গোসাঁই পূরণ গির ও ভোটবাগান মঠ
কলকাতার খুব কাছেই গঙ্গার অন্য তীরে হাওড়ায় প্রায় আড়াই শো বছর প্রাচীন ভোটবাগান (অর্থাৎ তিব্বতি উদ্যান) মঠ আজ সবার স্মৃতি থেকে প্রায় বিলুপ্ত। অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে স্থাপিত শৈব মঠে রূপান্তরিত এই বৌদ্ধ মঠ নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত উত্তর ভারতের শৈব দশনামী গোসাঁই সাধু পূরণ গির, যিনি বাংলার ইংরেজ কোম্পানির শাসকদের প্রতিনিধি হয়ে কলকাতা থেকে ভুটান, তিব্বত ও চীনে যাত্রা করেছেন, তাঁর কথাই বা কতজন মনে রেখেছেন? আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, বাংলার মাটিতে একমাত্র তিব্বতি মঠের নির্মাণ কাহিনির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস আর তিব্বতের তত্কালীন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রধান পাঞ্চেন লামা। আজ অবহেলা আর উপেক্ষার পরিণামে জরাজীর্ণ অবস্থায় বিদ্যমান সেই মঠ আর তার মঠের প্রতিষ্ঠাতা গোসাঁই সাধু পূরণ গিরকে নিয়ে বাংলা ভাষায় বিগত শতাধিক বছর ধরে বেশ কয়েকটি নিবন্ধ ও একটি বই লেখা হলেও১ এই মঠ আর সাধুর ইতিহাস আজও অনেকের কাছেই অজানা। তাই আড়াই শতকের ইতিহাসের দিকে আর একবার ফিরে দেখা যেতে পারে।
দশনামী সম্প্রদায়
ভোটবাগান মঠের প্রতিষ্ঠাতা পূরণ গির ছিলেন শৈব দশনামী সম্প্রদায়ের অন্তর্গত গিরি শাখার গোসাঁই সাধু। সেই কারণে প্রথমে দশনামী সম্প্রদায়ভুক্ত গোসাঁই সাধুদের সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত উল্লেখের প্রয়োজন আছে। গোবিন্দ সদাশিব ঘুর্য়ে ভারতের শৈব সাধুদের প্রসঙ্গে লিখেছেন, সন্ন্যাসীদের (অর্থাৎ শৈব সাধুদের) সাধারণত ৪টি শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয় – দশনামী, দণ্ডী, পরমহংস ও ব্রহ্মচারী। তিনি এও উল্লেখ করেছেন এই শ্রেণিবিভাগ সন্ন্যাসীদের সম্পর্কে ধারণার বিভ্রান্তি থেকে উদ্ভূত। তাঁর সংগৃহীত তথ্য থেকে এ কথা স্পষ্ট তাঁর উল্লিখিত ৪টি শ্রেণির মধ্যে আসলে দশনামী নামে জ্ঞাত একটি সম্প্রদায়ই বিদ্যমান২ এবং সন্ন্যাসজীবন পালনের রীতির ভিত্তিতে তাঁদের দণ্ডী, পরমহংস বা ব্রহ্মচারী বলে অভিহিত করা হয়। ঘুর্য়ের আগে যোগেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য লিখেছেন দশনামী সাধুদের জীবনচর্যার ভিত্তিতে ৫টি শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয় – দণ্ডী, পরমহংস, সন্ন্যাসী, ব্রহ্মচারী ও গৃহস্থ গোসাঁই। তাঁর মতে প্রথম ৪টি শ্রেণির সাধুদের জীবনচর্যার মধ্যে প্রকৃত পার্থক্য খুবই কম।৩
শৈব দশনামী সম্প্রদায়ের সাধুদের এই বিশেষ নামে পরিচিত হওয়ার কারণ তাঁদের দীক্ষাগ্রহণের পর গুরুর প্রদত্ত সন্ন্যাসজীবনের জন্য নতুন নামের শেষে ব্যবহৃত ১০টি নাম অর্থাৎ বৈশিষ্ট্যসূচক শব্দ দিয়ে পরিচিতি লাভ। এই সম্প্রদায়ের সাধুদের নামের শেষে গিরি, পুরী, ভারতী, বন, অরণ্য, পর্বত, সাগর, তীর্থ, আশ্রম ও সরস্বতী, এই ১০টি শব্দ যুক্ত করে তাঁদের সম্প্রদায়গত পরিচিতি নির্মিত হয় (অবশ্য দশনামী যোদ্ধা সন্ন্যাসীদের অগ্নি আখাড়ার সাধুদের নামের শেষে এই ১০টি নামের পরিবর্তে আনন্দ, চৈতন্য, স্বরূপ ও প্রকাশ যুক্ত করে সম্প্রদায়গত পরিচিতি নির্মিত হয়)।
দশনামী সম্প্রদায়ভুক্ত সন্ন্যাসীদের নিজস্ব ঐতিহ্য অনুসারে তাঁদের সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা অদ্বৈত বৈদান্তিক সন্ন্যাসী আদি শঙ্করাচার্য। কিন্তু এই ঐতিহ্যের সমর্থনে যে কোনও ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই আধুনিক বিদ্বানরা সেই দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।৪ শঙ্করাচার্য স্থাপিত বলে জ্ঞাত মঠগুলির ঐতিহ্য অনুযায়ী আদি শঙ্করাচার্যের জীবনকাল ষষ্ঠ বা পঞ্চম শতাব্দী সাধারণপূর্বাব্দ। অবশ্য এই ঐতিহ্যগুলি চতুর্দশ-পঞ্চদশ শতক সাধারণাব্দে উদ্ভূত বলে বর্তমানে মনে করা হয়। আধুনিক বিদ্বানদের মধ্যে অনেকের অনুমান শঙ্করাচার্যের জীবনকাল ৭৮৮-৮২০ সাধারণাব্দ। কিন্তু শঙ্করাচার্যের যে জীবনী গ্রন্থগুলিতে উল্লিখিত শ্লোকের ভিত্তিতে তাঁরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, কোনওটিই ষোড়শ শতাব্দী সাধারণাব্দের আগে রচিত নয়। শঙ্করাচার্য নবম শতক সাধারণাব্দে বিদ্যমান ছিলেন বলেও অনুমান করা হয়েছে। শঙ্করাচার্যের রচনায় উল্লিখিত পূর্বসূরিদের জীবৎকাল এবং তাঁর রচনা উল্লেখকারী উত্তরসূরিদের জীবৎকালের ভিত্তিতে তাঁর জীবনকাল সপ্তম শতাব্দী সাধারণাব্দের দ্বিতীয়ার্ধ বলে অনুমান করা যায়।৫
যদুনাথ সরকার জানিয়েছেন, দশনামী সম্প্রদায়ের বিদ্বান সন্ন্যাসীরা মনে করেন, আদি শঙ্করাচার্যের শিষ্য ও শৃঙ্গেরি শারদা পীঠের পরবর্তী শঙ্করাচার্য, সুরেশ্বর এই সম্প্রদায়ের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা।৬ পাণ্ডুরঙ্গ বামন কানে দশনামী সম্প্রদায়ের যে ঐতিহ্যের উল্লেখ করেছেন, সেই ঐতিহ্য অনুযায়ী তীর্থ ও আশ্রম শাখা আদি শঙ্করাচার্যের শিষ্য পদ্মপাদ; বন ও অরণ্য শাখা আরেক শিষ্য হস্তামলক; গিরি, পর্বত ও সাগর শাখা অন্য এক শিষ্য ত্রোটক এবং পুরী, ভারতী ও সরস্বতী শাখা সুরেশ্বর থেকে শিষ্য পরম্পরায় উদ্ভূত।৭
