সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

প্রাকৃত-অপভ্রংশ অবহট্ঠ ও সংস্কৃত ভাষায় জৈন সাহিত্যের বিবরণ

প্রাকৃত-অপভ্রংশ অবহট্ঠ ও সংস্কৃত ভাষায় জৈন সাহিত্যের বিবরণ

কৃশানু নস্কর

জানুয়ারি ২২, ২০২২ ৮৩১ 5

বৌদ্ধ ধর্মের মতোই ভারতভূমির এক প্রাচীন ধর্ম হলো জৈনধর্ম। এর আগে বুদ্ধদেব ও বৌদ্ধ সাহিত্য বিষয়ে যখন লিখেছিলাম সেসময়ই জৈন সাহিত্য বিষয়ে লেখার ইচ্ছা মনের মধ্যে ছিলই। বাঙলায় জৈন ধর্ম, দর্শন বা সাহিত্য বিষয়ে আলোচনা এমনিতেই অতি কম, তবে সম্প্রতি নবাঙ্কুর মজুমদার এবং ডঃ অভিজিৎ ভট্টাচার্য – এই দুই বিদগ্ধ বন্ধুর চর্চা দেখে উৎসাহিত হই।

জৈন ঐতিহ্য অনুযায়ী চব্বিশজন তীর্থংকর জৈন ধর্মের বিকাশ ঘটিয়েছেন। ঋষভদেব প্রথম তীর্থংকর, যিনি পুরুষদের ৭২টি এবং নারীদের ৬৪টি বিদ্যা শিখিয়েছিলেন জীবনধারণের জন্য। পরবর্তী তীর্থংকরেরা নিজেদের যুগের উপযোগী করে জৈন জীবনচর্যার প্রচার করেছিলেন। শেষ দুজন তীর্থংকর, পার্শ্ব ও মহাবীরের হাতে জৈন ধর্মের গুণগত পরিবর্তন হয়। ত্রয়োবিংশতিতম তীর্থঙ্কর’ পার্শ্বনাথ ঐতিহাসিক পুরুষরূপে স্বীকৃত হয়েছেন এবং চতুর্বিংশতিতম তথা সর্বশেষ তীর্থঙ্কর মহাবীর (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৫২৭ অব্দ) বুদ্ধদেবের প্রায় সমকালীন ছিলেন বলে জানা যায়। জৈন গ্রন্থসমূহে পার্শ্ব ও মহাবীরের পূর্ববর্তী তীর্থংকরদের সম্পর্কে বড় বেশি অতিরঞ্জিত কথাবার্তা আছে, যা থেকে অনেকেই ধারণা করেন যে তাঁদের অস্তিত্বের কল্পনা নিছকই জৈনদের মনগড়া। কিন্তু জৈন ঐতিহ্যকে এত সহজে অস্বীকার করা যায় না। তাঁদের পক্ষে ঐতিহাসিক ব্যক্তি হওয়া খুবই সম্ভব, বিশেষ করে গুরুপরম্পরার আদর্শ যখন এদেশে অজানা নয়। হতে পারে অনেক পরবর্তীকালের লেখকেরা ভক্তির প্রাবল্যে তাঁদের চরিত্রগুলিকে পৌরাণিক করে তুলেছেন, কিন্তু তাতেই তাঁদের অনস্তিত্ব প্রমাণিত হয় না। পার্শ্ব এবং মহাবীর কখনও দাবি করেননি যে তাঁরা কোন নতুন ধর্মের প্রতিষ্ঠা করেছেন।

মহাবীর বুদ্ধের বয়োজ্যেষ্ঠ সমসাময়িক ছিলেন। এঁর মাতৃভূমি উত্তর বিহার। বুদ্ধের মত মহাবীরেরও অন্যতম প্রধান কর্মভূমি ছিল দক্ষিণ বিহার। জৈনশাস্ত্রে বুদ্ধের এবং বৌদ্ধশাস্ত্রে মহাবীরের নাম আছে পরম্পর প্রতিদ্বন্দ্বী দুই ধর্ম ও সাধনার প্রধান গুরুরূপে। বৌদ্ধশাস্ত্রে মহাবীর নিগণ্ঠ নাতপুত্ত (অর্থাৎ-“নির্গ্রন্থজ্ঞাতপুত্র”) নামে উল্লিখিত। “জৈন” শব্দ “জিন” থেকে উৎপন্ন । জিন শব্দ “বুদ্ধ” শব্দের প্রায় সমার্থক। জিন=যিনি ইন্দ্রিয় জয় করিয়াছেন, বুদ্ধ= যিনি চরমজ্ঞান (“বোধি”) লাভ করিয়াছেন (এই দুইটি শব্দ থেকে দুইটি ধর্মের ঝোঁক কোথায় তা বোঝা যায়। জৈনধর্মে ঝোঁক তপস্যায়, বৌদ্ধধর্মে ঝোঁক জ্ঞানে)। বৌদ্ধশাস্ত্রে গৌতম যেমন শেষ বুদ্ধ জৈনশাস্ত্রে মহাবীর তেমনি শেষ জিন। তিনি এক রাজকুলজাত এবং মগধ রাজবংশের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলেন। এই মহাবীরই নির্গ্রন্থ সম্প্রদায়কে পুনর্গঠিত করেন এবং অহিংসা ও আত্মশুদ্ধির পথে পরিচালনা করেন। তিনিও বুদ্ধদেবের মতো ধর্মদেশনা ও শাস্ত্র ব্যবহারে সংস্কৃত ভাষাকে পরিহার করে লোকায়ত ভাষার শরণ গ্রহণ করেন। বুদ্ধদেবের প্রচারিত ধর্ম ও মতবাদ প্রচারের জন্য পালি ভাষা গ্রহণ করা হয়েছিল, পক্ষান্তরে জৈন ধর্ম প্রচারে ব্যবহৃত হয় অর্ধমাগধী প্রাকৃত।

