সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

উল্কি, অলংকার, রীতি: কিছু তত্ত্বতালাশ

উল্কি, অলংকার, রীতি: কিছু তত্ত্বতালাশ

অর্থিতা মণ্ডল

ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২৬ ১৮১ 19

কথামুখ

প্রত্যেকেই নিজেকে সুন্দর দেখতে চায়। বলা ভালো দেখাতে চায়। অলংকার এবং পোশাক হচ্ছে নিজেকে সাজিয়ে তোলার মূল উপাদান। এরই সঙ্গে আধুনিক স্টাইলে ট্যাটুর গুরুত্ব বেশ বেড়েছে।

এই যে সাজসজ্জা, তা কি শুধুই নিজেকে সুন্দর দেখানোর জন্যে সৃষ্টি হয়েছিল? মানুষের সুন্দরের প্রতি সহজাত তীব্র আকর্ষণই কি এর কারণ? একটু খেয়াল করলে দেখি অঞ্চল ভেদে, অবস্থান এবং জাতিগত তারতম্যে সাজসজ্জার তারতম্য ঘটে। তবে ফ্যাশন বা কায়দা ব্যাপারটা নির্ভর করে ব্যক্তি মানুষের রুচির উপরে। আবার ব্যক্তিগত সাজসজ্জার বাইরে দাঁড়িয়ে দেখতে পাই, প্রথা-সংস্কার আর কিছু রীতিনীতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে থাকে পোশাক, সাজসজ্জা এবং উল্কি বা ট্যাটু। আর এই ব্যাপারটার সঙ্গে একাত্ম হয়ে আছে অঞ্চল, অবস্থান, জাতি বা আরও একটু বিশদভাবে বললে গোষ্ঠী।

এবারে আমরা ফিরতে পারি সুদূর অতীতে। আর তখন বোঝা যায় নিজেকে সুন্দর দেখানোর জন্যে অলংকার, সাজসজ্জা কিংবা উল্কি আঁকার উদ্ভব হয়নি। এইসব উদ্ভবের পেছনে কাজ করেছিল জাদু-বিশ্বাস। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে লড়াই করে টিকে থাকার জন্যে জাদু-বিশ্বাসের শরণাপন্ন হয়েছিলেন আদি মানুষ। আর তাই ৫,২০০ বছরের পুরানো মানুষের গায়ে পাওয়া গেছে উল্কি। জাদু-বিশ্বাসের মধ্যে আবার কখনো কাজ করেছে সুস্থ থাকার প্রচেষ্টা। এই প্রসঙ্গে, The Origins of Tattooing: A Brief Overview নিবন্ধটিতে চোখ রাখতে পারি,

‘The oldest known evidence of tattooing to date is exemplified on Ötzi, the 5,200-year-old ‘ice man’ who was found preserved in an ice cap near the border of Italy and Switzerland. His tattoos were small, seemingly random marks above joints and other sites of skeletal tension. This contributes to the idea that tattooing was meant to be therapeutic or medicinal rather than decorative.

আজ পর্যন্ত উল্কি আঁকার সবচেয়ে প্রাচীন প্রমাণ পাওয়া যায় ৫,২০০ বছরের পুরানো ‘বরফমানব’ ওৎজির ক্ষেত্রে, যাকে ইতালি এবং সুইজারল্যান্ডের সীমান্তের কাছে একটি বরফের টুকরোতে সংরক্ষিত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। তার উল্কিগুলি ছোটো ছিল৷ জয়েন্ট এবং কঙ্কালের অন্যান্য স্থানের উপরে, আপাতদৃষ্টিতে, এলোমেলো চিহ্ন ছিল। এটি এই ধারণাকে প্রমাণ করে, উল্কি আঁকার উদ্দেশ্য ছিল সাজসজ্জার চেয়ে থেরাপিউটিক বা ঔষধি।       

সুস্থ থাকার জন্যে, সাদা-জাদু-র (White Magic) প্রভাবমূলক একটি প্রথা দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত বাংলায় উল্কির সঙ্গে সংযুক্ত, এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনায় যাওয়ার আগে আরও কয়েকটি দিক দেখে নেওয়া যাক।

