সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

কানহেরী বৌদ্ধ গুহা – দুই যুগের সমাপতনের কাহিনি

কানহেরী বৌদ্ধ গুহা – দুই যুগের সমাপতনের কাহিনি

সুদীপ্ত পাল

ডিসেম্বর ২৭, ২০২৫ ১২৫ 0

মুম্বাই অঞ্চলের ইতিহাসের প্রাচীনত্ব বোঝা যায় সেখানে অবস্থিত প্রাচীন বৌদ্ধ ও হিন্দু গুহার সংখ্যা থেকে। এলিফ্যান্টা, মণ্ডপেশ্বর, মহাকালী, যোগেশ্বরী, কানহেরী – অন্তত পাঁচটি প্রাচীন গুহাসমূহ মুম্বাই শহরে বা তার উপকণ্ঠে আছে। এদের মধ্যে এলিফ্যান্টা সবচেয়ে বিখ্যাত হলেও, প্রাচীনতম হল কানহেরী। সংস্কৃত কৃষ্ণগিরি থেকে প্রাকৃতে কানহেরী। শহরের উত্তর দিকে বোরিবলীতে সঞ্জয় গান্ধী জাতীয় উদ্যানের মধ্যে কানহেরী গুহা। ডিসেম্বরের এক দুপুরে ট্যাক্সি ধরে চলে এলাম এই সংরক্ষিত বনের প্রবেশপথে। তারপরের বাকি পাঁচ কিমি আর ট্যাক্সি যায় না। পাহাড় বেয়ে ওঠা, তার জন্য শাটল বাস আর শাটল গাড়ি আছে। একটু পরিশ্রম করতে চাইলে হেঁটেও ওঠা যায়, তবে আমি শাটল নিলাম, কারণ গুহাতে গিয়েও অনেকটা পাহাড় ভাঙতে হয়। শাটলে যাবার পথে গাড়ির চালিকা হরিণ দেখালেন, জঙ্গলে যারা বাস করে তাদের বাড়িঘরও দেখালেন। এই জঙ্গলে ভীল জনগোষ্ঠী বহুদিন ধরেই বাস করে। শাটল থেকে নেমে সিঁড়ি বেয়ে অনেকটা উঠে প্রথম চারখানি গুহা।

কানহেরীর একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, বৌদ্ধ ধর্মের ক্রমবিবর্তনের একটা সময়কালের সাক্ষী হয়ে আছে কানহেরীর গুহাগুলি, এখানকার অনেক গুহাতেই দুটো আলাদা আলাদা সময়ের ছাপ সমাপতিত হয়ে আছে- একটা সাতবাহন যুগ, অন্যটা গুপ্ত ও গুপ্তোত্তর যুগ। একটা হীনযানের সময়কাল, অন্যটা মহাযানের।

কানহেরীর ১১২টি গুহায় কয়েকশো ভিক্ষুর থাকার মতো ব্যবস্থা ছিল। নালন্দার মতো বিশ্ববিদ্যালয় না হলেও, এটি ছোটোখাটো একটা আবাসিক কলেজের মতো ছিল বলে অনুমান করা যায়। ১১২টি গুহার মধ্যে ১০৭টিকে আবাসিক গুহা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে, আর পাঁচটিকে চৈত্যগৃহ হিসাবে।

কানহেরীতে প্রথম শিলালেখ পাওয়া যায় সাতবাহন রাজা যজ্ঞশ্রী সাতকর্ণীর (১৫০-১৮৯ অব্দ) সময়কালে, তবে অনুমেয় যে এখানে গুহা খনন আর বৌদ্ধ ভিক্ষুদের বসবাস তার এক শতাব্দী আগে থেকেই শুরু হয়েছিল। গুহাগুলিতে অনুদানকারীদের নাম হিসাবে যাদের নাম পাওয়া যায় তারা বেশিরভাগই কিন্তু শ্রেষ্ঠী ছিল, রাজা নয়, যার থেকে ঐ সময়ে ঐ অঞ্চলের শ্রেষ্ঠীদের প্রতিপত্তির অনুমান করা যায়। স্বাভাবিকভাবেই সোপারা, কল্যাণ এবং চাউলের মতো সমুদ্রবন্দরের উপস্থিতি ঐ অঞ্চলকে বাণিজ্যিকভাবে সমৃদ্ধ করেছিল।

