সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

লিপি, মধ্যযুগ, ইউরোপ ও ব্ল্যাকলেটারের কথা

লিপি, মধ্যযুগ, ইউরোপ ও ব্ল্যাকলেটারের কথা

কুন্তল রায়

আগস্ট ৭, ২০২১ ৩৬৭ ১৪

বেশ একটা গুগলি দিয়ে লেখাটা শুরু করা যেত। সেটা এই রকম, বলুন তো স্টেটসম্যান পত্রিকা, হিটলারের আত্মজীবনী ‘মাইন কাম্ফ’ ও ওল্ড মঙ্ক কোম্পানির মধ্যে মিল কী? হয়তো শিরোনাম দেখে আগেই খানিকটা আন্দাজ করতে পেরেছেন; উত্তরটা হল, এদের তিনটেরই নাম লেখার ক্ষেত্রে একই অক্ষরছাঁদ (Typeface) ব্যবহার করা হয়। এই লেখাটিতে সেই অক্ষরছাঁদ (পরিভাষার পিণ্ডি চটকে অনেক জায়গাতেই লিপি, অক্ষর বা হরফ বলেও উল্লেখ করে ফেলেছি, যা আসলে একই) এবং তার ইতিহাস নিয়ে কিছু আলোচনা হবে।

প্রথমে নাম থেকেই শুরু করা যাক। এর নাম ‘ব্ল্যাকলেটার’ কেন? পৃথিবীর সব ছাপা অক্ষরের রঙই তো কালো, তাহলে আলাদা করে একে ‘কালো অক্ষর’ নাম দেওয়া কেন বাপু? এই নিয়ে নানান জনের নানা মত আছে। সারা ওয়ারনারের ব্যাখ্যা অনুসারে এই অক্ষরগুলিতে কালো চওড়া অংশ রোমান অক্ষরের তুলনায় অনেকটাই বেশি। তাই এর নাম দেওয়া হয়েছিল ব্ল্যাকলেটার। তবে এই নামটির প্রচলন খুব বেশি পুরনো হয়তো নয়। ১৬৮৩ সালে যোসেফ মক্সন প্রথম ‘ব্ল্যাকলেটার’ শব্দটি ব্যবহার করেন। সহজ উপমায়, ব্ল্যাকলেটার অনেকটা হিন্দু ধর্মের মত। মহারাষ্ট্রে গণেশ, বাংলায় দুর্গা, উত্তরে নবরাত্রির আলাদা আলাদা প্রাধান্য থাকলেও আসলে এই সবই যেমন হিন্দু ধর্মের অন্তর্গত, ঠিক তেমনই ইউরোপে মুদ্রণ সংস্কৃতির মাধ্যমে তৈরি হওয়া এই আলাদা অক্ষর ধরণগুলিকে একসাথে ব্ল্যাকলেটার বলা হয়। এখানে নিচের ছবিটার মাধ্যমে তার একটি উদাহরণ দিচ্ছি, যাকে দেখলেই হয়তো চিনে ফেলবেন।

আগ্রহ নিয়ে এতটা পড়ার পর আপনাকে সেই প্রতিটি আলাদা চেহারার ইতিহাস ও অবস্থানের কথা নিশ্চয়ই বর্ণনা করবো। তবে, তার আগে এর সম্বন্ধে কয়েকটা সাধারণ কথা জেনে নিলে সুবিধা হবে। আজকের দিনে ব্ল্যাকলেটারে ছাপা লেখা পড়ার সবচেয়ে বড় অসুবিধা হল, এই হরফের সাথে আমরা খুব একটা পরিচিত নই। বিশেষ করে উপরের ছবিটার বড় হাতের অক্ষরগুলি দেখুন, এরা সে সময় বিভিন্ন রকমের হত। এখানে একটা কথা না বললেই নয় যে, হাতে লেখা বইয়ের ক্ষেত্রে একাদশ থেকে পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত প্রথম অক্ষরটিকে (initial বা drop cap) বইয়ের অলংকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হত। সেগুলো কখনও কখনও পৃষ্ঠার অনেকটা অংশ জুড়ে থাকত। এর একটা উদাহরণ হিসেবে নিচের ছবিটি দেখানোর লোভ সামলাতে পারছি না।

 ‘L’- কেমন লতায় পাতায় অর্ধেক কাগজ জুড়ে আছে দেখুন!

এই সময়ের ইনিসিয়াল অক্ষরগুলি বইয়ের ফাঁকা জায়গা পূরণ করতে অলংকরণের কাজে ব্যবহার করা হত। হাতে লেখা বইয়ের আমলে বড় হাতের অক্ষর (Capital/Majuscule) নিয়ে প্রচুর পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। অক্ষর-ইতিহাসে বড় হাতের অক্ষরের দাপটের যুগকে ‘uncial’ নামে আলাদা এক পরিচিতি দেওয়া আছে। তবে সে সব হাতের লেখা বইয়ের যুগের কথা, যা নিয়ে এখানে বিশেষ আলোচনা হবে না।

এখন প্রশ্ন হল, ইউরোপের ছাপা বইয়ের সূচনায় যে ব্ল্যাকলেটারের ব্যবহার শুরু হল, সে হরফ দেখতে কেমন? এলেক্সান্ডার লওসন বলেছেন যে, এই অক্ষর কোনভাবেই একাদশ শতকের ক্যারোলিঞ্জীয় নবজাগরণের সময়ের বইয়ের লেখা অক্ষরের মত নয়। কারণ এরপর প্রায় চার শতক পেরিয়ে গিয়েছে। তাই অক্ষরের চেহারায় পরিবর্তন আসবে, এটাই স্বাভাবিক। প্রথম ছাপা অক্ষরের আদল অনেকটাই পঞ্চদশ শতকের উত্তর ইউরোপীয় গথিক লিপির কাছাকাছি। অনেকে এই লিপির উৎস সন্ধানে সুদূর নবম শতকে শার্লামেনের আমল বা আরও আগে চলে যান, সেটা লওসনের মতে পণ্ডশ্রম ছাড়া আর বেশি কিছু নয়। ক্যারোলিঞ্জীয় অক্ষরগুলি ছিল গোল গোল দেখতে, বাংলায় যেমন ‘ত’, ‘ড’ এরকম।

