ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের আদিপর্ব
রুশ বিপ্লবের আগেও মার্ক্স এবং তাঁর প্রথম ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ হয়েছিল। কলকাতা থেকে জনৈক ব্যক্তি প্রথম ইন্টারন্যাশনালের কাছে একটি চিঠি লিখে শ্রমিক ইউনিয়নকে তার অন্তর্ভুক্ত করার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। চিঠিটি ইন্টারন্যাশনালের অধিবেশনে পঠিত ও আলোচিত হয়েছিল, এটুকু জানা গেলেও কে এর লেখক বা কোন ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্তির আবেদন এখানে ছিল, তার পরিণতিই বা কী হয়েছিল, সে বিষয়ে বিশেষ কোনও খোঁজখবর পাওয়া যায় না। প্রথম ইন্টারন্যাশনালের অবলুপ্তির পর যে দ্বিতীয় ইন্টারন্যাশনাল গড়ে উঠেছিল, সেখানেও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীরা গিয়েছেন ও বক্তৃতা দিয়েছেন। মার্ক্স সম্পর্কে ১৯১২ সালেই আগ্রহ উদ্দীপক লেখা প্রকাশিত হয় কলকাতার ‘মডার্ন রিভিউ’ পত্রিকায়। হরদয়ালের এই লেখাটির শিরোনাম ছিল, ‘কার্ল মার্ক্স : এ মডার্ন ঋষি’। তবে মার্ক্সবাদের সঙ্গে বা কমিউনিস্ট আদর্শ ও সংগঠনের সঙ্গে ভারত তথা বাংলার ধারাবাহিক সংযোগ স্থাপিত হয়েছিল রুশ বিপ্লবের পরে। ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবের পরে যে সব কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে উঠেছিল, তার মধ্যে ছিল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিও। পার্টির প্রতিষ্ঠা নিয়ে অবশ্য একটি বিতর্ক আছে। এর প্রতিষ্ঠা ১৯২০ সালে ভারতের বাইরে তাসখন্দে, না ১৯২৫ সালে ভারতের মধ্যে কানপুরে – সে নিয়ে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিগুলো একমত নয়।
(১)
পার্টি গঠন (১৯১৭ – ১৯২৫)
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা বিষয়ে যার কথা সর্বাগ্রে বলতে হয় তিনি হলেন নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য ওরফে মানবেন্দ্রনাথ রায়। এম. এন. রায় অল্প বয়সেই ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে সামিল হয়েছিলেন। চলে গিয়েছিলেন প্রথমে জার্মানিতে ও পরে আমেরিকা আর সেখান থেকে মেক্সিকোতে। রায় যখন মেক্সিকোতে সে সময়ে হয় রুশ বিপ্লব এবং তিনি সমাজতন্ত্রের মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ হন। ১৯১৯ সালে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের প্রথম অধিবেশনে তিনি উপস্থিত না থাকলেও ১৯২০ সালের দ্বিতীয় অধিবেশনে হাজির হয়েছিলেন মেক্সিকোর কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিনিধি হিসেবে। সেখানে ঔপনিবেশিক দেশ সমূহে কমিউনিস্ট আন্দোলনের নীতি-রীতি কী হবে তাই নিয়ে তাঁর মত এমনকী লেনিনকে প্রভাবিত করে এবং লেনিন মানবেন্দ্রনাথের মতের ভিত্তিতে কমিন্টার্নে পেশ করা এই সংক্রান্ত দলিলে খানিক বদল আনেন। এই ঘটনায় আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে এম. এন. রায়ের গুরুত্ব বাড়ে। কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক বা কমিন্টার্নের একজন নেতা হিসেবে তিনি পরিগণিত হন। মেক্সিকোর কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক হলেও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি তৈরিতে এই প্রবাসী ভারতীয় হাত লাগান।
১৯২০ সালে তাসখন্দের মাটিতে এম. এন. রায় সহ সাতজন আলাপ আলোচনা করে ‘ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি’ নামে এক নতুন সংগঠন তৈরি করেন। উপস্থিত সাতজন ছিলেন – এম. এন. রায়, অবনী মুখার্জী, তিরুমল আচার্য, রোজা ইটিংগফ, এভেলিন রায়, মহম্মদ আলী, মহম্মদ শফীক। পরবর্তী সময়ে কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের তরফে এম. এন. রায় ভারতের মাটিতে একটি কার্যকরী কমিউনিস্ট সংগঠন তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যান। রায় সম্পাদিত ‘ভ্যানগার্ড’ পত্রিকাটি এই কাজে বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল।
