সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

সিন্ধু সভ্যতার বাদ্যযন্ত্র

সিন্ধু সভ্যতার বাদ্যযন্ত্র

দীপান ভট্টাচার্য

জানুয়ারি ৩, ২০২৬ ১৪৫ 1

মানুষ ঠিক কবে থেকে সঙ্গীত আয়ত্ত করেছিল, তার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই। প্রথম সঙ্গীত ছিল মানুষের কণ্ঠস্বর আর আশেপাশে থাকা বস্তুর উপর ঠুকে তোলা আওয়াজ বা ছন্দ; স্বাভাবিকভাবেই তার কোনো বস্তুগত প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবুও গবেষণায় মোটামুটি পরিষ্কার যে, প্রাগৈতিহাসিক মানুষের দৈনন্দিন জীবনেই সঙ্গীতের বীজ তৈরি হয়েছিল। প্রকৃতির বিভিন্ন শব্দ ও পশুপাখিদের আওয়াজ অনুসারে সুর তৈরি করে তা গুনগুন করা, তালি বাজানো, পা ফেলা, পাথর বা কাঠের টুকরো ঘষে বা ঠুকে শব্দ বের করা—এসবই ছিল যোগাযোগ, শিকার, উৎসব আর গোষ্ঠীর ঐক্য রক্ষার এক স্বাভাবিক উপায়। শব্দের মধ্যেই প্রাচীন মানুষ নিরাপত্তা, উত্তেজনা বা সংহতির অনুভূতি তৈরি করত। এর ফলে সঙ্গীত কেবল বিনোদন ছিল না, বরং সামাজিক ও মানসিক দিক থেকে বেঁচে থাকার একটা হাতিয়ার।

কণ্ঠ আর প্রাকৃতিক বস্তুর উপরে ঠুকে তৈরি ধ্বনির পরেই আসে বাদ্যযন্ত্রের চিন্তা। যদিও প্রথম দিককার যন্ত্রগুলো ছিল সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক। জার্মানির শোয়াবিয়ান আল্পস অঞ্চলে পাওয়া হাড়ের বাঁশিগুলো প্রায় চল্লিশ হাজার বছরের পুরানো। পাখির ডানার হাড় বা ম্যামথের চোয়ালের ফাঁপা হাড় ছিদ্র করে তৈরি এই বাঁশিগুলো প্রমাণ করে যে সেই সময়েও মানুষ সুর তৈরির নির্দিষ্ট দক্ষতা অর্জন করেছিল। অনুষ্ঠানের সময়ে হাতের কাছে থাকা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক বস্তু আর এমন নির্দিষ্ট বাদ্যযন্ত্রের মধ্যবর্তী সময়ে নিশ্চয়ই থাকবে বিশেষ ধরনের পাথর বা ফাঁপা গাছের কাণ্ড যেগুলি আঘাত করলে আলাদা আলাদা শব্দ তৈরি করে। বাদ্যযন্ত্রের উৎপত্তির সঙ্গে সঙ্গে শুকনো লাউ, শামুকের খোল, কাঠি আর কঙ্কর দিয়ে তৈরি ঝুমঝুমির ব্যবহারও খুব প্রাচীন। তত্ত্বগতভাবে তারজাতীয় যন্ত্রের শুরুও হয় শিকারির তির–ধনুক থেকে, যার ছিলা টেনে ধরা হলে বিশেষ কম্পনধ্বনি তৈরি হত। হয়তো এর কম্পনধ্বনি দূরপাল্লার সংকেত হিসেবে ব্যবহৃত হত।

