না। আমাদের জীবনধারা আমরা বড় ভালোবাসি।

আমরা মদ খাই না। মাসান্তে একদিন, যদি পায়, কেউ কেউ মদ খায়। শহরে সব জায়গায়, সব সময়, মদ পাওয়া যায়। আর পেলেই হয়ত খাবে। কোনও সন্দেহ নেই যে, মদ খেয়েই সব টাকা শেষ করে পুরো পরিবারকে মহাবিপদে ফেলবে। এমনি এক ভয়ের ভাবনা আমাদের কুঁকড়ে দেয়। এমন দিন যেন দেখতে না হয়। বনে যে নিরাপত্তা আছে তা আমরা আর কোথাও পাবো না। শহরে গেলে, নতুন জীবনধারার সাথে তাল মেলাতে না পেরে আমাদের অনেকেই মানসিক অবসাদে ভুগতে শুরু করবে। আমাদের যে কয়জন বেঁচে আছি তারা সবাই তিলে তিলে এমনি ভাবে এক অবসাদগ্রস্ত ভয়াবহ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে।

পূর্বপুরুষদের আমল থেকে আমরা এই বনে জন্মেছি, মরেছি। এখনও আমরা সবাই এই বনেই মরতে চাই। এই বন আমাদের প্রাণবায়ু, এই বন আমাদের প্রাণ। এই বন আমাদের স্বাধিকার। আর কেউ সেই স্বাধিকার কেড়ে নিতে পারবে না। কেউ এই নাড়ির বাঁধন ছিঁড়তে পারবে না। যদি কেউ সে চেষ্টা করে, আমরা শেষ নিঃশ্বাস অবধি লড়বো। শরীরের প্রতিটি রক্তকণা দিয়ে রক্ষা করবো এই বন আর এই স্বাধিকার। জানি, জন্মালে মরতে হবেই, তাই স্বাধিকার রক্ষার জন্য না হয় কদিন আগেই মরব, ভয় পাই না।

দয়া করে আমাদের একটি বন্য-প্রজাতি ভাবুন, বনে বাস করা মানবদেহী বন্য-প্রজাতি, যার মধ্যে আছে মানবিকতা, যে ভালোবাসতে জানে, যার মন মমতায় আর্দ্র হয়। আইন বলে বন্য-প্রজাতি বনে বাস করবে। আমরা ঠিক সেটাই চাই। বনেই বাস করতে চাই।

যাঁরা এই চিঠিটি পড়ছেন তাঁদের কাছে এটাই অনুরোধ আমাদের সহায় হোন। তা না পারলে, অন্তত আমাদের ক্ষতি যেন না করেন।

টি. গুরুভাইয়া

আপ্পাপুরম,

আমরাবাদ টাইগার রিজার্ভ,

নাল্লামালা ফরেস্ট,

তেলেঙ্গানা রাজ্য, ভারত।

চেঞ্চু উপজাতি

সরকারি খাতাকলমে চেঞ্চুরা আদিবাসী, যারা আসলে আদিম বাসিন্দা। দক্ষিণ ভারতে দ্রাবিড়দেরও আগে থেকে বসবাস করছে এই চেঞ্চুরা। অনুমান করা হয় তাদের বসতি প্রস্তরযুগের শেষ ভাগ থেকে। তখন পৃথিবীর তাপমাত্রা এখনকার চেয়ে গড়ে প্রায় দশ ডিগ্রি কম ছিল। বৃষ্টিপাতও অনেক কম হত। চেঞ্চুদের ভারতে বসবাস আরম্ভের দিন তারিখ তো বলা সম্ভব না তবে তাদের জেনেটিক্স তথ্য বলে তারা অতি প্রাচীন। ১,২৯,০০০ থেকে ১১,৭০০ বৎসর আগের কোনও এক সময়ের। কাজেই আমরা নিশ্চিত ভাবে বলতে পারি শৈত্য যুগ শেষ হয়ে কৃষিকাজ শুরু হবারও অনেক অনেক আগে থেকেই আছে এই চেঞ্চু সম্প্রদায়। চেহারার দিক দিয়ে প্রোটো-অস্ট্রালয়েড গড়নের ছোটখাট ছিপছিপে কিন্তু অফুরন্ত শক্তির অধিকারী চেঞ্চুদের নাক উঁচুর চেয়ে চওড়ায় বেশি। গায়ের রং তামাটে থেকে বাদামি। মাথায় কোঁকড়ানো চুল। চেঞ্চুদের ভাষা চেঞ্চু ভাষা। চেঞ্চু ভাযাকে দ্রাবিড় ভাষা গোষ্ঠীর একটি ভাষা বলে ধরা হয়। নিজেদের মধ্যে চেঞ্চু ভাষা ব্যবহার করলেও বাইরের লোকের সাথে তেলেগু ভাষাতেও স্বচ্ছন্দে কথা বলতে পারে। এমনিতেই তাদের ভাষায় ইতিমধ্যে ঢুকে গেছে প্রচুর তেলেগু শব্দ।

বর্তমানে চেঞ্চুদের প্রধান বাসস্থান তেলেঙ্গানা, তবে তাদের দেখা যাবে উড়িষ্যা, অন্ধ্র, কর্ণাটক, তামিলনাডুতেও। চেঞ্চুরা চেন্সওর, চেঞ্চেওর, চোঞ্চারু, চেঞ্চুভারু, চেঞ্চেকুলম বলেও পরিচিত। তাদের এই চেঞ্চু নামের উৎস হিসাবে দুটো ধারণা আছে। তারা গাছের চেট্টু (গাছ) এর নীচে বাস করে বলে তাদের নাম হয়েছে চেঞ্চু। আরেকটি ধারণা হল তারা চেঞ্চু (ইঁদুর) খায় বলে তাদের নাম হযে গেছে চেঞ্চু।

চেঞ্চুদের প্রধান বাসস্থান তেলেঙ্গানার নাল্লামালাই-র দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে। তাছাড়া তারা ছড়িয়ে আছে তেলেঙ্গানার মেহবুবনগর জেলায়, অন্ধ্রের কুর্নুল, আর গুন্টুর জেলায়। আছে উড়িষ্যার কালাহাণ্ডি, গঞ্জাম আর কেওনঝার সহ একাধিক জেলায়। এছাড়াও চেঞ্চুরা আছে কর্ণাটকে আর তামিলনাড়ুতে। তবে উড়িষ্যায় কর্ণাটকে বা তামিলনাড়ুতে তারা আছে খুবই কম সংখ্যায়। যেমন ২০১১ সেন্সাস বলছে উড়িষ্যায় আছে মাত্র ১৩জন। ছয়জন পুরুষ আর সাতজন নারী। যদিও ১৯৯১তে ছিল ২৭৫ জন। তবে এমনিতে চেঞ্চুরা সংখ্যায় খুব বেশি না হলেও খুব কমও নেই। মোটমুটি ৬০ হাজারের মত।

চেঞ্চু সংস্কৃতি

চেঞ্চু সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনায় আসবে তাদের সমাজ গঠন, সামাজিক প্রথা, বাসস্থান, ধর্মবিশ্বাস, পোশাক সবই। এর সব কিছুই গড়ে উঠেছে সুদুর অতীত থেকে তাদের বাসস্থানের ভৌগোলিক পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে। যে কোনও জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি সেভাবেই গড়ে ওঠে, আবার তার বদলও ঘটে সময়ের সাথে। সেই বদলে ভৌগোলিক পরিবেশের প্রভাব যেমন থাকবে তেমনি করে থাকবে তাদের প্রতিবেশী অন্য জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক প্রভাবও। বিশেষ করে যদি প্রতিবেশী জনগোষ্ঠী সংখ্যাগুরু হয় ও আর্থ-সামাজিক ভাবে পরাক্রান্ত হয় তবে সেই প্রভাবের ছাপ হবে গভীরতর। অনেক সময় এই প্রভাব এতটাই শক্তিশালী হতে পারে যে ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর নিজস্বতা সম্পূর্ণ লোপ পাওয়াও সম্ভব। আজ চে়ঞ্চুরা আদিম জনগোষ্ঠী হলেও আজকের চেঞ্চু সমাজ দেখে কতটা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি বজায় রাখতে পেরেছে তার হদিস পাওয়া খুব কঠিন। তারা সময়ের সাথে ক্রমাগত বদলেছে, এখনো বদলাচ্ছে। যেটুকু নিজস্বত্ব বজায় আছে এখনো সেটা আর কতদিন থাকবে তা বলা অসম্ভব। কারণ বর্তমানে শক্তিশালী প্রতিবেশীর প্রভাবের সাথে যোগ হচ্ছে চাপ। ফলে দ্রুততর লয়ে ঘটছে বদল।

চেঞ্চুদের বিশ্বাস ও ধর্মাচার

চেঞ্চুদের পারলৌকিক জীবন ও পুনর্জন্মে বিশ্বাসী। চেঞ্চুরা তাদের নারী পুরুষ নির্বিশেষে সব পূর্বজদের আরাধনা করে। চেঞ্চুদের মধ্যে ভুতপ্রেত অপদেবতা নানা ভালো মন্দ জাদুকরী তন্ত্রমন্ত্রেরও বিশ্বাস আছে। তারা বিশ্বাস করে রোগবালাই, শিকারের অভাব, এসবের জন্য পূর্বজদের আর দেবতাদের অবহেলা জনিত অসন্তুষ্টিই দায়ী।