প্রবাসী ভারতীয় বিপ্লবীরা সেই সময় নানা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলেন। দ্বিতীয় কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের সময় গড়ে তোলা এম. এন. রায়দের কমিউনিস্ট পার্টিকে ভারতের কমিউনিস্ট মনোভাবাপন্নদের যথার্থ প্রতিনিধি হিসেবে মেনে নিতে পারেননি বার্লিন ও জার্মানির অন্যান্য স্থানে অবস্থিত প্রবাসী ভারতীয় বিপ্লবীরা। তাঁরা বার্লিন কমিটি হিসেবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সক্রিয় ছিলেন। এই বার্লিন কমিটির মোট ১৪ জন মস্কোতে এসেছিলেন কমিন্টার্নের তৃতীয় অধিবেশনে যোগ দিতে। এরা হলেন বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত, বীরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত, নলিনী গুপ্ত, হেরম্বলাল গুপ্ত, এম. বি. টি. আচার্য, পাণ্ডুরঙ্গ খানখোজে, জি. এ. কে. লোহানী, প্রমথ দত্ত, ড. মনসুর, ড. হাফিজ, বরকতুল্লা, আব্দুর রব, আব্দুল ওয়াহেদ। তাঁদের একজন – এম. বি. টি. আচার্য তাসখন্দে পার্টি গঠনের উদ্যোগের ভেতরে সামিল হয়েছিলেন, তবে রায় ও অন্যান্যদের সঙ্গে তাঁর বিতর্কর নিরসন হয়নি। তিরুমল আচার্য অবশ্য বেশিদিন কমিউনিস্ট আন্দোলনের মধ্যে ছিলেন না, কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করে পরবর্তীকালে অ্যানার্কিস্ট ধারার রাজনীতির সঙ্গে তিনি সম্পর্ক তৈরি করেন।
১৯২১ সালে কমিন্টার্নের তৃতীয় অধিবেশনের সময় মস্কোতে উপস্থিত প্রবাসী ভারতীয় বিপ্লবীদের মধ্যে ছিল নানান ধরনের পরস্পর বিরুদ্ধ চিন্তাভাবনা। প্রধান ত্রয়ী – এম. এন. রায়, বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় ও ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত আলাদা আলাদা পদ্ধতিতে ভারতে কাজ করার কথা ভেবেছিলেন। ভারতীয় বিপ্লবের পথ ও পদ্ধতি নিয়ে তাদের ভিন্ন মত ও দৃষ্টিকোণ ছিল। এম. এন. রায় শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের দিকে ভারতের রাজনীতিকে পরিচালনার কথা বলেছিলেন। ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত ও বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রথমে রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনকেই মুখ্য ব্যাপার এবং সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ভাবনাচিন্তাকে পরবর্তী স্তরের ব্যাপার বলে মনে করেছিলেন। তবে বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যেখানে স্বাধীনতা অর্জনের প্রশ্নটিতেই সর্বাত্মক গুরুত্ব দিয়েছিলেন সেখানে ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত এই কাজের পাশাপাশি শ্রমিক ও কৃষকদের বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তাঁদের মধ্যে আলাদা করে সংগঠন তৈরি ও মতাদর্শ প্রচারের কথা ভেবেছিলেন। কমিন্টার্নের নেতাদের কাছে বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জমা দেওয়া থিসিসটি সঙ্গত কারণেই একটি ন্যাশানালিস্ট থিসিস হিসেবে পরিগণিত হয়েছিল। রায়, চট্টোপাধ্যায়, দত্ত এই ত্রয়ী ছাড়াও অবনী মুখার্জী, নলিনী গুপ্ত প্রমুখরা পরস্পরের বিরুদ্ধে নানা বিষোদগার চালিয়ে যান। রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণগত ভিন্নতা ছাড়াও টাকাপয়সা, সাংগঠনিক কর্তৃত্ব ইত্যাদি প্রশ্নে অসংখ্য ছোটো-বড়ো সমস্যা এদের ঐক্যকে বিনষ্ট করে এবং এই ঐক্যের অভাবে প্রবাসীদের কমিউনিস্ট উদ্যোগ সাংগঠনিকভাবে এক জায়গায় আসতে পারেনি। এম. এন. রায় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের নেতা হিসেবে মস্কোকে কেন্দ্র করে কাজ করতে থাকেন। বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় ফিরে আসেন বার্লিনে ও হিটলারের উত্থানের আগে পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন, যুক্ত হয়েছিলেন জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে। ভূপেন্দ্রনাথ মস্কোতে থেকে কাজ করার প্রস্তাব পেয়েছিলেন, কিন্তু রাজি হননি। মস্কো থেকে তিনি আবার জার্মানিতে ফেরেন, গবেষণার কাজ শেষ করেন এবং পি. এইচ. ডি. ডিগ্রি নিয়ে ভারতে প্রত্যাবর্তন করেন।
ভারতের অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি ১৯৫৮ সালের বিশেষ অমৃতসর অধিবেশনে যে পার্টি সংবিধান গ্রহণ করেছিল, তার প্রস্তাবনায় লেখা হয়েছিল, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের মধ্যেকার বৈপ্লবিক ধারাটি রুশ বিপ্লবের প্রভাবকে আত্তীকৃত করে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তুলেছিল। ভারতের বৈপ্লবিক আন্দোলনের মধ্যেকার যে ধারাগুলি মিলিত হয়ে কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করে, তার মধ্যে চারটি ছিল প্রধান।
