সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাসদের অস্থিমজ্জায় নির্মিত আধুনিক সভ্যতার সৌধ

কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাসদের অস্থিমজ্জায় নির্মিত আধুনিক সভ্যতার সৌধ

সুপ্রিয় লাহিড়ী

এপ্রিল ২৭, ২০২২ ৬৭

মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগে উত্তরণের ইতিহাস থেকে কিভাবে আফ্রিকার নাম মুছে দেওয়া হয়েছে, তার উপরে বিস্তারিত ভাবে লিখেছেন, হাওয়ার্ড ডব্লিউ ফ্রেঞ্চ, দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায়। এই প্রতিবেদন ফ্রেঞ্চের লেখাটির অনুসারী।

আজকের এই মানবসভ্যতা, যাকে আমরা ‘আধুনিক’ ভেবে শ্লাঘা অনুভব করি, এখনকার ইতিহাস অনুযায়ী তার সমস্ত কৃতিত্ব, ইউরোপীয় দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক ও চিন্তাবিদদের দেওয়া হয়। তা যে কতদূর মিথ্যা এবং কিভাবে কালো আফ্রিকার জঠর থেকে উচ্ছ্রিত অস্থি, রক্ত স্বেদের বিনিময়ে আজকের আধুনিক পৃথিবীর বুনিয়াদ গড়ে উঠেছে তার ওপর থেকে যবনিকা তুলেছেন এই গবেষক। না, এটা কোনো ‘কমিউনিস্ট’ প্রচার নয়। অন্ধকার ইতিহাসের ওপরে নতুন আলোকপাত।

যেকোন ঐতিহাসিক সন্ধানের শুরুর জায়গাটাই যদি ভুল হয়, তাহলে সে সন্ধানও ব্যর্থ ও ভ্রান্ত হতে বাধ্য। আধুনিক মানবসভ্যতার ইতিহাসের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনই হয়েছে। মোটামুটি ভাবে মধ্যযুগের অন্ধকার থেকে আধুনিকতায় পদার্পণের কৃতিত্ব সবটাই দেওয়া হয়, পনের শতক থেকে ইউরোপে বিদ্যা ও জ্ঞানের চর্চা, যুক্তিবাদের প্রচলন, নানারকম আবিষ্কার ও নেহাতই কাকতালীয় ভাবে দুই আমেরিকান মহাদেশের আবিষ্কারের ওপরে।

এছাড়াও এইসব ইউরোপীয় ঐতিহাসিকেরা এও দাবী করেন যে  ইউরোপীয় চরিত্রের অনন্য কিছু গুণ, যেমন বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসা, কঠোর কর্মনিষ্ঠা, ব্যক্তিত্ববাদ আর অদম্য উদ্যোগই এই উত্তরণের জন্য দায়ী।
সেই সময়ে ইউরোপ থেকে ফার্ডিন্যান্ড ম্যাজেল্লান, ভাস্কো ডা গামা বা কলম্বাসের মত নাবিকদের নৌ-অভিযান ও বিভিন্ন নতুন দেশের আবিষ্কার, সভ্যতার এই আধুনিকীকরণে অবশ্যই সাহায্য করেছে – কিন্তু সে প্রসঙ্গে, লেখিকা, মারী আরানা কি বলেছেন সেটাও মনে রাখতে হবে। তিনি বলেছেন, কলম্বাস যখন পশ্চিম দিকে নৌকো ভাসালেন তখন তিনি নানা রকম দত্যি-দানো, এক চোখওয়ালা সাইক্লপ্স, কুকুরের মুখওয়ালা মানুষ, মাথা দিয়ে যারা হাঁটে আর পা দিয়ে কথা বলে, এইসব উদ্ভট জীবজন্তুর অস্তিত্বে বিশ্বাসী এক মধ্যযুগীয় ব্যক্তি ছিলেন। আর সেই কলম্বাস যখন আমেরিকার মাটিতে প্রথম পা রাখলেন, তিনি শুধু এক নতুন জগতেই নয়, এক নতুন যুগে পদার্পণ করলেন। জনমানসে এই তথাকথিত সব আবিষ্কার আর উদ্ভাবনের গল্প অনেক প্রভাব ফেললেও, খুঁটিয়ে দেখলে দেখা যাবে, অন্ধকার যুগ থেকে আধুনিক যুগে আসার কাহিনিতে আফ্রিকার অবদান কত গুরুত্বপূর্ণ! আর কীভাবে পুরুষানুক্রমে ভুল ইতিহাস, লেখা, পড়া ও শেখানো হচ্ছে।