কার্যকারণ না জানার কারণে আদিম মানুষ সবকিছুর পেছনে অদৃশ্য শক্তির উপস্থিতি আছে মনে করত। অদৃশ্যশক্তি তাদের ভাবনায় কখনো শুভ বা কখনো অশুভ হিসেবে কাজ করেছিল। এই ভাবনা থেকে সাদা-জাদু (White Magic) এবং কালো-জাদু (Black Magic)র ধারণা গড়ে উঠেছিল। সাদা-জাদুর কাজ শুভ বা ভালো কিছু ঘটানো। অপরদিকে কালো-জাদুর প্রভাব ক্ষতিকারক। আবার এই জাদু বিশ্বাসের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে উল্কিপ্রথা। আসলে ক্ষতিকারক শক্তির হাত থেকে বাঁচার জন্যে শরীরে উল্কি আঁকত আদি মানুষ। এরই সঙ্গে মিশে আছে নারীর বয়ঃসন্ধির রহস্যময়তা। এদিকে এইসব জাদুবিশ্বাসের মধ্যে রয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাসের আদিতম শিকড়। এক্ষেত্রে বলতে পারি,

‘There is, on account of the disputed connection between magic and religion, a preliminary difficulty in dividing evidence relating to body marking as a religious exercise from that pertaining to magical practices. But for practical purposes instances of body marking deemed to be of religious import are those connected with idea of a superhuman being, survival after death, prayer, sacrifice, and communion.

জাদু এবং ধর্মের সংযোগের মধ্যে বিতর্ক থাকলেও ধর্মীয় অনুশীলন হিসেবে দেহ-চিহ্নের প্রমাণ এবং জাদুবিদ্যার অনুশীলনের প্রমাণকে আলাদা করার ক্ষেত্রে অসুবিধা রয়েছে। ব্যবহারিক উদ্দেশ্যে, দেহ-চিহ্নের ধর্মীয় গুরুত্ব বিবেচনা করা যায়—এমন উদাহরণগুলি হল অতিমানবীয় সত্তার ধারণা, মৃত্যুর পরে বেঁচে থাকা, প্রার্থনা, ত্যাগ এবং মিলনের সঙ্গে সম্পর্কিত।

আবার উৎপাদনশক্তি বা Fertilityর সঙ্গে উল্কি করার সম্পর্ক রয়েছে। আমরা জানি, নারীর বয়ঃসন্ধি তথা পাদনশক্তিসঙ্গে রয়েছে রক্তের সম্পর্ক। বয়ঃসন্ধির ঋতুস্রাব নারীকে পূর্ণ করে তোলে। এই প্রাকৃতিক নিয়মের মাধ্যমে নারীশরীর সন্তান উৎপাদনের উপযুক্ত হয়। আসলে আদিমানুষ তার অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছিল রক্ত বা লাল রঙের সঙ্গে মিশে আছে সন্তান উৎপত্তির প্রাথমিক অবস্থান। ঠিক সেকারণে অশুভ শক্তির হাত থেকে বাঁচার জন্যেই বয়ঃসন্ধির সময় উল্কি করা হত। এটাও একধরনের জাদু বিশ্বাস। উল্কির মাধ্যমে অর্থাৎ সাময়িক আঘাতের মধ্যে দিয়ে অশুভ শক্তিকে বাধাদান এর অন্যতম কারণ বলা যায়। খুব সন্তর্পণে লক্ষ্য করলে বোঝা যায়, আঘাত-রক্ত একাকার হয়ে মিশে গিয়েছিল যৌথ-অবচেতনায়।

রক্তের সুরক্ষার জন্যে কি রক্তদান? এদিক থেকে ভাবলে বুঝতে পারি বলিপ্রথার উৎপত্তির পেছনেও এই একই বিশ্বাস কার্যকরী ছিল। রক্ত উৎসর্গ করে অতিপ্রাকৃত শক্তিকে তুষ্ট করা এক ধরনের আদিমপ্রথা। এখানেও সেই উৎপাদনশক্তি বা উর্বরতাশক্তির ভাবনাই ছিল যৌথ-অবচেতনায়। স্বভাবতই টিকে থাকার লড়াই, সন্তান উৎপাদন—এইসব কিছুর সঙ্গে উল্কির একাত্মতা, এমনকি অলংকারও সংলগ্ন রয়েছে শুভ-অশুভ (সাদা ও কালো) জাদু-বিশ্বাসের ভেতরে।

