সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

‘বিশ্রাম’-এর ক্ষমতাচর্চা—নিদ্রা, ‘অবসর’ এবং মানব-সময়ের রাজনীতিকরণ

‘বিশ্রাম’-এর ক্ষমতাচর্চা—নিদ্রা, ‘অবসর’ এবং মানব-সময়ের রাজনীতিকরণ

আয়ূষ দে

সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬ ১৪০ 4

১

ইতিহাসচর্চায় দীর্ঘদিন ধরে ঘটনাবলির দৃশ্যমান ধারাবাহিকতাকে কেন্দ্র করেই ইতিহাস লেখা হয়েছে—যেখানে যুদ্ধ, রাষ্ট্র, শাসক-প্রতিষ্ঠান এবং জনগণ ইতিহাসের আলোচনার প্রধান স্থান অধিকার করেছে। কিন্তু এই আলো-আঁধারির ইতিহাসে একটি মৌলিক প্রশ্ন আমাদের কাছে বহুকাল প্রায় অনুপস্থিত থেকে গেছে; তা হল, মানুষের অবসর সময়ের উপর কার অধিকার রয়েছে? বিশেষত, নিদ্রা, বিশ্রাম এবং এই তথাকথিত ‘অবসর সময়’—এই আপাত-নিষ্ক্রিয় সময়গুলির ইতিহাস কোথায়? কেন ইতিহাস সর্বদা সক্রিয়তা, উৎপাদন ও দৃশ্যমানতার দিকে ঝুঁকে থাকে, এবং বিশ্রাম, অলসতা বা অপেক্ষার মতো সময়কে অপ্রাসঙ্গিক বলে উপেক্ষা করে?

আমাদের এই নিবন্ধের প্রারম্ভিক যুক্তি হল—বিশ্রাম বা নিদ্রা কোনো স্বাভাবিক বা জৈবিক ঘটনা মাত্র নয়; বরং এটি একটি গভীরভাবে রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিকভাবে নিয়ন্ত্রিত ক্ষেত্র। আধুনিক পুঁজিবাদী ও ঔপনিবেশিক সমাজে সময়কে এমনভাবেই বিন্যস্ত করা হয়েছে, যেখানে উৎপাদনশীল সময়কে মহিমান্বিত করা যায় এবং ‘অ-উৎপাদনশীল’ সময়—যেমন নিদ্রা বা নিষ্ক্রিয়তাকে নৈতিকভাবে সন্দেহের চোখে দেখা যায়। ই. পি. থম্পসনের ভাষায়, আধুনিকতার আগমনের সঙ্গে সঙ্গে ‘সময়’ একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ যন্ত্রে পরিণত হয়, যা শ্রম ও শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করে।[i] এই প্রেক্ষিতে, ‘নিষ্ক্রিয় সময়’ কোনো নিরপেক্ষ শূন্যতা নয়; বরং এটি ক্ষমতার দ্বারা চিহ্নিত, নিয়ন্ত্রিত এবং বিতরণকৃত একটি রাজনৈতিক নির্মাণ।

এই আলোচনায় মিশেল ফুকো-র ‘disciplinary power’-এর ধারণা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। ফুকো দেখিয়েছেন, আধুনিক ক্ষমতা কেবল বাহ্যিক দমনের মাধ্যমে নয়, বরং শরীর ও অভ্যাসের উপর সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কাজ করে।[ii] এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, নিদ্রা ও বিশ্রামও একটি শাসনযোগ্য ক্ষেত্র—যেখানে কে কখন, কতক্ষণ এবং কীভাবে বিশ্রাম নেবে, তা সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো দ্বারা নির্ধারিত। এই নিয়ন্ত্রণ এতটাই গভীর যে মানুষ নিজেই তার বিশ্রামের উপর অপরাধবোধ অনুভব করতে শুরু করে—যা পিয়ের বুর্দিয়োর ‘habitus’-এর ধারণার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ।[iii]