আমরা সবাই পড়ে ও জেনে এসেছি, যে পনের শতক থেকে ইউরোপীয় আবিষ্কারের এই ধারার সূত্রপাত, এশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টার মাধ্যমে। আসলে কিন্তু তা নয়। সে সময়ের পশ্চিম আফ্রিকার অনেক অকল্পনীয় সমৃদ্ধশালী সব দেশের কথা ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে বহু শতাব্দী ধরেই প্রচলিত ছিল। তাই ইউরোপ, প্ৰথমে এশিয়া বা আমেরিকায় নয়, আফ্রিকায় পদার্পণ করে। আইবেরিয়ার দক্ষ নাবিকদের উন্মুক্ত মহাসাগরে নৌচালনার হাতেখড়ি এশিয়া-যাত্রায় নয়, পশ্চিম আফ্রিকার উপকূলে হয়েছিল। দিগদর্শন, মানচিত্র তৈরি, উন্নত জাহাজের নক্সা ও জাহাজ তৈরি, স্পেন ও পর্তুগালের নাবিকেরা আফ্রিকা পাড়ি দেবার পথেই শেখে। বহু বছর ধরে আফ্রিকার পথে যাতায়াত করেই কলম্বাস আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দেবার আত্মবিশ্বাস অর্জন করেছিলেন। ইতালির জেনোয়া নগরের বাসিন্দা কলম্বাস, স্পেনের হয়ে আমেরিকা যাত্রা করার বহু আগেই আজকের দিনের ঘানায়, এলমিনা নামে এক বন্দরে আসেন। ইউরোপের প্ৰথম বিদেশী সামরিক ঘাঁটি স্থাপিত হয় এই এলমিনাতেই।

১৪৭১ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগীজরা ঘানায় সোনার খনির সন্ধান পায়। সেই সোনার খনিকে আর সোনার ব্যবসাকে সুরক্ষিত করার জন্যে ১৪৮২ সালে এলমিনার দূর্গ তৈরি হয়। ঘানা থেকে আনা এই সোনাই তখনকার পর্তুগালের বিভিন্ন অভিযান, এমনকি ভাস্কো ডা গামার ভারত অভিযানের ব্যয়ভার বহন করত। আর নতুন খুঁজে পাওয়া এই স্বর্ণভান্ডারই ইউরোপের এক ছোট দুর্বল দেশ, পর্তুগালকে পনের ও ষোল শতকের আন্তর্জাতিক ক্ষমতার প্ৰথম সারিতে তুলে আনে ও পৃথিবীর ইতিহাসকে পাল্টে দেয়। আরেক পর্তুগীজ নাবিক, বার্থলমিউ দিয়াজ আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপকে প্রদক্ষিণ করে ভারত মহাসাগরে এসে উপস্থিত হন। সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপ থেকে এশিয়া আসার রাস্তা খুলে যায়। ১৪৭১-এ আফ্রিকার এলমিনাতে ইউরোপীয়দের প্ৰথম বিদেশী সামরিক ঘাঁটি স্থাপন হয় ও ১৪৯৮ সালে ভাস্কো ডা গামা কালিকটে এসে নামেন। মধ্যবর্তী প্রায় তিরিশ বছর সম্বন্ধে আজকের ইতিহাস অদ্ভুতভাবে নীরব।

এই সময়েই, আজকে আমরা যাকে সাব-সাহারান আফ্রিকা বলে জানি, তার আর ইউরোপের মধ্যে গভীর যোগাযোগ স্থাপিত হয়, আর সেই যোগাযোগই মধ্যযুগীয় পৃথিবীর আধুনিক যুগে পদার্পণের প্ৰথম সোপান।

এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তিরিশ বছরের ইতিহাসের উল্লেখ না করাই, আধুনিক সভ্যতার উত্থানে আফ্রিকার অবদানকে মুছে ফেলার একমাত্র উদাহরণ নয়। সমস্ত তথ্য কিন্তু চোখের সামনেই আছে, কিন্তু সুকৌশলে তথাকথিত ঐতিহাসিকরা, সেসব তথ্যকে একে অন্যের থেকে বিচ্ছিন্ন করে আলাদা আলাদা কুঠুরিতে ঢুকিয়ে রেখেছেন, সেসব তথ্য প্রমাণকে অন্ধকার সব কোণায় ঠেলে দিয়েছেন। বিশ্বের ইতিহাসে মধ্যযুগের অন্ধকার থেকে আধুনিক যুগের আলোয় পদার্পণে আফ্রিকার ভূমিকাকে সামনে আনার জন্য আমাদের সেইসব তথ্যসূত্রকে জোড়া দিতে হবে, সেইসব কাল-কুঠুরির মধ্যে উঁকি মারতে হবে।

পঞ্চদশ শতাব্দীর শুরু থেকে ইউরোপীয় সভ্যতা যে অর্থ এবং ক্ষমতায় এশিয়ান ও ইসলামিক সভ্যতাগুলোকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেলো, ককেশিয়ান জনগোষ্ঠীর কোন বিশেষ জাতিগত বৈশিষ্ট্য বা গুণ তার জন্যে দায়ী নয়। আফ্রিকার সঙ্গে নিবিড় আর্থিক ও রাজনৈতিক সংযোগই ছিল এই অগ্রগতির এঞ্জিন। এক কথায় বলতে গেলে কয়েক শতাব্দী ব্যাপী, অকল্পনীয় বিশালত্বের আফ্রিকান দাসব্যবসাই এই চোখ ধাঁধানো অগ্রগতির প্রধান স্তম্ভ। সাগরপার থেকে আনা লক্ষ লক্ষ দাসেরা দুই আমেরিকার চিনি, তামাক, তুলো আর অন্যান্য অর্থকরী ফসল ফলাতো, তারাই ছিল এর হোতা।