সভ্যতার উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে বাদ্যযন্ত্র আরও জটিল রূপ নেয়। মেসোপটেমিয়া, মিশর আর চীনে তিন হাজার সাধারণপূর্বাব্দের কাছাকাছি সময়ে বিভিন্ন ধরনের তারযন্ত্র, নানান বাঁশি আর ডঙ্কা তৈরি হতে শুরু করে। অর্থাৎ বাদ্যযন্ত্রের যাত্রা আদিমের সরলতা পেরিয়ে ধীরে ধীরে রীতিনীতিসমৃদ্ধ, নান্দনিক প্রকাশে পরিণত হয়। এখন ভারতীয় প্রেক্ষাপটে তাকালে ছবি আরও বিস্তৃত হয়। ভারতের আদি বাদ্যযন্ত্রের ধারাটি বহুমুখী এবং বহুস্তরীয়। লক্ষ্য করবেন যে আমি আদি শব্দটি ব্যবহার করেছি, আদিম নয়। ভারতভূমির আদি সভ্যতা হল সিন্ধু সভ্যতা কিন্তু এই সভ্যতা আগে উল্লিখিত অন্যান্য সভ্যতা থেকে অনেকটাই আলাদা। এই সভ্যতা বোবা—সে কাজের জিনিস ছাড়া কিছুই আঁকা-লেখা করে রাখেনি আর সবচেয়ে বড়ো বিষয় হল, যেটুকু লেখা আমরা পেয়েছি তার রহস্যও ভেদ করতে পারিনি কারণ অন্যান্য সভ্যতার মতো এর লিপি আজও পাঠ করা সম্ভব হয়নি৷ সুতরাং সঙ্গীত বা বাদ্যযন্ত্র নিয়ে তাঁদের বর্ণনা যদি কিছু থেকে থাকেও (যদিও আমার মনে হয় এমন সম্ভাবনা খুবই কম) তা আজও অধরা। বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে কাঠ, শিং, চামড়া বা প্রাকৃতিক তন্তু দিয়ে নির্মিত নিদর্শন কয়েক হাজার বছর পর পাওয়া অসম্ভব কারণ সেগুলি সবই পচনশীল পদার্থ। সব গলে পচে শেষ হয়ে গেছে।

যেহেতু এই সংক্রান্ত কোনো নিদর্শন প্রায় পাওয়া যায় না বললেই হয় তাই সিন্ধু সভ্যতার সবচেয়ে কম আলোচিত বিষয় হল সঙ্গীত৷ এক্ষেত্রে তা বাদ্যযন্ত্র, কারণ গানের বিষয়ে তো জানা সম্ভব নয়, আন্দাজ করতে পারি। আগেই বলেছি যে বাদ্যযন্ত্রও পাওয়া মুস্কিল কারণ প্রাকৃতিক বস্তুর তৈরি যন্ত্র তো আর হাজার হাজার বছর টিকবে না। ধাতু ছিল মহার্ঘ আর এমন আর্দ্র আবহাওয়ায় ধাতুর ক্ষয় হয় অস্বাভাবিক। যদি কিছু বা টিকে যায় সেগুলি যুগে যুগে মানুষ সংগ্রহ করে পুনর্ব্যবহার করেছে।

এখন ভরসা ছবি। কেউ কেউ আন্দাজ করে কিছু বাদ্যযন্ত্রের অস্তিত্ব ভেবে বানিয়েছেন কিন্তু তার কোনো সঠিক প্রমাণ নেই। তবে সিন্ধু সভ্যতার অনেক পরবর্তী কালে রচিত ভরতের নাট্যশাস্ত্রে (প্রায় ২০০ সাধারণপূর্বাব্দ থেকে ২০০ সাধারণ অব্দ) বাদ্যযন্ত্রকে মোটামুটি চার ভাগে ভাগ করা হয়েছে—তৎ‌বাদ্য (তারজাতীয়), অবনদ্ধবাদ্য (চর্ম আবৃত ডঙ্কা জাতীয়), ঘনবাদ্য (যেখানে ধাতু বা কাঠে আঘাত করে শব্দ উৎপন্ন করা হয়) ও সুষিরবাদ্য (বায়ুস্বর যন্ত্র যেখানে বায়ু প্রবাহিত হয়ে শব্দ উৎপন্ন করে)। আন্দাজ করা যায় যে সিন্ধু সভ্যতায় এই চার প্রাথমিক ধরনের বাদ্যযন্ত্রের অস্তিত্ব ছিল।