পাণ্ডুরঙ্গ বামন কানে জানিয়েছেন, দুটি অন্ত-মধ্যযুগের স্মৃতিনিবন্ধ বৈদ্যনাথ দীক্ষিত রচিত ‘স্মৃতিমুক্তাফল বর্ণাশ্রমকাণ্ড’ ও বিশ্বেশ্বর সরস্বতী রচিত ‘যতিধর্মসংগ্রহ’ গ্রন্থে দশনামী সম্প্রদায়ের শাখাগুলির নামের উল্লেখ রয়েছে।৮ এই দুটি গ্রন্থেই সন্ন্যাস দীক্ষার সময় গুরুর শিষ্যকে নামকরণ প্রসঙ্গে একই শ্লোকের উল্লেখ দেখা যায় – “তীর্থ, আশ্রম, বন, অরণ্য, গিরি, পর্বত, সাগর, সরস্বতী, ভারতী ও পুরী, যতিদের দশটি নাম।”৯ সম্ভবত এই শ্লোকটিই সংস্কৃত গ্রন্থে দশনামী সম্প্রদায় সম্পর্কে প্রাচীনতম উল্লেখ। বিশ্বেশ্বর সরস্বতী দশনামী সম্প্রদায়ের প্রমুখ বিদ্বান সন্ন্যাসী মধুসূদন সরস্বতীকে কাশীতে সন্ন্যাস দীক্ষা দিয়েছেন; মধুসূদন সরস্বতী তাঁর গুরুকে দশশ্লোকী গ্রন্থের ব্যাখ্যামূলক সিদ্ধান্তবিন্দু মঙ্গলাচরণ শ্লোকে শঙ্করাচার্যের নব অবতার বলে উল্লেখ করেছেন।১০ সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্তের মতে বিশ্বেশ্বর সরস্বতীর শিষ্য মধুসূদন সরস্বতী ষোড়শ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বিদ্যমান ছিলেন।১১ অতএব, বিশ্বেশ্বর সরস্বতীর জীবৎকাল পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ দিক থেকে ষোড়শ শতাব্দীর গোড়ার দিক পর্যন্ত বলে অনুমান করা যায়। আধুনিক বিদ্বানরা বৈদ্যনাথ দীক্ষিতের স্মৃতিমুক্তাফল গ্রন্থের রচনাকাল আনুমানিক ১৬০০ সাধারণাব্দ বলে মনে করেন।১২ দশনামী সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীদের ব্যবহৃত নামের শেষাংশগুলির এর আগে উল্লেখ পাওয়া গেলেও দশনামী সম্প্রদায় বা এই সম্প্রদায়ভুক্ত ১০টি শাখার নামের একত্রে উল্লেখ ষোড়শ শতাব্দী সাধারণাব্দের পূর্ববর্তী কোনও সময়ে পাওয়া যায়নি।
সপ্তদশ শতক সাধারণাব্দ থেকে দশনামী সম্প্রদায়ের যোদ্ধা সাধুদের প্রধানত দুটি নামে উল্লেখ করতে দেখা যায় – গোসাঁই (বাংলা গোসাঞি) ও নাগা। গোসাঁই সাধুরা বস্ত্র পরিধান করেন, স্থায়ীভাবে একস্থানে, মূলত কোনও মঠে, বসবাস করেন আর নাগা সন্ন্যাসীরা নগ্ন হয়ে থাকেন এবং অধিকাংশ সময় পরিব্রাজকের জীবনযাপন করেন। তবে, সব গোসাঁই সাধুই যোদ্ধা সন্ন্যাসী নন। গোসাঁই সাধুদের মারাঠি ভাষায় গোসাবী বলা হয়, সম্ভবত গোসাঁই ও গোসাবী উভয় শব্দই সংস্কৃত গোস্বামী শব্দ থেকে উদ্ভূত। সম্ভবত গোসাঁই কথাটির ব্যবহার প্রথমে অন্ত-মধ্যযুগের বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের ধর্মীয় গুরুদের জন্য শুরু হয়েছিল। উত্তর ভারতের গোসাঁই বা দাক্ষিণাত্যের গোসাবী সাধুদের অনেকেই ছিলেন বিবাহিত গৃহস্থ। তাঁরা মূলত তাঁদের বংশানুক্রমিক শিষ্যদের ধর্মগুরু এবং শিষ্যদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পৌরোহিত্য করতেন। তবে বিগত কয়েক শতকে তাঁরা অন্য পেশা, বিশেষত কৃষির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। দাক্ষিণাত্যের গোঁড়া ব্রাহ্মণরা গোসাবীদের বিবাহের কারণে তাঁদের আধ্যাত্মিক আদর্শভ্রষ্ট ব্রাত্য ও শূদ্রের সমান বলে মনে করেন।১৩ গুজরাতে বিংশ শতকের গোড়াতে গোসাঁই অতীতদের (অর্থাৎ সাধুদের) মধ্যে বিবাহিত গৃহস্থদের ঘরবারী ও ব্রহ্মচারীদের মঠধারী বলে উল্লেখ করা হতো।১৪ অন্ত-মধ্যযুগের দাক্ষিণাত্যে ব্রাহ্মণ বা ক্ষত্রিয়দের গোসাবী হওয়ার পর অন্যান্য জাতির সঙ্গে আহার ও সম্পর্ক স্থাপনের কারণে পূর্বের জাতিগত পরিচিতি চিরকালের জন্য ত্যাগ করতে হতো। সেই কারণে দাক্ষিণাত্যে গোসাবী ধর্মীয় সম্প্রদায় থেকে বিশিষ্ট জাতিগত পরিচিতিতে পরিবর্তিত হয়েছে।১৫ বর্তমানে উত্তর ভারতের দশনামী আখাড়াগুলির সাধুদের ক্ষেত্রে নাগা কথাটি ব্যবহৃত হলেও গোসাঁই কথাটির আর প্রচলন নেই, সম্ভবত, তারই পরিবর্তে পরমহংস কথাটি প্রচলিত হয়েছে।
সওদাগরি ও মহাজনি ব্যবসা
জয়নারায়ণ ঘোষাল (১৭৫২-১৮২০ সাধারণাব্দ) অষ্টাদশ শতক সাধারণাব্দের শেষ দিক থেকে তাঁর কাশীবাসের সময় প্রত্যক্ষদর্শীর অভিজ্ঞতা তাঁর ‘কাশী পরিক্রমা’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। তিনি এই গ্রন্থে (১১.১০৭-১০৮) বারাণসীর সেই সময়কার দশনামী সম্প্রদায়ভুক্ত সাধুদের সম্পর্কে পয়ার ছন্দে লিখেছেন: “দশনামী সন্ন্যাসীর কত শত মঠ।/ বাহ্যে উদাসীন মাত্র গৃহী অন্তঃপট॥/ সদাগরি মহাজনি ব্যবসা সভার।/ এক এক জনার বাটী পর্ব্বত আকার॥১৬
অন্ত-মধ্যযুগ থেকে প্রায় আধুনিক যুগ পর্যন্ত দশনামী গোসাঁই সাধুদের অর্থ উপার্জনের অন্যতম দুটি মুখ্য পন্থা ছিল মহাজনি ব্যবসা অর্থাৎ টাকা ধার দিয়ে সুদ সংগ্রহ এবং সওদাগরি অর্থাৎ উপমহাদেশের অভ্যন্তরীণ ও বহির্বাণিজ্যে অংশগ্রহণ। অষ্টাদশ শতক সাধারণাব্দের গোড়ার দিক থেকে মোগল শাসক ও অভিজাতদের অভ্যন্তরীণ ও বহির্বাণিজ্যে অংশগ্রহণ ক্ষীণ হয়ে আসার পর উত্তর ও পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত দশনামী সম্প্রদায়ের মঠগুলির মহান্ত পদে আসীন গোসাঁই সাধুদের অনেকেই মহাজনি কারবার ও সওদাগরি ব্যবসায়ে বেশি করে অংশগ্রহণ করতে শুরু করেন এবং মঠগুলিকে অর্থ বা পণ্য হস্তান্তরণের সুবিধার জন্য বাণিজ্য কেন্দ্র হিসাবে ব্যবহার করা শুরু হয়। সওদাগরি ব্যবসার জন্য পণ্য পরিবহনের মাধ্যম ছিলেন মহান্তের চেলারা, মুখ্যত মঠের সঙ্গে যুক্ত পরিব্রাজক নাগা সাধুদের সশস্ত্র দলসমূহ। সেই সময়কার অন্য বণিকদের সঙ্গে দশনামী গোসাঁই সাধুদের মূল পার্থক্য ছিল, ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত দশনামী মঠগুলির মহান্তরা একক বাণিজ্য সংস্থার প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করতেন এবং দশনামী আখাড়াগুলির পঞ্চায়তী ব্যবস্থার মাধ্যমে পারস্পরিক বাণিজ্যিক বিবাদও মিটিয়ে নিতে পারতেন।১৭ আর্থিক ও বাণিজ্যিক সাফল্যের কারণে ১৭৫০ সাধারণাব্দ নাগাদ দশনামী গোসাঁই সাধুরা বারাণসী, মির্জাপুর, নাগপুর ও উজ্জৈন শহরের বৃহত্তম সম্পত্তির মালিকে পরিণত হয়েছিলেন।১৮
দশনামী মহানির্বাণী আখাড়ার নিজস্ব ঐতিহ্য অনুযায়ী মোগল আমলের শেষে দিকে এই আখাড়ার সাধুরা যুদ্ধের সাথে সাথে বাণিজ্যেও অংশগ্রহণ করতে শুরু করেন এবং সেই উদ্দেশ্যে ঐ সময়কার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র বারাণসী, মির্জাপুর, উদয়পুর, পুণে, নাগপুর, হায়দ্রাবাদ, মহীশূর ও কচ্ছের মাণ্ডবীতে মঠ নির্মাণ করে। এই মঠগুলি শুধুমাত্র বাণিজ্যিক কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং মঠগুলি যাঁরা পরিচালনা করতেন সেই মহান্তদের দঙ্গলী মঠধারী বলে অভিহিত করা হত।১৯
