আধুনিক ইতিহাসবিদ্যার ‘সূত্র-সমালোচনা’ পদ্ধতির পূর্ব-ইতিহাস : রেনেসাঁস থেকে র্যাঙ্কে
ইতিহাস সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে, “It is not a science of observation, it is a science of reasoning”। কথাটির কারণ এই, যে-অতীত নিয়ে ঐতিহাসিকের কারবার তা যেমন সরাসরি পর্যবেক্ষণের অতীত, তেমনই ল্যাবরেটরিতে তা পুনরাবৃত্তিযোগ্যও নয়। ঐতিহাসিক কাজ করেন অতীতের ফেলে-আসা টুকরো ও সূত্রগুলি নিয়ে (“Historical study is not the study of the past but the study of the present traces of the past.”)। এগুলিই তাঁর ইতিহাস রচনার আকর। ঐতিহাসিকেরা এই সূত্র বা উপাদানসমূহকে দুই ভাগে ভাগ করেন – primary source বা প্রত্যক্ষ সূত্রসমূহ এবং secondary source বা পরবর্তী বা দূরবর্তী হাত-ফেরতা সূত্রসমূহ (পরোক্ষ জ্ঞান)। ঐতিহাসিকদের কাছে প্রথম ধরনের সূত্রসমূহই সাধারণভাবে বেশি গুরুত্ব পায়। তবে সূত্রসমূহ বিনা প্রশ্নে তাঁরা গ্রহণ করেন না। সূত্র বা আকরসমূহের প্রামাণিকতা নির্ধারণ করতে হয় (অর্থাৎ দলিলটি জাল না আসল সেই নির্ণয়), তারপর দলিলে উল্লিখিত তথ্য ও বক্তব্যসমূহের বিশ্বাসযোগ্যতা পরীক্ষিত হয়। এর নাম “source criticism” বা সূত্র-সমালোচনা পদ্ধতি। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ নাগাদ যখন পাশ্চাত্যে পেশাদারি ইতিহাসশাস্ত্রের সূচনা ঘটল, তখন ইতিহাস গবেষণার অপরিহার্য একটি শর্ত হিসেবে সংযুক্ত হয়েছিল এই ‘সূত্র-সমালোচনা পদ্ধতি’। কিন্তু এমনটা মোটেই নয় যে, সূত্র-সমালোচনা পদ্ধতি উনিশ শতকের আবিষ্কার। এর একটা পূর্ব-ইতিহাস আছে। এই প্রবন্ধের আলোচ্য সেই “ইতিহাস”।
এই ইতিহাসের শুরু চোদ্দো-পনেরো শতকের ইউরোপে, রেনেসাঁসের যুগে, হিউম্যানিস্ট চিন্তকদের হাতে—যাঁরা টেক্সটের (ধ্রুপদী যুগের পুথির) এক নতুন পাঠপদ্ধতি প্রণয়ন করেছিলেন। ধ্রুপদী অতীত অর্থাৎ প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সভ্যতার প্রতি তীব্র আগ্রহ ও কৌতূহল এই সময়কার বৈশিষ্ট্য। এর আগে, মধ্যযুগে, গ্রিক-রোমান লেখকরা সম্পূর্ণ অজানা ছিলেন, তা নয়। কিন্তু হিউম্যানিস্ট চিন্তকদের নতুনত্ব হল—তাঁরা শুধু প্রাচীন পুথির উত্তরকালীন প্রতিলিপি পাঠ করেই সন্তুষ্ট হননি। তাঁদের মূল মন্ত্র ছিল— ad fontes, উৎসে প্রত্যাবর্তন। এর ফলাফল: মঠের কুঠুরি থেকে প্রাচীনতম পুথির উদ্ধার, বিভিন্ন প্রতিলিপির পাঠভেদ মেলানো, ভাষার সূক্ষ্ম বিচ্যুতিগুলি চিহ্নিত করে সেগুলির প্রামাণিকতা নির্ণয়। মানবতাবাদী ফিলোলজির এই অভ্যাসই পরবর্তীকালের ইতিহাসচর্চার জন্য এমন এক বৌদ্ধিক জমি তৈরি করে দেয়, যেখানে অতীতকে প্রমাণের নিক্তিতে যাচাই করবার প্রবণতা শিকড় গাড়তে শুরু করে।
এই পরিবর্তনের পিছনে ক্রিয়াশীল ছিল একাধিক ঐতিহাসিক শক্তি। ইতালীয় নগররাষ্ট্রগুলির অর্থবিত্ত, ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারের প্রসার, মঠে-মঠে চাপা পড়ে থাকা পুথির পুনরাবিষ্কার, আর ১৪৫৩ সালে কনস্টান্টিনোপলের পতনের পর গ্রিক পণ্ডিতদের ইতালিমুখী স্রোত — এ সবের সম্মিলিত ফলে পশ্চিম ইউরোপে জমে উঠেছিল বিপুল গ্রিক ও লাতিন পাণ্ডুলিপির ভাণ্ডার। এই আবিষ্কারই আবার এক নতুন সমস্যা ডেকে এনেছিল। একই রচনার একাধিক প্রতিলিপিতে দেখা দেয় পাঠের অসঙ্গতি — কোথাও বাক্য জুড়ে বসেছে অনধিকারচর্চা, কোথাও শব্দের রূপ পাল্টে গেছে, কোথাও লিপিকরের ভুলে অর্থই দাঁড়িয়ে গেছে উলটো দিকে। প্রশ্ন উঠল অনিবার্যভাবে — কোনটি প্রকৃত পাঠ, কোনটি পরবর্তী সংযোজনের চিহ্নমাত্র? এই জিজ্ঞাসার উত্তর সন্ধানেই ফিলোলজি নামক শাস্ত্রটি পরিণত হয়ে ওঠে।