সিন্ধু সভ্যতার সিল ইত্যাদিতে জীবজন্তু ও সম্ভবত কিছু আচার ছাড়া আর কিছু বর্ণিত নেই। সিন্ধু সভ্যতার কয়েক’শ সিলের মধ্যে যেন দুটি সিলে বাদ্যযন্ত্রের হদিশ আছে। আর অসংখ্য প্রত্নবস্তুর মাঝে আমরা কিছু এমন নিদর্শন পাই যেগুলিকে বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে আনা যায় যদিও এগুলির সঙ্গে শিশুর খেলনারও মিল আছে।

চিত্র ১ – হরপ্পার সিলমোহরে লম্বা ঢোলক বাদনরত শিল্পী আর বাঘ

হরপ্পার সিলমোহর

হরপ্পা থেকে পাওয়া গিয়েছে একটি অদ্ভুত সিল (যদিও এটা sealing বা মোহর)। লম্বাটে সিলের দুই দিকেই ছবি আছে। এক দিকে পাঁচটি স্বস্তিকা (হ্যাঁ, সিন্ধু সভ্যতায় স্বস্তিকার প্রচলন ছিল) আর কয়েকটি সিন্ধু চিহ্ন বা লিপির অক্ষর বলতে পারেন যা আজও পড়া সম্ভব হয়নি। স্বস্তিকাগুলি কিছু বামমুখী ও কিছু দক্ষিণমুখী। মোহরের বিপরীত পৃষ্ঠেও কয়েকটি লিপি-চিহ্নের সঙ্গে রয়েছে একজন ঢোল বাদকের ছবি ও পাশে তাকে দেখতে থাকা একটি বাঘের ছবি। ঢোলটি ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের আদিবাসীদের মধ্যে প্রচলিত লম্বা ঢোলকের মতো একটি বাদ্যযন্ত্র। আমি গারো পাহাড়ে থাকার সময়ে ওদের ওয়াঙ্গলা উৎসবে সারি সারি এমন ঢোলক বাজতে দেখেছি। ঢোলক বাদকের পাশে বাঘটা তাকে যেন অবাক ভাবে দেখছে—হয়তো বোঝানো হচ্ছে, বাজনা দিয়ে বনের পশুকেও জয় করা যায়। বুদ্ধদেব গুহ-র কথায়, বাজা তোরা রাজা যায়।

চিত্র ২ – গারোদের ওয়াঙ্গলা উৎসবে লম্বা ঢোলকের ব্যবহার

এখানে আরেকটি বিষয় বেশ গুরুত্বপূর্ণ, তা হল ঢোলক বাদকের মাথাটি। মূর্তির ঘাড়ের উপরে, দুই পাশেই মুখ চোখের আদল করা আছে, তাই এই মূর্তিটিকে দ্বিমুখী মূর্তি বলা হয়ে থাকে। এই শিল্প যে কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক অনুষ্ঠানের ছবি তাই নিয়ে দ্বিমতো নেই; এর মধ্যে ব্যবহৃত স্বস্তিকা চিহ্ন এবং ঢোলক তাই ইঙ্গিত করছে। এখানে দ্বিমুখী মূর্তিটিকে আমার বহুমুখী কোনো দেবতা বলে মনে হয় না। মনে হয়, মাথা দুলিয়ে ঢোলক বাদকের চিত্রকল্পকে আঁকা হয়েছে। আপনারা কীর্তন বা কোনো অনুষ্ঠানে ঢোলক বা খোল বাদকের প্রবলভাবে শির আন্দোলন হয়তো দেখেছেন। গান বা বাজনার বেগের সঙ্গে এমন আবেগ আসা স্বাভাবিক এবং তা ঢোলক বাদকের মাথায় সঞ্চারিত হয়। এখানে সাড়ে চার হাজার বছর আগের শিল্পী হয়তো সেই চিত্রকল্পটাকে ফুটিয়ে তুলেছেন যে বাজনার আবেগের সঙ্গে ঢোলক বাদকের মাথা একবার বাম দিকে ঘুরছে আর ডান দিকে ঘুরছে। এই অসামান্য গতিটা এক ছবিতে দেখাবার জন্য তিনি একটি মানুষের দুটি মাথা দুই পাশে বানিয়ে সহজে বুঝিয়ে দিয়েছেন।

পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে আমরা দেখেছি যে প্রথম তৈরি হওয়া বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে বাঁশি ছিল অন্যতম। সিন্ধু সভ্যতার আগের পর্যায়ে অর্থাৎ নব্যপ্রস্তর যুগে ভারত ভূখণ্ডে এমন ফাঁপা হাড় দিয়ে কোনো বাদ্যযন্ত্র যদিও বা তৈরি হয়ে থাকে তার কোনো নিদর্শন এখনও অবধি পাওয়া যায়নি।

বাঁশি

সিন্ধু সভ্যতায় বাঁশির ব্যবহার যে ছিল তার প্রমাণ তাদের বায়ু প্রক্ষেপের মাধ্যমে ধ্বনি উৎপন্নের একাধিক বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহারে। বায়ু প্রক্ষেপের বাদ্যযন্ত্র সিন্ধু সভ্যতায় অনেক পাওয়া গেলেও তাদের পদমর্যাদা বাদ্যযন্ত্রের মতো কিনা তাই নিয়ে সন্দেহ আছে। সেগুলি থেকে স্বর বা ধ্বনি নির্গত হলেও আদতে সেগুলিকে হুইসল বলে। সেগুলিকে আজকের নিরিখে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা শিশুদের খেলনা বললেও তা নিছক শিশুদের খেলনা ছিল, নাকি আচার–অনুষ্ঠান বা সঙ্গীতের পরিবেশে ব্যবহার হত—এই নিয়ে ভাবা যেতে পারে। তবু শিল্পরীতির সূক্ষ্মতা এবং নির্মাণের নৈপুণ্য বিচার করলে কেবল খেলনার ধারণা যথেষ্ট নয়। সবচেয়ে প্রচলিত রূপ হল পাখি–আকৃতির হুইসিল বা পাখি-বাঁশি, যেগুলির গড়ন সাধারণত মুরগি বা হাঁসের মতো। এগুলি ছোটো পাদপীঠের উপর বসানো থাকত, ভেতরটা সম্পূর্ণ ফাঁপা। চানহুদারোর একটি নমুনার গায়ে মোটা লাল রেখায় পালকের নকশা আঁকা, ঠিক যেমন পাখির গায়ে থাকে। তবে বেশির ভাগ নিদর্শনই অলংকরণহীন কিংবা কালের প্রভাবে তার অলঙ্করণ হারিয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে গলায় লাল রঙের বৃত্ত দেখা যায় যা দেখতে এক ধরনের গলাবন্ধের মতো। কোনো কোনো ভাঙা নমুনা থেকে জানা যায় যে কখনও কখনও কাদা চেপে আলাদা ফিতে জুড়ে সেই কলারটি বানানো হত। কিছু পাখির মূর্তিতে ডানা বা পা আদৌ খোদাই করা হয়নি। কখনও দুই পা আলাদা করে পাদপীঠে বসানো হত, আবার কখনও কোনো পা বানানো হয়নি। এই ধরনের পাখি-বাঁশির উচ্চতা গড়ে প্রায় ২.২৯ ইঞ্চি আর এর লেজের ঠিক আগে পিঠে প্রায় ০.২ ইঞ্চি ব্যাসের একটি ছিদ্র থাকে যেখানে ফুঁ দিলেই তীক্ষ্ণ শব্দ বের হয়। সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হল যে ফাঁপা দেহের ভেতরে বায়ুস্রোত ঘুরে শব্দ সৃষ্টি করার নির্দিষ্ট কাঠামো থাকার কারণে এগুলিকে প্রকৃত কার্যকর হুইসিল হিসেবেই চিহ্নিত করা যায়। এমন পাখি–আকৃতির মাটির হুইসিল আজও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে তৈরি হয়, যা এক দীর্ঘস্থায়ী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ইঙ্গিত বহন করে। এই পাখি-বাঁশির মধ্যভাগ বা শরীরের অংশ স্ফীত আর ফাঁপা। ছিদ্রের মধ্যে দিয়ে যদি এর ভিতরে কিছু জল ঢুকিয়ে পাখির অভ্যন্তরে আংশিক পূর্ণ করে দেওয়া হয় আর তারপর তাতে ফুঁ দিলে অনেক ধরনের আওয়াজ বার করা সম্ভব। বায়ুস্রোতের বিচিত্র প্রতিফলন ও কম্পনের কারণে অনেক সময় এক ধরনের কম্পমান, কাঁপা সুর তৈরি হয়, যা আধুনিক নৃগোষ্ঠীগত বাদ্যযন্ত্রবিদ্যায় warbling whistle হিসেবে পরিচিত। প্রসঙ্গত বলা যায় যে আজও এমন ধরনের পাখি-বাঁশি তৈরি হয়ে থাকে এবং তার ভিতরে জল পুরে বাজানো হয়।

