কাঁঠাল কথা
কাঁঠাল—ঢাউস একটি ফল, সারা গায়ে তার কাঁটা, তেমনি তার আঠা। বাঙালি বড়োই রসিক, কাঁঠালের আঠাকে তুলনা করেছে পীরিতির সঙ্গে। পীরিতি কাঁঠালের আঠা… সেই কাঁঠাল বাংলাদেশের জাতীয় ফল। ছোটবেলায় মাথায় ঘুরতো একটি প্রশ্ন—জাতীয় ফল কাঁঠাল কেন? এর উত্তর পণ্ডিতমহল নিজের মতো করে বুঝিয়েছেন, সর্বজনীন উত্তর পাইনি। তবে নানা জনের মতামত শুনে যা উপলব্ধি করেছি তা হল, কাঁঠালের ব্যাপ্তি সমস্ত বাংলাদেশ জুড়ে, সহজলভ্য ফলটি সর্বত্র বিদ্যমান এবং এর সার্বিক ব্যবহার—মানে কাঁচাও খাওয়া যায়, পাকলে তো বটেই৷ কাঁঠালের বীজসমেত সবটুকু অংশই কাজে লাগে। এর পাশাপাশি দেশের বৃহৎ অংশ, যাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বেশি নয়, গ্রীষ্মকালে তাদের সারা দিনের খাদ্য চাহিদার অনেক অংশ কাঁঠাল খেয়ে পূরণ করা সম্ভব। কাঁঠালের মধুময় রস বাঙালিমাত্রই প্রিয়। এটাও ভুললে চলবে না, কাঁঠাল কিন্তু পৃথিবীর একক বৃহত্তম ফল!
১
গ্রীষ্মের শুরুতেই এ বছর যে গরম পড়েছে, কাঁঠালের কথা মনে পড়ছে—এই তো বছর ঘুরে আবারো এসে গেল কাঁঠালের মরসুম। আমার মতো আমপ্রেমী আমজনতার কাছে কাঁঠাল একটি গুরুপাক খাবার। এটা আমার কথা নয়, সেন রাজকবি উমাপতিধর স্বয়ং বলেছেন—
পৃথুত্বাৎ সৌরভ্যান্ মধুরতরভাবাচ্চ পতিতৈঃ
ক্ষুধাতপ্তৈ কুক্ষিম্ভরিভিরিহ সেবা তব কৃতা।
তদাত্বব্যামুগ্ধৈরনুদিবসমস্বাস্থ্যজননী
ন দৃষ্টা তে হস্মাভিঃ পনস পরিণামে বিরসতা।
বড়ো আকার ব’লে, সুগন্ধ ব’লে, অত্যন্ত সুমিষ্ট ব’লে, ক্ষুধাপীড়িত লোকেরা ছুটে এসে পেট ভরাবার জন্যে এই দেশে তোমার সেবা করেছিল। তারপর থেকে, হে কাঁঠাল, অত্যন্ত বোকা আমরা দিনের পর দিনেও তোমার অস্বাস্থ্যকর পরিপাক-দুঃখ লক্ষ্য করিনি।
আরও কয়েকশ বছর পিছিয়ে গেলে দেখবেন, সেখানেও কাঁঠালের উৎপাত। হিউয়েন সাং পুণ্ড্রতে পনস (কাঁঠাল) ফলের প্রাচুর্যের কথা বলেছেন। পুণ্ড্র একটি প্রাচীন জনপদ, যা বগুড়া, রাজশাহী, রংপুর এবং দিনাজপুর জেলার বিভিন্ন অঞ্চলকে নিয়ে গঠিত ছিল৷ এই ফলটি নাকি গাছের গোড়া থেকে আগা অবধি ফলে৷ হিউয়েন সাং ফলটি প্রচুর পরিমাণে ফলতে দেখেছেন। এখনও পুণ্ড্র-এর সবখানে কাঁঠাল গাছ চোখে পড়ে, ফলও ধরে তাজ্জব রকমের বেশি। বৌদ্ধ জাতকে আম, গোলাপজাম, ডুমুর প্রভৃতি ফলের সঙ্গে পনস (কাঁঠাল) উপস্থিত রয়েছে দেখতে পাই। পাল আমলেও কাঁঠাল তার আঠা লাগিয়ে আমাদের পূর্বজদের সঙ্গে এঁটে ছিল। সোমপুর মহাবিহারের অজস্র টেরাকোটার মধ্যে দুটি টেরাকোটায় রয়েছে কাঁঠালের উপস্থিতি। একটি টেরাকোটায় একটি বানর বা হনুমান কাঁঠাল ভেঙে খাচ্ছে। আরেকটিতে একটি বানর/হনুমান কাঁঠাল কাঁধে পলায়নরত।