পরবর্তীকালে (চতুর্দশ শতকের শেষ ও পঞ্চদশ শতকের শুরুতে) ক্যারোলিঞ্জীয় লিপি ইতালির মানবতাবাদীদের কাছে খুবই জনপ্রিয় হয়। এখান থেকেই আধুনিক রোমান অক্ষরের সূচনা। হাতে লেখা বইয়ের যুগে এই আলোচনাকে নিয়ে যাব না ভাবলেও কোন কোন ক্ষেত্রে সেই প্রসঙ্গ এড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে। যেমন ধরুন, ব্ল্যাকলেটারের আবির্ভাবের কথা উঠলে দ্বাদশ শতক থেকে পঞ্চদশ শতকে ক্রমশ হাতের লেখা বইয়ের চাহিদা বৃদ্ধি ও উৎপাদনের পরিবর্তন লক্ষ্য করাটা অত্যন্ত জরুরি। দ্বাদশ শতকের দিকে বই তৈরি বা নকল করা একমাত্র চার্চের অধিকার ছিল। ইউরোপ জুড়ে তখন চার্চগুলির চরিত্র ছিল অত্যন্ত রক্ষণশীল। সে সময় খুব বেশি বইয়ের চাহিদা ছিল এমনও নয়। অথচ পঞ্চদশ শতকে এসে বইয়ের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয় নতুন গজিয়ে ওঠা বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ছাত্রদের প্রয়োজনে। বইয়ের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে ও বিভিন্ন বিষয়ের বইয়ের নকল হতে থাকায় চার্চের অধিকার ক্রমশ কমতে থাকে এবং চার্চে ব্যবহৃত অক্ষরের চেহারাগুলিতে দ্রুত পরিবর্তন আসতে শুরু করে।

সেই পরিবর্তন কেমন ছিল এটাই হল আসল আগ্রহের বিষয়। চার্চের আমলে নানা ধরণের অক্ষরশৈলী ব্যবহার করা হলেও এই অক্ষরগুলির একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হল, দুটো পাশাপাশি অক্ষর নিবিড়ভাবে যুক্ত করা হত (উপরের প্রথম ছবিটা দেখলেই বোঝা যাবে)। এই ধরণের ঘন অক্ষর দ্রুত লেখা বা পড়া খুবই কঠিন। তাই চার্চের বাইরে যে সমস্ত হাতে লেখা বইগু তৈরি হতে লাগলো, তার অক্ষর বিন্যাস (বিশেষ করে ছোট হাতের অক্ষর বা minuscule) পরস্পর আলাদা এবং অক্ষরের নিচটা কোনাকুনি রাখতে দেখা গেল।

এলেক্সান্ডার লওসন আরেকটি কারণকে খুব গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, চার্চের লিপিকার ও অন্য লিপিকারদের মধ্যে গুণগত পার্থক্য ছিল। এই পার্থক্যটা আসলে একজন শিল্পী এবং কারিগরের মধ্যের যে পার্থক্য অনেকটা সেই রকম। যাই হোক, পাথর কাটা, ধাতুতে অক্ষর খোদাই করা আর কাগজে লেখা – দুটোর মধ্যে পার্থক্য দেখা যেতে লাগলো। যদিও চার্চের ভেতরেই বিভিন্ন ধরনের কাজে আলাদা অক্ষরের প্রচলন ছিল। সেগুলো বাইরে বহুল প্রচলিত হতে শুরু করলে এই বৈচিত্র্য ক্রমশ বাড়তে থাকে। সুতরাং ১৪৪০ সালে বা সেই সময় থেকে, অর্থাৎ ঐতিহাসিকরা যে সময়কে গুটেনবার্গের পরীক্ষা-নিরীক্ষার সূচনা ও ছাপার প্রযুক্তির প্রবর্তনের যুগ হিসেবে মনে করেন, তখন থেকেই এই অক্ষরগুলি একটি প্রতিষ্ঠিত রূপ পায় এবং ছাপার শুরুর সময়কেই ব্ল্যাকলেটারেরও যথার্থ সূচনাকাল বলে মনে করা যেতে পারে। মোট কথা, হাতের লেখা অক্ষরের তুলনায় ছাপা অক্ষরের ক্ষেত্রে অনেক বেশি অভিন্নতা থাকার কথা।

ব্ল্যাকলেটারের বিভিন্নতা

ব্ল্যাকলেটার আজকের ‘টাইমস নিউ রোমান’-এর মত কোন একটি বা দুটি নির্দিষ্ট অক্ষরশৈলী নয়। পশ্চিম ইউরোপে এর নানা চেহারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। তাদের আলাদা নামও আছে। সেসব কথায় প্রবেশের আগে ছোটখাটো কয়েকটা দিক দেখে নেওয়া দরকার। যেমন, এর অপর একটি প্রচলিত নাম হল ‘গথিক লিপি’। এখানে প্রশ্ন হতে পারে, ‘গথিক’ শব্দটা ব্যবহার করার কারণ কী?