সাধারণ ভাবে চেঞ্চুদের মধ্যে সামাজিক বা সর্বজনীন ধর্মাচরণের প্রথা প্রায় নেই। তাদের সব ধর্মাচরণ ব্যক্তিগত স্তরে সীমিত থাকে। ধর্মাচরণে কোনও পুরোহিত থাকে না। তবে কখনো সখনো অভিজ্ঞ সাহায্যকারীর সাহায্য নিতে হয়, বিশেষ করে বলি দেবার সময়। এছাড়া মেয়েরা সরাসরি দেবার্চনায় অংশ গ্রহণ করে না। মেয়েদের কাজ শুধু দেবতাদের ভোগ রান্না করে দেওয়া আর দেবদেবীদের সাজসজ্জার ব্যবস্থা করা।

দুর্গম এলাকায় বসবাসকারী চেঞ্চুদের সাথে সমতলবাসীদের সম্পর্ক কিন্তু বেশ আলগা। যদিও তাদের ধর্মকে বলা হয় হিন্দু ধর্ম, আসলে কিন্তু তাদের দেব দেবীরা প্রচলিত হিন্দু দেবদেবীদের মধ্যে পড়ে না। চে়ঞ্চুদের প্রধান দেবী গিরিমালাই-সামা। গ্রামের প্রান্তে একটি গাছের তলায় পাথর খণ্ড রেখে তৈরি হয় দেবীর আরাধনা স্থল। শিকারে যাবার আগে দেবীর কাছে প্রার্থনা করা হয় ভালো শিকারের জন্য। শিকার শেষে শিকার করা প্রাণীর মাংসের টুকরো দেওয়া হয় দেবীকে নৈবেদ্য হিসাবে।

এছাড়া আছে পোলেরাম্মা, সুনকাম্মা, পেদ্দাম্মা, পতুরাজু, মাল্লাম্মা, মেরেম্মা, মন্থনলাম্মা এমন সব বিভিন্ন গ্রামীণ দেবদেবী। এদের আরাধনা করা হয় বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য। কদাচিৎ কখনও কিছু বীজ বপনের মতো কোনও কৃষিকাজ করলে সেই কাজের আগে লাচাম্মাদেবীর আরাধনা অবশ্য কর্তব্য। কোনও নদী বা জলাশয় পার হবার আগে বা সন্তানের প্রথমবার চুল কাটার আগে গঙ্গাম্মাদেবীর আরাধনা করার প্রথাও আছে।

এটা খুবই স্বাভাবিক যে যতই বিচ্ছিন্ন থাকার চেষ্টা করুক তবু দুই চার ছয় হাজার বৎসর পাশাপাশি বাস করতে করতে সংখ্যাগুরু লোকেদের ধর্মের অনেক কিছুই তাদের মধ্যে ঢুকে যাবেই। সেই পথেই চেঞ্চুদের মধ্যে প্রবেশ করেছে ভেঙ্কটেশ্বরের আরাধানা। যোগ হয়েছে শিবের উপাসনা। কুর্নুলের শ্রীশৈলম শিবমন্দিরে শিবরাত্রির অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার প্রথাও যোগ হয়েছে। যোগ হয়েছে শ্রাবণ মাসে লিঙ্গাম্ম্য পুজা, যাকে মনে করা হয় অতি প্রাচীন শিব আরাধনার একটি পদ্ধতি। এই মূল হিন্দু ধর্মের সাথে চেঞ্চুদের সংযোগ হিসাবে রচিত হয়েছে পুরাণ কথাও। সেই পুরাণে বলা হচ্ছে মল্লিকার্জুন (শিব) এক চেঞ্চু যুবতীর প্রেমে পড়ে যান এবং বিয়ে করেন। এই চেঞ্চু যুবতীই হলেন ‘চেঞ্চু লক্ষী’। শ্রীশৈলম মন্দিরে রক্ষিত গাথায় লেখা আছে এই কাহিনি। তাই শ্রীশৈলম মন্দিরে চেঞ্চুদের বিশেষ স্থান প্রাপ্য। সদ্য কয়েকমাস আগে দক্ষিণ ভারতের বিখ্যাত চিত্রাভিনেতা চরিতরামের মেয়ের অন্নপ্রাশনে ডেকে আনা হয় চেঞ্চু দম্পতিকে, মেয়েকে আশীর্বাদ দেবার জন্য, কারণ চরিতরামের স্ত্রী চেঞ্চুলক্ষীর ভক্ত।

চেঞ্চুদের খাবার, শিকার ও সংগ্রহ

চেঞ্চুরা পুরো আমিষাশী। এমনিতে মিলেট, জওয়ার, ভুট্টা তাদের পছন্দের, তবে আজকাল সরকার থেকে তাদের বিনামুল্যে চাল দেওয়া হয় বলে যারা চাল পায় ও নেয়, তারা ভাতই খায় বা খেতে বাধ্য হয়। তবে সেসব তো রোজ জোটে না। তখন খাবে মাটি খুঁড়ে পাওয়া কোনও কন্দ সেদ্ধ। সাথে শিকারে পাওয়া মাংস। আর কুড়িয়ে পেড়ে পাওয়া নানা ফল। চে়ঞ্চুদের খাদ্যাভ্যাস হল তারা সাত সকালে কিছু খেয়ে বের হয়ে যাবে শিকারে আর তারই সাথে মাটি খুঁড়ে নানা খাদ্যযোগ্য কন্দ জোগাড় করা চলে। আর আছে মধু সংগ্রহ। চেঞ্চুরা প্রচুর মধু খায়। শিকার-সংগ্রহের কাজে নারী পুরুষ সবাই বের হয়ে যায়। মেয়েরা শিকার করে না বা করবে না এমন কোনও নিয়ম তাদের মধ্যে নেই। শিকারের অস্ত্র তিরধনুক আর ছুরি। শিকারে সাহায্যকারী হিসাবে থাকবে কুকুর। চেঞ্চুদের চারপাশে ঘুরঘুর করছে বাঘ, চিতা, ভল্লুক, ময়ুর, বুনো শুয়োর, বনমোরগ, হরিণ, সাপ, নেউল, বিছা, খরগোশ, ধেড়ে ইঁদুর, নানা পাখি। তবে তারা শিকার করবে মুলত বুনো শুয়োর, হরিণ, ইঁদুর, গিরগিটি, খরগোশ পাখি। চেঞ্চুদের শিকারের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল, যতদুর সম্ভব তারা কেবল পুরুষ প্রাণীই শিকার করে। কোনও মেয়ে প্রাণী তাদের কাছে শিকারযোগ্য না। তবে মাঝেমধ্যে ভুলচুক হলেও হতে পারে। শিকার-সংগ্রহের কাজে তারা সকালে খেয়ে বের হবার পরে আবার খাবে সন্ধ্যার পর ডেরায় ফিরে। মাঝে আর কিছু না খেয়েই দিনভর পাহাড়ে হাঁটবে। গড়ে ২০ কিলোমিটার প্রতিদিন। ছিপছিপে চেহারার চেঞ্চুদের দেখে কখনো মনে হবে না যে তারা অতটাই শক্তি রাখে।

জীবনযাপনের জন্য খাবার ছাড়াও কিছু টুকটাক লাগেই। সেটা সংগ্রহ করতে হয় সমতলের লোকেদের থেকে। সমতলের লোকদের কিছু দিলে তবেই কিছু পাওয়া যায়। সেই উদ্দেশ্যে চেঞ্চুরা সংগ্রহ করে বিড়িপাতা, মহুয়া ফুল, মধু, গঁদ, রজন, হলুদ। এসব তারা দেয় ব্যবসায়ীদের বা সরকারী কো-অপারেটিভে সামান্য কিছু অর্থের বিনিময়ে। চে়ঞ্চুদের এমনিতে টাকার কোনও প্রয়োজনই হয় না। তারা কিছুই জমায় না। তাদের হল দিন আনি দিন খাই। ফলে সম্পদ ভাবনাটাই তাদের মাথায় নেই। সঞ্চয় করে সম্পদ সৃষ্টির ভাবনা মাথায় নেই বলেই তারা কৃষিকাজও করে না। সরকার থেকে চেষ্টা করা হয়েছিল তাদের কৃষিকাজে যুক্ত করার। সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। চেঞ্চুরা বন ছেড়ে নড়বে না। তবু ক্রমাগত বহু চেষ্টার পরে দেখা গেছে কোথাও কোথাও কোনও কোনও চেঞ্চু চাষ করছে। সে চাষ খুবই ছোট আকারে আর তাদের নিজস্ব পদ্ধতিতে। মুলত ভিজা মাটিতে ছুঁচোলো লাঠি দিয়ে গর্ত করে বীজ পুঁতে দেওয়া। এভাবে ফলের গাছ এক আধটু জন্মালেও অন্য ফসল হবে একেবারেই যৎসামান্য। তাও যেটুকু করে সেটুকুও ঐ বাজরা বা ভুট্টার চাষ। এছাড়া ইদানীং অনেকে অন্যের বাড়িতে পশু চরানোর কাজ নেয় বা সরকারি কাজেও দিনমজুর হিসাবে কখনও সখনও কাজ করে।