প্রসঙ্গত উল্লেখ প্রয়োজন যে, প্রাকৃত সাহিত্য মূলত জৈন সম্প্রদায় কর্তৃক পরিপুষ্ট ও পরিবর্ধিত। জৈনেতর লোকেরা খুব অল্প গ্রন্থই প্রাকৃত ভাষায় লিপিবদ্ধ করেছেন। সেইজন্যই জৈনদের ধর্ম বা আগম গ্রন্থেই প্রাকৃত সাহিত্যের প্রথম-পরিচয় পাওয়া যায়। মহাবীর মুখ-নিঃসৃত বাণী তাঁহার শিষ্য ও গণধরগণ কর্তৃক লিপিবদ্ধ হওয়ার ফলে, এই জৈন আগম সাহিত্যের উৎপত্তি হয়েছে। জৈনরা তাঁদের এই আগম সাহিত্যকে ‘সিদ্ধান্ত’ নামেও অভিহিত করে থাকেন। এই আগম সাহিত্যের রচনাকাল সম্বন্ধে বহুবিধ মতভেদ থাকলেও, এর রচনা যে সাধারণাব্দ পঞ্চম শতকের মধ্যে সমাপ্ত হয়েছিল, সেই বিষয়ে সকলেই একমত।

জৈন আগম সাহিত্যের উৎপত্তি

শ্বেতাম্বর জৈনদের মতে শেষ তীর্থঙ্কর মহাবীরের নির্বাণ লাভের (৫২৭ সাঃ পূঃ অব্দে) প্রায় দুই শতাব্দী পরে মগধাধিপতি মৌর্য চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বকালে (৩১৮-১৭ সাঃ পূঃ অব্দে) মগধদেশে যখন দীর্ঘ দ্বাদশবর্ষব্যাপী দুর্ভিক্ষ হয়েছিল, তখন চতুর্দশ পূর্ববিদ স্থবির ভদ্রবাহুর অধিনায়কত্বে একদল জৈন সাধু দক্ষিণ ভারতের কর্ণাট প্রদেশে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। অপর একদল মগধ দেশেই চতুর্দশ পূর্ববিদ স্থুলভদ্রের অধিনায়কত্বে রয়ে গেলেন। দুর্ভিক্ষের শেষবর্ষে ভদ্রবাহুর অনুপস্থিতিতে স্থুলভদ্র পাটলিপুত্ৰ নগরে এক সভা আহ্বান করেন। সেই সভায় “চতুর্দশ পূর্ব” হতে একাদশ অঙ্গ গ্রন্থ ও দৃষ্টিবাদ রচিত হল। দ্বাদশবর্ষ অতীত হলে পর যখন ভদ্রবাহু দলসহ মগধে প্রত্যাবর্তন করলেন, তখন তিনি বস্ত্র পরিহিত মগধস্থিত দল এবং বিবস্ত্র কর্ণাটস্থিত দলের মধ্যে প্রভূত পার্থক্য প্রত্যক্ষ করলেন, এবং মগধস্থিত দলের মতবাদ ও আচার পদ্ধতি মহাবীর পন্থার প্রতিকূল বিবেচিত হওয়ায়, তা স্বীকার করতে অসম্মত হলেন, ফলে তাঁদের মধ্যে ভাঙন দেখা দেয়। আনুমানিক সাধারণাব্দ প্রথম শতকের দিকে এই ভাঙন সম্পূর্ণতা লাভ করে এবং জৈন সম্প্রদায় স্পষ্টতই দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যায় (ক) দিগম্বর সম্প্রদায় এবং (খ) শ্বেতাম্বর সম্প্রদায়-এ।

মহাবীরের নির্বাণ লাভের ৯৮০ (বা ৯৯৩) বৎসর গত হলে (সম্ভবত ৪৫৪ বা ৪৬৭ সাধারণাব্দ), যখন স্থুলভদ্র পরিকল্পিত শ্বেতাম্বর জৈনদের অঙ্গ গ্রন্থাদি বিস্মৃতির গর্ভে বিলীন হতে চলেছিল, তখন গুজরাটের বলতী নগরীতে দেবধিগণি ক্ষমাশ্রমণের নেতৃত্বে দ্বিতীয়বার সভা আহুত হল। দৃষ্টিবাদ ইতিপূর্বেই লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল, সুতরাং সেটি বাদে অপরাপর অঙ্গ গ্রন্থসমূহের পুনর্বার সংস্কার করা হল। সেই সংস্কৃত অঙ্গগ্রন্থাদিই বর্তমানকাল পর্যন্ত চলে আসছে।

শ্বেতাম্বর সম্প্রদায় ও জৈন সাহিত্য

প্রাগুক্ত বিবরণ থেকে বোঝা যায় যে যদিও মূলত উৎপত্তিস্থল এক, তবু শ্বেতাম্বর ও দিগম্বর আগম গ্রন্থসমূহের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য পরিলক্ষিত হবে। শ্বেতাম্বর জৈনদের মতে দ্বাদশ অঙ্গগ্রন্থ ‘দৃষ্টিবাদ’ লুপ্ত, আর দিগম্বরেরা বলেন, ‘দৃষ্টিবাদ’ তাদের দ্বারা রক্ষিত এবং এই দিগম্বর সম্প্রদায় কর্তৃক রক্ষিত গ্রন্থই বর্তমানে দিগম্বর জৈনাগম বলে বিখ্যাত। সে যাই হোক, শ্বেতাম্বর ও দিগম্বর গ্রন্থের সংমিশ্রণে জৈনদের আগমগ্রন্থ পরস্পরের পরিপূরক ও সম্পূরক হয়েছে। সুতরাং ‘দৃষ্টিবাদ’ বাদে শ্বেতাম্বর জৈনদের আগম গ্রন্থের বর্তমান সংখ্যা পঁয়তাল্লিশ এবং সমস্ত সংগৃহীত শাস্ত্রকে ছয় ভাগে বিভক্ত করা হয়:-