দশনামী সম্প্রদায়ভুক্ত গোসাঁই সাধুরা দূরবর্তী দেশে তাঁদের ভ্রমণের সঙ্গে সঙ্গে বাণিজ্যকেও যুক্ত করে নিয়েছিলেন। জেমস ফোর্বস ভারতে কোম্পানির রাইটার হিসাবে ১৭৬৫ থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত ভারতে ছিলেন। তিনি জানিয়েছেন, সুরাত থেকে ভারুচ যাওয়ার পথে কিমে তাঁর সঙ্গে যে গোসাঁই সাধুদের দেখা হয়েছিল, তাঁরা ভারত তো বটেই, পারস্যও ঘুরে এসেছেন, এমনকি তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ রাশিয়ার অভ্যন্তরে মস্কো পর্যন্ত গিয়েছেন।২০ দশনামী গোসাঁই সাধুরা বাংলার সঙ্গে হিমালয়ের ওপারের দেশগুলির বাণিজ্যের মুখ্য মাধ্যম ছিলেন।২১ ১৭৪১ সালে ইতালীয় কাপুচিন সন্ন্যাসী কাস্সিয়ানো বেলিগাত্তি তিব্বতের রাজধানী লাসাতে চীনা পোশাক পরিহিত ভারতের ৪০ জন অশ্বারোহী ধনী ব্যবসায়ী সাধুকে (তিব্বতে ভারতীয় সাধুদের আচার্য বলে অভিহিত করা হতো) দেখতে পেয়েছিলেন। ১৭৭১ সালের অক্টোবর মাসে তৃতীয় (বা ষষ্ঠ) পাঞ্চেন লামা লোসাং পালদেন ইয়েশে (১৭৩৮-১৭৮০ সাধারণাব্দ) দশনামী গোসাঁই সাধু শুকদেব গিরির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন বলে জানা যায়। পাঞ্চেন লামা শুকদেব গিরির সঙ্গে তাঁর ভাষাতেই (অর্থাৎ হিন্দুস্তানি ভাষায়) কথা বলেছিলেন। শুকদেব গিরি পাঞ্চেন লামাকে একটি ইউরোপীয় চশমা উপহার দিয়েছিলেন। ঐ বছরেরই ডিসেম্বর মাসে পাঞ্চেন লামা আর এক দশনামী গোসাঁই সাধু সুগতি গিরির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সুগতি গিরি তাঁকে দক্ষিণাবর্ত শঙ্খ, মুক্তা, প্রবাল, ইউরোপীয় চশমা ও সিংহলি কাকাতুয়া উপহার দেন।২২ অষ্টাদশ শতক সাধারণাব্দে ভারতে ইউরোপ থেকে আমদানি করা পণ্য দশনামী সাধুদের মাধ্যমে ভারত থেকে অন্যান্য দেশের বাজারে পৌঁছাত এ বিষয়ে সন্দেহ নেই।
পূর্ব উত্তর প্রদেশের দশনামী গোসাঁই সাধুরা মূলত নদীপথে বাণিজ্য করতেন। গঙ্গার নদীপথে বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল গোসাঁই সাধুদের হাতে। তাঁদের কাছে নদীপথে যাত্রার জন্য সব রকমের নৌযান ছিল। তাঁরা নদীপথে পূর্ব উত্তর প্রদেশের পণ্য নিয়ে গিয়ে বাংলায় বিক্রি করতেন, বাংলা থেকে ইউরোপেও জাহাজে করে পণ্য রপ্তানি করতেন। বাংলা থেকে সংগৃহীত স্থানীয় পণ্য এবং ইউরোপীয় পণ্য নদীপথে নিয়ে এসে সারা দেশে বিক্রি করতেন।২৩ উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে দশনামী গোসাঁই সাধুদের এই সওদাগরি কারবার ক্রমশ কমে আসতে শুরু করে। এই সময় পাঞ্জাব ও পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে উত্পন্ন কৃষিজাত পণ্য পূর্ব ভারতে বিক্রয়ের উপর নিয়ন্ত্রণ পাঞ্জাবের বণিক শ্রেণির হাতে চলে যায়। পাঞ্জাবের বণিক শ্রেণি বাণিজ্যের জন্য রেলপথের ব্যবহার শুরু করেন।২৪ অসম প্রতিযোগিতায় পরাস্ত হয়ে দশনামী গোসাঁই সাধুদের বাণিজ্য ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়।
পূরণ গিরি
অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের গোসাঁই সাধু পূরণ গির (বা পূর্ণ গিরি) তাঁর বাণিজ্যের দক্ষতার চেয়ে তিব্বত ও ভারতের ইংরেজ শাসকদের মধ্যে কূটনৈতিক দৌত্যের কারণে বেশি পরিচিত ছিলেন। পূরণ গিরের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায়নি। গৌরদাস বসাকের ক্ষেত্রসমীক্ষায় সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী তিনি ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সন্ন্যাসী হওয়ার পর উপবীত ত্যাগ করেন। পূরণ গির দিনে একবার ভাত ও তরকারি নিজেই রান্না করে খেতেন। তিনি ভালো অশ্বারোহী ছিলেন, হিমালয় অঞ্চলে ঘোড়ায় চড়ে ভ্রমণ করেছেন। তিনি বাংলায় বিক্রয়ের জন্য মূল্যবান বস্তু, মুখ্যত সোনা নিয়ে আসার কাজ করতেন। কিন্তু তাঁর ব্যবসা থেকে অর্জিত অর্থ সঞ্চয়ের পরিবর্তে দান করে দিতেন। তাঁর স্বাভাবিক পোশাক ছিল কৌপীন – কটি দেশে জড়ানো গেরুয়া রঙের বস্ত্রখণ্ড ও কাঁধের উপর একটি ব্যাঘ্রচর্ম। কিছু অনুষ্ঠানের সময় তিনি একটি আলখাল্লা পরতেন ও পাগড়ি দিয়ে মাথা ঢাকতেন। প্রথম তিব্বত যাত্রার সময় তিনি ছিলেন এক সুন্দর চেহারার লম্বা, ছিপছিপে, শক্তিশালী তরুণ। ১৭৭৪ সালে তিনি যখন প্রথম কলকাতায় আসেন তখন তাঁর বয়স পঁচিশ বছরের বেশি নয়।২৫
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৭৪-৭৫ সালে জর্জ বগল (১৭৪৬-১৭৮১ সাধারণাব্দ) ও ১৭৮৩ সালে স্যামুয়েল টার্নারকে (১৭৫৯-১৮০২ সাধারণাব্দ) তাঁর প্রতিনিধি হিসাবে তিব্বতে পাঠান। ভারতে কোম্পানির অধিকৃত এলাকা ও তিব্বতের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে কোম্পানির পাঠানো এই দুই প্রতিনিধিদলেই পূরণ গিরিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।২৬ বগল ও টার্নার উভয়েই উল্লেখ করেছেন পূরণ গিরি তিব্বতের সরকারের পূর্ণ আস্থা ও তিব্বতের মানুষের বিশ্বাস অর্জন করেছিলেন। তিব্বতের সরকারের পক্ষ থেকে কলকাতায় কোম্পানির গভর্নর জেনারেলকে লেখা পত্রগুলিতেও এ কথার সমর্থন মেলে।
স্যামুয়েল টার্নার তাঁর প্রতিবেদনে জানিয়েছেন, ১৭৭২ সালে ভুটানের সেনা কোচবিহার রাজ্য আক্রমণ করে দখল করার পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সেখানে তার ভারতীয় সৈন্যদের একটি বাহিনী পাঠায়। ইংরেজ বাহিনীর কাছে ভুটানের সেনা পরাস্ত হলে ভুটানের শাসক পাঞ্চেন লামার মধ্যস্থতা চেয়ে আবেদন করেন। সেই সময় অষ্টম দলাই লামা লোসাং জামফেল গ্যাৎসো (১৭৫৮-১৮০৪ সাধারণাব্দ) প্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন না, তাই তৃতীয় পাঞ্চেন লামা কার্যত তিব্বতের শাসক ছিলেন। ১৭৭৩ সালে পূরণ গির তিব্বতে যান। পাঞ্চেন লামা তরুণ দশনামী সাধু পূরণ গির ও পেমা নামের জনৈক তিব্বতি ব্যক্তিকে তাঁর দূত হিসাবে কলকাতায় পাঠান। ১৭৭৪ সালের ২৯ মার্চ তাঁরা কোম্পানির হাতে সিন্দুক ভর্তি উপহার ও পাঞ্চেন লামার লেখা পত্র তুলে দেন। এই পত্রে পাঞ্চেন লামা কোম্পানির বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে ভুটানের পরাজয়ের কথা উল্লেখ করে ভুটান ও কোম্পানির মধ্যে বিরোধের অবসানের জন্য মধ্যস্থতার কথা জানান। ১৭৭৪ সালের ১৩ মে জর্জ বগলকে তিব্বত যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।