বড় আশ্চর্যের শব্দ এই গথিক। নানান ক্ষেত্রে ব্যবহার হয় শব্দটি। গথ বা গথিক শব্দটি ইউরোপের ইতিহাসে যে খুব উচ্চতর শ্রদ্ধার জায়গা দখল করে আছে, এমন নয়। গথ উপজাতিরা প্রাথমিকভাবে পূর্ব জার্মানি অঞ্চলে অবস্থান করলেও গথিক শব্দটি ইউরোপের নানান অঞ্চলের বা নানান বৈশিষ্ট্য বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। গথিক স্থাপত্যরীতি এমনিতেই খুব পরিচিত একটি শব্দ। আগে তার একটা ছবি দেখাই, পরে বাকিটা জানাচ্ছি।

এই হল ফ্রান্সের অ্যামিয়েন্স ক্যাথিড্রাল; গথিকশৈলীতে এটি তৈরি হয়েছিল ১২২০ থেকে ১২৬০ সালের মধ্যে। ছবিটা এক ঝলক লক্ষ্য করলেই দেখবেন, এর নিচের দিকের আকারে সরলরেখার প্রাচুর্য তবে উপরে দিকে গিয়ে কোণ তৈরি হয়েছে- ডিজাইনটা এমনই। ব্ল্যাকলেটারের অধিকাংশ অক্ষরের ডিজাইনে নিচের দিকে সোজা দাগ ও উপরে কৌণিক শেষভাগ, ক্যালিগ্রাফির পরিভাষায় যাকে বলে ডায়মন্ড এন্ড। তাই ব্ল্যাকলেটারের অপর নাম ‘গথিক স্ক্রিপ্ট’, যদিও ‘গথিক অ্যালফাবেট’-এর সাথে এর কিন্তু কোন সম্পর্ক নেই। গথিক লিপিমালার একটি ছবি দিলে আপনি নিজেই মেলাতে পারবেন। একে আবার ওল্ড ইংলিশ আক্ষরও বলা হয়।

আবার ফিরে আসি অক্ষরের শ্রেণীবিভাগের আলোচনায়। ব্ল্যাকলেটারের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় যে ভাগগুলি আছে, তার প্রধানটি হল Textura, এছাড়াও জার্মানিতে Schwabacher, Fraktur, Cursiva, ফ্রান্সে Bastarda ইত্যাদি। এদের আবার কয়েকটি উপবিভাগও আছে।

একাদশ শতক থেকে যখন লিপির বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে, সেই সময়ে ব্ল্যাকলেটারের দেখাদেখি বেশ কিছু লিপির উদ্ভব হয়েছিল। এইগুলিকে যদিও আলাদা কাজে ব্যবহার করা হত। যেমন- আইন, চার্চের সাধারণ তথ্য, স্থানীয় সাহিত্য, লোককথা ইত্যাদি লেখায়। ছাপা যুগের সূচনায় এই অক্ষরছাঁদগুলিকে নতুনভাবে ব্যবহার শুরু হয়।

গুটেনবার্গ তার বাইবেলে টেক্সচুরা হরফ ব্যবহার করেছিলেন, যা কিনা ছিল সবচেয়ে প্রাচীন ব্ল্যাকলেটারের একটি ধারা। তাঁর টেক্সচুরা ব্যবহারের দুটো নির্দিষ্ট কারণ ছিল। প্রথমত, সময়টা ছিল হাতে লেখা বইয়ের স্বর্ণযুগ। তাই ছাপানো বইয়ের অক্ষর যাতে হাতে লেখা বইয়ের কাছাকাছি ধরনের অনুভূতি আনতে পারে, সেই লক্ষ্যে তিনি হাতের লেখা হরফের সাথে ছাপানো অক্ষরের মিল রাখতে চেয়েছিলেন। দ্বিতীয় কারণটি আরও বেশি যুক্তিযুক্ত। সেটা বলার আগে গুটেনবার্গের ছাপা বাইবেলের একটি পাতার ছবি দেখাই।

এখানে দেখবেন, প্রতি পাতায় ৪২টি লাইন এবং দুটি অক্ষরের মাঝের যে দূরত্ব তা দৃষ্টিকটুভাবে কম। একজন সাধারণ পাঠকের পক্ষে এই ছাপা অক্ষর পড়া বেশ কঠিন। তাঁর বাইবেলে অক্ষরের এতটা ঘিঞ্জি করে ছাপানোর কারণ কী? এর উত্তর, সে সময়ের কাগজ ছিল অগ্নিমূল্য। গুটেনবার্গের সময় ইউরোপে কাগজ যে খুব সহজলভ্য ছিল এমন নয়। এর দামও ছিল অত্যন্ত বেশি। এছাড়াও গুটেনবার্গ কেবল কাগজেই নয়, পার্চমেন্টে (অর্থাৎ পশুর চামড়ায়), ভেলাম (বাছুরের চামড়া দিয়ে তৈরি আরো মোলায়েম কাগজ)-এ গ্রন্থ ছাপিয়েছেন। ছাপার প্রাথমিক উপাদান হিসেবে এর প্রতিটির দাম ছিল অত্যন্ত বেশি।

পিটার স্কহেফার (১৪২৫ – ১৫০৩) প্রায় সমসাময়িককালে এর একটি বিকল্প পথ বের করেন। তিনি গথিক অক্ষরগুলিকে তুলনায় ছোট করেন। সহজ কথায়, তিনি অক্ষরগুলো একটু মোটা আর বেঁটে করে দিলেন। তার এই প্রচেষ্টা একান্তভাবেই কাগজের অধিক মূল্যমানের কারণে ও তার পূর্ববর্তী মুদ্রকদের অক্ষর বিন্যাসের সমস্যাকে সামাল দেবার একটি প্রয়াস ছিল। স্কহেফার ১৪৫৯ সালে ‘রাশিওনাল’ গ্রন্থ ছাপানোর সময় অক্ষরের এই নতুন প্রবণতা আনলেও এটি সত্যিকারের প্রতিষ্ঠা পায় ১৪৬২ সালে, যখন থেকে তিনি এই হরফে প্রথম বাইবেল প্রকাশ করেন। এখানে বলে রাখি, স্কহেফার ছিলেন গুটেনবার্গের সবচেয়ে কৃতি কারিগর এবং তিনি যে বাইবেল ছাপিয়েছিলেন তার নামই ছিল ‘Biblia pulcra’ বা বিউটিফুল বাইবেল। তাই তাঁর ছাপানো বইয়ের এই ছবিটি দেখানোর লোভ সামলাতে পারছি না।