আধুনিক সমাজের সাথে সম্পর্ক

সরকারের তরফ থেকে চেঞ্চুদের বনের বাইরে এনে সমতলের আধুনিক জীবনধারার সাথে মিশিয়ে দেবার জন্য চেষ্টা করা হয়েছে, এখনও হচ্ছে। বড় সমস্যা হল চেঞ্চুরা কখনো তাদের বেঁচে থাকার জন্য সমতলের আধুনিক সমাজের উপর নির্ভরশীল ছিল না। ফলে সম্পর্কটি বরাবর ছিল প্রায় সম্পর্কহীন-আলগা, পারস্পরিক বোঝাপড়া কখনো গড়ে ওঠেনি। যদিও ইতিহাস বলে অতীতে স্থানীয় রাজারা চেঞ্চুদের কাজে লাগাত নদীর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য। কিন্তু সেই ঐতিহ্য রাজা বা রাজবংশ ভিত্তিক হওয়াতে এক সময় তা হারিয়ে গেছে। এখন সরাসরি সরকারি ভাবে, কখনও বা কোনও সেবা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চেঞ্চুদের সাথে সম্পর্ক গড়ার প্রচেষ্টা চলছে। স্কুল গড়ে দেওয়া হলেও চেঞ্চুরা কেউ স্কুলে যেতে উৎসাহী না। স্কুলে মিড ডে মিল দেওয়া হয়। কিন্তু সে মিল খেতেও চেঞ্চুরা উৎসাহী না। তাদের অভ্যস্ত খাবার হল জওয়ার, ভুট্টা, কন্দ সেদ্ধ, মাংস, মধু। আর মিড ডে মিলে দেওয়া হয় ডাল, ভাত, ডিম। কাজেই খেতে ভালো লাগে না। আরমাবাদ এলাকায় বেশ কয়েকটি স্কুল গড়া হয়েছে। দশম শ্রেণি পর্যন্ত স্কলারশিপ দেওয়া হয় আবার দশম শ্রেণির পরে পড়লেও স্কলারশিপ পাবে। স্কুলে থেকেই পড়ার সুবিধার জন্য হোস্টেল বানিয়ে দেওয়া হয়েছে আরমাবাদেই। কারন তারা ঐ এলাকার বাইরে যাবেই না। তবু ছাত্র জোটে না। পড়ার জন্য শহরে আনা হলেও তারা পালিয়ে যায় বনে। চেঞ্চুদের জীবনধারার শিকড় তাদের চিরাচরিত জীবনধারার ঐতিহ্যের গভীরে চারিয়ে সৃষ্টি করেছে এক গাঢ় আর দৃঢ় সম্পর্ক। তারা তাদের চিরাচরিত জীবনধারাতেই সদা সুখী।   

চেঞ্চুদের গ্রাম ও বাসস্থান

একেবারে সুদুর অতীতে চেঞ্চুদের বাসগৃহ বলে কিছুই ছিল না। তাদের বসবাস গাছতলায় অথবা পাহাড়ের গুহায়। কৃষ্ণা নদী ও তার শাখা নদীর ধারে পাশের ১৫০০ থেকে ২০০০ ফুট উঁচু পাহাড়ি, গভীর বনে থাকতো চেঞ্চুরা। কারণ এমন এলাকাতেই তাদের প্রয়োজনীয় খাদ্য পাওয়া যেত। সেই অতীতে স্বভাবতই তারা ছিল যাযাবর। কিন্তু ক্রমে সব বদলে গেছে। এখন চেঞ্চুরা বাস করে স্থায়ী গ্রামে স্থায়ী ঘর বানিয়ে। তবে এখনও তাদের গ্রাম ঐ বনেই হয়। অনেক জায়গাতেই তাদের বসবাস সরকারি ভাবে ঘোষিত সংরক্ষিত বনাঞ্চলে। ফলে সরকারি প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা আর চেঞ্চুদের জীবনযাত্রায় অনেক সময় খাপ খায় না। মাঝে মধ্যে অপ্রীতিকর পরিস্থিতিও দেখা দিচ্ছে।

চেঞ্চুরা বাস করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ছোটো ছোটো গ্রামে। দুটো গ্রামের মধ্যে পাঁচ ছয় কিলোমিটার দুরত্ব থাকে। প্রতিটি গ্রাম হবে কোনও না কোনও নদীর ধারে। গ্রামকে বলা হয় গুদেম বা পেন্টা। পেন্টাতে থাকে পাঁচ থেকে দশটি ঘর। পরিবারের আত্মীয়তার সূত্রে যত নিকট সম্পর্ক ততই কাছাকাছি ঘর। আত্মীয়তার সম্পর্ক যত দূরের ঘরও তত দূরে। এই ভাবে পারিবারিক সম্পর্কে বসতবাড়ির নৈকট্য আছে নামিবিয়ার কালাহারি মরুপ্রান্তে বসবাসকারী বুশম্যানদের মধ্যে, একই প্রথা দেখা গেছে নাইজেরিয়ার গ্রামীণ বসতিতে, দেখা গেছে চাদ-এর গ্রামাঞ্চলে। গ্রামের প্রধানকে বলা হয় পেদ্দা-মনিষ্যি যার আক্ষরিক অনুবাদ হবে বড়-মানুষ, আর ভাবগত অনুবাদ হবে গুরুজন। এই গুরুজনই গ্রামের সমস্ত বিষয়ের শেষ কথা। তাঁর সিদ্ধান্ত সবাই একবাক্যে মেনে নেবে। তবে আজকাল ছোটোখাটো সমস্যা হলেই কেবল এই গুরুজন সিদ্ধান্ত জানান। তেমন কোনও গুরুতর সমস্যা হলে অবশ্যই সরকারি প্রশাসন, পুলিশ আসবে। এখন সরকারি আবাসন প্রকল্পের অধীনে বেশ কিছু পাকা বাড়ি বানিয়ে দেওয়া হয়েছে চেঞ্চুদের। অনেকে থাকছেও। কিন্তু খুব যে খুশি মনে থাকছে সেটাও বলা যাবে না। মাঝে মাঝেই পাকা বাড়ি ছেড়ে জঙ্গলে চলে যাবার ঘটনাও নজরে পড়ছে।

চেঞ্চুদের নিজেদের ঘর তৈরি হয় শম্বুকাকৃতির। নীচের দিক তিনকোনা চৌকোনা কখনও আয়তক্ষেত্রাকার হয়। বাঁশের খুঁটি দিয়ে বানানো ঘরের বেড়া তৈরি হয় বাঁশের বা ডালপালার। উপরের ছাউনি শুকনো ঘাসের। সাধারণ ভাবে তিন রকমের ঘর তারা বানায়। চুট্টু গুডিসা হল গোলাকার ঘর। মুলা গুডিসা চৌকোনা ঘর। কোটাম্মা আয়তক্ষেত্রাকার ঘর। ঘরে সাধারণত একটাই রুম। এর মধ্যে গোলাকার ঘর চুট্টু গুডিসাই হল তাদের ঐতিহ্যবাহী ঘর। বাকিগুলো অনেক পরে এসেছে। ঘরে একটাই রুম থাকে। তবে আয়তক্ষেত্রাকার কোটাম্মা ঘরে বেড়া দিয়ে একাধিক রুম বানানো হয়, রান্নার জন্য, শোবার জন্য, পোষা ছাগল কুকুরের জন্য। অনেক এক রুমের ঘরেও ছাগল কুকুর রাখা হয়। সবাই একসাথে মেঝেতে শুয়ে পড়ে। অনেক সময় একটি ঘর বা দুই তিনটি ঘর ঘিরে বাইরের দিকে বাঁশের বেড়া দেওয়া থাকে। আবার অনেক সময় ছাগল কুকুরের মত পোষ্যদের জন্য আলাদা ঘর বানাতেও দেখা গেছে। ঘরে আসবাবপত্র থাকে না। তারা শোয় ঘরের মেঝেতে। ঘরে অন্যান্য সম্পদ বলতে থাকবে তিরধনুক, ছুরি, কুড়াল আর মাটিতে গর্ত খোঁড়ার জন্য ছুঁচোলো মুখের শক্ত ডাল। আর থাকবে খান কয়েক অ্যালুমিনিয়ামের বাসন, বাটি, গামলা, জলের পাত্র। থাকে কয়েকটা বাক্স আর খান কয়েক জামা কাপড়। রান্নার উনুন বলতে তিনটে পাথর বা ইটকে ত্রিভুজের মত করে পেতে নেওয়া। একটি ঘরে একটি পরিবার। স্বামী-স্ত্রী আর সন্তান। ছেলের বিয়ে হলে মা-বাবার ঘরের পাশেই নতুন ঘর বানিয়ে নেবে।