২৭ সুশোভন চন্দ্র সরকারের মতে, তিব্বত যাত্রায় পূরণ গিরের সঙ্গী হওয়া নিঃসন্দেহে বগল-এর পক্ষে খুবই সহায়ক হয়েছিল। পূরণ গিরি, তাঁর তিব্বতি ও অন্যান্য ভাষা (পাঞ্চেন লামা হিন্দুস্তানি ভাষা জানতেন) সম্পর্কে জ্ঞান এবং হিমালয় অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতার দৌলতে ইংরেজদের দোভাষী এবং পথপ্রদর্শক উভয় ভূমিকাই অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পালন করেছিলেন।২৮ শুধু তাই নয়, বগল ভুটানের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী তাশিছো জং (থিম্পু) পৌঁছাবার পর, পাঞ্চেন লামা তাঁকে তিব্বতে না এসে কলকাতায় ফিরে যাওয়ার জন্য একটি পত্র পাঠান। পূরণ গির তখন একাই কলকাতা থেকে তিব্বত যান, এবং পাঞ্চেন লামাকে রাজি করান এবং বগলকে ভুটানের শাসক জানান, তিব্বতে প্রবেশের জন্য পাঞ্চেন লামার অনুমতি এসে গেছে। ১৭৭৪ সালের ১৩ অক্টোবর বগল তাশিছো জং থেকে তিব্বত রওনা হন। তিনি ২৩ অক্টোবর ফারি (পাগরি) জং সীমান্ত পার হয়ে তিব্বতে প্রবেশ করেন। ২ নভেম্বর গ্যানৎসে জং-এর কাছে পূরণ গির বগল-এর সঙ্গে মিলিত হন। ৮ নভেম্বর তাঁরা পাঞ্চেন লামার তত্কালীন অবস্থান স্থল দেচেনরুবজে মঠে পৌঁছান। ঐ দিন বগল-এর সঙ্গে পাঞ্চেন লামার প্রথম সাক্ষাৎ হয়।২৯
পাঞ্চেন লামা বগল-এর তিব্বতে অবস্থানের সময় তাঁকে কয়েক বার গঙ্গার ধারে একটি বৌদ্ধ মঠ স্থাপন করে বাংলার সঙ্গে তিব্বতের সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। ১৭৭৫ সালের ৩ এপ্রিল সাক্ষাৎকারের সময় পাঞ্চেন লামা বলেছিলেন এই মঠটি বড়ো না হলেও চলবে আর বাংলার স্থাপত্যরীতিতে নির্মাণ করা যেতে পারে। তিনি তাঁর বিশ্বস্ত মিত্র পূরণ গিরকে এই মঠের দায়িত্ব দেওয়ার কথাও বগলকে জানিয়েছিলেন। ১৭৭৫ সালের ৪ এপ্রিল যখন বগল পাঞ্চেন লামার সঙ্গে দেখা করতে যান, তিনি ঐ মঠের জন্য যে প্রতিমাগুলি ও পোশাক পূরণ গিরের সঙ্গে পাঠাবেন বলে ঠিক করেছেন সেগুলি দেখান।৩০ ১৭৭৫ সালের জুন মাসে বগল কলকাতায় ফিরে আসার পর, ৪ ডিসেম্বর কোম্পানির রাজস্ব বোর্ড পাঞ্চেন লামার প্রতিনিধি হিসাবে পূরণ গিরকে মন্দির নির্মাণের জন্য কলকাতার গঙ্গার অপর পাড়ে ১০০ বিঘা ৮ বিশ্বা (কাঠা) নিষ্কর জমি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৭৭৭ সালের ১৬ এপ্রিল কোম্পানির পরিচালকদের অনুমোদনের পর ১৭৭৮ সালের ১২ জুন কোম্পানির পক্ষ থেকে একটি সনদ জারি করে পাঞ্চেন লামাকে ঐ নিষ্কর জমি প্রদান করা হয় এবং ঐ একই দিনে আর একটি সনদের মাধ্যমে পূরণ গিরকে ঐ জমির দখল দেওয়া হয়। পাঞ্চেন লামার প্রদত্ত অর্থে সেখানে মঠের নির্মাণ সমাপ্ত হওয়ার পর ওয়ারেন হেস্টিংস তাঁকে সেই সংবাদ জানিয়ে দেন। পূরণ গির এই মঠের প্রথম মহান্ত হন।৩১ পাঞ্চেন লামার ওয়ারেন হেস্টিংসকে লেখা এক পত্রে তাঁকে গঙ্গার তীরে মঠ নির্মাণের অনুমতি দেওয়ার ধন্যবাদ জানিয়ে লেখা পত্র ১৭৭৬ সালের ৮ এপ্রিল কলকাতায় কোম্পানির কাছে পৌছায়।৩২
টনি হুবার তাঁর সংগৃহীত তথ্যসূত্রের ভিত্তিতে মনে করেন, পাঞ্চেন লামার কলকাতার কাছে গঙ্গার তীরে এই বৌদ্ধ মঠ নির্মাণের জন্য প্রাথমিক উদ্দেশ্য ধর্মীয় হলেও, ব্রিটিশদের কাছে কলকাতার কাছে একটি তিব্বতী মঠ নির্মাণকে একটি কূটনৈতিক প্রয়োজনীয়তা হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। তাঁদের মনে হয়েছিল এই মঠের মাধ্যমে তিব্বতের সঙ্গে বাণিজ্যের বৃদ্ধির সম্ভাবনা আছে। কোম্পানি আশা করেছিল এই মঠ বহুসংখ্যক তিব্বতিকে ভারতে আসার জন্য এবং ভারতের বাণিজ্য কেন্দ্রগুলি থেকে ভারতীয় পণ্য ক্রয়ের জন্য উৎসাহিত করবে।৩৩
উনিশ শতকের শেষে গৌরদাস বসাক তাঁর ক্ষেত্রসমীক্ষায় জানিয়েছেন, হাওড়া জেলার ঘুসুড়িতে গঙ্গার ধারে অবস্থিত এই মঠটির অবস্থানস্থল সেই সময় ভোটবাগান নামে পরিচিত ছিল। তখন এখানে প্রাচীর বেষ্টিত তিব্বতি স্থাপত্য প্রভাবিত দ্বিতল ভবনটি ভোট মন্দির বা ভোটবাগান মঠ নামে এবং সংলগ্ন গঙ্গার ঘাটটি ভোট-মহান্তের ঘাট নামে পরিচিত ছিল। মঠের অভ্যন্তরে তিনি যে সব দেবদেবীর প্রতিমা দেখতে পেয়েছিলেন তাঁর মধ্যে ছিল বিষ্ণু, দুর্গা, বিন্ধ্যবাসিনী, গণেশ ও গোপালের প্রতিমা। এ ছাড়া তিনি দেখেছিলেন শালগ্রাম শিলা ও বিভিন্ন প্রকারের শিবলিঙ্গ। তান্ত্রিক বৌদ্ধ দেবদেবীদের মধ্যে তিনি আর্যতারা, মহাকাল ভৈরব, চক্রসম্বর, গুহ্যসমাজ, বজ্রভৃকুটি ও পদ্মপাণির প্রতিমা এখানে দেখেছিলেন।৩৪ হাওড়ার ঘুসুড়ির ৫ নম্বর গোঁসাই ঘাট স্ট্রিটে অবস্থিত ভোটবাগান মঠ (বর্তমানে শঙ্করমঠ নামেও পরিচিত) ও সংলগ্ন মন্দির বর্তমানে অত্যন্ত জীর্ণ অবস্থায় বিদ্যমান। সাম্প্রতিক একটি ক্ষেত্রসমীক্ষায় মঠ সংলগ্ন মন্দিরের মধ্যবর্তী উপাসনাগৃহে লোহার গারদের মধ্যে সুরক্ষিত তিনটি বেদির সর্বোচ্চ ধাপে আর্যতারার প্রতিমা, মাঝের ধাপে অন্য তান্ত্রিক বৌদ্ধ দেবদেবীদের প্রতিমা ও নীচের ধাপে একটি ঘট, নাড়ুগোপাল ও গণেশের প্রতিমা, চারটি ভিন্ন আকৃতির শালগ্রাম শিলা, একটি শ্বেত শিবলিঙ্গ এবং কয়েকটি ধাতুনির্মিত প্রতিমার অংশ দেখতে পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।৩৫
জর্জ বগল ১৭৭৪-১৭৭৫ সালে তিব্বতে থাকাকালীন সেখানে চীনের রাজপ্রতিনিধির প্রভাবের কারণে তিব্বতে ইংরেজদের বাণিজ্যিক সুযোগসুবিধা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিশেষ সাফল্য অর্জন করতে পারেননি। লাসার চীনা প্রশাসকের মৃত্যুর পর হেস্টিংস তিব্বতের আরও অভ্যন্তরে ব্রিটিশ বাণিজ্য ও প্রভাব সম্প্রসারণের জন্য প্রচেষ্টা করতে উৎসাহিত হন, এবং ১৭৭৯ সালে বগল আর একবার তিব্বতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। বগল ইতিমধ্যেই পাঞ্চেন লামার পিকিং যাত্রার খবর পেয়েছিলেন। তাই তিনি নিজে যাওয়ার পরিবর্তে পূরণ গিরকে তিব্বতে পাঠান, যাতে পূরণ গির পাঞ্চেন লামার দলের সঙ্গে চীনে যেতে পারেন।৩৬