১) ভারতের বাইরে অবস্থিত বিপ্লবীকেন্দ্রসমূহ, যেগুলি জার্মানি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক ও আফগানিস্তানের মাটিতে বসে ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামকে নানা উপায়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করত। সে সমস্ত উদ্যোগের মধ্যে থেকে কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে আসেন তাদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলেন বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বরকতুল্লা, এম. পি. বি. টি. আচার্য, এম. এন. রায়, অবনী মুখার্জী প্রমুখ।
২) খিলাফৎ আন্দোলনের প্রভাবে যে সমস্ত মুসলিম ব্যক্তিবর্গ ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে যোগ দিতে গিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই রুশ বিপ্লবের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। এঁদের মধ্যে ছিলেন মহম্মদ আলি সেপাসসি, রহমত আলি খান, ফিরোজউদ্দিন মনসুর, আব্দুল মজিদ, শওকত ওসমানি প্রমুখ।
৩) পাঞ্জাব থেকে শিখ সম্প্রদায়সহ যে সব শ্রমিকেরা পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন, তাঁরা সেখানে গদর পার্টি গড়ে তোলেন। ১৯১৫ সালে তারাই কোমাগাতামারু জাহাজটি ভারতে এলে তাকে কেন্দ্র করে বিপ্লবী উদ্যোগ নিয়েছিলেন, যদিও তা ব্যর্থ হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর গদর পার্টি আন্দোলনের দ্বিতীয় ঢেউয়ের নেতৃত্বকারী শক্তিরা কমিউনিস্ট মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হন ও কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। এদের মধ্যে ছিলেন রত্তন সিং ও সন্তোখ সিং।
৪) ভারতের মধ্যেকার স্বাধীনতা সংগ্রামীরাই ছিলেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা ও কমিউনিস্ট আন্দোলনের মূল প্রাণশক্তি। সে সময়ের ভারতের কয়েকটি প্রান্তে কয়েকজন সংগঠক নেতাকে ধরে কয়েকটি কমিউনিস্ট কেন্দ্র গড়ে ওঠে। মুম্বাই কেন্দ্রটির নেতৃত্বে ছিলেন শ্রীপত অমৃত ডাঙ্গে এবং তাঁর সহযোগী ছিলেন এস. ভি. ঘাটে, কে. এন. যোগলেকর, আর. এস. নিম্বকর, টি. ভি. পারভাতে। কলকাতা কেন্দ্রটির নেতৃত্বে ছিলেন মুজফফর আহমেদ। তাঁর সহযোগীদের মধ্যে ছিলেন আব্দুল হালিম, আব্দুর রেজ্জাক খাঁ প্রমুখরা। লাহোর কেন্দ্রটির নেতৃত্বে ছিলেন গোলাম হোসেন। সেখানে গড়ে ওঠে ইনকিলাবি গোষ্ঠী। চেন্নাই কেন্দ্রটির নেতৃত্বে ছিলেন সিংঘরাভেলু চেট্টিয়ার। তিনিই ভারতে প্রথম মে দিবস পালন করেছিলেন। শ্রমিক আন্দোলন ছাড়াও সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এবং পেরিয়ারের সঙ্গে তিনি জাতপাত বিভেদের বিরুদ্ধে কাজ করেছিলেন। জাতীয় কংগ্রেসের মধ্যে থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্যও সিংঘরাভেলু চেট্টিয়ার কাজ করতেন। উত্তরপ্রদেশে হসরৎ মোহানি, গণেশ শঙ্কর বিদ্যার্থী প্রমুখরাও জাতীয়তাবাদ ও কমিউনিস্ট আন্দোলনের যুগ্ম প্রভাবের মধ্যে থেকে কাজ করছিলেন।
প্রতিটি কেন্দ্র থেকেই এক বা একাধিক পত্রিকা প্রকাশিত হত এবং সেগুলি কমিউনিস্ট মতাদর্শকে ছড়িয়ে দেবার কাজ করত। মুম্বাই থেকে ডাঙ্গের উদ্যোগে প্রকাশিত হয়েছিল ‘দ্য সোশালিস্ট’। চেন্নাই থেকে ‘নবযুগ’, যার সম্পাদক ছিলেন ভি. কৃষ্ণা রাও। সিঙ্গরাভালু চেট্টিয়ারের উদ্যোগে চেন্নাই থেকে আরও একটি পত্রিকা শুরু হয়। লাহোরে প্রকাশিত পত্রিকার নাম ছিল ‘ইনকিলাব’, এর সম্পাদনা করতেন গোলাম হোসেন ও সামসউদ্দিন। কলকাতা থেকে ‘লাঙল’, ‘নবযুগ’, ‘আত্মশক্তি’, ‘ধূমকেতু’, ‘দেশের বাণী’, ‘অমৃতবাজার’ ইত্যাদি পত্রিকা ছিল সমাজতান্ত্রিক চিন্তাভাবনা দ্বারা প্রভাবিত। তবে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল মানবেন্দ্রনাথ রায় সম্পাদিত ‘দ্য ভ্যানগার্ড অব ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স’। পরে এটি ‘অ্যাডভান্স গার্ড’ নামেও প্রকাশিত হত। বিভিন্ন প্রান্তের এই গোষ্ঠীগুলি নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করে একটি একক সংগঠন গড়ে তোলার প্রয়াস চালাচ্ছিল। ১৯২০ সালে মানবেন্দ্রনাথ রায় সহ কয়েকজনের উদ্যোগে তাসখন্দের মাটিতে যে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা হয়েছিল তা এই সমস্ত উদ্যোগগুলির মধ্যে যোগাযোগ রক্ষার ক্ষেত্রে ভূমিকা নেবার চেষ্টা করত।
