উপন্যাসের ইতিহাসমহলে
১
অনেক বছর আগে ঠিক করেছিলাম উপন্যাসের রূপ-রীতি-বৈচিত্র্য-বিবর্তন এসব নিয়ে এমন কিছু লেখার চেষ্টা করব, যা কেবল বাংলা উপন্যাসের মধ্যেই আবদ্ধ থাকবে না, সারা বিশ্বের নানা প্রান্তে নানা সময়ে যে সব উপন্যাস লেখা হয়েছে, সেসব মাথায় রেখেই লেখাটা হবে।
এই রকম একটা লেখার কথা আমার মাথায় প্রথম আসে একটা বাংলা বই পড়ে। কলেজে সাহিত্যের স্নাতক স্তরে পড়ার সময়ে পড়েছিলাম সেই বই, ‘সাহিত্যে ছোটগল্প’। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের এই বই যাঁরা পড়েছেন, তাঁরা জানেন যে এখানে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় নানা দেশকালের গল্প নিয়ে আলোচনার পর ছোটগল্পের নিজস্ব জঁরটির আলোচনায় এসে পৌঁছেছেন। গল্পের অন্যান্য যে ধারা – উপকথা, রূপকথা, নীতিকথা, টেল, অ্যানেকডোট, নভেল, নভেলেট – তার থেকে ছোটগল্প কোথায় কতটা আলাদা সে সব নিয়ে আলোচনা বইটিতে আছে।
নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ইংরেজি ছাড়াও ফরাসি ভাষা খুব ভালো জানতেন। একদিকে তিনি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের জনপ্রিয় সাহিত্য অধ্যাপক, অন্যদিকে তেমনি বিখ্যাত ঔপন্যাসিক ও ছোটগল্প-লেখক। এই কারণে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের পক্ষে এমন জটিল এক বিষয়ে এমন স্বাদু এক বই লেখা সম্ভব হয়েছিল। উপন্যাস নিয়ে ঠিক এই পর্যায়ের একটি বই কি বাংলায় হতে পারে না?
এইরকম ভাবনাচিন্তা যখন মাথায় ঘুরছে তখন হাতে পাই অধ্যাপক দেবীপদ ভট্টাচার্যের ‘উপন্যাসের কথা’ বইটি। মনে রাখতে হবে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো দেবীবাবুও ছিলেন ফরাসি ভাষায় সুপণ্ডিত, মনস্বী পাঠক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।
২
‘উপন্যাসের কথা’ নামের বইটি যদি আপনারা পড়েন তো দেখবেন এখানে উপন্যাসের যে বিশ্ব ইতিহাস সেখানে আয়ান আয়াটের বইয়ের অনুসরণ রয়েছে। আয়ান আয়াটের দুনিয়া কাঁপানো বই ‘দ্য রাইজ অব দ্য নভেল’ বেরিয়েছিল ১৯৫৭-তে। প্রকাশের পরেই বইটি আলোড়ন তোলে। দেশ দুনিয়ার বইপত্রের খোঁজ রাখা প্রাজ্ঞ অধ্যাপক দেবীপদ ভট্টাচার্য নিশ্চিতভাবেই আয়াটের বইটি পড়েন ও বাংলায় এই নিয়ে বই লেখার কথা ভাবেন। এর ফলে ১৯৬১-তে আমরা পাই দেবীবাবুর চমৎকার আলেখ্য ‘উপন্যাসের কথা’। আয়ান আয়াটের বইটিতে কী আছে সেটা একটু দেখা যাক।
