সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

বাংলার ‘প্রথম’ দুর্গাপূজা? – আচার, আখ্যান ও ইতিহাসের পুনর্নির্মাণ

বাংলার ‘প্রথম’ দুর্গাপূজা? – আচার, আখ্যান ও ইতিহাসের পুনর্নির্মাণ

আয়ূষ দে

অক্টোবর ৩১, ২০২৬ ৩১ 0

১

শরতের আকাশে কাশফুল ফুটলেই বাংলার মানুষের বুকে যে উৎসবটি সবচেয়ে গভীরভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, তার নাম দুর্গাপূজা। আজকের বাংলায় দুর্গাপূজা কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়; এটি একই সঙ্গে পারিবারিক স্মৃতি, পাড়ার সামাজিকতা, শিল্পচর্চা, অর্থনীতি, নগর-সংস্কৃতি এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু এই উৎসবের বর্তমান সর্বব্যাপী রূপের পিছনে যে দীর্ঘ ইতিহাস, তার শুরু কোথায়—এই প্রশ্নের উত্তর এত সহজ নয়।

‘বাংলার প্রথম দুর্গাপূজা’—এই কথাটিই আসলে একটি সমস্যাসঙ্কুল ঐতিহাসিক ধারণা। কারণ ‘প্রথম’ বলতেই ঐতিহাসিক মহলে প্রশ্ন উঠবে ‘প্রথম’ শব্দটির মাধ্যমে আমরা ঠিক কী বোঝাচ্ছি? দেবী দুর্গার প্রাচীনতম পূজা? শরৎকালের দুর্গোৎসবের সূচনা? কোনও রাজপরিবারের আয়োজিত বৃহৎ দুর্গা পূজা? কোনও জমিদার পরিবারের গৃহদেবীর পূজা? নাকি এমন একটি পূজা, যার ধারাবাহিকতা আজও কোনও পরিবারের মধ্যে অটুট রয়েছে? এই প্রশ্নগুলির প্রত্যেকটির উত্তর আলাদা হতে পারে। ফলে ইতিহাসের কাজ কোনও একটি প্রচলিত তারিখকে ‘প্রথম’ বলে চিহ্নিত করা নয়; বরং অনুসন্ধান করা — কোন সময়ে, কোন সামাজিক পরিসরে, কোন দেবী-রূপে এবং কোন আচারগত কাঠামোর মধ্যে দুর্গাপূজা বাংলায় তার বর্তমান অর্থ অর্জন করতে শুরু করেছিল।

এই প্রশ্নের জটিলতা আরও স্পষ্ট হয় যখন আমরা দুর্গাপূজার ইতিহাসকে কেবল একটি নির্দিষ্ট দেবীমূর্তির ইতিহাস হিসেবে না দেখে বৃহত্তর শাক্ত উপাসনার ইতিহাসের মধ্যে স্থাপন করি। বাংলায় দুর্গার পরিচয় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাবে ফুটে উঠেছে, কখনও তা মহিষাসুরমর্দিনী — অসুরবিনাশিনী যুদ্ধদেবী; কখনও তা চণ্ডী— স্থানীয় ও পুরাণপ্রসূত দেবী-উপাসনার সঙ্গে যুক্ত এক শক্তিস্বরূপ; কখনও আবার বাঙালির শরৎকালীন কল্পনার উমা — কৈলাস থেকে বাপের বাড়িতে ফিরে আসা কন্যা। এই বিভিন্ন দেবী-রূপ একে অপরের সঙ্গে সম্পূর্ণ অভিন্ন নয়। তবু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের আচার, কাহিনি ও লোকস্মৃতি এমনভাবে পরস্পরের মধ্যে প্রবেশ করেছে যে আধুনিক ‘দুর্গাপূজা’ একটি বহুস্তরীয় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক নির্মাণে পরিণত হয়েছে। বাংলার শাক্তধর্মের বহুমাত্রিকতা বোঝার জন্য June McDaniel দুর্গা ও কালী-সহ বিভিন্ন দেবী-উপাসনাকে লোকাচার, তন্ত্র, ভক্তি, পুরাণ ও আঞ্চলিক ধর্মীয় অনুশীলনের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে দিয়ে দেখেছেন।১

এই ইতিহাসের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল অকালবোধন। আজকের শরৎকালীন দুর্গাপূজাকে আমরা স্বাভাবিক বলেই জানি; কিন্তু ‘অকালবোধন’ শব্দটির মধ্যেই নিহিত রয়েছে একটি ঐতিহাসিক স্মৃতি—এই পূজা একসময় ‘অকাল’, অর্থাৎ প্রচলিত সময়ের বাইরে দেবীর জাগরণ ও আরাধনা হিসেবে কল্পিত হয়েছিল। বাঙালি রামায়ণের কাহিনিতে রামচন্দ্রের রাবণবধের পূর্বে শরৎকালে দেবী দুর্গার আরাধনার আখ্যান এই ধারণাকে বিশেষ সাংস্কৃতিক শক্তি দিয়েছে। কৃত্তিবাসী রামায়ণের জনপ্রিয় আখ্যান-পরম্পরায় রামের দুর্গাপূজা, দেবীর বোধন এবং একশো আটটি পদ্মের নিবেদনের কাহিনি এমন এক ধর্মীয় স্মৃতি নির্মাণ করে, যার সঙ্গে পরবর্তী বাংলার শরৎকালীন দুর্গোৎসবকে সহজেই যুক্ত করা যায়। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা প্রয়োজন: বাল্মীকির রামায়ণে এই আখ্যান নেই। অতএব রামের অকালবোধনকে ‘প্রাচীন রামায়ণের অবিকৃত ঐতিহ্য’ হিসেবে দেখা যায় না; বরং এটি রামায়ণের আঞ্চলিক পুনর্নির্মাণ এবং বাংলার নিজস্ব ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক কল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।২

এইখানেই সাহিত্য ও ইতিহাসের সম্পর্কটি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। কোনও আচার প্রথমে সাহিত্যে স্থান পেয়েছে, নাকি কোনও প্রচলিত আচারকে পরে সাহিত্যিক আখ্যানের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছে—এই প্রশ্নের উত্তর সবসময় সরল নয়। কৃত্তিবাসী রামায়ণের অকালবোধন তাই কেবল একটি পৌরাণিক গল্প নয়; এটি বাংলার শরৎকালীন দুর্গাপূজাকে একটি মহাকাব্যিক বৈধতা দেওয়ার সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ার অংশ মাত্র। একই সঙ্গে এটিও মনে রাখতে হবে যে কৃত্তিবাসী রামায়ণ নিজেও একটি স্থির, একক ও অপরিবর্তনীয় পাঠ নয়; এর দীর্ঘ পাণ্ডুলিপি-পরম্পরা এবং বিভিন্ন পাঠরূপের মধ্যে সংযোজন ও পরিবর্তনের ইতিহাস রয়েছে।৩

কিন্তু সাহিত্যিক আখ্যানের ইতিহাসের পাশাপাশি আমাদের ফিরে তাকাতে হয় রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের দিকে। বাংলায় বৃহৎ আকারে দুর্গাপূজার প্রচলন নিয়ে যে সব পারিবারিক ও আঞ্চলিক স্মৃতি আজও জীবিত, তাদের মধ্যে রাজা কংসনারায়ণের নাম বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রচলিত ইতিহাসে তাঁর সঙ্গে ষোড়শ শতকের শেষভাগে বৃহৎ আকারের শরৎকালীন দুর্গোৎসবের সূচনাকে যুক্ত করা হয়। আবার কলকাতার বৃহত্তর অঞ্চলের ইতিহাসে বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের ১৬১০ সালের দুর্গাপূজাও একটি বহুল-উদ্ধৃত তারিখ। কিন্তু এই তারিখগুলিকে পাশাপাশি রাখলেই একটি প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে ওঠে—এগুলিই কি সত্যিই বাংলার প্রথম দুর্গাপূজার প্রমাণ, নাকি এগুলি কেবল সেইসব পূজার মধ্যে সবচেয়ে সুপরিচিত যেগুলির পারিবারিক স্মৃতি পরবর্তীকালে লিখিত ইতিহাসে স্থায়ী হয়েছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য এই প্রবন্ধে একটি অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকানো হবে— হুগলি অঞ্চলের বসু পরিবার, খলিসানি এবং চন্দননগর-সংলগ্ন অঞ্চলের দুর্গাপূজার স্মৃতি। পারিবারিক ঐতিহ্যে করুণাময় বসুর সঙ্গে একটি প্রাচীন দুর্গাপূজার পুনরুজ্জীবনের কথা যুক্ত হয়েছে এবং ১৫০৮ সালকে সেই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ তারিখ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আমাদের সংগৃহীত পারিবারিক ও ঐতিহাসিক উপাদানে এই দাবি রবীন্দ্রকুমার বসুর লেখা চিঠির সূত্রে এসেছে; সেখানে করুণাময় বসুর খলিসানির সঙ্গে সম্পর্ক এবং পূর্বপুরুষের দুর্গাপূজা পুনরুজ্জীবনের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়েছে।৪

কিন্তু এখানেই ইতিহাসবিদের কাজ শুরু হয় — শেষ নয়। কারণ ১৫০৮ সালের একটি পারিবারিক স্মৃতি এবং সেই তারিখকে সমর্থনকারী সমকালীন দলিল—এই দু’টিকে একই জিনিস হিসেবে দেখা যাবে না। আবার পরবর্তী কোনও দলিল যদি পরিবারটির সামাজিক অবস্থান, রাজনৈতিক সম্পর্ক বা ধর্মীয় পৃষ্ঠপোষকতার প্রমাণ দেয়, তবুও তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ১৫০৮ সালের পূজার প্রতিষ্ঠার প্রমাণ হয়ে ওঠে না। বরং প্রত্যেকটি উৎসকে তার নিজস্ব কাল, ভাষা, উদ্দেশ্য এবং প্রেক্ষিতের মধ্যে পড়তে হবে।

এইখানেই আমাদের কাছে মুঘল দরবারের ফারসি দলিলের গুরুত্ব। ষোড়শ শতকের বাংলার প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক জগতে ফারসি ছিল ক্ষমতা, জমি, রাজস্ব ও পৃষ্ঠপোষকতার গুরুত্বপূর্ণ ভাষা। সেই পরিসর থেকে পাওয়া একটি ১৫৮০-এর দশকের ফারসি দলিল, যা বসু পরিবার ও সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে আলোকিত করে, এই দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত পারিবারিক স্মৃতিকে নতুনভাবে পরীক্ষা করার সুযোগ দেয়। দলিলটি আমাদের শুধু একটি তারিখের কাছে নিয়ে যায় না; বরং আমাদের জিজ্ঞাসা করতে বাধ্য করে—পরিবারটি তখন কোন সামাজিক অবস্থানে ছিল, তার সঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষমতার সম্পর্ক কী ছিল, এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা পূজার সঙ্গে সেই সম্পর্ককে কতদূর পর্যন্ত যুক্ত করা যায়?৫

অতএব এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য ‘কার পূজা আগে’—এই প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত রায় দেওয়া নয়। বরং উদ্দেশ্য হল ‘প্রথম দুর্গাপূজা’ ধারণাটিকেই ইতিহাসের পরীক্ষার সামনে দাঁড় করানো। মহিষমর্দিনী, দুর্গা ও চণ্ডীর পৃথক দেবী-পরম্পরা থেকে শরৎকালীন অকালবোধনের সাহিত্যিক নির্মাণ; সেখান থেকে রাজা কংসনারায়ণ, সাবর্ণ রায়চৌধুরী এবং বসু পরিবারের মতো আঞ্চলিক অভিজাত পরিবারের পূজা—এই সমস্ত স্তরকে একসঙ্গে পড়লে হয়তো বোঝা যাবে যে বাংলার দুর্গাপূজার ইতিহাস কোনও একক সূচনাবিন্দু থেকে তৈরি হয়নি। বরং এটি গড়ে উঠেছে দেবী-উপাসনার বহু পুরোনো স্তর, পুরাণ ও রামায়ণের আঞ্চলিক পুনর্লিখন, রাজনীতি ও জমির সম্পর্ক, পারিবারিক পৃষ্ঠপোষকতা, স্থানীয় স্মৃতি এবং লিখিত দলিলের দীর্ঘ আন্তঃসম্পর্কের মধ্য দিয়ে।

এই ইতিহাসে তাই ১৫০৮, ১৫৮০-এর দশক বা ১৬১০—কোনও একটি তারিখই একা যথেষ্ট নয়। আসল প্রশ্ন হল: সেই তারিখগুলির পিছনে কী ধরনের প্রমাণ রয়েছে, এবং সেই প্রমাণ আমাদের বাংলায় দুর্গাপূজার রূপান্তর সম্পর্কে কী বলতে পারে?

