নাগ উপাসনা – ভারত ও কম্বোডিয়া
বারোশো বছর পুরোনো আঙ্কোর নগরী – কম্বোডিয়ার উত্তর-পশ্চিমাংশে। আঙ্কোর শব্দের অর্থ নগর, সংস্কৃত নগর শব্দ অপভ্রষ্ট হয়ে আঙ্কোর। এখন অবশ্য এই নগরীর ধ্বংসস্তূপই রয়ে গেছে, তবে বেশ অক্ষত অবস্থায়- এখনও দেখলে মানসচক্ষে গোচর করা যায়, সে যুগে কেমন লাগত এই শহর। কয়েকশো মন্দির, কয়েকশো তোরণ, চারিদিকে জলের পরিখা, তাদের উপর দিয়ে ছোটো ছোটো সেতু, আর অজস্র নাগ। সেতুর রেলিংগুলো নাগের শরীর, মন্দিরের প্রবেশপথের দুধারের রেলিংগুলিও নাগ, মন্দিরের দেয়ালচিত্রে নাগ, গৌতম বুদ্ধের মস্তক আবৃত করে তাঁকে রক্ষা করে চলেছে একটি নাগ- সারা শহরে আধিপত্য করছে দুটি নাগ- বৌদ্ধদের মুচলিন্দ আর হিন্দুদের বাসুকি।
আঙ্কোরওয়াট বিষ্ণুমন্দির হল পৃথিবীর বৃহত্তম মন্দির – দু’শো তেরো ফুট গগনচুম্বী উচ্চতা, আর চারশো একর তার বিস্তার। এই মন্দিরের সুদীর্ঘ প্রাকারগুলিকে ব্যবহার করা হয়েছে খোদাই করা দেয়ালচিত্রের জন্য। সুদীর্ঘ দেয়াল, আর তার মধ্যে খোদিত কাহিনিও সেই দৈর্ঘ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। মহাভারত, পুরাণ ও স্থানীয় ইতিহাসের কাহিনি। এদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল সমুদ্রমন্থনের দৃশ্য – মন্দির প্রাকারের দক্ষিণ-পূর্ব দিকের সম্পূর্ণ দেয়ালগাত্র জুড়ে এই দৃশ্য। এই দৃশ্যে বাসুকি নাগের মাথার দিকে ১৮২ জন অসুর, লেজের দিকে দেবতা ১৮২ জন। বাসুকির দেহের ঠিক মাঝখানের মন্থনদণ্ডটি হল মেরুপর্বত, যার নিচে কূর্ম আর উপরে নৃত্যরত চতুর্ভুজ বিষ্ণু। বিষ্ণুসহ এই ৩৬৫ জন দেবতা ও অসুর সৌর বছরের একেকটা দিনের প্রতীক। মন্দিরের বিশালতা আর দেয়ালের দৈর্ঘ্যকে সুন্দরভাবে ব্যবহার করা হয়েছে ৩৬৫ জন দেবাসুরকে স্থান দিতে, আর বাসুকি নাগের দৈর্ঘ্যকে বোঝাতে।

চিত্র-১
বাসুকির উপস্থিতি আঙ্কোরের এই একটা মন্দিরেই সীমিত নয়। মন্দিরনগরী আঙ্কোরের প্রায় প্রতিটা মন্দিরের প্রবেশমার্গের দুই-ধারে ফণা মেলে আছে বাসুকি। প্রবেশপথের রেলিঙের অগ্রভাগটি হল বাসুকির সপ্তমস্তক ফণা, আর কয়েকশো ফুট লম্বা রেলিংটি হল বাসুকির দেহ । মন্দিরগুলি যেমন আটশো থেকে বারোশো বছর পুরোনো, রেলিংগুলিরও প্রাচীনত্ব তেমনই। প্রে-খ্যান মন্দিরের রেলিঙে আছে একটা বাড়তি অনুষঙ্গ- রেলিঙের অবলম্বন হিসেবে যে স্তম্ভগুলির প্রয়োজন হয়, সেই স্তম্ভগুলো হয়ে গেছে অসুরের মূর্তি। অর্থাৎ অসুরেরা বাসুকিকে ধরে টানছে। একই দৃশ্যকল্প ওদেশের সহস্রাব্দ-প্রাচীন সেতুগুলিতেও। বাসুকি আর সমুদ্রমন্থনের এই সর্বব্যাপী উপস্থিতি ভারতের কোনো মন্দিরে বা শহরে দেখা যায় না। বাসুকিকে দেখতে হলে কম্বোডিয়াতেই আসতে হয়।