অ্যান্টনি গ্রাফটন দেখিয়েছেন, উত্তর ইতালির চোদ্দ শতকের নোটারি ও আইনজ্ঞদের রচনায় প্রথম এই ধরনের পাঠপদ্ধতির হদিশ মেলে, কিছু পরে পেত্রার্ক (১৩০৪-১৩৭৪)-এর পাণ্ডিত্যচর্চায় এই প্রবণতা আরও সুসংবদ্ধ রূপ লাভ করে। রোমান লেখক সিসেরো বা লিভি ছিলেন পেত্রার্কের আদর্শ। এঁদের রচনার নির্ভুল পাঠ পুনরুদ্ধার ছিল তাঁর কাছে নেশার মতো। এই মনোভাবই ক্রমশ মানবতাবাদী পাণ্ডিত্যের একটি স্থায়ী বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়। পোগগিও ব্রাসিলিওনি, নিকোলো নিকোলি এবং তাঁদের সমকালীন সহযাত্রীরা ইউরোপের নানা মঠের অন্ধকার কুঠুরি থেকে পুথি টেনে আনতে থাকেন আলোয়। বিভিন্ন পাঠের তুলনা, ভাষার নিবিড় বিশ্লেষণ, আর পাঠ-সমালোচনার শ্রমসাধ্য প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই তাঁরা গড়ে তোলবার চেষ্টা করেন একটি গ্রহণযোগ্য সংস্করণ।
খেয়াল রাখতে হবে, এই পর্যায়ে ফিলোলজির লক্ষ্য ইতিহাস রচনা ছিল না, তার প্রধান অভিপ্রায় টেক্সটের পুনর্নির্মাণ। কিন্তু এই কাজের ভিতর দিয়েই অজান্তে জন্ম নেয় একটি নতুন বৌদ্ধিক অভ্যাস — কোনো টেক্সটকে অবিমিশ্র বিশ্বাসে গ্রহণ না করে তাকে প্রথমে যাচাই করা। এইভাবে ভাষা, ব্যাকরণ, শব্দচয়ন, রচনাশৈলী — এসব ধীরে ধীরে নিছক সাহিত্যিক রুচির বিষয় হয়ে না থেকে পরিণত হতে থাকে ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে। অন্যভাবে বলা যায়, ভাষা তখন আর কেবল অর্থপ্রকাশের বাহন নয় — ভাষা কোনো যুগের সাক্ষীও বটে। একটি দলিল তার নিজস্ব ভাষার ভিতর দিয়েই বহন করে চলে তার জন্মকাল, তার রচয়িতা, তার ঐতিহাসিক অবস্থানের সংকেত। এই সম্ভাবনাকে পূর্ণ ও পরিণত রূপ দিয়েছিলেন লোরেঞ্জো ভাল্লা (১৪০৭-১৪৫৭)। তাঁর হাতেই ফিলোলজি পাঠ-সমালোচনার সংকীর্ণ সীমানা পেরিয়ে পরিণত হয় ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের এক কার্যকর, ধারালো পদ্ধতিতে।
লোরেঞ্জো ভাল্লা
Donation of Constantine নামক দলিলটির বিশ্লেষণী পাঠ ভাল্লার একটি যুগান্তকারী কীর্তি। Donation of Constantine ছিল পশ্চিম ইউরোপের উপর পোপতন্ত্রের জাগতিক কর্তৃত্বের ভিত্তিস্বরূপ। মনে করা হত যে, সম্রাট কনস্টান্টিন চতুর্থ শতকে পোপ প্রথম সিলভেস্টারকে রোম এবং পশ্চিম সাম্রাজ্যের উপর বিশেষ রাজনৈতিক অধিকার দান করেছিলেন। কয়েক শতক ধরে দলিলটি ধর্মীয়, আইনি এবং রাজনৈতিক বিতর্কে প্রামাণ্য নথি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে তার সত্যতা প্রশ্ন করা মানে কেবল একটি পাঠকে চ্যালেঞ্জ করা নয়; একটি প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং ক্ষমতার ভাষ্যকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো।
ভাল্লার এই বিতর্কে প্রবেশ ধর্মতাত্ত্বিক হিসেবে নয়, ফিলোলজিস্ট বা ভাষাতাত্ত্বিক রূপে। তিনি ধরে নিলেন, যদি কোনো দলিল সত্যিই চতুর্থ শতকে রচিত হয়ে থাকে, তাহলে তার ভাষা, শব্দভাণ্ডার, বাক্যরীতি এবং প্রশাসনিক পরিভাষাও সেই যুগের হওয়া উচিত। অথচ, ভাল্লা দেখান, Donation of Constantine-এ এমন বহু শব্দ ও অভিব্যক্তি রয়েছে, যেগুলি চতুর্থ শতকের লাতিনে প্রচলিত ছিল না। কিছু প্রশাসনিক পরিভাষা অনেক পরবর্তী যুগের; কিছু ধারণা মধ্যযুগীয় চার্চ-সংগঠনের প্রতিফলন; এমনকি ভাষার সামগ্রিক ভঙ্গিও প্রাচীন লাতিনের তুলনায় স্পষ্টতই ভিন্ন।
ভাল্লার বিশ্লেষণের শক্তি এখানেই যে, তিনি ভাষাগত অমিলকে বিচ্ছিন্ন ভুল হিসেবে দেখেননি। তিনি ধরে নিয়েছিলেন, ভাষারও একটি ইতিহাস আছে। শব্দের অর্থ বদলায়, ব্যাকরণ পরিবর্তিত হয়, প্রশাসনিক পরিভাষা নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে জন্ম নেয়। ফলে কোনো নথি যে-সময়ের দাবি করে, তার ভাষা যদি সেই সময়ের সঙ্গে খাপ না খায়, তাহলে সন্দেহের সূচনা সেখান থেকেই হবে।