২

বাংলার দুর্গাপূজার ইতিহাস অনুসন্ধান করতে গেলে প্রথমেই একটি প্রচলিত ধারণা থেকে সরে আসতে হয়— সাধারণের ধারণায় দুর্গা, মহিষমর্দিনী ও চণ্ডী আদ্যন্ত একই দেবীর তিনটি অভিন্ন নাম, এবং তাঁদের উপাসনাও যেন একই ধারায়, একই সময়ে ও একই সামাজিক পরিসরে বিকশিত হয়েছে। ধর্মীয় বিশ্বাসের জগতে এই নামগুলির মধ্যে গভীর সংযোগ রয়েছে; কিন্তু ইতিহাসের দৃষ্টিতে তাদের প্রত্যেকটির নিজস্ব আখ্যান, প্রতীক, সাহিত্যিক পরম্পরা ও উপাসনাগত তাৎপর্য আছে। বাংলার শারদীয়া দুর্গোৎসব কীভাবে গড়ে উঠেছিল, তা বুঝতে হলে এই পার্থক্যগুলিকে অস্বীকার না করে বরং তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের ইতিহাস অনুসন্ধান করা জরুরি।

দেবীকে কেন্দ্র করে ভারতীয় ধর্মীয় কল্পনার দীর্ঘ ইতিহাসে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়: দেবীর পরিচয় কোনও একক, অপরিবর্তনীয় রূপে আবদ্ধ থাকেনি। তিনি কখনও বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃজনশীল শক্তি, কখনও যুদ্ধক্ষেত্রের অপরাজেয় যোদ্ধা, কখনও রোগ-ব্যাধি ও বিপদের সময় আশ্রয়দাত্রী, আবার কখনও সংসারের মঙ্গল ও সমৃদ্ধির অধিষ্ঠাত্রী। এই বহুরূপতার অর্থ এই নয় যে সমস্ত দেবী-পরম্পরা একই উৎস থেকে উৎপন্ন হয়েছিল; বরং বিভিন্ন আঞ্চলিক বিশ্বাস, পুরাণকথা, ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা এবং সামাজিক আচার দীর্ঘ সময় ধরে পরস্পরের সঙ্গে সংলাপে প্রবেশ করেছে। বাংলার দেবী-উপাসনার ইতিহাসও এই বৃহত্তর প্রক্রিয়ারই একটি বিশেষ অধ্যায়।৬

মহিষমর্দিনী রূপে দেবীর পরিচয়ের কেন্দ্রে রয়েছে মহিষাসুরের সঙ্গে তাঁর যুদ্ধ। এখানে দেবী মূলত এমন এক শক্তি, যিনি দেবতাদের সম্মিলিত শক্তির প্রতিমূর্তি হয়ে অসুরের আধিপত্যের অবসান ঘটান। দেবীমাহাত্ম্য বা দুর্গাসপ্তশতী নামে পরিচিত মার্কণ্ডেয় পুরাণের অংশে এই আখ্যানের সবচেয়ে প্রভাবশালী ধর্মতাত্ত্বিক রূপগুলির একটি পাওয়া যায়। গ্রন্থটির দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ অধ্যায়ে মহিষাসুরের বিরুদ্ধে দেবীর যুদ্ধ ও বিজয়ের বিবরণ রয়েছে। এই কাহিনিতে দেবী কেবল দেবতাদের সহায়তাকারী কোনও গৌণ শক্তি নন; তিনিই সেই কেন্দ্রীয় ক্ষমতা, যাঁর কাছে দেবতারাও পরাজিত অসহায়ত্ব থেকে মুক্তির প্রত্যাশা করেন।৭

এই আখ্যানের তাৎপর্য শুধু একটি অসুরবধের কাহিনিতে সীমাবদ্ধ নয়। মহিষাসুরের শক্তি দেবতাদের পরাভূত করে স্বর্গের অধিকার দখল করে; তার বিরুদ্ধে পুরুষ দেবতাদের সম্মিলিত শক্তিও কার্যকর হয় না। তখন দেবতাদের তেজ একত্রিত হয়ে এক দেবীর আবির্ভাব ঘটায়, যিনি তাঁদের প্রত্যেকের অস্ত্র ধারণ করলেও তাঁদের কারও অধীন নন। যুদ্ধের শেষে বিজয় তাঁর নিজের। ফলে মহিষমর্দিনী আখ্যান দেবীকে এমন এক সার্বভৌম শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে, যাঁর কর্তৃত্ব দেবতাদের ক্ষমতার সমষ্টিকেও অতিক্রম করতে পারে।

মহিষমর্দিনী মূর্তির দৃশ্যভাষায় এই ধারণার একটি সুস্পষ্ট প্রকাশ ঘটে। দেবী ও মহিষাসুরের সংঘর্ষ, দেবীর হাতে অস্ত্র, সিংহের উপস্থিতি এবং পরাভূত অসুরের শরীর—এই উপাদানগুলি একত্রে দেবীর সক্রিয় শক্তিকে দৃশ্যমান করে। মূর্তির প্রতিটি অংশ তাই নিছক অলংকার নয়; তা দেবীর বিজয়, শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং অশুভ শক্তির নিয়ন্ত্রণের ধর্মীয় বক্তব্য বহন করে। তবে এই পরিচিত মূর্তিরূপকে বাংলার শরৎকালীন দুর্গাপূজার সূচনার সঙ্গে সরাসরি এক করে দেখা চলে না। দেবীর মহিষাসুরবধের কাহিনি এবং একটি নির্দিষ্ট ঋতুতে, নির্দিষ্ট আচারবিধি অনুসারে, নির্দিষ্ট সামাজিক পরিসরে তাঁর পূজা—এগুলি ইতিহাসের পৃথক প্রশ্ন।

এই পার্থক্যটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কোনও অঞ্চলে মহিষমর্দিনী মূর্তির উপস্থিতি বা দেবীর যুদ্ধকাহিনির পরিচিতি থেকে সেখানে আজকের রীতিতে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হত বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। তার জন্য প্রয়োজন আচারবিধি, পঞ্জিকা, শিলালিপি, পাণ্ডুলিপি, দানপত্র অথবা সমকালীন বিবরণের মতো পৃথক প্রমাণ। দেবীর পৌরাণিক পরিচয়ের ইতিহাস আমাদের উপাসনার সাংস্কৃতিক পটভূমি জানায়; কিন্তু সেই পরিচয় কখন এবং কীভাবে নির্দিষ্ট উৎসবে রূপান্তরিত হল, তার উত্তর পেতে হলে আমাদের আরও গভীরে প্রবেশ করতে হবে।

দুর্গার ইতিহাসের সঙ্গে চণ্ডীর সম্পর্ক বুঝতে হলে সংস্কৃত পুরাণের দেবী-আখ্যান থেকে বাংলার আঞ্চলিক সাহিত্য ও লোকধর্মের জগতে প্রবেশ করতে হয়। ‘চণ্ডী’ নামটি একদিকে দেবীমাহাত্ম্য-এর দেবীর সঙ্গে যুক্ত, অন্যদিকে মধ্যযুগীয় বাংলায় চণ্ডীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা মঙ্গলকাব্যের বিস্তৃত পরম্পরারও প্রধান পরিচয়। এই দুই ক্ষেত্রের মধ্যে যোগসূত্র থাকলেও তাদের সাহিত্যিক উদ্দেশ্য ও সামাজিক পরিসর এক নয়।

দেবীমাহাত্ম্য-এ চণ্ডী কোনও দুর্বল বা নির্ভরশীল দেবী নন। তিনি অসুরবিনাশিনী, দেবতাদের রক্ষাকর্ত্রী এবং বিশ্বব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠাকারী শক্তি। কিন্তু বাংলার চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে দেবীর উপস্থিতি অনেক সময় আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবন, জীবিকা, সামাজিক মর্যাদা, বাণিজ্য, পারিবারিক সম্পর্ক এবং দেবীর স্বীকৃতি আদায়ের সঙ্গে। দেবী এখানে কেবল মহাজাগতিক যুদ্ধে বিজয়ী শক্তি নন; তিনি এমন এক দেবতা, যাঁর পূজা সমাজে প্রতিষ্ঠা পাওয়া, তাঁর মাহাত্ম্য স্বীকার করা এবং মানুষের সঙ্গে দেবীর সম্পর্ক স্থাপনের মধ্য দিয়েও প্রকাশিত হয়।

মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে চণ্ডীমঙ্গল ধারার গুরুত্ব এখানেই। এই কাব্যগুলি দেবীর মাহাত্ম্য প্রচারের পাশাপাশি এমন এক আখ্যানজগৎ নির্মাণ করে, যেখানে দেবীকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাঁর উপাসনা গ্রহণ করা সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চণ্ডীমঙ্গল-এর কালকেতু-উপাখ্যান কিংবা পরবর্তী চণ্ডীমঙ্গল-পরম্পরার ধনপতি ও শ্রীমন্তের কাহিনিগুলিতে দেবীর ক্ষমতা কেবল অলৌকিক শক্তির প্রদর্শন নয়; তা সামাজিক সম্পর্কের পুনর্বিন্যাসের সঙ্গেও যুক্ত। দেবী মানুষের জীবনযাত্রায় প্রবেশ করেন, তাঁর অনুগ্রহ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বা সামাজিক প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা তৈরি করে, আবার তাঁর উপেক্ষা বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

এই সাহিত্যিক পরিসরকে বাংলার ধর্মীয় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে দেখা যায়। তবে চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে চণ্ডীর মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে বলেই সেই কাব্যগুলিকে সরাসরি দুর্গাপূজার ইতিহাসের দলিল বলা যায় না। একজন দেবীর উপাসনার বিস্তার, তাঁর মাহাত্ম্য প্রচারের সাহিত্যিক কৌশল এবং শরৎকালে দুর্গার বার্ষিক পূজা—এই তিনটি বিষয় পরস্পর সম্পর্কিত হলেও একে অন্যের বিকল্প নয়। চণ্ডীমঙ্গল থেকে আমরা জানতে পারি দেবী-উপাসনা কীভাবে আঞ্চলিক সমাজের কল্পনা ও সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে প্রবেশ করেছিল; কিন্তু কোনও নির্দিষ্ট পরিবার কখন দুর্গাপূজা শুরু করেছিল, তা জানতে হলে পৃথক দলিলের প্রয়োজন হবে।

এই সতর্কতা আরও একটি কারণে জরুরি। বাংলার আঞ্চলিক দেবী-উপাসনার জগৎকে কেবল সংস্কৃত পুরাণের দেবীদের স্থানীয় সংস্করণ হিসেবে দেখলে তার নিজস্ব ইতিহাস আড়াল হয়ে যায়। চণ্ডীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিভিন্ন কাহিনি, আচার ও বিশ্বাসের মধ্যে একদিকে পুরাণপ্রসূত দেবী-ভাবনার প্রভাব রয়েছে, অন্যদিকে স্থানীয় সমাজের নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও ধর্মীয় চাহিদাও কাজ করেছে। Saswati Sengupta দেখিয়েছেন, চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে চণ্ডীর বহুমাত্রিক পরিচয়কে শিবের পত্নী হিসেবে একটি অধিক নিয়ন্ত্রিত ধর্মীয় কাঠামোর মধ্যে স্থাপন করার প্রক্রিয়াও লক্ষ করা যায়। তাঁর আলোচনায় এই সাহিত্যিক রূপান্তর কেবল ধর্মীয় কাহিনির পরিবর্তন নয়; বরং দেবীকে ব্যাখ্যা করার সামাজিক ও লিঙ্গভিত্তিক ক্ষমতার প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত।৮

অতএব, চণ্ডী ও দুর্গার সম্পর্ককে একরৈখিক বিবর্তন হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। বরং দেখতে হবে কীভাবে বিভিন্ন দেবী-পরম্পরা একই বৃহত্তর ধর্মীয় পরিসরে পাশাপাশি অবস্থান করেছে, একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছে এবং কখনও কখনও একে অন্যের বৈশিষ্ট্য গ্রহণ করেছে। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফলেই কোনও অঞ্চলে দেবীর একাধিক নাম ও রূপ একই ধর্মীয় অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু সেই সাংস্কৃতিক নৈকট্যকে তাদের উৎপত্তি বা উপাসনার ইতিহাসের অভিন্নতার প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।

মহিষমর্দিনী ও চণ্ডীর যুদ্ধময়, শক্তিশালী এবং কখনও ভয়ংকর পরিচয়ের পাশাপাশি বাংলায় দুর্গার আর একটি বিশেষ রূপ ক্রমশ সাংস্কৃতিক তাৎপর্য অর্জন করেছে— তিনি উমা, হিমালয় ও মেনকার কন্যা, যিনি স্বামী শিবের গৃহ থেকে শরৎকালে পিতৃগৃহে ফিরে আসেন। এই পরিচয়ে দেবীর সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের প্রকৃতি বদলে যায়। যুদ্ধক্ষেত্রের অপরাজেয় দেবী এখানে একই সঙ্গে ঘরের মেয়ে; তাঁর আগমন ও বিদায়ের মধ্যে বাঙালি পরিবার, মাতৃত্ব, কন্যার বিবাহ-পরবর্তী জীবন এবং বাপের বাড়ির স্মৃতিকে নতুন অর্থে কল্পনা করে।

এই উমা-ভাবনা দুর্গাপূজার সামাজিক অনুভূতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। দেবীকে কেবল দূরবর্তী মহাশক্তি হিসেবে নয়, ঘরের আপনজন হিসেবে ভাবার ফলে তাঁর আগমন একটি পারিবারিক ও আবেগঘন ঘটনায় পরিণত হয়। বিজয়ার বিদায়ে যে বিষাদ, আগমনী গানে যে আকুলতা এবং দেবীকে কন্যারূপে কল্পনা করার যে ঐতিহ্য, সেগুলি দেবীর যুদ্ধজয়ের পৌরাণিক আখ্যানের থেকে ভিন্ন এক অনুভূতির জগৎ নির্মাণ করে। এখানে দেবীর মাহাত্ম্য শুধু অসুরবধের মধ্যেই নিহিত নয়; তাঁর সঙ্গে মানুষের আত্মীয়তার কল্পনাতেও নিহিত।

তবে এই সাংস্কৃতিক রূপান্তরকে ‘প্রাচীন দেবী-উপাসনা থেকে আধুনিক দুর্গাপূজা’ পর্যন্ত একটি সরল রেখা হিসেবে দেখা উচিত নয়। উমা, পার্বতী, দুর্গা ও মহিষমর্দিনীর পরিচয় বিভিন্ন পুরাণ, কাব্য, আচার ও আঞ্চলিক ঐতিহ্যে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে প্রকাশিত হয়েছে। বাংলার ধর্মীয় সংস্কৃতিতে এই পরিচয়গুলি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যে দুর্গার রূপ নির্মাণ করেছে, তা দীর্ঘ সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ফল। June McDaniel-এর বাংলার শাক্তধর্ম নিয়ে গবেষণায়ও দেবী-উপাসনার বিভিন্ন প্রবণতা— লোকধর্ম, তন্ত্র, যোগসাধনা এবং ভক্তি— একটি বহুমাত্রিক ধর্মীয় জগতের মধ্যে আলোচিত হয়েছে।৯