স্কহেফারের কথা এত গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করার একটি বিশেষ কারণ আছে। এ পর্যন্ত মনে করা হত বাইবেল যেমন তেমন অক্ষরে ছাপানো উচিত নয়। সেই অক্ষর যেন চার্চের অনুমদিত ও তাদের সুখপাঠ্যের কাছাকাছি হয়। স্কহেফার খানিকটা বাস্তব প্রয়োজনে ও কিছুটা অক্ষরের ফিউশন ঘটিয়ে যে নতুন অক্ষরছাঁদ আনলেন, তা এতদিনের ঐতিহ্যতে আঘাত হানল। আমরা যদি রোমান অক্ষরের জনপ্রিয়তার কারণ কখনো অনুসন্ধান করি, তাহলে দেখব সেও হয়েছিল কেবল মানবতাবাদীদের পৃষ্ঠপোষকতায় নয়, বরং সদ্য শিক্ষিতশ্রেণীর এই জাতীয় অক্ষরে সড়গড় থাকার কারণে।

স্কহেফার ব্ল্যাকলেটারের এতদিনের যে প্রতিষ্ঠিত অক্ষরধারা, তা থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলেন। তাঁর ব্যবহৃত এই শৈলীর কী নাম হওয়া উচিত, সে নিয়ে লিপি গবেষকদের মধ্যে মতপার্থক্য আছে। একে গথিক-অ্যান্টিকও বলা হয়ে থাকে। কারণ গথিক ও প্রাচীন রোমান অক্ষরের সংমিশ্রণ এতে লক্ষ্য করা যায়। তবে পরবর্তী এক শতকের মধ্যেই তার প্রচলিত এই লিপিতে বেশ কিছু পরিবর্তন হয় এবং শেষমেশ তাঁর ছাপানো প্রথম বইয়ের লেখকের নামেই লিপির নামকরণ ‘ডুরান্ডাস’ থেকে যায়।

এতক্ষণ আমরা দেখছিলাম পঞ্চদশ শতকের জার্মানির অক্ষরগুলো। ইতালি ও স্পেনে একই সময়ে অন্য একটি হরফের বিকাশ হয়, যার সূচনা  হয়েছিল ত্রয়োদশ শতকের হাতে লেখা অক্ষর থেকেই। এগুলো সেই আদি ও অকৃত্রিম টেক্সচুরার মত সরলরেখায় নয় বরং বেশ একটু গোলাকৃতির, তাই এর নাম দেওয়া হয়েছিল রোটান্ডা বা রাউন্ড গথিক। এখন কথা হল, ইতালির মতো জায়গায়, যেখানে ধর্মের দাপট অত্যন্ত বেশি, সেখানে টেক্সচুরার বাইরে হঠাৎ রোটান্ডার প্রয়োজন হল কেন? এই ‘পাপকার্যের’ জন্য দায়ী করতে হয় ভেনিসের নিকোলাস জেনসনকে। তবে তাকে অভিযুক্ত করার আগে দুটো কথা উল্লেখ করা খুব জরুরি। প্রথমত, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বাইরে রাজতন্ত্রের কাজের জন্য একটি অক্ষরছাঁদের চাহিদা ছিল। চার্চের বাইরের যা লেখালেখি, যেমন রাজাদেশ বা আইন লেখার জন্য কিংবা পরবর্তীকালে শাসনের প্রয়োজনে ছাপার জন্য (ইতালিতে ছাপার প্রচলন শুরু হয় ১৪৬৫ সালে) একটি আলাদা হরফের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, ইতালির মুদ্রণকাররা ছাপার কাজে তাদের স্বতন্ত্র পরিচিতি বজায় রাখতে নতুন এই অক্ষরের প্রতি আকৃষ্ট হন। এই দু’য়ে মিলে নিচের হরফ রোটান্ডার আবির্ভাব।

রোটান্ডা প্রসার লাভ করেছিল সব থেকে বেশি; আর তা হবে নাইবা কেন? পঞ্চদশ শতকে কেবল ধর্মীয় শিক্ষার প্রয়োজনে নয়, ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রযুক্তির পাঠ নিতেও ইতালি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল। তাই সেখানে আগত মানুষের মাধ্যমে এই সময়ে রোটান্ডা কেবল ইতালির নিজস্ব প্রত্যন্ত অঞ্চলে নয়, সুদূর জার্মানি ও নেদারল্যান্ডেও খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

আমরা এতক্ষণ যে যে অক্ষরছাঁদ নিয়ে আলোচনা করলাম সকলই শুদ্ধ অক্ষর। এবার যার কথা বলব, তার নাম বাস্টার্ড, আশাকরি গালিগালাজ হিসেবে কেউ শব্দটাকে নেবেন না। গুটেনবার্গ যখন প্রথম বাইবেল ছাপান ঠিক তার আগে, ১৪৫৪ – ৫৫ সালে কয়েকটা ইনডালজেন্স (মুক্তিপত্র) ছাপিয়েছিলেন। ৩০ লাইনের সেই মুদ্রণে বড় হাতের অক্ষরগুলি টেক্সচুরাতে থাকলেও ছোট হাতের অক্ষর তা ছিল না। এখানে দুটো ছবি দিলে হয়তো ভিন্নতা সহজে বোঝা যাবে।

৩০ লাইনের এই ইন্ডালজেন্সের (১৫৫৫) অক্ষর হয়তো বুঝতে সমস্যা হতে পারে, তাই অক্ষরের আরেকটু স্পষ্ট একটি ছবি দিচ্ছি, যা ছাপা হয়েছিল ১৫৫৪ সালে। আশা করি, সহজেই আগের অক্ষরের সাথে পার্থক্য বোঝা যাবে।