বলাই বাহুল্য, এই পদ্ধতির একটি গভীর জ্ঞানতাত্ত্বিক তাৎপর্য ছিল। মধ্যযুগীয় পাণ্ডিত্যে দলিলের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করত তার দীর্ঘ ব্যবহার, প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি এবং ধর্মীয় মর্যাদার উপর। ভাল্লা মানদণ্ডগুলিকে সরাসরি অস্বীকার করেননি; কিন্তু তিনি দেখিয়েছিলেন, ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এগুলি যথেষ্ট নয়। একটি নথির সত্যতা নির্ধারণে তার নিজস্ব অভ্যন্তরীণ বৈশিষ্ট্যই প্রধান বিচার্য, পরে যাকে ঐতিহাসিকেরা internal criticism বা অভ্যন্তরীণ সমালোচনা নামে অভিহিত করবেন। এই পরিবর্তনের ফলে কর্তৃত্ব (authority) এবং প্রমাণ (evidence)-এর সম্পর্ক নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হয়। প্রমাণ আর কর্তৃত্বের অনুসারী নয়; বরং কর্তৃত্বকেই প্রমাণের বিচারে পরীক্ষা করা যায়।
ভাল্লার পদ্ধতির আর-একটি বৈশিষ্ট্যও লক্ষ্য করার মতো। তিনি কোনো একক লক্ষণের উপর নির্ভর করেননি। একটি শব্দের কালানুচিত ব্যবহার, কোনো প্রশাসনিক পরিভাষার অসামঞ্জস্য কিংবা একটি ব্যাকরণগত বৈশিষ্ট্য — এগুলির কোনো একটিই তাঁর কাছে চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। তিনি বিভিন্ন ভাষাগত পর্যবেক্ষণকে একত্রে সাজিয়ে এমন একটি যুক্তিশৃঙ্খল নির্মাণ করেন, যার সম্মিলিত শক্তি দলিলটির দাবিকৃত প্রাচীনত্বকে অগ্রাহ্য করে। এই বিচারপদ্ধতি আধুনিক ঐতিহাসিক গবেষণার একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্যের পূর্বাভাস বহন করে: কোনো সিদ্ধান্তকে একটি মাত্র প্রমাণের উপর নয়, বরং পারস্পরিকভাবে সমর্থনকারী বহু প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
তবু আজকের সূত্র-সমালোচনা রীতির নিরিখে ভাল্লার কাজের সীমাও ছিল। তাঁর সমগ্র বিশ্লেষণ পাঠের অভ্যন্তরে সীমাবদ্ধ। দলিলটি কোন পার্চমেন্টে লেখা, তার হস্তাক্ষরের ধরন কী, সিলমোহর আসল কি না, সংরক্ষণের ইতিহাস কী — এই প্রশ্নগুলি তাঁর আলোচনার কেন্দ্রে ছিল না। কারণ তাঁর বিচারের অভিমুখ ছিল ভাষা, বস্তুগত দলিল নয়।
এই সীমাবদ্ধতা থেকেই সতেরো শতক নাগাদ একটি নতুন অনুসন্ধানের সূত্রপাত হয়। যদি ভাষা কোনো নথির অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্য বহন করে, তবে সেই নথির কাগজ, কালি, লিপি, সিলমোহর এবং প্রণয়ন-পদ্ধতিও কি সমানভাবে তার ইতিহাস বহন করে না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই ইউরোপীয় পাণ্ডিত্যে diplomatics (দলিলের সত্যতা নির্ণয়) নামে একটি নতুন শাস্ত্রের উদ্ভব ঘটে। এই বিদ্যার সবচেয়ে প্রভাবশালী রূপকার ছিলেন জাঁ মাবিয়োঁ (Jean Mabillon), যিনি দলিলকে কেবল টেক্সট হিসেবে নয়, একটি ভৌত ঐতিহাসিক বস্তু হিসেবেও বিশ্লেষণের বিষয় করে তোলেন।
জাঁ মাবিয়োঁ
‘Diplomatics’ আধুনিক অর্থে কূটনীতি (diplomacy)-র সমার্থক নয়। এটি গ্রিক diploma শব্দ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ ভাঁজ করা আনুষ্ঠানিক দলিল। এই বিদ্যার উদ্দেশ্য দলিলের বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ ছিল না, তা দলিলটির বস্তুগত প্রামাণিকতা (authenticity) যাচাই করতে চেয়েছিল।
এই পদ্ধতির সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ প্রবক্তা ছিলেন ফরাসি বেনেডিক্টাইন সন্ন্যাসী জ্যাঁ মাবিয়োঁ (১৬৩২–১৭০৭)। তিনি ‘Maurist’ সংঘের সদস্য ছিলেন, যারা মধ্যযুগীয় ধর্মীয় নথি সম্পাদনা ও সংরক্ষণের জন্য পরিচিত। ষোলো ও সতেরো শতকে বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নিজেদের সম্পত্তি ও বিশেষাধিকারের সপক্ষে যে-দলিলগুলি উপস্থাপন করছিল, তাদের অনেকগুলিরই সত্যতা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে ছিল না। বিশেষত জেসুইট পণ্ডিত ড্যানিয়েল ভ্যান পাপেনব্রুক মেরোভিঞ্জিয়ান যুগের বহু দলিলকে জাল বলে অভিহিত করলে এক পাণ্ডিত্যপূর্ণ বিতর্কের সূচনা হয়েছিল। এই বিতর্কেরই উত্তর হিসেবে মাবিয়োঁ ১৬৮১ সালে তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ De Re Diplomatica (On the Science of Diplomatics) প্রকাশ করেন।