আরও এক ভাবনা এখানে কাজ করেছে। সেই ভাবনার কথা প্রথম শুনেছিলাম এক কুড়মি মহিলার কাছে। তাঁর হাতের উল্কি সম্পর্কে জিগ্যেস করায় তিনি জানিয়েছিলেন, মৃত্যুর পরে কোনোকিছু সঙ্গে যাবে না কিন্তু এই ‘খোদাই’টা সঙ্গে যাবে। দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত বাংলায় উল্কিকে ‘খোদাই’ বলা হয়। এই ব্যাপারটা আদিজনমানসে কীভাবে ছিল Wilfrid Dyson Hambly-র লেখা থেকে দেখা যাক,

‘So, exact a replica of the earthly body is this counterpart that any tattoo or other marks assumed during the lifetime of the individual will identify the celestial body. Tattoo marks will serve as a rite de passage from this world to the next.’

সুতরাং, পার্থিব দেহের হুবহু প্রতিরূপ হল ব্যক্তির জীবদ্দশায় ধারণ করা যেকোনো ট্যাটু বা অন্যান্য চিহ্ন যা স্বর্গীয় দেহকে চিহ্নিত করবে। ট্যাটু চিহ্নগুলি এই পৃথিবী থেকে পরলোকে যাওয়ার একটি আচার হিসেবে কাজ করবে।

আদি মানুষদের মৃত্যু সম্পর্কে ধারণা থাকা সম্ভবপর ছিল না, অথচ এই অজানা বিষয় সম্বন্ধে ভয় ছিল। মৃত্যুকে একসময় তারা বৃহৎ ঘুম হিসেবেও ভাবত। স্বভাবতই তাদের মধ্যে অন্য জগতের ধারণা গড়ে উঠেছিল। মৃত্যুর পরের সেই অজানা জগতে যাতে কোনো রকম অসুবিধে না হয় তার জন্যে বিভিন্ন রকমের ব্যবস্থা নিত। মনে রাখতে হবে, এই সমস্ত ব্যবস্থাই ছিল প্রতীকী। তাদের মধ্যে গড়ে ওঠা জাদুবিশ্বাস, পারিপার্শ্বিক প্রাকৃতিক অবস্থানের প্রেক্ষিতে গড়ে ওঠা প্রতীকী ভাবনার উপর নির্ভরশীল ছিল।

একদিকে ক্ষতিকারক শত্রু বা ক্ষতিকারক আত্মার হাত থেকে বাঁচার তাগিদ যেমন ছিল, তেমনই সুরক্ষাবলয় তৈরির পদ্ধতিও ছিল। এক্ষেত্রে টোটেমের কথা বলতে পারি। টোটেম অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তার উল্কি শরীরে ধারণ করার মধ্যে প্রতীকী জাদুভাবনা কার্যকরী ছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল, টোটেমের চিত্র (উল্কি) শরীরে থাকলে সৃষ্টিকর্তা নিজেও সেই শরীরে অবস্থান করে। ফলে সেই ব্যক্তির কোনো বিপদ ঘটবে না। এও এক প্রতীকী বিশ্বাস ছাড়া আর কী! 

পরবর্তীতে এই ভাবনাই ক্রমবিবর্তনের হাত ধরে ধর্মীয় অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছিল। শুধু তাই নয়, ভারতীয় জাতপাত-ছোঁয়াছুঁয়ির সমাজ-ব্যবস্থায় উঁচুজাত-নীচুজাতের পার্থ্যক্যেও এই দেহচিত্র একসময়ে ভূমিকা নিয়েছিল। ব্রাহ্মণদের কপাল, গাল ও বুকে আঁকা বিন্দু, লম্বাকার রেখা, বৃত্ত ইত্যাদি তাঁদের পেশা, আভিজাত্য, উচ্চস্থানকে নির্দেশ করত। শিবভক্তরা শিবের প্রতীকী চিহ্ন দেহে এঁকে নিজেদের শিবের আশীর্বাদধন্য মনে করত। তা তাদের ধর্মের পরিচয়ও বহন করত বৈকি। অপরদিকে বৈষ্ণবরা কপালে যে তিলক আঁকে তা বিষ্ণুর প্রতীক।