কাঁঠাল কাঁধে পলায়নরত বানর/হনুমান (৮-৯ শতাব্দী), পাহাড়পুর
চরক সংহিতায় যে ছাব্বিশটি ফল থেকে ফলাসব তৈরি করা যায় বলে উল্লেখ করা হয়েছে, কাঁঠাল তার মধ্যে অন্যতম। আবার টক ফলের পাশাপাশি কাঁঠাল সহযোগে দুধ খেতে নিষেধ করা হয়েছে।
২
মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যেও কাঁঠাল উপস্থিত; বিশেষত বাঙালির রসনা বিলাসে সুমিষ্ট পাকা কাঁঠাল, কাঁচা কাঁঠাল ও এর বীজের সরব উপস্থিতি বিদ্যমান। চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে আমরা দেখতে পাই, ধনপতি সওদাগর সিংহলরাজের জন্য ভেট নিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর উপহারসামগ্রীর মধ্যে রয়েছে পনস বা কাঁঠাল।
আনন্দিত সদাগর. ভেটিব সিংহলেশ্বর।
ভেটঘাট করিল জোজনা।
কলা নিল মর্তমান মজা গুয়া পাকা পান।
আম্র পনস নারিকেল।
একটি মজার বিষয় হল, কৃত্তিবাসী রামায়ণে রামচন্দ্রের পনস নামের একজন সেনাপতির নাম পাওয়া যায়। লঙ্কাকাণ্ডে রামচন্দ্রের অভিষেক অনুষ্ঠানে আমরা পাই—
ঋষভ কুমুদ দেখ পনস সম্পাতি।
নল নীল দেখ এই মুখ্য সেনাপতি।।
এখানে পনস নামটি কোন অর্থবাচক তা জানি না; তবে পনস সমৃদ্ধ দেশ (পুণ্ড্র) হতে আগত কোনো সেনাপতিকে বুঝানো হয়েছে কি? কেকয় দেশ থেকে আগত রাণীর নাম যদি কৈকেয়ী হতে পারে, পনসের দেশ থেকে আগত কারুর নাম পনস হতে পারে কি? আমার জিজ্ঞাসু মনের প্রশ্ন এটি।
খুল্লনার ভোজ আয়োজনেও রয়েছে কাঁঠাল, তা-ও আবার যাকে বলে ডেজার্ট হিসেবে, মানে ভোজনের শেষভাগে মিষ্টিমুখ করার জন্য।
দধি পিঠা খাইল সবে মধুর পায়স
রসাল পনস-কোষ রসালের রস।
বিপ্রদাস পিপিলাইয়ের মনসামঙ্গলে নৈবেদ্যের বর্ণনায় পাই—
নানা দিব্য রচনা নৈবিদ্য আদি যত।
অতিরম্য দশ ফল করিল মজুত।
কদলী কর্কট ফুটী নারিকেল জাম।
খাজুর পনস তাল পূগ পূর্ণ আম।
আবার চাঁদ সদাগরের নাখরা বনে যে সকল গাছের উল্লেখ রয়েছে, সরস কাঁঠালগাছ তার মধ্যে অন্যতম।
চৈতন্য চরিতামৃতে খাবারের বহরে কাঁঠালের দেখা পাই—
ছেনা পানা পৈড় আম্র নারিকেল কাঁঠাল।
নানাবিধ কদলক আর বীজতাল।
উনিশ শতকের শেষের দিকে বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায় প্রণীত রান্না বিষয়ক বই ‘পাক প্রণালী’-তে পাকা কাঁঠালের মিষ্ট বড়া রান্নার কথা পাওয়া যায়। পাকা কাঁঠালের রসের সঙ্গে চালের গুঁড়া ও চিনি মিশিয়ে ঘন মণ্ড তৈরি করতে হবে। সেই মণ্ড গরম ঘিয়ে ভেজে চিনির রসে ডোবালেই তৈরি হবে কাঁঠালের বড়া। এই বড়া নাকি ক্ষীরসহযোগে খেতে অসাধারণ লাগে। এছাড়া এঁচোড় (কাঁচা কাঁঠাল) রান্নার কথাও রয়েছে এই বইতে।