সারা ইউরোপে পঞ্চদশ শতকের শেষ তিন দশক থেকে বইয়ের চাহিদা তুমুল বৃদ্ধি পায়, যাকে ‘প্রিন্ট কালচার’ বা ছাপা যুগের সূচনা বলা হয়ে থাকে। তবে ঐতিহাসিক মহলে এই সময় নিয়ে দুই ভিন্ন ধারণা আছে।  জেসন ম্যাকেলিগট এবং ইভ প্যাটেন তাদের সম্পাদিত গ্রন্থের ভূমিকায় খুব সুন্দর একটি উদাহরণ দিয়ে নিজেদের বক্তব্যকে তুলে ধরেছেন। তাদের কথায়, বই ছাপা হতে শুরু হওয়া আর ‘প্রিন্ট কালচার’ দুটো এক জিনিস নয়। ধরুন ৮০ বা ৯০ এর দশকে মোবাইল ফোন ছিল, কিন্তু বর্তমানে গোটা বিশ্বসমাজে যে ‘মোবাইল কালচার’ শুরু হয়েছে, তার সূচনা সেই সময় হয়নি। ঠিক তেমনি, তাদের মতে পঞ্চদশ শতকের শেষের সময়কে কোনভাবেই ‘প্রিন্ট কালচারের’ সময় বলা যায় না।

অন্যদিকে চার্লস সি. মিশ এই ব্যাখ্যা সার্বিকভাবে গ্রহণ করতে পারেননি। তিনি মনে করেন, জার্মানিতে ও পরবর্তীকালে ফ্রান্স, ইংল্যান্ডে বাস্টার্ড লিপিগুলির বিকাশ প্রমাণ করে এই অঞ্চলে ক্রমশ এমন শিক্ষিত মানুষের হার খুব দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছিল, যারা চার্চের সাথে সরাসরি যুক্ত ছিলেন না। এই লিপিগুলিতে সাধারণত বাইবেল বা গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় গ্রন্থ ছাপা হত না; তার জায়গায় সস্তার ও সাধারণের বই, যেমন- পঞ্জিকা, আঞ্চলিক ভাষার সাহিত্য, লোকগাথা ইত্যাদি, অর্থাৎ যে সমস্ত বিষয় প্রতিষ্ঠিত সাহিত্য ও ল্যাটিন ভাষাচর্চার বাইরে কম গুরুত্বের; সেসব কম খরচের ছাপাতে পাঁচমেশালি লিপির প্রয়োজন দেখা দিল। ইংল্যান্ডে লোকসাহিত্যের ইতিহাসচর্চার উপর গবেষক পিটার বার্ক কেবল পথিকৃৎ নন, আজ তিনি কিংবদন্তীতে পরিণত হয়েছেন। এছাড়াও নায়ল ও সুজেন-এর আয়ারল্যান্ড নিয়ে গবেষণার আলাদা উল্লেখ না করলেই নয়। অ্যাডাম ফক্স ২০০০ সালে ইংল্যান্ডের ওরাল লিটারেচারের উপর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগ্রন্থ উপহার দিয়েছিলেন, ২০২০ সালে স্কটল্যান্ড নিয়ে তার গবেষণাগ্রন্থটিও বর্তমানে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছে।

যাই হোক, আমরা পুরনো প্রসঙ্গে ফিরে আসি। আঞ্চলিক সাহিত্যের সমৃদ্ধির কালে যে সমস্ত মিশ্রগথিক হরফের প্রচলন হয়, তাদের ফরাসি ভাষায় একত্রে ‘লেথর বেথদা’ (lettre batarda) বলা হয়। এইগুলির নিজেদের মধ্যে অবশ্যই কিছু পার্থক্য ছিল। বর্তমান লিপি গবেষকরা মনে করেন ফ্রান্সে একাদশ শতকের সময় থেকে রাজতন্ত্রের উত্থানের কারণে এই ধরনের লিপিগুলি হাতে লেখা গ্রন্থে দেখা গেলেও ১৪৭০-এ সেখানে ছাপার প্রচলন শুরু হতেই এদের বিপুল জনপ্রিয়তা তৈরি হয়। এই লিপির ফ্রান্স থেকে ইংল্যান্ডে যেতে সময় লেগেছিল ঠিক ছয় বছর, ১৪৭৬ সালে উইলিয়াম ক্যাকস্টনের মাধ্যমে। ইংল্যান্ডে এসেই এর ‘বাস্টার্ড’ নামের সূত্রপাত, যদিও আজকাল ল্যাটিন ‘বাস্টারডা’ নামে ডাকার দস্তুর তৈরি হয়েছে।

১৪৯০ এর মধ্যেই জার্মানিতে গুটেনবার্গধন্য এই বাস্টার্ডা সবথেকে জনপ্রিয় হরফ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। সেই সময় এই দেশে যে ধরনের বাস্টার্ডা ব্যবহার করা হত, তার নাম স্কবাহার দেওয়া হয়েছিল। স্কবাহ হল জার্মানির একটি শহর। কেন সমগ্র জার্মানি এবং সুইজারল্যান্ডে প্রচলিত এই অক্ষরছাঁদের নাম এই শহরের নামে রাখা হল এটা বলা কঠিন। অবাক করার বিষয়, স্কবাহ শহরে এই অক্ষর ছাপার কোন অতীত নিদর্শন পাওয়া যায় না বললেই চলে। লওসন তাই এমন নামকরণের কারণ নিয়ে কোন সদুত্তর দিতে পারেননি। তার লেখায় আসলে যা প্রতিষ্ঠিত হয়, তা অনেকটা ওই সারা বাংলায় প্রচলিত ‘বিক্রমপুরের কাসুন্দি’ ধরণের ব্যাখ্যা।