দুই নং গুহায় অনুদানকারীদের নাম হিসাবে কল্যাণ-নিবাসী দুজন বণিক- পুনবসু আর স্বর্ণকার স্বামীদত্তর নাম পাওয়া যায়, আর তিন নং গুহায় গজসেন এবং গজমিত নামে বণিক দুই ভাইয়ের নাম দেখা যায়। স্বর্ণকারপুত্র সুলসদাস এবং সমীক নামের এক বণিকের নাম পাওয়া যায় সাত নং গুহার অনুদায়ীদের মধ্যে। স্বর্ণকার ধমনকের পত্নী শিবভূতি অনুদান দিয়েছিলেন চার নং গুহার জন্য। এদের প্রত্যেকের দানের কথা ব্রাহ্মী লিপিতে খোদিত আছে গুহায়, এবং এরা সবাইই সাতবাহন যুগের।

গুহা দুই থেকে শুরু করে গুহা চার অবধি গেলে স্তূপের একটা উল্লেখযোগ্য বিবর্তন বোঝা যায়। প্রথমদিকে বৌদ্ধদের প্রধান উপাসনাস্থল ছিল মূলত স্তূপ। শুরুর দিকে স্তূপ নির্মাণ হত বুদ্ধের দেহাস্থিভস্ম বা অন্য কোনো শরীরের অংশের উপর। পরবর্তীকালে উদ্দেশিক স্তূপ নির্মাণ শুরু হয়, যার নিচে কোনো দেহাবশেষ থাকত না- এই স্তূপগুলি প্রতীকী। গুহার মধ্যেকার স্তূপগুলি সাধারণত উদ্দেশিক স্তূপই হত। এগুলি গুহারই অংশ, পাহাড়ের গায়ে গুহা কাটার সময়ই এগুলি উৎকীর্ণ করা হত। এই গুহা-মধ্যস্থ স্তূপগুলিকে ঘিরে তৈরি হত চৈত্যগৃহ, যেখানে স্তূপ ছাড়াও বহুবিধ ভাস্কর্য থাকত। পরবর্তীকালে এই স্তূপগুলির গায়ে গৌতম বুদ্ধের ভাস্কর্যরূপ উৎকীর্ণ করা শুরু হল। অর্থাৎ স্তূপ এবং মূর্তি – বুদ্ধকে উপাসনা করার দু’ রকম পদ্ধতি এখানে এসে সংযুক্ত হল। হীনযানীদের কাছে স্তূপই সর্বপ্রধান উপাস্যবস্তু, কিন্তু মহাযানপন্থীরা ধীরে ধীরে স্তূপের গায়ে বুদ্ধমূর্তি খোদাই করা শুরু করেছিল – পরে এই শিল্পরীতি হীনযানেও গৃহীত হয়।

এক নং‌ গুহায় কিছু নেই, এটি অসম্পূর্ণ, দুই নং গুহা থেকে দেখা শুরু করলাম। দুই নং গুহায় তিনটি স্তূপ আছে- এদের কোনোটির গায়েই বুদ্ধমূর্তি নেই- এটি সাতবাহন যুগের স্তর। এই স্তূপগুলির তিন দিকের দেয়ালে বিভিন্ন মুদ্রায় বুদ্ধকে প্রদর্শন করা হয়েছে- ধ্যানমুদ্রা, অভয়মুদ্রা এবং ব্যাখ্যানমুদ্রায়- এগুলি ষষ্ঠ বা সপ্তম শতাব্দীর সংযোজন।