চেঞ্চু জীবনধারা ও সমাজ ব্যবস্থা

নাচ-গান – চেঞ্চুদের নাচ গানের সাথে ধর্মের বা তুকতাকের কোনও সম্পর্ক নেই। নাচ-গান হল সরল ভাবেই সামাজিক আনন্দের অনুষ্ঠান। তাদের সব গানই প্রেম ভালোবাসা ঘিরে। এছাড়া কিছু গান আছে তাদের দৈনন্দিন জীবনের কাজের তালে তালে তাল মিলিয়ে গাওয়া হয় সেগুলো। সামাজিক আনন্দানুষ্ঠানে নাচ হবে ঢোলের তালে তালে পা ফেলে। মেয়েরা পরনের কাপড়ের প্রান্ত এক হাতে ধরে তালে তালে দুলে দুলে পা ফেলবে আর দুলবে।

সমাজ – চেঞ্চুদের সমাজ পিতৃতান্ত্রিক হলেও পারিবারিক জীবনে নারী পুরুষ প্রায় সমান ক্ষমতার অধিকারী। তাদের প্রধান বাসস্থান নাল্লামালা এলাকার জনগণনা বলে প্রতি হাজার পুরুষে ২০০১ তে ছিল ১০২০ নারী, সেটা কমে ২০১১ তে হয়েছে ৯৮০। গড় আয়ু চল্লিশের আশপাশে। চেঞ্চুদের সমাজ পিতৃতান্ত্রিক সমাজ। ২৬টি কুলম বা গোত্রে ভাগ। যদিও চেঞ্চুদের মতে তাদের কুলমের সংখ্যা ৬৪ কিন্তু ১৯৬১-র সেন্সাসে মাত্র ২৬টি কুলমের হদিস মিলেছে। কুলমের পরের ধাপে থাকা গুম্পু হল কয়েকটি পরিবার মিলে গড়া ছোট দল। কোনও বড় কাজে যেমন বাড়ি তৈরি করার মত কাজে একটি গুম্পুর সবাই হাত লাগাবে। গুম্পুর পরের ধাপে থাকা পরিবারই হল তাদের সমাজের ভিত। কুলমকে অনেক সময় ইন্টিপেরু বলা হয়। প্রতিটি ইন্টিপেরুর আলাদা নাম। চেঞ্চুদের নামের সাথে তার ইন্টিপেরু নাম যুক্ত থাকে। মা-বাবা অবিবাহিত সন্তান নিয়ে তাদের ছোটো পরিবার। ছেলের বিয়ে হলে মা-বাবার ঘরের পাশেই আলাদা ঘর বানিয়ে নেবে। এই বিয়ে হলেই আলাদা থাকাটা সাধারণ নিয়ম হলেও বৃদ্ধ মা-বাবা কখনও কখনও বিবাহিত ছেলের সাথেও থাকেন।

গর্ভধারণ ও সন্তানের জন্ম ইত্যাদি ঘিরে সামাজিক প্রথা – চেঞ্চুরা জীবনচক্রের পরিবর্তনের যে ধাপগুলোকে গুরুত্ব দেয় তা হল জন্ম, ঋতুমতী হওয়া, বিয়ে, মৃত্যু। প্রতিটি জন্মই চেঞ্চুদের কাছে ঈশ্বরের আশীর্বাদ।

জন্ম – গর্ভধারণের নবম মাসে সন্তান জন্ম নিলে সে হবে পুত্র সন্তান, আর দশম মাসে জন্ম হলে সে হবে কন্যা সন্তান, এমনটাই চেঞ্চুদের বিশ্বাস। গর্ভবতী নারীকে কয়েকটি নিষেধাজ্ঞা পালন করতে হয়। যেমন কবরস্থানে না যাওয়া, সদ্য মৃত্যু হয়েছে এমন বাড়িতে না যাওয়া, মৃতদেহকে স্পর্শ না করা এইসব নিষেধাজ্ঞা অবশ্য পালনীয়। সাধারণত প্রথম সন্তানের জন্ম দেবার জন্য গভর্বতী নারী তার মায়ের কাছে থাকবে। সন্তান প্রসবের সময় গ্রামের কোনও অভিজ্ঞ মহিলা সাহায্য করবেন। বিশেষ প্রয়োজন পড়লে চেঞ্চু বৈদ্যের সাহায্যও নেওয়া হয়। আর তেমন বড় রকমের সমস্যা হলে অবশ্যই ডাক্তারের কাছে যাবে। তবে প্রসবকালীন সমস্যা দেখা দিলে ধরে নেওয়া হয় কোনও দেবী বা অপদেবতা ক্রুদ্ধ হয়েছেন। শিশুর জন্মের সময়ে সাহায্যকারী মহিলাটি শিশু আর জন্মদাত্রী মায়ের সাথে একই ঘরে থাকবেন পাঁচ থেকে দশ দিন। সাহায্যকারী মহিলা এই কয়দিন ওখানেই খাবেন। যাবার সময় কিছু টাকাও পাবেন। প্রসবের পরে দশদিন হল অশৌচকাল। এই দশদিন জন্মদাত্রী কোথাও যাবেন না। কোনও কাজ করবেন না, এমনকি কোনও কিছু ছোঁবেনও না। দশদিন পরে হলুদ আর বাদাম তেল গায়ে মেখে জন্মদাত্রী মা স্নান করে শুদ্ধ হবেন। তবে এই স্নানের সময় মাথায় জল দেবেন না। জন্ম দেওয়ার পরে জন্মদাত্রী বিশ্রামে থাকবেন। নিজের ও শিশুর শরীরের অবস্থা বুঝে বিশ্রামকাল এক থেকে চারমাস অবধি হতে পারে। এই সময়ে জন্মদাত্রী মুরগি আর খরগোশের মাংস খাবেন না।

জন্মের পরে শিশুর মুখে একটু জল আর মধু দেওয়া হয়। কাটা নাড়ির ঘা শুকোবার জন্য আগে ব্যবহার করা হত হলুদ, কাপড় পোড়া ছাই আর ক্যাস্টর অয়েল মিশিয়ে বানানো মলম। তবে আজকাল অনেক বদল হয়েছে। এখন তারা বোরিক পাউডার ব্যবহার করে। শিশুর মাথায় ক্যাস্টর অয়েল মেখে কাপড় মুড়ে রাখার প্রথা চালু আছে। আর অনেক সময় দুই কানের কাছে কাটা পেঁয়াজ রেখে দেওয়া হয় অসুখবিসুখ ঠেকাতে।

সন্তানের নামকরণ একটু দেরি করেই হয়। অনেক সময় বছর দুই তিন পরেও হয়। যতদিন নামকরণ না হচ্ছে, ততদিন বাচ্চা ছেলেকে মুগেন্না আর মেয়েকে মুগেম্মা বলে ডাকা হবে। শিশুর আটমাস বয়সে হবে অন্নপ্রাশন। মুখে অন্নের বদলে অবশ্য কোনও কন্দ সেদ্ধই দেওয়া হবে। প্রথম মাথা মুড়ানো একটা গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান। বিশেষ মানত করা থাকলে সেই বিশেষ দেব বা দেবীর সামনে বা পছন্দের যে কোনও দেবদেবীর থানে গিয়ে চুলকাটা হবে। অনুষ্ঠানে গ্রামের প্রায় সবার নিমন্ত্রণ। শিশুর মামা প্রথম কয়েক গাছা চুল কেটে দেবেন। তারপরে ঠিকঠাক ন্যাড়া করানোর কাজ নাপিতের।

ঋতুমতী কন্যা – কন্যা সন্তান ঋতুমতী হলে তার জন্য বিশেষ অনুষ্ঠান করা হয়। সাধারনত চেঞ্চু মেয়েরা ঋতুমতী হয় ১২ থেকে ১৫ বৎসর বয়সে। প্রথম ঋতুমতী হলে গোবর লেপা মেঝেতে মেয়েকে বসতে দেওয়া হয় ঘরের এক কোণে। তার পাশে রাখা হয় ঝাঁটা, ছুরি, কাস্তে বা যে কোনও লোহার জিনিস যাতে কোনও অশুভ শক্তির প্রভাব না পড়ে। পাঁচ দিন থাকবে অশৌচ। এই পাঁচ থেকে দশ দিন মেয়েটির পুজা করা, রান্না করা সহ ঘরের প্রায় কোনও কিছুই ছোঁয়া চলবে না। তার কাছে কোনও শিশু বা পুরুষের যাওয়া বা তাকে ছোঁয়া নিষেধ। অশৌচকাল কাটলে মেয়ের ব্যবহারের সব জিনিষ ফেলে দেওয়া হবে। তারপর হবে মেয়ের শুদ্ধিকরণ স্নান। তার সাথে সেই দিনই ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের নিমন্ত্রণ করা হয়, তারা মেয়েকে নতুন পোশাক সহ নানা উপহার দেবে।