মাবিয়োঁ দেখিয়েছিলেন, একটি নথির বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ধারণ করতে হলে তার বহিরঙ্গ (external features) এবং অন্তরঙ্গ (internal features)—উভয়কেই সুসমঞ্জস ভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। দলিলটি কোন ধরনের পার্চমেন্ট বা কাগজে লেখা, কী ধরনের কালি ব্যবহৃত হয়েছে, হস্তাক্ষরের ধরন কী, সিলমোহর ও স্বাক্ষরের রীতি কেমন, তারিখ লেখার পদ্ধতি যুগোপযোগী কি না, ভাষা ও শৈলী সংশ্লিষ্ট সময়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কি না—সমস্ত কিছুই বিচার্য। অর্থাৎ, একটি দলিলকে আর বিচ্ছিন্ন পাঠ্য (text) হিসেবে দেখা হয় না; বরং তাকে একটি ঐতিহাসিক বস্তু (historical artefact) হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যার প্রতিটি ভৌত ও ভাষাগত বৈশিষ্ট্য তার উৎপত্তি সম্পর্কে সাক্ষ্য বহন করে।
এই দৃষ্টিভঙ্গি ইতিহাসচর্চায় প্রমাণ (evidence)-এর ধারণাকে আরও বিস্তৃত ও সুসংহত করল। এই প্রসঙ্গেই প্যালিওগ্রাফির গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। প্যালিওগ্রাফি হল প্রাচীন হস্তলিপি পাঠ ও তার কালনির্ণয়ের বিদ্যা। যদিও এর বিকাশে বহু পণ্ডিতের অবদান ছিল, তবে মাবিয়োঁ-ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন শতকে লিপির রূপ, অক্ষরের গঠন, সংক্ষিপ্তরূপের ব্যবহার এবং লিখনরীতির পরিবর্তনকে তিনি কালনির্ণয়ের কার্যকর উপায় হিসেবে ব্যবহার করেন। এর ফলে ইতিহাসবিদের কাছে নথি বা দলিলটি একটি নির্দিষ্ট সময়, স্থান এবং প্রশাসনিক সংস্কৃতি থেকে উৎপন্ন বস্তু হিসেবে প্রতিভাত হয়।
সবচেয়ে বড়ো কথা মাবিয়োঁ তাঁর গবেষণা-পদ্ধতিকে ব্যক্তিগত প্রজ্ঞার উপর নির্ভরশীল না রেখে তাকে একটি অনুশাসনবদ্ধ চর্চার রূপ দিয়েছিলেন। ভাল্লার বিশ্লেষণে আমরা অসাধারণ পাণ্ডিত্যের পরিচয় পেলেও মাবিয়োঁর পদ্ধতির গুরুত্ব হল এই যে, তা পুনরাবৃত্তিযোগ্য (replicable)। এর পর থেকে ইউরোপীয় পাণ্ডিত্যজগতে দলিল-সমালোচনার গুরুত্ব দ্রুত স্বীকৃতি পায়। আঠারো শতক জুড়ে ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে দলিল-সম্পাদনা, পাণ্ডুলিপি-সংগ্রহ এবং প্রাচীন নথির সমালোচনামূলক প্রকাশনার প্রসার ঘটে। বেনেডিক্টাইন ম্যরিস্ট (Maurist) পণ্ডিতদের সম্পাদিত মধ্যযুগীয় গ্রন্থাবলি, বোলান্দিস্টদের (Bollandist) Acta Sanctorum, এবং ইতালিতে লুদোভিকো আন্তোনিও মুরাতোরি (Ludovico Antonio Muratori)-র উদ্যোগে প্রকাশিত বিপুল ঐতিহাসিক সূত্র ও আকরের সংকলন ইউরোপীয় ইতিহাসচর্চার প্রকৃতিতে বদল নিয়ে আসে। বহু শতক ধরে বিচ্ছিন্নভাবে সংরক্ষিত চার্টার, পত্রাবলি, ক্রনিকল, রাজকীয় ফরমান এবং ধর্মীয় নথিকে সংগ্রহ, সম্পাদনা এবং টীকাসহ অতঃপর সুসম্পাদিত রূপে প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই সব উদ্যোগ প্রথমবারের মতো পশ্চিমি ইতিহাসবিদদের সামনে এমন এক সূত্রভাণ্ডার খুলে দিয়েছিল, যাদের তুলনামূলক বিশ্লেষণ এবং আন্তঃপাঠ (cross-reading) ইতিহাস রচনার ভিত্তি হয়ে ওঠে।
গটিংগেন বিশ্ববিদ্যালয়
মাবিয়োঁ-র De Re Diplomatica ইতিহাসচর্চায় দলিল-সমালোচনার একটি সুসংহত পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করলেও, সেই পদ্ধতি তখনও বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত পাণ্ডিত্যের (erudition) পরিসরের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ইতিহাসের ছাত্রদের জন্য তখনও এমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি, যেখানে সূত্র-সমালোচনা, দলিল-পর্যালোচনা এবং ঐতিহাসিক সহায়ক বিদ্যাগুলি প্রণালীবদ্ধভাবে শেখানো হবে। এই পরিপ্রেক্ষিতে ১৭৩৭ সালে জার্মানির হ্যানোভার রাজ্যে গটিংগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের (Georg-August-Universität Göttingen) প্রতিষ্ঠা একটি দিকচিহ্ন। এখানেই ইতিহাসচর্চা প্রথমবারের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা ও পদ্ধতিগত প্রশিক্ষণের দিকে অগ্রসর হয়েছিল। এই অর্থে, গটিংগেন বিশ্ববিদ্যালয়কে রেনেসাঁসের ফিলোলজি-ভিত্তিক সূত্র-সমালোচনার ঐতিহ্য এবং পরবর্তীকালের লিওপল্ড ফন র্যাঙ্কের মহাফেজখানার দলিলভিত্তিক ইতিহাসের মধ্যবর্তী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