সময়ের সিঁড়ি ধরে পেছনে হাঁটতে থাকলে আমরা গিয়ে পৌঁছবো পঞ্চদশ শতকের সেই তিনটি দশকে, যখন পর্তুগাল নামের ছোট্ট ইউরোপিয়ান দেশটি সোনার খোঁজে পশ্চিম আফ্রিকার সঙ্গে যোগাযোগ ও ব্যবসা করে ফুলে ফেঁপে উঠেছে। পর্তুগালে এর ফলে অভাবনীয় মাত্রায় নগরায়ণ শুরু হলো, নতুন নতুন পেশার উদ্ভব হলো এবং এক নব্য জাতীয়তাবাদের জন্ম হলো। সাগরপারের নতুন নতুন দেশে পাড়ি দেওয়া এবং সেখানে পর্তুগিজ উপনিবেশ গড়ে তোলা সেই জাতীয়তাবাদের এক প্রধান লক্ষণ। ক্রমে ইউরোপের অন্যান্য দেশও পর্তুগালের পদাঙ্ক অনুসরণ করে এবং ব্রিটেন, স্পেন, হল্যান্ড, ফ্রান্স এমনকি খুদে বেলজিয়ামও পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে উপনিবেশ স্থাপন করে।

১৪০০ শতক থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রায় একশো বছর পর্তুগিজদের বহির্জগতের সঙ্গে যোগাযোগ ছিলো, মূলত আফ্রিকাতেই। আর এ সময়েই তাদের ধ্যান ধারণায় এক আমূল পরিবর্তন ঘটে। তারা বুঝলো যে, নতুন নতুন জায়গা বা দেশ আবিষ্কার শুধু তার নতুনত্বের জন্যই মূল্যবান, তা নয়। বলা যায়, আবিষ্কার একটা মানসিকতা হয়ে দাঁড়ালো। এর সঙ্গে ইউরোপের মধ্যযুগের মানসিকতার তুলনা করলে বিষয়টা আরো পরিষ্কার হবে। মধ্যযুগের ধ্যানধারণা প্রায় পুরোটাই চার্চের অনুসারী ছিল। চার্চের মতে এই বিশ্ব এবং মহাপৃথিবীতে কোথায়, কী এবং কেমন ভাবে আছে সবই মানুষের জানা এবং সেই জ্ঞানের একমাত্র উৎস হলো ধর্মগ্রন্থগুলো। তার বাইরে নতুন কিছু খোঁজা শুধু বোকামি বা পাগলামি নয়, চূড়ান্ত হঠকারিতা। গ্যালিলিও, জিওরদানো ব্রুনো, এমনকি যে সব অনুসন্ধিৎসু গবেষকরা মানুষের শরীরের গঠনের ওপরে গ্যালেনের আজগুবি পাঠের বিরোধিতা করেছিলেন, তাঁদের ভাগ্যে, নানারকম নির্যাতন থেকে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত জুটেছিল।

পর্তুগিজদের এই নবলব্ধ আবিষ্কার স্পৃহা সেই অচলায়তনের ওপর জোরালো আঘাত হানলো। যদিও এর পেছনে আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গদের ওপরে কয়েক’শ বছরব্যাপী নৃশংস অত্যাচার এবং অমানুষিক শোষণের ইতিহাস রয়েছে, তবুও এটা মানতে হবে যে এই মানসিকতার পরিবর্তনের মাধ্যমেই আধুনিক যুগের সূচনা হলো। নিয়তির অমোঘ অঙ্গুলিহেলনে ইউরোপ এবং সাব-সাহারান আফ্রিকার মধ্যে এই যে যোগাযোগ, তা শুধু এই দুই মহাদেশেই নয়, সারা বিশ্বে সভ্যতার ইতিহাসের গতিপথকে এমনভাবে পরিবর্তন করে দিল যে আমরা সহজেই ইতিহাসকে দু ভাগে ভাগ করে দেখতে পারি, এই সংযোগের ‘আগে’ ও ‘পরে’।

ষোড়শ শতকের ইউরোপের মানুষও কিন্তু এ কথা জানতো। ১৫৩০ খ্রিস্টাব্দে, অর্থাৎ পর্তুগিজদের সঙ্গে এশিয়া, বিশেষত ভারতের ইতিহাসখ্যাত মশলা ব্যবসা শুরু হয়ে যাবার অনেক দিন বাদেও, জোয়াও ডি ব্যারোস নামে পর্তুগালের এক উপদেষ্টা লিখছেন, “আমাদের দেশে, (পর্তুগালে) আদায় করা সবরকম ট্যাক্সকে একত্র করলেও তা গায়ানার সঙ্গে ব্যবসা করে যা লাভ হয়, তার সমান হবেনা!” ব্যারোসের আফ্রিকার সঙ্গে ব্যবসায়ে লাভের এই স্বীকৃতি যেমন উল্লেখযোগ্য, তার থেকে আরো বেশি উল্লেখযোগ্য বোধহয়, তাঁর পুরো সংবাদে কোথাও দাসব্যবসার উল্লেখ না থাকা। মনে হয়, তখনই সারা ইউরোপে মনুষ্য জাতির একটা বিরাট অংশকে পশুদের পর্যায়ে গণ্য করা শুরু হয়ে গেছে এবং তা চলবে আরো কয়েকশ বছর।