বিয়ে – বিয়ে তাদের ভাষায় পেল্লি। বিয়ে হয় চেনা পরিচিতি আলাপ আলোচনার মাধ্যমে, আলোচনা করতে যাবে পাত্রের মা-বাবা সাথে কুলের বিশেষ জন, যাকে রাজু-বা কুলগাড়ু বা মন্ত্রী বলা হয়। আলোচনা পাকা করার জন্য পাত্রপক্ষকে পাত্রীর কাকা বা মামার হাতে দিতে হবে পাঁচ থেকে পঁচিশ টাকা। আর নিজেরা পছন্দ করে ভালোবেসে, পালিয়ে গিয়ে, এসব বিয়ে তো হবেই হবে। তবে সব বিয়েতেই একটি সামাজিক শর্ত থাকে, স্বগোত্রে বিয়ে হবে না। বিয়ের পরে গোত্রান্তর হয়ে স্বামীর গোত্রই হবে স্ত্রীর গোত্র। বিয়ে হবে পাত্রীর বাড়িতে। বিয়ের পোশাকের রঙ হবে হলুদ। ঐ হলুদ গোলা জলে চুবিয়ে হলুদ করা। বিয়ের অনুষ্ঠান হবে গ্রামের সবার উপস্থিতি বিশেষ করে বয়োবৃদ্ধদের উপস্থিতিতে, চিরাচরিত প্রথায়। বিয়েতে উপস্থিত থাকবে উত্তালুরি গোষ্ঠীর পুরোহিত বা কুলরাজু। তিনিই বিয়ের আচার অনুষ্ঠান পরিচালনা করবেন। পাত্রীকে পাত্রের হাতে সম্প্রদান করবেন মেয়ের মামা। তারপরে পাত্র পাত্রীর গলায় পরিয়ে দেবে একটা লকেট, পান পাতা চিবিয়ে পাত্রপাত্রী দুজন দুজনকে খাইয়ে দেবে। ব্যাস বিয়ে হয়ে গেল। তারপরে খাওয়াদাওয়ার ব্যাপার তো থাকবেই। সেই খাওয়ার খরচ পাত্র পাত্রী দুই পক্ষই যৌথভাবে বহন করবে। চেঞ্চুদের সমাজে বিধবা বিয়ে সম্পূর্ণ ভাবে অনুমোদিত। আর বিয়ে হলে বিবাহ বিচ্ছেদের সম্ভাবনাও থাকবেই। বিবাহ বিচ্ছেদও চে়ঞ্চু সমাজে অনুমোদিত, তবে গ্রামের বয়োবৃদ্ধরা সায় দিলে তবেই। বিচ্ছেদের পরে স্বামী স্ত্রী আবার বিয়ে করতে পারে। চেঞ্চুদের সমাজে বহুবিবাহ নিষিদ্ধ। সন্তান হলে, সন্তান পিতার গোত্র আর পদবী নেবে। আর পিতার মৃত্যুতে পিতার যা কিছু আছে তার অধিকারী হবে ছেলে। বিয়ের পরে গড়া সংসারের দায় কেবল একা পুরুষের নয় নারীটিও সমান দায় থাকে।

মৃত্যু – চেঞ্চুদের বিশ্বাসে বৃদ্ধ বয়সে মৃত্যু খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।তারা মনে করে মৃত জনের আত্মা দেহ ছেড়ে চলে যায় দেবতার কাছে। মৃতদেহ সৎকারে অগ্নিদাহ বা কবর দেওয়া দুটো প্রথাই প্রচলিত আছে। কোনটা হবে তা কিছুটা পারিবারিক প্রথা পছন্দ বা পরিস্থিতির উপর নির্ভর করলেও অগ্নি সৎকার খুবই কম হয়। মৃত্যু হলে সমস্ত নিকট আত্মীয়কে খবর দেওয়া হবে। সবাই উপস্থিত হলে মৃতদেহকে স্নান করিয়ে চুন আর সিঁদূরের তিনটি করে খাড়া লম্বা দাগ টেনে দেওয়া হয় বুকের উপর কপালে আরে দুই পায়ের মাঝে, বাহুতে, হাতে তালুতে। মাথায় নারকেল তেল মেখে সযত্নে মাথার চুল আঁচড়ে দেওয়া হয়। মৃত দেহের উপর সুগন্ধি কাঠের তেল রেখে একটি কাপড়ে মুড়ে দেওয়া হয়। তারপরে সেই কাপড় মোড়া মৃতদেহ পোক্ত বাঁশে ঝুলিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় গ্রামের থেকে দূরে দিম্পেদু কল্লম-এ (তাদের শ্মশান বা কবরস্থান)। এখানে রাখার পর কাপড়ের ঢাকা খুলে সবাই এক এক করে এসে মৃতের মুখ দেখবে বেশ কিছু সময় ধরে। এই দেখার একটা বিশেষ কারণ হল তাদের ধারণা অনেক সময় এই স্থলে এসে মৃত ব্যক্তি আবার প্রাণ ফিরে পেতে পারে। তাই অনেক ক্ষণ ধরে দেখা হয় প্রাণের কোনও লক্ষণ ফিরে আসছে কিনা। দিম্পেদু কল্লম-এ মৃতদেহ আনার সময় সাথে আনা হবে জোওয়ার, গুড়, আর ছোলার ছাতু। তারপরে কবর খোঁড়া। কবরের মাটি কাটা শুরু করবেন মৃতের কাকা বা জ্যাঠা। তারপরে উপস্থিত সবাই ভাগে ভাগে মাটি খুঁড়বে একটু একটু করে। এরপর আবার খুড়া বা জ্যাঠা মৃতের কোমরে লজ্জাবস্ত্র বাঁধার দড়িটি কেটে লজ্জাবস্ত্র সরিয়ে দেবে। তারপরে নগ্ন দেহ কবরে শুইয়ে দেবে। চেঞ্চুদের বিশ্বাসে তাদের যেমন নগ্ন রূপে জন্ম হয়েছিল তেমনি নগ্ন রূপেই পৃথিবী ত্যাগ করতে হবে। কবরে মৃতদেহের মাথা থাকবে উত্তরদিকে। তারপরে মৃতদেহ ঢাকা হবে যে কাপড়ে মুড়ে আনা হয়েছিল সেই কাপড়ে। একপাশে রাখা হবে তার লজ্জাবস্ত্র। মুল্যবান গয়না খুলে রেখে মৃতের নিজস্ব ব্যবহারের সব কিছু কবরেই রেখে দেওয়া হবে। তারপরে প্রথম খুড়া বা জ্যাঠা একমুঠো মাটি দেবে ঢাকা দেওয়া মৃতদেহের উপর। তারপরে একে একে উপস্থিত সবাই মাটি দেবে। এরপর সবাই ফিরে যাবে একবারও পেছন ফিরে না তাকিয়ে। হাতমুখ ধোয়ার পরে শ্মশানযাত্রীদের কপালে সিঁদূরের ফোঁটা দিয়ে, খেতে দেওয়া হবে মহুয়ার মদ। তারপরে আবার সবাই হাতমুখ ধোবে যেখানে প্রথমবার মৃতদেহকে স্নান করানো হয়েছিল সেই জায়গায় গিয়ে। জোড় হাতে সেখানে খানিক দাঁড়িয়ে সবাই নিজ নিজ ঘরে ফিরে যবে। সেদিন আর মৃতের ঘরের উনুনে আঁচ পড়বে না। আর যিনি বিধবা হলেন তিনি সেদিন ঘরের বাইরেই থাকবেন। পরদিন শ্মশানযাত্রীরা সবাই আবার একত্র হবে মৃতদেহ প্রথম যেখানে রাখা হয়েছিল সেইখানে। সেখানে কাটা হবে মুরগি। সেই মুরগি রান্না করে সবাইকে মদ সহ খেতে দেওয়া হবে। মৃত্যুর পরের দশদিন অশৌচ। তাছাড়াও তৃতীয় আর দশম দিনে কিছু আচার অনুষ্ঠান আছে। সেই দুইদিন সমস্ত আত্মীয়দের উপস্থিত থাকতে হয়।

চেঞ্চু জেনেটিক্স

এখন কোনও জাতিকে চিহ্নিত করতে গেলে আগেকার মত নাকের মাপ, খুলির মাপ দিয়ে সেটা করা হয় না। আগের এই পদ্ধতিতে যদিও কয়েকটি দৈহিক বৈশিষ্ট্যকে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছিল তবু তা দিয়ে পৃথিবী জোড়া মানুষদের দৈহিক বৈচিত্রের প্রতিটি বৈশিষ্ট্যকে চিহ্নিত করে তাদের ভিন্ন ভিন্ন নামকরণ করাটা বাস্তবে সম্ভব ছিলো না। তাই কয়েকটি বৈশিষ্ট্যকে ধরে গোটা পৃথিবীর মানুষদের কয়েকটি জাতিত্ব ধরনে ভাগ করে ফেলা হয়েছিল। ফলে সব মানুষ কয়েকটি নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে গেল। এবার একটি ভৌগোলিক এলাকায় একাধিক নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের নৃগোষ্ঠীর দেখা পেলে তারা কি করে সেখানে এলো তারও ব্যাখ্যা দেওয়া দরকার। বেশির ভাগ সময় তার যুক্তি সঙ্গত ব্যাখ্যা দেওয়াও কঠিন হয়ে যাচ্ছিল।

এই সমস্যার সমাধান এল মানুষদের জিনগত পরিচিতি জ্ঞান থেকে। তবে পৃথিবী জোড়া গোটা মানব জাতির পরিচিতি নিয়ে যে জটিল সমস্যা আছে তার ত্রুটিহীন সমাধান এখনো বহুদুর। তবে ক্রমে একটা জিনিস বোঝা গেছে নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য একটা প্রাথমিক ধারণার জন্ম দিতে পারে মাত্র। এই প্রাথমিক ধারণা কতখানি ভুল বা ঠিক তা বোঝা যাবে কেবল জেনেটিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে।