চিত্র ৩ – মহেঞ্জোদারো থেকে পাওয়া পাখি-বাঁশি

হুইসিলের দ্বিতীয় রূপটি সম্পূর্ণ ভিন্ন যা একটি ছোটো, ফাঁপা পাত্র–আকৃতির, যার তলা গোল বা হালকা ছুঁচলো, মুখের ব্যাস ০.১৯ থেকে ০.৪৬ ইঞ্চির মধ্যে। মুখের ঠিক পাশে বা নিচে থাকে আরও একটি ছোটো ছিদ্র। পরীক্ষায় দেখা যায় যে বড়ো মুখে ফুঁ দেওয়ার সময় ছোটো ছিদ্রটি আঙুলে ঢেকে–খুলে ঠিক প্রথাগত বাঁশির মতো বিভিন্ন সুর সৃষ্টি করা যায়। এই ধরনের ভাণ্ড-বাঁশির উচ্চতা গড়ে মাত্র ১.৭ ইঞ্চি, আর এগুলি বেশির ভাগই অলঙ্করণহীন’ যদিও কয়েকটি রঙ্গিন পাওয়া গেছে যাদের পৃষ্ঠ লাল রেখা দিয়ে চিত্রিত।

সবচেয়ে অবাক করা কাণ্ড হল যে এই ধরনের ভাণ্ড-বাঁশি আজও সিন্ধু সভ্যতার ক্ষেত্রে বিদ্যমান, আজকের সিন্ধি বাদ্যযন্ত্র বোরিণ্ডো (Borindo)-র সঙ্গে ভাণ্ড-বাঁশি ঘনিষ্ঠ সাদৃশ্য বহন করে। বোরিণ্ডো একটি মাটির তৈরি গোলাকার ভাণ্ডের মতো ফাঁপা বায়ুবাদক যন্ত্র, যা এখনও সিন্ধু ও বালুচিস্তানের গ্রামীণ অঞ্চলে বাজানো হয়। এগুলি সাধারণত একাধিক ছিদ্রবিশিষ্ট হয় যার মূল ছিদ্রে ফুঁ দিয়ে অন্যান্য ছিদ্রগুলি আঙুল দিয়ে খোলা-বন্ধ করে সুর তোলা যায়। খুব সম্ভব যে সিন্ধি অঞ্চলের এই বাদ্যযন্ত্রের ঐতিহ্য প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতার সময়কাল থেকেই ধারাবাহিকভাবে টিকে আছে, যদিও সরাসরি প্রমাণ সীমিত। তবু আকার, নির্মাণপ্রণালী এবং কাজের নীতির মিল বিচার করলে প্রাচীন হুইসিলগুলিকে এই দীর্ঘ সঙ্গীত–ঐতিহ্যের প্রাথমিক স্তর হিসেবে ভাবা অযৌক্তিক নয়। সব মিলিয়ে পাখি–বাঁশি এবং ভাণ্ড–বাঁশি, এই দুই রকম হুইসিলই হরপ্পা শিল্পের নৈপুণ্য, খেলনার সম্ভাব্য ব্যবহার এবং ধ্বনি–উৎপাদক উপকরণ হিসেবে বাদ্যযন্ত্রসুলভ বৈশিষ্ট্যের অনন্য সাক্ষ্য হয়ে আছে।