এই পারিবারিক অনুভূতির সঙ্গে দেবীর শক্তিময় পরিচয়ের কোনও অনিবার্য বিরোধ নেই। একই দেবী একদিকে মহিষাসুরকে বধ করতে পারেন, অন্যদিকে কন্যারূপে মায়ের কাছে ফিরে আসতে পারেন। বরং এই দুই পরিচয়ের সহাবস্থানই বাংলার দুর্গাপূজার সাংস্কৃতিক শক্তির একটি প্রধান উৎস। পূজার মণ্ডপে যে দেবী অসুরবিনাশিনী, আগমনী গানে তিনিই উমা; পুরাণের যোদ্ধা দেবী এবং পরিবারের আদরের কন্যা একই বৃহত্তর ধর্মীয় কল্পনায় মিলিত হন।

কিন্তু এখানেও একটি মৌলিক পার্থক্য মনে রাখতে হবে: দেবীকে কন্যারূপে কল্পনা করা এবং তাঁকে শরৎকালে নির্দিষ্ট তিথি, মন্ত্র, বোধন ও অন্যান্য আচার অনুসারে পূজা করা এক বিষয় নয়। প্রথমটি দেবীর সাংস্কৃতিক ও আবেগগত পরিচয়ের ইতিহাস; দ্বিতীয়টি পূজার আচারগত ইতিহাস। তাদের মধ্যে সম্পর্ক থাকলেও সেই সম্পর্ককে প্রমাণ করতে হবে সাহিত্য, আচারবিধি এবং সমকালীন বিবরণের সাহায্যে।

এতক্ষণকার আলোচনা থেকে একটি মৌলিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়। মহিষমর্দিনী, চণ্ডী ও উমা—এই তিনটি পরিচয় বাংলার দুর্গাপূজার সাংস্কৃতিক পটভূমি বোঝার জন্য অপরিহার্য; কিন্তু তাদের কোনও একটিকেই দুর্গাপূজার একমাত্র উৎস বলে চিহ্নিত করা যায় না। মহিষমর্দিনীর আখ্যান দেবীর যুদ্ধজয় ও সার্বভৌম শক্তির ধারণা ব্যাখ্যা করে। চণ্ডীমঙ্গল কাব্য দেবী-উপাসনার আঞ্চলিক বিস্তার এবং মানুষের সামাজিক জীবনের সঙ্গে দেবীর সম্পর্ক অনুসন্ধানের সুযোগ দেয়। উমার কন্যারূপ বাঙালির পারিবারিক স্মৃতি ও আবেগের জগতে দুর্গাকে প্রতিষ্ঠা করে। এই পৃথক প্রবণতাগুলি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বাংলার দেবী-উপাসনার বহুমাত্রিক ঐতিহ্য গড়ে তুলেছে।

কিন্তু এই ইতিহাস থেকে সরাসরি কোনও নির্দিষ্ট পরিবারের দুর্গাপূজার সূচনাবর্ষ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। একটি সাহিত্যিক গ্রন্থে দেবীর মাহাত্ম্য বর্ণিত হওয়া, কোনও প্রত্নবস্তুতে মহিষমর্দিনী মূর্তির উপস্থিতি এবং কোনও পরিবারের বার্ষিক পূজার প্রাচীনত্ব— এগুলি পৃথক ধরনের ঐতিহাসিক তথ্য। একটির প্রমাণ অন্যটির প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করলে ইতিহাসের কালক্রমে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।

সুতরাং বাংলার ‘প্রথম দুর্গাপূজা’ অনুসন্ধানে প্রথম কাজ হল দেবী-উপাসনার প্রাচীনতা এবং নির্দিষ্ট আচার-অনুষ্ঠানের প্রাচীনতার মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা। মহিষমর্দিনী বা চণ্ডীর পূজার ঐতিহ্য প্রাচীন হতে পারে; কিন্তু তার দ্বারা প্রমাণিত হয় না যে আজকের পরিচিত রীতিতে শরৎকালীন দুর্গোৎসব একই সময় থেকেই অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। আবার কোনও পরিবারের পূজার লিখিত প্রমাণ অপেক্ষাকৃত পরবর্তী সময়ের হলেই যে তার আগে সেই পরিবারে কোনও পূজা ছিল না, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না। লিখিত প্রমাণের অনুপস্থিতি এবং ঐতিহাসিক ঘটনার অনুপস্থিতি এক কথা নয়— তবে প্রমাণের সীমা স্বীকার করাও ইতিহাসচর্চার মৌলিক শর্ত।

এই পার্থক্য মাথায় রেখেই পরবর্তী অধ্যায়ে অকালবোধনের আখ্যানের দিকে এগোনো দরকার। কারণ দেবীর বহুমাত্রিক পরিচয় থেকে শরৎকালীন পূজার বিশেষ আচারগত রূপে পৌঁছনোর পথে রামায়ণের আঞ্চলিক পাঠ, বিশেষত বাংলার রামায়ণ-পরম্পরা, একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে: কীভাবে শরৎকালের দেবী-আরাধনা রামের রাবণবধের আখ্যানের সঙ্গে যুক্ত হল, এবং সেই সংযোগ বাংলার দুর্গাপূজার সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যাকে কীভাবে প্রভাবিত করল?

চিত্র-১: দেবী দুর্গা

৩

বাংলার শারদীয়া দুর্গাপূজার ইতিহাসে ‘অকালবোধন’ এমন একটি ধারণা, যার মধ্যে ধর্মীয় আচার, পুরাণকথা এবং আঞ্চলিক সাহিত্য-সংস্কৃতির দীর্ঘ ইতিহাস এসে মিলিত হয়েছে। আজ আশ্বিন মাসে দুর্গার বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসকে আমরা পূজার স্বাভাবিক সূচনা হিসেবে দেখি। কিন্তু এই আচারের ঐতিহাসিক তাৎপর্য বুঝতে হলে একটি মৌলিক প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন: শরৎকালেই দুর্গার আরাধনা কেন বাংলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসবে পরিণত হল?

এই প্রশ্নের উত্তর কেবল রামচন্দ্রের রাবণবধের কাহিনির মধ্যে খুঁজলে চলবে না। কারণ শরৎকালে দেবী দুর্গার পূজার আচারগত ইতিহাস এবং সেই পূজাকে রামায়ণের সঙ্গে যুক্ত করার সাহিত্যিক ইতিহাস পরস্পর সম্পর্কিত হলেও অভিন্ন নয়। দেবীর শরৎকালীন উপাসনার একটি ধর্মীয় ও আচারগত পরম্পরা ছিল; অন্যদিকে রামের অকালবোধনের কাহিনি এই ঋতুকালীন উপাসনাকে এক মহাকাব্যিক ব্যাখ্যা দিয়েছে। এই দুই ধারার পারস্পরিক সম্পর্ক অনুসন্ধান করলেই বোঝা যায়, কীভাবে বাংলার দুর্গাপূজা একটি বিশেষ আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক অর্থ অর্জন করেছিল।

দুর্গার পূজার ক্ষেত্রে বসন্ত ও শরৎ—এই দুই ঋতুর উল্লেখ গুরুত্বপূর্ণ। বসন্তকালীন বাসন্তীপূজা দেবীর আরাধনার একটি স্বীকৃত রূপ। কিন্তু বাংলায় শরৎকালীন দুর্গোৎসব ক্রমে যে ব্যাপক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অর্জন করে, তা ব্যাখ্যা করতে গেলে কেবল আচারবিধির দিকে তাকালে হবে না; দেখতে হবে কীভাবে ধর্মীয় সাহিত্য, আঞ্চলিক কাব্য এবং লোকস্মৃতি শরৎকালকে দেবীর আগমন ও পূজার বিশেষ সময় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।

বিহানি সরকারের মধ্যযুগীয় বাংলার দুর্গাপূজা-সংক্রান্ত গবেষণা (Heroic Shāktism) এই প্রসঙ্গে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। রঘুনন্দন ভট্টাচার্যের দুর্গাপূজাতত্ত্ব এবং সংশ্লিষ্ট সংস্কৃত আচারগ্রন্থের সাহায্যে তিনি চতুর্দশ থেকে ষোড়শ শতকের বাংলায় দুর্গাপূজার সম্ভাব্য আচারগত কাঠামো পুনর্গঠনের চেষ্টা করেছেন। তাঁর গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, মধ্যযুগীয় বাংলায় ধর্মীয় আচার সম্পর্কে প্রত্যক্ষ বিবরণ সীমিত হলেও বিধিবদ্ধ আচারগ্রন্থগুলি পূজার প্রকৃতি, ক্রম এবং ধর্মীয় ব্যাখ্যা বুঝতে সাহায্য করে। তবে এই ধরনের গ্রন্থ মূলত কীভাবে পূজা করা উচিত, তা নির্ধারণ করে; ফলে এগুলিকে সমকালীন প্রতিটি পূজার সরাসরি বিবরণ হিসেবে ব্যবহার না করে, অন্যান্য প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে পড়া প্রয়োজন।

এই পার্থক্যটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোনও আচারগ্রন্থে শরৎকালীন দুর্গাপূজার সুসংহত বিধান পাওয়া গেলে তা প্রমাণ করে যে সংশ্লিষ্ট সময়ে এই পূজার একটি প্রতিষ্ঠিত শাস্ত্রীয় কাঠামো ছিল। কিন্তু সেই গ্রন্থ থেকে কোনও নির্দিষ্ট একটি জমিদার পরিবারের বা রাজপরিবারের বা গ্রামের পূজার প্রতিষ্ঠাবর্ষ নির্ধারণ করা যায় না। একইভাবে, পরবর্তী সাহিত্যিক আখ্যান কোনও আচারের ধর্মীয় ব্যাখ্যা দিলেও তা থেকে সরাসরি সেই আচারের ঐতিহাসিক সূচনা নির্ণয় করা সম্ভব নয়।

অতএব, অকালবোধনের ইতিহাসে আমাদের দুটি প্রশ্ন পাশাপাশি রাখতে হবে: প্রথমত, শরৎকালে দুর্গাপূজার আচার কীভাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল; দ্বিতীয়ত, রামচন্দ্রের দুর্গারাধনার কাহিনি কীভাবে এই আচারকে ব্যাখ্যা ও বৈধতা দেওয়ার একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক মাধ্যম হয়ে উঠল।

বাল্মীকি-প্রচলিত সংস্কৃত রামায়ণ-এর যুদ্ধকাণ্ডে রাম ও রাবণের চূড়ান্ত সংঘর্ষের আগে দেবী দুর্গার পূজার সেই পরিচিত কাহিনি নেই, যেখানে রাম শরৎকালে দেবীকে জাগিয়ে একশো আটটি নীলপদ্ম নিবেদন করেন এবং একটি পদ্মের অভাবে নিজের চোখ উৎসর্গ করতে উদ্যত হন। যুদ্ধের পূর্বপ্রস্তুতিতে রামকে অন্য ধর্মীয় ও নৈতিক কাঠামোর মধ্যে উপস্থাপন করা হয়েছে। যুদ্ধকাণ্ডের ১০৫তম সর্গে অগস্ত্য মুনি রামকে আদিত্যহৃদয় স্তোত্র শিক্ষা দেন; সেখানে সূর্যের উপাসনা রামের মনোবল ও বিজয়ের প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার: বাল্মীকি রামায়ণে দুর্গার এই নির্দিষ্ট পূজার কাহিনি অনুপস্থিত—এ কথা বলার অর্থ এই নয় যে সংস্কৃত সাহিত্যের বৃহত্তর পরিসরে রাম ও দুর্গার সম্পর্ক নিয়ে কোনও কাহিনি ছিল না। বরং বক্তব্যটি নির্দিষ্ট: বাংলার দুর্গাপূজার সঙ্গে বহুল পরিচিত যে অকালবোধন-আখ্যান যুক্ত, সেটি বাল্মীকি রামায়ণের যুদ্ধকাণ্ডে এই রূপে বর্ণিত হয়নি। পরবর্তী পুরাণ ও আঞ্চলিক রামায়ণ-পরম্পরায় রামের দুর্গারাধনার বিভিন্ন রূপ দেখা যায়। ফলে ‘রাম দুর্গাপূজা করেছিলেন’—এই বাক্যটির ঐতিহাসিক মূল্যায়ন করতে গেলে আগে জানতে হবে, কোন গ্রন্থ বা কোন আখ্যান-পরম্পরার কথা বলা হচ্ছে।

এই পাঠগত পার্থক্যের তাৎপর্য গভীর। পরবর্তী কোনও আঞ্চলিক কাব্যে নতুন একটি আচারগত পর্ব যুক্ত হওয়া মানেই যে কবি কোনও ঐতিহাসিক ঘটনা হুবহু সংরক্ষণ করছেন, তা নয়। বরং সেই সংযোজনের মাধ্যমে কবি একটি পরিচিত ধর্মীয় অনুশীলনকে মহাকাব্যের কেন্দ্রীয় কাহিনির সঙ্গে যুক্ত করতে পারেন। রামায়ণের আঞ্চলিক পুনর্লিখন এই অর্থে কেবল পুরোনো কাহিনির অনুবাদ নয়; তা নতুন ধর্মীয় অর্থ নির্মাণেরও একটি প্রক্রিয়া।

বাংলার দুর্গাপূজার ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়াটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। রামচন্দ্রের অকালবোধনকে যদি কেবল পৌরাণিক অতীতের একটি ঘটনা হিসেবে পড়ি, তাহলে আমরা বুঝতে পারব না কেন এই আখ্যান বাংলার শরৎকালীন পূজার সঙ্গে এত নিবিড়ভাবে যুক্ত হয়েছে। কিন্তু যদি একে আঞ্চলিক রামায়ণের একটি সাহিত্যিক সংযোজন হিসেবে দেখি, তাহলে প্রশ্নটি আরও ফলপ্রসূ হয়ে ওঠে: কোন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিস্থিতিতে দেবীর শরৎকালীন পূজা রামের বিজয়ের প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত হল?