পড়াশিয়া গ্রামে কিছু অভিজ্ঞতা

শিবের প্রতীকী চিহ্নের উল্কি দেখলাম পড়াশিয়া গ্রামে। সাঁওতাল নারীটি জানালেন, তিনি শিবের ভক্ত, তাই শিবচিহ্ন ‘খোদাই’ করেছেন। এখানে প্রচ্ছন্ন আছে একটি ভাবনা, শিবের প্রতীকী চিহ্নের উপস্থিতির কারণে শিবই রক্ষাকর্তা হিসেবে অবস্থান করছেন তাঁর দেহে! এই পরিবারের টোটেম সুপারি। নিজস্ব পুজো-ধর্মীয় উপাচারের বাইরে শিব আরাধ্য দেবতা হয়ে উঠেছেন। দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত বাংলায় অস্ট্রো-এশিয়াটিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভিন্নরূপেই শিবের উপস্থিতি দেখা যায়।

এদিকে একসময় সাঁওতাল নারীদের উল্কিপ্রথা বাধ্যতামূলক থাকলেও, ‘খোদাই’ করা আজ আর বাধ্যতামূলক নয়। ধীরেন্দ্রনাথ বাস্কের লেখা থেকে জানতে পারি,

‘সাঁওতাল সমাজে উল্কির প্রচলন আছে। পূর্বে সাঁওতাল সমাজে কোনো মেয়েকে উল্কিবিহীন অবস্থায় বিয়ের পর তার শ্বশুর-শাশুড়ী পুত্রবধূ বলে গ্রহণ পর্যন্ত করত না। আজকাল অবশ্য এ ধরণের গোঁড়ামি আর নেই।’

এই একই কথার প্রতিধ্বনি শুনলাম, পড়াশিয়া (গোপীবল্লভপুর এক নম্বর ব্লক) গ্রামের শিবসত্য হেমব্রমের গলায়। বর্তমানে নিয়ম মেনে ‘খোদাই’ করেন না গোপীবল্লভপুর এক এবং দুই নম্বর ব্লকের মুণ্ডা, সাঁওতাল, লোধা, ভূমিজ মানুষেরা। সময়ের পরিবর্তনে আজ এঁদের কাছে উল্কিপ্রথা প্রতীকী জাদুবিশ্বাসের বাইরে স্থানবিশেষে শুধুমাত্র সাজসজ্জার অঙ্গ হয়ে উঠেছে।

তবে প্রাকৃতিক অনুষঙ্গের অলংকারের ব্যবহার আজও জাদুবিশ্বাসের প্রতীকী অবস্থানকে তুলে ধরছে। ফুলের সাজ এর উদাহরণ। ফুল এখানে প্রেম-ভালোবাসা ও উৎপাদনশক্তির প্রতীক। এই প্রসঙ্গে উঠে আসে লোহার বালার কথা। যাকে সাঁওতালরা ‘মেড়হেঞক সাকম’ বা ‘মেঢ়েদ সাকম’ বলেন। তাছাড়া লোহার বালা এই অঞ্চল জুড়ে ‘নহাখাড়ু’ নামে পরিচিত। বাঙালি বিয়েতে বাঙালি হিন্দুদের কাছে নহা বা তপাদন (লোহার বালা) গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর আদি অবস্থান দেখতে পাই এইসব অস্ট্রো-এশিয়াটিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে।

ভূমিজ জনজাতির বিনতা সিং বলেন, ‘নহাখাড়ু’ বিবাহিত মহিলার অধিকার প্রতিষ্ঠা করার চিহ্ন। স্বামীর বাড়ির সম্পত্তির উপর অধিকার এই ‘নহাখাড়ু’ গ্রহণের মাধ্যমে হয়। কোনো স্ত্রী তার স্বামীর কাছ থেকে বিবাহ বিচ্ছেদ চাইলে ‘মেঢ়েদ সাকম’ বা ‘নহাখাড়ু’ হাত থেকে খুলে ফেলে এবং স্বামীকে ফিরিয়ে দেয়। একই ব্যাপার ঘটে যদি স্বামী তার স্ত্রীর কাছে বিচ্ছেদ চায়। স্ত্রী তার হাতের নহাখাড়ু খুলে স্বামীকে ফিরিয়ে দিলে তবে বিচ্ছেদ ঘটে।