চিত্র ৪ – ভাণ্ড-বাঁশি

ঝুমঝুমি

সিন্ধু সভ্যতার আরেকটি বহুল প্রচলিত খেলনা ছিল ঝুমঝুমি। বিভিন্ন প্রত্নস্থল থেকে এদের অসংখ্য নিদর্শন পাওয়া গেছে, বিশেষ করে মহেঞ্জোদারোর ২ নম্বর মাউন্ডের নিচের স্তর থেকে উদ্ধার হওয়া ঝুমঝুমিগুলি সবচেয়ে পরিচিত। গোলাকার গঠন ও মসৃণ বাইরের কারণে এগুলি উপর থেকে নিচে গড়িয়ে পড়েছিল, সে সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। পোড়ামাটির তৈরি এই ঝুমঝুমিগুলির বেশির ভাগই ভেতরে সম্পূর্ণ ফাঁপা হলেও আশ্চর্যজনকভাবে অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেছে। মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পার ভাঙা নমুনাগুলি পরীক্ষা করে জানা যায়, এর নির্মাণপ্রক্রিয়া ছিল বেশ জটিল। প্রথমে খড়ের মতো দহনযোগ্য উপাদান দিয়ে একটি গোলক বানিয়ে তার ভিতরে দু’একটি ছোটো পোড়ামাটির দানা রাখা হত, তারপর তার উপর সমান করে কাদামাটির পরত চাপিয়ে পুরো গোলকটিকে ঢেকে দেওয়া হত। পোড়ানোর সময় ভেতরের দহনযোগ্য অংশ সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে যেত, কেবল বাইরের কাদামাটির খোলা আবরণ শক্ত হয়ে টিকে থাকত। ভেতরে রেখে দেওয়া সেই কাদার দানাগুলোই ঝুমঝুমি নড়ালে ঝনঝন শব্দ তুলত।

এই ছোট্ট খেলনাগুলির সাজসজ্জায় যে কারিগরের বিশেষ মনোযোগ ছিল, তা নকশাগুলির বৈচিত্র্য দেখলেই বোঝা যায়। অনেক ঝুমঝুমিতে সরাসরি গায়ের উপরেই রঙ করা হয়েছিল। আকারে এগুলি ছোটো—ব্যাস সাধারণত ০.৭ ইঞ্চি থেকে ২.৫ ইঞ্চির মধ্যে, গড়ে প্রায় ১.৮ ইঞ্চি। চানহুদারো থেকে পাওয়া একটি ঝুমঝুমিতে অলংকরণের যে বৈচিত্র্য দেখা যায়, তা সত্যিই লক্ষ্যণীয়। সবচেয়ে প্রচলিত নকশা হল একটি বড়ো কেন্দ্রবিন্দুকে ঘিরে তিন, চার বা পাঁচটি বৃত্ত আঁকা, আর তাদের মাঝে থাকে জোড়া–বাঁকা সমান্তরাল রেখা। আবার একটি নমুনায় দেখা যায় তির্যক দুই রেখায় পুরো গোলককে চার ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে।