হিন্দু পুরাণ থেকে যেমন বাসুকিকে নেওয়া হয়েছে, বৌদ্ধ সাহিত্য থেকে এখানে আনা হয়েছিল আরেকটি নাগকে। আঙ্কোরওয়াট আদিতে বিষ্ণুমন্দির হলেও এখন এই মন্দিরের প্রধান উপাস্য দেবতা বুদ্ধ। আঙ্কোর তথা কম্বোডিয়ার মন্দিরগুলিতে বুদ্ধের দুটি রূপ বিশেষ জনপ্রিয়। একটি দণ্ডায়মান রূপ, যা লোকেশ্বর নামে পরিচিত, অন্যটি ধ্যানমুদ্রার মূর্তি, যেখানে বুদ্ধের মাথার উপরে সপ্তমস্তক নাগের উপস্থিতি প্রায় বাধ্যতামূলক- এই নাগের নাম মুচলিন্দ। ধ্যানী বুদ্ধের সঙ্গে এই নাগ কিভাবে যুক্ত হল? এই দৃশ্যকল্পের আদিরূপ দেখা যায় ভারতের বৌদ্ধ স্থাপত্যে, খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে। যদিও ভারতে পরবর্তীকালে বুদ্ধের এই মূর্তিরূপটি বিরল হয়ে যায়। বোধিবৃক্ষের নিচে সিদ্ধার্থ যখন বোধিলাভের জন্য ধ্যান করছিলেন, তখন প্রবল ঝড়বৃষ্টি থেকে সিদ্ধার্থকে বাঁচাতে পাতাল থেকে উঠে আসে মুচলিন্দ নাগ। তার বহুমস্তক আর ফণা দিয়ে সে ছাতার মতো করে ঢেকে রেখেছিল সিদ্ধার্থকে। খুদ্দক নিকায়ের অন্তর্গত মুচলিন্দ সূত্রে এই কাহিনি প্রথম দেখা যায়, এরপর বিভিন্ন প্রাচীন ভাস্কর্যে তাকে ফুটিয়ে তোলা হয়, যেমন মহারাষ্ট্রের পবনী স্তূপের স্তম্ভে, সাঁচী স্তূপে। এগুলো খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় থেকে প্রথম শতাব্দীর। এই ভাস্কর্যগুলো সেই সময়ের যখনও বুদ্ধকে মূর্তিরূপ দেওয়া শুরু হয়নি, তাই এগুলিতে দেখা যায় মুচলিন্দ তার পাঁচটি মাথা দিয়ে শূন্য বজ্রাসন বা প্রজ্জ্বলিত অগ্নিকে রক্ষা করছে- যেগুলি বুদ্ধেরই প্রতীক।

চিত্র-২
এরপরে মথুরায় প্রথম ও দ্বিতীয় শতাব্দীতে প্রাপ্ত জৈন তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথের মূর্তিতেও পঞ্চমস্তক নাগের উপস্থিতি দেখা যায়। এই সাপের নাম ধরণেন্দ্র – এবং সেও ধ্যানরত পার্শ্বনাথকে রক্ষা করেছিল। পার্শ্বনাথের মূর্তিতে নাগের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক – বুদ্ধের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা সেরকম নয়।
আরও হাজার বছর আগে ঋগ্বেদের দেবতাদের তালিকায় আমরা নাগদের দেখতে পাই না। সেযুগের অবৈদিক সংস্কৃতিতে নাগেরা কতটা পূজিত হত তার সম্পূর্ণ নথি পাওয়া সম্ভব নয়, কারণ বেদে সেটা উপেক্ষিত হয়েছে। তবে ঋগ্বেদে নথিবদ্ধ হয়েছিল ইন্দ্র ও বৃত্রের সংঘাত- সেখানে বৃত্রকে অহি (অর্থাৎ সাপ) রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রথম মণ্ডলের ৩২নং সূক্তে দেখা যায় এই অহিকে বধ করে সপ্তসিন্ধুর জলপ্রবাহকে মুক্ত করলেন ইন্দ্র। অথর্ববেদে সাপেদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার মন্ত্র আছে।