ব্যারোসের সময় দাসব্যবসায় পর্তুগাল ইউরোপের সব দেশের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিল এবং এই ব্যবসা সোনার খনির চেয়েও লাভজনক হয়ে উঠছিল। ইতিমধ্যেই পৃথিবীর অন্য প্রান্তে দাসশ্রমিক নির্ভর খামার ব্যবস্থার এক নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থান পত্তন হয়ে গেছে। পরবর্তী কয়েক’শ বছর সময়ে এই অর্থব্যবস্থা, পুরোনো বিশ্বের সমস্ত সোনা, সিল্ক আর মশলা ব্যবসায়ের মিলিত সম্পদের বহু বহু গুণ ধনরাশি উৎপাদন করবে। তিনশ বছর পরে ঊনবিংশ শতাব্দীর এক প্রধান ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ মালাচি পোস্টলেথওয়েত দাস অর্থনীতি থেকে পাওয়া অর্থ এবং করকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের আর্থিক ক্ষমতার প্রধান স্তম্ভ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষায়,  “ব্রিটিশ সাম্রাজ্য হলো এক মহাসৌধ, যা নির্মিত হয়েছে আমেরিকান বাণিজ্য এবং নৌশক্তির বলে, আর তা দাঁড়িয়ে আছে আফ্রিকান শ্রমের ভিত্তির ওপরে।”

প্রায় একই সময়ে, বিখ্যাত ফরাসী চিন্তাবিদ, গিয়োম তোমা ফ্রাসোঁয়া দে রানো (Guillaume- Thomas- Francois- de Ranyal) বলেন, “দাসত্বের শৃঙ্খলে বাঁধা আফ্রিকান দাসদের শ্রমই আজকের পৃথিবীর, বা সভ্যতার অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি।” রবিনসন ক্রুসোর লেখক ড্যানিয়েল ডিফো, যিনি লেখক ছাড়াও একজন ব্যবসায়ী এবং গুপ্তচরও ছিলেন, আরো স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “আফ্রিকান বাণিজ্য থাকবে না তো ক্রীতদাস থাকবে না, ক্রীতদাস থাকবে না তো চিনি থাকবে না, আদা থাকবে না, সুতো থাকবে না, ইন্ডিগো থাকবে না, এককথায় মহাদেশই থাকবে না, কোন অর্থনীতিই থাকবে না।”

পোস্টলেথওয়েত, রনো এবং ডিফো ঠিকই বলেছিলেন, যদিও তাঁরা বিষয়টার তাৎপর্য সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে পারেননি। পৃথিবীর যে কোন অংশের তুলনায় আফ্রিকাই গত চার পাঁচ শতাব্দী ব্যাপী আধুনিকীকরণের ভরকেন্দ্র ছিল। আফ্রিকা থেকে বন্য জন্তুদের মত ধরে আনা দাসদের ছাড়া আমেরিকার উন্নয়ন এবং পশ্চিমা সভ্যতার অগ্রগতির কোন সম্ভাবনাই ছিল না। দাসশ্রমের ওপরে সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল, তামাক, কফি, কোকো, ইন্ডিগো, চাল এবং অবশ্যই চিনির মত বিভিন্ন অর্থকরী ফসলের উৎপাদন, বিশ্বব্যাপী বন্টন ও বাণিজ্যই প্ৰথম সত্যিকারের পৃথিবীজোড়া ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির জন্ম দেয়। কৃষ্ণাঙ্গ দাস উৎপাদিত চিনিই আজ আমরা যাকে শিল্পায়ন বা industrialisation বলি, তাকে গতি দিল। আগে যা মহার্ঘ ছিল সেই চিনি সহজলভ্য হয়ে যাওয়ায়, ইউরোপ এবং আমেরিকায় মানুষের খাদ্যাভ্যাস পালটালো দ্রুতগতিতে। সাধারণ পুষ্টির মান উন্নত হলো। মানুষের অর্থাৎ শ্রমিকদের কার্যক্ষমতা বাড়লো দ্রুতহারে এবং এভাবে ক্রীতদাস উৎপাদিত চিনি, ইউরোপের আর্থসামাজিক অবস্থায় এক বিপ্লব ঘটালো। চিনির পায়ে পায়ে এলো আমেরিকার দক্ষিণে দাসখামারে উৎপন্ন তুলো এবং বাজারে অঢেল তুলোর উপস্থিতি আনুষ্ঠানিকভাবে শিল্পায়নের সূচনা করলো। বলা যায়- আধুনিক সভ্যতায় ভোগবাদের দ্বিতীয় ঢেউ। মানবসভ্যতার ইতিহাসে এই প্রথম নানারকম এবং প্রচুর পরিমাণে পরিধেয় কাপড় জামা সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে এলো।