তবে এই আলোচনাকে কেবল ইউরোপীয় আধুনিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। ভারতবর্ষের মতো দেশে, উত্তর-ঔপনিবেশিক প্রেক্ষিতে, সময়ের এই রাজনীতি আরও জটিল রূপ ধারণ করেছে। আসলে পূর্বের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন কেবল ভূমি বা সম্পদ দখল করেনি; এটি উপনিবেশের মানুষদের সময়কেও পুনর্গঠিত করেছে। দীপেশ চক্রবর্তীর মতে, ঔপনিবেশিক আধুনিকতা স্থানীয় সময়বোধকে অপ্রাসঙ্গিক করে দিয়ে একটি সর্বজনীন, রৈখিক সময় আরোপ করে[iv], যার ফলে, ঔপনিবেশিক সমাজে বিশ্রাম বা অলসতা প্রায়ই ‘অপচয়’ বা ‘অবক্ষয়’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়—যা এক ধরনের নৈতিক শাসনের অংশ।

এখানে জোনাথন ক্র্যারি-র বিশ্লেষণ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি দেখিয়েছেন, সমসাময়িক পুঁজিবাদ ‘২৪/৭’ কার্যক্রমের মাধ্যমে নিদ্রাকেও একটি প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত করে—তাই বর্তমান পুঁজিবাদ আমাদের জানায় যে আমরা যদি জীবনে সফল হতে চাই তবে আমাদের এই প্রতিবন্ধকতাকে দূর করতে হবে।[v] এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদেরকে ভাবতে বাধ্য করে: নিদ্রা কি তবে আমাদের শেষ স্বাধীনতার ক্ষেত্র, নাকি সেটিও ইতিমধ্যেই নিয়ন্ত্রিত?

এই প্রবন্ধ তাই ইতিহাসচর্চার একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতাকে প্রশ্ন করে: কেন ইতিহাস সর্বদা কাজ, উৎপাদন ও ঘটনার ইতিহাস লিখে রাখে, কিন্তু বিশ্রাম, ক্লান্তি বা অপেক্ষার ইতিহাস লেখে না! ‘নিষ্ক্রিয় সময়’ বলে যাকে আমরা বারে-বারে চিহ্নিত করে চলি, তা কি সত্যিই মৃত, নাকি এটি সেই স্থান, যেখানে ক্ষমতা সবচেয়ে সূক্ষ্মভাবে কাজ করে? এবং সর্বোপরি, কে বিশ্রাম নিতে পারে, আর কে পারে না—এই প্রশ্নটি কি আমাদের সময়ের সবচেয়ে গভীর রাজনৈতিক প্রশ্নগুলির মধ্যে একটি নয়?

এই প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজার মধ্য দিয়েই আমরা চেষ্টা করব দেখাতে যে, ইতিহাসের আলোয় যা দৃশ্যমান, তার বাইরে একটি অদৃশ্য সময়-রাজনীতি কাজ করে—যেখানে মানুষের নিদ্রা, বিশ্রাম ও নিষ্ক্রিয়তাও ক্ষমতার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, বিতর্কিত এবং পুনর্গঠিত হয়।

২

আমরা একমত হব যে, আধুনিক ইতিহাসচর্চা সাধারণত শ্রম, উৎপাদন ও কার্যকারিতার দৃশ্যমান রূপগুলিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। কিন্তু যদি আমরা এই তথাকথিত ইতিহাস রচনার দৃষ্টিকোণ থেকে সামান্য সরিয়ে বৃহত্তর অর্থে ইতিহাসকে দেখি, তবে আমাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর সত্য উদ্ভাসিত হয়; সেটি  হল মানুষের জীবনে যে সময়গুলি ‘অকার্যকর’, ‘নিষ্ক্রিয়’ বা ‘অপ্রয়োজনীয়’ বলে চিহ্নিত, সেগুলিই আসলে সবচেয়ে বেশি মাত্রায় রাষ্ট্র কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত। তাই আমাদের এই নিবন্ধের কেন্দ্রীয় দাবি হল- বিশ্রাম, নিদ্রা এবং তথাকথিত ‘নিষ্ক্রিয় সময়’ আসলে ক্ষমতার এমন এক সূক্ষ্ম ক্ষেত্র, যেখানে শাসন দৃশ্যমান হয় না, কিন্তু গভীরভাবে কার্যকর হয়।