চিত্র ৫ – ঝুমঝুমি

মন্দিরা

এবারে আসব পারকাশন বাদ্যযন্ত্রের আলোচনায় আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে মন্দিরা নিয়ে আলোচনা। মন্দিরা মূলত এক ধরনের বাদ্যযন্ত্র। ধাতু বা ব্রোঞ্জের তৈরি দুই বা তার বেশি পাতলা চাকতি হাতের আঙুলে ধরে একটির সঙ্গে আরেকটি ঠোকা হলে ঝনঝন শব্দ তৈরি হয়। কীর্তনের একক গায়ক সাধারণত মন্দিরা নিয়েই গেয়ে থাকেন। বিশ্বের নানা প্রাচীন সভ্যতায় এই ধরনের ছোটো বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। মেসোপটেমিয়া, অ্যাসিরিয়া, মিশর, গ্রিস এবং রোম – সব জায়গাতেই ধর্মীয় অনুষ্ঠান, সামরিক পরিবেশ বা আচার-অনুষ্ঠানে এই বাদ্যযন্ত্র ব্যবহৃত হত। ভারতে মন্দিরা বহু কাল ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং আজও ভজন, কীর্তন, নৃত্য ও লোকসঙ্গীতে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। মধ্যপ্রাচ্য, তুরস্ক এবং মধ্য এশিয়ার নানা সাংস্কৃতিক পরিসরেও মন্দিরার প্রাচীন রূপ টিকে আছে। সব মিলিয়ে দেখা যায়, মন্দিরা শুধু ছন্দ তোলার যন্ত্র নয়, সমাজের আচার-অনুষ্ঠান, উৎসব ও সমাবেশেরও অবিচ্ছেদ্য অংশ। সময়ের সঙ্গে এর আকার, ধাতুর মিশ্রণ ও বাজানোর কৌশল বদলেছে, কিন্তু মূল চরিত্রটি বজায় রয়েছে।

চিত্র ৬ – মহেঞ্জোদারো থেকে পাওয়া মন্দিরা

সিন্ধু সভ্যতায় মন্দিরার মতো বস্তুর হদিশ পাওয়া গিয়েছিল একদম প্রথম দিকের খননেই। মোহেঞ্জোদারো, হরপ্পা ও চানহুদারোতে পাওয়া কয়েকটি গোলাকার ধাতব চাকতি বহুদিন ধরে সম্ভাব্য বাদ্যযন্ত্র হিসেবে আলোচিত হয়ে আসছে। এগুলোর কেন্দ্রে ছিদ্র থাকে এবং আকারে তা পরবর্তী যুগের মন্দিরার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। তবে একইসঙ্গে এক জোড়া এমন বস্তু পাওয়া না যাওয়ায় দীর্ঘদিন গবেষকেরা এগুলোকে সাধারণ ঢাকনা বা প্রয়োজনীয় কোনো পাত্রের অংশ বলে মনে করতেন। সম্প্রতি ওমানের দাহওয়া–৭ সাইটের আবিষ্কার পুরো আলোচনাকে নতুন দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে। সেখানে পাওয়া সাধারণ পূর্বাব্দের তৃতীয় সহস্রাব্দ কালের দুটি ছোটো ব্রোঞ্জের তৈরি মন্দিরা পাওয়া গেছে। এগুলোর আকার, কেন্দ্রে ভাঁজ করা অংশ এবং রাসায়নিক বিশ্লেষণ সবই দেখিয়েছে যে এগুলির উৎস সিন্ধু সভ্যতা। এই জোড়া মন্দিরাকে একটি ঘরের ভেতরে পাশাপাশি রেখে মাটির স্তর দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল, যা ঘরের ধর্মীয় বা আনুষ্ঠানিক ব্যবহারের ইঙ্গিত দেয়। আরও চিত্তাকর্ষক হল, এগুলোর ধাতু স্থানীয় ছিল না, দূরবর্তী খনি থেকে আনা হয়েছিল। এতে বোঝা যায় যে সিন্ধু অঞ্চল ও ওমানের মধ্যে ধাতু এবং বাদ্যযন্ত্র সংক্রান্ত কারুশিল্পের সক্রিয় বিনিময় ছিল।