গটিংগেনের ইতিহাসচর্চার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল — ইতিহাসকে কেবল অতীত ঘটনার বর্ণনা হিসেবে না দেখে সূত্র ও প্রমাণনির্ভর অনুসন্ধানের একটি পদ্ধতিগত শাস্ত্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা। এই লক্ষ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে শিক্ষার্থীরা শিখত কীভাবে একটি দলিলের সত্যতা বিচার করতে হয়, কীভাবে বিভিন্ন পাঠের তুলনা করতে হয়, কীভাবেই বা কালপঞ্জি, বংশতালিকা, মানচিত্র এবং প্রশাসনিক নথিকে ইতিহাসচর্চার উপযোগী করে ব্যবহার করতে হয়। মাবিয়োঁ-র নির্মিত দলিল-সমালোচনার নিয়মগুলি এখানে প্রথমবারের মতো নিয়মিত একাডেমিক প্রশিক্ষণের বিষয় হয়ে উঠেছিল।
এই রূপান্তরের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন ইয়োহান ক্রিস্টফ গাটেরার (Johann Christoph Gatterer, ১৭২৭–১৭৯৯)। আধুনিক ইতিহাসবিদ্যার পদ্ধতিগত বিকাশে তাঁর গুরুত্ব র্যাঙ্কের খ্যাতির আড়ালে ঢাকা পড়ে গেলেও বাস্তবে তিনিও ইতিহাসচর্চার নতুন ধারণার একজন প্রবর্তক। গাটেরার-ই গটিংগেনের প্রথম অধ্যাপক যাঁর পদবিতে “প্রফেসর অফ হিস্ট্রি” লেখা হয়েছে। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, কোনো ইতিহাসবিদকে কেবল ভাষাজ্ঞান বা ঘটনাবলির সঙ্গে পরিচিত থাকলেই চলবে না; তাকে এমন একগুচ্ছ সহায়ক বিদ্যায় (auxiliary sciences) দক্ষ হতে হবে, যেগুলি অতীতের দলিলকে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে। তাঁর উদ্যোগেই ডিপ্লোম্যাটিক্স (দলিলের সত্যতা-নির্ণয়), প্যালিওগ্রাফি (হস্তলিপিবিদ্যা), ক্রনোলজি (কালপঞ্জি), জিনিয়ালজি (বংশতালিকা), হেরালড্রি (রাজচিহ্নবিদ্যা), নুইমেসমেটিক্স (মুদ্রাবিজ্ঞান) ও হিস্টোরিকাল জিওগ্রাফি একটি সমন্বিত জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে সংগঠিত করা হয়।
গাটেরার-এর দ্বিতীয় অবদান সূত্র বা নথিপত্র সম্পাদনার কৌশলকে শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করা। শিক্ষার্থীদের সামনে কেবল প্রস্তুত ইতিহাসগ্রন্থ উপস্থাপন করা হত না; তাঁদের হাতে দেওয়া হতো মূল দলিল, পাঠভেদ এবং পূর্ববর্তী সম্পাদনার নমুনা। কোন পাঠটি গ্রহণযোগ্য, কোন তারিখটি সন্দেহজনক, কোন নথির প্রামাণিকতা প্রশ্নসাপেক্ষ — এ সব বিষয়ে আলোচনার মধ্য দিয়েই গবেষণার প্রশিক্ষণ চলত। এই উদ্দেশ্যে তিনি সেমিনার প্রথাওচালু করেছিলেন। সেই সেমিনার যদিও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, কিন্তু উনিশ শতকে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে র্যাঙ্কেকেও অনুরূপ উদ্যোগ নিতে দেখা যায়, এবং তারপর থেকে আজ পর্যন্ত ঐতিহাসিকের প্রশিক্ষণে সেমিনার একটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম। গাটেরার-ই ছিলেন এই প্রচেষ্টার পথিকৃৎ।
গটিংগেনের আর-একজন বিশিষ্ট পণ্ডিত ছিলেন অগাস্ট লুডভিগ ফন শ্লোজার (August Ludwig von Schlözer, ১৭৩৫–১৮০৯)। তাঁর আগ্রহ ছিল বৃহত্তর ঐতিহাসিক আখ্যানে, কিন্তু সেই রচনার পূর্বশর্ত হিসেবে তিনি নির্ভরযোগ্য নথিপত্র প্রকাশনার উপর জোর দেন। রুশ ইতিহাস, স্ক্যান্ডিনেভীয় উপকরণ কিংবা মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় নথি — যে ক্ষেত্রেই তিনি কাজ করেছেন, সূত্র-সম্পাদনার মান সম্পর্কে তাঁর সতর্কতা সমকালীনদের সম্ভ্রম আদায় কাছে। তিনি মনে করতেন, ইতিহাসচর্চার সূচনা হয় নথিপত্রের সমালোচনামূলক প্রতিষ্ঠা (establishment of the text) দিয়ে; ব্যাখ্যা তার পরবর্তী ধাপ। এই দৃষ্টিভঙ্গি পরবর্তী জার্মান ইতিহাসচর্চায় গভীর প্রভাব বিস্তার করে।