সত্যভক্ত নামের এক জাতীয়তাবাদী বাম মনোভাবাপন্ন যুবক ১৯২৫ সালে কানপুরে বিভিন্ন কমিউনিস্ট উদ্যোগগুলিকে সংযুক্ত করার ভাবনা থেকে একটি সম্মেলনের আয়োজন করেন ও সংশ্লিষ্টদের চিঠি পাঠান। ১৯২৫ এর ২৬ ডিসেম্বর থেকে ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই সম্মেলন চলে। ডাঙ্গের মতো যারা জেলে ছিলেন তারা ছাড়া সমাজতন্ত্রের ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ অন্যান্য নেতৃত্ব এই সম্মেলনে হাজির হন। প্রথম দিন ভাষণ দেন সত্যভক্ত, হসরৎ মোহানি ও সিঙ্গরাভালু চেট্টিয়ার। ১৯২৫ এর ২৬ ডিসেম্বর সম্মেলনের প্রথম দিনে জাতীয়তাবাদী আবেগের প্রাধান্য ছিল। দ্বিতীয় দিন থেকে মূল আলোচনা শুরু হলে শ্রমিক শ্রেণির আন্তর্জাতিকতা ও কমিউনিস্ট মতাদর্শ প্রাধান্য পায়। ঠিক হয় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের কমিউনিস্ট কেন্দ্রগুলিকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলা হবে। এই পার্টির নাম কী হবে তাই নিয়ে বিতর্ক হয়। সত্যভক্ত ও তাঁর অনুগামীদের মত ছিল পার্টির নাম হোক ‘ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি’ (ইন্ডিয়ান কমিউনিস্ট পার্টি), বস্তুতপক্ষে এই নামে তিনি একটি সংগঠন বানিয়েও রেখেছিলেন। তবে এই মতটি বিতর্কে হেরে যায়। আন্তর্জাতিক চেতনার উপর জোর দিয়ে ‘ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি’ (কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া) নামটিই গৃহীত হয়। ১৯২৫ এর সম্মেলনে ভারতের নানা প্রান্ত থেকে প্রতিনিধিরা যোগ দেওয়ায় এটি যথার্থ অর্থে প্রতিনিধিত্বমূলক হয়ে ওঠে। ১৯২৫ এর কানপুর সম্মেলন থেকে যে কেন্দ্রীয় কমিটি নির্বাচন করা হয় তাঁর সম্পাদক হন এস. ভি. ঘাটে। সত্যভক্তও এই কেন্দ্রীয় কমিটিতে ছিলেন। তবে জাতীয়তা ও আন্তর্জাতিকতা সংক্রান্ত বিতর্ক ঘিরে সম্মেলনের মাস দেড়েক পরে তিনি পার্টি থেকে সরে যান।
(২)
পার্টি গঠনের পরবর্তী দিনগুলি (১৯২৫ – ১৯৩৫)
১৯২৫ থেকে ১৯২৯ সাল অবধি কমিউনিস্ট পার্টি গোপন সংগঠন হিসেবে কাজ করত আর নেতারা কাজ করতেন খোলা সংগঠন হিসেবে সামনে থাকা ‘ওয়ার্কাস অ্যান্ড পেজেন্ট পার্টি’র মধ্যে। ১৯২৫ এর নভেম্বর মাসের ১ তারিখে ‘ওয়ার্কাস অ্যান্ড পেজেন্ট পার্টি’র প্রতিষ্ঠা-সম্মেলনটি হয়েছিল। তখন এর নাম ছিল ‘লেবার স্বরাজ পার্টি অব দ্য ইন্ডিয়ান ন্যাশানাল কংগ্রেস’। নেতৃত্ব হিসেবে প্রকাশ্যে সামনে ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম, হেমন্ত কুমার সরকার, কুতুবউদ্দিন আহমেদ, সামসউদ্দিন হুসেন। তবে কমিউনিস্ট পার্টি তার কর্মীদের এই সংগঠনের ভেতরে গোপনে কাজ করার নির্দেশ জারি করেছিল। কমিন্টার্ন তথা ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিশিষ্ট নেতৃত্ব মানবেন্দ্রনাথ রায় নিজেই এই ‘ওয়ার্কাস অ্যান্ড পেজেন্ট পার্টি’র বৃদ্ধির কাজে হাত লাগিয়েছিলেন। কলকাতার পরে মুম্বাইতেও এর শাখা খোলা হয়। ঘাটে, যোগলেকর, নিম্বকর, টেঙ্গডি এরা মুম্বাই শাখার নেতৃত্বে ছিলেন। ১৯২৮ সালে পাঞ্জাব ও উত্তরপ্রদেশেও মিরাজকরের নেতৃত্বে এই পার্টির শাখা খোলা হয়েছিল। এরপরে একটি সর্বভারতীয় সম্মেলনও হয়। কিন্তু ১৯২৯ সালে কমিন্টার্ন তার দিশা বদলায় এবং ‘ওয়ার্কাস অ্যান্ড পেজেন্ট পার্টি’র বদলে সরাসরি কমিউনিস্ট পার্টির মাধ্যমে রাজনৈতিক কাজ চালানোর জন্য তার সদস্যদের নির্দেশ দেয়।
১৯২৫ থেকে ১৯৪২ পর্যন্ত সময়কালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের দমন-পীড়নের মুখে খোলা পার্টি হিসেবে কাজ করতে পারেনি। ১৯২২ – ১৯২৭ পেশোয়ার ষড়যন্ত্র মামলা, ১৯২৪-এ কানপুর বলশেভিক ষড়যন্ত্র মামলা, ১৯২৯ থেকে ১৯৩৩ পর্যন্ত কয়েক ধাপে মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা ইত্যাদির মাধ্যমে কমিউনিস্ট কর্মীদের উপর নির্যাতন ও ধরপাকড় অব্যাহত রেখেছিল ব্রিটিশ সরকার। তারপর ১৯৩৪-এ তারা কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধই ঘোষণা করে দেয়। ১৯৪২ সাল পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ ছিল। ১৯২৫ থেকে ১৯২৯ সাল অবধি ‘ওয়ার্কাস অ্যান্ড পেজেন্ট পার্টি’র মধ্যে কমিউনিস্ট কর্মীরা কাজ করতেন, তাছাড়াও খোলা কাজের জন্য কমিউনিস্ট কর্মীদের সামনে ছিল বেশ কিছু গণসংগঠন। এর মধ্যে প্রধান ছিল শ্রমিক সংগঠন এ. আই. টি. ইউ. সি.।