বর্তমানে জিন বিশ্লেষণ করে কোনও মানব গোষ্ঠীর সুদুর অতীতের পূর্বজদের পরিচিতি জানা সম্ভব। ফলে কোনও জনগোষ্ঠীর নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে মাথা না ঘামিয়েও বলা সম্ভব কারা ছিল তাদের এবং কোন কোন এলাকার লোকেদের সাথে তাদের পূর্বপুরুষরা ঘর বেঁধেছিল। আর সেই সুত্রেই এখন জানা সম্ভব হয়েছে, আসলে পৃথিবী জোড়া মানুষরা সবাই সবার সাথে সম্পর্কিত। কোনও জনগোষ্ঠীই প্রকৃত অর্থে সম্পূর্ণ সম্পর্কহীন আলাদা জনগোষ্ঠী না। আফ্রিকা থেকে কয়েকটি পরিবার বের হয়ে এসেছিল কোনও এক সময় আমরা সবাই তাদের সন্তান। তা আমাদের নাকের মাপ খুলির মাপ, গায়ের রঙ, চোখের রঙ, যতই আলাদা হোক, সবাই ঐ কয়েকজন জনক-জননীর সন্তান।

অতীতের সামান্য কিছু লোকের জন্য এই বিশাল পৃথিবীর ভৌগোলিক দুরত্ব ছিল বিশালতর। তাই দীর্ঘকালীন ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য আর বিচ্ছিন্নতাকালীন ঘটা জিনের অনিয়ন্ত্রিত পরিবর্তন সৃষ্টি করেছিল বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক গড়ন আর সংস্কৃতির। ভাষাও হয়ে যায় আলাদা আলাদা। দীর্ঘ সময়ের পরে পৃথিবী জোড়া বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য, ভাষা, আর সংস্কৃতিগত বিভিন্নতাজনিত যে জটিল সমাজ গড়া হয়ে গেছে ইতিমধ্যে, তার মধ্যে নতুন করে মিশেছে ধর্মীয় জটিলতা। আর মিশেছে রাজনৈতিক ক্ষমতার লোভ। ফলে সম্ভবত আগামী বহুযুগ আমাদের এই বিভিন্নতাজনিত জটিলতা মেনে নিয়েই চলতে হবে।

আজ ভারতে যে পাহাড়-বন-জঙ্গলবাসী ছোটো ছোটো বিচ্ছিন্ন আদিবাসী আর বৃহত্তর, বহুলাংশে সুসংগঠিত সমতলবাসীদের মধ্যে আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক টানা পোড়েন চলছে তার প্রকৃত সমাধান সম্ভবত নেই। এই জটিলতা থেকেই প্রশ্ন এসেছে ছোট ছোট নৃগোষ্ঠীগুলো আদি-বাসী হলে বাকিরা কি উড়ে এসে জুড়ে বসেছে? ভারতবাসীদের জিনগত পরিচয় বলে তাদের পিতৃপুরুষদের বেশিটাই বহিরাগত। অথচ জননীরা প্রায় সবাই প্রথম থেকেই এখানে। বাস্তবে এমন কখনো হতে পারে না যে ভারতে শুধুই নারীরা বসতি করত। প্রতিটি নারীর সাথে সমসংখ্যক পুরুষেরও থাকার কথা। সেই নারীরা থেকে গেল অথচ পুরুষরা নেই কেন?

জিন বিজ্ঞানীরা সহ প্রত্ন বিজ্ঞানীরা, সমাজ বিজ্ঞানীরা, এই ধাঁধার সমাধান খুঁজেছেন। তাঁরা একটি, কিছুটা অভিনব, ধারণার কথা বলছেন। তাঁরা বলছেন ভারতে বহু পরিযানে ক্রমাগত বহিরাগতরা প্রবেশ করেছে শৈত্যযুগের পর থেকেই। সব পরিযানই যেহেতু কষ্টসাধ্য তাই প্রায় সব পরিযানই ছিল বৃদ্ধ-নারী-শিশু বর্জিত। সক্ষম যুবকেরা সফল পরিযান অন্তে এখানেই ঘর বেঁধেছে স্থানীয় বিচ্ছিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীদের নিয়ে। তারপরে সেই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পুরুষদের সরিয়ে ভারত জোড়া নবাগত সমতলবাসীর সংসার গড়া হয়েছে তাদেরই নারীদের নিয়ে। খুব সহজে এক কথায়, সমস্ত ভারতবাসীর জননীরা যাদের আমরা আদিবাসী বলি তাদের সমাজ থেকেই এসেছে। এমনটা সম্ভব কি? সম্ভবত বর্তমানের সমাজ ব্যবস্থার মধ্যেই এর উত্তর লুকিয়ে আছে। ভারতে বর্ণজাত পুত্র সন্তান নিম্ন বর্ণের পরিবারের কন্যাকে গ্রহণ করতে পারে, কিন্তু যে কোনও বর্ণ পরিবারের কন্যাদের বেলা নিম্ন বর্ণের পরিবারের পুত্রকে বিয়ে করায় অতি কঠোর নিষেধাজ্ঞা এখনো বজায় আছে। সেই নিষেধাজ্ঞা এতটাই কঠোর যে প্রয়োজনে সেই কন্যাকে হত্যা করতে তার পিতা মাতা বা ভাইয়ের হাত কাঁপে না। ধরা যেতে পারে, অতীতেও এটাই ঘটেছিল। সমতল বাসি নবাগত বর্ণ পুরুষরা আদিবাসী কন্যাদের সাথে ঘর বাঁধলেও আদিবাসী পুরুষরা বহিরাগত সমাজের কন্যার সাথে ঘর বাঁধার কোনও সুয়োগ পায় নি। তারই ফলশ্রুতি পিতৃক্রমে বহিরাগত জিনের আধিক্য থাকলেও মাতৃক্রমে থেকেছে কেবল স্থানীয় নারীদের জিন।

ভারতে মাতৃক্রমে মাইটোকন্ড্রিয়া হ্যাপ্লোগ্রুপ-এম এখনো গোটা ভারতেই সর্বাধিক। সব রকমের বর্ণ ভাষা দৈহিক বৈশিষ্ট্য, পাহাড়ি বা সমতলবাসী, সবাইকে জুড়েই মাইটোকন্ড্রিয়া হ্যাপ্লোগ্রুপ-এম-এর প্রবল আধিক্য। তারপরেই উল্লেখযোগ্য হল মাতৃক্রম মাইটোকন্ড্রিয়া হ্যাপ্লোগ্রুপ-এন। মাইটোকন্ড্রিয়া হ্যাপ্লোগ্রুপ-এম, এন বাদে ভারতে মাতৃক্রমে পাওয়া যাবে মাইটোকন্ড্রিয়া হ্যাপ্লোগ্রুপ-আর এবং মাইটোকন্ড্রিয়া- হ্যাপ্লোগ্রুপ-ইউ। জিন বিজ্ঞানীদের মতে ভারতে মাইটোকন্ড্রিয়া-এম ও এন প্রায় সমসাময়িক। তুলনায় পরে এসেছে মাইটোকন্ড্রিয়া-আর এবং তারও বেশ পরে ইউ।

বর্তমানে ভারতে পিতৃক্রমের একেবারে প্রথমদিকের জিনের হ্যাপ্লোগ্রুপগুলো প্রায় নেই হয়ে গেছে। এখন দেখা যাবে পিতৃক্রমের হ্যাপ্লোগ্রুপ-এইচ, এল, জে, আর২ এবং ওএম৯৫। তাছাড়া আরো সামান্য কিছু, তারা সংখ্যায় খুবই কম। তবে এই হিসাব উত্তরপূর্ব ভারত বাদ দিয়ে। সেখানে সরাসরি পূর্ব-এশীয় জিনের আধিক্য খুবই বেশি সেখানে আছে হ্যাপ্লোগ্রুপ-সি এর প্রবল প্রাধান্য।

পূর্ব-ভারতের অস্ট্রো-এশিয়াটিক যাদের আমরা বাংলায় আদিবাসী বলে জানি তারা প্রায় সবাই মাতৃক্রমে মাইটোকন্ড্রিয়া হ্যাপ্লোগ্রুপ-এম বহন করছে। আর পিতৃক্রমে ওয়াই ক্রমোজম হ্যাপ্লোগ্রুপ-ওএম৯৫ বহন করছে। এখানেই এসেই আমাদের স্বীকার করতে হবে সব আদিবাসী এক না। কারণ অস্ট্রো-এশিয়াটিক চেঞ্চুদের মাইটোকন্ড্রিয়া হ্যাপলোগ্রুপ-এম হলেও পিতৃক্রমে ওএম৯৫ নেই। তবে দক্ষিণ ভারতেও কিছু ওয়াই ক্রমোজম হ্যাপ্লোগ্রুপ-ওএম৯৫ বহনকারী জনগোষ্ঠী আছে।