এই গুরুত্বপূর্ণ অলঙ্কারটি কি শুধুই স্বামীর মঙ্গলের জন্যে! আমার মনে হয় তা নয়, রয়েছে গূঢ় কারণ। আমরা জানি, নারীর সন্তান উৎপাদনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিবাহের আচার। আবার অস্ট্রো-এশিয়াটিক জনগোষ্ঠী যখন থেকে শিকারের সঙ্গে কৃষিকে আপন করে নিয়েছিল, তখন থেকেই তাদের পুজো-পার্বন আচারের সঙ্গে একাত্ম হয়েছে শস্য উৎপাদনের প্রতীকী ব্যঞ্জনা। স্বভাবতই বিবাহ-সন্তান উৎপাদন ও শস্য উৎপাদন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। লোহা দিয়ে একসময় তৈরি হয়েছে লাঙলের ফলা। লোহা তার প্রয়োজনীয় গুরুত্ব নিয়ে শস্য উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে মিশে গেছে। আদিতম ভাবনায় বিবাহিতা স্ত্রী একদিকে যেমন সন্তান উৎপাদনের মাধ্যমে স্বামীর গৃহকে পূর্ণ করে তোলে অপরদিকে উৎপাদনশীলতার মাধ্যমে শস্যের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়। তাই ‘নহাখাড়ু’ স্বামীর গৃহের সন্তান ও শস্যের পরিপূর্ণতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। একইভাবে বলা যায় বিবাহের আরও এক অনুষঙ্গ পলা অর্থাৎ রক্ত প্রবালের বালা তার লাল রঙ নিয়ে মিশে আছে উৎপাদনের সঙ্গে।

শুধু বিবাহের নির্দিষ্ট কিছু অলংকার নয়, বিভিন্ন অলংকারের সঙ্গেই মিশে আছে এইসব প্রতীকী ব্যঞ্জনা।

মুণ্ডা, সাঁওতাল, লোধা-শবর, ভূমিজ সম্প্রদায়ের মানুষেরা তাঁদের অলংকারের ক্ষেত্রে ফুল, লতাপাতা যেমন ব্যবহার করেন, তেমনই তৈরি করা অলংকারেও প্রকৃতি উঠে এসেছে ‘মোটিফ’ হিসেবে। সাঁওতাল নারীদের একসময়ের ব্যবহৃত ‘হাসা সাকম’ নামের পোড়ামাটির বালার গায়ে ফুল, লতাপাতার নকশা করা থাকত বলে মনে করা হয়। সাঁওতালি হাসা শব্দের অর্থ মাটি বা কাদা হলেও সাকম শব্দের অর্থ লতাপাতা। টোটেম বা উল্কির মতোই অলংকারের গায়েও গোত্র পরিচয় অর্থাৎ টোটেম চিহ্ন থাকত।

এবার আসি ‘তুকুই লুতুর’ বা কানফোঁড়া অনুষ্ঠানের কথায়। আগেই বলেছি, সুস্থ থাকার জন্য, সাদা-জাদুর প্রভাবমূলক একটি প্রথা দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত বাংলায় দেখতে পাই। ‘তুকুই লুতুর’ বা ‘কানফোঁড়া’ হচ্ছে উল্কির সঙ্গে সংযুক্ত। উল্কি পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে শরীরকে আঘাত দেওয়া। এক্ষেত্রে কিছু ফুঁড়িয়ে প্রতীকী চিহ্ন আঁকা হয়। কালো-জাদুর হাত থেকে মুক্তি পাওয়া হচ্ছে এর একটি উদ্দেশ্য।

আদি মানুষেরা কোনো অসুস্থতার কারণ হিসেবেও কালো-জাদু অর্থাৎ অলৌকিক শক্তিকে দায়ী করত। দুষ্ট আত্মার কারণে এরকম ঘটেছে বলে তারা মনে করত।

কথা হচ্ছিল সুস্মিতা সিং–এর সঙ্গে। এই অনুষ্ঠান সম্পর্কে বলতে গিয়ে আকুপাংচারের কথা উঠে আসে। সুস্মিতা বলেন, কানে যেহেতু প্রচুর শিরা-উপশিরা আছে, তাই কানফোঁড়ার মাধ্যমে বিভিন্ন রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