১৯২০ সালে কেন্দ্রীয় শ্রমিক সংগঠন এ. আই. টি. ইউ. সি.-র প্রতিষ্ঠা হয়। লোকমান্য তিলক বা লালা লাজপত রাইয়ের মতো কংগ্রেসের ভেতরে থাকা জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বের বিশেষ ভূমিকা ছিল এই সম্মেলন আয়োজনের ক্ষেত্রে। লাজপত রাই এ. আই. টি. ইউ. সি.-র প্রথম সম্মেলনে সভাপতি ছিলেন। জাতীয়তাবাদীদের নেতৃত্বে আয়োজিত এই সম্মেলন কিন্তু খুব স্পষ্টভাবেই রুশ বিপ্লব, শ্রমিক শ্রেণির রাজনীতি, পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা ও সমাজতন্ত্রের পথের কথা বলেছিল। এই থেকে বোঝা যায় সেই সময় যারা তথাকথিত কমিউনিস্ট ছিলেন না, রুশ বিপ্লব তাদেরও কতটা প্রভাবিত করেছিল। এই প্রভাব বোঝার জন্য লালা লাজপত রাইয়ের সভাপতির অভিভাষণটি বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। এই অভিভাষণে লাজপত রাই বলেন যে এখন দু’ ধরনের কথা আমাদের সামনে আছে। এক ধরনের কথা বলেন পুঁজিবাদী মহল ও রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরা। ব্রিটেনের উইনস্টন চার্চিলের কথাবার্তায় বা লন্ডন ‘টাইমস’-এর মতো সংবাদপত্রে আমরা এর অনুরণন পাই। আর এক ধরনের সত্য তুলে ধরেন বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন, লন্ডনের ‘ডেইলি হেরাল্ড’-এর মতো কাগজ এবং সোভিয়েত রাশিয়ার মতো শ্রমিক রাষ্ট্র। আমাদের সরকার কেবল প্রথম ধরনের কথাকেই আমাদের সামনে তুলে ধরে আর দ্বিতীয় পক্ষের কথাকে আড়াল করতে চায়। লাজপত রাই সুস্পষ্টভাবে জানান যে তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলছে সমাজতান্ত্রিক মহল, এমনকী বলশেভিক মহল যে সত্যকে তুলে ধরছে তা পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী মহলের পক্ষ থেকে তুলে ধরা সত্যর থেকে অনেক ভালো, বিশ্বাসযোগ্য ও মানবিক।
এ. আই. টি. ইউ. সি.-র প্রথম সম্মেলন থেকে শ্রমিক শ্রেণির উদ্দেশ্যে সভাপতি লাজপত রাই যে বার্তা দিয়েছিলেন সেখানে তিনটি মূল ধারণা ছিল-
১) শ্রমিকদের শ্রেণি-সচেতন হতে হবে, কোনটা নিজেদের শ্রেণির জন্য ভালো তা উপলব্ধি করা দরকার।
২) আন্তর্জাতিকভাবে শ্রমিক শ্রেণি যে একই সুতোয় গাঁথা, একই লড়াইয়ের অংশীদার তা উপলব্ধি করতে হবে।
৩) শ্রমিকদের লড়াই আন্দোলনে আন্তর্জাতিক শ্রেণিচেতনার সঙ্গে জাতীয় বৈশিষ্ট্যকেও মাথায় রাখতে হবে।
ডিক্টেটরশিপ অব দ্য প্রলেতারিয়েতের ধারণাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরলেও জাতীয় বৈশিষ্ট্যকে মাথায় রাখার কথা লাজপত রাই বারবার বলেছেন। রুশ শ্রমিকদের লড়াই ও বিজয়কে আদর্শ মনে করলেও ভারতের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যকে মাথায় না রাখলে যে বিপদ হবে, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লাজপত রাই হাঙ্গেরির নেতা বেলা কুনকে লেনিনের লেখা সেই চিঠির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, যেখানে রুশ বৈশিষ্ট্যকে হাঙ্গেরির মতো আলাদা একটা দেশে নকল করতে যাওয়ার বিপদ লেনিন নিজেই খেয়াল করিয়ে দিয়েছিলেন।
এ. আই. টি. ইউ. সি. সূচনালগ্ন থেকেই শ্রমিক শ্রেণির আন্তর্জাতিকতা, সমাজতন্ত্রের স্বপ্নের সুরে বাঁধা থাকায় এর মধ্যে কমিউনিস্ট নেতা ও কর্মীদের কাজ করা সহজ হয়েছিল। ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত কমিউনিস্টরা সরকারী দমন-পীড়নের মুখে সরাসরি পার্টি ব্যানার নিয়ে যখন সামনে আসতে পারছিলেন না, তখন এ. আই. টি. ইউ. সি. শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে তাদের রাজনীতি নিয়ে যাবার পথ করে দিয়েছিল। কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম সাধারণ সম্পাদক এস. ভি. ঘাটে পরবর্তীকালে এ. আই. টি. ইউ. সি.-র অন্যতম প্রধান নেতৃত্ব হয়ে ওঠেন ও এই সংগঠনকে কমিউনিস্ট মনোভাবাপন্ন করে তোলেন।
(৩)
কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রথম পর্বে বাংলা (১৯২৫ – ১৯৩৫)