(ক) একাদশ অঙ্গগ্রন্থ

(১) আয়রঙ্গসুত্ত (আচারাঙ্গসূত্র), (২) সূয়গড়ঙ্গ (সূত্ৰকৃতাঙ্গ), (৩) ঠানাঙ্গ (স্থানাঙ্গ সূত্র), (৪) সমবায়ঙ্গ (সমবায়াঙ্গ সূত্র), (৫) ভগবতী বিয়াহ পগ্নত্তি (ব্যাখ্যা প্রজ্ঞপ্তি), (৬) নায়ধম্মকহাও (জ্ঞাতৃধর্মকথাঃ), (৭) উবাসগ-দশাও (উপাসক দশাঃ), (৮) অংতগড়-দসাও (অন্তঃকৃত্ দশাঃ), (৯) অণুত্তরো-ববাইয়-দসাও (অনুত্তরোপপাদিকদশাঃ), (১০) পণহবাগরণাই (প্রশ্নব্যাকরণনি), (১১) বিবাগসূয় (বিপাকশ্রুতঃ)। প্রথম গ্রন্থ ‘আয়রঙ্গ সুত্ত’ জৈনদের আদি ও শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ বিবেচিত হয়ে থাকে। এর প্রথম খণ্ডে জৈনদের আচার এবং দ্বিতীয় খণ্ডে মহাবীরের জীবনীই প্রধান বিষয়। নায়ধম্মকহাও গ্রন্থে কতকগুলি ধৰ্মমূলক এবং কিছু রূপক কাহিনি অবলম্বনে রচিত আখ্যায়িকা রয়েছে। উবাসগ-দসা’ গ্রন্থে মহাবীরের ধর্মে দীক্ষিত দশজন উপাসকের কাহিনি স্থান পেয়েছে। এই দুটি গ্রন্থের কাহিনিই এদের প্রধান আকর্ষণের বিষয়।

(খ) দ্বাদশ ‘উবঙ্গ’ (উপাঙ্গ)

(১) ঔপপাতিক দশাসুত্র, (২) রাজপ্রাশ্মীয়, (৩) জীবাভিগম, (৪) প্রজ্ঞাপনাসূত্র, (৫) সূর্যপ্রজ্ঞপ্তি, (৬) জম্বুদ্বীপ প্রজ্ঞপ্তি, (৭) চন্দ্র প্রজ্ঞপ্তি, (৮) নিয়মাবলী, (৯) কল্পাবতংসিকা, (১০) পুষ্পিকা, (১১) পুস্পিচুলিকা এবং (১২) বৃষ্ণিদশা। উপাঙ্গগুলি অনেকাংশে সংস্কৃত পুরাণের অনুরূপ। এতে যেমন জৈন সৃষ্টিতত্ত্ব বর্ণনার এবং জৈন দর্শনের নানাবিধ উপকরণের পরিচয় পাওয়া যায়, তেমনি আছে এতে বিবিধ ‘আখ্যায়িকা’ যাতে সুকৃতি ও দুষ্কৃতির ফল বর্ণিত হয়েছে। এ ছাড়া জ্যোতির্বিদ্যা, ভূবিদ্যা ইত্যাদি বিষয়ও কোনও কোনও উপাঙ্গে আলোচিত হয়েছে। উপাঙ্গগুলির মধ্যে প্রজ্ঞাপনার রচয়িতারূপে শ্যামাচার্যের নাম পাওয়া যায়।

(গ) দশ ‘পইগ্ন’ (প্ৰকীর্ণ) গ্রন্থ

(১) চতুঃশরণ, (২) আতুর-প্রত্যাখ্যান, (৩) ভূ-পরীক্ষা, (৪) সংস্কার, (৫) তন্দুলবৈতালিক, (৬) চন্দ্রবিদ্যা, (৭) দেবেন্দ্ৰস্তব, (৮) গণিতবিদ্যা, (৯) মহাপ্রত্যাখ্যান এবং (১০) বীরস্তব। বিচ্ছিন্নভাবে রচিত ছন্দোবদ্ধ বিভিন্ন শ্লোককে বিভিন্ন প্রকীর্ণে সঙ্কলন করা হয়েছে। বিষয়ের দিক থেকে এদের মধ্যে যথেষ্ট বৈচিত্র্য—এতে যেমন আছে সংঘের নিয়মাবলী তেমনই আছে খাদ্য-সম্বন্ধীয় বিচার। প্রথম প্রকীর্ণ ‘চতুঃশরণ’ (চউসরণ) কতকগুলি স্তবস্তুতির সঙ্কলন। এটি বীরভদ্র কর্তৃক রচিত হয়েছিল।

(ঘ) ষট ছেয়সুত্ত (ছয়টি ছেদসূত্র)

(১) নিশীথ, (২) মহানিশীথ, (৩) ব্যবহার, (৪) আচারদশা বা দশাতস্কন্ধ, (৫) কল্পসূত্র, (৬) পঞ্চকল্প বা জিতকল্প। এদের মধ্যে ‘কল্পসূত্র’ ভদ্রবাহু কর্তৃক রচিত এবং ‘জিতকল্প’ জিনভদ্র কর্তৃক রচিত। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা চলে যে, ধর্মপ্রাণ জৈনদের বিশ্বাস মতে তীর্থঙ্কর মহাবীর স্বয়ং যে ১৪টি ‘পুব্ব’ (পূর্ব) অর্থাৎ প্রাচীন গ্রন্থের সাহায্যে তাঁর শিষ্যদের মধ্যে ধর্মপ্রচার করেছিলেন কালক্রমে তা লুপ্ত হয়ে গেলে ভদ্রবাহু তার কিছুটা সংস্কার বা উদ্ধার সাধন করেছিলেন। মহাবীরের জীবনী-সম্বলিত ‘কল্পসূত্র’ (কপাপসুত্তং) এরূপ একটি রচনা। খ্রিস্টপূর্ব যুগেই এই সংস্কার সাধিত হয়েছিল। অতএব এটি সুপ্রাচীন রচনা। কল্পসূত্রের তিনটি অংশ— জিন-চরিত্র, স্থবিরাবলী এবং সামাচারী। জিন-চরিত্রে মহাবীর ছাড়াও পার্শ্বনাথ, অরিষ্টনেমি, ঋষভ প্রভৃতি জিনগণের জীবন কাহিনি বিবৃত হয়েছে। এর দ্বিতীয় অংশে পুরাণের বংশ-বর্ণনার মতো স্থবিরদের গোত্র-শাখাদির পরিচয় দান করা হয়েছে। তৃতীয় অংশে ‘পজুসন’ (পযুষণ) বর্ষাকালে যতিদিগের আচরণীয় বিধিসমূহ বিবৃত হয়েছে।