জার্মানিতে বাস্টার্ডার সবথেকে জনপ্রিয় নিদর্শন হচ্ছে ফ্রাকটুর, প্রকৃত অর্থে যার উত্থান ও পতনেই শুরু ও শেষ হবে ব্ল্যাকলেটারের জীবনকাল। ষোড়শ শতকে সে দেশেই এই অক্ষরছাঁদের জন্ম হয়, আর জন্মদাতার নাম জোহান স্কানপারগার, যিনি অক্সবার্গে এই অক্ষরের সূচনা করেন। জার্মান ‘Fraktur’ শব্দটির অর্থ ইংরেজিতে ফ্রাকচার শব্দের মত। আসলে ফ্রাকটুর এসেছিল পুরনো স্কবেচারের প্রচলিত রীতির স্থানে। টক্সচুরা লিখতে হাতের স্ট্রোক উপর থেকে নিচে বা নিচ থেকে উপরে করতে হয়। এখানে এইটুকুতে হবার জো নেই। আপনারা নিচের আলাদা ‘O” অক্ষরগুলো দেখুন, তাহলেই বুঝতে পারবেন কিভাবে একটু একটু করে স্ট্রোকের পরিবর্তন হচ্ছে, যা ক্রমশ আর সরলরেখা এবং সমান্তরাল থাকছে না।

জার্মানিতে এই অক্ষরের আয়ু ছিল প্রায় তিনশত বছর। এমনকি ইংল্যান্ডেও প্রায় ৭০ বছর এটি প্রধান অক্ষর হিসেবে ব্যবহৃত হয় ও প্রচুর বই এতে ছাপানো হয়েছিল। ষোড়শ শতকের মাঝের সময় থেকে ইংল্যান্ডে রোমান শৈলী ক্রমশ প্রধান হরফ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলে সেখানে ফ্রাকটুর-এর দিন শেষ হয়ে আসে।

বিচার ও বিশ্লেষণ

আমরা এতক্ষণ যা জানলাম তা মূলত ব্ল্যাকলেটারের বিভিন্ন রকমগুলির আবির্ভাবের সময়ের কথা। এগুলো প্রায় সবটাই তৈরি হয়েছিল অপরিকল্পিতভাবে। কিন্তু আসল যে প্রশ্নটি এখানে তোলা যায় তা হল, এই অক্ষরছাঁদ দীর্ঘদিন টিকে রইল কেন? বিশেষত জার্মানিতে ফ্রাকটুর যে প্রায় টানা তিন শতক ধরে ব্যবহৃত হয়েছিল, তা এক ধরনের অবাক করে দেওয়ার মত তথ্যই বটে। এ আলোচনায় প্রথম যার নাম আসবে, তিনি হলেন চার্লস সি. মিশ, কারণ তিনিই প্রথম ইংল্যান্ডের ইতিহাস ও সমাজজীবনে ব্ল্যাকলেটারের প্রভাব নিয়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রবন্ধ লিখেছেন। তার মূল বক্তব্য হল, ইংল্যান্ডে টিউডর-স্টুয়ার্ট যুগের (চার্লস সি. মিশ যে উদাহরণ দিয়েছেন তার প্রকাশকাল ১৬০০ থেকে ১৭০০ সালের মধ্যে) প্রকাশিত রোমান্সগুলিতে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত বিভাজন খুব স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়। এই বিভাজন নানাভাবে দেখা যায়, যেমন মধ্যবিত্তদের জন্য লেখা বইয়ের মূল বিষয়বস্তু ছিল শিভালরি রোমান্স, যা কিনা ছাপা হত ব্ল্যাকলেটারে। তুলনায় বীরত্বপূর্ণ রোমান্সগুলি উচ্চবিত্তদের জন্য রোমান অক্ষরে ছাপানোর রীতি ছিল। চার্লস সি. মিশ খুব স্পষ্টভাবে সমাজের এই দুই শ্রেণীর পাঠকের জন্য প্রকাশনা ও অক্ষর বিন্যাসে আলাদা বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন।

তিনি শেষ পর্যন্ত এই উপসংহারে এসেছেন যে, ব্ল্যাকলেটার অক্ষরে ও খুব সাধারণ মানের ছাপানো এই বইগুলি (চ্যাপবুক নয়) যেমন ইংল্যান্ডের মধ্যবিত্তদের প্রাত্যহিক জীবনের সাথে যুক্ত হয়ে পড়ে, সেই পাঠকই যখন পরবর্তীকালে নতুন প্রজন্মে উত্তীর্ণ হয় এবং সাহিত্যের প্রতি ভিন্নতর স্বাদ গ্রহণ করতে শুরু করে তখন ইংল্যান্ডে ব্ল্যাকলেটারের দিন ফুরিয়ে আসতে থাকে। সারা ওয়ার্নার ১৬৯০ সালের একটি বইয়ের ছবি দিয়ে এই পরিবর্তনকে আরও স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন। নিচের ছবিটা দেখলে বোঝা যাবে কিভাবে ক্রমশ ব্ল্যাকলেটারের সাথে রোমান হরফের ব্যবহার শুরু হয়ে গিয়েছিল।

জার্মানিতে ইংল্যান্ডের ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখা যায়নি, অর্থাৎ ব্ল্যাকলেটারের মেয়াদ দ্রুত শেষ হয়ে যায়নি কেন? এর সবচেয়ে কার্যকরী উত্তর হল, সেখানকার শাসক ও ব্ল্যাকলেটারের মধ্যে একটি অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এমনকি ঊনবিংশ শতকের মধ্যভাগে যখন সমগ্র ইউরোপে নতুনভাবে জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটছে, সেইসময় জার্মানিতে ফ্রাকটুর-এর বিপুল প্রসার হয়। জার্মানিতে রোমান অক্ষরের বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যায়, যখন আন্তর্জাতিক বিজ্ঞাপনগুলি ক্রমশ সেই দেশে ঢুকতে থাকে। তবুও ১৯৩০ সাল নাগাদ প্রায় 60% গ্রন্থ পুরনো ব্ল্যাকলেটারেই ছাপা হত।

ব্ল্যাক লেটারের হত্যাকারী কে?