এবার দেখা যাক কীভাবে হয় এই ‘কানফোঁড়া’। এই জনগোষ্ঠীর কাছে ১ মাঘ (তাঁদের পুষবাসী) হচ্ছে বিশেষ দিন। কৃষিকে কেন্দ্র করে তাঁরা উৎসবে মাতেন। ওইদিন নতুন বছর শুরু হয়। যে কোনো পবিত্র রীতিই জড়িয়ে থাকে ওইদিনে। ‘কানফোঁড়া’ অনুষ্ঠানটি এই বিশেষ দিনেই হয়।

ধীরেন্দ্রনাথ বাস্কে এই প্রসঙ্গে কী লিখেছেন দেখে নেওয়া যাক,

‘মুণ্ডা শিশুর তিন-চার বছর বয়স হলে কান ফোঁড়া হয় এবং সাখীনই সমস্ত কিছু খরচ বহন করে। এ অনুষ্ঠানে চালের গুঁড়ো দিয়ে আলপনা দেওয়া হয় এবং তার উপর দেবতার নামে মুরগি উৎসর্গ করা হয়। মুণ্ডাদের বিশ্বাস, ছেলেমেয়ের কান ফোঁড়া না হলে মৃত্যুর পর আত্মা পূর্বপুরুষদের সঙ্গে মিলিত হতে পারে না।’

এই অনুষ্ঠানের সঙ্গেও মিশে আছে মৃত্যুপরবর্তী পূর্বপুরুষদের সঙ্গে মিলিত হয়ে সুরক্ষা লাভের ইচ্ছে। উল্কি মৃত্যুর পরে সঙ্গে যায়, এই ভাবনার সঙ্গে ‘কানফোঁড়া’র ব্যাপারটা মিশে গেছে।

সুস্মিতা সিং-এর কাছ থেকে এই প্রসঙ্গে জানলাম, শিশুর বয়স তিন হতে হবে এমন নয়। এখানে একটা মজার ব্যাপার আছে। একই পরিবারে যদি দুটি শিশু থাকে যাদের দুজনেরই ‘কান ফোঁড়া’নো হয়নি, একজন যদি একটা ‘মকর’ দেখে থাকে আর অপরজন দুটো, তবে দুই আর একে তিন হয় বলে দুজনের একসঙ্গে কান ফোড়ানো হবে। সংক্রান্তি (সাঁকরাত) শিশুটির জীবনে তিনবার আসবে বা দুটি শিশু মিলিয়ে তিনবার আসবে। এই সংখ্যা পাঁচও হতে পারে—বিজোড় সংখ্যা হতে হবে।

ওইদিন সকালে ঘরের উঠোনকে গোবর জলে মোছা হয় (গোবর নাতা)। চালের গুঁড়ির আলপনা দিয়ে আলপনার উপর ‘গরাম’ ও ‘ধরম’ দেবতার উদ্দেশ্যে সিঁদুরের টিকা দিয়ে এরই উপরে এক ঝুড়ি ধান ঢেলে দেওয়া হয়। কাঠের পিঁড়ি চালের গুঁড়ি মাখিয়ে ধানের উপরে পাতা হয়। এবার শিশুকে নতুন পোশাক পরিয়ে পিঁড়িতে বসানো হয়। এই উপলক্ষ্যে শালপাতায় মুড়ে পিঠে তৈরি করা হয়। এবার শিশুটির দুটো কানে ‘কানাসি ধরে’ ‘কান ফুড়া’ করা হয়। এইসময় সাকিং (সাখীন)-এর দেওয়া মুরগিটিকে আছাড় দিয়ে মেরে মুরগির পা দুটো ধরে শিশুটির চারদিকে তিনবার ঘুরিয়ে ঘরের ভেতর নিয়ে যাওয়া হয়। শালপাতায় করা পিঠে কুলোতে করে ঘরের ‘দুয়ার’ বা ‘দোর’ থেকে উঠোনের পবিত্র স্থানটিতে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ‘কুটুম বন্ধু’ অর্থাৎ উপস্থিত সবাই শিশুটিকে উপহার দেয়।