১৭৮৩ সালের আমেরিকান স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং ১৮৬১ সালের গৃহযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে আমেরিকার দক্ষিণের তুলো উৎপাদনকারী রাজ্যগুলোতে দাসব্যবসার কী অপরিসীম গুরুত্ব ছিল, একটা তথ্য দিলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে। এই সময়ে দক্ষিণের এই দাসব্যবসার আর্থিক মূল্য সারা দেশে উৎপন্ন বিভিন্ন ফসল, সমস্ত কারখানা, রেলওয়ে ইত্যাদির মোট মূল্যের বেশি ছিল! আফ্রিকান দাসব্যবসা নিয়ন্ত্রণের অধিকার নিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন শক্তিগুলির মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহ লেগেই থাকতো এবং আজকেও এইসব দেশের পারস্পরিক রাজনৈতিক সমীকরণের মধ্যে তার ছায়া দেখতে পাওয়া যায়। পশ্চিম আফ্রিকার উপকূলে স্পেন ও পর্তুগাল বহু রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ লড়েছে। সতের শতকে হল্যান্ড, পর্তুগাল এবং স্পেন একজোট হয়ে, আজকের কঙ্গো এবং এঙ্গোলায় ছোটোখাটো বিশ্বযুদ্ধ চালিয়েছিল- কারণ এই অঞ্চল সবচেয়ে উন্নত মানের ক্রীতদাসের যোগান দিত। দাসখামারে উৎপন্ন চিনির সবচেয়ে বড় উৎপাদক ছিল আটলান্টিক মহাসাগরের ওপারে ব্রাজিল। এই যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল সেখানেও- এবং তার ফলশ্রুতি হিসেবে সে দেশের মালিকানার হাতবদল হয় বেশ কয়েকবার। এরই কিছু পরে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের অধিকার নিয়ে ব্রিটেন ও স্পেনের মধ্যে যুদ্ধ হয়।

সাগরপারের এই শক্তিধর দেশগুলো কেন নামতো এমন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে? বার্বাডোজ নামের ছোট্ট দ্বীপটার দিকে তাকালেই বোঝা যাবে। ১৬৩০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ ব্রিটেন বার্বাডোজে পর্তুগিজ সাও টোমে কলোনির অনুকরণে দাসশ্রম ব্যবস্থা চালু করে। তিন দশকের মধ্যে বার্বাডোজের চিনি রপ্তানির আয় সমস্ত ল্যাটিন আমেরিকার ধাতু রপ্তানির থেকে বেশি হয়ে দাঁড়ায়। জমি আর ক্রীতদাস লোলুপ ইউরোপীয় দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে এই যুদ্ধবিগ্রহ ছাড়াও ক্রমশই আরেকটা নতুন প্রবণতা দেখা দিচ্ছিল। তা হলো নানাভাবে কৃষ্ণাঙ্গদের ওপরে আরো বিধিনিষেধ, আরো অত্যাচার করার উপায় আবিষ্কার। তার একটা উপায় অবশ্যই নানারকম আসুরিক আইন প্রণয়ন করে কালো মানুষগুলোকে আরো পদানত করে রাখার চেষ্টা। কালো মানুষদের দিয়েই অন্যান্য কৃষ্ণাঙ্গদের ধরে দাসে পরিণত করা, দাসদের দিয়ে তাদেরই ওপর অত্যাচার করানো এবং দুই শ্বেতাঙ্গ দেশের মধ্যে যুদ্ধে কৃষ্ণাঙ্গদের ব্যবহার করা, ক্রমশই জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল।

আফ্রিকার মানুষের ওপরে পশ্চিমা সভ্যতার অগ্রগতির এই প্রক্রিয়ার যে কুপ্রভাব পড়েছে, হয়তো কোনদিনই তার সঠিক মূল্যায়ন হবে না। খুব রক্ষণশীল অনুমান হিসেবেও কম বেশি এক কোটি কুড়ি লক্ষ আফ্রিকাবাসীকে দাসে পরিণত করা হয়। আর এই সোজা হিসেবের বাঁকা দিকটা, যেটা কখনোই দিনের আলোয় আসে না, তা হলো আরো প্রায় ৬০ লক্ষ কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ, দাস শিকারের সময় মারা যায়। এ ছাড়াও আফ্রিকান মহাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ধরা কৃষ্ণাঙ্গ মানুষগুলোকে ‘শ ‘শ মাইল হাঁটিয়ে সমুদ্র বন্দরে আনার সময়ে ও দাস বহনকারী জাহাজে ওঠার আগে ব্যারাকুন নামের যে খোঁয়াড়ে বন্দী রাখা হতো, সেখানে প্রাণ হারাতো ৫% থেকে ৪০% কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ। জাহাজের খোলের মধ্যে গবাদি পশুর চেয়েও খারাপ অবস্থায় গাদাগাদি করা অসহায় মানুষগুলোর আরও ১০% মারা যেত, ওই দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার সময়ে। যদি আমরা মনে রাখি যে উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে পুরো আফ্রিকার জনসংখ্যা ছিল দশ কোটির কাছাকাছি, তাহলে এই দাস ব্যবসা যে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গণহত্যাগুলোর মধ্যে একটা ছিল, তা খানিকটা বোঝা যাবে।

কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর এই আসুরিক অত্যাচারের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় প্রতিরোধ ও মুক্তিযুদ্ধও গড়ে উঠছিল। ব্রাজিল, জ্যামাইকা, ফ্লোরিডা ইত্যাদি জায়গায়, পালিয়ে যাওয়া ক্রীতদাসরা, নিজেদের ফ্রি সোসাইটি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল। ক্রীতদাস প্রসঙ্গে প্রায়ই শোনা যায়, যে কালো মানুষরা নিজেরাই অন্য স্বজাতিদের ধরে শ্বেতাঙ্গদের কাছে  বিক্রি করতো। কিন্তু একথা অনেকেই জানেন না যে কঙ্গো, বেনিন সহ আফ্রিকার বহু জায়গায় আফ্রিকানরা শেষদিন পর্যন্ত দাস ব্যবসা বন্ধ করার জন্যে প্রাণপণ লড়াই করেছে। দাসবহনকারী জাহাজে বহু বিদ্রোহ হয়েছে এবং অনেক হতভাগ্য কৃষ্ণাঙ্গ, দাস হয়ে বেঁচে থাকার নারকীয় জীবনের থেকে আত্মহত্যা করে মুক্তির পথ খুঁজে নিয়েছেন।

দুই আমেরিকার দাসখামারে একজন ক্রীতদাসের গড়পড়তা আয়ু সাত বছরের বেশি হতো না। ১৭৫১ সালে, এন্টিগুয়ার এক খামার মালিকের কথায়, “ব্যবসায়ে লাভ করার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো যে, যতদিন বেঁচে আছে, দাসগুলোকে সামান্যতম খেতে পরতে দিয়ে খাটিয়ে খাটিয়ে মেরে ফেলা- যাতে যখন বুড়ো হয়ে নিষ্কর্মা হয়ে যাবে তখন আর সে বোঝা বইতে না হয়। তারপর নতুন ক্রীতদাস কিনে নিলেই হলো।

লেখক বলছেন: ‘আমি ছাত্রজীবনেই আফ্রিকার সংস্পর্শে এসেছিলাম এবং গ্র্যাজুয়েশনের পরে কয়েক বছর আফ্রিকাতে থাকার সময় সাংবাদিকতায় হাত পাকাইআমার স্ত্রী আইভরি কোস্টের মানুষ কিন্তু আসলে তাঁরা ঘানার যে অঞ্চলে পর্তুগীজরা একশ বছর খোঁজাখুঁজির পরে প্ৰথম সোনা পায়, সেখানকার মানুষ। ১৯৮৬ সালে আমি নিউ ইয়র্ক টাইমসে যোগ দিই এবং ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে প্রচুর ঘোরাঘুরি করার সুযোগ হয়। সেই সময় থেকে, আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের স্বেদ রক্তের সঙ্গে আধুনিক পৃথিবীর বিবর্তনের কিছু যোগসূত্র আমার চোখে পড়তে থাকে। বললে অবিশ্বাস্য লাগবে যে সতের বা আঠারো শতাব্দীতে বার্বাডোজ বা জ্যামাইকার মত ছোট ছোট দ্বীপ ব্রিটেনের পুরো আমেরিকান উপনিবেশের থেকে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ছিল। আর হাইতি! এখানেই তো পৃথিবীর প্রথম সম্পূর্ণ ভাবে সফল দাসবিদ্রোহ ঘটে- আর হাইতি ফ্রান্সের থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে।

এইসব ভ্রমণের কিছু কিছু ঘটনা ও স্মৃতি অমূল্য। একবার দমিনিকান রিপাবলিকের সমুদ্রে হাঁটু জলে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম একটি প্রত্নতত্ত্ব দল কলম্বাসের অভিযানের একটি জাহাজের ভাঙা অংশ জল থেকে তুলছে। আরেকবার হাইতির এক সবুজ পাহাড়ের ওপরে এক মহাবলী দুর্গে উঠছিলাম। তার নাম, Citadelle La ferrierre. এটা হাইতির প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ শাসক ফ্রেঞ্চ ঔপনিবেশিকদের হাত থেকে সদ্য স্বাধীন দেশকে বাঁচানোর জন্যে তৈরি করিয়ে ৩৬৫টা কামান দিয়ে সুরক্ষিত করেন। আমার স্ত্রীর কাছে আমি ঘানার টুই ভাষা কিছু কিছু শিখেছি। যখন জ্যামাইকা আর সুরিনামের কিছু কৃষ্ণাঙ্গের সঙ্গে সেই ভাষায় কথা বলতে পারলাম তখন আমার বিস্ময় আর আনন্দ দুইই অপার। এঁরা সগর্বে বলে থাকেন যে এনাদের পূর্বপুরুষরা পালিয়ে আসা কৃতদাসদের কমিউনিটি গড়ে তুলেছিলেন। এদের বলা হতো Maroons. কিন্তু তখনো আমি সমগ্র ছবিটা দেখতে পাইনি। ইতিহাসের খণ্ডচিত্রগুলো আমার চোখে একই ক্যানভাসে তখনো ধরা দেয়নি।