এই আলোচনার প্রবেশের আগে আমাদের কয়েকটি ধারণা সম্পর্কে অবগত থাকা জরুরি; তাঁর মধ্যে প্রথম এবং প্রধান হল, আমাদের বোঝা দরকার যে ‘নিষ্ক্রিয়তা’ কোনো প্রাকৃতিক বা স্বতঃস্ফূর্ত অবস্থা নয়; এটি একটি ‘সামাজিক’ ভাবে নির্মিত ধারণা। উদাহরণস্বরূপ, শহরের একজন কর্পোরেট কর্মীর ‘weekend rest’ যেভাবে উদযাপিত হয়, গ্রামীণ কৃষিশ্রমিকের ‘অবসর’ সেই একই অর্থ বহন করে না। একজনের বিশ্রাম যেখানে অর্জিত অধিকার, অন্যজনের ক্ষেত্রে সেটি প্রায়শই অক্ষমতা বা ব্যর্থতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। এবং এই পার্থক্যটি কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি একটি নৈতিক শ্রেণিবিন্যাসও তৈরি করে, যেখানে বিশ্রামকে একটি শ্রেণিগত বিশেষাধিকারে রূপান্তরিত করা হয়।

এই প্রসঙ্গে অশিল মেম্বে-র ‘necropolitics’ ধারণাকে নতুনভাবে পড়া যায়। মেম্বে মূলত দেখিয়েছেন কীভাবে ক্ষমতা জীবনের উপর নয়, মৃত্যুর উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।[vi] যদি আমরা এই ধারণাকে সময়ের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করি, তবে দেখা যায়—রাষ্ট্র কিছু মানুষের সময়কে এমনভাবেই বিন্যস্ত করে, যেখানে তারা প্রায় ‘জীবন্মৃত’ অবস্থায় বসবাস করে। উদাহরণস্বরূপ, দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করা মানুষজন, (যেমন) সরকারি অফিসের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা, কাজের অনিশ্চয়তায় দিন কাটানো, বা অনিয়মিত শ্রমঘণ্টার মধ্যে দেহকে ঠেলে নিয়ে যাওয়া ব্যক্তিরা—এক ধরনের সময়গত মৃত্যু। এখানে ‘নিষ্ক্রিয় সময়’ কেবল অলসতা নয়; এটি এমন এক অবস্থা, যেখানে মানুষের সময় আর তার নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না।

এই যুক্তিকে আরও স্পষ্ট করে তোলার জন্য আমরা শহুরে পরিসরের দিকে তাকাতে পারি। মহানগরগুলিতে রাতের পর রাত জেগে কাজ করা নিরাপত্তারক্ষী, অ্যাপ-ভিত্তিক ডেলিভারি কর্মী, বা হাসপাতালের নার্সদের কথা যদি আমরা ভাবি তাহলে দেখব যে তাদের নিদ্রা কখনোই একটি ধারাবাহিক, স্বাভাবিক প্রক্রিয়া নয়; বরং এটি ভগ্ন, বিছিন্ন এবং অনিশ্চিত প্রক্রিয়া। এই অবস্থাকে আমরা ‘fragmented sleep’ বলতে পারি—যেখানে দেহকে ‘বিশ্রাম’ দেওয়া হয় না, বরং দেহকে কেবলমাত্র কার্যক্ষম রাখার জন্য সামান্য একটু বিরতি দেওয়া হয়। জোনাথন ক্র্যারি এই প্রক্রিয়াকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন, সমসাময়িক পুঁজিবাদ এমন একটি পৃথিবী তৈরি করতে চায় যেখানে বিশ্রাম একটি অপ্রয়োজনীয় ব্যাঘাত হিসেবে বিবেচিত হবে।[vii] ফলে, নিদ্রা এখানে একটি প্রাকৃতিক অধিকার নয়; বরং এটি একটি সীমিত, নিয়ন্ত্রিত সম্পদ।