হিটলার যখন ক্ষমতায় আসেন, তার ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট পার্টি ঘোষণা করে ফ্রাকটুর হল একমাত্র লিপি যা জার্মান ভাষাকে লেখার ক্ষেত্রে যথার্থ ভাবে প্রকাশ করে। এই ঘোষণার পর থেকে জার্মানির মুদ্রণ জগতে এই লিপির চাহিদা বেড়ে যায় খুব দ্রুত। অষ্টাদশ শতকের জার্মানিতে যে পরিমাণ ছাপার কাজে এটি ব্যবহৃত হত, তা অনেকটাই বৃদ্ধি পায়। ১৯৪০ সালে সরকারিভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, ফ্রাকটুরকে আরও ছড়িয়ে দিতে হবে, কারণ বিভিন্ন রোমান হরফ তখন বাকি ইউরোপের প্রধান লিপি হিসেবে প্রতিষ্ঠা তৈরি করে ফেলেছে।

কিন্তু এরপরই ভিন্ন সুর শোনা যায়। পরের বছর অর্থাৎ ৪০ সালে মার্টিন বরম্যান একটি চিঠি প্রকাশ করেন। বরম্যান ছিলেন সেই ব্যক্তি যার কুখ্যাত উক্তি ছিল, ‘প্রতিটি  শিক্ষিত মানুষই আগামীর শত্রু’, তিনি ছিলেন হিটলারের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সহচর। সেই চিঠিতে তিনি জানান, ব্ল্যাকলেটার আসলে ‘জিউস লিপি’ থেকে আগত অক্ষরছাঁদ। তাই এই লিপিকে জার্মানি থেকে বিদায় দেওয়া হল। সবাই এই ঘোষণার পর খুব চমকিত হয়ে পড়েছিলেন। কারণ নাৎসিদের স্বস্তিকা চিহ্নের উৎস ছিল এই ব্ল্যাকলেটার। সেখান থেকে এই অক্ষরছাঁদকে একেবারে বাতিল করে দেওয়া খুবই আশ্চর্যের ছিল। অবশ্য এই সিদ্ধান্তের ভেতরে ছিল অন্য এক সমীকরণ। জার্মান শাসকরা জানতেন যে বাকি ইউরোপকে রাজনৈতিকভাবে দখলে রাখতে হলে ফ্রাকটুরকে তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। তাই কৌশলে এই লিপি জার্মানিতে বন্ধ করে দেওয়া হল।

হিটলার পরবর্তী সময়ে অবশ্য এই লিপিকে আর ফিরিয়ে আনা হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এতে ছাপানো বইয়ের সংখ্যা জার্মানিতেই ১ শতাংশেরও নিচে নেমে যায়। তবু আজও ব্ল্যাকলেটার বেঁচে আছে সংবাদপত্রের নাম-অংশে, বিভিন্ন পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শংসাপত্রের উপরে এবং অবশ্যই ট্যাটুর মত পপুলার সংস্কৃতিতে।

টীকা ও তথ্যসূত্র

১. Sarah Werner, ‘Studying Early Printed Books’, 1450-1800: A Practical Guide, Wiley Blackwell, 2019, p. – 39.

তার নিজের ভাষায় – Black letter is an apt name for this typeface because it produces letters with more black spaces than other fonts do. Black letter tends to have thick vertical lines, fewer rounded curves, and to be upright rather than sloped. Especially in early black letter faces, but also in later ones, there are multiple forms of the same letter; early black letter also used a lot of abbreviations.

২. হ্যারি কার্টার এই বক্তব্যের প্রতি যে সূত্র উল্লেখ করেছেন তা হল: Joseph Moxon, Mechanick Exercises, ii (1683-4), sect. 2, para. 2.

Harry Carter, ‘A View of Early Typography Up to about 1600’, Hyphen Press, London, 1969, p. – 5

৩. Alexander Lawson, ‘Anatomy of a Typeface’, Hamish Hamilton, London, 1990, p. – 13 – 34.

৪. ইউরোপে কাগজের প্রচলন শুরু হয় সেখানে আরবদের ক্ষমতা দখলের পর থেকে। স্পেনের সাতিভায় ১১৫০ সালে ইউরোপের প্রথম কাগজের কারখানা তৈরি হয়, যার নির্দিষ্ট প্রমাণ আছে। ফ্রান্সে কাগজের কল তৈরি হয় এর কিছু পরে, ১১৯০ সালে। ইতালির ফেব্রিয়ানো শহরে কাগজ উৎপাদন শুরু হয় এর বেশ কয়েক বছর বাদে, ১২৭৬ সাল নাগাদ। ১৩৪০ সালের মধ্যেই উত্তর ইতালির বহু স্থানে কাগজের উৎপাদন শুরু হয়ে যায়। ফ্রান্সের ট্রায়াসের (১৩৪৮) সমসাময়িক কালেই হল্যান্ডেও কাগজ তৈরির কথা জানা যায়। জার্মানির মেইঞ্জ শহরে ১৩২০ নাগাদ শুরু হয়। নুরেমবার্গে ১৩৯০ সালে কাগজের কল স্থাপন করেন উলমান স্ট্রমের। সুইজারল্যান্ডে কাগজকল স্থাপন হয় ১৪৩২ সালে। সবচেয়ে আশ্চর্যের, অনেক পরে ইংল্যান্ডে হার্টফোর্ডের কাছে ১৪৯০ সালে প্রথম কাগজের কল তৈরির কথা জানা যায়। তবে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু হয় আরও পরে, ১৫৮৮ সালে ডার্টফোর্ডে জন স্পিলম্যানের কারখানা থেকে। পোল্যান্ডে ১৪৯১ সালে, অষ্ট্রিয়াতে ১৪৯৮ সালে, রাশিয়াতে ১৫৭৬ সালে, ডেনমার্কে ১৫৯৬ সালে ও সুইডেনে ১৬১২ সালে প্রথম কাগজ তৈরির কথা জানা যায়।

৫. অক্ষরের আকারগত একক হল পিকা। পিটার স্কহেফারের নবনির্মিত এই অক্ষরে যদিও এই পিকার পরিমাণ বৃদ্ধি করা হল, কিন্তু অক্ষর হল ছোট।

৬. তারা লিখছেন – ‘One might approach the problem by way of a modern analogy: there were mobile phones in the late 1980s and early 1990s, but would one say that there was a ‘mobile phone culture’ at that time? Presumably not, and the comparison illustrates the distance we face between merely recognising the phenomena of print culture, and reaching a viable, responsible definition of its constituency.’