বরেন্দ্রীতে খই বা মুড়ির সঙ্গে কাঁঠাল খাওয়ার চল আশৈশব দেখে আসছি। অনেকে আবার এক কাঠি বেড়ে—পান্তার সঙ্গে পাকা কাঁঠাল খায়।
কাঁচা কাঁঠাল বা এঁচোড় তো বাঙালির ‘গাছ পাঁঠা’, ভালো করে কষিয়ে রাঁধলে অমৃততুল্য। কাঁঠালের বীজ নানা সবজির সঙ্গে মিশে অতুলনীয় স্বাদ নিয়ে আসে।
৩
রসনা বিলাসের পাশাপাশি বাঙালির সমুদ্রযাত্রায় ছিল কাঁঠালগাছের ব্যবহার। নৌকার কেরয়াল দণ্ড বা দাঁড় নির্মাণে ব্যবহৃত হত কাঁঠাল গাছের কাঠ। স্যার বুকানন হ্যামিল্টন বরেন্দ্র অঞ্চলে এসে অসংখ্য কাঁঠাল গাছ দেখেছিলেন। এই গাছের বাকল কাপড় রং করতে ব্যবহৃত হত বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। এর পাশাপাশি কাঁঠাল কাঠ দিয়ে চমৎকার শিল্পকর্ম হত বলে তিনি লিখেছেন। টেকসই হওয়াতে কাঁঠাল কাঠের আসবাব খুব সমাদৃত হত এবং আজও কাঁঠাল কাঠের আসবাবপত্রের সুখ্যাতি রয়েছে, যদিও কালপরিক্রমায় অন্যান্য নানা ধরনের কাঠ ও পার্টিকেল বোর্ড কাঁঠাল কাঠের পরিবর্তে ব্যবহৃত হচ্ছে।
৪
কাঁঠালের পাতার সঙ্গে বরেন্দ্রীদের একটি ধর্মাচরণের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এই অঞ্চলের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মাঝে, বিশেষত কৈবর্ত, নরসুন্দর, সাহা জাতিদের মধ্যে একটি বিশেষ ব্রত প্রচলিত রয়েছে, যেটি বাংলার অন্য অঞ্চলে দেখা যায় না। ‘গোপালের ব্রত’ নামে এই ব্রতটি সারা অগ্রহায়ণ মাসজুড়ে পালিত হয়। এই ব্রতপালনে কাঁঠাল পাতা অপরিহার্য। অগ্রহায়ণের প্রতি রবিবারে সূর্যোদয়ের সময় গোপালের উদ্দেশ্যে নৈবেদ্য দেওয়া হয় তুলসীতলায় সাতটি কাঁঠাল পাতায় করে। আতপ চাল, কলার টুকরো ও বাতাসা বা চিনি এই নৈবেদ্যের প্রধান উপচার। ধূপদীপ সহযোগে উলু ও শঙ্খধ্বনি করে নৈবেদ্য নিবেদন করেন পরিবারের নারীরা। সারা মাস ব্রত পালন করে অগ্রহায়ণের শেষদিন ব্রাহ্মণ এনে গোপাল পূজা করা হয়। এই সময় বরেন্দ্র জুড়ে হাটে-বাজারে কুমোররা গোপালমূর্তি বিক্রয় করে। ব্রতটিতে কোনো ব্রতকথা শোনানো হয় না। উল্লেখ্য যে, এই অঞ্চলে প্রচলিত ইতুপূজা ব্রতটির বিকল্প হিসেবে এই ব্রতটি পালিত হয়। এখানে তথ্যটুকু দিলাম কাঁঠালের সঙ্গে বাঙালির ধর্মাচরণের গভীর সম্পর্কটা বুঝাতে।
বৈষ্ণবাচার পদ্ধতি ও শ্রীহরিভক্তি বিলাস গ্রন্থদুটিতে যে সমস্ত খাদ্যদ্রব্য হবিষ্যদ্রব্য হিসেবে ব্যবহারযোগ্য বলা হয়েছে, পনস বা কাঁঠাল তার মধ্যে অন্যতম। কালিকাপুরাণে নৈবেদ্যের তালিকায় পনসে্র নাম রয়েছে, ‘কুষ্মাণ্ডৈর্ন্নারিকেলৈশ্চ খর্জ্জুরৈঃ পনসৈস্তথা’।
পিতৃপক্ষে দীপদানে কাঁঠাল বীজের তেল ব্যবহারের প্রথাও কোথাও কোথাও রয়েছে।
৫