চিত্র ৭ – ওমান থেকে পাওয়া সিন্ধু সভ্যতার মন্দিরা

ওমানের এই আবিষ্কারের ভিত্তিতে আমরা এখন সিন্ধু সভ্যতার অন্যান্য প্রত্নস্থলে পাওয়া সেই গোলাকার চাকতিগুলোকেও নতুন দৃষ্টিতে দেখতে পারছি। যেগুলো আগে শুধু ঢাকনা বা পাত্রের অংশ হিসেবে ধরা হত, এখন সেগুলোকে মন্দিরা হিসেবে চিহ্নিত করার ভিত্তি অনেক বেশি শক্ত। এটি শুধু প্রত্নতত্ত্বের দৃষ্টিতে নয়, সাংস্কৃতিক ইতিহাসের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর অর্থ দাঁড়ায়, সিন্ধু সমাজে সঙ্গীতচর্চা ছিল এবং তাতে ছোটো মন্দিরার প্রচলন ছিল। আরও বড়ো কথা, ওমানের দাহওয়া–৭ প্রত্নক্ষেত্র বা প্রাচীন দিলমুন অঞ্চলে পাওয়া মন্দিরার প্রমাণ দেখায় যে ভারতীয় উপমহাদেশের এই ছোটো বাদ্যযন্ত্রের মিঠে সুর সাগর পাড়ি দিয়ে বিদেশেও পৌঁছে গিয়েছিল। অর্থাৎ সিন্ধু সমাজের সঙ্গীতধারার একটা অংশ বিস্তৃত ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ভেতর চলমান ছিল, যেখানে বাণিজ্য, ধাতুপ্রক্রিয়া ও কারুশিল্পের সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গীতযন্ত্রও আদানপ্রদান হত।

সিন্ধু সভ্যতায় মাত্র এই কয়েকটি বাদ্যযন্ত্রের পাথুরে প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়া অনেকে বিভিন্ন প্রতীক বা লিপির চিহ্ন দেখে আরও বিভিন্ন ধরনের harp, lyre ইত্যাদির অস্তিত্বের বিষয়ে আন্দাজ করে থাকেন কিন্তু সেগুলির কোনো নিদর্শন বা খোদাই করা ছবি পাওয়া যায়নি। সেগুলি নিয়ে আবার কখনও বিশদে ব্যাখ্যা করা যাবে।

তথ্যসূত্র

  1. Douglas, Khaled A., Nasser S. Al-Jahwari, Michel de Vreeze, Mohammed Hesein, Lloyd Weeks, and Bernhard Pracejus. “Bronze Age Cymbals from Dahwa: Indus Musical Traditions in Oman.” Antiquity 99, no. 404 (2025): 375–391.
  2. Mackay, Ernest J. H. Chanhu-daro Excavations, 1935–36. New Haven: American Oriental Society, 1943.
  3. Mackay, Ernest J. H. Further Excavations at Mohenjo-daro: Being an Official Account of Archaeological Excavations at Mohenjo-daro Carried Out by the Government of India Between the Years 1927 and 1931. Delhi: Manager of Publications, 1938.
  4. Marshall, John. Mohenjo-daro and the Indus Civilization. 3 vols. London: Arthur Probsthain, 1931.
  5. Parpola, Asko, B. M. Pande, and Petteri Koskikallio, eds. Corpus of Indus Seals and Inscriptions. Vol. 2: Collections in Pakistan. Helsinki: Suomalainen Tiedeakatemia, 1991.
  6. Sachs, Curt. The History of Musical Instruments. New York: W. W. Norton, 1940.
  7. Vats, M. S. Excavations at Harappa: Being an Account of Archaeological Excavations at Harappa Carried Out by the Government of India Between the Years 1920–21 and 1933–34. 2 vols. Delhi: Government of India Press, 1940.
নৈহাটির সান্দীপনি ভট্টাচার্য বেশি পরিচিত দীপান ভট্টাচার্য নামে। অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর, কর্মজীবনে শিখেছেন রুশ ভাষাও। ভারত সরকারের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক ছিলেন, স্বেচ্ছাবসর নিয়ে এখন এক কর্পোরেট সংস্থার গ্রুপ ডিরেক্টর। অনেক শখের মধ্যে একটি শখ হল ফসিল সংগ্রহ করা।

মন্তব্য তালিকা - “সিন্ধু সভ্যতার বাদ্যযন্ত্র”

  1. ঐতিহাসিক জর্জ থম্পসনের মতে সঙ্গীতের জন্ম শ্রম থেকে।কাজ করতে করতে তার সঙ্গে ছন্দে ছন্দে গান আমরা আজও দেখতে পাই।
    পোড়া মাটির পাখি আকারের বাঁশি(হুইসল)এখনো সাঁওতালদের কাছে দেখা যায়।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।