(ঙ) চার মূলসুত্ত (মূলসূত্র)

(১) উত্তরাধ্যয়নসূত্র (উত্তরজঝয়ণ), (২) আবশ্যক সূত্র (আবস্ময়), (৩) দশবৈকালিক সূত্র (দসবেয়ালিয়), বা ওঘনিষুক্তি এবং (৪) পাক্ষিকসূত্র বা পিণ্ডনিযুক্তি (পিণ্ডনিচ্ছুত্তি)। এই চারটি মূলসূত্রের মধ্যে ‘উত্তরাধ্যয়নের স্থান শুধুই সর্বোচ্চ নয়, এটি জৈনদের প্রাচীনতম শাস্ত্র গ্রন্থগুলিরও অন্যতম। বৌদ্ধ ‘সুত্তনিপাত’-এর মতোই জৈনদের মূল আদর্শ এতে বিবৃত হয়েছে। এতে নীতিবাক্যগুলি যেমন মনোজ্ঞ ভাষায় বর্ণিত হয়েছে, তেমনি মনোহারিত্ব লাভ করেছে এর বিভিন্ন কাহিনিগুলি; ‘দশবৈকালিক’ নামক মূলসূত্রটি স্বয়ম্ভব কর্তৃক রচিত।

(চ) স্বয়ংপুর্ণ গ্রন্থদ্বয়

(১) নন্দীসূত্র এবং (২) অনুযোগদ্বার (প্রণুত্তগদার)। এই দু’খানি গ্রন্থকে জৈন ধর্ম ও শাস্ত্রের কোষগ্রন্থরূপে অভিহিত করা যায়। এগুলিতে যেমন জিন, গণধর এবং স্থবিরদের কাহিনি আছে, তেমনি রয়েছে ‘মিথ্যাসূত্র’ অর্থাৎ রামায়ণ-মহাভারত ইত্যাদি কাহিনি। এ ছাড়া সমকালীন জ্ঞান-বিজ্ঞানের যাবতীয় বিষয়ই এতে আলোচিত হয়েছে; জৈনশাস্ত্র এবং ধর্ম সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য তো রয়েছেই। নন্দীসূত্র’ গ্রন্থটি দেবর্ষি কর্তৃক রচিত।

দিগম্বর সম্প্রদায় ও জৈন সাহিত্য 

দিগম্বর সম্প্রদায় উপরিউক্ত অঙ্গগ্রন্থের নাম স্বীকার করেন, কিন্তু ঐ নামে যে অঙ্গগ্রস্থ বিদ্যমান, তা স্বীকার করেন না। পরন্তু তারা দৃষ্টিবাদের অস্তিত্বে বিশ্বাস করেন। দিগম্বর জৈনগণ মনে করেন, মহাবীরের উপদেশসমূহ যে দ্বাদশ ‘অঙ্গে’ নিবদ্ধ হয়েছিল, সেগুলিই আদি এবং মূল জৈন ধর্মগ্রন্থ বা আগম তথা সিদ্ধান্ত। মহাবীরের মহাপরিনির্বাণের ১৬২ বৎসর পর্যন্ত, অষ্টম গণধর ভদ্রবাহুর কাল পর্যন্তই ঐ আগম বর্তমান ছিল। তারপর ক্রমশই তা লোপ পেতে থাকে। মহাবীরের নির্বাণের ৬৮৩ বৎসর পর গিরিনগরে ধরসেন তাঁর শিষ্যদ্বয় পুষ্পদন্ত এবং ভূতবলিকে ‘পূর্বৰ্গত’ বা পূর্ব আগমের যে অংশ শিক্ষাদান করেছিলেন, তা মূলের ভগ্নাংশ মাত্র। তারা  দ্বিতীয় সাধারণ শতকে এগুলিকেই সূত্রাকারে ‘ষটখণ্ডাগম’ নামে গ্রন্থবদ্ধ করেন। দিগম্বর জৈনদের নিকট এটিই তাদের প্রাচীনতম এবং সর্বশ্রেষ্ঠ প্রামাণিক ধর্মগ্রন্থ। এটি শৌরসেনী প্রাকৃত ভাষায় রচিত। মধ্যে মধ্যে অর্ধমাগধী ও মাগধী ভাষার প্রভাব দৃষ্ট হয়। রচনাকাল সম্ভবত সাধারণাব্দ দ্বিতীয় বা তৃতীয় শতকে। গ্রন্থখানি দর্শনবিষয়ক এবং কর্মপদ্ধতি দ্বারা প্রভাবান্বিত। এটি ছয় খণ্ডে বিভক্ত – (১) জীবস্থান, (২) ক্ষুল্লকবন্ধ, (৩) বন্ধস্বামিত্ববিষয়, (৪) বেদনা, (৫) বৰ্গনা ও (৬) মহাবন্ধ। পুষ্পদন্ত প্রথম ১১৭টি সূত্র রচনা করেন এবং তারপরে ভূতবলি অবশিষ্টাংশ রচনা করেন। এতে সর্বসাকুল্যে ৬০০০ সূত্র পাওয়া যায়। বীরসেন কর্তৃক বিরচিত ‘ধবল’ নামে এর একটি টীকা আছে। সেই জন্য গ্রন্থখানি ‘ধবলা’ নামেও বিখ্যাত।