উনিশ শতক: নিব্যুর ও র্যাঙ্কে
আঠেরো শতক এনলাইটেনমেন্ট বা জ্ঞানদীপ্তির যুগ হিসেবে চিহ্নিত। জ্ঞানদীপ্তির যুগের ইতিহাসচর্চার প্রধান ধারাটি ছিল ‘দার্শনিক ইতিহাস’, যার প্রবক্তাদের মধ্যে ছিলেন ভলতেয়ার, মঁতেস্কু, কঁদেরশো, ডেভিড হিউম, গিবন, পরবর্তীকালে হেগেল প্রমুখ। এঁরা erudite-দের মতো দলিলের নিবিড় পাঠকে ইতিহাস লেখার জন্য জরুরি মনে করেননি (গিবনের ক্ষেত্রে কথাটি অবশ্য খাটে না)। সভ্যতার সামগ্রিক প্রবাহ ও তার ব্যাখ্যাই তাঁদেত ইতিহাসের উপজীব্য। ভলতেয়ার লিখেছিলেন, খুঁটিনাটি সব কিছুর বর্ণনা “কীটদষ্ট পুস্তকের মতো মহান রচনাকে নষ্ট করে”। উনিশ শতকে দার্শনিক ইতিহাসের সর্বোত্তম প্রবক্তা ছিলেন হেগেল, যিনি ছিলেন র্যাঙ্কের দেশেরই দার্শনিক, বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে র্যাঙ্কের কিছু বছরের সহকর্মীও বটে। তিনিও মনে করতেন, খুঁটিনাটি বর্ণনামূলক ইতিহাসের অতিরিক্ত তথ্যনির্ভরতা ইতিহাসের বৃহৎ চলমান প্রক্রিয়াটিকে অনুধাবনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
আধুনিক ইতিহাসশাস্ত্র দার্শনিক ইতিহাসের এই ধারাটির অনুবর্তী না হয়ে গটিংগেনের সূত্র-সমালোচনার ধারাটিরই অনুসারী হয়েছিল। নবপ্রতিষ্ঠিত (১৮০৯) বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ই ছিল পেশাদারি ইতিহাসশাস্ত্রের ‘জননী’। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বার্থোল্ড গেয়র্গ নিব্যুর (Barthold Georg Niebuhr ১৭৭৬–১৮৩১) ফিলোলজি থেকে গ্রহণ করা পাঠ-সমালোচনার (textual criticism) পদ্ধতিগুলিকে ধ্রুপদী রোমান ইতিহাসের অধ্যয়নে প্রয়োগ করেছিলেন। ধ্রুপদী গ্রন্থগুলিকে—বিশেষত কাব্যধর্মী বা পোয়েটিক উৎসগুলিকে—তাদের ভুল, অসঙ্গতি ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের জন্য সুসংবদ্ধ ও সমালোচনামূলকভাবে পরীক্ষা করে নিব্যুর মনে করেছিলেন যে, প্রাচীন রোমের ইতিহাসের বিচ্ছিন্ন খণ্ডাংশগুলিকে একত্র করে বিদ্যমান বিবরণগুলির তুলনায় আরও সম্পূর্ণ ও অধিক নির্ভরযোগ্য একটি ইতিহাস পুনর্গঠন করা সম্ভব।
নিব্যুরের কাজ সরাসরি র্যাঙ্কে (Leopold von Ranke, ১৭৯৫-১৮৮৬)-কে প্রভাবিত করেছিল। লাইপৎজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মতত্ত্ব ও ধ্রুপদী সাহিত্য অধ্যয়নের সময় সময় র্যাঙ্কে নিব্যুরের History of Rome (১৮১১–১২)-এর সঙ্গে পরিচিত হন। ১৮২৪ সালে তাঁর প্রথম গ্রন্থ Histories of the Latin and Germanic Nations from 1494–1514 (ইংরেজি অনুবাদে লেখা হল) প্রকাশিত হলে তিনি প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একজন ইতিহাসবিদ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। এর পরের বছরই তিনি বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন এবং তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে (১৮২৫-১৮৭১) বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে স্বতন্ত্র ডিসিপ্লিন হিসেবে ইতিহাসের প্রতিষ্ঠা ঘটে।