দ্বিতীয় দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাংলায় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন চারজন। মুজফফর আহমেদ, আব্দুল হালিম, আব্দুর রেজ্জাক খাঁ ও শামসুল হুদা। গ্রেট ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ফিলিপ স্প্রাট তখন কলকাতায় ছিলেন এবং তিনিও এদের সঙ্গে বাংলায় কমিউনিস্ট পার্টি গড়ার কাজে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন। আরো কয়েকজন ছিলেন যারা সে সময় থেকেই মতাদর্শে কমিউনিস্ট হলেও বিশের দশকে অন্তত পার্টির সদস্যপদ নেননি। পরবর্তীকালে এদের মধ্যে স্বামী বিবেকানন্দের ছোটোভাই জার্মান ফেরৎ বিপ্লবী ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত ছাড়া বাকীরা সকলেই – বঙ্কিম মুখার্জী, মণি সিংহ, কালী সেন, আব্দুল মোমিন, ধরণী গোস্বামী, গোপেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, গোপাল বসাক, রাধারমণ মিত্র, নীরোদ চক্রবর্তী, পিয়ারী মোহন দাস, নলীন্দ্রমোহন সেন, আশু রায় প্রমুখ – কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন। ১৯২৫ থেকে ১৯২৯ সাল পর্যন্ত এরা সকলেই বঙ্গীয় শ্রমিক ও কৃষক দল (ওয়ার্কাস অ্যান্ড পেজেন্ট পার্টি)-এ কাজ করতেন। ১৯২৫ সালের ১ নভেম্বর এই পার্টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কুতুবউদ্দিন আহমেদ, হেমন্তকুমার সরকার, কাজী নজরুল ইসলাম এবং শামসুদ্দিন হুসেন এরা প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ছিলেন। এই দলের যথেষ্ট জনভিত্তি তৈরি হয়েছিল। ১৯২৮ সালের ৩০ নভেম্বর এই পার্টির নেতৃত্বে ত্রিশ হাজার শ্রমিকের এক বিরাট মিছিল পার্ক সার্কাস ময়দানে অনুষ্ঠিত ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনে গিয়ে ‘পূর্ণ ও আপসহীন স্বাধীনতা’র দাবী পেশ করে।
১৯২৮ সালে কমিন্টার্নের ষষ্ঠ কংগ্রেসে গৃহীত হয় ‘থিসিস অন দ্য রিভোলিউশনারি মুভমেন্ট ইন দ্য কলোনিজ অ্যান্ড সেমি কলোনিজ’ যা ‘কলোনিয়াল থিসিস’ নামেই সাধারণভাবে পরিচিত৷ এই থিসিসে কমিউনিস্টদের দেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য কমিউনিস্টদের পূর্ণ শক্তিতে ঝাঁপিয়ে পড়ার কথা বলা হয়। সেই সঙ্গে বলা হয় ভারতে কমিউনস্টদের কাজ হবে সমাজতন্ত্রের আদর্শ প্রচারের পাশাপাশি কংগ্রেসের বুর্জোয়া স্বার্থের আদর্শের মুখোশ খুলে দেওয়া। ‘ওয়ার্কাস অ্যান্ড পেজেন্ট পার্টি’র কাজ থেকেও কমিউনিস্টদের সরে আসতে বলা হল। এই থিসিস ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ও কলকাতার কমরেডরা অনেকে মেনে নিলেও কোনো কোনো নেতা এটা মানতে পারেননি। মানবেন্দ্রনাথ রায়, সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর, ক্লেমেন্স পাম দত্ত, রজনী পাম দত্ত প্রমুখ নেতারা মনে করেছিলেন এই সিদ্ধান্ত ভুল। এই সময়েই কমিন্টার্নে নীতিগত মতপার্থক্য সহ বেশ কিছু কারণে মানবেন্দ্রনাথ রায় কমিউনিস্ট ইন্টার্ন্যাশানাল ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি থেকে বহিষ্কৃত হন। ভারতে ফিরে প্রথমে কংগ্রেসে ও তারপর নিজের তৈরি সংগঠনে কাজ করতে থাকেন। ক্রমশ মার্কসবাদ থেকে সরে আসেন রাডিকাল হিউম্যানিজম-এর দিকে।
সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯২৬ সাল থেকেই ‘ওয়ার্কাস অ্যান্ড পেজেন্ট পার্টি’তে সক্রিয় ছিলেন। ১৯২৭ সালে তিনি ইউরোপে চলে যান ও ১৯২৮ সালে কমিন্টার্নের ষষ্ঠ কংগ্রেসে যোগ দেন। এই কংগ্রেসের কলোনিয়াল থিসিস তিনিও মানতে পারেননি। ১৯৩৪ সালে দেশে ফিরে তিনি ‘সি. পি. আই.’ এর সঙ্গে থাকেননি, ‘কমিউনিস্ট লীগ অব ইন্ডিয়া’ নামে এক নতুন সংগঠন তৈরি করেন। ১৯৪২ সালে এই দলের নতুন নাম হয় ‘রিভোলিউশনারি কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া’ (আর. সি. পি. আই.)। বাংলা ছাড়াও আসামে এই দলের উল্লেখযোগ্য সংগঠন ছিল।
১৯২৮ সালের ২১ থেকে ২৪ ডিসেম্বর কমিউনিস্টরা যখন ‘ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্ট পার্টি’র সর্বভারতীয় সম্মেলন করেন তখনও কমিন্টার্নের ষষ্ঠ কংগ্রেসের পরিবর্তিত নীতিমালার নির্দেশিকা তাদের কাছে এসে পৌঁছায়নি। ফলে এই সম্মেলনে সর্বভারতীয় সংগঠন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন তারা। কংগ্রেসের নেতৃত্ব বুর্জোয়াদের হাতে থাকলেও তার মধ্যেই কাজ করে বিপ্লবী জনসাধারণকে ওয়ার্কাস অ্যান্ড পেজেন্ট পার্টির মধ্যে টেনে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। কিন্তু কমিন্টার্নের সদ্য সমাপ্ত ষষ্ঠ কংগ্রেসের নীতিমালা এসে পৌঁছনোর পর এদেশের কমিউনিস্টরা নীতি বদলান। কমিন্টার্নের