পূরণ গির তাঁর ১৭৭৯ থেকে ১৭৮১ সাধারণাব্দ পর্যন্ত পাঞ্চেন লামার সঙ্গে চীন ভ্রমণের যে মৌখিক প্রতিবেদন পেশ করেছিলেন তার ইংরেজি অনুবাদ ১৮০৮ সালে প্রকাশিত আলেকজান্ডার ডালরিম্পলের ওরিয়েন্টাল রেপার্টরির দ্বিতীয় খণ্ডে সন্নিবিষ্ট রয়েছে। টার্নারের প্রতিবেদনের চতুর্থ পরিশিষ্টেও এই একই অনুবাদ সমাবিষ্ট রয়েছে। পূরণ গির হেস্টিংসের পত্র ও উপহার নিয়ে তিব্বতে উপস্থিত হন, এবং দু’ বছর পর তিবতের সঙ্গে বাংলার ইংরেজ সরকারের সম্পর্কের উন্নতি ঘটিয়ে ফিরে আসেন। পূরণ গির ১৮৩৬ বিক্রম সংবতের ২ শ্রাবণ (১৭৭৯ সাধারণাব্দের ১৫ জুলাই) পাঞ্চেন লামার সঙ্গে তিব্বত থেকে রওনা হয়ে পিকিং-এর কাছে জেহোল (চেংদে) শহরে পৌঁছান। এখানে ১৭৮০ সালের ২৫ আগস্ট পাঞ্চেন লামা পূরণ গিরকে হিন্দুস্তানের চীনের সম্রাট কিয়ানলং-এর (রাজত্বকাল ১৭৩৫-১৭৯৬ সাধারণাব্দ) সামনে প্রথম উপস্থাপন করেন। পূরণ গিরের প্রতিবেদন অনুযায়ী চীন সম্রাট পাঞ্চেন লামার কাছ থেকে হিন্দুস্তানে ইংরেজদের রাজ্যের বিস্তার ও সেনাবাহিনীর বিবরণ শোনার পর তাঁকে ইংরেজদের সঙ্গে পত্রবিনিময় শুরু করার প্রতিশ্রুতি দেন। ১৭৮০ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর তিনি পাঞ্চেন লামার সঙ্গে পিকিং পৌঁছান। চীন সম্রাট কিয়ানলং-এর দলাই লামাকে ১৭৮১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি তারিখে লেখা পত্র অনুসারে পাঞ্চেন লামার ১৭৮০ সালের ২৭ নভেম্বর বসন্ত রোগে জীবনাবসান হয়। পূরণ গিরের প্রতিবেদনে পাঞ্চেন লামার মৃত্যুর দিন ১৮৩৭ বিক্রম সংবতের ১ অগ্রহায়ণ (১৭৮০ সাধারণাব্দের ১২ নভেম্বর) লেখা হলেও তা ঠিক নয়। পাঞ্চেন লামার মৃত্যুর সময় পূরণ গির তাঁর পাশে উপস্থিত ছিলেন, এবং পরে তাঁর শবাধারের সঙ্গে তিব্বতে যান, সেখানে পাঞ্চেন লামাকে সমাধিস্থ করার সময়ও তিনি উপস্থিত ছিলেন।৩৭ তিব্বত থেকে ফেরার পর তিনি গঙ্গার ধারে আরও জমি দানের জন্য তৃতীয় পাঞ্চেন লামার ভ্রাতার একটি আবেদন জমা দেন। কোম্পানি কর্তৃপক্ষ সেই আবেদন মঞ্জুর করে ১৭৮৩ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি আগের মতো দুটি সনদ জারি করে একটি সনদে আগের জমির সংলগ্ন ৫০ বিঘা জমি পাঞ্চেন লামাকে ও অন্য সনদে পূরণ গিরকে ঐ জমির দখল প্রদান করে।৩৮
হেস্টিংস ১৭৮২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিব্বতে সপ্তম পাঞ্চেন লামার ‘পুনর্জন্মের’ খবর পেয়ে ১৭৮৩ সালের ৯ জানুয়ারি স্যামুয়েল টার্নারকে তিব্বতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। তাঁকে মাসিক ৩০০০ টাকা বেতন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এবারও আবার পূরণ গিরকে ইংরেজ দলের সঙ্গে যাওয়ার জন্য বলা হয়। পূরণ গির এবার টার্নারের পথপ্রদর্শক এবং দোভাষী হিসেবে কাজ করেন এবং এবারও তাঁকে একা তিব্বতে যেতে হয় ভুটানে অপেক্ষারত ইংরেজদের তিব্বতে পথে বাধা দূর করার ব্যবস্থা করার জন্য। ১৭৮৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর টার্নার ও পূরণ গির তাশিছো জং থেকে তিব্বতের উদ্দেশে রওনা হন। তিব্বতে টার্নারকে সপ্তম পাঞ্চেন লামার জনগণের দ্বারা স্বীকৃতির উৎসবে যোগদানের অনুমতি না দেওয়া হলেও পূরণ গির এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ঘুসুড়ির ভোট বাগান মঠের জমি বর্ধমান রাজের জাগিরের অন্তর্ভুক্ত এলাকায় অবস্থিত ছিল। পূরণ গিরের তিব্বতে থাকাকালীন অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে বর্ধমানের ভূস্বামী তেজচাঁদ রায় তাঁর চেলাদের তাড়িয়ে ৫০ বিঘা জমি দখল করে নেন। টার্নার পূরণ গিরের হয়ে গভর্নর-জেনারেলকে আবেদন জানানোর পর ঐ জমি কোম্পানি আবার তাঁকে ফেরত দেয়। পূরণ গির বাকি জীবন এখানেই অতিবাহিত করেন। তাঁর জীবদ্দশায় তিব্বত ও ভুটান থেকে বাংলায় আগত ব্যক্তিদের ভোটবাগান মঠে নিয়মিত অবস্থানের কথা জানা যায়।৩৯
তৃতীয় পাঞ্চেন লামা বগলকে ভবিষ্যতে একজন ভারতীয়কে ব্রিটিশ প্রতিনিধি হিসাবে পাঠানোর অনুরোধ করেছিলেন। সেই কারণে, হেস্টিংস ১৭৮৫ সালের প্রথম দিকে তাঁর ভারত থেকে প্রত্যাবর্তনের ঠিক আগে পূরণ গিরকে তিব্বতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পূরণ গির ঐ বছরই পরবর্তী গভর্নর-জেনারেল জন ম্যাকফারসনের আমলে আবার তিব্বত যান। ১৭৮৭ সালের ২৭শে মার্চ তারিখের কোম্পানির পরিচালকদের একটি পত্র থেকে যান যায়, পূরণ গির ভুটানের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় সেখানকার মানুষের প্রচুর সহায়তা পেয়েছিলেন। তিনি ১৭৮৫ সালের ৮ মে শিগাজের তাশি লুনপো মঠে নাবালক সপ্তম পাঞ্চেন লামার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিব্বতে পূরণ গির বাংলার অনেক বণিকের সঙ্গে দেখা করেন, তিনি লক্ষ করেন তিব্বতের বাজারে ভারতীয় ও ব্রিটিশ পণ্য মজুদ করা আছে। পাঁচ মাস তিব্বতে থাকার পর, পূরণ গির পাঞ্চেন লামার দরবারের প্রধান ব্যক্তিদের কাছ থেকে ইংরেজদের প্রতি বন্ধুত্বের পত্র নিয়ে ভারতে ফিরে আসেন। পূরণ গিরের ম্যাকফারসনের কাছে ১৭৮৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি পেশ করা প্রতিবেদন টার্নার তাঁর প্রতিবেদনে মুদ্রিত করেছেন।৪০