মহাভারতেও এই নাগেরা বারবার ফিরে ফিরে এসেছে। কুরুবংশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক অম্লমধুর। তক্ষক নাগের হাতে নিহত হয়েছিলেন অর্জুনপৌত্র পরীক্ষিত, তাই তার প্রতিশোধ নিতে তাঁর পুত্র জনমেজয় সর্পসত্র যজ্ঞ করেন। সাপেদের যজ্ঞের আগুনে টেনে এনে হত্যা করা এই যজ্ঞের উদ্দেশ্য ছিল। মনসাপুত্র ঋষি আস্তিকের হস্তক্ষেপে এই নাগহত্যা বন্ধ হয়। অন্যদিকে, কুরুবংশের সঙ্গে নাগদের বৈবাহিক সম্পর্কও দেখা যায়। নাগকন্যা উলূপী ছিলেন অর্জুনের দ্বিতীয়া স্ত্রী। তিনি কখনই হস্তিনাপুরে এসে অর্জুনের পূর্ণাঙ্গ সহধর্মিনী হবার সুযোগ পাননি। তবু অর্জুন-উলূপীর পুত্র ইরাবান কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে এসে পাণ্ডবদের জন্য লড়াই করেছিল, নিজের প্রাণ দিয়েছিল। এর পাশাপাশি একটা সংঘাতের কাহিনিও পাওয়া যায়। কৃষ্ণ আর অর্জুন মিলে যখন খাণ্ডব বন দাহ করছিলেন, একের পর এক বৃক্ষ উচ্ছেদ করছিলেন, আর বনবাসী প্রাণীদের হত্যা করছিলেন, তখন রুখে দাঁড়িয়েছিল এক নাগ – তক্ষকপুত্র অশ্বসেন। অশ্বসেনের মা যখন তাকে বাঁচাতে আসে, অর্জুন তাকে হত্যা করেন, এবং এর প্রতিশোধ নিতে অশ্বসেন ফিরে আসে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে। এখানে বহুবিধ সংঘাতের কাহিনি লুকিয়ে আছে – মানুষের সাথে প্রকৃতির, আর্যদের সাথে প্রাগার্যের, নগরায়ণের সঙ্গে বনবাসীদের। সর্পসত্র, অশ্বসেন বা উলূপীর কাহিনি থেকে অনুমান করা যায় যে এই নাগেরা একটা প্রান্তিক জাতি ছিল। ব্রাহ্মণ্য ধর্ম প্রথমদিকে তাদের কিছুটা ভয় পেয়ে চললেও সম্পূর্ণ উপেক্ষা করতে পারেনি।
এই প্রান্তিক নাগজাতির কাহিনি বৌদ্ধদের প্রথম যুগের সাহিত্য ও ভাস্কর্যে অনেক বলিষ্ঠভাবে প্রদর্শিত হয়েছে। বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের পরে দাহকার্যশেষে তাঁর দেহাস্থিভস্ম আট ভাগে ভাগ করে বিভিন্ন রাজারা নিয়ে যায়, এবং তাদের উপরে আটটি স্তূপ নির্মাণ করে। পরে সম্রাট অশোক এই স্তূপগুলির নিচ থেকে দেহাস্থি রাখার কুম্ভগুলি বার করেন এবং সেই দেহাস্থিগুলি ভাগ করে তাদের উপরে চুরাশি হাজারটি স্তূপ নির্মাণ করেন, বুদ্ধের স্মৃতিকে সারা দেশে প্রসার করার জন্য। এই ৮৪০০০ সংখ্যা কিছুটা অতিরঞ্জিত- ‘অশোকাবদান’ এবং ‘থূপবংশ’ গ্রন্থদুটিতে এই কাহিনি পাওয়া যায়। অশোক কিন্তু আটখানা মূল স্তূপের মধ্যে সাতখানি স্তূপ থেকেই বুদ্ধের দেহাস্থি বার করতে পেরেছিলেন। একটি স্তূপ ছিল রামগ্রাম স্তূপ যেটি নাগরাজের অধীনে ছিল, এবং নাগরাজ সেটি