র্যাঙ্কের পদ্ধতিবিদ্যার অভিনবত্ব তাঁর সূত্র-সমালোচনার পদ্ধতির মধ্যে ছিল না, কেননা, আমরা দেখেছি, তা ইতিমধ্যেই যথেষ্ট বিকশিত হয়ে গিয়েছে। র্যাঙ্কের অভিনবত্ব হল তিনি সেই সূত্র-সমালোচনাকে মহাফেজখানার দলিল ও আকরের চর্চায় নিয়োজিত করেন। “প্রাথমিক সূত্রে সংগ্রহ এবং আর্কাইভের নথির স্তূপ র্যাঙ্কেকে এমনভাবে আকর্ষণ করত, যেমন ক্লোভার ঘাস শূকরকে করে”, লিখেছেন গ্রাফটন। গ্রাফটনের মতে, এই “pleasures of the archive”-ই হল র্যাঙ্কের প্রধান আবিষ্কার। ৎসুর ক্রিটিক নয়য়েরার গেশিখটস-শাইবার (On the Critique of Modern Historians, যা র্যাঙ্কের উপরিউক্ত বইটির পরিশিষ্টে প্রকাশিত হয়েছিল) ভূমিকায় র্যাঙ্কে এই ‘আনন্দানুভূতি’ জানিয়ে লিখেছিলেন, “ভাবুন তো, এমন একজন মানুষের অনুভূতি কেমন হতে পারে, যিনি প্রাচীন নিদর্শনের এক বিশাল সংগ্রহশালায় প্রবেশ করেছেন, যেখানে আসল ও নকল, সুন্দর ও কুৎসিত, দৃষ্টিনন্দন ও তুচ্ছ—বিভিন্ন জাতি ও বিভিন্ন যুগের অগণিত বস্তু সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল অবস্থায় পাশাপাশি স্তূপীকৃত রয়েছে। আধুনিক ইতিহাসের বিচিত্র স্মারকসমূহের সামনে একসঙ্গে দাঁড়ালে একজন মানুষের অনুভূতিও ঠিক তেমনই হবে। তারা আমাদের সঙ্গে হাজার রকম কণ্ঠে কথা বলে; তারা সবচেয়ে ভিন্ন ভিন্ন স্বভাবের পরিচয় দেয়; তারা যেন সব রঙের পোশাক পরে আছে।”
র্যাঙ্কের এই “মনোহর রূপকে” গ্রন্থাগার ও আর্কাইভ যেন ত্রিমাত্রিক প্রাচীন নিদর্শনের এক বিশাল প্রদর্শনীতে রূপান্তরিত হয়, আর ঐতিহাসিক হয়ে ওঠেন তার রসজ্ঞ বিচারক, যার সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য নির্ণয়ের ক্ষমতাই হয়ে ওঠে বিচারের মূল মানদণ্ড (গ্রাফটনের উক্তি)। ১৮৩০ ও ১৮৪০-এর দশকে ছয় খণ্ডে প্রকাশিত History of the Reformation in Germany -র প্রথম খণ্ডে র্যাঙ্কে তাঁর কাজটিকে “জার্মান আর্কাইভসমূহে দীর্ঘ অনুসন্ধানের বিজয়যাত্রার ফলাফল” বলে বর্ণনা করেছিলেন। তিনি এ-ও বলেছিলেন যে, তাঁর এই বিশাল গ্রন্থ আসন্ন ঐতিহাসিক বিপ্লবের পূর্বাভাসমাত্র — “আমি সেই সময়কে আসতে দেখছি, যখন আধুনিক ইতিহাসচর্চা আর সমসাময়িক ইতিহাসবিদদের প্রতিবেদনগুলির উপর (যদি না তাঁদের প্রত্যক্ষ জ্ঞান থাকে) নির্ভর করবে না; অপ্রত্যক্ষ দ্বিতীয়-হাতের সংকলনের (সেকেন্ডারি সোর্স) উপর তো আরও নয়। বরং ইতিহাস নির্মিত হবে প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ এবং সবচেয়ে নির্ভেজাল ও প্রত্যক্ষ দলিলের ভিত্তিতে।”
র্যাঙ্কের সূত্র-সমালোচনা তাই primary source বা প্রত্যক্ষ সূত্র ও দলিলসমূহের সূত্র-সমালোচনা, যার ঠিকানা আর্কাইভস। অর্থাৎ সূত্র আর নিছক পূর্ববর্তী কোনো লেখক বা ঐতিহাসিকদের টেক্সটের চর্চা নয় (যেমন নিব্যুরের কাছে ছিল), তা একেবারে হাতে-গরম আকর ও দলিলের চর্চা।
এ-কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে, সূত্র-সমালোচনা ও “খুঁটিনাটি তথ্যের কঠোর উপস্থাপনা”-র মধ্যেই ঐতিহাসিকের কাজ শেষ হয়ে যায় না। র্যাঙ্কে তা বলেনওনি। “অন্য সমস্ত বিজ্ঞানের চেয়ে ইতিহাসের স্বাতন্ত্র্য হল যে ইতিহাস কলাবিদ্যাও বটে। তথ্যসংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও ‘কী-ঘটেছিল’-র উপলব্ধির সময় ইতিহাস বিজ্ঞান; কিন্তু যা তিনি পেলেন ও বুঝলেন তা যেহেতু পুনঃসৃজনও করতে হয় তাঁর কলমে, তাই তা কলাবিদ্যাও বটে। অন্য বিজ্ঞানগুলি সাক্ষ্যপ্রমাণের নথিবদ্ধকরণেই সন্তুষ্ট থাকে, কিন্তু ইতিহাস প্রাপ্ত তথ্যের পুনঃনির্মাণের দক্ষতাও দাবি করে”, র্যাঙ্কে লিখেছিলেন (‘On the Character of Historical Science’ – A Manuscript of 1830s)। র্যাঙ্কের ইতিহাসগ্রন্থগুলি অনবদ্য সাহিত্যিক শৈলীর জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। কিন্তু র্যাঙ্কের সময় থেকেই জার্মান ইতিহাসবিদ্যার পেশাদারি প্রশিক্ষণের ধারায় “সূত্র-সমালোচনা” গবেষণাপদ্ধতির প্রথম ধাপ হিসেবে সুস্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল; উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে লেখা নানা ঐতিহাসিকের পাঠ্যপুস্তকে (ড্রয়সেন, আর্নস্ট বার্নহাইম কিংবা লাঁগলোয়া ও সেনিওবোস) সূত্র-সমালোচনার সেই “নিয়মাবলি” পেশাদারি ইতিহাসবিদদের আবশ্যিক পাঠ্য হয়ে উঠবে।
সহায়ক প্রবন্ধ ও গ্রন্থ
Anthony Grafton, The Footnote A Curious History (Cambridge: Harvard University Press: 1999).