১৭৯৩ সালে পূরণ গিরের পরিবর্তে তাঁর চেলা দলজিৎ গির (গিরি) কোম্পানির গভর্নর জেনারেল চার্লস কর্নওয়ালিসের দলাই লামা ও পাঞ্চেন লামাকে লেখা পত্র নিয়ে কলকাতা থেকে লাসা যান। দলজিৎ গির লাসায় আসার পর সেখানে অবস্থানরত চীনের সেনা কর্তৃপক্ষ তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। দলজিৎ গির চীনা সেনাকে জানিয়েছিলেন, তাঁর মঠ ফোর্ট উইলিয়াম থেকে খুব দূরে নয় এবং প্রত্যেক দিন ঐ মঠ থেকে এক জন সাধু ফোর্ট উইলিয়ামে গিয়ে তিব্বত থেকে পাঠানো সরকারি পত্রের অনুবাদের কাজ করেন। দলজিৎ গিরের কাছ থেকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় সংগৃহিত তথ্য ১৭৯৩ সালের ১৮ এপ্রিল চীনা সেনাপতি ফুকাংগান ও তাঁর এক সহযোগীর লাসা থেকে পিকিং-এ পাঠানো একটি প্রতিবেদনে উল্লিখিত হয়েছে। চীনা সেনাপতি দলাই লামা ও পাঞ্চেন লামাকে কলকাতা থেকে কোম্পানির পত্রের উত্তরের খসড়া যৌথভাবে লিখে তাঁকে দেখিয়ে তারপর পাঠাতে নির্দেশ দেন।৪১ দলজিৎ গিরি দলাই লামার কাছ থেকে এই পত্র ও উপহার নিয়ে লাসা থেকে কলকাতা ফিরে আসেন। ফেরার সময় তিব্বতি সরকারের পক্ষ থেকে তিব্বতি বর্ষপঞ্জির ১৩তম চক্রের জলবৃষ বর্ষের দ্বিতীয় মাসের ১৩ তারিখে (১৭৯৩ সাধারণাব্দ) জারি করা একটি লময়িগ (পাসপোর্ট) নথিতে আচার্য ধরজিরগিরি অর্থাৎ তাঁকে যাত্রাপথে রসদ ও বাহন দেওয়ার নির্দেশ দেখতে পাওয়া যায়।৪২
পূরণ গির যে ব্যক্তিগত প্রয়োজনেও দীর্ঘ পথ ভ্রমণ করতেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় একটি তিব্বতি লময়িগ (পাসপোর্ট) থেকে। ১৭৭৮ সালে জারি করা এই নথিতে সমস্ত সংশ্লিষ্ট তিব্বতি আধিকারিকদের বিস্তারিতভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন তাঁরা তিব্বত সরকারে কার্যরত আচার্য পুনগিরিকে (পূরণ গির) তাঁর ৩ জন সেবকের সঙ্গে মানস সরোবরে তীর্থযাত্রার সময় সব রকম প্রয়োজনীয় বস্তু ও সুবিধা প্রদান করে। ১৭৯০ সালে পূরণ গির ব্যক্তিগত উদ্যোগে আর একবার তিব্বত যাত্রা করেন। এবারের উদ্দেশ্য ছিল চায়ের বীজ বা চারা সংগ্রহ। তাঁকে ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, যদি তিনি জীবন্ত অবস্থায় চা গাছ এবং সম্ভব হলে চা চাষ করেছেন এমন কোনও স্থানীয় ব্যক্তিকে রংপুরের ব্রিটিশ প্রশাসককে উপস্থিত করতে পারেন তাহলে তাঁকে উপযুক্ত পুরষ্কার দেওয়া হবে। এই বিষয়ে একটি সরকারি পত্রও পূরণ গিরকে দেওয়া হয়।৪৩ পূরণ গির নাগরী লিপিতে তাঁর চীন ও তিব্বত ভ্রমণের সব তথ্য লিপিবদ্ধ করেছিলেন বলে জানা যায়। কোম্পানির বোর্ড তাঁকে তাঁর মূল দিনলিপিটি জমা দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিল, এটি ইংরেজিতে অনুবাদ করার জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি প্রস্তুতও ছিলেন। কিন্তু তারপর, এই মূল্যবান দিনলিপিটি সম্পর্কে আর কিছুই জানা যায়নি।৪৪
তারকেশ্বর মঠের মহান্ত সতীশচন্দ্র গিরির সংকলন গ্রন্থ ‘তারকেশ্বর শিবতত্ত্ব’ ১৯২১ সালে প্রকাশিত হয়। এখানে উল্লিখিত একটি ঐতিহ্য অনুসারে ওয়ারেন হেস্টিংসের আমলে দামোদরে বন্যার পর উদ্ভূত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে তারকেশ্বর মঠের সাধুরা ডম্বর গিরির নেতৃত্বে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সংঘর্ষ শুরু করেন এবং লুণ্ঠন আরম্ভ করেন। ওয়ারেন হেস্টিংস পূর্ণানন্দ গিরির (অর্থাৎ পূরণ গির) মধ্যস্থতার মাধ্যমে সেই সংঘর্ষ সমাপ্ত করেন। ডম্বর গিরিকে বগুড়া জেলার শেরপুরে ভূসম্পত্তি প্রদান করা হয়।৪৫ এই ঐতিহ্যের ঐতিহাসিকতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ভোটবাগান মঠের দুই শতক
গৌরদাস বসাকের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী ভোট-মন্দির লুঠ করতে আসা ডাকাতদের আক্রমণে আহত হয়ে সম্ভবত ১৭৯৫ সালের গোড়ার দিকে পূরণ গিরের জীবনাবসান হয়। তাঁর সমাধিগৃহের দ্বারের উপর স্থাপিত একটি ফলকের উপর বাংলায় উত্কীর্ণ একটি লেখে ঐ সমাধিগৃহ প্রতিষ্ঠার তারিখ ১৮৫২ বিক্রম সংবত, ১৭১৭ শকাব্দ ও ১২০২ বাংলা সনের ২৩ বৈশাখ (১৭৯৫ সালের ৩ মে) লেখা আছে। পূরণ গিরের মৃত্যুর পর তাঁর শিষ্য দলজিৎ গির (গিরি) মহান্ত হন। তিনিই এই সমাধিগৃহ নির্মাণ করেন। ১২৪৩ বাংলা সনের ৬ মাঘ (১৮৩৭ সাধারণাব্দের ২০ জানুয়ারি) দলজিৎ গিরের জীবনাবসানের পর তাঁর শিষ্য কালী গির (গিরি) মহান্ত হন। ১২৬৪ বাংলা সনের ২ বৈশাখ (১৮৫৭ সাধারণাব্দ) তাঁর মৃত্যুর পর পরবর্তী মহান্ত পদ নিয়ে তাঁর দুই শিষ্য বিলাস গির (গিরি) ও উমরাও গির (গিরি), উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধের পর উভয়ই সমান মর্যাদাযুক্ত মহান্ত হন।৪৬ ১৮৮৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি বিলাস গিরির মৃত্যুর পর উমরাও গিরি মহান্ত হন। ১৯০৪ বা ১৯০৫ সালে উমরাও গিরির মৃত্যুর পর তাঁর কোনও উত্তরাধিকারী না থাকায় আদালতের রিসিভারের কাছে চলে যায়। আদালত নতুন মহান্ত নিয়োগের জন্য এই অঞ্চলের সব দশনামী মহান্তদের নিয়ে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করেন। তারকেশ্বর মঠের মহান্ত সতীশ চন্দ্র গিরি এই কমিটির প্রধান ছিলেন। ১৯০৫ সালের ৫ মে এই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ত্রিলোক চন্দ্র গিরি মহান্ত নিযুক্ত হন। ১৯৩৫ সালে ত্রিলোক চন্দ্র গিরির বিরুদ্ধে আদালতে আর্থিক দুর্নীতি ও ব্যভিচারের অভিযোগে মামলা দায়ের করার পরিণামে ১৯৪২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তাঁকে অপসারণ করা হয়। মামলা চলাকালীন তাঁর চেলা রতন নারায়ণ গিরি মহান্ত হতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হন, ১৯৩৯ সালে আদালত তাঁর দাবি খারিজ করে দেন। ভোটবাগান মঠ আবার আদালতের রিসিভারের কাছে চলে যায়। আদালতে তারকেশ্বর মঠের মহান্ত ও অন্যদের সুপারিশ অনুযায়ী ১৯৫২ সালের ২৮ জানুয়ারি দণ্ডীস্বামী দিব্য আশ্রম ভোটবাগান মঠের মহান্ত নিযুক্ত হন। ১৯৫৮ সাল নাগাদ তিনি দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৯৭৭ সালে দণ্ডীস্বামী দিব্য আশ্রমের মৃত্যুর পর তারকেশ্বরমণ্ডলীর সাধু শম্ভুনাথ ব্রহ্মচারী মাঠের দায়িত্বে ছিলেন, কিন্তু তিনি মহান্ত ছিলেন না। ১৯৮৮ সালে তিনি মঠ ছেড়ে চলে যান। ১৯৯১ সালে দণ্ডীস্বামী দিব্য আশ্রমের চেলা দণ্ডীস্বামী প্রকাশ আশ্রম মহান্ত নিযুক্ত হন। ২০০৫ সালে তিনি পরিচালকমণ্ডলীর সঙ্গে বিবাদের কারণে মঠ ছেড়ে চলে গেলে মঠের দায়িত্ব আবার আদালতের রিসিভারের কাছে চলে যায়। ২০২১ সালে হাওড়ার রামরাজাতলার শঙ্কর মঠের মহান্ত দণ্ডীস্বামী প্রজ্ঞানন্দ সরস্বতীকে এই মঠের মহান্ত নিযুক্ত করা হয়েছে।৪৭ এখনও তিনিই মহান্ত আছেন, যদিও তিনি এই মঠে বসবাস করেন না।৪৮