কিভাবে আধুনিক সভ্যতার উত্থানে আফ্রিকার ভূমিকাকে ইচ্ছায়, অনিচ্ছায় সরানো হয়েছে, লুকোনো হয়েছে তা জানা সত্বেও এর সঙ্গে জড়িত স্থানীয় ইতিহাসের একেকটা অংশকে খুঁজে বার করা কত শক্ত, তা দেখে বারবার আশ্চর্য হয়েছি। যেন জোর করে বিস্মৃতির গর্ভে বিলীন করে দেওয়া হয়েছে সেগুলোকে। এ ঘটনা কিন্তু আটলান্টিকের দু’পারেই। কঙ্গো থেকে সাও টোমে কোথাওই যুগান্তকারী সেসব ঘটনা বা মানুষের ইতিহাসের দীর্ঘতম, বৃহত্তম এবং নৃশংসতম লুন্ঠণ ও অত্যাচারের চিহ্নবাহী কোন মিউজিয়াম, স্মৃতিসৌধ বা লাইব্রেরি ইত্যাদি দেখিনি।

বার্বাডোজে তো আমি হতবাক হয়ে যাইবলা যায়, শুধু দাস উৎপাদিত বার্বাডিয়ান চিনির দৌলতেই সপ্তদশ শতকের পৃথিবীতে ইংল্যান্ড সবচেয়ে ধনী দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে। সেই বার্বাডোজে গিয়ে কৃতদাসদের জন্যে নির্দিষ্ট একটি কবরখানা, যাতে কিনা ৬০০র বেশি সমাধি আছে, খুঁজে বার করতে আমি হিমশিম খেয়ে যাই। তার ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা জানা দূরে থাক, কেউ তার অস্তিত্ব সম্বন্ধেই জানে নাযখন খোঁজ পেলাম, একটা কাঁচা রাস্তা দিয়ে একটা আখের খেতের পাশ দিয়ে গাড়ি চালিয়ে গিয়ে খানিকটা খোলা মত জায়গায় পৌঁছলাম। সেখানে একটা মাটিতে আধবসা মর্চে ধরা সাইনবোর্ডে লেখা আছে, “The slave route cemetry!”

আর কিছু না। সূর্য ঢলে পড়ছিল পশ্চিম আকাশে, আমি কিছুক্ষণ উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘোরাফেরা করলাম, কয়েকটা ছবি তুললাম, আখের খেতের মধ্যে দিয়ে বাতাস শিস দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল। সেখানে দাঁড়িয়ে আমি ভাবতে চেষ্টা করলাম, মাত্র কয়েক’শ বছর আগে এখানেই কৃষ্ণাঙ্গ দাসদের ওপরে কতশত অবর্ণনীয় অত্যাচার, নৃশংসতা ঘটে গেছে, আর তাদেরই অস্থিমজ্জা, স্বেদ, রক্তের বিনিময়ে আমরা, একবিংশ শতাব্দীর মানুষ কত কিছুই না ভোগ করছি!

মানুষের তথাকথিত সভ্যতার ইতিহাসের এই অন্ধকারতম দিকটি সম্বন্ধে আলোচনা করতে বসে আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কথা মনে রাখতে হবে। এই নৃশংস প্রথার প্রভাবে যে আফ্রিকার এই হতভাগ্য মানুষগুলো তাদের ঘর বাড়ি দেশছাড়া হয় তাই নয়, তাদের নিজস্ব সভ্যতা ও সংস্কৃতিকেও বিলুপ্তির পথে ঠেলে দেওয়া হয়। আফ্রিকা মহাদেশে বহু জাতি, উপজাতি। রাজ্য ও দেশে নানান বৈচিত্র্যময় সভ্যতা ও সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিলো। সুসভ্য ইউরোপিয়ানদের প্রবর্তিত দাসপ্রথার মাধ্যমে এইসমস্ত মানুষের নিজস্ব দেশ, ধর্ম, জাতি, ভাষা, সংস্কৃতিগত সব পরিচয়কে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে একটিমাত্র পরিচয় তাদের ওপর দেগে দেওয়া হলো, – যে তারা সবাই কালো মানুষ।

এই বইটিতে সেই সময়ের শ্বেতাঙ্গদের বর্বরতা পড়তে পড়তে কখনো কখনো অবিশ্বাস্য লাগে। ১৬৬১ সালে বার্বাডোজ, এন্টিগুয়া, জামাইকা, সাউথ ক্যারোলিনা এবং আরো কিছু রাজ্যে একটি আইন পাস করা হয়। তাতে লেখা ছিল, “এই আফ্রিকানগুলো বিধর্মী, বর্বর, অনিশ্চিত বুদ্ধি এবং বিপদজনক। তাই প্রত্যেক দাসমালিকের এদের জীবনের ওপরে সম্পূর্ণ অধিকারস্থাপন ও নিয়ন্ত্রণ অবশ্যকর্তব্য।