গ্রামের মেয়েরা ঝুড়িতে করে ধান ও শিশিতে তেল নিয়ে আসেন। উঠোনে ‘কানফোঁড়া’ যেখানে হয়েছিল সেখানে বিছিয়ে রাখা ধানের উপর ঝুড়ির ধানগুলো ঢেলে দেওয়া হয়। সকালে এই অনুষ্ঠান হয়ে যাওয়ার পরে, সন্ধে পর্যন্ত ধান উঠনেই থাকে। সন্ধের পরে সমস্ত ধান ‘পাই’ বা ‘মান’ (পরিমাপক) দিয়ে মেপে গ্রামেরই কাউকে ঋণ দেওয়া হয়। শিশুর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ধান সুদে আসলে বাড়বে। শিশুটি প্রাপ্তবয়স্ক হলে তার বিয়ের সময় এই সুদে-আসলে বাড়া ধান খরচ করা হয়।

এই রীতির মাধ্যমে পরিবারে জন্ম নেওয়া শিশু ‘মুণ্ডারী সমাজে’ স্বীকৃতি পায়। এই প্রথাটিও মৃত্যু পরবর্তী সুরক্ষা এবং বর্তমান জীবনের সুরক্ষার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। ধানের ব্যবহার একদিকে যেমন কৃষিভিত্তিক সমাজকে তুলে ধরছে অপরদিকে মুরগির উৎসর্গের ব্যাপারটি শিকার কেন্দ্রিক আদিম জীবনপ্রবাহকে ঈঙ্গিত করছে।

শেষের কথা 

যৌথ মানুষের আদিতম বিশ্বাস, টিকে থাকার লড়াই, খাদ্য-যৌনতা তথা উৎপাদনশীলতা এবং মৃত্যুভীতি ও মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের সুরক্ষার কামনা উল্কি, অলংকার ও রীতিনীতির অভ্যন্তরে ক্রমপ্রবাহিত হয়ে চলেছে। এইসবের ভেতর আজও অতীত শিকড়টাকে দেখতে পাওয়া যায়। তথাকথিত ধর্মীয় অনুষঙ্গের বাইরে দাঁড়িয়ে এইসব আদিপ্রথা তাদের অমঙ্গল ও মঙ্গল কামনা নিয়ে বড়ো সন্তর্পণে সমবেত মানুষের আশা-আকাংক্ষা, বেঁচে থাকার অসম লড়াইটাকে তুলে ধরে।

তথ্যসূত্র

১) The Origins of Tattooing: A Brief Overview–Retrospect Journal https://share.google/W94lCZl2Ac3C4Ofvu

২) The History of Tattooing/Wilfrid Dyson Hambly/p.26/Dover publications, NC. Mineola, New York.

৩) The History of Tattooing/ Wilfrid Dyson Hambly/p.51/Dover publications, NC. Mineola, New York.

৪) ধীরেন্দ্রনাথ বাস্কে, পশ্চিমবঙ্গের আদিবাসী সমাজ, প্রথম খণ্ড, ১৯১ (বাস্কে পাবলিকেশন)৷

৫) সৌরভ মিত্র, ভারতবর্ষের অলংকার প্রাগৈতিহাসিক থেকে প্রাগাধুনিক, ১৯৫ (প্রজ্ঞা পাবলিকেশন প্রাইভেট লিমিটেদ, ২০২৪)৷

৬) ধীরেন্দ্রনাথ বাস্কে, পশ্চিমবঙ্গের আদিবাসী সমাজ, প্রথম খণ্ড, ১৫৫ (বাস্কে পাবলিকেশন)৷

তথ্যসূত্রে উল্লিখিত গ্রন্থগুলি ছাড়াও অন্য সহায়ক গ্রন্থঃ

১) বঙ্কিমচন্দ্র মাইতি, দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তবাংলার লোকায়ত সংস্কৃতি (অরিন্দম প্রকাশনা)৷

২) James Frazer, The Golden Bough, (Penguin Books).

৩) Wilfrid Dyson Hambly, The History of Tattooing, 310(Dover publications, NC. Mineola, New York).