তিন নং গুহার প্রবেশপথে স্বাগত জানালেন দ্বাররক্ষীরা। এঁরা এযুগের সিকিউরিটি গার্ড নন, সেযুগের প্রহরী। কানহেরীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় গুহা নিঃসন্দেহে তিন নং গুহা । দুই নং গুহার মতো এখানেও একটা সাতবাহন যুগের স্তর, আর একটা গুপ্ত যুগের স্তর আছে। তিন নং গুহা আকারে বিশাল। সুসজ্জিত প্রবেশপথ, দুধারে চক্রাকার পদ্মফুল দিয়ে সাজানো পাঁচিল, প্রবেশপথের ঠিক দুপাশে দ্বাররক্ষীরা – তাদের মূর্তি খোদাই করা আছে পাঁচিলে। এছাড়াও পাঁচিলের গায়ে আছে আরেকজন প্রহরী – তিনি হলেন নাগরাজ। নাগেরা চিরকাল স্তূপকে রক্ষা করে এসেছে, আর নাগরাজ মুচলিন্দ বুদ্ধকে। এ তো ছিল বাইরের প্রাচীরের প্রবেশপথ, এবার মূল গুহার প্রবেশপথ – সেখানে দুধারে চার জোড়া দম্পতির বড়মাপের ভাস্কর্য। এগুলো কিন্তু মৈথুনের মূর্তি নয়। এঁরা সম্ভবত অনুদানকারী পরিবার। এবার মূল গুহার ভিতরে ঢোকা যাক। আয়তবৃত্তাকার গুহার শেষে সুবিশাল একটি স্তূপ, এই স্তূপটির গায়েও বুদ্ধদেবের মূর্তি খোদাই করা নেই। এখানে পুরো গুহা জুড়ে শোভা পায় বিশাল বিশাল থাম। থামগুলির মাথায় বিভিন্ন ভাস্কর্য। এই ভাস্কর্যগুলিতে হাতির বহুল উপস্থিতি দেখা যায় – যেরকম হাতিদের দ্বারা স্তূপ অভিষেকের দৃশ্য।

চিত্র-১

চিত্র-২

এই সমস্ত ভাস্কর্য এবং অনুদানকারীদের মূর্তিগুলি মহাযানীকরণের আগে নির্মিত – সাতবাহন সময়কালে। প্রশ্ন আসে – ভিক্ষুদের থাকার জন্য এত আড়ম্বর কেন? মনে রাখতে হবে ভিক্ষুদের আবাসিক গুহাগুলি সাদামাটাই হত, এই দুই আর তিন নং গুহা ছিল চৈত্যগৃহ – ভিক্ষুদের আবাস নয়। সেখানে অনুদানকারী শ্রেষ্ঠীদের সামর্থ্যের প্রদর্শন জরুরি ছিল। চৈত্য-উপাসনা শুধুই ভিক্ষুরা করত না, অনুমেয় যে সাধারণ মানুষও সেখানে আসত – একটু দুর্গম জায়গা হলেও।

তিন নং গুহার স্তূপটিকে এখনও উপাসনা করা হয় – ডঃ বি আর আম্বেডকর প্রবর্তিত নবযান বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারীরা এর উপাসনা করে – চোখের সামনেই দেখার সুযোগ হল – বিভিন্ন বয়সের বেশ কয়েকজন মানুষ স্তূপটিকে কয়েকবার প্রদক্ষিণ করলেন “বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি, সঙ্ঘম্ শরণং গচ্ছামি, ধম্মং শরণং গচ্ছামি” এই ত্রিশরণ মন্ত্র গাইতে গাইতে। তারপর প্রদীপ, ফুল এবং সুগন্ধি ব্যবহার করে বিভিন্ন লোকাচার। স্তূপের বিশালতা, চৈত্যগৃহের সুউচ্চ গম্বূ্জাকার দেয়াল, তার মাঝে বিশাল বিশাল থামের উপস্থিতি, আর তার মধ্যে ত্রিশরণ মন্ত্রের অনুরণন – সব মিলিয়ে একটা মন্ত্রমুগ্ধকর পরিবেশ তৈরি করে।

এই অবধি তিন নম্বর গুহায় আমরা যা দেখলাম, পুরোটাই সাতবাহন যুগের। এবার আবার বাইরে বেরোনো যাক, গুহার মূল প্রবেশপথ থেকে বেরিয়ে ডান-বাম দুদিকে তাকানো যাক। দুদিকেই দাঁড়িয়ে আছেন স্বয়ং বুদ্ধ- দুটি সুবিশাল দণ্ডায়মান বুদ্ধমূর্তি। এইগুলিই হল গুপ্ত যুগের স্তর – এগুলির সংযোজন হয় পঞ্চম বা ষষ্ঠ শতকে। এই মূর্তিগুলিতে গুপ্তযুগসুলভ শিল্পসুষমা লক্ষণীয়, বিশেষ করে উত্তরীয়র ভাঁজগুলো দেখে স্পষ্ট বোঝা যায় এগুলি সুদক্ষ শিল্পীদের নির্মাণ। প্রায় দু’ তলা লম্বা দণ্ডায়মান উত্তরীয়শোভিত বুদ্ধমূর্তি দুটিকে দেখে এক ঝলক বামিয়ানের কথা মনে হল – এরা সমসাময়িকই। এই মূর্তি দুটি ছাড়াও গুপ্তযুগে যোগ করা হয় বিভিন্ন মুদ্রায় বুদ্ধের ভাস্কর্য, রয়েছে যক্ষযক্ষী ও দেবদূতরাও।