এখানে আমাদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে, তাহলে কেন কিছু মানুষের ক্লান্তি দৃশ্যমান হয়, এবং অন্যদের ক্লান্তি আমাদের চোখে অদৃশ্য থেকে যায়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ‘দৃশ্যমানতা’র রাজনীতির দিকে তাকাতে হয়। যেসব শ্রম দিবালোকে দৃশ্যমান, কারখানার কাজ বা অফিসের শ্রম, সেগুলি সরকার বা আমাদের কাছে প্রায়শই নথিভুক্ত হয়। কিন্তু যেসব শ্রম অদৃশ্য—যেমন গৃহস্থালির কাজ, পরিচর্যা, বা রাতের অদেখা শ্রম—সেগুলি ইতিহাসে বা কোনো নথিতে স্থান পায় না। এই অদৃশ্যতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে বিশ্রামের এক অসম বণ্টন। একজন গৃহিণীর জন্য ‘বিশ্রাম’ প্রায়ই একটি অসম্ভব ধারণা হয়ে ওঠে, কারণ তার শ্রম আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পায় না। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোয় একজন নারীর গৃহভিত্তিক শ্রম শ্বাস-প্রশ্বাস এর মতোই স্বাভাবিক শ্রমের আওতায় পড়ে যায়, যার জন্য আলাদা ভাবে কোনো বিশ্রামের প্রয়োজন হয় না।

এই প্রসঙ্গে সিলভিয়া ফেদেরিচি-র কাজ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে গৃহস্থালির শ্রমকে আমাদের চোখে ধীরে ধীরে অদৃশ্য করে দেওয়া হয়েছে, যাতে তা বিনা পারিশ্রমিকে চালিয়ে যাওয়া যায়।[viii] এই বিশ্লেষণকে যদি আমরা বিশ্রামের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করি, তবে দেখা যায়, যাদের শ্রম সমাজ স্বীকৃত নয়, তাদের বিশ্রামও সমাজে স্বীকৃত হয় না। ফলে এই জায়গা থেকে, বিশ্রামের অধিকার একটি রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নে পরিণত হয়।

এখন যদি আমরা ঔপনিবেশিক প্রেক্ষাপটে ফিরে যাই, তবে আমাদের কাছে এই সময়গত নিয়ন্ত্রণ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঔপনিবেশিক শাসন কেবল উৎপাদন বাড়ানোর জন্য নয়, বরং স্থানীয় জনগণের জীবনযাত্রার ছন্দকে পুনর্গঠনের জন্য সময়কে নিয়ন্ত্রণ করেছিল। চা-বাগান বা নীল চাষের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের কাজের সময়সূচি এমনভাবে নির্ধারিত ছিল, যাতে তাদের দেহ সর্বোচ্চ উৎপাদনক্ষম অবস্থায় থাকে, কিন্তু কখনোই সম্পূর্ণ বিশ্রাম না পায়। এই প্রক্রিয়াকে আমরা ‘regulated exhaustion’ বলতে পারি, যেখানে ক্লান্তিকে একটি নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় রাখা হয়, যাতে শ্রম বন্ধ না হয়, আবার বিশ্রামও পূর্ণতা না পায়।

এই ধারণাটি আমাদের আলোচনাকে একটি গভীর স্তরে নিয়ে যেতে বাধ্য করে, তা হল মানুষের অভ্যন্তরীণ সময়বোধের উপর তাঁর নিজের নিয়ন্ত্রণ। মানুষ সময়ের সাথে সাথে কেবল বাহ্যিক নিয়মের দ্বারা নয়, বরং নিজের মধ্যেই এক ধরনের শাসন বহন করতে শুরু করে। সে নিজেই তার বিশ্রামকে সীমিত করে, নিজের অলসতাকে দোষী মনে করে, এবং নিজের শরীরকে ক্রমাগত উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত রাখে। এই অবস্থাকে আমরা এক ধরনের ‘internalized temporality’ বলতে পারি, যেখানে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা আর মননের বাইরে নেই; বরং এটি মানুষের অভ্যাস, চিন্তা ও অনুভূতির মধ্যে প্রবেশ করেছে।