টীকা
১. ব্যোমকেশ মুস্তফী, “হাবড়া-ঘুসুড়ির বৌদ্ধ মঠ”, ‘অনুশীলন, ১ম ভাগ, ১ম সংখ্যা, আশ্বিন, ১৩০১’ কলিকাতা, ১৮৯৪, পৃ. ৬-২১। চারুচন্দ্র মিত্র, “রাঢ়ে বৌদ্ধ মঠ -ভোটবাগান”, ‘ভারতবর্ষ, ১ম বর্ষ, ৩য় সংখ্যা, ভাদ্র ১৩২০’। কলিকাতা: সুধাংশুশেখর চট্টোপাধ্যায়, ১৯১৩, পৃ. ৪০৫-৪০৯। সুশোভন সরকার, “পূর্ণ গিরি গোস্বামী”, ‘উত্তরা, অগ্রহায়ণ, ১৩৪০’; কাশীধাম, ১৯৩৩। অমিয়কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, “ভোটবাগান”, ‘দেখা হয় নাই’; কলিকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স, ১৯৪৭, পৃ. ২৯-৩৪। বিনয় ঘোষ, “ভোটবাগান”, ‘পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি’; কলিকাতা: পুস্তক প্রকাশক, ১৯৫০, পৃ. ৫৮৭-৫৯১। প্রভাসচন্দ্র কর, “তিব্বত-ভারতের ঐতিহাসিক যোগসূত্র – ভোটবাগান”, ‘প্রবাসী, ৫৩শ ভাগ, ২য় খণ্ড, অগ্রহায়ণ ১৩৬০’; কলিকাতা: প্রবাসী প্রেস, ১৯৫৩, পৃ. ১৯৫-২০২। গোপেন্দ্রকৃষ্ণ বসু, “বাংলাদেশে তিব্বতী দেবালয়”, ‘মাসিক বসুমতী, মাঘ ১৩৭৫’; কলিকাতা, ১৯৬৯। সুকান্ত মুখোপাধ্যায়, “এক অমূল্য দলিল প্রসঙ্গ”, ‘পুরোনো হাওড়ার কথা’; কলকাতা: ন্যাশনাল বুক এজেন্সি, ২০২৩ (২০১১), পৃ. ২৭-৩৬। শিবেন্দু মান্না, ‘ভোটবাগান মঠ ও পূরণ গিরি গোঁসাই’; কলকাতা: টেরাকোটা, ২০২৩। প্রীতম নস্কর, ‘‘ভোটবাগান মঠ’ সেকাল ও একাল একটি পুরাতাত্ত্বিক নিরীক্ষণ’, ২০২৩। কল্যাণ কুমার দাস, ‘হাওড়া চর্চা, ৩য় সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২৪, ভোটবাগান’; লিলুয়া: কল্যাণ দাস, ২০২৪।
২. G.S. Ghurye, ‘Indian Sadhus’; Bombay: The Popular Book Depot, 1953, p. 79.
৩. Jogendra Nath Bhattacharya, ‘Hindu Castes and Sects’; Calcutta: Thacker, Spink & Co., 1896, p. 376.
৪. Matthew Clark, ‘The Daśanāmī-Saṃnyāsīs: The Integration of Ascetic Lineages into an Order’; Leiden: Brill, 2006, p. 2.
৫. Govind Chandra Pande, ‘Life and Thought of Śaṅkarācārya’; Delhi: Motilal Banarsidass, 1994, pp. 41-52.
৬. Jadunath Sarkar, ‘A History of Dasnami Naga Sanyasis’; Allahabad: Sri Panchayati Akhara Mahanirvani, Not Dated (1958), p. 50.
৭. Pandurang Vaman Kane, ‘History of Dharmaśāstra, Vol. II, Part II’; Poona: Bhandarkar Oriental Research Institute, 1941, p. 948.
৮. Pandurang Vaman Kane, ‘History of Dharmaśāstra, Vol. II, Part II’, p. 948n2172.
৯. “তীর্থাশ্রমবনারণ্যগিরিপর্বতসাগরাঃ। সরস্বতী ভারতী চ পুরী নাম যতের্দশ॥” – জগন্নাথ রঘুনাথ ঘারপুরে সম্পাদিত, ‘শ্রী বৈদ্যনাথ দীক্ষিতীয় স্মৃতিমুক্তাফলম্ (প্রথম খণ্ড) বর্ণাশ্রমকাণ্ডম্’; পুণ্যপত্তন: আর্যভূষণ মুদ্রণালয়, ১৯৩৭, পৃ. ১৮২। “তীর্থাশ্রমবনারণ্যগিরিপর্বতসাগরাঃ। সরস্বতী ভারতী চ পুরী নামানি বৈ দশ॥” – গণেশশাস্ত্রী গোখলে সম্পাদিত, ‘বিশ্বেশ্বরসরস্বতীকৃতঃ যতিধর্মসংগ্রহঃ’; পুণ্যপত্তন: আনন্দাশ্রম মুদ্রণালয়, ১৯২৮, পৃ. ১০৩।
১০. বলদেব উপাধ্যায়, ‘কাশী কী পাণ্ডিত্য পরম্পরা’; বারাণসী: বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশন, ১৯৮৩, পৃ. ৪১, ৪১টী.১।
১১. Surendranath Dasgupta, ‘A History of Indian Philosophy, Vol. II’; Cambridge: Cambridge University Press, 1952, p. 55.
১২. বৈদ্যনাথ দীক্ষিত ও তাঁর স্মৃতিমুক্তাফল গ্রন্থের রচনাকাল সম্পর্কে দেখুন: Pandurang Vaman Kane, ‘History of Dharmaśāstra, Vol. I, Part II’, Poona: Bhandarkar Oriental Research Institute, 1975, pp. 1152-1153; David Pingree, ‘Census of Exact Sciences in Sanskrit, Series A, Vol. 5’; Philadelphia: American Philosophical Society, 1994, p. 743.
১৩. Jadunath Sarkar, ‘A History of Dasnami Naga Sanyasis’, pp. 109-110.
১৪. বড়োদরার সাধুদের কথা উল্লিখিত হয়েছে: Govindbhai H. Desai and A.B. Clarke, ‘Gazetteer of the Baroda State, Vol. 1’; Bombay: The Times Press, 1923, pp. 224-225; কচ্ছের অতীতদের কথা লেখা হয়েছে: Dalpatram Pranjivan Khakhar, “Castes and Tribes in Kachh:” in JAS Burgess edited ‘The Indian Antiquary, A Journal of Oriental Research, Vol. V-1876’; Delhi: Swati Publications, 1984, p. 168।
১৫. H.V. Nanjundayya and L.K. Ananthakrishna Iyer, ‘The Mysore Tribes and Castes, Vol. III’; Mysore: The Mysore University, 1930, pp. 256-257.
১৬. নগেন্দ্রনাথ বসু সম্পাদিত, ‘কাশী-পরিক্রমা: ভূ-কৈলাসের রাজা জয়নারায়ণ ঘোষাল প্রণীত’; কলিকাতা: বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, ১৯০৬, পৃ. ১৭৩-১৭৫।
১৭. Bernard S. Cohn, “The Role of the Gosains in the Economy of Eighteenth and Nineteenth Century Upper India” in ‘The Indian Economic and Social History Review, Vol. 1, Issue 4’; New Delhi: Sage Publications, 1964, p. 181.
১৮. C.A. Bayly, ‘Rulers, Townsmen and Bazaars: North Indian Society in the Age of British Expansion 1770-1870’; Cambridge: Cambridge University Press, 1983, p. 126.
১৯. Jadunath Sarkar (Ananda Bhattacharyya edited), ‘A History of the Dasnami Naga Sanyasis’; London and New York: Routledge, 2018, p. 250.