Jason McElligott, Eve Patten (Ed.), ‘The Perils of Print Culture: Book, Print and Publishing History in Theory and Practice’, Palgrave Macmillian, 2014, p.-3.

৭. Charles C. Mish, ‘Black Letter as a Social Discriminant in the Seventeenth Century’, PMLA Vol. 68, No. 3, Cambridge University Press (Jun., 1953), pp. 627-630

৮. প্রাগুক্ত। এই বিষয়ে পরবর্তীকালে আরও বিস্তারিত পাওয়া যায় –

Philipp Th Bertheau, ‘lackletter: Type and National Identity’, Princeton Architectural Press, 1998.

৯. সারা ওয়ার্নার, প্রাগুক্ত, পৃঃ ৩৮

মন্তব্য তালিকা - “লিপি, মধ্যযুগ, ইউরোপ ও ব্ল্যাকলেটারের কথা”

  1. অসাধারণ তথ‍্যপূর্ণ এবং সুখপাঠ‍্য একটি নিবন্ধ। এমন লেখা আরো চাই।

    1. অনেক ধন্যবাদ। আপনি লেখাটা পড়েছেন, এটাই সবচেয়ে বড় পাওনা। বাংলায় এই ধরণের চর্চা খুব একটা হয় না। তাই এই বিষয়ে লিখতে ইচ্ছে করলো।

  2. এমনিতেই বিষয়টির জন্য খুব আগ্রহের সঙ্গে পড়লাম। অভিভূত হলাম। লিপি, ব্ল্যাক লেটারের মত শক্ত বিষয় নিয়ে এত সুখপাঠ্য লেখা অভাবনীয়। লেখককে ধন্যবাদ ।

    1. আমি চেষ্টা করেছি দিদি। আপনাদের ভাল লাগলেই এই চেষ্টা সার্থক মনে করব।

  3. খুব ভালো একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করছেন। সেজন্য প্রথমেই অভিনন্দন জানাই। বাংলা ভাষায় এই বিষয়ে আর কোথায় আলোচনা হয়েছে জানা নেই। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় কিছু কৌতুহল উদ্রেক করেছে। সেজন্য দু একটি কথা নিবেদন করছি।

    লিপিকারদের অনুকরণ করে ছাপার বিপ্লবে উঠে এসেছে টাইপফেস। ছাপার বিষয়ে অভিজ্ঞ মুদ্রক এর কারিগর। টাইপফেস বাজারজাত করার প্রতিযোগিতা নিশ্চিত ছিল। সেই প্রতিযোগিতায় রাজনৈতিক শক্তির দম্ভশক্তিও কাজ করেছে বলে মনে হয়েছে। দুনিয়া যাকে গ্রহণ করেছে সেই জয়ী হয়েছে।

    দু ধরণের পাঠকের জন্য দু ধরণের টাইপফেস মন্তব্যটি ভাববার। ব‌ইয়ের দু ধরণের সংস্করণ পরিচিত বিষয়। কাগজ দূর্মূল্য হ‌ওয়ার জন্য ঠাসাঠাসি ছাপা খুবই সরল ভাবনা মনে হয়েছে। ক্যালিগ্রাফি বা ছাপায় অলংকরণের জন্য‌ও ব্ল্যাকলেটারের চল প্রয়োজনীয় বলে মনে হয়। কারণ ‘গুডবাই গুটেনবার্গ’-এর যুগেও ডিটিপি কাজে হরেক রকম টাইপফেস মজুত রাখতে হয়। আর কোনো কিছু লেখার আগে আমরা যেমন একসময় ‘ওঁ’ বা ‘গঙ্গা’ লেখায় অভ্যস্ত ছিলাম তেমনি অভিজাত পরম্পরার ঐতিহ্য বজায় রাখার কারণে ব্ল্যাকলেটার বা সমজাতীয় টাইপফেস ব্যবহার লিপির পূর্বপুরুষ লিপিকারদের‌ই স্মরণ করায় বলে মনে হয়েছে।

    খুব ভালো একটি বিষয়ে আলোকপাত করানোর জন্য আবারও ধন্যবাদ জানাই।

    1. অনেক ধন্যবাদ এত গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করার জন্য। আপনার উত্থিত প্রশ্নগুলির উত্তর দিতে আমাকে আরোও কিছুটা পড়তে হবে। আবারও ধন্যবাদ জানাই।

      1. এই বছর Daniel Bellingradt ও Anna Reynolds এর সম্পাদিত The Paper Trade in Early Modern Europe: Practices, Materials, Networks বইটা প্রকাশিত হয়েছে। এটা সংগ্রহ করে অবশ্যই আপনাকে জানাবো।

  4. খুব ভাল লাগল। আবার সমৃদ্ধ হলাম। বাংলা ভাষায় এ ধরনের বিশ্লেষণ আছে, জানতাম না।
    বন্ধুবর লেখক কে ধন্যবাদ জানাই এ ধরনের উপহার দেবার জন্য।

    1. অনেক ধন্যবাদ বন্ধু। এমন সাপোর্ট করলে আরও শিখতে, লিখতে ইচ্ছে করে।