প্রায় এরই সমকালে গুণধরাচার্য যে কষায়পাড় রচনা করেন, তা দ্বাদশ অঙ্গের দ্বাদশতম গ্রন্থ ‘দৃষ্টিবাদ’ অবলম্বনে রচিত। দিগম্বর সম্প্রদায়ের মতে, ‘দৃষ্টিবাদ’ পাঁচভাগে বিভক্ত: পরিকর্ম, সূত্র, প্রথমানুযোগ, পূর্বগত এবং চুর্ণিকা। এদের মধ্যে পূর্বগত ছাড়া বাকি চারটির বিষয় বিশেষ কিছু জানা যায় না। পূর্বগত আবার চৌদ্দটি উপবিভাগে বিভক্ত। যথা উৎপাদপর্ব, অগ্ৰায়ণীয়, বীর্যপ্ৰবাদ, অন্তি-নাস্তি-প্রবাদ, জ্ঞানপ্রবাদ, সত্যপ্রবাদ, আত্মপ্রবাদ, কর্মপ্রবাদ, প্রত্যাখান, বিদ্যানুবাদ, কল্যাণপ্রবাদ, প্রাণবায়, ত্রিয়াবিশাল এবং লোকবিন্দুসার। এই সমস্ত বিষয়ের বিবরণ গুণধরাচার্যের কষায়পাড় গ্রন্থ থেকে জানতে পারা যায়।

শ্ৰীযতিবৃষভাচার্য কর্তৃক বিরচিত প্রাকৃতভাষায় লিখিত ত্রিলোকপ্রজ্ঞপ্তি আর একটি প্রাচীন দিগম্বর জৈন গ্রন্থ। এতে ভূ-বিবরণ, বিশ্বনির্মাণ কৌশল বিষয়ক বহু তথ্যমূলক তত্ত্ব আছে। প্রসঙ্গক্রমে, এর মধ্যে জৈনদের পৌরাণিক কাহিনী কালনিরূপণ এবং বিভিন্ন মতবাদের পরিচয় পাওয়া যায়। জম্বুদ্বীপ, ধাতকীখণ্ডদ্বীপ, পুষ্করদ্বীপ প্রভৃতি বইদ্বীপের এবং সুসমা-দুসমা’ প্রভৃতি ছয় প্রকার ও ততোধিক জৈন কালচক্রের বিস্তৃত বিবরণ এর মধ্যে পাওয়া যায়। এক কথায়, জৈনশাস্ত্র ও তত্ত্ব উত্তমরূপে আয়ত্ত করতে হলে, গ্রন্থটি পাঠ করা আবশ্যক। গ্রন্থখানি মহাধিকার দ্বারা বিভক্ত এবং অতি প্রাচীন, কারণ ধবলা নামক টীকায় এর উল্লেখ আছে।

দিগম্বর জৈনদের আগমগ্রন্থ বিশাল। কিন্তু এখন পর্যন্ত খুব বেশী মুদ্রিত হয়নি, জৈন সম্প্রদায়ের বহু গ্রন্থই এখনও পর্যন্ত পাণ্ডুলিপি অবস্থায় পড়ে আছে, এদের সুসংস্কৃত মুদ্রণ না হলে জৈন সাহিত্যের ইতিহাস সম্পূর্ণ হবে না। তবে সুখের বিষয় অধুনা বহু পণ্ডিতদের দৃষ্টি এইদিকে পড়েছে। আশা করা যায় ভবিষ্যতে জৈন আগম সাহিত্যের একটি পূর্ণ বিবরণ আমরা জানতে পারবো।

জৈন আগম-বহির্ভূত বা আগমেতর সাহিত্য

জৈন সাহিত্যের মধ্যে নিঃসন্দেহে আগম সাহিত্য শ্রেষ্ঠ, কিন্তু আগম বা সিদ্ধান্তের বাইরেও জৈন ধর্মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু কিছু সাহিত্য রচিত হয়েছিল। জৈন সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত এই সাহিত্যকে ‘আগমেতর সাহিত্য’ বা ‘অঙ্গবাহ্য’ সাহিত্য নামে অভিহিত করা চলে। জৈন ধর্মের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট নয়, অথচ জৈনদের দ্বারা রচিত সাহিত্যের সংখ্যাও কম নয়। বরং বলা চলে, প্রাকৃত ভাষায় রচিত প্রায় সমগ্র সাহিত্যই জৈনদের রচিত। এই প্রসঙ্গে অপভ্রংশ ভাষায় রচিত সাহিত্যের কথাও উল্লেখ করা প্রয়োজন। প্রাকৃতের ক্রমবিবর্তিত পরবর্তী রূপ অপভ্রংশ প্রাকৃতের সঙ্গে এমন ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত হয়ে আছে যে, এদের পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করে জৈন সাহিত্য বিষয়ে আলোচনা করা কষ্টকর। কারণ, কোন কোন গ্রন্থে একই সঙ্গে প্রাকৃত এবং অপভ্রংশ দ্বিবিধ ভাষাই ব্যবহৃত হয়েছে। জৈনগণ প্রাকৃতের মতোই সহজ স্বাচ্ছন্দ্যে অপভ্রংশ ভাষায়ও সাহিত্য রচনা করে গেছেন। অতএব আলোচ্য অংশে প্রাকৃতের সঙ্গে অপভ্রংশ ভাষায় রচিত সাহিত্যের কথাও একই সঙ্গে উল্লেখ করা হবে।

জৈনগণ স্বীয় আগম গ্রন্থসমূহকে বোঝাবার জন্য সেই সেই গ্রন্থের ব্যাখ্যা লিখতে আরম্ভ করলেন। সেই ব্যাখ্যাগ্রন্থই পরবর্তীকালে এক সাহিত্যে পরিণত হল। সেই জাতীয় সাহিত্যের নাম ‘নিজ্জুত্তি’ (সং-নির্যুক্তি)। বেদের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে যেরূপ নিরুক্তের উৎপত্তি, সেইরূপ জৈনাগম সাহিতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে এই জাতীয় নির্যুক্তি গ্রন্থের উৎপত্তি। কেউ কেউ অনুমান করেন যে, আগম গ্রন্থের রচনাকালেই বা কিছু পরে এই নির্যুক্তি গ্রন্থের আবির্ভাব। কারণ, আগমগ্রন্থের মধ্যেই দেখা যায়, দুইটি নির্যুক্তি গ্রন্থের উৎপত্তি- পিণ্ডনির্যুক্তি এবং ওঘনির্যুক্তি। সাধারণপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে ভদ্রবাহুই সর্বপ্রথম নির্যুক্তি রচনা করেন বলে মনে করা হয়। পরবর্তীকালে এই নির্যুক্তি সাহিত্যের বিপুল বিস্তার লক্ষ্য করা যায়। শ্বেতাম্বরীয় আগম গ্রন্থের অন্তত দশটি নির্যুক্তির পরিচয় পাওয়া গেছে। এগুলি নিম্নরূপ-