ঋণ স্বীকার

সুস্মিতা সিং (চুয়াগারা), বিনতা সিং (পেটবিন্দি), শিবসত্য হেমব্রম (পড়াশিয়া)

জন্ম রেলশহর খড়্গপুরে। ভালোবাসার ক্ষেত্র—গবেষণামূলক অনুসন্ধান, এক্ষেত্রে পছন্দের বিষয় আঞ্চলিক ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতি। প্রকাশিত গবেষণাগ্রন্থঃ আলপনার প্রতীক ভাবনার উৎস (টেরাকোটা, ২০২৩), রবীন্দ্রসাহিত্যে রূপকথার সংস্কার (ট্রামলাইন বুকস ইন্ডিয়া, ২০২৩), প্রবন্ধ গ্রন্থঃ নির্দিষ্ট কিছু শিশুসাহিত্যঃ অনুভবে বিশ্লেষণে (ঈশপ, ২০২১)৷ এছাড়া কয়েকটি কবিতা গ্রন্থ এবং ছোটোদের যৌথ উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। কবিতা অনূদিত হয়েছে ইংরেজি ও হিন্দিতে এবং ছোটোদের গল্প অনূদিত হয়েছে ওড়িয়া ভাষায়।

মন্তব্য তালিকা - “উল্কি, অলংকার, রীতি: কিছু তত্ত্বতালাশ”

  1. সুন্দর গবেষণামূলক রচনা। ক্ষেত্র গবেষণা অংশগুলো বিশেষ ভালো লাগল।
    তবে প্রাচীনকালে মানুষের শরীরের উল্কি বা অলংকরণ বা যেকোনো সাজসজ্জা আমরা সবসময়েই ধর্মবিশ্বাস বা জাদু এসবের সঙ্গে Associate করি।
    এটা আমার মনে হয় যুক্তির বদলে কল্পনার ওপর বেশি নির্ভরশীল। আদি মানব-মানবীর সৌন্দর্য চেতনা ছিল না। তারা যা করতো সবই অদৃশ‍্য শক্তি দের খূশি বা নিয়ন্ত্রণের জন্য। এমন ভাবনাটা আমার একপেশে বা biased মনে হয়।

  2. সুন্দর গবেষণামূলক রচনা। ক্ষেত্র গবেষণা অংশগুলো বিশেষ ভালো লাগল।
    তবে প্রাচীনকালে মানুষের শরীরের উল্কি বা অলংকরণ বা যেকোনো সাজসজ্জা আমরা সবসময়েই ধর্মবিশ্বাস বা জাদু এসবের সঙ্গে Associate করি।
    এটা আমার মনে হয় যুক্তির বদলে কল্পনার ওপর বেশি নির্ভরশীল। আদি মানব-মানবীর সৌন্দর্য চেতনা ছিল না। তারা যা করতো সবই অদৃশ‍্য শক্তি দের খূশি বা নিয়ন্ত্রণের জন্য। এমন ভাবনাটা আমার একপেশে বা biased মনে হয়।

  3. চমৎকার গবেষণামূলক রচনা। অনেক অজানা তথ্য জানার সুযোগ পেলাম। লেখককে অসংখ্য ধন্যবাদ। ধন্যবাদ ইতিহাস তথ্য ও তর্ক গ্রুপকে রচনাটি প্রকাশ করায়।

  4. দারুণ লাগল লেখাটা। বিশেষ করে দুটো কারণে-
    ব্যক্তিগত ক্ষেত্রসমীক্ষা যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। আর রিচুয়ালগুলোর অতিলৌকিক ব্যাখ্যার বদলে ব্যবহারিক ব্যাখ্যার দিকে লেখক জোর দিয়েছেন।

    জনজাতীয় সমাজ ও রিচুয়াল নিয়ে আরো এরকম লেখার অনুরোধ রাখছি।

  5. লেখাটি ভালো লাগলো। স্বচ্ছ ধারনা পাওয়া গেল।
    বাঙালি সমাজে, উচ্চবর্ণের তো আরো বেশি করে,উলকির প্রতি অনীহা ছিল কিছুদিন আগেও। বিভূতিভূষণ এর একটি ছোটোগল্পও পড়েছি।এই রিজেকসন কি কেবল আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে এই প্রথা চালু ছিল বলেই?

    1. অনেক অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

      আমারও সেটাই মনে হয়, তবে এই নিয়ে আরও অনুসন্ধানের প্রয়োজন আছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।