আয়ান আয়াট দেখান উপন্যাস নামক সাহিত্যবর্গ বা লিটারারি জঁরটি কেন ও কীভাবে অষ্টাদশ শতকে বিকশিত ও প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিল। সেই বিকাশের পেছনে ফরাসী বিপ্লবোত্তর বুর্জোয়া সমাজ-অর্থনীতি-রাজনীতির ভূমিকা, ছাপাখানা, ছাপা বই ও পত্রপত্রিকার ক্রম প্রসারণ, এক নতুন রিডিং পাবলিকের আবির্ভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন আয়াট।
আয়াট তাঁর ক্লাসিকে পরিণত হওয়া “দ্য রাইজ অব দ্য নভেল” বইতে যে আলোচনা করেন, কোনও উপন্যাসতাত্ত্বিকই একে এরপর থেকে আর এড়িয়ে যেতে সক্ষম হননি। আয়ান আয়াটের কাজের ধারাকে পরিমার্জন, সংযোজন ও নতুন চিন্তার উপর দাঁড়িয়ে আরো এগিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা করেছেন মাইকেল ম্যাকিওন-এর মতো কেউ কেউ। উপন্যাসের নন্দন সম্পর্কে নানামুখী আলোচনার একটি অসামান্য সংকলন গ্রন্থও মাইকেল ম্যাকিয়নের সম্পাদনায় বের হয়েছে জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে। সংকলনটির নাম ‘থিওরি অব দ্য নভেল : এ হিস্টোরিক্যাল অ্যাপ্রোচ’।
আয়ান আয়াটের ১৯৫৭ সালের বইটি মূলত ইংরেজি উপন্যাসের আলোচনা। এর তিন পথিকৃৎ ড্যানিয়েল ডিফো, রিচার্ডসন আর হেনরি ফিল্ডিং-এর উপন্যাস ও উপন্যাস রচনার সমকাল সম্পর্কিত আলোচনার পাশাপাশি সেই সময়কাল ও তার নানা দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন আয়াট। সমকালের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে উপন্যাসের আবির্ভাব বিকাশকে মিলিয়েছেন তিনি।
৩
অন্যদিকে এর আগেই ইউরোপীয় উপন্যাসের বাস্তবতা নিয়ে কথা বলেন একজন বিখ্যাত মার্কসীয় তাত্ত্বিক – হাঙ্গেরির মানুষ গেয়র্গ লুকাচ। লুকাচের ‘থিওরি অব দ্য নভেল’ বা ‘হিস্টোরিক্যাল নভেল’ উপন্যাস নন্দনতত্ত্বের খুব বিখ্যাত বই। তবে তাঁর শ্রেষ্ঠকীর্তি সম্ভবত ‘স্টাডিজ ইন ইউরোপিয়ান রিয়ালিজম’। লুকাচ কোনও একটি ভাষার নভেল সম্পর্কে তাঁর আলোচনাকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। জার্মান, রুশ, ফরাসি আখ্যানের এক বিস্তারিত জগতকে তিনি আলোচনায় এনেছেন। লুকাচ দেখান উপন্যাস শিল্পীর কাছে ‘ন্যারেট’ আর ‘ডেসক্রাইব’ – এই দুই কাছাকাছি পদ্ধতির পার্থক্যটি কেন ও কীভাবে জরুরি হয়ে ওঠে। শ্রেণিচেতনা উপন্যাস নির্মাণে কীভাবে ছায়া ফেলে।
লুকাচের বইগুলি আজকের দিনে কতটা চর্চিত বা পঠিত জানতে ইচ্ছে করে। বাংলায় এক রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য ছাড়া লুকাচ নিয়ে লিখতে তো কাউকে খুব একটা দেখি না। যাঁর ক্লাস করতে গিয়ে আমাদের লুকাচ পাঠের শুরু, সেই শিবাজীদাও (যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্যের শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়) লুকাচ নিয়ে তেমন কিছু লিখলেন না। অন্তত আমার চোখে পড়েনি।
আপনারা যদি লুকাচের প্রথম বই ‘থিওরি অব দ্য নভেল’, আবার পড়তে শুরু করেন, দেখবেন খুব কাব্যিক এক বর্ণনা দিয়ে সেটার শুরু। লুকাচের এই বইটি বেরোয় রুশ বিপ্লবের প্রায় সমকালে। মূল জার্মান বইটি – ‘Die Theorie des Romans’ – বিপ্লবের আগেই, ১৯১৬ সালে প্রকাশিত হয়। এর ইংরেজি অনুবাদ প্রথম বেরোয় ১৯২০ সালে। বইয়ের শুরুতে লুকাচ বলছেন যুগ হিসেবে সেটাই ছিল এক স্বপ্নের যুগ, যখন মানুষ আকাশের তারাদের থেকে পথের সন্ধান নিত। তারাদের আলোই মানুষকে আলো দেখাত। সেই যুগটাই আমাদের স্বপ্নের যুগ, যখন সবকিছুই ছিল একই সঙ্গে নতুন ও ভীষণ পরিচিত। সবকিছুই ছিল খুব রোমাঞ্চকর আবার একইসঙ্গে একেবারে নিজের জিনিস।
লুকাচের বইটি আরো পড়লে ক্রমশ আমরা জানতে পারি তিনি সাহিত্যের ফর্ম-এর সঙ্গে সময় ও সময়ের দৃষ্টিকোণকে মিলিয়ে পড়তে চাইছেন। এপিক, ট্রাজেডি ও কমেডি হল সেকালের সাহিত্যিক ফর্ম। একালের সাহিত্যিক ফর্ম হল নভেল বা উপন্যাস।
এই চার সাহিত্য সংরূপে নায়ক বা মূল চরিত্রপাত্রের সঙ্গে জগতের সম্পর্কের একটা ছক লুকাচ তাঁর বইতে তুলে ধরতে আগ্রহী। লুকাচের লেখা আমাদের দেখায় এপিকে রয়েছে এক স্বপ্নসুন্দর জগৎ এবং তার নায়কও ধীরোদাত্ত এবং সমুন্নত। ট্রাজেডির জগতটিও একই। কিন্তু নায়ক সেখানে আর মহাকাব্যের নায়কের মতো ধীরোদাত্ত নয়, যুধিষ্ঠির নয়, সে বিচ্যুত হয়েছে পরম আদর্শ থেকে। যেমন গ্রীক ট্রাজেডির অয়দিপাউস। এর বিপরীত হল কমেডির মজার জগৎ। সেখানে নায়ক নিজেকে ধীরোদাত্ত মহানই ভাবে। কিন্তু দেখে তার চারপাশের জগতটি আর স্বপ্নসুন্দর নেই। বিলকুল বদলে গেছে। এই অসঙ্গতি কমেডিতে আনে হাস্যরস আর ট্রাজেডিতে আনে বেদনা।
একালের নায়ক বা তার জগৎ কোনও কিছুই আর স্বপ্নসুন্দর নয়। একালে সবই বিচ্যুত। একালের সাহিত্য সংরূপ হল নভেল। এপিকের উদার মহনীয় পরিবেশের চরিত্রপাত্রদের ঠিক বিপরীতে দাঁড়ায় নভেলের পরিবেশ ও চরিত্রপাত্ররা। এপিকের উত্তরাধিকারী নভেল। তবে যুগের বদল, প্রেক্ষাপটের বদল তার চেহারা চরিত্রকে আলাদা করে দিয়েছে।
লুকাচের বইতে যাঁদের উপন্যাসের কথা বিশেষ করে এসেছে তাঁদের মধ্যে রয়েছেন দন কিহোতে রচয়িতা স্পেনের সার্ভেন্তেস, জার্মান উপন্যাস তথা সাহিত্যের প্রবাদ পুরুষ গ্যয়ঠে, ফ্রান্সের অন্যতম প্রধান উপন্যাসকার বালজাক এবং রাশিয়া তথা বিশ্বসাহিত্যের সর্বকালের দুই অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক তলস্তয় ও দস্তয়েভস্কি।
লুকাচ তাঁর এই বইতে নভেলের আলোচনা প্রসঙ্গে দেখান যে এই সাহিত্য সংরূপের শ্রেষ্ঠ স্রষ্টাদের খুব বড়ো দুটি বৈশিষ্ট্য হল ইতিহাসবোধ ও বাস্তবতাবোধ। যার বাস্তবতাবোধ নেই, বাস্তবের সঙ্কটবোধ যার চরিত্র ও পটপরিবেশকে জারিত ও শাণিত না হয়েছে, তার পক্ষে নভেল লিখে ওঠা সম্ভব নয়। আর ইতিহাসবোধ না থাকলে, সময়ক্রম ও পরিবর্তনের গতিসূত্র না বুঝলে, প্রেক্ষাপট ও চরিত্রপাত্রের পালাবদলের সমীকরণ ফুটিয়ে তোলা অসম্ভব।
নভেলের এই প্রধান দুটি দিককে লুকাচ বিস্তারিত পরিসরে ধরতে চাইবেন আখ্যান বিষয়ক তার পরের দুটি বইতে। একটি হল ‘দ্য হিস্টোরিক্যাল নভেল’ এবং অন্যটি হল ‘স্টাডিজ ইন ইউরোপিয়ান রিয়ালিজম’। সেই নিয়ে পরে কখনো লিখব। আপাতত আশা যাক বাখতিন প্রসঙ্গে।
৪
লুকাচের প্রায় সমকালেই রুশ দেশে বসে এক অন্য পথে ভাবনাচিন্তা করছিলেন মিখাইল বাখতিন। উপন্যাসের কালগত প্রেক্ষাপটের দিকটির বদলে বাখতিন মনোযোগ দিলেন এর আন্তরধর্মের দিকে। প্রথমদিকে বাখতিন তেমন জনপ্রিয়তা পাননি। রুশ থেকে যখন ইংরেজিতে তাঁর লেখা অনূদিত হল ও পশ্চিমা দুনিয়ায় পৌঁছল, তখন তিনি যে কেবল প্রবল জনপ্রিয়তা পেলেন তাই নয়, অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাসতাত্ত্বিক হিসেবে পরিগণিত হতে শুরু করলেন বিশ্বজুড়ে।
বাখতিনের উপন্যাস তত্ত্বের বিশেষত্ব নিয়ে কিছু লেখালিখি হয়েছে বাংলায়৷ দেবেশ রায় লিখেছেন, তপোধীর ভট্টাচার্যও লিখেছেন। আমাদেরও কিছু চর্চার ইচ্ছে আছে এই বিষয়ে। আপাতত শুধু একটি কথাই বলা যাক; বাখতিনের যেটি শ্রেষ্ঠ উন্মোচন বলে আমার মনে হয়। বড়ো তত্ত্বের একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য এটাই যে কেউ বলে দেবার পর মনে হয়, তাই তো, এছাড়া আর কী বা হতে পারে৷ সরলতা অনেক বড়ো তত্ত্বেরই গুণ। বিজ্ঞানের জগতে যেমন, সাহিত্যের জগতেও তাই। বাখতিনের উপন্যাসতত্ত্বও তেমনি। বাখতিন বললেন উপন্যাসের মূল বৈশিষ্ট্য হল তার ডায়ালজিক চরিত্র। মার্কসীয় রুশিয়ায় দ্বন্দ্বতত্ত্ব সর্বত্র আলোচিত হত৷ বাখতিন সর্বাংশে মার্কসবাদী ছিলেন কিনা সেই বিতর্কে এখন ঢোকার দরকার নেই আমাদের। কিন্তু উপন্যাসের ডায়ালজিক তত্ত্বের আবিষ্কারে মার্কসীয় দ্বন্দ্বতত্ত্বের প্রভাব থাকতেই পারে।
উপন্যাসের ডায়ালজিক তত্ত্ব সামনে এনে বাখতিন বলতে চাইলেন যে উপন্যাসে চরিত্ররা পরস্পরকে নিয়ন্ত্রণ করে, নির্মাণ করে। একটা টানাপড়েন কাজ করে৷ সংলাপে এটা দেখা যায়। চরিত্রপাত্রদের নির্মাণে, ঘটনার অগ্রগতিতেও দেখা যায়। এই দ্বন্দ্বজাত নির্মাণ অন্যান্য সাহিত্য প্রকরণ যেমন কবিতা বা এপিক থেকে উপন্যাসকে আলাদা করে৷ উপন্যাসের যে অন্তর্ধর্ম হিসেবে লুকাচ বা আয়ান ওয়াটেরা বাস্তবতার কথা বলেন, তার মূল সূত্র ডায়ালজিক চরিত্রের মধ্যেই আছে বলে বাখতিন মনে করেন। উপন্যাসের এই ডায়ালজিক চরিত্র থেকেই আসে তার আর এক মৌল ধর্ম – তার পলিফনিক বা বহুস্বরীয় ধর্ম। একটি উপন্যাসে একইসঙ্গে অনেক রকম স্বর আত্মপ্রকাশ করে, বিতর্ক করে, দৃষ্টিকোণ প্রকাশ করে। বিষবৃক্ষ উপন্যাসটিকে আমরা বিধবা কুন্দনন্দিনীর আকাঙ্ক্ষার জায়গা থেকেও পড়তে পারি, আবার সূর্যমুখীর আসন টলে গিয়ে পারিবারিক ভাঙনের জায়গা থেকেও বোঝার চেষ্টা করতে পারি। লেখক বঙ্কিমের ব্যক্তিগত নীতিবাদী প্রবণতাটি কোন দিকে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এর বহুপাঠের সম্ভাবনা, যা আসলে উপন্যাসটির মধ্যেই নিহিত ছিল। যে কোনও সার্থক উপন্যাসেই সাধারণভাবে এই বহুস্বরটি খুঁজে পাওয়া সম্ভব।
৫
মার্গারেট অ্যানে ডুডির এই বইটা – দ্য ট্রু স্টোরি অব দ্য নভেল – আখ্যান চিন্তায় একেবারে অন্যরকম কথা বলে। কথাটাকে আমরা মানি কিনা, কতটা মানি, সে বিচারে যাবার আগে কথাটা কী সেটা শোনা দরকার। আমাদের প্রচলিত নভেলের নন্দনতত্ত্ব বলে নভেল একটি বুর্জোয়া লিটারারি জঁর। বুর্জোয়া সমাজ অর্থনীতির হাত ধরেই তার আবির্ভাব ও বিকাশ।
আয়ান আয়াটের “রাইজ অব দ্য নভেল” উপন্যাসের ইতিহাসকে পড়তে চায় ড্যানিয়েল ডিফো, রিচার্ডসন আর হেনরি ফিল্ডিং এর লেখাগুলির মধ্যে দিয়ে, যেগুলি লেখা হচ্ছিল ১৭১৯ থেকে ১৭৫০ এর মধ্যে। এগুলি যখন লেখা হচ্ছিল তখনো ফরাসী বিপ্লব হয়নি; ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিভোলিউশন হয়নি। তবে উপনিবেশ স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। শুরু হয়ে গেছে আধুনিক বিজ্ঞানের জয়যাত্রা। নিউটনের তত্ত্বসমূহ প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে। ব্রিটেন সহ ইউরোপ জুড়ে সায়েন্স অ্যাকাডেমিগুলো প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, কার্যকারিতা বাড়াচ্ছে। কফি হাউসগুলোতে নতুন আলোচনা। এক নতুন জীবনদৃষ্টি ও দর্শন সামনে আসছে৷ পুরোনো চিন্তার সঙ্গে নতুন চিন্তার ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়ে গেছে। বইপত্র ও পত্রিকার পাতায় তর্জা প্রবল৷ গ্যালিভার্স ট্রাভেলস খ্যাত জোনাথান সুইফট তো এই তর্জার প্রেক্ষিতেই লিখবেন তাঁর স্যাটায়ার – ব্যাটেল অব বুকস, যেখানে লাইব্রেরির বিভিন্ন চিন্তাধারার বইয়েরা পরস্পরের সঙ্গে মারামারিতে উদ্যত।
এসবের মধ্যে দিয়ে বুর্জোয়া সমাজ অর্থনীতি রাজনীতি আসার প্রেক্ষাপটটা তৈরি হয়ে গেছে। আয়াটের তত্ত্বের আর একটা বড়ো দিক, রিডিং পাবলিকের আবির্ভাব ও বিকাশ ঘটেছে; প্রিন্ট টেকনোলজির রমরমা। ছাপা বইয়ের ব্যবসা বাড়ছে, পত্রপত্রিকা বাড়ছে। গদ্যের প্রসার হচ্ছে। যুক্তি ও বিতর্কের ভাষার প্রসার হচ্ছে। এটাকেই উপন্যাস নামক সাহিত্যবর্গের আবির্ভাবের প্রেক্ষাপট হিসেবে তুলে ধরতে চান আয়ান আয়াট। তার আগে পরে উপন্যাস সংক্রান্ত এই মতটিই মূলত নানা জনে নানাভাবে বলেছেন।
মার্গারেট অ্যানে ডুডি এই মতটা একেবারেই মানেননি। তিনি উপন্যাসকে একটি বুর্জোয়া জঁর বলেই মানতে চাননি। তাঁর মতে উপন্যাস আদৌ কোনও নতুন সাহিত্যবর্গ নয়। এপিক বা লিরিক বা নাটকের মতোই এও এক অতি প্রাচীন জঁর৷ লেখিকার বইটিতে আমরা তাই দেখি তিনি গ্রীক ও রোমান আখ্যানগুলি নিয়ে আলোচনা করেন। সেখানে উপন্যাসের লক্ষণ খুঁজে পান।
মার্গারেট আর একটি মৌলিক প্রশ্ন তোলেন তাঁর বইতে। তিনি বলেন আয়ান আয়াটের দৃষ্টিকোণটি একেবারেই পশ্চিমা, তাও আবার প্রটেস্টান্ট ভাবনা সঞ্জাত। মার্গারেট ডুডির অভিযোগ আয়ান আয়াট ক্যাথলিক স্পেনের আখ্যানকে গুরুত্ব দিতে চান না। প্রটেস্টান জগতকেই বেছে নেন আর ইংরেজি আখ্যানের আবির্ভাবকে উপন্যাসের আবির্ভাব বলে চালিয়ে দেন। এমনকি মিখাইল বাখতিনের মধ্যেও চয়নের সমস্যা খুঁজে পান মার্গারেট। লেখিকার মতে বাখতিন বুর্জোয়া জঁর হিসেবে উপন্যাসকে দেখলেন না বটে, কিন্তু তিনিও রেনেসাঁ জঁর হিসেবে উপন্যাসকে দেখার সীমাবদ্ধতা থেকে বেরোতে পারলেন না। ষোড়শ শতকের ফ্রান্সের র্যাবলের গার্গান্তুয়া ও প্যান্তাগ্রুয়েল নামক রচনার মধ্যেই উপন্যাসের আবির্ভাবকে দেখলেন।
আয়ান আয়াটের সমালোচনাকে যেভাবে দেখা যায়, বাখতিনের সমালোচনায় সেই যৌক্তিক বিচার থাকল কিনা সেই প্রশ্ন তোলাই যায়। আমাদের বাখতিন পাঠ মনে করে না বাখতিন একটি রেনেসাঁ জঁর হিসেবে উপন্যাসকে দেখেছেন। বরং কালগত বিচার এড়িয়ে আন্তরধর্মের দিক থেকে – বহুবাচনিকতা (পলিফনি) ও ডায়ালজিক ধর্মের ভিত্তিতে উপন্যাসকে বিচারের দিকে এগোলেন। র্যাবলে বা দস্তয়েভস্কি তাঁর কার্নিভাল বা পলিফনি ও ডায়ালজিক তত্ত্বের দৃষ্টান্ত হিসেবেই এসেছে বলে আমরা মনে করি। বরং বাখতিনের আন্তরধর্মের দিক থেকে উপন্যাস পাঠই মার্গারেট অ্যানে ডুডির মতো তাত্ত্বিকদের ভাষ্যকে জোর দিতে পারে৷ পুরনো জাপানী আখ্যানের উপন্যাস লক্ষণ নিয়ে ইতোমধ্যেই অনেক আলোচনা হয়ে গিয়েছে। অনেকের মতে একাদশ শতকে একজন অভিজাত মহিলা – মুরাসাকি শিকিবু ‘দ্য টেল অব দ্য গেঞ্জি’ নামের যে আখ্যানটি লিখলেন, সেটিই বিশ্বের প্রথম উপন্যাস। ভাবনাকে ছড়ালে আরো নানা দেশে এই ধরনের রচনাকে আমরা খুঁজে পাব। কিন্তু ভারতীয় বা ইরানীয় প্রাচীন আখ্যান নিয়ে এই ধরনের আলোচনা সেভাবে হয়নি। এই আলোচনার সম্ভাবনা ও প্রয়োজনীয়তা কিন্তু আছে। বাণভট্টের লেখার মধ্যে উপন্যাসের সম্ভাবনা রয়েছে কিনা সে প্রশ্ন মার্গারেট ডুডির ধারাতে কেউ তুলতেই পারেন।
আমাদের বাংলা উপন্যাসের প্রথম ইতিহাসকার শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বিখ্যাত বই ‘বঙ্গসাহিত্যে উপন্যাসের ধারা’তে একটা কথা তুলেছিলেন। মুকুন্দ চক্রবর্তীর চণ্ডীমঙ্গলের মধ্যে তিনি উপন্যাসের লক্ষণ খুঁজে পেয়ে বলেছিলেন, এ যুগে জন্মালে মুকুন্দ নিশ্চয় সার্থক উপন্যাস লিখতেন। কিন্তু আজ তো এই প্রশ্নও কেউ কেউ তুলতে পারেন যে মুকুন্দ যা লিখেছেন, বা সামগ্রিকভাবেই আমাদের মঙ্গলকাব্যগুলির মধ্যে উপন্যাস নেই – এটা ধরে নেব কেন? আমাদের উপন্যাসের ইতিহাস আমরা কেন মঙ্গলকাব্য থেকে শুরু করব না? একালে রামকুমার বাবুর ধনপতির সিংহল যাত্রা বা তারও আগে অমিয়ভূষণের চাঁদবেনেতে তো বঙ্কিমী ধারা থেকে সরে মঙ্গলকাব্যের ধারাটিকে আশ্রয় করে উপন্যাসে নতুন পরীক্ষানিরীক্ষার চেষ্টা হয়েছে। নাটকে এই নিরীক্ষা অনেক আগেই চালিয়েছিলেন বাংলাদেশের সেলিম আলদীন। ‘মধ্যযুগের বাঙলা নাট্য’ নামে বইটি এই কারণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
এমন নয় যে ব্যক্তিগতভাবে আমি এইভাবে উপন্যাস নামক সাহিত্যবর্গটিকে দেখতে চাই। আমি নিজে বরং আয়ান আয়াটের মতটির দিকেই ঝুঁকে থাকি। বাখতিনের পলিফনিক বা ডায়ালজিক সূত্র মাথায় নিয়েও উপন্যাসের ইতিহাসকে যেমন তেমনভাবে পিছিয়ে স্থাপন করা যায় না বলেই আমার মনে হয়। তবে এও ঠিক প্রাচীন আখ্যান নিয়ে এই সংক্রান্ত যথেষ্ট বিবেচনা আমরা এখনো করিনি; সিদ্ধান্ত পরের ব্যাপার। খোলামনে এই নিয়ে আলোচনা এগোনোটা অন্তত দরকার।
আকর
György Lukács, The Theory of the Novel: A Historico-philosophical Essay on the Forms of Great Epic Literature, MIT Press, 1974
György Lukács, The Historical Novel, University of Nebraska Press, 1983
György Lukács, Studies in European realism, Grosset & Dunlap, 1964
Mikhail Mikhaĭlovich Bakhtin, Rabelais and his world, Indiana University Press, 1984
Mikhail Mikhaĭlovich Bakhtin, The Dialogic Imagination: 4 Essays, University of Texas Press, 1988
Mikhail Mikhaĭlovich Bakhtin, Problems of Dostoevsky’s Poetics, Edited and Translated by Caryl Emerson, University of Minnesota Press, 1984
Ian Watt, The Rise Of The Novel: Studies in Defoe, Richardson and Fielding, Chatto & Windus, 1957
Michael McKeon, The Origins of the English Novel 1600-1740, Johns Hopkins University Press, 2002
Margaret Anne Doody, The True Story of the Novel, Rutgers University Press, 1996
দেবীপদ ভট্টাচার্য, উপন্যাসের কথা, সুপ্রকাশ প্রাইভেট লিমিটেড, ১৯৬১
agulo pore kichu janar icha.