(১) আচারাঙ্গসূত্রের, (২) সূত্ৰকৃতাঙ্গসূত্রের, (৩) সূর্যপ্রজ্ঞপ্তির, (৪) আবশ্যক সূত্রের, (৫) উবাধ্যযনের, (৬) দশাশ্রুতস্কন্ধের, (৭) কল্পসূত্রের, (৮) দশবৈতালিক সূত্রের, (৯) ব্যবহারসূত্রের, (১০) ঋষিবাসিষ্ঠসূত্রের নির্যুক্তি। 

নির্যুক্তি গ্রন্থসমূহ আর্যছন্দে জৈন মহারাষ্ট্র ভাষায় রচিত। আচার্যগণ এই জাতীয় নির্যুক্তি কণ্ঠস্থ করে রাখতেন। পরবর্তীকালে এই নির্যুক্তিই বৃহৎ আকার প্রাপ্ত হয়ে, চূর্ণি ও ভাষ্য গ্রন্থে পরিণত হয়ে, নতুন সাহিত্যের আকার ধারণ করেছে। আবার তা থেকে টীকা, বৃত্তি, অবচুর্ণী ইত্যাদির উৎপত্তি হয়েছে।

যেমন শ্বেতাম্বরদের নির্যুক্তি তেমনি দিগম্বরদের চূর্ণি। দিগম্বরেরা তাদের আগম গ্রন্থের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে এই চূর্ণির উৎপত্তি করলেন। কিন্তু উভয়ের মধ্যে মূলগত পার্থক্য আছে। নির্যুক্তি হল একটি কঠিন বা পারিভাষিক শব্দের ব্যাখ্যা, আর চূর্ণি হল শব্দের এবং সূত্রের – উভয়ের ব্যাখ্যা। নির্যুক্তি পদ্যাত্মক; আর চূর্ণি গদ্যাত্মক। চুৰ্ণিসূত্রকে অবলম্বন করেই পরবর্তীকালে ভাষ্য, টীকা প্রভৃতির উৎপত্তি হয়েছে। বর্তমানে নিম্নলিখিত চূর্ণি দেখা যায়- 

(১) গুণধর প্রণীত-কসায়পাহুড়চূর্ণি, (২) শিবশৰ্মার কম্মপয়ড়ীচূর্ণি (কর্মপ্রকৃতি চূর্ণি), (৩) শিবশর্মার শতকচূর্ণি (বা বন্ধশতকচুনি), (৪) সিত্তয়ীচূর্ণি (সপ্ততিকাচুর্নি)। এ ছাড়া, লঘুশতকচূৰ্ণি এবং বৃহচ্ছতকচূর্ণি প্রভৃতিও দেখা যায়। প্রসঙ্গত বলা আবশ্যক যে, শ্বেতাম্বর গ্রন্থেরও চূর্ণি দেখা যায়। যথা-নিশীথচূর্ণি, আবশ্যকচূর্ণি, দশবৈলিকচূর্ণি ইত্যাদি। এগুলি সংস্কৃত-মিশ্র প্রাকৃত ভাষায় রচিত। চূর্ণিগুলি জিনদাস গণি কর্তৃক রচিত বলে মনে করা হয়। শব্দসূত্র ছাড়াও এতে কিছু কিছু কৌতুহলোদ্দীপক ঐতিহাসিক কাহিনির উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন, ‘আবশ্যক চূর্ণিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে মহাবীরের সিদ্ধিলাভের তেরো বৎসর পর শ্রাবস্তীতে ভয়ানক বন্যা হয়েছিল, কিংবা নিশীথচুর্ণি থেকে জানা যায় যে, কালকাচার্য জনৈক বিদেশীকে উজ্জয়িনী আক্রমণ করতে আহ্বান জানিয়েছিলেন।

শেষ পর্যায়ের ব্যাখ্যামূলক রচনাগুলিকে টীকা নামে অভিহিত করা হয়। এগুলি সংস্কৃত ভাষায় রচিত হলেও প্রাকৃত কাহিনিগুলি যথাযথভাবে রক্ষিত হয়েছে। প্রধান টীকাকারদের মধ্যে আছেন— হরিভদ্র, শীলাঙ্ক, শান্তিসূরি নেমিচন্দ্র, দ্রোণাচার্য, মালাধরী, হেমচন্দ্র, মলয়গিরি এবং আরও অনেকেই।

আখ্যায়িকা কাব্য

আগমশাস্ত্র এবং তার নানা প্রকার ব্যাখ্যামূলক সাহিত্য রচনার বাইরেও জৈনগণ বিস্তর সাহিত্য রচনা করে গেছেন। তাদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিভিন্ন ‘আখ্যায়িকা কাব্য’। এই আখ্যায়িকা কাব্যগুলির মধ্য দিয়েও তারা প্রধানত জৈন ধর্মের মাহাত্ম্যই প্রচার করতে চেষ্টা করেছেন। বিষয়বস্তুরূপে তাঁরা বিশেষভাবে রামায়ণ, মহাভারত ও বিভিন্ন সাধুমহাপুরুষদের জীবন-কাহিনিকেই গ্রহণ করেছিলেন। ভাষা-ব্যবহারে তারা প্রাকৃত এবং অপভ্রংশ উভয়েরই সহায়তা গ্রহণ করেছেন। এ জাতীয় গ্রন্থগুলির মধ্যে প্রাচীনতম ‘পউম চরিঅম’ (পদ্মচরিতম)। গ্রন্থখানির রচয়িতা বিমলসূরির রচনাকাল সম্ভবত সাধারণাব্দ প্রথম শতাব্দী। রামায়ণের কাহিনিকেই জৈন ছাঁচে ঢেলে গ্রন্থকার এই জৈন রামায়ণখানি রচনা করেছেন। রামায়ণের বিভিন্ন চরিত্র এখানে নতুন অভিধায় পরিচিত হয়েছে। গ্রন্থের নায়ক এখানে রামচন্দ্রের পরিবর্তে ‘পউম’ (পদ্ম)। এই কাব্যধর্মী গ্রন্থখানি জৈন-মাহারাষ্ট্রী প্রাকৃতে রচিত।

সাধারণাব্দ সপ্তম বা অষ্টম শতাব্দীতে স্বয়ম্ভুদেব পউমচরিউ (পদ্মচরিত্র) নামে অপর একখানি গ্রন্থ রচনা করেন। গ্রন্থটির ভাষা অপভ্রংশ এবং এটিরও বিষয়বস্তু রামায়ণের অনুরূপ। এটিকে অপভ্রংশ ভাষায় রচিত ‘জৈন রামায়ণ’ বলে অভিহিত করা চলে। ‘হরিবংশ পুরাণ’ নামে অপভ্রংশ ভাষায় রচিত জৈন মহাভারতের রচনাকাল আনুমানিক সাধারণাব্দ দশম বা একাদশ শতক। গ্রন্থকারের নাম ধবলগিরি। তিনি মোটামুটিভাবে মহাভারতের কাহিনিই অনুসরণ করেন এবং এতে মহাভারতের নামগুলিও অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে জৈন ধর্মের মাহাত্ম্য কীর্তনই গ্রন্থকারের লক্ষ্য ছিল বলে গ্রন্থশেষে পাণ্ডবদের সন্ন্যাস গ্রহণ করানো হয়েছে। এই জৈন মহাভারতের পাত্রপাত্রীদের অনেকেই জৈন ধর্মাবলম্বী। জৈন মহাপুরুষ বা তীর্থঙ্করদের জীবন কাহিনি অবলম্বন করে প্রাকৃত ভাষায় যে জাতীয় গ্রন্থ রচিত হয়েছিল, দিগম্বর জৈনগণ তাদের পুরাণ এবং শ্বেতাম্বর জৈনগণ চরিতাবলী নামে উল্লেখ করে থাকেন। এই জাতীয় একটি গ্রন্থে তেষট্টিজন মহাপুরুষের জীবনী একসঙ্গে গ্রথিত হয়েছে— গ্রন্থটির নাম ‘তিসট্টি লকখণ মহাপুরাণ’ বা ‘তিসট্টিসলাকাপুরিসচরিত। এতে চব্বিশজন তীর্থঙ্কর, বারোজন চক্রবর্তী, নয়জন বাসুদেব, নয়জন বলদেব এবং নয়জন প্রতিবাসুদেবের জীবনী বিবৃত হয়েছে। সেই তেষট্টি জন মহাপুরুষদের নাম নিম্নে দেওয়া হল-

(ক) চব্বিশ তীর্থঙ্কর

(১) ঋষভ বা বৃষভ (২) অজিত (৩) শংভব বা সংভব (৪) অভিনন্দন (৫) সুমতি, (৬) পদ্মপ্রভ (৭) সুপার্শ্ব (৮) চন্দ্ৰপ্ৰভ (৯) পুষ্পদন্ত বা সুবিধি (১৩) শীতল (১১) শ্রেয়াংস (১১) বামপূজ্য (১৩) বিমল (১৪) অনন্ত (১৫) ধর্ম (১৬) শান্তি (১৭) কুম্ভ (১৮) অর (১৯) মল্পি (১০) সুব্রত(২১) নমি (২২) নেমি (২৩) পার্শ্ব (২৪) মহাবীর।

(খ) বারো চক্রবর্তী

১) ভরত (২) সগর (৩) মঘবন (৪) সনৎকুমার (৫) শান্তি (৬) কুস্থ (৭) অর (৮) সুভৌম বা সুহুম (৯) পদ্ম (১০) হরিষেণ (১১) জয়সেন বা জয় (১২) ব্রহ্মদ

(গ) নয় বাসুদেব

(১) ত্রিপৃষ্ঠ (২) দ্বিপৃষ্ঠ (৩) স্বয়ংভূ (৪) পুরুষোত্তম(৫) পুরুষসিংহ (৬) পুরুষপুণ্ডরীক (৭) দত্ত (৮) নারায়ণ (৯) কৃষ্ণ

(ঘ) নয় বলদেব

১) অচল ২) বিজয় (৩) ভদ্র (৪) সুপ্রভ (৫) সুদর্শন (৬) আনন্দ (৭) নন্দন (৮) পদ্ম (৯) রাম (বলরাম)।

(ঙ) ৯ প্রতি বাসুদেব

(১) অশ্বগ্রীব (২) তারক (৩) মেরক ৪) মধু (৫) নিশুম্ভ (৬) বলি (৭) প্রহলাদ (৮) রাবণ (৯) জরাসন্ধ বা মগধেশ্বর।

পুষ্পদন্তের মহাপুরাণ বা ‘তিসট্টি-মহাপুরিসগুণালঙ্কার’ একটি প্রাচীন দিগম্বর জৈন মহাপুরাণ। গ্রন্থখানি অপভ্রংশ ভাষায়, সাধারণাব্দ দশম শতকে রচিত। এই গ্রন্থে প্রাগুক্ত তেষট্টিজন মহাপুরুষদের জীবনচরিত বর্ণনা করা হয়েছে। এটি আদিপুরাণ ও উত্তরপুরাণ নামে দুই ভাগে বিভক্ত। আদিপুরাণে ৩৭টি এবং উত্তরপুরাণে ৬৫টি অধ্যায় আছে। এছাড়াও পৃথকভাবেও বিভিন্ন মহাপুরুষের জীবনী অবলম্বনে প্রাকৃত বা অপভ্রংশ ভাষায় অনেক পুরাণ রচিত হয়েছে। এই পুরাণগুলির রচনাকাল সাধারণাব্দ নবম শতাব্দী থেকে পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত বিস্তৃত।