এই প্রেক্ষিতে, অপেক্ষার অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ধরুন, একটি সরকারি হাসপাতালে রোগীর পরিবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছে। এই অপেক্ষা কিন্তু কোনো স্বেচ্ছাকৃত অবসর নয়; বরং এটি একটি বাধ্যতামূলক স্থগিতাবস্থা। এখানে সময় যেন থেমে আছে, কিন্তু এই থেমে থাকা আসলে একটি সক্রিয় প্রক্রিয়া যেখানে মানুষকে তার নিজের সময় থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়। এই অবস্থাকে আমরা ‘suspended time’ বলতে পারি; এটি একটি এমন সময়, যা ফলপ্রসূও নয়, আরামদায়কও নয়, কিন্তু তবুও গভীরভাবে নিয়ন্ত্রিত।

আমাদের আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে আসতে পারে, তা হল অবসরের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ভূমিকা। ডিজিটাল যুগে সময়ের উপর পুঁজিবাদের নিয়ন্ত্রণ আরও সূক্ষ্ম হয়ে উঠেছে। স্মার্টফোন, নোটিফিকেশন এবং ক্রমাগত সংযুক্ত থাকার চাপ মানুষের বিশ্রামের সময়কে বারবার ভেঙে দিচ্ছে। মানুষ ঘুমোতে যাওয়ার পরেও ‘অনলাইন’ থাকে, তার মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হয় এবং তার বিশ্রাম অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এই অবস্থায়, নিদ্রা আর একটি বিচ্ছিন্ন অবস্থা নয়; এটি একটি বিঘ্নিত, অস্থির প্রক্রিয়া হয়ে ওঠে।

এই সমস্ত উদাহরণ আমাদেরকে একটি কেন্দ্রীয় উপলব্ধির দিকে নিয়ে যায়: বর্তমানে সময় আর কেবল একটি পরিমাপ নয়; বরং এটি একটি ক্ষমতার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। এবং এই ক্ষমতা সবচেয়ে গভীরভাবে কাজ করে সেইসব মুহূর্তে, যেগুলিকে আমরা আপাতভাবে গুরুত্বহীন বলে মনে করি, যেমন বিশ্রাম, নিদ্রা বা অপেক্ষা।

তাহলে প্রশ্নটি আবার ফিরে আসে; কে বিশ্রাম নিতে পারে? আমাদের এই প্রশ্নের উত্তর কোনো একক নয়; এটি বহুমাত্রিক। শ্রেণি, লিঙ্গ, পেশা এবং সামাজিক অবস্থান—সবকিছুই নির্ধারণ করে একজন মানুষের বিশ্রামের ওপর কতখানি অধিকার রয়েছে। এবং এই অধিকারের প্রশ্নটি যতটা না জৈবিক, তার চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক।

সবশেষে, এই প্রবন্ধের মূল বক্তব্যকে আমরা এভাবে সংক্ষেপ করতে পারি, বর্তমানে মানুষের উপর শাসন কেবলমাত্র তার কাজের উপর নয়, বরং তার বিশ্রামের উপরও প্রতিষ্ঠিত। এবং এই শাসন এতটাই সূক্ষ্ম যে, আমরা প্রায়শই তা অনুভব করি না। আমরা ক্লান্ত হই, কিন্তু বিশ্রাম নিতে পারি না; আমরা ঘুমোতে যাই, কিন্তু শান্তিতে ঘুমোতে পারি না; আমরা অপেক্ষা করি, কিন্তু সেই অপেক্ষার উপর আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। এই উপলব্ধি আমাদেরকে ইতিহাসের ধারণাকে এক নতুন প্রশ্নের সম্মুখীন করে; যেখানে আমরা কেবল প্রশ্ন করি না যে মানুষ কী করেছে, বরং মানুষ কখন, কীভাবে, এবং কতটা বিশ্রাম নিতে পেরেছে তা হয়ে ওঠে আমাদের আলোচনার বিষয়, এবং হয়তো, এই প্রশ্নটিই আমাদের বর্তমান সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক রাজনৈতিক প্রশ্ন।

