সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

সাংস্কৃতিক ইতিহাস

বাংলা ভাষা সাহিত্যের ইতিহাসে মধ্যযুগের দীর্ঘ সময়টাকে আমরা দুটো বড়ো উপবিভাগে বিভক্ত করে থাকি। প্রথম অংশটাকে বলি আদি-মধ্যযুগ আর পরের অংশটাকে অন্ত-মধ্যযুগ। এই দুই যুগের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন মধ্যযুগের বাংলার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব শ্রীচৈতন্যদেব। চৈতন্যদেবের জন্ম ১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দে আর প্রয়াণ ১৫৩৩ খ্রিস্টাব্দে। সাধারণভাবে ১৩৫০ থেকে ১৫০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালকে আমরা আদি-মধ্যযুগ এবং ১৫০০ থেকে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালকে অন্ত-মধ্যযুগ বলে থাকি। ১২০০ থেকে ১৩৫০ – এই সময়কালের বাংলা ভাষা বা সাহিত্যের তেমন কোনও নিদর্শন আমাদের কাছে নেই। ফলে বাংলা ভাষা সাহিত্যের আদিযুগ যখন ১২০০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ শেষ হয়ে গেল, তখনই আদি-মধ্যযুগের শুরু এমনটা বললেন না ভাষা সাহিত্যের ইতিহাসকাররা। তাঁদের মনে হল ১২০০ – ১৩৫০ কে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে মতো আকর বা আলো যখন পাওয়া যাচ্ছে না, তখন একে অন্ধকার যুগ হিসেবেই আপাতত চিহ্নিত করা বাঞ্ছনীয়। এই ধরনের যুগবিভাগ অবশ্যই পালটে যেতে পারে যদি এই পর্বে লেখা ভাষা সাহিত্যের কোনও গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন আমরা খুঁজে পাই।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মৈমনসিংহ গীতিকার প্রকাশ এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দীনেশচন্দ্র সেন সম্পাদিত শতবর্ষ পুরানো মৈমনসিংহ গীতিকা প্রকাশিত হয়েছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এই সময় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সম্পর্ক ছিল নিবিড়, যা ছিল ঐতিহাসিকও। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তার বছর চল্লিশের ‘শৈশবকালে’ আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের মতো অভিভাবকের হাতে এসে পড়েছিল। তাঁর বুদ্ধিমত্তা, কর্মোদ্যম, শিক্ষাসচেতনতা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে অতি দ্রুত দেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্মান এনে দিয়েছিল। প্রচলিত ধারণাকে নস্যাৎ করে দেওয়ার মতো বাংলা সমাজ জীবনের দলিল মৈমনসিংহ গীতিকার প্রকাশ আর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা স্নাতকোত্তর বিভাগের ঐতিহাসিক দ্বারোদ্ঘাটন প্রায় সমসাময়িক ঘটনা।
বটতলার বই মানেই মধ্যবিত্ত বাঙালির কাছে এক ধরনের আদিরসাত্মক রচনার ছাপা, যেগুলো ছেলেমেয়েরা লুকিয়ে পড়তেন এক সময়ে। হতে পারে ‘বটতলা’ নামটি এসেছে কলকাতার মুদ্রণ যুগের প্রথম পর্বের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে, কিন্তু এই নামের সঙ্গের যে ধারণা, তার মধ্যে মিশে আছে উচ্চধারার সাহিত্যের তাচ্ছিল্যের ধারাবাহিকতা, প্রোপাগান্ডা, এমনকি প্রকাশক বা বিক্রেতার পাঠককে প্রলুব্ধ করার হাতছানিও। বটতলার বই মানেই যে কেবল আদিরসাত্মক নয়, তা বারবার উল্লেখ হয়ে আসছে সেই সুকুমার সেনের সময় থেকে। এমনকি প্যাট্রিক জে. কারনি তাঁর রচিত A History Of Erotic Literature–এ চার শতকের প্রধানত ইংরেজি ও ফরাসি আদিরসের যে সাহিত্যিক নিদর্শনের কথা উল্লেখ করেছেন, তাতে দেখা যায় বটতলার ছাপার তুলনায় এলিট সাহিত্যের সংখ্যা এক্ষেত্রে অনেক বেশি। তবুও মধ্যবিত্ত বাঙালি পাঠকের কাছে বটতলার বিষয়গত চরিত্র সম্পর্কে ধারণার পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব হয়নি।
বর্তমান উত্তরপ্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশের বেশ কয়েকটি জেলা জুড়ে বুন্দেলখণ্ডের ভৌগোলিক এলাকার ব্যাপ্তি। বুন্দেলখণ্ডের পাহাড় আর উপত্যকা ঘেরা ভূখণ্ডে দুই নিম্নবর্গীয় বীর আল্হা আর উদলের যশোগাথা সম্ভবত অন্ত-মধ্যযুগের সূচনাকাল থেকেই লোকসংস্কৃতির অঙ্গীভূত। সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত এই লোকগাথার ২৩টি সমরাঙ্গনে ৫২টি যুদ্ধের আবেগদীপ্ত বর্ণনা এই অঞ্চলের মূলত কৃষিজীবী সমাজের কিশোর আর তরুণদের যুদ্ধে অংশ নিয়ে বীরত্ব প্রদর্শনে উদ্বুদ্ধ করে চলেছে। প্রতি বছর শ্রাবণ মাসে আকাশ যখন মেঘে ঢেকে যায়, ঢোলক, চিমটা আর মঞ্জিরার বাদ্যের সঙ্গে বুন্দেলখণ্ডের গ্রামে গ্রামে আল্হাখণ্ডের যুদ্ধগাথার হুংকারে মুখরিত হয়ে ওঠে মাটি আর পাহাড়। বীররসাত্মক আল্হাখণ্ডের বাহান্নটি যুদ্ধগাথার মধ্যে বুন্দেলখণ্ডের তরুণ হৃদয় সবচেয়ে বেশি আলোড়িত হয় যখন শুরু হয় আল্হার নিজের বিবাহের জন্য ন্যায়নাগড়ের লড়াইয়ের বাখান।