জৈন কথাসাহিত্য

হিন্দুদের সংস্কৃত কথাসাহিত্যের ন্যায় জৈন কথাসাহিত্যও সমৃদ্ধ। জৈন কবিদের অনেকে প্রাকৃত ছাড়া সংস্কৃত ভাষায় নানা কথা-কাহিনী রচনা করেছেন। জৈন কথানক ও গল্প-সাহিত্যের অবদান সমগ্র জৈন সাহিত্যের মধ্যে বিশেষ মূল্যবান। জৈন কথাসাহিত্যের অধিকাংশ রচনাই ধর্মীয় নীতি-উপদেশ প্রচারের বাহন মাত্র; তবে পঞ্চতন্ত্রের তুল্য পশুপাখির গল্প ও রূপকথার কল্পকাহিনি, নারীজাতির চারিত্রিক স্খলনের কাহিনি এবং প্রচলিত সংস্কৃত গল্পের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রূপান্তর প্রভৃতিও আছে। সাহিত্যগুণের বিচারে অধিকাংশ গল্পই স্বল্পমূল্য, তবে কথানক বা ক্ষুদ্রাকার গল্প এবং আখ্যানজাতীয় বৃহদাকার রচনাগুলি সুখপাঠ্য।

প্রাকৃত-অপভ্রংশ অবহট্ঠ ভাষায় রচিত এই বিরাট জৈন সাহিত্যের উৎকর্ষ বিচার করতে গেলে দেখা যায় যে, অধিকাংশ রচনাই এত বেশি উদ্দেশ্যমূলক যে তাতে কাব্যগুণের আশা করাই বৃথা। ধর্মতত্ত্ব-প্রচারই ছিল এই জৈন মহাকাব্যগুলির (রামায়ণ-মহাভারত ইত্যাদির) মূল লক্ষ্য। এ বিষয়ে প্রাকৃত সাহিত্যে ব্যুৎপন্ন জনৈক অধ্যাপকের মন্তব্যটি স্মরণীয়। তিনি বলেন, “সব খাঁটি সাহিত্যেরই মূল উদ্দেশ্য পরোক্ষভাবে সমাজের কল্যাণসাধন, কাজেই ধর্মতত্ত্ব প্রচারের ফলেই এসব মহাকাব্যে উৎকর্ষের অভাব ঘটবার কথা নয়; কিন্তু কোনো সাহিত্যিক সজ্ঞানে যখন তত্ত্বকথা প্রচারের বা (আধুনিক কালের ভাষায়) প্রোপাগাণ্ডা করবার মতলব নিয়ে কিছু লেখেন তখন তাবৎ সাহিত্যর সস্ফুর্তির ব্যাঘাত ঘটে। জৈনদের প্রাকৃত মহাকাব্যগুলি প্রায়শ সাধু বা তীর্থঙ্কর জীবন অথবা প্রচলিত উপকথা ও পৌরাণিক কাহিনির। আধারে রচিত এবং জৈনতত্ত্বটি তার উপর বেশ স্পষ্টভাবে বিন্যস্ত।” তবে জৈন ধর্মগ্রন্থগুলির ভিন্নতর মূল্যবোধের ভিত্তিতে অধ্যাপক হীরালাল জৈন যা বলেন তাই বোধকরি এ বিষয়ে অধিকতর যুক্তিযুক্ত, “In the task of realising human destiny, Jaina literature, with its lessons of nobility and the virtue of tolerance, and with its message of non-violence, love for humanity, and supremacy of the spiritual over the material gain, has much to offer to mankind.”

তথ্যসূত্র:

১. বিমলচন্দ্র ভট্টাচার্য্য, সংস্কৃত সাহিত‍্যের রূপরেখা, জ্ঞানোদয় প্রেস, ১ম সংস্করণ ১৯৫৮.

২. মণীন্দ্রনাথ সমাজদার, সংস্কৃত-প্রাকৃত-অবহট্ঠ সাহিত‍্যের ইতিবৃত্ত, বাংলা অ‍্যাকাডেমী, ঢাকা, ১ম সংস্করণ ১৯২০.

৩. সংস্কৃত সাহিত্যের ইতিহাস – ধীরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, ২য় সংস্করণ, ৫ম মুদ্রণ, ২০১২.

৪. A history of Indian literature vol-2 – Maurice Winternitz; MLBD publishers pvt Ltd, 5th reprint 2018.

৫. Studies in Jain Literature (The collected papers Contributed by Prof. V. M. Kulkarni) – Published by Shresthi Kasturbhai Lalbhai Smarak Nidhi

মন্তব্য তালিকা - “প্রাকৃত-অপভ্রংশ অবহট্ঠ ও সংস্কৃত ভাষায় জৈন সাহিত্যের বিবরণ”

  1. জৈন ধর্ম এবং জৈন ধর্মের গ্রন্থ সম্পর্কে অনেক অজানা তথ্য সম্পর্কে অবগত হলাম। সমৃদ্ধ হলাম, আগামী দিনে এ নিয়ে আরও পড়াশোনার আগ্রহ থাকলো। লেখককে ধন্যবাদ জানাই।

    1. হ‍্যাঁ স্থবির জৈন সাধু।
      জৈন ধর্মে তন্ত্র সাধনা হয় না। মানে তন্ত্রের সঙ্গে জৈন দের যোগাযোগ নেই যেমনটি বৌদ্ধদের ছিল।

  2. সমগ্র জৈন সাহিত্য বিশ্লেষণ সহ এক ছাতার তলায় এনে অশেষ উপকার করলেন। এতে আমার মত জৈন ধর্ম সম্বন্ধে আগ্রহীদের কাছে সামগ্রিক চিত্রটি পরিষ্কার হবে। বিষয় নির্বাচন অভিনব, সেই সাথে সুখপাঠ্যও বটে। খুব ভাল লাগল।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।