ছবি: A Sleeping Girl, শিল্পী: আলবার্ট মুর

৩

ইতিহাসের প্রচলিত বয়ানে আমরা সবসময় ‘আলো’কে অনুসরণ করি; যেখানে প্রতিটি কার্যকলাপ দৃশ্যমান, ক্ষমতা স্পষ্ট এবং সময় পরিমাপযোগ্য। কিন্তু এই আলো-নির্ভর ইতিহাসের বাইরে ইতিহাসের এমন এক বিস্তৃত ক্ষেত্র রয়ে গেছে, যা ক্রমাগত আমাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়। এই প্রবন্ধের আলোচনাগুলি সেই অদৃশ্য ক্ষেত্রের দিকে ইঙ্গিত করে—যেখানে সময়ের এমন স্তরগুলি কাজ করে, যেগুলি না সম্পূর্ণ সক্রিয়, না সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়। বরং এগুলি এমন এক অন্তর্বর্তী অঞ্চল, যেখানে মানুষের অস্তিত্ব স্থগিত হয়ে থাকে, তারপর বিভক্ত হয়ে যায় এবং সবশেষে রাষ্ট্র কর্তৃক পুনর্গঠিত হয়। এই অঞ্চলকে আমরা একধরনের ‘সময়গত সীমান্ত’ (temporal frontier) হিসেবে ভাবতে পারি—যেখানে বিশ্রাম, নিদ্রা ও অপেক্ষা নতুন অর্থ লাভ করে।

এই সীমান্তের সঙ্গে ‘রাত্রি’র একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কারণ রাত্রি শুধুমাত্র দিনের অনুপস্থিতি নয়; এটি এমন একটি অবস্থা, যেখানে দৃশ্যমানতার নিয়মগুলি বদলে যায়। দিনের সময়ে যা স্বাভাবিক, রাত্রিতে তা অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে; দিনের বেলা যে শৃঙ্খলা আমাদের নজরে আসে, রাত্রিতে তা ভেঙে পড়ে বা নতুনভাবে সংগঠিত হয়। এই অর্থে, রাত্রি একটি বিকল্প সময়-ব্যবস্থা তৈরি করে—যেখানে মানুষের দেহ, শ্রম ও অভ্যাস অন্যভাবে কাজ করে। আমার পূর্বের ‘History of Night’[1] নিবন্ধের সঙ্গে এই নিবন্ধের সংযোগ এখানেই যে রাত্রি ও বিশ্রাম উভয়ই সেই ক্ষেত্র, যেখানে ক্ষমতা সরাসরি নয়, বরং পরোক্ষভাবে, অদৃশ্যভাবে কাজ করে।

এই প্রসঙ্গে ওয়াল্টার বেঞ্জামিন-এর ‘homogeneous, empty time’ ধারণাটি স্মরণযোগ্য। বেঞ্জামিন দেখিয়েছিলেন, আধুনিক ইতিহাস একটি সমতল, রৈখিক সময়ের ধারণা তৈরি করে, যেখানে সব মুহূর্ত একই রকমভাবে প্রবাহিত হয়।[2] কিন্তু বাস্তবে, সময় কখনোই সমতল নয়; এটি ভাঙা, অসম এবং স্তরায়িত। রাত্রি ও তথাকথিত ‘নিষ্ক্রিয় সময়’ এই অসমতার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ—যেখানে সময়ের গতি ধীর হয়, থেমে যায়, বা অন্যভাবে অনুভূত হয়। ফলে, ইতিহাস যদি সত্যিই সময়ের ইতিহাস হতে চায়, তবে তাকে এই ভাঙাচোরা, অসম সময়ের অভিজ্ঞতাগুলিকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

এখানে হোমি ভাবা-র ‘time-lag’-এর ধারণাটিও প্রাসঙ্গিক। ভাবা আমাদের দেখিয়েছেন, ঔপনিবেশিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে ‘সময়’ কখনোই একরৈখিক নয়; বরং এটি বিলম্বিত, বিছিন্ন এবং দ্বৈত সত্ত্বা হিসেবে কাজ করে।[3] এই ‘time-lag’ আমাদেরকে বুঝতে সাহায্য করে, মানুষের অভিজ্ঞ সময় সবসময়ই ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে সংঘাতে থাকে। রাত্রির সময়, যখন শহর আংশিকভাবে থেমে যায়, তখন এই দ্বৈত সময় আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে—একদিকে শাসকের নীরব উপস্থিতি, অন্যদিকে মানুষের ব্যক্তিগত সময়ের ক্ষুদ্র মুক্তি।