এই তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেখায় যে রামের দুর্গারাধনার কাহিনিকে একটি মাত্র গ্রন্থের মধ্যে আবদ্ধ করে দেখা যায় না। বিভিন্ন ধর্মীয় পাঠে এই আখ্যানের উপস্থিতি, বিন্যাস ও গুরুত্বের পার্থক্য রয়েছে। কোনও কোনও পাঠে দেবীর পূজা রামের বিজয়লাভের উপায় হিসেবে উপস্থিত; অন্যত্র দেবীর মাহাত্ম্য, ঋতুকালীন উপাসনা অথবা পূজার ধর্মীয় বিধান বৃহত্তর তাৎপর্য অর্জন করে। প্রতিটি পাঠের রচনাকাল, পাঠ-পরম্পরা এবং আঞ্চলিক প্রভাব সম্পর্কে পৃথক অনুসন্ধান ছাড়া তাদের মধ্যে সরল কালানুক্রমিক সম্পর্ক স্থাপন করা উচিত নয়।

এখানে আরও একটি পার্থক্য মনে রাখা জরুরি: অকালবোধন, অর্থাৎ দেবীর ‘অসময়ে বোধন’, এবং শরৎকালে দুর্গাপূজার সম্পূর্ণ আচারবিধি এক বিষয় নয়। বোধন হল দেবীকে জাগ্রত ও পূজার জন্য আহ্বান করার একটি নির্দিষ্ট আচারগত পর্ব; অন্যদিকে দুর্গাপূজা একটি বহুদিনব্যাপী আচারসমষ্টি, যার মধ্যে দেবীর অধিষ্ঠান, উপাসনা, নৈবেদ্য, বলি বা তার বিকল্প আচার, সন্ধিক্ষণের পূজা এবং বিসর্জনের মতো বিভিন্ন উপাদান থাকতে পারে। রঘুনন্দনের দুর্গাপূজাতত্ত্ব মধ্যযুগীয় বাংলায় এই আচারগুলির বিন্যাস বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বিহানি সরকারের আলোচনায় ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় বেলগাছে বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের পর সপ্তমীতে প্রতিমা ও নবপত্রিকার প্রতিষ্ঠার যে ক্রম পুনর্গঠিত হয়েছে, তা দেখায় যে বোধন বৃহত্তর আচারপর্বের একটি অংশ।

সুতরাং অকালবোধনের কাহিনি দুর্গাপূজার ধর্মীয় অর্থ ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করলেও, পূজার প্রতিটি আচার কীভাবে গড়ে উঠেছিল, তার সম্পূর্ণ ইতিহাস এই কাহিনির মধ্যে পাওয়া যায় না। আচারগ্রন্থ, পুরাণ এবং আঞ্চলিক মহাকাব্য—প্রতিটি উৎস আলাদা ধরনের তথ্য দেয়। তাদের একত্রে পড়লে ইতিহাসের একটি সমৃদ্ধতর চিত্র তৈরি হতে পারে, কিন্তু কোনও একটি উৎসকে অন্য সব উৎসের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।

এই বহুমাত্রিকতার মধ্যেই অকালবোধনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিহিত। এটি কেবল রামচন্দ্রের পূজার কাহিনি নয়; এটি এমন একটি ব্যাখ্যামূলক আখ্যান, যার মাধ্যমে শরৎকালীন দুর্গাপূজা মহাকাব্যিক অতীতের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে। দেবীর আরাধনা এখানে একদিকে যুদ্ধজয়ের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তির আহ্বান, অন্যদিকে দেবীর সময়, জাগরণ ও পূজার উপযুক্ততা নিয়ে ধর্মীয় চিন্তারও অংশ।

অকালবোধনের বহুল পরিচিত কাহিনিতে রাবণের সঙ্গে চূড়ান্ত যুদ্ধের আগে রাম দেবীর আশীর্বাদ লাভের জন্য দুর্গার পূজা করেন। প্রচলিত কাহিনির একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্বে একশো আটটি নীলপদ্ম নিবেদনের কথা বলা হয়। একটি পদ্ম অনুপস্থিত থাকায় রাম নিজের পদ্মসদৃশ চোখ উৎসর্গ করতে উদ্যত হন; তাঁর এই আত্মনিবেদনের সংকল্পে দেবী সন্তুষ্ট হন এবং তাঁকে আশীর্বাদ করেন। এই আখ্যানের বিভিন্ন পাঠে বিবরণের তারতম্য থাকতে পারে; তাই কোনও একটি জনপ্রিয় পুনর্কথনকে কৃত্তিবাসী রামায়ণের সব পাণ্ডুলিপি বা সংস্করণের অভিন্ন পাঠ বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়।

কাহিনিটির ধর্মীয় তাৎপর্য একাধিক স্তরে কাজ করে। প্রথমত, রাম এখানে এমন এক যোদ্ধা, যিনি নিজের শক্তির উপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করে দেবীর অনুগ্রহ প্রার্থনা করেন। দ্বিতীয়ত, দেবী যুদ্ধের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেন। তৃতীয়ত, রামের পূজা ও আত্মনিবেদনের মধ্য দিয়ে দেবীর সঙ্গে ভক্তের সম্পর্কের একটি আদর্শ রূপ প্রতিষ্ঠিত হয়। রামের বীরত্ব এখানে দেবীর শক্তির বিরোধী নয়; বরং দেবীর আশীর্বাদ লাভের মধ্য দিয়ে তাঁর বিজয়ের সম্ভাবনা পূর্ণতা পায়।

এই আখ্যানের আর একটি তাৎপর্য রয়েছে। রামায়ণের যুদ্ধকাহিনিকে শরৎকালীন দুর্গাপূজার সঙ্গে যুক্ত করার ফলে বাংলার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব মহাকাব্যিক সময়ের মধ্যে স্থান পায়। পূজা তখন আর কেবল একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের ঋতুভিত্তিক আচার নয়; তা রাম-রাবণের যুদ্ধের মতো পরিচিত মহাকাব্যিক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত একটি ধর্মীয় অনুশীলন হয়ে ওঠে। এর ফলে দুর্গাপূজার আঞ্চলিক রীতির জন্য এক বৃহত্তর ধর্মীয় ব্যাখ্যা তৈরি হয়।

তবে এই প্রক্রিয়াকে একমুখী বলা যাবে না। কৃত্তিবাসী রামায়ণ যে শরৎকালীন দুর্গাপূজার সাংস্কৃতিক স্বীকৃতিকে শক্তিশালী করেছে, সেই সম্ভাবনা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু শুধু এই কাহিনি থেকেই প্রমাণ করা যায় না যে বাংলায় শরৎকালীন পূজা প্রথম কৃত্তিবাসের রচনার পরেই শুরু হয়েছিল। কোনও আচার সাহিত্যে জনপ্রিয়তা পাওয়ার আগে থেকেই প্রচলিত থাকতে পারে। আবার কোনও সাহিত্যিক আখ্যান কোনও বিদ্যমান আচারের ব্যাখ্যা দিতে দিতে তাকে নতুন সামাজিক ও ধর্মীয় অর্থও দিতে পারে। এই দুই সম্ভাবনার মধ্যে কোনটি কখন কতটা কার্যকর ছিল, তা নির্ধারণ করতে হলে সাহিত্যিক পাঠের পাশাপাশি আচারগ্রন্থ ও সমকালীন দলিলও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

কৃত্তিবাসী রামায়ণের গুরুত্ব তাই দুর্গাপূজার সূচনাবর্ষ নির্ধারণে নয়, বরং বাংলার ধর্মীয় কল্পনায় শরৎকালীন পূজার স্থান বোঝার ক্ষেত্রে। এটি দেখায়, কীভাবে একটি আঞ্চলিক ভাষায় রচিত মহাকাব্য কোনও ধর্মীয় উৎসবকে ব্যাখ্যা করার পাশাপাশি তার সাংস্কৃতিক অর্থ নির্মাণেও অংশ নিতে পারে।

অকালবোধনের আখ্যানের জনপ্রিয়তা বোঝার জন্য তার সাহিত্যিক রূপের পাশাপাশি সামাজিক জীবনেও তার প্রভাব বিবেচনা করা প্রয়োজন। একটি ধর্মীয় কাহিনি যখন বারবার পাঠ করা হয়, গাওয়া হয়, আবৃত্তি করা হয় কিংবা উৎসবের সময় স্মরণ করা হয়, তখন তা কেবল গ্রন্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ধীরে ধীরে সেই কাহিনি আচার, প্রতীক এবং সামষ্টিক স্মৃতির অংশ হয়ে ওঠে। অকালবোধনের ক্ষেত্রেও রামের দুর্গাপূজার কাহিনি বাংলার শরৎকালীন উৎসবকে ব্যাখ্যা করার একটি পরিচিত সাংস্কৃতিক মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

এই সাংস্কৃতিক স্মৃতির শক্তি নিহিত রয়েছে তার পরিচিত প্রতীকগুলিতে। দেবীর বোধন, নীলপদ্মের নিবেদন, রামের ভক্তি এবং যুদ্ধের আগে দেবীর আশীর্বাদ প্রার্থনা—এই উপাদানগুলি পূজার আচার ও তার জনপ্রিয় ব্যাখ্যার মধ্যে একটি অর্থপূর্ণ যোগসূত্র তৈরি করে। ফলে পূজা কেবল নির্দিষ্ট তিথিতে সম্পন্ন কিছু বিধিবদ্ধ আচারের সমষ্টি থাকে না; তা এমন এক আখ্যানের অংশ হয়ে ওঠে, যার মাধ্যমে ভক্তরা দেবীর শক্তি, করুণা ও আশীর্বাদের অর্থ উপলব্ধি করেন।

কিন্তু সাংস্কৃতিক স্মৃতির ইতিহাস এবং ঘটনার সমকালীন ইতিহাসের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি। কোনও কাহিনি দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত থাকলে তা সেই সমাজের ধর্মীয় কল্পনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হয়ে উঠতে পারে; কিন্তু কাহিনিতে বর্ণিত ঘটনাটি ঐতিহাসিকভাবে ঠিক সেইভাবেই ঘটেছিল, তার প্রমাণ হিসেবে তাকে সরাসরি ব্যবহার করা যায় না। অকালবোধনের আখ্যান বাংলার দুর্গাপূজার ধর্মীয় অর্থ ও সাংস্কৃতিক স্মৃতি বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা নিজে থেকে কোনও নির্দিষ্ট পরিবারে পূজার প্রতিষ্ঠাবর্ষ কিংবা কোনও অঞ্চলে পূজার প্রথম প্রচলনের তারিখ নির্ধারণ করে না।

এই সতর্কতা বিশেষভাবে প্রয়োজন, কারণ দুর্গাপূজার ইতিহাসে সাহিত্যিক ঐতিহ্য, আচারগত প্রমাণ এবং পারিবারিক স্মৃতি প্রায়ই একসঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে। একটি পরিবার তার পূজার ইতিহাসকে রামের অকালবোধনের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে; কোনও আঞ্চলিক বর্ণনা পূজার প্রাচীনত্বকে একটি নির্দিষ্ট রাজা বা জমিদারের সঙ্গে সম্পর্কিত করতে পারে; আবার কোনও আচারগ্রন্থ পূজার বিধিবদ্ধ রূপ সম্পর্কে তথ্য দিতে পারে। এই সব উৎসই ইতিহাসচর্চায় মূল্যবান, কিন্তু প্রত্যেকটির প্রমাণমূল্য আলাদা। একটি উৎসের বক্তব্য অন্য উৎসের দ্বারা সমর্থিত না হলে সেই সংযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে ঘোষণা করা উচিত নয়।

৪

রামায়ণের বিভিন্ন পাঠে অকালবোধনের ইতিহাস অনুসন্ধান করতে গেলে প্রথমেই একটি পদ্ধতিগত প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়: রামের দুর্গারাধনার কাহিনি কি আদি রামায়ণের অবিচ্ছেদ্য অংশ, নাকি পরবর্তী পুরাণ, আঞ্চলিক রামায়ণ ও ভক্তিমূলক সাহিত্যের মধ্য দিয়ে এই আখ্যান ক্রমশ বিকশিত হয়েছে? এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাংলার শরৎকালীন দুর্গাপূজার সঙ্গে রামের অকালবোধনের যে সম্পর্ক আজ প্রায় অবিচ্ছেদ্য বলে মনে হয়, তা একক কোনও গ্রন্থের মধ্যে সম্পূর্ণ ও অপরিবর্তিত অবস্থায় উপস্থিত ছিল না। বরং সংস্কৃত মহাকাব্য, শাক্ত পুরাণ, বৈষ্ণব ভক্তিধারা এবং মধ্যযুগীয় বাংলা কাব্যের পারস্পরিক সংলাপের মধ্য দিয়ে এই সম্পর্কটি গড়ে উঠেছে। রামায়ণের আঞ্চলিক পাঠগুলি কেবল সংস্কৃত মহাকাব্যের অনুবাদ নয়; এগুলি নিজস্ব ধর্মীয় ও সামাজিক পরিবেশে পরিচিত আখ্যানকে পুনর্গঠন করেছে। মন্দাক্রান্তা বসু সম্পাদিত The Ramayana Revisited গ্রন্থের পূর্বভারতীয় রামায়ণ-পরম্পরা বিষয়ক আলোচনায় দেখানো হয়েছে যে বাংলা, অসমিয়া ও ওড়িয়া রামায়ণগুলি বাল্মীকি-পরম্পরার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও স্থানীয় ভক্তি, শাক্তধর্ম এবং সামাজিক অভিজ্ঞতার দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছে।১০ অতএব অকালবোধনের ইতিহাসকে একটি কাহিনির সরল প্রচার-ইতিহাস হিসেবে নয়, বরং বিভিন্ন ধর্মীয় পরম্পরার মধ্যে আখ্যানগত পরিবর্তনের ইতিহাস হিসেবে পড়া অধিক যুক্তিযুক্ত।

বাল্মীকি রামায়ণের যুদ্ধকাণ্ডে রাবণের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত যুদ্ধের পূর্বমুহূর্তে রামের সংকটের যে বিবরণ পাওয়া যায়, সেখানে দুর্গাপূজা বা অকালবোধনের পরিচিত আখ্যানটি অনুপস্থিত। যুদ্ধের ক্লান্তি ও উদ্বেগের মধ্যে রামকে দেখে ঋষি অগস্ত্য তাঁকে সূর্যের স্তব আদিত্যহৃদয় শিক্ষা দেন। যুদ্ধকাণ্ডের ১০৫তম সর্গে রামকে উদ্দেশ করে বলা হয়েছে:

ततो युद्धपरिश्रान्तं समरे चिन्तया स्थितम्।

रावणं चाग्रतो दृष्ट्वा युद्धाय समुपस्थितम्॥

[tato yuddha-pariśrāntaṃ samare cintayā sthitam।

rāvaṇaṃ cāgrato dṛṣṭvā yuddhāya samupasthitam॥]

অর্থাৎ, যুদ্ধে ক্লান্ত ও চিন্তামগ্ন রাম সামনে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত রাবণকে দেখতে পেলেন।১১ এই শ্লোকটি অগস্ত্যের উপদেশের প্রেক্ষাপট নির্মাণ করে; এখানে দেবী দুর্গার পূজা নয়, সূর্যোপাসনাই রামের মানসিক শক্তি পুনরুদ্ধার এবং যুদ্ধের প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত। ফলে পরবর্তী কালে বাংলায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠা রামের দুর্গারাধনা, শরৎকালে দেবীর বোধন, একশো আটটি নীলপদ্ম নিবেদন এবং নিজের চোখ উৎসর্গ করতে উদ্যত হওয়ার কাহিনিকে বাল্মীকি রামায়ণের এই অংশের সরাসরি বিবরণ হিসেবে উদ্ধৃত করা যায় না। এই পার্থক্য কোনও পরম্পরাকে অন্যটির তুলনায় অধিক বা কম ধর্মীয় মর্যাদা দেওয়ার প্রশ্ন নয়; বরং পাঠভেদ ও আখ্যানের ঐতিহাসিক বিকাশ বোঝার মৌলিক শর্ত।

রামের দুর্গারাধনার কাহিনি সংস্কৃত সাহিত্যের অন্যান্য ধারায়ও বিকশিত হয়েছে। দেবীভাগবত পুরাণের তৃতীয় স্কন্ধের ত্রিশতম অধ্যায়ে রাবণবধের পূর্বে রামের দেবীপূজার একটি বিবরণ পাওয়া যায়। এখানে দেবীর উপাসনা যুদ্ধজয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ঐশ্বরিক সহায়তা লাভের উপায় হিসেবে উপস্থাপিত। এই আখ্যানের ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামোয় রাম বীর হলেও তাঁর সাফল্য দেবীশক্তির অনুগ্রহের সঙ্গে সম্পর্কিত; যুদ্ধের ফল নির্ধারণে দেবী একটি সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেন।১২ বৃহদ্ধর্ম পুরাণের প্রথম খণ্ডের একবিংশ ও দ্বাবিংশ অধ্যায়েও রামের দুর্গাপূজা এবং শরৎকালীন পূজার সঙ্গে সম্পর্কিত আচারবিধির বর্ণনা রয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষত বিল্ববৃক্ষে দেবীর বোধন, পরবর্তী তিথিগুলিতে পূজা এবং বিজয়া দশমীর আচার এই পাঠপরম্পরার সঙ্গে যুক্ত।১৩

এই বিবরণগুলি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলি রামের দুর্গারাধনাকে কেবল একটি যুদ্ধপূর্ব প্রার্থনা হিসেবে রাখে না; বরং দেবীর জাগরণ, নির্দিষ্ট তিথিতে পূজা এবং সমাপনী আচারের সঙ্গে যুক্ত একটি বিস্তৃত ধর্মীয় অনুশীলনের কাঠামোর মধ্যে স্থাপন করে।

তবে এই পুরাণগুলির পাঠকে কালানুক্রমিকভাবে সাজানোর ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। কোনও গ্রন্থে রামের দুর্গাপূজার উল্লেখ আছে বলেই সেই গ্রন্থের বর্তমান পাঠ কৃত্তিবাসী রামায়ণের পূর্ববর্তী, অথবা কৃত্তিবাস সরাসরি সেই গ্রন্থ থেকেই কাহিনিটি গ্রহণ করেছিলেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। পুরাণের রচনাকাল, বিভিন্ন অংশের সংযোজন, পাণ্ডুলিপির পাঠভেদ এবং আঞ্চলিক মৌখিক পরম্পরার প্রভাব পৃথকভাবে বিচার করতে হয়। একই আখ্যান একাধিক পাঠপরম্পরায় প্রচলিত থাকলে তার অর্থ এই নয় যে একটি গ্রন্থই অপরটির একমাত্র উৎস। বরং রামের দুর্গারাধনার কাহিনি শাক্ত পুরাণ, রামায়ণ-সম্পর্কিত আখ্যান এবং আঞ্চলিক ভক্তিসাহিত্যের মধ্যে চলাচল করেছে—এই সম্ভাবনাটিই তুলনামূলক পাঠের মাধ্যমে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। এই কারণে অকালবোধনের ইতিহাসে ‘প্রথম রচয়িতা’ বা ‘একক উৎস’ নির্ধারণের চেয়ে বিভিন্ন পাঠে কাহিনিটির পরিবর্তন ও ধর্মীয় তাৎপর্য অনুসন্ধান করা বেশি ফলপ্রসূ।

এই আখ্যানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ঋতুর প্রশ্ন। দুর্গার পূজা বসন্তকালেও প্রচলিত ছিল; বসন্তের পূজার সঙ্গে শরৎকালের পূজার পার্থক্যই অকালবোধনের ধারণাকে অর্থবহ করে তোলে। ‘অকালবোধন’ শব্দটির অর্থ প্রচলিত বা প্রত্যাশিত সময়ের বাইরে দেবীর বোধন বা জাগরণ। রাম যখন রাবণবধের আগে শরৎকালে দেবীর পূজা করেন, তখন কাহিনিটি সেই ঋতুকে একটি বিশেষ ধর্মীয় তাৎপর্য দেয়। শরৎকালের পূজা আর কেবল একটি আঞ্চলিক ঋতুভিত্তিক আচার থাকে না; মহাকাব্যের নায়কের যুদ্ধজয়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় তা এক ধরনের আদর্শ ধর্মীয় আচারে পরিণত হয়। দেবীভাগবত পুরাণ এবং বৃহদ্ধর্ম পুরাণের সংশ্লিষ্ট বিবরণে রামের দেবীপূজার সঙ্গে শরৎকালীন আচারকে যুক্ত করার যে প্রবণতা দেখা যায়, তা বাংলার পরবর্তী ধর্মীয় সংস্কৃতির জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।১৪

কৃত্তিবাসী আখ্যানের প্রচলিত রূপে রাবণ দেবীর উপাসক এবং দেবী তাঁর পক্ষে অবস্থান করছেন—এই সংকটের মধ্য দিয়ে রামের পূজার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়। ব্রহ্মা রামকে দেবীর পূজা করতে পরামর্শ দেন। রাম শরৎকালে পূজা করার সিদ্ধান্ত নেন, দেবীর বোধন ও পূজার ব্যবস্থা করেন এবং যুদ্ধের আগে তাঁর আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন। আখ্যানের এই বিন্যাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় পুনর্বিন্যাস ঘটে: রাম ন্যায়ের পক্ষে যুদ্ধ করলেও ন্যায়ের দাবি একাই তাঁকে বিজয় নিশ্চিত করে না; দেবীশক্তির অনুগ্রহও প্রয়োজন। দেবী এখানে কেবল রামের অনুগত কোনও শক্তি নন, বরং এমন এক স্বাধীন ঐশ্বরিক সত্তা, যাঁর অনুগ্রহ লাভের জন্য রামকে যথাযথ ভক্তি ও আচার পালন করতে হয়। শাক্তধর্মের দৃষ্টিকোণ থেকে এই বিন্যাস বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এতে দেবীর শক্তি পুরুষ নায়কের বীরত্বের অধীন হয়ে যায় না; বরং নায়কের বিজয় দেবীর স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণতা পায়।

কৃত্তিবাসী পরম্পরার সবচেয়ে স্মরণীয় পর্বগুলির একটি হল একশো আটটি নীলপদ্ম নিবেদনের কাহিনি। বিভীষণের পরামর্শে রাম দেবীর পূজার জন্য নীলপদ্ম সংগ্রহের ব্যবস্থা করেন; হনুমান সেই পদ্ম নিয়ে আসেন। কিন্তু পূজার সময় একটি পদ্ম অনুপস্থিত দেখা যায়। রাম ‘কমললোচন’—অর্থাৎ পদ্মনয়ন—হওয়ায় নিজের চোখকেই শেষ পদ্মের বিকল্প হিসেবে উৎসর্গ করতে উদ্যত হন। তাঁর আত্মনিবেদনের এই মুহূর্তে দেবী আবির্ভূত হয়ে তাঁকে থামান এবং বিজয়ের আশীর্বাদ দেন। কাহিনিটির বিভিন্ন মুদ্রিত পাঠে শব্দ, ছন্দ ও বিবরণের পার্থক্য থাকতে পারে; তাই নির্দিষ্ট সংস্করণ যাচাই না করে বহুল প্রচলিত পঙ্‌ক্তিকে কৃত্তিবাসের অভিন্ন মূলপাঠ হিসেবে উদ্ধৃত করা উচিত নয়। এই পর্বের তাৎপর্য অবশ্য কেবল নাটকীয়তায় নয়। এখানে পূজার নির্ধারিত উপাচার ও ভক্তের আত্মনিবেদন পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। রাম প্রথমে বিধিবদ্ধ উপাচার সম্পূর্ণ করতে চান; কিন্তু একটি পদ্মের অভাব দেখা দিলে তিনি আচার পরিত্যাগ না করে নিজের শরীরকেই নিবেদনের বস্তু করতে প্রস্তুত হন। এইভাবে কাহিনি ভক্তিকে শুধু মানসিক অনুভূতি হিসেবে নয়, আত্মত্যাগের সম্ভাবনাসম্পন্ন একটি নৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থান হিসেবে নির্মাণ করে।

নীলপদ্মের কাহিনি পরবর্তী বাংলার পূজা-সংস্কৃতিতে বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করে। রামের পদ্মনয়ন এবং পদ্ম নিবেদনের মধ্যে যে প্রতীকী সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে, তা ভক্তি, আত্মনিবেদন ও দেবীর করুণার একটি স্মরণীয় চিত্র তৈরি করে। এই কাহিনি পাঠ, কথন, গান, নাট্যরূপ এবং দুর্গাপূজার জনপ্রিয় ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে পুনরাবৃত্ত হয়েছে। ফলে অকালবোধন কেবল কোনও পুরাণ বা কাব্যের নির্দিষ্ট পর্ব হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা বাংলায় শরৎকালীন দুর্গাপূজার সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ হয়ে উঠেছে। তবে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার: নীলপদ্ম ও চোখ উৎসর্গের কাহিনি বাংলায় অকালবোধনের সবচেয়ে পরিচিত রূপ হলেও, রামের দুর্গাপূজার সব পাঠেই এই বিবরণ একইভাবে উপস্থিত—এমন ধারণা করা যায় না। আখ্যানের জনপ্রিয়তা এবং তার প্রাচীনতম পাঠরূপ দুটি পৃথক গবেষণার বিষয়।

অকালবোধনের কাহিনি বাংলায় প্রভাব বিস্তার করেছিল একাধিক স্তরে। প্রথমত, এটি শরৎকালীন পূজাকে মহাকাব্যিক বৈধতা দিয়েছে। রামের মতো আদর্শ নায়ক যখন যুদ্ধের আগে দেবীর পূজা করেন, তখন শরৎকালের দুর্গোৎসবকে একটি মহাকাব্যিক পূর্বদৃষ্টান্তের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হয়। দ্বিতীয়ত, কাহিনিটি পূজার সময় ও ঋতুকে ধর্মীয় অর্থ দেয়। বসন্তকালীন পূজার বিপরীতে শরৎকালে দেবীর বোধন একটি ব্যতিক্রমী আচার হিসেবে আখ্যানের মধ্যে ব্যাখ্যা পায়; পরবর্তী সময়ে সেই ব্যতিক্রমই বাংলার সবচেয়ে পরিচিত দুর্গোৎসবের সঙ্গে যুক্ত হয়। তৃতীয়ত, কৃত্তিবাসী রামায়ণের বাংলা ভাষা এই কাহিনিকে সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতের পরিসর থেকে বৃহত্তর ভাষিক ও সাংস্কৃতিক জগতে নিয়ে যায়। মৌখিক পাঠ, গৃহস্থালি ধর্মাচরণ, কীর্তনধর্মী পরিবেশন এবং উৎসবের সঙ্গে যুক্ত কথনের মাধ্যমে আখ্যানটি ক্রমে পরিচিত সাংস্কৃতিক সম্পদে পরিণত হয়। চতুর্থত, রাম ও দুর্গার সম্পর্কের এই রূপটি বৈষ্ণব ও শাক্ত ভাবনার মধ্যে একটি সংযোগ তৈরি করে। রাম বৈষ্ণব ধর্মীয় কল্পনার প্রধান নায়ক; দুর্গা শাক্ত উপাসনার কেন্দ্রীয় দেবী। অকালবোধনের আখ্যান তাঁদেরকে একই ধর্মীয় পরিসরে স্থাপন করে, যেখানে রামের ভক্তি দেবীর শক্তিকে স্বীকার করে এবং দেবীর আশীর্বাদ রামের বিজয়কে সম্ভব করে তোলে।