কিন্তু লুণ্ঠন, ধর্ষণ, শোষণ ও হত্যার এই ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্য বিস্মৃতি জ্যামাইকা বা বার্বাডোজে হয়নি, হয়েছে আজকের উন্নত, ধনী দেশগুলোর  জনমানসে। আমি যখন এটা লিখছি, তখনই ইউ. এস. এবং উত্তর আটলান্টিকের অন্যান্য কিছু জায়গায়, রিচমন্ড, ভার্জিনিয়া থেকে ইংল্যান্ডের ব্রিস্টল পর্যন্ত নানা শহরে, কিছু মানুষের মূর্তি ভাঙ্গা হয়েছে। দাসব্যবসায়ের এবং দাস অর্থনীতির সমর্থক, ধারক ও পালক এই মানুষগুলো এতদিন বীর নায়কের সম্মান পেয়ে আসতো।


প্রথমে গত ছয়’শ বছরের ইতিহাসের পাঠ ও ব্যাখ্যাকে বদলাতে হবে, আধুনিক যুগের প্রবর্তনে আফ্রিকার যে কেন্দ্রীয় ভূমিকা ছিল, তাকে তুলে ধরতে হবে। স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটির পাঠক্রমে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। সাংবাদিকদের আজকের দুনিয়াকে দেখার ও বোঝার দৃষ্টিভঙ্গির চুলচেরা বিচার করতে হবে। শুধু সাংবাদিক কেন, আমাদের নিজেদেরও বর্তমান সময়কে বোঝবার জন্যে নতুন তথ্য, নতুন জ্ঞানের সাহায্য নিতে হবে, তাকে নিত্যদিনের আলাপ আলোচনায় সামিল করতে হবে। অজ্ঞতার আড়ালে লুকিয়ে থাকলে আর চলবে না। আমরা এ বিষয়ে যা যা আলোচনা করলাম, প্রায় একশ বছর আগেই W.E.B Du Bois, তার ওপরে শেষ কথা বলে গেছেন- “আধুনিক যুগের বাণিজ্যের ভিত্তি সম্পূর্ণভাবে কৃষ্ণাঙ্গদের শ্রমের উপর প্রতিষ্ঠিত- যে বাণিজ্য প্ৰথমে, কালো মানুষগুলোর নিজেদের কেনাবেচা দিয়ে শুরু হয়।”

দাসব্যবসার নারকীয় নিষ্ঠুরতার কথা আজ আমরা সবাই জানি। এই রচনা পড়ার পরে ভাবতে বসেছিলাম, দাসপ্রথার কারক, পালক, ধারক ও বাহক যারা, বণিক ও শাসককুল, তারা না হয় অর্থ ও ক্ষমতা লোভে এ কাজ করতো। কিন্তু সারাপৃথিবী জুড়ে একদিকে যখন এই নারকীয় বর্বরতা চলছে, আরেকদিকে ইউরোপ ও আমেরিকায় জ্ঞান, বিজ্ঞান, সাহিত্য, দর্শনের চর্চাও তুঙ্গে। অমর সাহিত্য রচনা করছেন শেক্সপিয়র, শেলী, কিটস, বায়রন ও আরো কত বিখ্যাত সাহিত্যিকরা, কাজ করছেন, নিউটন, আবিষ্কৃত হচ্ছে ব্যারোমিটার, টেলিস্কোপ, মাইক্রোস্কোপ, স্টীম ইঞ্জিন, ইতিহাসে প্রথমবার মানুষের দেহে রক্ত সংবাহনতন্ত্রের প্রামাণ্য মডেল তৈরি করছেন উইলিয়াম হার্ভে, ‘দ্য অরিজিন অফ স্পিসিস’ লিখে বিজ্ঞানকে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের অন্ধকার অচলায়তন থকে মুক্ত করছেন ডারউইন…

এইসব মহাপুরুষরা কি জানতেন না দাসপ্রথার কথা? তাঁদের কারো কখনো মনে হয়নি লক্ষ লক্ষ মানুষকে পশুর অধমে পরিণত করাটা এক গভীর ও চরম অন্যায়? আধুনিক মানব সভ্যতার নির্মাণ প্রক্রিয়ায় একি এক নির্মম বিদ্রূপ নয়? 

তথ্যসূত্র:

১. Born in Blackness: Africa, Africans, and the Making of the Modern World, 1471 to the Second World War’ by Howard W French. Liveright Publishing. 2021.

২. Review of Born in Blackness by Peter Francopan, author of The New Silk Routes.

৩. ‘The souls of Black Folk: W.E.B Du Bois. A.C. McClurg& Co. 1903.

সুপ্রিয় লাহিড়ীর জন্ম রামরাজাতলা হাওড়ায়। পড়াশোনা করেন নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন ও কলকাতা সায়েন্স কলেজে। কর্মজীবন সারা দেশ জুড়েই, এক বহুজাতিক ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে শুরু করে ও কোম্পানির দেশের আভ্যন্তরীণ ব্যবসার কর্ণধারের দায়িত্ব থেকে অবসর নেন। শখ ইতিহাস, লেখালেখি ও ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফি।

মন্তব্য তালিকা - “কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাসদের অস্থিমজ্জায় নির্মিত আধুনিক সভ্যতার সৌধ”