তবে মানুষের এই মুক্তি কি সত্যিই মানুষের ‘প্রকৃত’ মুক্তি? নাকি এটি কেবল একটি বিভ্রম? কারণ রাত্রিও সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণমুক্ত নয়। বরং, রাত্রির অন্ধকারে ক্ষমতা আরও সূক্ষ্মভাবে কাজ করে—নজরদারি, নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা এই সময়ে এমনভাবে কার্যকর হয়, যা দিনের আলোর মতো দৃশ্যমান নয়। এই দিকটি জ্যাক দেরিদা-র ‘trace’ ধারণার মাধ্যমে বোঝা যায়। দেরিদা দেখিয়েছিলেন, উপস্থিতির মধ্যে সর্বদা অনুপস্থিতির চিহ্ন থাকে।[4] রাত্রির ক্ষেত্রেও তাই—যা অদৃশ্য, সেটিই আসলে সবচেয়ে কার্যকর হয়; এবং যা অনুপস্থিত বলে মনে হয়, সেটিই ক্ষমতার গভীরতম স্তরকে ধারণ করে।

এই আলোচনার শেষ পর্যায়ে এসে আমাদের বক্তব্য হল: ইতিহাসকে কেবল ঘটনাবলির ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখলে চলবে না; বরং এটিকে দেখতে হবে অভিজ্ঞতার ইতিহাস হিসেবে—বিশেষত সেই অভিজ্ঞতা, যা ভাষায় ধরা পড়ে না, আর্কাইভে সংরক্ষিত হয় না, কিন্তু মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। বিশ্রাম, নিদ্রা ও অপেক্ষা এই ধরনের অভিজ্ঞতার অন্তর্গত। এগুলি এমন এক মুহূর্ত, যেখানে মানুষ নিজেকে খুঁজে পায়, আবার হারিয়েও ফেলে; যেখানে দেহ ও সময়ের সম্পর্ক নতুনভাবে গঠিত হয়। এই প্রেক্ষিতে, ‘History of Night’ একটি তাত্ত্বিক সম্ভাবনা আমাদের সামনে উন্মোচন করে, যেখানে আমরা ভাবতে বাধ্য হই এমন একটি ইতিহাস কল্পনা করতে, যেখানে অন্ধকারও একটি উৎস, নীরবতাও একটি ভাষা এবং নিষ্ক্রিয়তাও একটি কার্যকর অবস্থা। এই নিবন্ধে আমাদের বক্তব্যও তাই—ইতিহাসে আলো যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার ছায়াও ইতিহাস রচনায় ততটাই তাৎপর্যপূর্ণ।

কিন্তু এই সমস্ত আলোচনার পরেও আমাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন থেকে যায়—আমরা কি সত্যিই আমাদের নিজের সময়ের উপর অধিকার রাখি? আমরা যখন ঘুমোই, তখন কি আমরা সত্যিই মুক্ত? আমরা যখন অপেক্ষা করি, তখন কি সেই অপেক্ষার সময়টুকু কেবলই আমাদের? আমরা যখন কিছুই করি না, তখন কি সেই ‘কিছু না করা’ সত্যিই আমাদের নিজের সিদ্ধান্ত? সম্ভবত, এই প্রশ্নগুলির কোনো সরল উত্তর নেই। কারণ সময়ের উপর নিয়ন্ত্রণ কখনোই সম্পূর্ণ নয়—না শাসকের, না ব্যক্তির। বরং এটি একটি ক্রমাগত সংঘাতের ক্ষেত্র, যেখানে ক্ষমতা ও প্রতিরোধ একসঙ্গে কাজ করে। এবং এই সংঘাত সবচেয়ে তীব্র হয়ে ওঠে সেইসব মুহূর্তে, যেগুলিকে আমরা আপাতভাবে গুরুত্বহীন বলে মনে করি—যেমন একটি দীর্ঘ রাত, একটি অস্থির ঘুম, বা একটি অনন্ত অপেক্ষা।