চেঞ্চু আর কয়াদের মাতৃক্রমে মাইটোকন্ড্রিয়া-এম কত পুরোনো? জেনেটিক প্রজন্মের হিসেব বলছে ৬৮,৮০০±১২,৬০০ বৎসর। এই হিসেব সমগ্র ভারতীয়দের মাতৃক্রমের গড় হিসাবের চেয়েও কিছু বেশি আগের। এই মাতৃক্রম দেখে বলাই যেতে পারে ভারতে আসা আফ্রিকান জননীদের প্রথম প্রজন্মই হয়ত ছিলেন এদের জননী। দক্ষিণ ভারতের চেঞ্চুরা ছাড়া এই গৌরবের ভাগীদার আরেকটি জনগোষ্ঠী, ‘কয়া জনগোষ্ঠী’। চেঞ্চুদের মত পশ্চিমবাংলার ও তামিলনাড়ুর আদিবাসীদের মধ্যেও মাইটোকন্ড্রিয়া-এম আছে। অর্থাৎ তারা সবাই একই মাতৃক্রমের অংশীদার। এর মধ্যে ভারতের বর্ণ মানুষদের মধ্যে আছে পশ্চিম ইউরেশিয়ার মাইটোকন্ড্রিয়া হ্যাপ্লোগ্রুপ-এইচ.ভি, টি.জে, এন১, এক্স সামান্য হলেও আছে। এই পশ্চিম ইউরেশীয় মাতৃক্রমের হার পাঞ্জাবে ২০ শতাংশ কিন্তু বাকি ভারতে তার তিন ভাগের এক ভাগ। মাত্র ৭ শতাংশ। কিন্তু এই মাতৃক্রম চেঞ্চু কয়া বা তামিলনাড়ু ও পশ্চিমবাংলার আদিবাসীদের মধ্যে নেই।

চেঞ্চুদের মাতৃক্রম মাইটোকন্ড্রিয়া-হ্যাপ্লোগ্রুপ-এম এর শাখা হ্যাপ্লোগ্রুপ-এম২। হ্যাপ্লোগ্রুপ-এম২ এর বয়স বের হয়েছে ৭৩,০০০±২২,৯০০ বৎসর। এছাড়া সামান্য পরিমাণে হ্যাপ্লোগ্রুপ-এম৩, এম৫, এম৬ পাওয়া গেছে। তবে লক্ষনীয় হল আফ্রিকায় পাওয়া মাইটোকন্ড্রিয়া-এম১ চেঞ্চুদের মধ্যে নেই। আরেকটা উল্লেখযোগ্য দিক হল চেঞ্চুদের সাথে দক্ষিণ ভারতের আরেকটি আদিবাসী জনগোষ্ঠী ইরুলাদের সাথে মিল পাওয়া গেছে এই মাতৃজিনের কিছু বৈশিষ্ট্যের, (সেগুলো হল ১৬১৮৪-১৬২২৩-১৬২৫৬জি-১৬৩৬ স্থানিক)। প্রসঙ্গত ইরুলারাও চেহারায় অস্ট্রালয়েড। এছাড়া ৯-বি.পি জিন না থাকার দরুন ঘটা এইচ.ভি.এস-১ মিউটেশনটি আছে কয়া আর চেঞ্চুদের মধ্যে। এই মিউটেশন বলে অতীতে তারা একই জনগোষ্ঠী হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তবে হ্যাপ্লোগ্রুপ-আর চেঞ্চুদের মধ্যে মাত্র এক শতাংশ, অথচ কয়াদের মধ্যে ৩১ শতাংশ। এই মাইটোকন্ড্রিয়া-হ্যাপ্লোগ্রুপ-আর তুলনায় সামান্য নবীন হলেও আসলে প্রাচীনই, বয়স ৭৩,০০০±২০,৯০০ বৎসর।    

আমার এই আলোচনার তথ্যসূত্রের গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে যে ভারতে ৩২৫টি জাতি উপজাতির মধ্যে ১৯টি আলাদা আলাদা পিতৃক্রম আছে। ভারতের পিতৃক্রমের এই বিশাল বৈচিত্র্যের ৪টি বা তার বেশি জনগোষ্ঠী বহন করছে ৯টি আলাদা পিতৃক্রম। এটা হল ভারতের পিতৃক্রমের পাঁচ শতাংশ। এই পিতৃক্রমের বৈচিত্র্যের বেলা আদিবাসী বা বর্ণ লোকেদের মধ্যে প্রায় কোনও লক্ষণীয় জেনেটিক বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য নেই। পিতৃক্রমের দিক থেকে ভারতীয়দের মধ্যে পাঁচ শতাংশ বহন করছে হ্যাপ্লোগ্রুপ-জে২, আর১এ, আর১বি, এর মধ্যে আবার বিশেষ করে আর১এ অনেকটাই বেশি। এছাড়া হ্যাপ্লোগ্রুপ-এইচ, এল, আর২ ভারতে যথেষ্ট বেশি হারেই আছে। প্রায় এক তৃতীয়াংশ ভারতীয় এই শেষের তিনটি হ্যাপ্লোগ্রুপগুলো বহন করে। হ্যাপ্লোগ্রুপ-এইচ, ভারতের আদিবাসীদের মধ্যে এর আধিক্য সর্বাধিক। পশ্চিমবাংলা তথা পূর্ব ভারতের আদিবাসীদের পিতৃক্রমে থাকা হ্যাপ্লোগ্রুপ-ও গোটা পূর্ব-এশিয়াতেও ছড়িয়ে আছে। যদিও ভারতের শাখাটি ভিন্ন। পূর্ব-ভারতের হ্যাপ্লোগ্রুপ-ও৯৫ দক্ষিণ ভারতেও গোটা তিন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে আছে। আর আছে মিয়ানমারের লোলো এবং চিনের কারেন জনগোষ্ঠীর মধ্যে। হ্যাপ্লোগ্রুপ-এল পাওয়া যাবে দক্ষিণ মধ্য আর পশ্চিম এশিয়াতে। পাকিস্তানে আছে ১৩.৫ শতাংশ লোকের। ইউরোপে নেই বলা যেতে পারে। হ্যাপ্লোগ্রুপ-জে২ আছে ভারতের ১৩ শতাংশ লোকের মধ্যে। এই জে২ পাকিস্তান সহ মধ্যপ্রাচ্যে আছে ইউরোপেও আছে। হ্যাপ্লোগ্রুপ-আর, উত্তর ইউরোপ আর ভারতে। ভারতে প্রায় এক তৃতীয়াংশ লোকের পিতৃক্রমই হ্যাপ্লোগ্রুপ-আর বা তার দুই ভগ্নিসম হ্যাপ্লোগ্রুপ-আর১, হ্যাপ্লোগ্রুপ-আর২। এই দুটোই পাওয়া যাবে বর্ণ ভারতীয় আর আদিবাসীদের মধ্যে। হ্যাপ্লোগ্রুপ-আর১ আবার দুই ভাগ হয়েছে, হ্যাপ্লোগ্রুপ-আর১এ, হ্যাপ্লোগ্রুপ-আর১বি. এই শেষেরটির দেখা মিলবে না পশ্চিম-এশীয়, মধ্য-এশীয়, ইউরোপের চেক আর এস্তোনিয়ার লোকেদের মধ্যে।

ইউরোপ, মধ্য এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া সহ ভারতের ১৬টি পিতৃক্রমের হ্যাপ্লোগ্রুপ নিয়ে দেখা গেল চেঞ্চুদের মধ্যে একটি অভিনব ব্যাপার রয়েছে। তারা পাঁচটি ভিন্ন বর্ণ ভারতীয় জনগোষ্ঠীর সাথে অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ। তুলনায় কয়া জনগোষ্ঠীর সাথে অন্যরা প্রায় সম্পর্কহীন। চেঞ্চুদের সাথে বর্ণ ভারতীয়দের পিতৃক্রমে ১২টি বিভিন্ন মিল পাওয়া গেছে। এই মিলের আবার বেশিটাই এসেছে হ্যাপ্লোগ্রুপ-জে২, হ্যাপ্লোগ্রুপ-আর১ থেকে। এবার ৪২ জন চেঞ্চু আর ৪১ জন কয়া লোকের পিতৃক্রমে পরস্পরের মধ্যে সংযোগকারী হ্যাপ্লোটাইপ আছে মাত্র একটি। চেঞ্চুদের মধ্যে পিতৃক্রমের বৈচিত্রের হার মাত্র ০.৫৬। অথচ কয়াদের মধ্যে তাদের আটটি পিতৃক্রম নিয়ে এই হার ০.৮ ।

চেঞ্চুদের পিতৃক্রমে আছে ওয়াই ক্রমোজম হ্যাপ্লোগ্রুপ-জে, এইচ, আর১এ। এই আর১এ হ্যাপ্লোগ্রুপকেই ভারতে ইন্দো-ইউরোপীয় (বা আর্য) পিতৃক্রম বলে মান্যতা দেওয়া হয়। যেহেতু আর১.এ. জিনের সঠিক উৎসস্থান এখনো প্রবল ভাবে বিতর্কিত অথচ প্রস্তরযুগীয় চেঞ্চুদের রয়েছে তাই এই তথ্য ধরে অনেকে দাবী করেন হ্যাপ্লোগ্রুপ-আর১এ উৎস ভারত। ঠিক? না একটি ফাঁক রয়েছে। শুধু হ্যাপ্লোগ্রুপের নাম ধরে এগুলে হিসেবে গোলমাল হবেই। আমাদের লক্ষ্য রাখতে একই হ্যপ্লোগ্রুপের মধ্যেও জিনের কিছু কিছু বিশেষ পরিবর্তন আর সময়। তার সাথে গোটা প্রেক্ষাপটকে একত্রে ভাবতে হবে। যদি চেঞ্চুদের হ্যাপ্লোগ্রুপ-আর১.এর উৎস ভাবা হয় তবে একই সাথে তাদের হ্যাপ্লোগ্রুপ-জে, এবং হ্যাপ্লোগ্রুপ-এইচ-এর উৎসও ভাবতে হয়। বাস্তবে যা অসম্ভব।