এই প্রভাবকে অবশ্য সরল কারণ-পরিণামের সূত্রে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়। কৃত্তিবাসী রামায়ণ শরৎকালীন দুর্গাপূজাকে জনপ্রিয় ও অর্থবহ করতে ভূমিকা রেখেছে—এমন বক্তব্য ঐতিহাসিকভাবে যুক্তিযুক্ত; কিন্তু বাংলায় শরৎকালীন পূজা কেবল এই কাব্যের কারণেই শুরু হয়েছিল, এমন সিদ্ধান্তের পক্ষে আলাদা প্রমাণ প্রয়োজন। আচারগ্রন্থ, পুরাণ এবং বাংলা রামায়ণ-পরম্পরায় অকালবোধনের উপস্থিতি দেখায় যে ধর্মীয় আচার ও সাহিত্যিক আখ্যান পরস্পরকে প্রভাবিত করেছিল। কিন্তু কোনটি আগে এবং কোনটি পরে—এই প্রশ্নের উত্তর সব ক্ষেত্রে সরল নয়। কোনও সাহিত্যিক পাঠ বিদ্যমান আচারের ব্যাখ্যা দিতে পারে; আবার কোনও আচারকে জনপ্রিয় সাহিত্যিক আখ্যানের আলোকে নতুনভাবে বোঝাও সম্ভব। এই পারস্পরিক প্রক্রিয়াই বাংলার ধর্মীয় সংস্কৃতির ইতিহাসকে জটিল ও গতিশীল করে তোলে।

মধ্যযুগীয় বাংলায় দুর্গাপূজার বাস্তব আচারগত কাঠামো বুঝতে রঘুনন্দন ভট্টাচার্যের দুর্গাপূজাতত্ত্ব বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বিহানি সরকার তাঁর গবেষণায় এই গ্রন্থ এবং সংশ্লিষ্ট আচারগ্রন্থের সাহায্যে চতুর্দশ থেকে ষোড়শ শতকের বাংলায় দুর্গাপূজা কীভাবে সম্পন্ন হয়ে থাকতে পারে, তার একটি ঐতিহাসিক পুনর্গঠনের চেষ্টা করেছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে মধ্যযুগীয় বাংলার পূজার ইতিহাস সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান এখনও সীমিত এবং আচারবিধি-সংক্রান্ত সংস্কৃত গ্রন্থগুলি এই ইতিহাসের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্যের মধ্যে পড়ে।১৫ এই ধরনের গ্রন্থের সঙ্গে কৃত্তিবাসী রামায়ণের তুলনামূলক পাঠ বিশেষ ফলপ্রসূ হতে পারে। কাব্য আমাদের দেখায় কীভাবে পূজার ধর্মীয় অর্থ নির্মিত হয়েছে; আচারগ্রন্থ দেখায় পূজার বিধি, তিথি, বোধন ও উপাচার কীভাবে বিন্যস্ত হয়েছে। তবে বিধিবদ্ধ নির্দেশকে সরাসরি প্রতিটি পরিবারের বাস্তব আচারের প্রতিচ্ছবি বলে ধরে নেওয়া যায় না। সাহিত্যিক কাহিনি, আচারগ্রন্থ এবং পারিবারিক দলিল—প্রতিটি উৎসের নিজস্ব সীমা ও প্রমাণমূল্য রয়েছে।

অতএব, বাংলার দুর্গাপূজার ইতিহাসে অকালবোধনের গুরুত্ব কোনও নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠাবর্ষের প্রমাণ হিসেবে নয়, বরং ধর্মীয় আচার ও আঞ্চলিক সংস্কৃতির পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝার উপায় হিসেবে বিচার করা উচিত। বাল্মীকি রামায়ণের আদিত্যহৃদয় পর্ব, দেবীভাগবত পুরাণ ও বৃহদ্ধর্ম পুরাণের দেবীপূজার বিবরণ এবং কৃত্তিবাসী রামায়ণের বাংলা আখ্যান একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও অভিন্ন নয়। এই পাঠগুলির মধ্যে দিয়ে রামের দুর্গারাধনা ক্রমশ এমন একটি সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যা লাভ করে, যা বাংলার শরৎকালীন দুর্গোৎসবের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে যায়। দেবীর বোধন, নীলপদ্ম নিবেদন, রামের আত্মনিবেদন এবং বিজয়ার আশীর্বাদ—এই প্রতীকগুলি সাহিত্যিক কাহিনির সীমানা অতিক্রম করে ধর্মীয় স্মৃতির অংশ হয়ে ওঠে। কিন্তু এই সাংস্কৃতিক স্মৃতি থেকে কোনও নির্দিষ্ট পরিবারের পূজার সূচনাবর্ষ নির্ধারণ করা যায় না। সেই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে কাব্য ও পুরাণের পাশাপাশি সমকালীন নথি, জমির বন্দোবস্ত, পারিবারিক পত্রাবলি এবং প্রশাসনিক দলিলের সাক্ষ্যও পরীক্ষা করতে হবে। অকালবোধনের সাহিত্যিক ইতিহাস তাই বাংলার দুর্গাপূজার সামাজিক ইতিহাসের বিকল্প নয়; বরং সেই ইতিহাসকে আরও গভীরভাবে বোঝার একটি অপরিহার্য সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট।

চিত্র-২: খলিশানি বোস বাড়ির দুর্গা পূজা, ২০২৪

৫

বাংলার দুর্গাপূজার ইতিহাসে পারিবারিক পৃষ্ঠপোষকতা, জমিদারি ক্ষমতা এবং আঞ্চলিক অভিজাত সমাজের ভূমিকা বুঝতে গেলে একটি মৌলিক পার্থক্য দিয়ে আলোচনা শুরু করা প্রয়োজন। বাংলায় দেবী দুর্গার উপাসনা কত প্রাচীন, শরৎকালে দুর্গাপূজার আচার কখন সুসংহত হয়েছিল, এবং নির্দিষ্ট কোনও পরিবার কবে থেকে দুর্গোৎসবের আয়োজন শুরু করেছিল—এই তিনটি প্রশ্ন পরস্পর সম্পর্কিত হলেও এক নয়। কোনও পরিবারের পূজার প্রতিষ্ঠাবর্ষ নির্ধারণ করতে হলে সেই পরিবারের নিজস্ব ইতিহাস, সম্পত্তির বিবরণ, সমকালীন প্রশাসনিক নথি এবং পরবর্তী বংশপরম্পরায় সংরক্ষিত স্মৃতিকে আলাদাভাবে পরীক্ষা করতে হয়। এই পদ্ধতিগত পার্থক্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাংলার দুর্গাপূজার জনপ্রিয় ইতিহাসে কয়েকটি অভিজাত পরিবারের নাম ও নির্দিষ্ট সাল এতটাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে অনেক সময় সেগুলিকেই সমগ্র বাংলায় দুর্গাপূজার সূচনার সমার্থক বলে ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু একটি পরিবারের পূজার ইতিহাস কখনও সমগ্র অঞ্চলের ধর্মীয় ইতিহাসের সম্পূর্ণ প্রতিরূপ হতে পারে না। বাংলার দুর্গাপূজার ইতিহাসকে তাই একটিমাত্র ‘প্রথম পূজা’র সন্ধানে সীমাবদ্ধ না রেখে বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠী, অঞ্চল ও ঐতিহাসিক সময়ে পূজার বিস্তার এবং পৃষ্ঠপোষকতার পরিবর্তনশীল রূপের মধ্যে অনুসন্ধান করা অধিক যুক্তিযুক্ত।

ষোড়শ শতকের শেষভাগে তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণের সঙ্গে যে আড়ম্বরপূর্ণ দুর্গাপূজার ঐতিহ্য যুক্ত হয়েছে, তা বাংলার অভিজাত পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্গোৎসবের ইতিহাসে বিশেষ পরিচিত। পরবর্তী ঐতিহাসিক বিবরণে কংসনারায়ণকে বিপুল ব্যয়ে দুর্গাপূজা আয়োজনকারী শাসক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই বর্ণনার গুরুত্ব বোঝার জন্য পূজার ধর্মীয় তাৎপর্যের পাশাপাশি তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিকও বিবেচনা করা দরকার। বৃহৎ আকারে পূজা আয়োজনের সঙ্গে পুরোহিত, কারিগর, প্রতিমাশিল্পী, বাদ্যকর, খাদ্য প্রস্তুতকারী এবং নানা ধরনের পরিষেবা প্রদানকারীর শ্রম যুক্ত হতে পারত। আয়োজনের পরিসর অনুসারে পূজা স্থানীয় সমাজে সম্পদ প্রদর্শন, পৃষ্ঠপোষকতা এবং সামাজিক সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্র হিসেবেও কাজ করতে পারত। তবে এই সাধারণ সামাজিক ব্যাখ্যাকে কংসনারায়ণের নির্দিষ্ট পূজার প্রত্যক্ষ বিবরণ বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়; তাঁর পূজার প্রকৃত ব্যয়, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা এবং সামাজিক পরিসর নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট সময়ের নির্ভরযোগ্য দলিল প্রয়োজন। একইভাবে, পরবর্তী কালে কোনও পূজাকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল বলে বর্ণনা করা হলে সেই দাবির উৎস ও পরিভাষা যাচাই না করে নির্দিষ্ট অর্থমূল্যকে ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে পুনরাবৃত্তি করা অনুচিত।

কংসনারায়ণের পূজাকে বাংলার দুর্গাপূজার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা এবং তাঁকেই বাংলায় দুর্গাপূজার প্রথম উদ্যোক্তা ঘোষণা করা এক বিষয় নয়। প্রথম দাবিটি তাঁর সঙ্গে যুক্ত পূজার ঐতিহাসিক স্মৃতি ও পরবর্তী প্রভাবের আলোচনার সুযোগ দেয়; দ্বিতীয় দাবির জন্য প্রয়োজন এমন প্রমাণ, যা তাঁর পূর্ববর্তী অন্য পূজার অস্তিত্ব সম্পর্কে নির্ভরযোগ্যভাবে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে। মধ্যযুগীয় বাংলায় দুর্গাপূজার আচার সম্পর্কে বিহানি সরকারের গবেষণা দেখায় যে পূজার বিধিগত ও ধর্মীয় কাঠামো বোঝার জন্য রঘুনন্দন ভট্টাচার্যের দুর্গাপূজাতত্ত্ব এবং সংশ্লিষ্ট আচারগ্রন্থগুলি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কোনও আচারগ্রন্থে দুর্গাপূজার বিধান পাওয়া এবং কোনও নির্দিষ্ট জমিদার বা পরিবারের সেই আচার বাস্তবে পালন করার মধ্যে প্রমাণগত ব্যবধান রয়েছে। এই ব্যবধানের কথা মনে রাখলে কংসনারায়ণের পূজার ঐতিহ্যকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়েও বাংলার দুর্গাপূজার ইতিহাসকে তাঁর ব্যক্তিগত পৃষ্ঠপোষকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না।

পরবর্তী বহুল পরিচিত কালক্রমে কলকাতার বরিশা অঞ্চলের সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের দুর্গাপূজা বিশেষ স্থান অধিকার করে। পারিবারিক ঐতিহ্য অনুযায়ী, এই পরিবারের পূজা ১৬১০ সালে শুরু হয়েছিল। কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের ইতিহাসে এই পরিবারের জমি, সামাজিক অবস্থান এবং পরবর্তী সময়ে ঔপনিবেশিক নগরায়ণের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে তাদের পূজার ঐতিহাসিক স্মৃতি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। কিন্তু ১৬১০ সালকে এই পরিবারের পূজার সূচনাবর্ষ হিসেবে গ্রহণ করার প্রশ্ন এবং সেই সালকে সমগ্র বাংলার দুর্গাপূজার সূচনাবর্ষ হিসেবে ব্যবহার করার প্রশ্ন সম্পূর্ণ পৃথক। একটি পারিবারিক পূজার ধারাবাহিকতা সম্পর্কে পারিবারিক নথি, বংশতালিকা ও স্থানীয় ঐতিহ্য তথ্য দিতে পারে; কিন্তু তা থেকেই অন্য অঞ্চলে এর আগে কোনও পূজা ছিল না—এমন সিদ্ধান্ত আসে না। বাংলার দুর্গাপূজার ইতিহাসে সাবর্ণ পরিবারের স্থান তাই তাদের নিজস্ব ঐতিহাসিক পরিসর ও দলিলের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা উচিত, কোনও সর্বজনীন ‘প্রথমত্ব’-এর ধারণার ভিত্তিতে নয়।

এই আলোচনায় চন্দননগরের খলিসানি অঞ্চলের বসু পরিবারের দুর্গাপূজার ঐতিহ্য বিশেষভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। স্থানীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী, বসু পরিবারের পূজার সূচনা করুণাময় বসুর হাতে, এবং তার প্রতিষ্ঠাবর্ষ হিসেবে ৯১৪ বঙ্গাব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়। এই সালকে খ্রিস্টীয় পঞ্জিকায় সাধারণত ১৫০৭–১৫০৮ সালের সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়; বিভিন্ন বিবরণে ১৫০৭ সালও ব্যবহৃত হয়েছে। চন্দননগরের বনেদি পরিবারের পূজা নিয়ে কিঞ্জল বসুর প্রকাশিত বিবরণে খলিসানির বোসপাড়ার বসু পরিবারের পূজাকে ৯১৪ বঙ্গাব্দে প্রতিষ্ঠিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে করুণাময় বসুর নাম দেওয়া হয়েছে।১৬ এই তথ্যটি স্থানীয় পারিবারিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য। তবে ঐতিহ্যের বিবরণ এবং সমকালীন প্রমাণকে পৃথক রাখার প্রয়োজন এখানেও রয়েছে। ৯১৪ বঙ্গাব্দের দাবি কত পুরোনো তা পারিবারিক নথি, বংশবৃত্তান্ত বা অন্য কোনও সূত্রের উপর কতোটা প্রতিষ্ঠিত, তা নির্ধারণ না করে এই তারিখকে সম্পূর্ণভাবে প্রমাণিত প্রতিষ্ঠাবর্ষ হিসেবে ঘোষণা করা যায় না।

