সম্পাদকীয়
“দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া”
বাঙালির প্রবল ভ্রমণ পিপাসার কথা বোধ হয় সারা ভারতের সব রাজ্যের অধিবাসীদের কাছেই সুবিদিত। শুধুমাত্র আর্থিকভাবে স্বচ্ছল পরিবার নয়, অনেক স্বল্পবিত্ত বাঙালি পরিবারের নিজেদের সাধ্যাতীত ব্যয় করেও ভ্রমণ করার দৃশ্য বিরল নয়। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের জনপ্রিয় পর্যটন স্থলগুলিতে, বিশেষত ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থলগুলিতে গেলে বাংলা ভাষায় কথোপকথন না শুনতে পাওয়ার সম্ভাবনা কম। কিন্তু বাংলার ভৌগোলিক সীমার মধ্যে অবস্থিত ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলিকে যখন অনাদর আর অবহেলার মধ্যে পড়ে থাকতে দেখা যায়, তখন এক অদ্ভুত বৈপরীত্য অনুভূত হয়। সাগর থেকে পাহাড়, বাংলার দীর্ঘ ইতিহাসের অনেক সাক্ষী আজ জরাজীর্ণ চেহারা নিয়ে টিকে রয়েছে, প্রতিনিয়ত মুছে যাচ্ছে লোকচক্ষু থেকে। বাংলার মানুষের দেখার আগ্রহ আর জানার কৌতূহলের অভাবের কারণে বাংলার বহু অভাবনীয় পুরাকীর্তি, অনেক অসামান্য প্রত্নসম্পদ আজ বিস্মৃতির অন্তরালে চলে গেছে।
বাংলার প্রাগিতিহাস থেকে আদি-মধ্যযুগের গুরুত্বপূর্ণ বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নক্ষেত্র বাংলার অধিকাংশ মানুষের ভ্রমণের তালিকায় কখনও যুক্ত হয়নি – শুশুনিয়া পাহাড়, পাণ্ডু রাজার ঢিবি, চন্দ্রকেতুগড়, কর্ণসুবর্ণ-রক্তমৃত্তিকা, জগজ্জীবনপুর বা মোগলমারি কত জন বাঙালির ভ্রমণসূচির অন্তর্ভুক্ত? আদি-মধ্যযুগ থেকে প্রাগাধুনিক যুগ পর্যন্ত নির্মিত অতুলনীয় শিল্প-সুষমামণ্ডিত টেরাকোটার ফলকে সুসজ্জিত মন্দিরগুলির মধ্যে কতগুলি তাঁদের পর্যটনের পরিধির অন্তর্গত? অন্ত-মধ্যযুগের গৌড়, পাণ্ডুয়া থেকে মুর্শিদাবাদ পর্যটকদের অকর্ষিত করলেও থাকলেও এখনও বাদ পড়ে আছে অনেক ঐতিহাসিক স্থান। সরকারি অবহেলা সত্ত্বেও স্থানীয় অধিবাসীদের সংরক্ষণ চেষ্টার উজ্জ্বল উদাহরণ দেবলগড় প্রত্নক্ষেত্র নিয়ে ইতিহাস তথ্য ও তর্ক গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য প্রয়াস করা হয়েছে, কিন্তু পর্যটকদের এখনও সেখানে বিশেষ আনাগোনা শুরু হয়নি। সুন্দরবন থেকে ডুয়ার্স – বাংলার আরও অনেক প্রত্নস্থল সংরক্ষণের অভাবে আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে।
বাংলার ইতিহাসকে জনপ্রিয় করার লক্ষ্যে অবিচল ইতিহাস তথ্য ও তর্ক গোষ্ঠী প্রকাশ করেছে ‘বঙ্গ ইতিহাস প্রবাহ’ বইটি, বাংলার প্রত্নস্থল ও ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থলগুলিকে জনপ্রিয় করার জন্যও ভবিষ্যতে পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। বাংলার মানুষ যাতে নিজেদের ইতিহাসের মাইলফলকগুলিকে একবার স্বচক্ষে দেখার জন্য ‘ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া’ বেরিয়ে পড়েন, তাঁদের পূর্বপুরুষের জীবনকথাকে, শিল্পকীর্তিকে হৃদয় দিয়ে অনুভব করেন, সেই চেষ্টা সতত চালিয়ে যাবে। শুধু তাই নয়, যাতে বাংলার মানুষ এখানকার প্রত্নসম্পদের সংরক্ষণে এগিয়ে আসেন, তার জন্য নিয়ত সচেষ্ট থাকবে। আজ বাংলার অনেক প্রত্ন-সংগ্রহশালার দর্শক সংখ্যা ক্ষীণ, প্রাচীন সাধারণ পাঠাগারগুলিতে পড়ুয়াদের আর দেখা যাচ্ছে না। এই ভাবে চললে যে আমরা আত্মবিস্মৃতির অন্ধকারে তলিয়ে যাব, সে কথা বলাই বাহুল্য। বাংলার অধিবাসীদের ইতিহাস সচেতনতার ক্ষেত্রে সামগ্রিক পরিবর্তনের আশু প্রয়োজন আছে।
বিগত এক শতকেরও বেশি সময় যাবৎ বাংলায় আঞ্চলিক ইতিহাস বা স্থানিক ইতিহাস নিয়ে বিশিষ্ট বিদ্বানদের যথেষ্ট সংখ্যক মূল্যবান বই বাংলায় লেখা হয়েছে। বিনয় ঘোষের বিশ্বকোষপ্রতিম ‘পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি’ আমাদের মননে এখনও প্রতিভাসিত। শুধু তাই নয়, বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রকাশিত পত্র-পত্রিকাগুলিতে যে গভীর গবেষণাসমৃদ্ধ রচনাসম্ভার বিগত কয়েক দশক ধরে পাঠ করার সুযোগ হয়েছে তা অবশ্যই প্রশংসা ও শ্রদ্ধার দাবি রাখে। কিন্তু এই বিপুল প্রয়াসও যে বাঙালিদের বাংলার ইতিহাসের সন্ধানে যাত্রায় সেভাবে আকর্ষিত করতে পারছে না, তা অতীব বেদনাদায়ক হলেও সত্য। প্রথম দিন থেকেই ইতিহাস তথ্য ও তর্ক গোষ্ঠীর সংকল্প মানুষের ইতিহাসকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া, বাংলার মানুষের ইতিহাসকে সবার ঘরে পৌঁছে দেওয়াও সেই সংকল্পেরই অংশ। তাই, সবার মিলিত প্রয়াসে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের সংকল্প সফল হবে, বাংলার ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত অথচ এখনও অপরিচিত, এমন স্থানগুলিতেও অনেক পদধ্বনি শোনা যাবে আর বাংলার প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণের চেষ্টায় প্রবল প্রাণসঞ্চার হবে এই বিশ্বাস নিয়ে আমরা এগিয়ে চলব।