মাইটোকন্ড্রিয়া হ্যাপ্লোগ্রুপ-এল৩ ভারতে নেই। ভাবা যেতে পারে, আফ্রিকা থেকে বের হবার সময়ই হ্যাপ্লোগ্রুপ-এল৩ এর থেকে সৃষ্ট হ্যাপ্লোগ্রুপ-এম, হ্যাপ্লোগ্রুপ-এন সহই প্রথম আফ্রিকান জননীরা ভারতে প্রবেশ করেছিল। হ্যাপ্লোগ্রুপ-এন থেকে সৃষ্ট হয় হ্যাপ্লোগ্রুপ-আর। সেটা ভারতে সৃষ্টি হতে পারে নতুবা ভারতে আসার আগেই পশ্চিম এশিয়াতেই সৃষ্টি হয়েছিল। নিশ্চিত ভাবে পশ্চিম এশিয়াতে সৃষ্টি হয় হ্যাপ্লোগ্রুপ-এইচ.ভি, হ্যাপ্লোগ্রুপ-টি.জে এবং হ্যাপ্লোগ্রুপ-ইউ। হ্যপ্লোগ্রুপ-ইউ পরে ঢুকেছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে উত্তর পশ্চিম ভারতে। তবে পরে হলেও সেটা সম্ভবত প্রস্তরযুগের শেষ ভাগের শেষ দিকেই দিকেই। ভারতে ঢুকে সীমাবদ্ধ থেকে গেছে ভারতের উত্তর পশ্চিমের বর্ণ ভারতীয় ও আদিবাসীদের মধ্যে। দক্ষিণ এবং পূর্ব ভারতে খুব সামান্যই বিস্তার লাভ করেছে।

পাপুয়া সহ গোটা পূর্ব-এশিয়ার তুলনায় ভারতের হ্যাপ্লোগ্রুপ-এম তার সব শাখার বিভিন্নতায় ও প্রাচীনতায় এগিয়ে। এর থেকে ধরা যায় আফ্রিকা থেকে ভারতে আসা প্রথম জননীরা কখনো পুরো লুপ্ত হয়নি, বা অন্য কোনও মাতৃক্রম তাকে প্রতিস্থাপন করতে পারেনি। পিতৃক্রমের কথায় দেখবো তিনটি প্রধান ইউরেশিয়ান হ্যাপ্লোগ্রুপ-সি, এফ, কে, নেই হয়ে গেছে। হ্যাপ্লোগ্রুপ-এফ এবং হ্যাপ্লোগ্রুপ-কে থেকে সৃষ্ট হ্যাপ্লোগ্রুপ-এইচ, এল, আর২। এর সব কটাই ভারতে আছে।

সবমিলিয়ে যেটা অনুমান করা হয় তা হল প্রথমদিককার মাতৃ হ্যাপ্লোগ্রুপ-এম, এন, আর এবং পিতৃ হ্যাপ্লোগ্রুপ-সি, ডি, এফ, কে, এরা আফ্রিকা থেকে পশ্চিম এশিয়া আর ইউরোপের দিকে যায়। তাদের থেকে হ্যাপ্লোগ্রুপ-এইচ.ভি, হ্যাপ্লোগ্রুপ-টি.জে পশ্চিম এশিয়াতেই থেকে গেলেও পরে বিভিন্ন ছোটো ছোটো পরিযানে তাদের কিছু কিছু ভারতেও প্রবেশ করে।

হ্যাপ্লোগ্রুপ-আর২ ভারতে পাকিস্তানে ইরান আর মধ্য-এশিয়ার দক্ষিণাংশে আছে। হ্যাপল্লোগ্রুপ-আর১ সম্ভবত পশ্চিম এশিয়ার দিকে থেকেই ভারতে প্রবেশ করে। একই ভাবে পশ্চিম এশিয়া থেকে হ্যাপ্লোগ্রুপ-জে২ উত্তর পশ্চিম ভারতে আসে। একই সাথে পাঞ্জাব এলাকায় আসে হ্যাপ্লগ্রুপ-আর১এ। এই ঘটনা খুব আগের নয়। হয়তো নিওলিথিক হরপ্পা সভ্যতার কালে শুরু হয়েছিল এই ঘটনাগুলো। তারাই সাথে নিয়ে আসে মাতৃ হ্যপ্লোগ্রুপ-ইউ। তবে এরই সাথে পরবর্তী ঐতিহাসিক কালের পারসিক, শক, হূণ, কূষাণদের ক্রমাগত ভারত প্রবেশের ঘটনাবলিও আমাদের মাথায় রাখতে হবে। তুলনায় গ্রিকদের জিনের তথ্য যতটা পাওয়া গেছে তার থেকে বোঝা সহজ যে তাদের প্রভাব খুবই সীমিত ছিল।

তাহলে সার্বিক ভাবে বর্ণ ভারতীয়দের সাথে চেঞ্চুদের জেনেটিক সম্পর্ক নিয়ে যে ছবি আমরা পাই তা বলে চেঞ্চুদের মাতৃক্রম প্রস্তরযুগে যেমন ছিল তেমনই আছে। প্রতিস্থাপিত হয় নি। পিতৃক্রমে পুরোটাই প্রতিস্থাপিত হয়েছে। এখানেই সম্ভাবনা থাকে চেঞ্চুদের পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার উৎসের। এবং তার সাথে বিজ্ঞানীদের খানিক অভিনব ভাবনাটির উৎস। যা বলে ভারতে পিতৃক্রমগুলো প্রবেশ করেছে ক্রমাগত পুরুষ প্রধান পরিযানের মাধ্যমে। আর সেই পুরুষ প্রধান পরিযানে নারী জুগিয়ে গেছে তথাকথিত আদিবাসী সমাজ। উল্টোদিকে পুরুষপ্রধান পরিযায়ীরা কখনো তাদের কন্যা সন্তানকে আদিবাসী পুরুষের সাথে ঘর করার অনুমতি দেয়নি। ফলে দ্রুততর হয়েছে পিতৃক্রমের প্রতিস্থাপন।

চিত্র কৃতজ্ঞতা

চিত্র-১: সারভাইভাল ইন্টারন্যশনাল

চিত্র-৩: শিডিউল কাস্ট অ্যান্ড শিডিউল ট্রাইব ট্রেনিং ইন্সটিটিউট, ভুবনেশ্বর

চিত্র-৪: ইন্ডিজেনাস পিপলস লিটেরেচার

তথ্যসূত্র

  1. T. Kivisild, S. Rootsi, M. Metspalu, S. Mastana, K. Kaldma, J. Parik, E. Metspalu, M. Adojaan, H.V. Tolk, V. Stepanov, M. Golge, E. Usanga, S.S. Papiha, C. Cinnioglu, R. King, L. Cavalli-Sforza, P.A. Underhil, R. Villems, “The Genetic Heritage of the Earliest Settlers Persists Both in Indian Tribals and Caste Populations”; American Society of Human Genetics, Sept 2003.
  •  “The Chenchu of Andhra Pradesh”; Tribal Tribune.
  • A.B. Ota, A. Mall, “CHENCHU (A Nomadic Tribe of Odisha)”; Schedule Castes and Schedule Tribes Research and Training Institute, Bhubaneswar. 2016.
  • Sayed Abdul Sameer, “Incredible Cultural Heritage of Chenchu Tribe: A Case study in Armabad Mandal, Mehbubnagar District”; Conference paper Oct 2014, Research Gate.
  • “An Open Letter from the Chenchu tribe of Amrabad Tiger Reserve”; Survival.

মন্তব্য তালিকা - “আদিম জনজাতি চেঞ্চুদের কথা”

  1. একটা কথা সব সময় মাথায় আসে, আপনি ক্রমাগত ভেবে যাচ্ছেন নিরলসভাবে যার ফল হিসেবে আমরা অনবরত আপডেটেড হতে পারছি।
    খুব সুন্দর ব্যাখ্যা অল্প লেখার মাধ্যমে, অনেক প্রশ্নের উত্তর আছে। আমি তো এই লেখনীর ঝর্ণা ধারায় অনেক কিছু প্রয়োজনীয় উত্তর পেয়ে যাই। অদ্ভুত ভাবে কিছু লোকাচারের সাদৃশ্য পাওয়া যাচ্ছে।
    বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন

    1. ধন্যবাদ। এই মিল পাওয়াটাই তো স্বাভাবিক। আসলে পুরোটাই মিলে যাবার কথা ছিলো কিন্তু প্রভাবশালী পড়শিদের সাংস্কৃতিক উপাদান জুড়ে ভিন্ন চেহারা নিয়ে ফেলে।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।