করুণাময় বসুর সঙ্গে যুক্ত এই ঐতিহ্যকে গুরুত্ব দেওয়ার আরেকটি কারণ হল চন্দননগর ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের ইতিহাসের স্বাতন্ত্র্য। বর্তমান চন্দননগরের নগর-পরিচয় পরবর্তী ঔপনিবেশিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হলেও, ফরাসি বসতি গড়ে ওঠার আগে এই অঞ্চলে একাধিক গ্রাম, স্থানীয় বসতি এবং আঞ্চলিক সামাজিক সম্পর্কের অস্তিত্ব ছিল। খলিসানি, বোড়ো, গোঁদলপাড়া ও বিলকুলি-সহ বিভিন্ন এলাকার ইতিহাসকে পরবর্তী চন্দননগর শহরের ইতিহাসের সঙ্গে এক করে দেখা যায় না। ফলে কোনও পরিবারের পূজার সূচনাকাল অনুসন্ধান করতে গেলে আজকের শহরের প্রতিষ্ঠা বা ঔপনিবেশিক নগরায়ণের তারিখকে একমাত্র কালগত ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা অনুচিত। চন্দননগরের ইতিহাসে কোনও পরিবার যদি ষোড়শ শতকের গোড়ায় পূজা শুরু করে থাকে, তবে সেই ঘটনাকে পরবর্তী ফরাসি বসতির আগের আঞ্চলিক ইতিহাসের অংশ হিসেবে বিচার করতে হবে। তবে বসু পরিবারের ক্ষেত্রে ১৫০৭–১৫০৮ সালের দাবির সঙ্গে নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব, স্থান এবং দলিলের সম্পর্ক আরও নিবিড়ভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

এই যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ১৫৮০-এর দশকের একটি ফারসি দলিলের গুরুত্ব রয়েছে। দলিলটি উত্তরপ্রদেশের রামপুর  রাজা লাইব্রেরী থেকে প্রাবন্ধিক উদ্ধার করেছেন, এর পাশাপাশি সমসাময়িক বিভিন্ন ফারসি চিঠিপত্রে এই পূজার উল্লেখ পাওয়া যায়। এদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল আলাউদ্দিন হোসেন শাহ, যিনি সেই সময়ে (১৫০৭-০৮) বাংলার শাসক ছিলেন, তাঁর লেখা বিভিন্ন চিঠিপত্র, যেখানে এই পূজার উল্লেখ আছে। ত্রিবেণী অঞ্চলে জাফর খান গাজি দরগা’র একটি শিলালিপি-তে করুণাময় বসুর নাম পাওয়া যায় যিনি বিলকুলি অঞ্চলের প্রধান ছিলেন এবং ঐ শিলালিপি থেকে এও জানা যায় যে বসু পরিবার সেই অঞ্চলের মানুষদের কথা মাথায় রেখে বিশালাক্ষ্মী এবং দুর্গা পূজার প্রচলন করেন। 

১৫৮০-এর দশকের দলিলটি এবং ১৫০৭–১৫০৮ সালের পারিবারিক ঐতিহ্যকে পাশাপাশি পড়লে আরও একটি প্রশ্ন ওঠে: পরবর্তী দলিলটি কি পূজার সূচনাবর্ষের প্রত্যক্ষ প্রমাণ, নাকি সেই সময়ে পরিবারটির অস্তিত্ব ও সামাজিক অবস্থানের প্রমাণ? এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করবে দলিলের মূলপাঠের উপর। নথিতে যদি পূজার কোনও উল্লেখ না থাকতো, তবে তা থেকে পূজার প্রতিষ্ঠাবর্ষ সরাসরি নির্ণয় করা যেত না। কিন্তু এখানে সম্পূর্ণ বিবরণ আছে যে ৯১৪ বঙ্গাব্দে বসু পরিবার খলিশানি অঞ্চলে দুর্গা পূজা প্রচলন করেন এবং সেই পূজা থেকে প্রাপ্ত অর্থের মধ্যে বার্ষিক ২ লাখ স্বর্ণ মুদ্রা তাঁরা উপঢৌকন হিসাবে পাঠাতেন মুঘল দরবারে।

খলিসানির বসু পরিবারের পূজার ঐতিহ্যকে কংসনারায়ণ ও সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের পূজার সঙ্গে তুলনা করলে বাংলার দুর্গাপূজার ইতিহাসে ‘প্রাচীনতম’ ধারণাটির সমস্যাও স্পষ্ট হয়। কংসনারায়ণের পূজার সঙ্গে সাধারণত ষোড়শ শতকের শেষভাগের কথা যুক্ত হয়, সাবর্ণ পরিবারের ক্ষেত্রে প্রচলিত সাল ১৬১০, আর খলিসানির বসু পরিবারের ক্ষেত্রে এটি ১৫০৭–১৫০৮। এই তারিখগুলি একই ধরনের প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত কি না, তা আগে নির্ধারণ করতে হবে। কংসনারায়ণ ও সাবর্ণ পরিবারের পূজার সাল জনপ্রিয় ঐতিহাসিক বিবরণে বহুল প্রচলিত হলেও, প্রচলিত হওয়া আর সমকালীন দলিলে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এক নয়। সাবর্ণ পরিবারের পূজার ১৬১০ সালের ঐতিহ্য সংবাদমাধ্যম ও পারিবারিক বিবরণে নিয়মিতভাবে উল্লেখিত হয়েছে; তবে এই তারিখের ভিত্তি কী, কোন প্রাচীন নথিতে তা লিপিবদ্ধ আছে এবং সেই নথির কাল কতটা নির্ভরযোগ্য—এসব প্রশ্ন আলাদা দলিলগত অনুসন্ধান দাবি করে।১৭ কংসনারায়ণের ক্ষেত্রেও পরবর্তী ঐতিহাসিক বর্ণনায় তাঁর পূজার আড়ম্বরের কথা পাওয়া গেলেই তা সমগ্র বাংলায় দুর্গাপূজার প্রথম আয়োজন ছিল বলে প্রমাণিত হয় না। সেই জায়গায় বসু পরিবারের দুর্গা পূজার একটি সু-নির্দিষ্ট তথ্য এবং সালপঞ্জি রয়েছে, যা আমাদের ঐতিহাসিকতা নির্ধারণে সাহায্য করে।

এই তুলনা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সম্ভাবনা সামনে আসে। বাংলায় দুর্গাপূজার বিস্তার কোনও একক কেন্দ্র থেকে অন্যত্র সরলরৈখিকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল — এমন মডেল হয়তো সব ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। বিভিন্ন অঞ্চলে জমিদার, স্থানীয় অভিজাত পরিবার, ধর্মীয় পৃষ্ঠপোষক এবং সম্পত্তির অধিকারী গোষ্ঠী নিজ নিজ সামাজিক পরিসরে পূজার আয়োজন করে থাকতে পারে। কোনও কোনও পূজা আঞ্চলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে; কোনও কোনওটি পরবর্তী নগর-ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় বৃহত্তর পরিচিতি লাভ করেছে; আবার অন্য কিছু পূজার ইতিহাস পারিবারিক স্মৃতি ও স্থানীয় ঐতিহ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছে। এই সম্ভাবনাকে প্রতিষ্ঠিত সত্যে রূপ দিতে হলে অবশ্য আরও সমকালীন দলিল প্রয়োজন। তবু গবেষণার দৃষ্টিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে বাংলার দুর্গাপূজার ইতিহাসকে কয়েকটি বহুল পরিচিত পরিবারের তালিকায় সীমাবদ্ধ না রেখে আঞ্চলিক সামাজিক ইতিহাসের বৃহত্তর পরিসরে অনুসন্ধান করা যায়।

দুর্গাপূজার সঙ্গে অভিজাত পরিবারের সামাজিক মর্যাদার সম্পর্কও এই আলোচনায় বিবেচ্য। বৃহৎ পূজার আয়োজনের জন্য অর্থ, জমি, খাদ্যশস্য, শ্রম এবং ধর্মীয় বিশেষজ্ঞদের প্রয়োজন হতে পারে। এই সম্পদ সংগঠিত করার ক্ষমতা কোনও পরিবারের সামাজিক অবস্থানের একটি প্রকাশ হতে পারে। পূজা একই সঙ্গে দেবীর আরাধনা, পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা এবং বৃহত্তর সামাজিক সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু এই সাধারণ কাঠামোকে কোনও নির্দিষ্ট পরিবারের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করার আগে তার নিজস্ব ইতিহাস পরীক্ষা করা জরুরি। বসু পরিবারের পূজা, কংসনারায়ণের পূজা এবং সাবর্ণ পরিবারের পূজাকে একই সামাজিক শ্রেণির অভিন্ন উদাহরণ ধরে নেওয়া যায় না; তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান, সম্পত্তির ভিত্তি, ভৌগোলিক পরিসর এবং পরবর্তী ঐতিহাসিক স্মৃতি আলাদা হতে পারে। তুলনামূলক ইতিহাসের কাজ হল এই পার্থক্যগুলি মুছে ফেলা নয়, বরং তাদের মধ্য দিয়ে বৃহত্তর প্রবণতা বোঝা।

অতএব, খলিসানির বসু পরিবারের দুর্গাপূজাকে বাংলার দুর্গাপূজার ইতিহাসে অন্তর্ভুক্ত করার তাৎপর্য শুধু ১৫০৭–১৫০৮ সালের দাবির মধ্যে নিহিত নয়। এর বৃহত্তর গুরুত্ব হল, এই ঐতিহ্য প্রচলিত দুর্গাপূজার কালক্রমকে নতুন করে পরীক্ষা করার সুযোগ তৈরি করে। বাংলার দুর্গাপূজার ইতিহাস তাই একটি মাত্র সূচনাবর্ষের সন্ধানের চেয়ে বহুমাত্রিক কালক্রম নির্মাণের দাবি জানায়। দেবী-উপাসনার ধর্মীয় ইতিহাস, শরৎকালীন পূজার আচারগত বিকাশ, রামায়ণ ও পুরাণে অকালবোধনের সাহিত্যিক ব্যাখ্যা, অভিজাত পরিবারের পৃষ্ঠপোষকতা এবং পরবর্তী সময়ে পূজার প্রাচীনত্ব নিয়ে নির্মিত পারিবারিক স্মৃতি—এই সব ক’টি স্তরকে পৃথকভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। খলিসানির বসু পরিবারের ঐতিহ্য এই অনুসন্ধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

৬

বাংলার দুর্গাপূজার ইতিহাস অনুসন্ধান করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত যে প্রশ্নটি সামনে আসে, তা কেবল এই নয় যে কোন পরিবার প্রথম দুর্গাপূজার আয়োজন করেছিল; বরং এই প্রশ্নও যে, কীভাবে একটি ধর্মীয় আচার দীর্ঘ সময়ের মধ্যে সাহিত্যিক আখ্যান, আঞ্চলিক বিশ্বাস, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং সামাজিক ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে বাংলার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম প্রধান প্রতীকে পরিণত হল। এই ইতিহাসকে একটি নির্দিষ্ট সাল, একটি রাজপরিবার কিংবা একটি প্রতিষ্ঠিত কিংবদন্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ করলে তার বহুমাত্রিক চরিত্র অনুধাবন করা সম্ভব নয়। দেবী মহিষমর্দিনীর পৌরাণিক প্রতিমা, চণ্ডী-উপাসনার আঞ্চলিক সাহিত্যিক পরম্পরা, রামায়ণের বিভিন্ন পাঠে রামের দুর্গারাধনার আখ্যান এবং বাংলার অভিজাত পরিবারের পূজার ইতিহাস—প্রতিটি পৃথক ঐতিহাসিক স্তর। এগুলি পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও কোনও একটি স্তরকে অন্যটির সরাসরি প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। বাংলার দুর্গাপূজার ইতিহাস তাই একই সঙ্গে ধর্মীয় ধারণার পরিবর্তন, আচারগত বিকাশ, সাহিত্যিক পুনর্নির্মাণ এবং সামাজিক স্মৃতি গঠনের ইতিহাস।

মহিষমর্দিনী ও চণ্ডীর উপাসনা বাংলার ধর্মীয় সংস্কৃতিকে যে দীর্ঘ ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করে, তা দুর্গাপূজার ইতিহাসের প্রাথমিক সাংস্কৃতিক পরিসর নির্মাণ করে। কিন্তু দেবীর পৌরাণিক মাহাত্ম্য কিংবা মধ্যযুগীয় চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে তাঁর উপস্থিতি থেকে শরৎকালীন দুর্গাপূজার নির্দিষ্ট সূচনাবর্ষ নির্ধারণ করা যায় না। একইভাবে, রামায়ণের অকালবোধন-আখ্যান এই পূজাকে যে মহাকাব্যিক ও ধর্মতাত্ত্বিক অর্থ দিয়েছে, তার গুরুত্বও কোনও নির্দিষ্ট পরিবারের পূজার প্রতিষ্ঠাবর্ষ প্রমাণ করার মধ্যে নয়। বাল্মীকি রামায়ণের আদিত্যহৃদয় পর্ব, পুরাণের রামের দেবীপূজার বিবরণ এবং কৃত্তিবাসী রামায়ণের জনপ্রিয় অকালবোধন-আখ্যান এক অভিন্ন পাঠ নয়; বরং তাদের তুলনামূলক পাঠের মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, কীভাবে একটি ধর্মীয় কাহিনি বিভিন্ন সাহিত্যিক ও আঞ্চলিক পরিসরে নতুন অর্থ অর্জন করেছে। কৃত্তিবাসী রামায়ণের বিশেষ তাৎপর্য এই যে, রামের ভক্তি, দেবীর শক্তি, নীলপদ্ম নিবেদন এবং বিজয়ার আখ্যান বাংলার শরৎকালীন দুর্গোৎসবকে এমন এক সাংস্কৃতিক স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত করেছে, যা পরবর্তী সময়ে উৎসবটির জনপ্রিয় ব্যাখ্যার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।