উৎখনন করতে দেননি। এর থেকে বোঝা যায়, নাগেরা ছিল বুদ্ধের স্মৃতির আদি রক্ষক, তারা সেই বোধিলাভের সময় থেকেই বুদ্ধকে রক্ষা করে এসেছে, বুদ্ধের স্মৃতিকে এক সর্বব্যাপী সম্রাটের হাতে তুলে দিতে চায়নি। সাঁচির তোরণের একটি ভাস্কর্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে রামগ্রামের এই নাগেরা একটি জনগোষ্ঠীই ছিল – তাদের উপাস্য দেবতা ছিল নাগ, তাদের বেশভূষায় থাকত সাপের উপস্থিতি। সাতবাহন যুগে নির্মিত সাঁচির এই তোরণে দেখা যায় অশোকের সঙ্গে নাগরাজের সাক্ষাতের ঘটনা। মাঝখানে রামগ্রাম স্তূপ, ডানদিকে দেখা যায় অশোক আসছেন একটি অশ্ববাহিত রথে, সঙ্গে তাঁর পার্ষদরা, কেউ পায়ে হেঁটে আসছে, আবার অনেকে হাতির পিঠে চড়ে, প্রত্যেকের মাথায় পাগড়ি। বাঁদিকের দৃশ্য এর অনেকটাই বিপরীত – এদিকে আছেন নাগরাজ এবং তাঁর পার্ষদরা। নাগরাজের শরীর মানুষের মতোই, তবে তাঁর মাথার পিছনে রয়েছে পাঁচ-মস্তকযুক্ত সাপের ফণা। অর্থাৎ সাপটি এখানে তাঁর পোশাক বা শিরোস্ত্রাণের অংশ। একই রকম সর্পশিরোস্ত্রাণ তাঁর পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা আরো কয়েকজন পার্ষদের দেখা যায় – প্রত্যেকেরই মানবশরীর। এদের কারোর কাছে অশোকের মতো অশ্বচালিত রথ বা হাতি নেই। পোশাক এবং যানবাহনের ভিন্নতা এই দুই গোষ্ঠীর মধ্যেকার বৈপরীত্যকেও তুলে ধরে। তবে নাগজাতির শক্তির পরিচয় এখান থেকেই পাওয়া যায় যে তারা এক সম্রাটকে রুখে দিতে পেরেছিল, এবং বুদ্ধের স্মৃতির উপর তাঁর একাধিপত্যকেও প্রতিরোধ করেছিল।

চিত্র-৩
বেদ-পরবর্তী যুগের হিন্দুধর্মে নাগেরা দেবত্ব অর্জন করে, যা বিশেষ ভাবে চোখে পড়ে বৈষ্ণব মূর্তিশিল্পের ইতিহাস অন্বেষণ করলে। দ্বিতীয় শতাব্দীতে কুষাণ যুগের মথুরা অঞ্চলে বিশেষ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল সঙ্কর্ষণ বলরামের বিভিন্ন মূর্তি। বলরামের মূর্তিতে পিঠের উপরে মাথার পেছনে থাকত সপ্তমস্তক নাগ। এর পর পঞ্চম শতাব্দীতে নির্মিত অনন্তশায়ী বিষ্ণুকে দেখা যায় শেষনাগের উপর শায়িত। মধ্যপ্রদেশের বিদিশায় উদয়গিরির গুহামন্দিরের এই মূর্তিটি গুপ্তযুগের। ঐ উদয়গিরি গুহামন্দিরেই বিশালাকার বরাহ অবতারের মূর্তির পদতলে দেখা যায় নাগদেবতাকে। বরাহ তাঁর একটি পা রেখেছেন নাগদেবতার কুণ্ডলীকৃত শরীরে, আর নাগদেবতা হাতজোড় করে বরাহের স্তব করছেন। অনুমিত যে এই বরাহ-বিষ্ণু গুপ্ত রাজতন্ত্রের প্রতীক, আর নাগজাতির গুপ্তসাম্রাজ্যের অধীনস্থ হওয়ার ঘটনা এখানে প্রদর্শিত হয়েছে। সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ প্রশস্তি থেকে জানা যায় নাগবংশীয় রাজা গণপতিনাগকে তিনি নিজের নিয়ন্ত্রণে এনেছিলেন। আরও পরে নাগরাজকন্যা কুবেরনাগার সঙ্গে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের বিবাহের মাধ্যমে গুপ্তদের সঙ্গে নাগদের রাজনৈতিক মেলবন্ধন স্থাপিত হয়।