নির্দেশের আলোতে তৈরি করেন ‘ড্রাফট প্ল্যাটফর্ম অব অ্যাকশান অব দ্য কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া’। ১৯৩০ সালে গৃহীত এই নীতিমালায় বলা হল এদেশে কমিউনিস্টদের প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য হল ভারতীয় বিপ্লবের বর্তমান স্তরে সশস্ত্র উপায়ে পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন। পাশাপাশি এই ড্রাফট কংগ্রেসের সংস্কারপন্থী নেতৃত্বের পাশাপাশি কংগ্রেসের বামপন্থী অংশ – যার মধ্যে ছিলেন জহরলাল নেহরু ও সুভাষ বোস – তাদেরকেও তীব্রভাবে আক্রমণ করে। বলা হয় বাম বুলি-সর্বস্বতার আড়ালে তারা বুর্জোয়া নীতিমালাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন এবং বিপ্লবী জনগণকে বিভ্রান্ত করছেন। এর মধ্যে দিয়ে তারা আসলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে কংগ্রেসের বোঝাপড়ার রাস্তাকেই প্রশস্ত করছেন।
সি. পি. আই. এর নয়া দৃষ্টিভঙ্গি ও আক্রমণাত্মক প্রচারের কারণে কমিউনিস্ট পার্টি জাতীয়তাবাদী গণসংগ্রাম থেকে বেশ খানিকটা বিচ্ছিন্নতার মধ্যে পড়ে। ১৯৩০ এর ১২ মার্চ থেকে মহাত্মা গান্ধী ডান্ডি অভিযান শুরু করেন এবং সেই সূত্র ধরে দেশব্যাপী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী গণ আইন অমান্য আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। কমিউনিস্ট পার্টি এই আন্দোলন থেকে গোটা দেশে এবং বাংলায় শুধু দূরে সরে থাকে তাই নয়, সমগ্র আন্দোলনটিকেই বুর্জোয়া সংস্কারবাদী বলে বর্ণনা করে তার বিরোধিতাও করে। অনেক কমিউনিস্ট মনোভাবাপন্নই সি. পি. আই. এর নয়া নীতি মানতে পারেননি। তারা বেশ কিছু ছোটো ছোটো কমিউনিস্ট দল বা গ্রুপ তৈরি করে আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে যান। সি. পি. আই. ছাড়াও সেই সময় আরো যে সব বাম ও কমিউনিস্ট পার্টি সক্রিয় ছিল তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল-
১) সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট লীগ অব ইন্ডিয়া (পরবর্তীকালে নাম বদলে রেভোলিউশনারি কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (আর. সি. পি. আই.)
২) মানবেন্দ্রনাথ রায়ের দি রেভেলিউশনারি পার্টি অব দি ইন্ডিয়ান ওয়ার্কিং ক্লাসেস
৩) নীহারেন্দু দত্ত মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বেঙ্গল লেবার পার্টি
৪) বেঙ্গল কীর্তি কিষাণ পার্টি
৫) কারখানা গ্রুপ
৬) লাল নিশান গ্রুপ
৭) ইন্ডিয়ান প্রলেতারিয়ান রেভেলিউশনারি পার্টি
৮) সাম্যরাজ পার্টি
৯) যশোর খুলনা যুব সঙ্ঘ
১০) বেঙ্গল লেবার অ্যাসোসিয়েশন।
এছাড়া ছিল কংগ্রেস সোশ্যালিস্ট পার্টি। তারা নিজেদের সব সময়েই সোশ্যালিস্ট বলেই পরিচয় দিত, কমিউনিস্ট হিসেবে নয়। এই দলগুলির মধ্যে কংগ্রেস সোশালিস্ট পার্টি এবং সৌমেন্দ্রনাথ ও মানবেন্দ্রনাথের পার্টি ছাড়া বাকীদের অধিকাংশই ১৯৩৫ সালে কমিন্টার্নের সপ্তম অধিবেশনের পর নতুন নীতির পরিপ্রেক্ষিতে সি. পি. আই. তে যুক্ত হয়ে যায়।
১৯২৯ থেকে ১৯৩৫ পর্যন্ত সি. পি. আই. বাম সংকীর্ণতাবাদী লাইন গ্রহণ করে জাতীয় আন্দোলন থেকে দূরে থাকলেও গোটা দেশে এবং বাংলায় বেশ কিছু বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য শ্রমিক আন্দোলন ও ধর্মঘট সংগঠিত করে। ১৯২৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে খড়গপুরের বেঙ্গল নাগপুর রেলওয়ের শ্রমিক ধর্মঘট দিয়ে এই প্রবাহের সূত্রপাত হয়৷ তারপর ১৯২৮ এর মার্চ থেকে জুলাই মাস অবধি হয় হাওড়ার লিলুয়ায় ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ে কারখানার শ্রমিক ধর্মঘট। ১৯২৮ সালে মার্চ মাসে প্রথম দফায় এবং জুন-জুলাই মাসে দ্বিতীয় দফায় কলকাতায় ঝাড়ুদার ও মেথর ধর্মঘট হয়। হাওড়ায় এই ধর্মঘট হয় এপ্রিল মাসে। ১৯২৮ এর এপ্রিলে হাওড়ার বার্নস কোম্পানি ও জেসপে শ্রমিক ধর্মঘট হয়। সব থেকে বেশি হয় চটকল ধর্মঘট। ১৯২৮ এর মার্চ এপ্রিল-মে মাসে হাওড়ার লাডলো মিলে শ্রমিক ধর্মঘট হয়। ১৯২৮ এর জুলাই মাস থেকে টানা সুদীর্ঘ ছয় মাস হাওড়া জেলার বাউড়িয়ার ফোর্ট গ্লস্টার জুট মিলে শ্রমিক ধর্মঘট হয়। এই শ্রমিকদের সমর্থনেও নানা জায়গায় ধর্মঘট চলে। ১৯২৮ এর মে মাসে কলকাতার চিৎপুর ও কাশীপুরে জুট প্রেস ধর্মঘট হয়। ১৯২৯ সালের জানুয়ারিতে কলকাতার ক্লাইভ জুট মিলে ধর্মঘট হয়। এই সব ধর্মঘট আন্দোলনের সূত্র ধরে ১৯২৯ সালের জুলাই মাস থেকে শুরু হয় বাংলা চটকল শ্রমিকদের প্রথম সাধারণ ধর্মঘট এবং তা প্রায় দেড় মাস চলে৷