তাই, এই প্রবন্ধ কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চায় না। বরং এটি একটি প্রশ্ন উত্থাপন করে, যদি ইতিহাস সত্যিই মানুষের জীবনকে বোঝার চেষ্টা হয়, তবে আমরা কি প্রস্তুত সেই অন্ধকারের ইতিহাস লিখতে— যেখানে মানুষ কোনও কাজ করে না, বরং কেবল বসে থাকে; যেখানে সময় চলে না, বরং থেমে যায়; এবং যেখানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সবচেয়ে নীরব, অথচ সবচেয়ে গভীর ভাবে কাজ করে চলে!

প্রচ্ছদচিত্র পরিচিতি : The Siesta, শিল্পী: ভ্যান গগ


[1] https://www.itihasadda.in/politics-of-night/ accessed 23-03-2026

[2] Benjamin, Walter. Illuminations. New York: Schocken Books, 1968, p. 261

[3] Bhabha, Homi K. The Location of Culture. London: Routledge, 1994, p. 254

[4] Derrida, Jacques. Of Grammatology. Baltimore: Johns Hopkins University Press, 1976, p. 70


[i] Thompson, E. P. “Time, Work-Discipline, and Industrial Capitalism.” Past & Present, No. 38 (1967): 56–97

[ii] Foucault, Michel. Discipline and Punish: The Birth of the Prison. New York: Pantheon Books, 1977, pp. 136-139

[iii] Bourdieu, Pierre. Outline of a Theory of Practice. Cambridge: Cambridge University Press, 1977, p. 72

[iv] Chakrabarty, Dipesh. Provincializing Europe: Postcolonial Thought and Historical Difference. Princeton: Princeton University Press, 2000, p. 8

[v] Crary, Jonathan. 24/7: Late Capitalism and the Ends of Sleep. London: Verso, 2013, pp. 10-12

[vi] Mbembe, Achille. “Necropolitics.” Public Culture Vol. 15, No. 1 (2003): 11–40

[vii] Crary, Jonathan. 24/7, pp. 15

[viii] Federici, Silvia. Caliban and the Witch: Women, the Body and Primitive Accumulation. New York: Autonomedia, 2004, pp. 75-77

বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ইতিহাস বিভাগে গবেষণারত; তিনি উত্তর-পূর্ব পার্বত্য বিশ্ববিদ্যালয় (NEHU), শিলং-এর ইতিহাস বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর এবং রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যামন্দির, বেলুড় মঠ থেকে স্নাতক শিক্ষা সম্পন্ন করেছেন। তাঁর গবেষণার আগ্রহের ক্ষেত্র মূলত লিঙ্গ ইতিহাস, শ্রমজীবী ও কর্মজীবী শ্রেণির আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নের ইতিহাস (Aspirations and Dreams), প্রান্তিক ও সাবঅল্টার্ন সম্প্রদায়ের ইতিহাস, মধ্যযুগীয় ভারতে সমকামিতার ইতিহাস, এবং ডাইনি-বিদ্যা ও ডাইনিবিদ্যার ইতিহাস। তাঁর গবেষণার মূল লক্ষ্য বিভিন্ন ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষমতা, প্রান্তিকতা ও পরিচয়ের জটিল আন্তঃসম্পর্ক বিশ্লেষণ করে, ইতিহাসের নীরব ও উপেক্ষিত অভিজ্ঞতাগুলিকে নতুন আলোয় তুলে ধরা।

মন্তব্য তালিকা - “‘বিশ্রাম’-এর ক্ষমতাচর্চা—নিদ্রা, ‘অবসর’ এবং মানব-সময়ের রাজনীতিকরণ”

  1. বেশ গুরুত্ববহ একটা প্রবন্ধ। মানুষের অবসর এখন খুবই কম। নিদ্রা যেতে হয় পরবর্তী দিনের জন্য শরীর ও মনকে উজ্জীবিত রাখতে। সত্যিই তো! নিদ্রা, অবসর এসব সময়ের রাজনীতিরই অংশ। সমৃদ্ধ হলাম।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।