চিত্র-৩  

চার নং গুহায় এসে প্রথম দেখলাম স্তূপের গায়ে খোদাই করা বুদ্ধমূর্তি। তার সঙ্গে চারদিকের দেয়ালে বহুসংখ্যক বুদ্ধের ভাস্কর্য। এই গুহাটিও মূলগতভাবে সাতবাহন যুগের। দেখে আন্দাজ করলাম এর মূল স্তূপটিতে শুরুতে বূদ্ধমূর্তি খোদাই করা ছিল না, পরবর্তীকালে যোগ করা হয়েছে – কিছুটা জোর করে যোগ করা বলেই মনে হল- কারণ ভাস্কর্যগুলোর ফিনিশিং তেমন ভালো নয়। অজন্তার অনুকরণ, কিন্তু অজন্তার ধারেকাছে আসে না। আবার এরকমও হতে পারে যে এগুলো সাতবাহন যুগেই পরীক্ষামূলক ভাবে বানানো, কিন্তু কাঁচা হাতের কাজ।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে প্রতীকের সঙ্গে মূর্তিকে যোগ করে এই যৌথরূপ নির্মাণ সমান্তরালভাবে ঐ সময়কার শৈব ধর্মেও দেখা যায়। লিঙ্গোদ্ভব শিব বা মুখলিঙ্গ – এগুলি তার উদাহরণ – এগুলিতে শিবের মানবরূপ এবং প্রতিকী রূপ অর্থাৎ লিঙ্গ – দুটিকে একসাথে যুক্ত করা হয়েছিল। প্রথমদিকে শুধু লিঙ্গই বেশি প্রচলিত ছিল। তেমনই বুদ্ধের মানবরূপ এবং প্রতীকরূপ অর্থাৎ স্তূপকে একত্রিত করা হয়। আবার একটা লিঙ্গের চারদিকে চারজন হিন্দু দেবতাকে রেখে – শিব, বিষ্ণু, ব্রহ্মা আর সূর্য- যেমন সর্বতোভদ্র লিঙ্গের প্রচলন হয়েছিল, তেমনই একটা স্তূপের চারদিকে চারজন বুদ্ধকে রেখে সর্বতোভদ্র স্তূপের প্রচলন হয়েছিল। মহাযানে চারটি আলাদা জগৎলোকের চারজন বুদ্ধ, আর হীনযানে চারটি আলাদা ঐতিহাসিক যুগের চারজন বুদ্ধ (ককুসন্ধ, কনকমুনি, কাশ্যপ ও গৌতম বুদ্ধ)- এঁদের ভাস্কর্য উৎকীর্ণ হত।

চিত্র-৪

এবার আমরা যাবো আবাসিক গুহাগুলির দিকে। চার নম্বর গুহার পর আরো কিছু সিঁড়ি ভেঙে পাহাড়ের উপর থেকে আবাসিক গুহাগুলি শুরু হয় – অর্থাৎ চৈত্যগৃহগুলির থেকে আবাসিক অংশের কিছুটা তফাৎ রাখা হয়েছিল। প্রথমে ভেবেছিলাম ভিক্ষুদের থাকার জায়গা খুবই সাদামাটা হবে। কিন্তু সেখানেও অনেক চমক লুকিয়ে আছে। যেমন, ৩৪ নং গুহার ছাদে রয়েছে দেয়ালচিত্র, সেখানে কমলা রঙের উত্তরীয় পরিহিত বুদ্ধকে দেখা যায়। এগুলি অজন্তার একটু পরবর্তীকালীন – আনুমানিক ষষ্ঠ শতকের। অনেক আবাসিক গুহাতেই দুটো আলাদা আলাদা যুগের সমাপতন চোখে পড়বে। কিছু আবাসিক গুহা এমন আছে যেগুলি সাতবাহন যুগে আবাসিক ছিল, কিন্তু গুপ্ত ও গুপ্তোত্তর যুগে তাদেরকে ধর্মীয় স্থানে পরিণত করা হয়েছে, এবং অনেক নূতন নূতন ভাস্কর্য সেখানে খোদাই করা হয়েছে।

চিত্র-৫

দুই থেকে চার নং গুহা শুরু থেকেই ধর্মীয় স্থান ছিল। কিন্তু কিছু কিছু আবাসিক গুহার রূপান্তর পরবর্তীকালে হয়েছে। এই রূপান্তরকে অনেকেই হীনযান বিহারের মহাযানীকরণ হিসেবে দেখে। দুই থেকে চার নং গুহায় বুদ্ধের যে নূতন নূতন মূর্তি সংযোজন হয়েছে, সেই রূপগুলি হীনযান, মহাযান দুই মতেই প্রচলিত। অতএব সেগুলিকে মহাযানীকরণের স্পষ্ট নজির বলা যায় না। যে পরিবর্তনগুলিকে মহাযানীকরণের স্পষ্ট দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা যায়, সেগুলি হল – ৪১নং গুহায় মহাযানী দেবদেবীদের উপস্থিতি আর বিভিন্ন আবাসিক গুহাকে উপাসনাস্থলে রূপান্তরীকরণ।

আবাসিক গুহাগুলির সিংহভাগই সাদামাটা ঘর, তবে সময়ের সাথে সাথে কিছু আবাসিক গুহায় ভাস্কর্যের সংযোজন করা হতে থাকে। প্রথমদিকে সম্পূর্ণরূপে আলংকারিক উদ্দেশ্য নিয়েই সেটা করা হচ্ছিল। প্রশ্ন ওঠে ভিক্ষুদের থাকার গুহায় অলংকরণের প্রয়োজনই বা কী? মনে রাখতে হবে গুহাগুলির সৌন্দর্য-সুষমা তাদের অনুদানকারীদের সম্মানের সঙ্গে যুক্ত ছিল- অতএব অনুদানকারীরা নিজেদের দানের ঔৎকর্ষ প্রমাণ করার জন্যই অনেক আবাসিক গুহার সৌন্দর্যায়ন করছিল- বিশেষ কোনো সম্প্রদায়-পক্ষপাত তাঁদের ছিল না। কিন্তু গুপ্ত যুগের শেষ দিক থেকে কিছু আবাসিক গুহায় খুব স্পষ্টভাবে মহাযান ঢুকে পড়ে।

হীনযান আর মহাযানের বিরোধটা কোথায়? হীনযান বাস্তবতায় প্রোথিত, মহাযান অলৌকিকতায়। হীনযান মনে করে অর্হত্ত্ব অর্জন একমাত্র নিজের প্রচেষ্টায় সম্ভব, বোধিসত্ত্বের মতো কোনো অলৌকিক শক্তির সহায়তায় নয়। আর হীনযানের দৃষ্টিতে বুদ্ধ একজন রক্তমাংসের মানুষ, মহাযানেও তিনি মানুষ, কিন্তু ইহজগতের মানুষী বুদ্ধ ছাড়াও অন্য লোকে বিচরণকারী লোকোত্তর বুদ্ধদের কল্পনা মহাযানে আছে- তাঁদের অনেকে গৌতম বুদ্ধের চেয়ে শ্রেষ্ঠতর – যেমন অমিতাভ বুদ্ধ – তিনি সুখাবতী লোকের বুদ্ধ। সুখাবতী হল সমস্ত লোকের মধ্যে শ্রেষ্ঠ লোক, অমিতাভ হলেন সমস্ত বুদ্ধের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, তাঁকে ভক্তিভরে উপাসনা করলে মানুষ সুখাবতী লোকে জন্ম নিতে পারে – এটি মহাযানপন্থীদের বিশ্বাস। ৪১ নং গুহায় একাদশমুখযুক্ত বোধিসত্ত্ব আর অমিতাভ বুদ্ধর উপস্থিতি এই গুহাটিকে স্পষ্ট মহাযানী বলে চিহ্নিত করে।

