সম্পাদকীয়
আদিবাসী মানুষ
কাদের বলে আদিবাসী মানুষ? আসলে ‘আদিবাসী’-র সবার জন্য গ্রহণযোগ্য কোনো সংজ্ঞা নেই। আদিবাসী না জনজাতি—কোন শব্দ ব্যবহার করা উচিত? আদিবাসী শব্দটি সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের প্রাচীনতম বাসিন্দাদের বোঝায়, অন্যদিকে জনজাতি এক বৃহৎ জনগোষ্ঠীর একটি অংশকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। ভারতের সংবিধান জনজাতি (Scheduled Tribes) শব্দটির ব্যবহার হয়েছে ।
এই জনগোষ্ঠীগুলিকে নির্ধারণ করার জন্য জাতিসংঘ কিছু বৈশিষ্টকে চিহ্নিত করেছে। মূল কথা, ব্যক্তিগত স্তরে আদিবাসী হিসেবে আত্ম-পরিচয় দিতে তারা ইচ্ছুক এবং তাদের সম্প্রদায় এই আত্ম-পরিচয় মেনে নেয়।
তারা
- ধারাবাহিকভাবে কোনো অঞ্চলে পরবর্তীকালে আগত গোষ্ঠীর আগে জনবসতি তৈরি করে আছেন,
- অঞ্চল এবং আশেপাশের প্রাকৃতিক সম্পদের সঙ্গে শক্তিশালী সংযোগ রেখেছেন,
- স্বতন্ত্র সামাজিক, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে চলেন,
- স্বতন্ত্র ভাষা, সংস্কৃতি এবং বিশ্বাস বজায় রেখেছেন,
- সমাজের অ-প্রভাবশালী গোষ্ঠী, এবং
- পূর্বপুরুষের পরিবেশ এবং ব্যবস্থা বজায় রাখতে চান।
পৃথিবীতে প্রায় ৪৭ কোটি আদিবাসী মানুষ আছেন। তার মধ্যে ১০.৪ কোটি ভারতে। আজ থেকে প্রায় ২ হাজার বছর আগে উপমহাদেশের মানব-সমাজকে ব্রাহ্মণ্যবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে চারটি বর্ণে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছিল—ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র। যেসব সম্প্রদায় চারটি বর্ণের অন্তর্গত তাদেরকে সবর্ণ হিন্দু বলা হত। দলিত ও আদিবাসীরা কোনো বর্ণের অন্তর্গত নয়, তাদের বলা হত ‘পঞ্চম বর্ণ’। তারা পঞ্চম বর্ণ, তাদের বেঁচে থাকবার অধিকার স্বীকৃত ছিল। তাদের সকলকে হত্যা করা হয়নি, যেমন করা হয়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে।
এই দেশের থেকে বেশি আদিবাসী মানুষ আছেন একমাত্র চীনে, ১২.৫ কোটি। অধিকাংশই দেশের পশ্চিম দিকে।
সারা ইউরোপের বাসযোগ্য অঞ্চলে আর আদিবাসী নেই। আছে—একমাত্র ভয়ঙ্কর ঠাণ্ডার জায়গায়, নর্ডিক দেশগুলিতে, সাইবেরিয়াতে সামান্য মানুষ টিকে আছেন। যেসব অঞ্চলে কেউ থাকতে চাইত না, সেখানে তারা টিকে আছেন।
আফ্রিকাতে আদিবাসীরা আছেন। তবে সেখানেও তারা আছেন অপরিসীম দারিদ্র্য মধ্যে। আফ্রিকাতে বহু আদিবাসী গোষ্ঠী স্বেচ্ছায় মরুভূমি, প্রান্তর বা জঙ্গলে থাকেন।
আদিবাসীরা কীভাবে থাকবেন তা কারা ঠিক করবে? এখানে একটা দ্বন্দ্ব আছে।
- আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে ব্রিটিশরা আসবার আগে তারা নিজেদের মতো করে নিজের অঞ্চলে ছিলেন। আজকে জারোয়াদের টিকে থাকবার জন্য সভ্য মানুষের উপর নির্ভর করতে হয়।
- আবার তারা আজকের মানদণ্ডে সভ্য না হলে জীবনের মান অনেকটা উন্নত হবে না। সভ্য হলে মিশ্রণ হবে, মিশ্রিত হতে থাকলে নিজেদের বিশেষত্বকে বিসর্জন দিতে হবে।
তারা কীভাবে থাকবেন তার সিদ্ধান্ত একমাত্র তারাই নিতে পারেন। তবে মূল কথা তাদের জমি নেওয়া চলবে না। আর আমাজন বা আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের মানুষ ব্যতিরেকে তাদের শিক্ষা, পানীয়, স্বাস্থ্য সুরক্ষা ইত্যাদি সব সুবিধা দিতে হবে।
- সেন্টিনেলিজরা বা আমাজনের জঙ্গলের আদিবাসীরা সহস্র সহস্র বছর আগের জীবনকে অনুসরণ করে চলেছেন।
- অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাস প্রায় দুই আমেরিকার মতো।
যারা সকলের থেকে আলাদা থাকতে চান, তাদের নিয়ে সভ্য সমাজের কিছু মুশকিল হয়। সেই অশোকের আমল থেকে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের পাশ দিয়ে ভারতীয় জাহাজ গেছে সিংহলে। বণিক এবং সাধুরা জানতেন সেখানে বনবাসী মানুষ থাকে। তারা এড়িয়ে গেছেন। ঔপনিবেশিসক শক্তি তা করেনি, আন্দামানে বা পাপুয়া নিউগিনিতে। অস্ট্রেলিয়া বা আমেরিকাতে।
প্রাকৃতিক সংরক্ষণে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা সত্ত্বেও, আদিবাসীরা অসম দারিদ্র্যের সম্মুখীন। তারা বিশ্ব জনসংখ্যার মাত্র ৬.২ শতাংশ, তবুও বিশ্বব্যাপী চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাসকারী ১৮.২ শতাংশ হল আদিবাসী মানুষ। আদিবাসীদের আয়ুষ্কাল অন্যান্য জনসংখ্যার তুলনায় ২০ বছর কম। এই দৃশ্য দেখা যায় সর্বত্র।
এই প্রসঙ্গে অশোকের ১৩শ মুখ্য শিলানুশাসন থেকে সামান্য উদ্ধৃত করছি।
‘দেবপ্রিয় বিশ্বাস করেন, ভুল যে করে যতদূর সম্ভব তাকে ক্ষমা করা উচিত। দেবপ্রিয় তার সাম্রাজ্যের বনাঞ্চলের অধিবাসীদের সঙ্গে সমঝোতা করেছিলেন। তবে তিনি তাদের সাবধান করে দিচ্ছেন, তার অনুতাপের মুহূর্তেও তার হাতে ক্ষমতা আছে এবং তিনি তাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, নিহত হতে না চাইলে তারা যেন দোষ স্বীকার করে। কারণ দেবপ্রিয় চান সমস্ত প্রাণীই যেন অক্ষত থাকে এবং আত্মসংযমী, নম্র ও শান্তমনের অধিকারী হয়।’(Asoka & The Decline Of The Mauryas, Romila Thapar)
অশোকের রাজত্বে কিছু প্রাণিহত্যা নিষিদ্ধ হয়েছিল। এরমধ্যে রয়েছে, কথা বলা পাখি, বাদুড়দের কিছু প্রজাতি, জলজ কিছু প্রাণী, কয়েকটি সরীসৃপ। সম্ভবত এদের খাদক ছিল বনবাসী কিছু গোষ্ঠী।
অশোকের অহিংস ধম্ম অরণ্যচারী কিছু আদিবাসী গোষ্ঠীর স্বাভাবিক জীবনে বাধা দিয়েছে। অরণ্যে আদিম কৃষিজীবীদের কৃষির উপায় ছিল বন কেটে বা পুড়িয়ে জমি সাফ করে কৃষিকাজের জমি তৈরি করা (জুম)। এই রীতি আজও ভারতে অল্প কিছু অঞ্চলে এবং বাংলাদেশের বান্দারবানে প্রচলিত। অশোক নিয়ম জারি করলেন, অকারণে প্রাণীদের ক্ষতি করার জন্য অরণ্যে আগুন লাগানো চলবে না। বনবাসীদের প্রাণধারণের কোনো বিকল্প ব্যবস্থা এই নিয়মের সঙ্গে চালু করা হয়েছিল কিনা তার খোঁজ পাওয়া যায় না। এই নিয়ম সম্ভবত বনবাসী মানুষের জীবনচর্যায় আঘাত হেনেছিল।
বিবাদ ছিল, বিবাদ আছে। আদিবাসী মানুষের সম্পদ সভ্য মানুষ কেড়ে নিতে পারে না। আদিবাসীদের জন্য, আবার নিজেদের জন্যও।
প্রকৃতিকে রক্ষা করার জন্য, পৃথিবীকে বাঁচাবার জন্য।
মার্কিন দেশে ১৩ অক্টোবরকে আদিবাসী দিবস হিসেবে পালন করা হয়। ভারতের ক্ষেত্রে সারা দেশের জন্য নির্দিষ্ট কোনো আদিবাসী দিবস নেই। তবে রাজ্যগুলিতে সেই অঞ্চলের জনজাতি পার্বণ বা বিশেষ জনজাতি মানুষের জন্মদিবস পালন করা হয়। স্বাভাবিক, ভারতের মতো বৈচিত্র্যময় দেশে যেখানে অন্তত ৭০৫টি জনজাতি গোষ্ঠী আছে, সেখানে কোনো নির্দিষ্ট দিনকে জনজাতি দিবস হিসেবে পালন করা কঠিন।
যাহোক, আগামী ১৩ অক্টোবর একবার স্মরণ করবেন পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ আদিবাসী গণহত্যার কথা—ইউরোপীয় বসতি স্থাপনকারীদের দ্বারা আদিবাসী আমেরিকানদের বাস্তুচ্যুত করার ইতিহাস।