আন্দোলনের ঢেউকে আটকাতে ব্রিটিশ সরকার মীরাট ষড়যন্ত্র মামলায় কমিউনিস্ট নেতা কর্মীদের ১৯২৯ সালের মার্চ মাস থেকে গ্রেপ্তার করতে শুরু করে। সামনের সারির নেতৃত্বের গ্রেপ্তারের পর কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য ১৯৩০ সালে কলকাতায় কমিউনিস্ট পার্টির একটি অস্থায়ী কমিটি বা নিউক্লিয়াস তৈরি করা হয়। পরে এই কলকাতা কমিটিই বঙ্গীয় প্রাদেশিক কমিটিতে রূপান্তরিত হয়। এর নেতা ছিলেন সুধাংশুকুমার অধিকারী। তিনি গ্রেপ্তার হয়ে যাওয়ায় এই কমিটির কাজ ধাক্কার মুখে পড়ে৷
১৯৩১ সালে সোমনাথ লাহিড়ী কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন। ১৯৩১-৩২ সালের মধ্যে মন্মথ চ্যাটার্জী, সত্য ঘোষ, সরোজ মুখোপাধ্যায়, মহম্মদ ইসমাইল, আব্দুল মোমিন প্রমুখরা কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। বঙ্কিম মুখার্জী যোগ দেন ১৯৩৬ সালে। এরা বিভিন্ন শ্রেণি আন্দোলনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেন। সোমনাথ লাহিড়ীর চেষ্টায় গড়ে ওঠে ‘ইস্টবেঙ্গল অ্যান্ড ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ে ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন’। মহম্মদ ইসমাইলের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ‘ক্যালকাটা ট্রামওয়েজ ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন’। কমিউনিস্ট সংগঠকদের মিলিত প্রচেষ্টায় এই সময় আরো যে সব জায়গায় ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে ওঠে তার মধ্যে ছিল ‘বাস ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন’, ‘সিটি মটর অ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন’, ‘বেঙ্গল ম্যাচ ফ্যাক্টরি ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন’, ‘মেটিয়াবুরুজ ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন’, ‘কেশোরাম কটন মিল ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন’ ইত্যাদি। ১৯৩৩ সালে কমিউনিস্ট পার্টির কলকাতা কমিটির উদ্যোগে একটি সর্বভারতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। কানপুর সম্মেলন থেকে নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক এস. ভি. ঘাটে তখন মীরাট ষড়যন্ত্র মামলায় জেল-বন্দী। আরো অনেকেই জেলে। এই পরিস্থিতিতে কলকাতা সম্মেলনে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয় ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন গঙ্গাধর অধিকারী।

মিরাট সড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্তরা
কমিউনিস্টদের কার্যকলাপ বৃদ্ধি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে শঙ্কিত করে। ১৯৩৫ সালে বাংলার সরকার একটি গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে ১৩টি রাজনৈতিক ও শ্রমিক সংগঠনকে বে-আইনি বলে ঘোষণা করে। কমিউনিস্ট পার্টির কলকাতা কমিটি ও তার নিয়ন্ত্রণাধীন কয়েকটি ট্রেড ইউনিয়ন এই তালিকায় ছিল। এর পর থেকে কমিউনিস্ট পার্টি তার সব কাজকর্মই গোপনে চালাতে বাধ্য হয়। তা সত্ত্বেও আন্দোলন ও সংগঠন প্রসারে ভাঁটা পড়েনি। দু’মাসের মধ্যেই কেশোরাম কটন মিলসের পাঁচ হাজার শ্রমিক তাদের নেতৃত্বে ধর্মঘট করে। বাংলার কমিউনিস্টরা বুঝিয়ে দেন নিষিদ্ধ করে জোয়ারকে ঠেকিয়ে রাখা যাবে না।
আকর –
১) ডকুমেন্টস অব দ্য হিস্ট্রি অব দ্য কমিউনিস্ট মুভমেন্ট – ভল্যুম ওয়ান টু এইট – গঙ্গাধর অধিকারী ও অন্যান্য (সম্পাদিত) – পিপলস পাবলিশিং হাউস।
২) ডকুমেন্টস অব দ্য কমিউনিস্ট মুভমেন্ট ইন ইন্ডিয়া – ভল্যুম ওয়ান টু টোয়েন্টি ফাইভ – জ্যোতি বসু ও অন্যান্য (সম্পাদিত) ন্যাশানাল বুক এজেন্সি।
৩) কমিউনিস্ট মুভমেন্ট ইন ইন্ডিয়া – অরিন্দম সেন ও পার্থ ঘোষ – সি. পি. আই. (এম. এল.) লিবারেশন।
৪) বাংলার কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাস অনুসন্ধান – খণ্ড ১ থেকে ১৫ – ভানুদেব দত্ত ও অন্যান্য (সম্পাদিত) – মনীষা পাবলিকেশন।
৫) বাংলার কমিউনিস্ট আন্দোলন দলিল ও প্রাথমিক তথ্য – খণ্ড ১ থেকে ৫ – অনিল বিশ্বাস ও অন্যান্য (সম্পাদিত) – এন. বি. এ.।