চিত্র-৬

একাদশমুখযুক্ত বোধিসত্ত্ব নিঃসন্দেহে দর্শকের মনে শিহরণ এবং কৌতুহল জাগায়। এই বোধিসত্ত্ব মূর্তির মূল মস্তকের উপরে তিনটি সারিতে তিনটি তিনটি করে নয়টি মাথা, এবং সবার উপরে আরেকটি মাথা রয়েছে- মোট এগারো মাথা- যা তাঁর অলৌকিক ক্ষমতাকে তুলে ধরে। অমিতাভ বুদ্ধর ডানদিকে তিনি দাঁড়িয়ে, আর অমিতাভ রয়েছেন ঠিক মাঝখানে, আর বাঁ দিকে আছেন পদ্মপাণি বোধিসত্ত্ব।

অমিতাভকে গৌতম বুদ্ধের থেকে কীভাবে আলাদা করা যায়? ৪১ নং গুহার সিকিউরিটি গার্ড দেখলাম এই বিষয়ে বেশ ওয়াকিবহাল। তিনি অমিতাভর বাম হাত দেখতে বললেন, তাঁর এই হাতে থাকে একটি পুঁথি। এছাড়া এই গুহায় দেবী তারাকেও দেখা যায়। হীনযানে বোধিসত্ত্বের উপস্থিতি আছে, যদিও ত্রাণকর্তার ভূমিকায় নয়। আর অমিতাভ ও দেবী তারা সম্পূর্ণরূপে মহাযানী উদ্ভাবন। এই মূর্তিগুলি দেখলে প্রশ্ন জাগে, গুপ্ত-পরবর্তী যুগে এই কানহেরীর গুহাবিহারগুলি শিক্ষাকেন্দ্র থেকে ধীরে ধীরে ধর্মীয় সাধনাকেন্দ্রের রূপ নিচ্ছিল?

অষ্টম শতাব্দীর পর থেকে পশ্চিম ভারতে বৌদ্ধ ধর্ম ক্ষীয়মাণ হতে থাকে। তবে কানহেরীতে দশম শতাব্দী অবধি বৌদ্ধ সক্রিয়তা ছিল, তার প্রমাণ পাওয়া যায় ৩৯ নং গুহার অনুদান-লেখ থেকে। নবম শতকের শেষদিকের বাংলার একজন বুদ্ধভক্ত অনুদাতার নাম পাওয়া যায় এগারো নং গুহার লিপিতে। এই অনুদানলেখ অনুযায়ী গৌড়নিবাসী সৌগত গোমিন অবিঘ্নকর একশো দ্রম্ম দান করেছিলেন এই গুহায় একটি ধ্যানকক্ষ খননের জন্য, এবং ভিক্ষুদের বস্ত্রের জন্য। এই গুহাটি দেখতে দেখতে উপলব্ধি হল- পশ্চিম ভারতে বৌদ্ধ ধর্ম ম্রিয়মাণ হতে থাকলেও বাংলায় তখন বৌদ্ধ ধর্মের বলিষ্ঠ উপস্থিতি ছিল, এবং বাংলার ধনী বৌদ্ধ পৃষ্ঠপোষকরা পশ্চিম ভারতে গিয়ে বৌদ্ধ বিহারের জন্য দানও করতেন।

চিত্র পরিচিতি

চিত্র-১ অনুদানকারী দম্পতিরা

চিত্র-২ তিন নং গুহার প্রধান স্তূপ

চিত্র-৩ তিন নং গুহায় সুবিশাল বুদ্ধমূর্তি।

চিত্র-৪ চার নং গুহায় স্তূপের গায়ে বুদ্ধমূর্তি

চিত্র-৫ গুহাচিত্রে বুদ্ধ

চিত্র-৬ একাদশমুখ বোধিসত্ত্ব এবং অমিতাভ বুদ্ধ

তথ্যসূত্র

১. Dutt, Sukumar. Buddhist Monks and Monasteries of India: Their History and Contribution to Indian Culture. London: George Allen & Unwin, 1962 — pp. 148-161.

২. গুহাগুলির সামনের নির্দেশিকা বোর্ড।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।