সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

সম্পাদকীয়

ফেব্রুয়ারি ১, ২০২৬

আমরা আছি বিজ্ঞান চেতনা, ইতিহাস চেতনা, মুক্ত ভাবনার সঙ্গে 

স্বাধীনতার আগে জওহরলাল নেহরু ১৯৪৬ সালে তাঁর ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া বইতে সায়েন্টিফিক টেম্পার বা বিজ্ঞান মনস্কতার কথা লিখেছিলেন। স্বাধীনতার পর প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জওহরলাল ভারতের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশে বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গড়ে তোলার বিষয়ে উৎসাহী ছিলেন। নেহরু তাঁর বইতে লিখেছিলেন, ‘দেশের আপামর জনসাধারণের জন্য বিজ্ঞানের প্রয়োগ আজ আবশ্যিক, একে এড়িয়ে যাবার কোনো উপায় নেই, কিন্তু প্রয়োগের পর আরও কিছু করা দরকার—তা হল বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা গড়ে তোলা, দুঃসাহসী জটিল বৈজ্ঞানিক মেজাজ, সত্য ও জ্ঞানের জন্য অনুসন্ধান; কোনো কিছু পরখ, যাচাই না করে গ্রহণ না করা এবং নতুন প্রমাণ সামনে এলে পুরানো সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করার তৎপরতা; আগে থেকে ঠিক করা ধারণার উপর নয়, পর্যবেক্ষণলব্ধ সত্যের উপর আস্থা, মনের কঠোর শৃঙ্খলা—এসবই আজ প্রয়োজন। শুধু বিজ্ঞানের প্রয়োগের জন্য নয়, জীবনের জন্যও এবং তার সমস্যা সমাধানের জন্যও। বৈজ্ঞানিক মেজাজ ও দৃষ্টিভঙ্গি এক জীবনশৈলী, চিন্তা প্রক্রিয়া, কার্যধারা এবং সহ-নাগরিকদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার পদ্ধতি হওয়া উচিত। বিজ্ঞানমনস্কতা যে পথ তৈরি করে সেই পথ দিয়ে মানুষের হাঁটা দরকার। বিজ্ঞান কেবল ইতিবাচক জ্ঞানের চর্চা করে, কিন্তু বিজ্ঞানমনস্কতা যে প্রভাব তৈরি করে তা পাশফেলের চেয়ে অনেক সুদূরপ্রসারী।’

ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, বৈজ্ঞানিক মেজাজ তৈরির একটা প্রচেষ্টা নেহরুর মধ্যে লক্ষ্য করা গেলেও অনেক বিরুদ্ধগুণের সমাবেশ ছিল সেদিনের পরিস্থিতিতে। আজ দেশের ক্ষুদ্র একটা অংশের মানুষের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা তৈরি হয়েছে ঠিকই কিন্তু অন্য বৃহদংশের র মানুষের মধ্যে যুক্তিবাদী বিজ্ঞানচর্চার বিকাশ একেবারে হয়নি। এই পরিসরেই সমাজের মধ্যে মাথা গেড়ে বসেছে নিয়তিবাদ, জন্মান্তরবাদ, মোক্ষবাদ আর তাতে ইন্ধন জুগিয়েছে বিভিন্ন ধরনের, বিভিন্ন ধর্মের মৌলবাদ।  

১৯৭৬ সালে সংবিধানের ৪২ তম সংশোধনে ৫১ এ ধারায় বলা হয়েছে—

‘It shall be the duty of every citizen of India to develop the scientific temper, humanism and the spirit of inquiry and reform.’

বিজ্ঞান মনস্কতা, মানবিকতা এবং অনুসন্ধান ও সংস্কারের চেতনাকে বিকশিত করা ভারতের প্রতি নাগরিকের কর্তব্য।

একাজে খুব বেশিদূর অগ্রসর হওয়া যায়নি। বিগত শতকের পঞ্চাশের দশকে বিজ্ঞানী সমাজের অগ্রণী অংশ তৈরি করেন সায়েন্টিফিক ওয়ার্কার্স অ্যাসোসিয়েশন, কিন্তু দেড় দশকের মধ্যেই তার কর্মকাণ্ড ম্রিয়মাণ হয়ে পড়েছিল। ষাটের দশকে সোসাইটি ফর প্রমোশন অফ সায়েন্টিফিক টেম্পার গড়ে উঠেছিল। তাঁরা বলেছিলেন, সহিষ্ণুতা ও মুক্ত মনের অনুসন্ধানের প্রক্রিয়ার মেলবন্ধন ঘটাতে হবে। জ্ঞান কোনো প্রতিভাসের মধ্য দিয়ে নয়, মানুষের প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে অর্জন করা সম্ভব। জ্ঞান অর্জিত হয় কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তির বিশ্বাসে নয়; তা লাভ করা যায় সমস্যার মুখোমুখি হয়ে মানুষের নৈতিক ও বৌদ্ধিক সম্পদের সাহায্যে।

ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার প্রাপক চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রামন। তিনি ১৯২৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তাঁর বিখ্যাত তত্ত্ব রামন এফেক্ট জনসমক্ষে আনেন। সম্পূর্ণ দেশীয় গবেষণাগারে কাজ করে ১৯৩০ সালে তাঁর পদার্থ বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি অবশ্যই ভারতীয় উপমহাদেশের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ১৯৮৭ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি ভারতবর্ষে জাতীয় বিজ্ঞান দিবস হিসেবে পালিত হয়।   

আজকে সারা উপমহাদেশে পরিস্থিতি জটিল। মৌলবাদী শক্তি ক্ষমতা বিস্তারে সক্ষম হয়েছে। মৌলবাদ বিজ্ঞান চেতনা, ইতিহাস চেতনা, মুক্ত ভাবনা, ইতিহাস ও বিজ্ঞানমনস্কতার উপরে ধারাবাহিক আক্রমণ করছে। এই জটিল পরিস্থিতিতে ইতিহাস আড্ডা ও ইতিহাস তথ্য ও তর্ক গ্রুপ তাদের অতি সীমিত পরিসরে বিজ্ঞানভিত্তিক ইতিহাস আলোচনা চালিয়ে যাবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।