২০. James Forbes, ‘Oriental Memoirs: A Narrative of Seventeen Years Residence in India, Vol. I’; London: Richard Bentley, 1834, p. 462.
২১. S.C. Sarkar, “A Note on Puran Gir Gosain” in ‘Bengal Past & Present, Vol. XLIII, Part II, April-June 1932’; Calcutta: Calcutta Historical Society, 1932, pp. 83-84.
২২. L. Petech, “The Missions of Bogle and Turner According to the Tibetan Texts” in J. J. L. Duyvendak and Paul Demieville edited, ‘T’oung Pao, Second Series, Vol. XXXIX, Livr. 4-5’; Leiden: E.J. Brill, 1950, pp. 330-346.
২৩. William Buyers, ‘Recollections of Northern India’; London: John Snow, 1848, p. 365.
২৪. Bernard S. Cohn, “The Role of the Gosains in the Economy of Eighteenth and Nineteenth Century Upper India”, p. 181.
২৫. Gaur Dás Bysack, “Notes on a Buddhist Monastery at Bhoṭ Bágán (Howrah), on two rare and valuable Tibetan MSS discovered there, and on Puran Gir Gosaiṃ, the celebrated Indian Áchárya and Government Emissary at the Court of the Tashi Lama, Tibet in the Last Century” in ‘Journal of the Asiatic Society of Bengal, Vol. LIX, Part I, Nos. I to IV-1890’; Calcutta: Baptist Mission Press, 1891, pp. 76, 87.
২৬. Jadunath Sarkar, ‘A History of Dasnami Naga Sanyasis’, pp. 277-278.
২৭. Samuel Turner, ‘An Account of An Embassy to the Court of the Teshooo Lama, in Tibet, Containing A Narrative of a Journey through Bootan, and Part of Tibet’; London: W. Bulmer & Co., 1800, pp. v-xiv.
২৮. S.C. Sarkar, “A Note on Puran Gir Gosain”, p. 84.
২৯. Clements R. Markham, ‘Narratives of the Mission of George Bogle to Tibet, and of the Journey of Thomas Manning to Lhasa’; London: Trübner and Co., 1876, pp. 44-46, 49, 61-190, 136; Samuel Turner, ‘An Account of An Embassy to the Court of the Teshooo Lama, in Tibet, Containing A Narrative of a Journey through Bootan, and Part of Tibet’, pp. 38, 431-432; S.C. Sarkar, “A Note on Puran Gir Gosain”, p. 84.
৩০. Clements R. Markham, ‘Narratives of the Mission of George Bogle to Tibet, and of the Journey of Thomas Manning to Lhasa’, pp. 134, 164-165, 167-168.
৩১. S.C. Sarkar, “A Note on Puran Gir Gosain”, p. 85.
৩২. Imperial Record Department, ‘Calendar of Persian Correspondence, Vol. V, 1776-80’; Calcutta: Government of India, Central Publication Branch, 1930, p. 12.
৩৩. Toni Huber, ‘The Holy Land Reborn: Pilgrimage & the Tibetan Reinvention of Buddhist India’; Chicago and London: The University of Chicago Press, 2008, p. 218.
৩৪. Gaur Dás Bysack, “Notes on a Buddhist Monastery at Bhoṭ Bágán (Howrah), on two rare and valuable Tibetan MSS discovered there, and on Puran Gir Gosaiṃ, the celebrated Indian Áchárya and Government Emissary at the Court of the Tashi Lama, Tibet in the Last Century”, pp. 50-52.
৩৫. প্রীতম নস্কর, “‘ভোটবাগান মঠ’ সেকাল ও একাল একটি পুরাতাত্ত্বিক নিরীক্ষণ”, কল্যাণ কুমার দাস সম্পাদিত, ‘হাওড়া চর্চা, ৩য় সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২৪, ভোটবাগান’; লিলুয়া: কল্যাণ দাস, ২০২৪, পৃ. ৩৮৫-৩৯১।
৩৬. Clements R. Markham, ‘Narratives of the Mission of George Bogle to Tibet, and of the Journey of Thomas Manning to Lhasa’, p. 209; S.C. Sarkar, “A Note on Puran Gir Gosain”, p. 85.
৩৭. Alexander Dalrymple edited, ‘Oriental Repertory, Volume the second’; London: Ballintine and Law, 1808, pp. 145-164; Samuel Turner, ‘An Account of An Embassy to the Court of the Teshooo Lama, in Tibet, Containing A Narrative of a Journey through Bootan, and Part of Tibet’, pp. 457-473; Clements R. Markham, ‘Narratives of the Mission of George Bogle to Tibet, and of the Journey of Thomas Manning to Lhasa’, p. lxx; Schuyler Cammann, “The Panchen Lama’s Visit to China in 1780: An Episode in Anglo-Tibetan Relations” in ‘The Far Eastern Quarterly, Vol. 9, No. 1 (Nov. 1949)’; Durham, North Carolina: Duke University Press, 1949, pp. 3-19; S.C. Sarkar, “A Note on Puran Gir Gosain”, p. 85.
৩৮. S.C. Sarkar, “A Note on Puran Gir Gosain”, pp. 85-86.
৩৯. Samuel Turner, ‘An Account of An Embassy to the Court of the Teshooo Lama, in Tibet, Containing A Narrative of a Journey through Bootan, and Part of Tibet’, pp. xvii,167-358; Clements R. Markham, ‘Narratives of the Mission of George Bogle to Tibet, and of the Journey of Thomas Manning to Lhasa’, p. 138n1; S.C. Sarkar, “Some Notes on the Intercourse of Bengal with the Northern Countries in the Second Half of the Eighteenth Century” in ‘Bengal Past & Present, Vol. XLI, Part II, April-June 1931’; Calcutta: Calcutta Historical Society, 1931, p. 120; S.C. Sarkar, “A Note on Puran Gir Gosain”, p. 86.
৪০. Samuel Turner, ‘An Account of An Embassy to the Court of the Teshooo Lama, in Tibet, Containing A Narrative of a Journey through Bootan, and Part of Tibet’, pp. 419-431; S.C. Sarkar, “A Note on Puran Gir Gosain”, p. 86.
৪১. Schuyler Cammann, ‘Trade through The Himalayas: The Early British Attempts to Open Tibet’; Princeton, New Jersey: Princeton University Press, 1951, pp. 139-142.
৪২. Sarat Chandra Das, ‘An Introduction to the Grammar of the Tibetan Language’; Darjeeling: Darjeeling Branch Press, 1915, Appendix pp. 5, 43-44.
৪৩. S.C. Sarkar, “A Note on Puran Gir Gosain”, pp. 86-87; Gaur Dás Bysack, “Notes on a Buddhist Monastery at Bhoṭ Bágán (Howrah), on two rare and valuable Tibetan MSS discovered there, and on Puran Gir Gosaiṃ, the celebrated Indian Áchárya and Government Emissary at the Court of the Tashi Lama, Tibet in the Last Century”, p. 99.
৪৪. S.C. Sarkar, “A Note on Puran Gir Gosain”, p. 87.
৪৫. কল্যাণ কুমার দাস “ভোটবাগান মঠ: ভ্রান্তি নিরসন”, ‘হাওড়া চর্চা, ৩য় সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২৪, ভোটবাগান’; লিলুয়া: কল্যাণ দাস, ২০২৪, পৃ. ৭২-৭৪।
৪৬. Gaur Dás Bysack, “Notes on a Buddhist Monastery at Bhoṭ Bágán (Howrah), on two rare and valuable Tibetan MSS discovered there, and on Puran Gir Gosaiṃ, the celebrated Indian Áchárya and Government Emissary at the Court of the Tashi Lama, Tibet in the Last Century”, pp. 54-55, 90-92.
৪৭. Gaur Dás Bysack, “Notes on a Buddhist Monastery at Bhoṭ Bágán (Howrah), on two rare and valuable Tibetan MSS discovered there, and on Puran Gir Gosaiṃ, the celebrated Indian Áchárya and Government Emissary at the Court of the Tashi Lama, Tibet in the Last Century”, p. 92n1; Toni Huber, ‘The Holy Land Reborn: Pilgrimage & the Tibetan Reinvention of Buddhist India’, pp. 226-228; প্রীতম নস্কর, “‘ভোটবাগান মঠ’ সেকাল ও একাল একটি পুরাতাত্ত্বিক নিরীক্ষণ”, কল্যাণ কুমার দাস সম্পাদিত, ‘হাওড়া চর্চা, ৩য় সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২৪, ভোটবাগান’; লিলুয়া: কল্যাণ দাস, ২০২৪, পৃ. ৩৯৫-৩৯৭।
৪৮. ভোটবাগান মঠের ম্যানেজার সুনীল বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে লেখকের সাক্ষাৎকার, ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬।