হার না-মানা হারমোনিয়াম
দ্বারকানাথ ঘোষ। তাঁর কোম্পানির নাম Dwarkin & Sons; নামের এইরকম ইঙ্গ-করণ হয়েছিল সম্ভবত যুগের সঙ্গে তাল রাখতে গিয়ে। ব্রিটিশের উচ্চারণে এটা হয়েছিল ‘ডোয়ারকিন’। ১৮৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কোম্পানি নানারকম বাদ্যযন্ত্র তৈরি ও বিপণনে সাফল্য পায়—এর মধ্যে অন্যতম হারমোনিয়াম। কোম্পানির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, হারমোনিয়াম যন্ত্রের আধুনিক রূপটি আকার পেয়েছে দ্বারকানাথের হাতে। উনবিংশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে যে সময়টার কথা বলছি সেই সময় ভারতের ঘর-গেরস্থালিতে চেয়ারের ব্যবহার তেমন ছিল না। ফলে ইউরোপের হারমোনিয়াম এদেশে চলেনি। দাঁড় করানো সে যন্ত্র ছিল বেশ উঁচু এবং পা দিয়ে প্যাডেল করে সেটা থেকে আওয়াজ বের করতে হত।
ঘরের মেঝেতে বসে বাজানো যায় এমন হারমোনিয়াম বানালেন দ্বারকানাথ। রীড, কীবোর্ড আর বেলো এমনভাবে নকশা করলেন যাতে যন্ত্রটা ব্যবহার করা সহজ হয়, একইসঙ্গে সুবিধে হল তার মেরামতিতে।১ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাকি ১৮৮৮ সালে এই কোম্পানির তৈরি হারমোনিয়াম-এর প্রশংসা করে চিঠি দেন—মন্তব্য করেন, ভারতীয় সঙ্গীতের পক্ষে যন্ত্রটি বেশ উপযুক্ত। এর একশো বছর পরেও ডোয়ারকিন কোম্পানি সেই প্রশংসা নিয়ে বিজ্ঞাপন করত।২ সেই রবীন্দ্রনাথই ১৯৪০ সালে মৃত্যুর ঠিক আগে, ‘ছেলেবেলা’ বইতে লেখেন,
‘তখন হারমোনিয়ম আসেনি এদেশের গানের জাত মারতে। কাঁধের উপর তম্বুরা তুলে গান অভ্যেস করেছি। কল-টেপা সুরের গোলামি করিনি।’৩
বাহান্ন বছরের ব্যবধানে পাল্টে গিয়েছে হারমোনিয়ম সম্পর্কে কবির দৃষ্টিভঙ্গী? সাতাশ বছরের তরুণ রবীন্দ্রনাথ যে হারমোনিয়ম-কে পছন্দ করেছিলেন সেই বাদ্যযন্ত্র চোখের বিষ হয়ে উঠল পরিণত বয়সে! ব্যাপারটা হয়ত তেমন নয়। সমর্থনের যে চিঠিকে রবীন্দ্রনাথের লেখা বলে দাবি করেছিল ‘ডোয়ারকিন অ্যাণ্ড কোম্পানি’ সেটাকেই পরে সৌরীন্দ্রমোহন ঠাকুরের লেখা বলে উল্লেখ করে ওই একই কোম্পানি।৪ ফলে, অন্তত এই তথ্যের ভিত্তিতে কবির দৃষ্টিভঙ্গীতে বিবর্তন খোঁজা অর্থহীন।
হারমোনিয়াম যন্ত্রী
ফেরা যাক ডোয়ারকিন-এ। দ্বারকানাথ ঘোষের এক নাতির নাম জ্ঞানপ্রকাশ। বাদ্যযন্ত্র নিয়ে ব্যবসা, তাই হারমোনিয়াম-ক্ল্যারিওনেট-কর্নেট নিয়ে চর্চা লেগে থাকত কলকাতার ক্রিক রো-র বাড়িতে। স্বাভাবিকভাবে সেইসব যন্ত্রের সঙ্গে পরিচয় ঘটে গেল ছোটো জ্ঞানপ্রকাশের। পরবর্তীকালে বাদ্যযন্ত্রী হিসাবে তাঁর যে দক্ষতা, সুনাম তার সূচনা এখানেই। তবলা বাজানো এবং শেখানোয় তিনি ভারতবিখ্যাত। তবলার তালিম তিনি নিয়েছিলেন মসীত খান, আজিম খান প্রমুখের কাছে। এদিকে যাঁরা তাঁর হারমোনিয়াম বাজানো দেখেছেন তাঁদের কথাতে এ সম্পর্কে উচ্ছ্বাস ফুটে ওঠে। বিমান মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণে ধরা পড়ে জ্ঞানপ্রকাশের গুণের কথা,
‘… জ্ঞানদার হারমোনিয়াম বাজানো যে কি জিনিস তা তোমরা কল্পনাও করতে পারবে না। তাছাড়া সবসময় একটা নতুন কিছু করা, বা নতুনভাবে করা, এরকম স্বভাবের জন্যে সর্বদা যেন ছটফট করতেন। এরকম একজন সতত সৃজনশীল, আদ্যোপান্ত শিল্পীমনের মানুষ আর পাওয়া যাবে না।’৫
জ্ঞানপ্রকাশ কাজ করেছেন ‘অল ইণ্ডিয়া রেডিও’-তে। কত সালে তাঁর নিয়োগ, পদের নাম মিউজিক প্রোডিউসার নাকি অন্য কিছু তা নির্দিষ্ট করে জানা সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন ওয়েবসাইট ঘুরে কেবল জানা যায় যে পনেরো বছর ধরে তিনি ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’-তে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের দায়িত্বভার সামলেছিলেন। এই সময় লঘু সঙ্গীতেও তিনি নতুনত্ব আনেন। তবে নিজের লেখা বইতে তিনি জানিয়েছেন, ১৯৫৪ সালে ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’-র উদ্যোগেই তাঁর ইউরোপ সফরে যাওয়া।৬ ফলে অন্ততঃ সেই বছরটা যে তাঁর রেডিওর কাজের মেয়াদের মধ্যে পড়ে তা আমরা ধরে নিতে পারি। পরে আমরা জানতে পারব যে এই সময়ে ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’-তে হারমোনিয়াম নিষিদ্ধ ছিল। তাহলে কি হারমোনিয়াম-এ পটু জ্ঞানপ্রকাশ, যাঁর সঙ্গত পাওয়ার জন্য আকুল হয়ে থাকতেন পণ্ডিত ও ওস্তাদরা, হারমোনিয়াম না-বাজিয়েই সাঙ্গ করেছিলেন রেডিওর কর্মকাল? ভাবতে হয় বৈকি।
এরই পাশাপাশি উল্লেখ করতে হয় রবীন্দ্রনাথকে গান শোনানোর জন্য এক গায়ক-নায়কের কলকাতা থেকে শান্তিনিকেতন যাত্রার কথা—তিনি কুন্দনলাল সায়গল। হারমোনিয়াম বয়ে নিয়ে তিনি গুরুদেবের কাছে পৌঁছেছিলেন। সামনে বসে গেয়েছিলেন আর তারপর রবীন্দ্রনাথের লেখা গানের একটা শব্দ পরিবর্তন করার অনুমতি নিয়ে এসেছিলেন তাঁর অভিনীত সিনেমার জন্য।৭ অর্থাৎ হারমোনিয়াম-এর সঙ্গতে রবীন্দ্রনাথ নিজের লেখা গান সেদিন শুনেছিলেন—আপত্তি করেননি!
পাশ্চাত্যের পণ্ডিতরা
‘অল ইণ্ডিয়া রেডিও’ পাশ্চাত্যের দু’জন সঙ্গীতজ্ঞকে নিয়োগ করেছিল। বম্বেতে ওয়াল্টার কাউফম্যান (১৯০৭-১৯৮৪) এবং দিল্লীতে জন ফোল্ডস (১৮৮০-১৯৩৯)। ভারতীয় এবং পাশ্চাত্য সঙ্গীতের একটা সমন্বয় তৈরিতে আগ্রহী ছিলেন ফোল্ডস। তাঁর পরিকল্পনা প্রভাবিত করেছিল রবিশঙ্করকে, এই পথেই তিনি ‘অল ইণ্ডিয়া রেডিও’-র জন্য একটা অর্কেস্ট্রা তৈরিতে মনযোগী হয়েছিলেন। কিন্তু সেসব অনেক পরের কথা। এখানে যেটা বলার তা হল, ফোল্ডস হারমোনিয়াম যন্ত্রটিকে সহ্য করতে পারতেন ন । তাঁর মনে হয়েছিল ভারতীয় মার্গসঙ্গীত যে সূক্ষ্ণতা দাবি করে তা সৃষ্টি করতে অক্ষম এই যন্ত্র। ভারতের রেডিও থেকে হারমোনিয়াম-কে নির্বাসিত করার জন্য তিনিই দায়ী বলে অনেকে মনে করেন।৮ কিন্তু তাঁর উপরে এ ব্যাপারে কারও প্রভাব কি ছিল? অনেকে নির্দেশ করেন তাঁর স্ত্রী, বেহালা বাদক মড ম্যাকার্থির দিকে। ভারতীয় সঙ্গীত থেকে হারমোনিয়াম-কে বিসর্জন দিতে চাইতেন ম্যাকার্থি। ১৯১২ সালে ‘মডার্ন রিভিউ’-তে লেখা এক প্রবন্ধে তিনি তাচ্ছিল্য করেন এই বাদ্যযন্ত্রকে। তাঁর বক্তব্য ছিল, মিশনারীরা বিলেত থেকে আমদানি করেছে এটি। ইংল্যাণ্ড-এ কোনো ভদ্রঘরে এর ব্যবহার হয় না, বড়জোর রাস্তার পাশে বস্তিবাসীদের সমাবেশে দেখা যায় হারমোনিয়াম। তাঁদের ঐশ্বরীয় রাগরাগিনী পরিবেশনের জন্য ভারতীয়রা কিনা বেছে নিল হতচ্ছাড়া এই যন্ত্রকে! ম্যাকার্থির এই অভিমত তৈরি হয়ে থাকতে পারে ভারতে হোমরুলের সমর্থক অ্যানি বেসান্তের কারণে। প্রাচ্যের সঙ্গীতকে অনেক বেশি উন্নত বলে মনে করতেন বেসান্ত, পাশ্চাত্যের হারমনির থেকে ভারতীয় মেলডিকে সবসময় এগিয়ে রাখতেন তিনি।৯
ইংল্যাণ্ড-এর অন্য এক সঙ্গীত বিশারদ, রবীন্দ্রনাথের গানের ভক্ত আর্থার ফক্স স্ট্রাংওয়েজ একইভাবে বিরক্ত ছিলেন হারমোনিয়াম-এর ব্যাপারে। তাঁর দৃঢ় অভিমত ছিল, হারমোনিয়াম ব্যবহার করে নিজেদের সঙ্গীতের দফারফা করছেন ভারতীয় শিল্পীরা। আমাদের দেশে শিশুদের ঘুম পাড়ানোর জন্য যেসব গান প্রচলিত রয়েছে তার মধ্যে কেরালার একটি গান আকৃষ্ট করেছিল স্ট্রাংওয়েজকে। সেটা তিনি খুঁজে পান ত্রিবান্দ্রমে। সেখানকার রাজাকে সেই গান শুনিয়ে ছোটোবেলায় ঘুম পাড়ানো হত বলে তিনি জানতে পারেন। কিন্তু একজন শিল্পী যখন হারমোনিয়াম ব্যবহার করে সেই গান শোনাতে উদ্যত হলেন তখন বাধা দিলেন সাহেব। হারমোনিয়াম-এর উচ্চকিত আওয়াজ দোলনায় শুয়ে থাকা শিশুকে যে ঘুমোতে দেবে না তা তিনি ভালোভাবে বোঝালেন; সর্বনাশ হবে গানটিরও।১০ ম্যাকার্থির মতো ইনিও বলেন যে সস্তা গানবাজনার জন্য তৈরি হয়েছিল এই যন্ত্র। প্রায়ই বেসুরো হয়ে যায়; যদিও টিউনিং করে কিছুটা হাল ফেরানো যায়। ভারতের কোণায়-কোণায় পৌঁছে গিয়েছে এই বাক্স, রঙ্গমঞ্চে এর ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে, অচিরে মন্দিরের গানবাজনাকেও নষ্ট করবে হারমোনিয়াম।১১
এ ব্যাপারে খুব একটা ভিন্নমত পোষণ করেননি থিওসফির ধারায় দীক্ষিত, ভারতে অ্যানি বেসান্তের সহযোগী মার্গারেট কাজিন্স। তিন সপ্তকে ভাগ করা হারমোনিয়াম-এর ব্যাপারে নিজের অবজ্ঞা তিনি গোপন করেননি। ভারতে যন্ত্রটি আমদানি করা হয়েছে অস্ট্রিয়া থেকে যেখানে সেটা আখ্যা পেয়েছে ভিখারিদের যন্ত্র বলে। দাম কম, অল্প জায়গা নেয়, শুনে-শুনে অল্প সময়ে এর বাজানোর পদ্ধতি আয়ত্ত করা যায় কারণ স্বরগুলো নির্দিষ্ট করা আছে আগে থেকে। তাই যেকোনো তারযুক্ত বাদ্যযন্ত্রের তুলনায় সহজতর হারমোনিয়াম-বাজানো শেখা। ভারতের চিরাচরিত সঙ্গীত এই যন্ত্রের ব্যবহারে ধীরে-ধীরে পাশ্চাত্য সঙ্গীতের ছাঁচে ঢালা হয়ে যাচ্ছে। এই ছিল কাজিন্সের মতামত।১২
নিষেধপর্ব
সবার কাছে গানবাজনা পৌঁছে দিত ‘অল ইণ্ডিয়া রেডিও’। সেখানে অপছন্দের বিদেশি যন্ত্র ব্যবহৃত হয়ে চলেছে নিয়মিত। এই ব্যাপারটা মানতে পারছিলেন না হারমোনিয়াম-বিরোধীরা। তাই তাঁরা নানাভাবে চাপ বাড়াতে লাগলেন। ‘কন্ট্রোলার অফ ব্রডকাস্টিং’ লায়োনেল ফিলডেনের উপরে চাপ দিলেন জন ফোল্ডস। এদিকে বাংলায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কড়া বিরোধিতা তো ছিলই। পাশাপাশি মহাত্মা গান্ধী, জহরলাল নেহরু প্রমুখ জননেতাদের বিষ নজরে পড়েছিল হারমোনিয়াম। ফলে বোঝাই যাচ্ছিল যে ব্রিটিশ ভারতে রেডিওর স্টুডিওতে আর বেশিদিন ঠাঁই হবে না হারমোনিয়াম-এর। তাই হল অবশেষে। ১৯৪০ সালের পয়লা মার্চ থেকে বাতিল হল হারমোনিয়াম-এর ব্যবহার।১৩ এই নিষেধাজ্ঞায় কার মতামতের প্রভাব সবথেকে বেশি ছিল তা নির্ধারণ করা সহজ নয়। যেমন কলকাতা বেতারের সঙ্গে যুক্ত প্রশাসকের দৃঢ় অভিমত যে রবীন্দ্রনাথ চাননি বলেই হারমোনিয়াম বাতিল হয়। অন্যদের প্রভাবকে তুচ্ছ করেছেন লেখক।১৪ এই যুক্তি গ্রহণ করা কঠিন। লায়োনেল ফিলডেন কাজের দায়িত্ব বন্টনের সময় সারা ভারত থেকে যে ছ’জন তরুণকে বেছে নেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন কলকাতার অশোক কুমার সেন। পরে তিনিই কলকাতা কেন্দ্রের অধিকর্তা হন। তাঁর লেখা খুঁটিয়ে পড়লে নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে ভিন্নতর চিত্র পাওয়া যায়। সেন লিখেছেন,
‘ফিল্ডেনকে হার্মোনিয়ম সম্পর্কে কবির বিরূপ মনোভাবের কথা জানাতে ফিল্ডেন বললেন, তিনি নিজেও এ কথাই ভাবছিলেন। যাহোক, অল-ইন্ডিয়া রেডিও-র সমস্ত কেন্দ্র থেকে হার্মোনিয়ম বর্জনের নির্দেশ প্রদান করতে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার দরুণ তাঁকে আরো একটি বৎসর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত এই সুসংবাদটি কবিকে যখন জানালাম, তিনি আনন্দ প্রকাশ করে আমাকে একটি চিঠি লিখে জানান যে, আমাদের সংগীতের সংগে হারমোনিয়াম-এর ব্যবহারের যে প্রচলন রয়েছে তিনি বরাবরই তার সম্পূর্ণ বিরোধী এবং শান্তিনিকেতন আশ্রম থেকে হারমোনিয়মের ব্যবহার সম্পূর্ণ বর্জিত হয়েছে। তিনি আরো লেখেন যে, ‘অল-ইন্ডিয়া রেডিও’-র স্টুডিও-সমূহ থেকে যদি হারমোনিয়ম পরিত্যক্ত হয়, তাহলে ভারতীয় সংগীতের একটি প্রকৃত উপকার করব আমরা।’১৫ (বানান অপরিবর্তিত)
অর্থাৎ নিষেধাজ্ঞার বয়ান তৈরি হচ্ছিল অনেক আগে থেকেই, সময়-সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন রেডিও কর্তৃপক্ষ। রবীন্দ্রনাথের মতামত সেখানে একটা অনুঘটক, গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক, তার অতিরিক্ত কিছু নয়।
তবে সবাই যে সানন্দে এই নিষেধাজ্ঞা মেনে নেন তা নয়। হারমোনিয়াম-এর প্রয়োজনীয়তা যে ছিল তা স্বীকার করেছেন বহু নামী-অনামী শিল্পী। তাঁদের মধ্যেই কয়েকজন দিল্লী কেন্দ্রে এক অভিনব প্রতিবাদের আয়োজন করেন। শিল্পীরা স্টুডিও থেকে এগারোটি হারমোনিয়াম তুলে নিয়ে শোকযাত্রার ঢঙে রেডিওর প্রাঙ্গণ থেকে বেরিয়ে কবরের মধ্যে সেগুলি স্থাপন করেন। সমাধি হল হারমোনিয়াম-এর!
এমনই এক প্রতীকী প্রতিবাদ নাকি সংঘটিত হয়েছিল আওরঙ্গজেবের আমলে। সঙ্গীতের উপর যে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন তিনি তারই প্রতিবাদে এই কাজ করেছিলেন কিছু সঙ্গীতপ্রেমী।১৬
শিল্পীদের অসন্তোষ সঙ্গে নিয়েই হারমোনিয়াম-এর উপর নিষেধাজ্ঞা জারি রইল তিন দশক। তারপর ১৯৭০ সালে আকাশবাণীর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হল সঙ্গীত-নাটক অ্যাকাডেমির এক আলোচনাসভা। সেখানে ফের হারমোনিয়াম নিয়ে বিতর্কের ঝড় উঠল। আবার বিদেশী যন্ত্র সম্পর্কে চালু আপত্তির ভাষ্যগুলো উচ্চারিত হল। কিন্তু প্রতিবাদও ধ্বনিত হল কয়েকজনের কন্ঠে। এঁদের মধ্যে একজন ছিলেন দক্ষিণ ভারতের সঙ্গীত সমালোচক পি ভি সুব্রহ্মণিয়াম। তিনি বললেন, হারমোনিয়াম-এর উপর নিষেধাজ্ঞা জাতপাতের শাসনের মতো। এ যেন ইচ্ছে করে একটি বাদ্যযন্ত্রকে অস্পৃশ্য করে রাখার কৌশল। হারমোনিয়াম-এর ভারতীয়ত্ব প্রমাণ করতে তিনি এও বোঝানোর চেষ্টা করলেন, এই যন্ত্রে রীডের নকশা অনুসরণ করছে ভারতীয় এক যন্ত্রকে। উত্তর-পূর্ব ভারতে ব্যবহৃত হয় মুখ দিয়ে বাজানোর যন্ত্র রুসেম বা শেঙ। সেটা দেখেই হারমোনিয়াম-এ রীডের নকশা হয়েছে । এই দাবি কতটা বস্তুনিষ্ঠ তা জানা না-গেলেও সুব্রহ্মণিয়ামের মত প্রতিবাদী কিছু কন্ঠস্বর ছাপ রেখে গেল হারমোনিয়াম-এর সপক্ষে। বেতার কর্তৃপক্ষও সম্ভবত হারমোনিয়ামকে ফিরিয়ে আনার একটা সম্মানজনক পথ খুঁজছিলেন। সীমিত অনুমতি দেওয়া হল কিছুদিন পর থেকে। টপ গ্রেড এবং এ গ্রেড শিল্পীরা নিতে পারবেন হারমোনিয়াম-এর সহায়তা, বি গ্রেডের জন্য তার অনুমতি নেই। সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের অধিকর্তার অনুমতি নিয়ে সমবেত সঙ্গীতেও ব্যবহার করা যাবে হারমোনিয়াম। ধীরে-ধীরে আরও শিথিল হল এই যন্ত্র ব্যবহারের নিয়মকানুন।১৭
বলা বাহুল্য, এখন আর হারমোনিয়াম নিয়ে আপত্তি শোনা যায় না স্টুডিওর অন্দরে।
নানা স্বর
মীড়, গমক, শ্রুতি তৈরি করতে না-পারা হারমোনিয়াম-এ বাধাগুলো নিজেদের মত করে অনেকে দূর করেছিলেন। রেডিওতে নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারটা নিয়ে অসন্তোষ ছিল অনেকের মনের মধ্যে। এমনকি, সরাসরি প্রতিবাদের পথও বেছে নিয়েছিলেন কেউ-কেউ। হারমোনিয়াম বাদক পণ্ডিত মনোহর চিমোতে ‘অল ইণ্ডিয়া রেডিও’-র বিরুদ্ধে একটি প্রতীকী মামলাও করেন। মামলা সম্পর্কে বিশদে জানা সম্ভব না হলেও পণ্ডিত চিমোতে যে হেরে যান আদালতে তা জানা যায় অন্যান্য সঙ্গীতজ্ঞদের ভাষ্য থেকে।১৮ এ ব্যাপারে সমাজবিজ্ঞানীদের অভিমত কী তা জানা অপ্রাসঙ্গিক হবে না। তানপুরা, সারেঙ্গি ইত্যাদি তারবাদ্যকে অনেক সমাজবিজ্ঞানী বিগত দিনের সামন্ত প্রথার প্রতিভূ বলে মনে করেছেন। অতীতের খোলামেলা, অনেকটা জায়গা নিয়ে তৈরি দরবারে বা ঘরবাড়িতে সারেঙ্গি মানানসই থাকলেও আজকের দিনে সেটা নেহাৎই বেমানান বলে মন্তব্য বিকল্প ভাবনার শরিকদের।১৯ অ্যানি বেসান্ত, মার্গারেট কাজিন্স, মড ম্যাকার্থি প্রমুখের লেখায় হারমোনিয়াম-এর প্রতি অবজ্ঞার সঙ্গে মিশে ছিল সমাজের নিম্নবর্গের মানুষদের আচরণের প্রতি তাচ্ছিল্য। তাঁদের আলোচনায় নির্দিষ্ট এক ধরনের সঙ্গীতের প্রতি আকর্ষণ যেমন প্রকাশ পায় তেমনি ফুটে ওঠে অভিজাত থেকে যাওয়ার আগ্রহ।
কিন্তু বড়ো প্রশ্ন, রেডিওর নিষেধ হারমোনিয়াম সম্পর্কে কতটা অনাগ্রহ সৃষ্টি করতে পেরেছিল সমাজে? খুবি বেশি হয়ত নয়। রেডিওতে কাজ করা শিল্পীরা বাইরে গিয়ে বাজাতেন, শেখাতেন। চাকরির বাঁধা সময়ের বাইরে তাঁদের হারমোনিয়াম ব্যবহারে কোনো অসুবিধে ছিল না। কন্ঠশিল্পী যদি সারেঙ্গির বদলে হারমোনিয়াম-এর সঙ্গত চাইতেন তবে তাঁকে সেটা না-দেওয়ার কোনো কারণ ছিল না। রেডিও কর্তৃপক্ষও নিশ্চয়ই জানতেন সে কথা। আজকের ভাষায় বললে, বাজারের চাহিদার উপর কোনো ছাপ ফেলতে পারেনি রেডিওর নিষেধ।
এই প্রেক্ষিতেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় ১৯৭০ সালে আকাশবাণী আয়োজিত ওই আলোচনাসভা। সেখানে সুব্রহ্মণিয়ামের বক্তব্যের বিরোধিতা করে এস এন রতনজঙ্কার বলেছিলেন, আমি বুঝি না যে হারমোনিয়াম-এর মতো একটা যন্ত্রের জন্য এত আলোচনা, এত খরচ করা যায় কিনা! সভায় হারমোনিয়ামকে ফেরানোর চেষ্টায় অনেকেই সীমিত সম্মতি দেন। যে সব যুক্তি রাখা হয়েছিল তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য,
- কেবল সাধারণরাই নন, প্রখ্যাত সব শিল্পী যেমন গুলাম আলি খান, আব্দুল করিম খান প্রমুখও হারমোনিয়াম ব্যবহার করে চলেছেন।
- সারেঙ্গি বাজানোর জন্য উপযুক্ত মানুষের অভাব।
- গমগমে পুরুষ কন্ঠের সঙ্গে বেশ মানানসই হারমোনিয়াম।
- সারেঙ্গির মত প্রত্যেকবার বাজানোর সময় টিউন করতে হয় না হারমোনিয়াম। বয়ে নিয়ে যাওয়াও সহজ।
- বুনিয়াদী সঙ্গীতশিক্ষায় অপরিহার্য হয়ে উঠেছে হারমোনিয়াম।
উল্টোদিকের যুক্তিগুলো পাঠকের জানা হয়ে গেছে। হারমোনিয়াম-এর পক্ষে থাকা বক্তারা বললেন, প্রযুক্তির উন্নতির ফলে শ্রুতির দায়িত্ব নেওয়ার জন্য যোগ্য হয়ে উঠেছে হারমোনিয়াম। এর পরেই এই বাদ্যযন্ত্রের প্রত্যাবর্তন হল।
শেষ করার আগে পুরো ব্যাপারটাকে একবার অন্য চোখে দেখার চেষ্টা করা যায়। এদেশে হাত ও মস্তিষ্কের মধ্যে বিপুল ব্যবধানের কথা বলেছিলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। কর্মের অন্যান্য জগতের মতোই ভারতীয় গানের জগতে পণ্ডিত ও পারফর্মারের মধ্যে যোগ অতি ক্ষীণ। হারমোনিয়াম নিষিদ্ধ হয়েছিল দেশীয় পণ্ডিতদের সমর্থন সম্বল করে ব্রিটিশদের