এই সাহিত্যিক ও ধর্মীয় ইতিহাসের পাশাপাশি দুর্গাপূজার সামাজিক ইতিহাস অনুসন্ধান করাও সমান প্রয়োজনীয়। কংসনারায়ণের সঙ্গে যুক্ত আড়ম্বরপূর্ণ পূজার ঐতিহ্য, সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের ১৬১০ সালের প্রতিষ্ঠাবর্ষের দাবি এবং চন্দননগরের খলিসানিতে বসু পরিবারের পূজার ১৫০৭–১৫০৮ সালের ঐতিহ্য—এই বিবরণগুলি বাংলায় পারিবারিক পৃষ্ঠপোষকতার ইতিহাস নিয়ে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করে। বিশেষত খলিসানির বসু পরিবারের ঐতিহ্য প্রচলিত কালক্রমকে পুনর্বিবেচনার সুযোগ তৈরি করে, কারণ তার প্রতিষ্ঠাবর্ষ হিসেবে যে প্রাচীন তারিখটি উল্লেখ করা হয়, তা কংসনারায়ণ ও সাবর্ণ পরিবারের পূজার বহুল প্রচলিত তারিখেরও পূর্ববর্তী। কিন্তু এই কালগত অগ্রাধিকারকে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে রূপান্তরিত করতে হলে প্রমাণের প্রকৃতি ও নির্ভরযোগ্যতা নির্ধারণ করা অপরিহার্য। পারিবারিক ঐতিহ্য ইতিহাসচর্চার মূল্যবান উপাদান, কিন্তু তারিখের দাবিকে সমকালীন দলিলের সাক্ষ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হয়। কোনও পূজার প্রাচীনত্ব সম্পর্কে প্রচলিত স্মৃতি এবং সেই প্রাচীনত্বের প্রত্যক্ষ দলিলগত প্রমাণ একই বিষয় নয়।

এই কারণেই খলিসানির বসু পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত ১৫৮০-এর দশকের ফারসি দলিলটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দলিলটি পরিবারের পরিচয়, সম্পত্তি, ভূমির অধিকার বা সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে যেমন তথ্য দেয়, তেমন তা পরিবার কর্তৃক প্রচলিত দুর্গা পূজার কথাও উল্লেখ করে। আর এই দলিলে ধর্মীয় অনুদান, দেবোত্তর সম্পত্তি কিংবা পূজার ব্যয়ভার সম্পর্কে প্রত্যক্ষ উল্লেখ আমাদের দাবিকে স্পষ্ট করে। কিন্তু তারপরেও আমাদের বক্তব্য হল ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা কোনও আকর্ষণীয় দাবিকে দ্রুত প্রতিষ্ঠা করার মধ্যে নয়; বরং উপলব্ধ প্রমাণ যতদূর সমর্থন করে, সিদ্ধান্তকে ততদূরেই সীমাবদ্ধ রাখার মধ্যে নিহিত। এই পদ্ধতি অনুসরণ করলে বসু পরিবারের ঐতিহ্যের গুরুত্ব অক্ষুণ্ণ থাকে, অথচ তার ঐতিহাসিক অবস্থান নির্ধারণের প্রশ্নটি খোলা ও অনুসন্ধানযোগ্য থাকে।

দুর্গাপূজার ইতিহাসে ‘প্রথম’ শব্দটির সমস্যাও এখানেই। প্রথম দেবী-উপাসনা, প্রথম শরৎকালীন দুর্গোৎসব, কোনও নির্দিষ্ট পরিবারের প্রথম পূজা, বৃহৎ আকারে পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত পূজা এবং সমকালীন দলিলে প্রমাণিত প্রাচীনতম পূজা—এগুলি একটি আলাদা আলাদা ঐতিহাসিক শ্রেণি। একটি পরিবারের পূজার প্রাচীনত্ব অন্য সব অঞ্চলে তার আগে কোনও পূজা ছিল না—এমন প্রমাণ দেয় না। একইভাবে, কোনও একটি পূজা পরবর্তী কালে বৃহত্তর পরিচিতি লাভ করেছে বলেই অন্য কোনও পরিবারের পূর্ববর্তী ঐতিহ্যকে অস্বীকার করা যায় না। বাংলার দুর্গাপূজার ইতিহাসে তাই একাধিক আঞ্চলিক ও পারিবারিক কালক্রম পাশাপাশি থাকতে পারে। এই বহুত্বকে স্বীকার করা ইতিহাসের দুর্বলতা নয়; বরং ইতিহাসের জটিলতা ও প্রমাণের সীমা সম্পর্কে সচেতন থাকার লক্ষণ।

অবশেষে, দুর্গাপূজার ইতিহাসকে শুধু প্রাচীনত্বের প্রতিযোগিতা হিসেবে না দেখে তার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তরের ইতিহাস হিসেবে পড়া প্রয়োজন। দেবীর পৌরাণিক মাহাত্ম্য তাঁকে ধর্মীয় কল্পনার কেন্দ্রে স্থাপন করেছে; রামায়ণের বিভিন্ন পাঠ সেই উপাসনাকে নতুন আখ্যানগত অর্থ দিয়েছে; আচারগ্রন্থ পূজার বিধিবদ্ধ কাঠামো সংরক্ষণ করেছে; আর পারিবারিক পৃষ্ঠপোষকতা ও স্থানীয় ঐতিহ্য পূজাকে নির্দিষ্ট সামাজিক পরিসরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহন করেছে। এই প্রক্রিয়াগুলির মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজা ধর্মীয় আচারকে অতিক্রম করে স্মৃতি, পরিচয় ও সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। সেই ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ পুনর্গঠনের জন্য সাহিত্য, পুরাণ, আচারগ্রন্থ, পারিবারিক বৃত্তান্ত এবং ফারসি প্রশাসনিক নথিকে তাদের নিজস্ব প্রমাণমূল্য অনুসারে পাশাপাশি পড়তে হবে। কোনও একক উৎস সমগ্র ইতিহাসের উত্তর দিতে পারে না; কিন্তু বিভিন্ন উৎসের পারস্পরিক তুলনা এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সাহায্য করে, যা একক কোনও গ্রন্থ বা দলিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

বাংলার দুর্গাপূজার ইতিহাসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক সম্ভবত এই যে, এর কোনও একটি মাত্রা দিয়ে সমগ্র উৎসবকে ব্যাখ্যা করা যায় না। অকালবোধনের সাহিত্যিক ইতিহাস আমাদের জানায়, কীভাবে শরৎকালীন পূজা মহাকাব্যিক স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে; পারিবারিক ঐতিহ্য আমাদের জানায়, কীভাবে নির্দিষ্ট পরিবার ও অঞ্চল পূজার ধারাবাহিকতাকে নিজেদের অতীতের অংশ করে তুলেছে; আর সমকালীন দলিল সেই স্মৃতি ও দাবিকে ঐতিহাসিক প্রমাণের আলোয় পরীক্ষা করার সুযোগ দেয়। খলিসানির বসু পরিবারের ঐতিহ্য এই বৃহত্তর অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার তাৎপর্য কোনও পূর্বনির্ধারিত ‘প্রথমত্ব’ প্রতিষ্ঠায় সীমাবদ্ধ নয়। বরং এই ঐতিহ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বাংলার ধর্মীয় ইতিহাসের বহু অধ্যায় এখনও স্থানীয় নথি, পারিবারিক আর্কাইভ এবং আঞ্চলিক স্মৃতির গভীরে নিহিত। সেই উপাদানগুলিকে পদ্ধতিগতভাবে উদ্ধার ও বিশ্লেষণ করাই বাংলার দুর্গাপূজার ইতিহাসকে আরও সমৃদ্ধ, প্রমাণনির্ভর এবং বহুস্বরিক করে তোলার পথ।

টীকা

১. June McDaniel, Offering Flowers, Feeding Skulls: Popular Goddess Worship in West Bengal (New York: Oxford University Press, 2004), 209–64.

২. Kṛttivāsa Ojha, Kṛttivāsī Rāmāyaṇa, Laṅkākāṇḍa, অকালবোধন-পর্ব। কৃত্তিবাসী রামায়ণে রামের শরৎকালীন দুর্গাপূজার আখ্যান রয়েছে, কিন্তু বাল্মীকি রামায়ণে এই আখ্যান নেই — এই পার্থক্যটি গবেষণামূলক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ।

৩. Kṛttivāsī Rāmāyaṇa-র পাঠ-পরম্পরা সম্পর্কে সতর্কতার কারণ হল এর বহু পাণ্ডুলিপি, মৌখিক পরিবেশন ও পরবর্তী সংযোজনের ইতিহাস। এই কারণে ‘কৃত্তিবাসের মূল পাঠ’ এবং পরবর্তী প্রচলিত পাঠকে সর্বদা অভিন্ন ধরে নেওয়া উচিত নয়।

৪. আমরা বসু পরিবারের বংশপঞ্জিকা উদ্ধারে সমর্থ হয়েছি, পাশাপাশি বেশ কয়েকটি ফারসি চিঠি পত্র আমাদের হাতে এসেছে।

৫. Tapati Guha-Thakurta, In the Name of the Goddess: The Durga Pujas of Contemporary Kolkata (Delhi: Primus Books, 2015), 1–28.

৬. June McDaniel, Offering Flowers, Feeding Skulls, 27–65, 145–208. 

৭. Devī Māhātmya, chapters 2–4, in Mārkaṇḍeya Purāṇa.

৮. Saswati Sengupta, “Domestication of the Disorderly Devī: The Caṇḍī Maṅgalakāvya of Bengal,” in The Oxford History of Hinduism: The Goddess, ed. Mandakranta Bose (Oxford: Oxford University Press, 2018), 259–78.

৯. McDaniel, Offering Flowers, Feeding Skulls, 209–64.

১০. Mandakranta Bose, “Rāmāyaṇa Textual Traditions in Eastern India,” in The Ramayana Revisited, ed. Mandakranta Bose (New York: Oxford University Press, 2004), 87–106. এই অধ্যায়ে বাংলা, অসম ও ওড়িশার রামায়ণ-পরম্পরার আঞ্চলিক ও ধর্মীয় বৈশিষ্ট্য আলোচনা করা হয়েছে।

১১. Vālmīki Rāmāyaṇa, Yuddhakāṇḍa 6.105.1–6, Ādityahṛdaya পর্বের সূচনা। এখানে রামের যুদ্ধক্লান্তি ও অগস্ত্যের সূর্যস্তবের উপদেশের বিবরণ রয়েছে। সর্গ ও শ্লোকসংখ্যা প্রচলিত সংস্কৃত পাঠের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে; বিভিন্ন সংস্করণে অধ্যায় ও শ্লোকসংখ্যায় সামান্য পার্থক্য থাকতে পারে।

১২. Śrīmad Devī Bhāgavata Purāṇa, 3.30, বিশেষত 3.30.25–30। রাবণবধের পূর্বে রামের দুর্গারাধনা এবং দেবীর আশীর্বাদের প্রসঙ্গের জন্য এই অধ্যায়টি প্রাসঙ্গিক। অধ্যায় ও শ্লোকসংখ্যা নির্দিষ্ট সংস্করণের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া উচিত।

১৩. Bṛhaddharma Purāṇa, Pūrvakhaṇḍa 1.21–22. এই অধ্যায়গুলির সঙ্গে রামের দুর্গাপূজা ও শরৎকালীন পূজার আচারসংক্রান্ত বর্ণনা যুক্ত। তুলনামূলক আলোচনার জন্য দেখুন Studies in the Upapurāṇas, vol. 1, “The Śākta Upapurāṇas,” 451–52; পাশাপাশি Bṛhaddharma Purāṇa, trans. Śyāma Caraṇ Banerji (1915), chap. 21–22।

১৪. Devī Bhāgavata Purāṇa 3.30; Bṛhaddharma Purāṇa, Pūrvakhaṇḍa 1.21–22. এই পাঠগুলির পারস্পরিক কালানুক্রম নির্ধারণ করতে হলে নির্দিষ্ট সংস্করণ, পাঠভেদ ও রচনাকাল-সংক্রান্ত গবেষণা আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

১৫. Bose, “Rāmāyaṇa Textual Traditions in Eastern India,” 87–106 ; Bihani Sarkar, “The Rite of Durgā in Medieval Bengal: An Introductory Study of Raghunandana’s Durgāpūjātattva with Text and Translation of the Principal Rites,” Journal of the Royal Asiatic Society 22, no. 2 (2012): 325–390, বিশেষত 325–33।

১৬. Kinjal Bose, “Durga Puja of ‘Bonedi’ Families of Chandannagar,” 12 October 2019. লেখক খলিসানির বোসপাড়ার বসু পরিবারের পূজার সূচনা ৯১৪ বঙ্গাব্দে এবং প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে করুণাময় বসুর নাম উল্লেখ করেছেন। এটি স্থানীয় পারিবারিক ঐতিহ্য সম্পর্কে একটি প্রকাশিত বিবরণ; সমকালীন প্রতিষ্ঠা-দলিলের বিকল্প নয়।

১৭. “The Sabarna Roy Choudhury Family Durga Puja, Barisha,” The Cultural Heritage of India; এবং Debashis Konar, “Kolkata’s Oldest Durga Puja Turns 413 Years at Barisha’s Sabarna Roy Choudhuri Home,” The Times of India, 4 October 2022. উভয় বিবরণে ১৬১০ সালের ঐতিহ্যের উল্লেখ রয়েছে; এগুলিকে পারিবারিক ইতিহাসের প্রচলিত তারিখের সাক্ষ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ইতিহাস বিভাগে গবেষণারত; তিনি উত্তর-পূর্ব পার্বত্য বিশ্ববিদ্যালয় (NEHU), শিলং-এর ইতিহাস বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর এবং রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যামন্দির, বেলুড় মঠ থেকে স্নাতক শিক্ষা সম্পন্ন করেছেন। তাঁর গবেষণার আগ্রহের ক্ষেত্র মূলত লিঙ্গ ইতিহাস, শ্রমজীবী ও কর্মজীবী শ্রেণির আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নের ইতিহাস (Aspirations and Dreams), প্রান্তিক ও সাবঅল্টার্ন সম্প্রদায়ের ইতিহাস, মধ্যযুগীয় ভারতে সমকামিতার ইতিহাস, এবং ডাইনি-বিদ্যা ও ডাইনিবিদ্যার ইতিহাস। তাঁর গবেষণার মূল লক্ষ্য বিভিন্ন ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষমতা, প্রান্তিকতা ও পরিচয়ের জটিল আন্তঃসম্পর্ক বিশ্লেষণ করে, ইতিহাসের নীরব ও উপেক্ষিত অভিজ্ঞতাগুলিকে নতুন আলোয় তুলে ধরা।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।