———– Defenders of Text: The Traditions of Scholarship in An Age of Science, 1450-1800 (Cambridge: Harvard University Press: 1994).
CH. V Langlois & CH. Seinobos, Introduction to the Study of History (Trans by G C Berry), (London: Duckworth & Co: 1912).
Ernst Breisach, Historiography: Ancient, Medieval and Modern (Third Edition), (Chicago & London: The University of Chicago Press: 2007).
Georg G. Iggers, “The Intellectual Foundations of Nineteenth-Century ‘Scientific’ History: The German Model,” in Stuart Macintyre (ed.), The Oxford History of Historical Writing, Vol. 4: 1800–1945 (Oxford University Press, 2011), pp. 41–58.
একটা অসাধারণ নিবন্ধ। এখানে যে বৌদ্ধিক বিষয়টি নিয়ে চর্চা করা হয়েছে তার কিছু কিছু জিনিস জানতাম (যেমন internal criticism বা Diplomatics), ঠিক এই নামে না জানলেও মূল ব্যাপারটা জানতাম, এগুলো কিভাবে কাজ করে জানতাম কারণ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ইতিহাসবিদের লেখা পড়তে গিয়ে দেখেছিলাম যে তাঁরা এ পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করেছেন পদ্ধতিগুলোর নাম বা বিস্তারিত ব্যাখ্যা না দিয়ে। ফলে এ পদ্ধতিগুলোর পরিষ্কার definition ও explanation একেবারে textbook format ও precision এ জানতে পারা একটা বড় প্রাপ্তি।
কিছু জিনিস (যেমন ad fontes বা উৎসে প্রত্যাবর্তন এবং cross referencing বা তুলনামূলক বিশ্লেষণ) সরাসরি জানতাম না কিন্তু এমনটাই যে করা উচিত বা হয়তো করা হয় এমন একটা ধারণা বা sense অন্তত ছিল। এই প্রবন্ধ পড়ে জানতে পারলাম যে আমি এই sense এর আবিষ্কার করিনি, এই sense শুধু বিজ্ঞানক্ষেত্রের লোকেদের ব্যবহার্য তাও নয়। ইতিহাস বহু আগে থেকেই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি বা বলা উচিত জ্ঞানচর্চার যুক্তিপূর্ণ পথ ব্যবহার করে চলেছে। এই ইতিহাস বিস্তারিত জানতে পারা দ্বিতীয় প্রাপ্তি।
বহু স্বশিক্ষিত বা স্বঘোষিত ইতিহাসবিদ আছেন যাঁদের ইতিহাস বিষয়ে এবং এইসব পদ্ধতি বিষয়ে উপযুক্ত ধারণা না থাকায় তাঁরা অনেক সময়ই নিজেদের অজান্তেই আসলে দার্শনিক ইতিহাস রচনা করে ফেলেন বস্তুগত ইতিহাসের পরিবর্তে। অনেকসময় দেখা যায় বস্তুগত ইতিহাসের মধ্যে মিশে গেছে ঐতিহাসিকের ভাবালুতা বা ব্যক্তিগত বিশ্বাস। এমনকি কিছু খ্যাতনামা ঐতিহাসিক ও এর থেকে মুক্ত নন।
অনেকেই আবার এইসব পদ্ধতিগুলোর মধ্যে যেকোনো একটার (যেমন internal criticism) ওপর নির্ভর করে থাকেন ইতিহাসের বা নিজ আলোচ্য বিষয়ের কাঠামো দাঁড় করানোর জন্য।
এখানে যেমন মোরোঞ্জোভিয়ান যুগের দলিল বিষয়ে বিতর্কের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে ঠিক তেমন বিতর্কের উদাহরণ আমিও পেয়েছিলাম চৈতন্যজীবনীকার হরিপদ কর্মকার আসল না নকল, তাঁর লেখা জীবনীটি আসল না নকল তা নিয়ে। দীনেশচন্দ্র সেন মূলত internal criticism এর ওপর নির্ভর করেছেন কিন্তু সুকুমার সেন তার সঙ্গে diplomatics ও (infact তাঁর লেখাতেই প্রথম diplomatics এর ব্যবহার দেখেছি যদিও নাম উল্লেখ ছিল না) ব্যবহার করেছেন।
এই নিবন্ধটা পড়ার পর অনেক পূর্বেকার জানা জিনিস হঠাৎই নতুন করে দেখতে এবং বুঝতে পারলাম। নতুন আলোতে দেখতে এবং ভাবতে শিখলাম যেটা এই প্রবন্ধের থেকে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।