গুপ্তযুগে উত্তরপ্রদেশের দেওগড় দশাবতার মন্দিরেও শেষশায়ী বিষ্ণুকে দেখা যায়। ষষ্ঠ শতাব্দীতে কর্ণাটকের বাদামি গুহামন্দিরে শেষনাগের ছত্রছায়ায় বসে থাকা বিষ্ণুকে দেখা যায়। এই সময়ে পুরাণ রচনা শুরু হয়ে গেছে, আর বিষ্ণুর শেষশায়ী রূপও তখন কিছু পৌরাণিক সাহিত্যে বর্ণিত হয়েছে। অর্থাৎ ব্রাহ্মণ্য ধর্মে ততদিনে নাগদের আত্তীকরণ সম্পূর্ণ হয়েছে।
বৈদিক সাহিত্যের বাইরেও বহু দেবদেবী চিরকালই ভারতবর্ষে ছিল। হিন্দুধর্মে শেষ অবধি এই বেদবহির্ভূত দেবদেবীরাই প্রাধান্য পেয়েছে বৈদিক দেবতাদের পিছনে ফেলে, কখনও বা এই দুই ধারার দেবতারা মিশে গেছে একে অপরের সঙ্গে। নাগ, যক্ষ, আর লৌকিক দেবদেবীরা ছিল এই দেবলোকের অঙ্গ, আর তাদের উপাসনা বৌদ্ধ-জৈন-হিন্দু ধর্ম নির্বিশেষে ব্যাপ্তিলাভ করেছিল।
বৌদ্ধ, জৈন, ও বৈষ্ণব ধর্মের পর শৈব ধর্মেও নাগের প্রবেশ ঘটে – প্রথমে শিবের ত্রিশূলের অঙ্গসজ্জারূপে নাগ, আরো পরে শিবের অঙ্গসজ্জারূপে এবং শিবলিঙ্গের আচ্ছাদন হিসেবে নাগ। মহিষমর্দিনীর মূর্তিরূপে প্রথমদিকে পাশ বলে একটা অস্ত্র দেখা যেত – অর্থাৎ দড়ির ফাঁস। পরে এটি নাগপাশের রূপ নেয়। গুপ্তযুগ থেকে মনসা এবং নাগিনী মূর্তির প্রচলনও বাড়ে। নাগিনী মূর্তির নিম্নাঙ্গে নাগরূপ, ঊর্ধ্বাঙ্গ মানবীরূপ, আর ক্ষেত্রবিশেষে মাথায় বহুমস্তক নাগের ফণাও থাকত। বাংলায় পালযুগে মনসার প্রস্তরমূর্তির ব্যাপক প্রচলন দেখা যায়। এই মূর্তিগুলিতে তিনি পদ্মাসীনা, মাথায় সপ্তমস্তক নাগের আচ্ছাদন, বাম হাতে একটি সাপকে তিনি ধরে রেখেছেন সন্তানের মতো করে।
কুষাণপূর্বযুগের বৌদ্ধ শিল্পে মুচলিন্দ নাগ যতটা গুরুত্ব পেয়েছিল পরের দিকে সেটা আর চোখে পড়ে না। অজন্তা, ইলোরা, পালযুগের পুঁথি – কোথাওই মুচলিন্দের ছত্রছায়ায় ধ্যানী বুদ্ধমূর্তি তেমনভাবে পাওয়া যায়নি। একটা সাম্ভাব্য কারণ হল পার্শ্বনাথের একই রকম মূর্তিরূপের সঙ্গে যেন বিভ্রম না হয় দর্শকদের চোখে, তাই শিল্পীরা সচেতনভাবে এই মূর্তিরূপটাকে এড়িয়ে গেছে। কম্বোডিয়াতে শিল্পীদের এই চিন্তা ছিল না। আবার, কম্বোডিয়ায় বাসুকি আর সমুদ্র মন্থনের কাহিনি যে বহুল পরিমাণে দর্শিত হয়, প্রাচীন ভারতীয় শিল্পে তা প্রায় দেখাই যায় না। এর থেকে বোঝা যায় মুচলিন্দ ও বাসুকির যে জনপ্রিয়তা কম্বোডিয়ায় দেখা যায় সেটা অনেকটাই কম্বোডিয়ার শিল্পরীতির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। অর্থাৎ নাগ উপাসনার একটা নিজস্ব ধারা কম্বোডিয়ায় দূর অতীতে ছিল, যার সঙ্গে বৌদ্ধ ও হিন্দু কিংবদন্তির মিশ্রণ হয়েছে। কম্বোডিয়ায় পঞ্চম থেকে চতুর্দশ শতাব্দী অবধি অন্তত তিনটি ভিন্ন ভিন্ন রাজবংশ রাজত্ব করেছিল যাদেরকে একত্রে বর্মণ রাজবংশ বলা হয়। বাস্তবে এই রাজবংশগুলি সবকটি একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত নাও হতে পারে। তবে প্রত্যেকটি রাজবংশই তাদের উৎসকাহিনিকে যুক্ত করেছিল দূর অতীতের এক ব্রাহ্মণ ও নাগকন্যার বিবাহবন্ধনের সঙ্গে। বিভিন্ন শিলালিপি থেকে এই কিংবদন্তি যুগলের কথা জানা যায়। ভারতীয় ব্রাহ্মণ কৌণ্ডিন্য আর কম্বোডিয়ার নাগজাতির রানি সোমা। এই নাগজাতি মহাভারত বা বৌদ্ধ সাহিত্যের ভারতীয় নাগজাতি নয়। নাগকন্যা সোমা কিন্তু স্বয়ং একজন শাসনকর্ত্রী ছিলেন, যিনি বহিরাগত ব্রাহ্মণ কৌণ্ডিন্যকে নিজে পছন্দ করে বিয়ে করেছিলেন।
ভারতে যেরকম প্রতিটা রাজবংশ নিজেদেরকে রঘুবংশ, যদুবংশ বা চন্দ্রবংশ – যে কোনো একটির উত্তরসূরি হিসেবে দেখাতো, সেই অনুযায়ী পুরাণগাথা লেখাতো, কম্বোডিয়াতেও রাজবংশগুলো এই কৌণ্ডিন্য ও নাগকন্যা সোমার সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করেছিল। এর থেকে বোঝা যায় নাগ কেন গুরুত্বপূর্ণ ওদেশের সংস্কৃতিতে। বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য ধর্মের মধ্যেই তারা অতীতের নাগ উপাসনার নিজস্ব সংস্কৃতিকে ধরে রেখেছে।
কম্বোডিয়ায় নাগজাতি আত্তীকরণ করেছিল ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতিকে। ভারতেও ব্রাহ্মণ্য ধর্ম গ্ৰহণ করেছিল নাগপূজার লোকাচারকে। প্রথমটার প্রতিফলন দেখা যায় কৌণ্ডিন্য-সোমার বিবাহের কিংবদন্তিতে, আর দ্বিতীয়টার প্রমাণ পাওয়া যায় বিষ্ণু আর শেষনাগের একীকরণের মধ্যে।
চিত্র পরিচিতি
শীর্ষক চিত্র – আঙ্কোরের সেতুতে সমুদ্রমন্থন – বাসুকি এবং অসুরেরা। (ছবি: লেখকের তোলা)
চিত্র-১ সমুদ্রমন্থনের দৃশ্য – আঙ্কোরওয়াট বিষ্ণুমন্দির (ছবি: লেখকের তোলা)
চিত্র-২ মুচলিন্দ নাগের সপ্তমস্তকের ছত্রছায়ায় বুদ্ধ, কম্বোডিয়ার আঙ্কোরওয়াট মন্দির। (ছবি: লেখকের তোলা)
চিত্র-৩ রামগ্রাম স্তূপকে ঘিরে অশোক ও নাগরাজের সাক্ষাৎ – সাঁচীর তোরণ। (ছবি: wikimedia commons)
তথ্যসূত্র
১. Coedès, George. The Indianized States of Southeast Asia. Edited by Walter F. Vella. Translated by Susan Brown Cowing. Honolulu: University of Hawaii Press, 1968.
২. Vogel, J. Ph. Indian Serpent-Lore: Or the Nāgas in Hindu Legend and Art. London: Arthur Probsthain, 1926.