হাতে। পারফর্মাররা তাতে সায় দেননি। হারমোনিয়াম বাজিয়ে রোজগার করা বাদকের এইসব কাজে কোনো আগ্রহও ছিল না। এঁদের ক্ষেত্রে আধুনিক গবেষণাকর্মে চেনা শব্দ ‘সাবঅল্টার্ন’ প্রয়োগ করা যায় কিনা জানা নেই তবে পণ্ডিতদের অবস্থানের উল্টোদিকেই থেকেছেন এঁরা। হারমোনিয়াম-এর বাজারকে অগ্রাহ্য করার সাহস দেখাতে চাননি এই সঙ্গীতজ্ঞরা। তাই টিকে থেকেছে হারমোনিয়াম, দিনে-দিনে বেড়েছে তার কদর।
তথ্যসূত্র
১। The Invention of Hand Harmonium, https://web.archive.org/web/20070409051040/http://dwarkin.com/dwarkinaboutus.htm
২। Birgit Abels, The Harmonium in North Indian Music, 53 (New Age Books, Delhi, 2010).
৩। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ছেলেবেলা, ৩২ (বিশ্বভারতী গ্রন্থালয়, ভাদ্র ১৩৪৭)৷
৪। পূর্বে উল্লিখিত (দ্রষ্টব্য ২), ৭৬৷
৫। বিমান মুখোপাধ্যায়, বিমানে বিমানে আলোকের গানে, প্রথম সংস্করণ, জানুয়ারি, ৮৯ (১৯৯৯)৷
৬। জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ, এলেম নতুন দেশে, ৯ (সিগনেট প্রেস, আষাঢ় ১৩৬৩)৷
৭। পূর্বে উল্লিখিত (দ্রষ্টব্য ৫), ১১৬-১১৭৷
৮। David Lelyveld, Upon the Subdominant: Administering Music on All-India Radio, Social Text, No. 39. 111-127 (Summer, 1994).
৯। The Harmonium, Maddy’s Ramblings, (01 May 2023). https://maddy06.blogspot.com/2023/05/the-harmonium.html
১০। A. H. Fox Strangways, The Music of Hindostan, 63 (Oriental Books Reprint Corporation, 1914).
১১। ঐ, 163-164.
১২। Margaret E Cousins, The Music of Orient and Occident, 185 (B G Paul and Co. Publishers, 1935).
১৩। Saquib Salim, When Harmonium was banned at All India Radio, Heritage Times, (14 July 2024). https://www.heritagetimes.in/when-harmonium-was-banned-at-all-india-radio
১৪। অমলেন্দুবিকাশ করচৌধুরী, হারমোনিয়াম বন্ধ হল কেন, ভবেশ দাস ও প্রভাতকুমার দাস (সম্পাদক), কলকাতা বেতার ১৯২৭-১৯৭৭, ৩০১-৩০৪ (২০১১)৷
১৫। অশোককুমার সেন, আকাশবাণীর সংস্পর্শে রবীন্দ্রনাথ, বেতার জগৎ, (২২শে এপ্রিল ১৯৬১)৷
১৬। Matt Rahaim, That Ban(e) of Indian Music: Hearing Politics in The Harmonium, The Journal of Asian Studies 70(3), 657–682 (August) 2011.
১৭। ঐ
১৮। Kedar Naphade, A perspective on the Indian Harmonium, (27 Nov 2008) http://www.kedarnaphade.com/thanksgivingday.html#:~:text=gained%20critical%20acclaim.-,Pt.,the%20ban%20against%20the%20harmonium.
১৯। পূর্বে উল্লিখিত (দ্রষ্টব্য ১৬)
২০। পূর্বে উল্লিখিত (দ্রষ্টব্য ২), পৃষ্ঠা ৫৯-৬২