বাংলায় প্রচলিত অনেক বাগধারা ও প্রবাদে কাঁঠালের উজ্জ্বল উপস্থিতি। ‘গাছে কাঁঠাল, গোঁফে তেল’, ‘পরের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাওয়া’, ‘কাঁঠালের আমসত্ত্ব’, ‘কিলিয়ে কাঁঠাল পাকানো’ এ সবই আমাদের নিত্যদিনের কথায় মিশে থাকে।
‘সকল গাছ কাটিকুটি, কাঁঠাল গাছে দেই মাটি’—খনার বচন।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় কাঁঠাল খাইয়ে পাকসেনাদের জব্দ করার হাসির গল্পও বাংলায় ছড়িয়ে আছে। পল্লীকবি জসীমউদ্দিনের গল্পে এক কাবুলিওয়ালার কাঁঠাল খেতে গিয়ে নাকাল হয়ে যাওয়া এবং তার দাড়ি হারানোর গল্প এখনও আমাদের হাসির খোরাক জোগায়।
কোন অজানিত সময়ে বাঙালির পূর্বজদের সঙ্গে কাঁঠালের পরিচয় হয়েছিল, তারপর কতশত শতাব্দী কেটে গিয়েছে। ইতিহাসের কোন এক অলিখিত ক্ষণে কাঁঠালের সঙ্গে বাঙালির সখ্যতা হয়ে গিয়েছে। কাঁঠালের আঠার মতোই সেই সখ্যতা। সে কারণে খাবার থেকে শুরু করে মুখের বুলিতে কাঁঠালের উপস্থিতি আজও বহমান।
শেষটা করছি বিদ্রোহী কবির একটি মজার ছড়ার চারটি লাইন উদ্ধৃত করে—
ওরে হুলোরে তুই রাতবিরেতে ঢুকিসনে হেঁশেল।
কবে বেঘোরে প্রাণ হারাবি বুঝিসনে রাসকেল॥
স্বীকার করি শিকারি তুই গোঁফ দেখেই চিনি,
গাছে কাঁঠাল ঝুলতে দেখে দিস গোঁফে তুই তেল॥
তথ্যসূত্র:
১. নীহাররঞ্জন রায়, বাঙ্গালীর ইতিহাস (আদিপর্ব), (দেজ পাবলিশিং, ১৪৩০)৷
২. বারিদবরণ ঘোষ সম্পাদিত, বৌদ্ধযুগের ভারত – হিউয়েন সাং, পত্রলেখা৷
৩. সুকুমার সেন সম্পাদিত, কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম রচিত চণ্ডীমঙ্গল৷
৪. অচিন্ত্য বিশ্বাস, বিপ্রদাস পিপিলাই-এর মনসামঙ্গল, রত্নাবলী৷
৫. শ্রীসতীশচন্দ্র শর্ম্মা সম্পাদিত চরক সংহিতা৷
৪. নিজস্ব ক্ষেত্রসমীক্ষা৷
ছবিঋণ:
পোস্টে ব্যবহৃত টেরাকোটার ছবিটি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সোহরাব উদ্দিনের সোমপুর মহাবিহারের টেরাকোটা নিয়ে একটি গবেষণাপত্র থেকে নেয়া হয়েছে। সেজন্য কৃতজ্ঞতাভরে তাঁর ঋণ স্বীকার করছি।
খুব সুন্দর লাগলো নিবন্ধটি।কোন বইতে মনে পরছেনা, শ্রীচৈতন্যের সময়ের খাওয়া দাওয়ার বিষয়ে কাঁঠালের উল্লেখ পেয়েছি।ফলটি আজকাল একটু ব্রাত্য, কেন জানি না।
ক্লাস সেভেনের ইতিহাস বইয়ে আছে দিদি।
খুব সুন্দর
খুব ভালো লাগলো
শাহরিয়ার কবীর খুব ভাল মানের লেখক। এই লেখাটি যথারীতি অনবদ্য। দক্ষিণ দিনাজপুর জেলায় বিশেষ করে বালুরঘাটে আত্রেয়ী নদীর দুপাশে উৎকৃষ্ট মানের কাঁঠাল হয়ে থাকে। এই এলাকা প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধন ভুক্তি (রাজ্য)’ এর কোটিবর্ষ বিষয় (জেলা)’র অন্তর্গত।