দলবাহাদুর গিরি – স্বাধীনতা সংগ্রামের এক বিস্মৃত পদাতিক
১৯৪৭ সালের অগাস্ট মাসের এক মধ্য রাত্রে ভারত পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচন করে পা বাড়িয়েছিল নিয়তির সঙ্গে অভিসারে। দেশভাগের অন্ধকারের মাঝেও নতুন স্বাধীনতার সেই অরুণোদয়ের মুহূর্তের পেছনে ছিল অসংখ্য মানুষের ত্যাগ। স্বাধীনতা সংগ্রামের এই পদাতিকরা এসেছিলেন দেশের সব প্রান্ত থেকে। নানাবিধ ভাষায় কথা বলা, নানা প্রকার সংস্কৃতির অনুসারী ও ভিন্ন ভিন্ন ধর্মে আস্থাশীল এই মানুষগুলিকে মিলিয়ে দিয়েছিলেন দেশের ডাক। কিছু পাওয়ার আশায় এই ডাকে তাঁরা সাড়া দেননি। তাই দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে তাঁদের অনেকেই যখন বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেলেন, তখন একজনের কন্ঠেও শোনা যায়নি আক্ষেপের ধ্বনি। তবুও ইতিহাস তো আদতে বিস্মৃতির বিরুদ্ধে স্মৃতির সংগ্রাম, তাই এই স্বাধীনতা দিবসে স্মরণ করি এমনই এক বিস্মৃত স্বাধীনতার পদাতিককে, যিনি স্বাধীনতার সূর্যোদয় দেখে যেতে পারবেন না জেনেও নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন সেই ভোরের আলোকে আবাহন করে আনতে। আজ ১৫ অগাস্ট শ্রদ্ধায় স্মরণ করি দলবাহাদুর গিরিকে।
আমাদের রাজ্যের মাথায় মুকুটের মতো অবস্থান ‘হিমালয়ের রানি’ দার্জিলিং-এর। উনিশ শতকের প্রথমার্ধে সিকিমের রাজার থেকে এই অঞ্চলটি হাতে আসার পর সামরিক শিবির ও তারপর স্বাস্থ্যকেন্দ্র হিসেবে শৈলরানিকে গড়ে তুলেছিল ব্রিটিশরা। লেপচারা পূর্বেই এই অঞ্চলে বসবাস করতেন। চা বাগানের কাজে ধীরে ধীরে এলেন নেপালিরা (অবশ্য ব্রিটিশ আমলের পূর্বে এক সময়ে এই অঞ্চলে নেপালিদের আবাস থাকার কিছু প্রমাণ পাওয়া যায়)। বসতি জমালেন ভোটিয়ারাও।
দার্জিলিং-এর অধিকাংশ বাসিন্দাই ব্রিটিশ ভারতের রাজনৈতিক সীমানার বাইরে থেকে এলেও উনিশ শতকের শেষ ভাগে এসে এই মাটিতে তাঁদের শিকড় চারিয়ে গিয়েছিল গভীরে। দার্জিলিং-এর মাটিতে শিকড় ছড়িয়ে দেওয়া এমনই এক নেপালি পরিবারে ১৮৮৭ সালের ৮ মার্চ দার্জিলিং শহরের চকবাজারে জন্ম নিয়েছিলেন দলবাহাদুর গিরি। তাঁর পিতা শিবলাল গিরি পেশায় ছিলেন দার্জিলিং-এর আরক্ষা বিভাগের একজন সাধারণ কর্মচারী, পরে অবশ্য নিজ যোগ্যতায় পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টর হিসেবে তাঁর পদোন্নতি হয়। তাঁর মা ধনমায়া ছেত্রীর পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ছিল। তাঁর উৎসাহেই ১৮৯৩ সালে, দলবাহাদুরের যখন ছয় বছর বয়স, তখন তাঁকে দার্জিলিং-এর সরকারি বিদ্যালয়ের প্রাথমিক বিভাগে ভর্তি করে দেওয়া হয়।
ছাত্রাবস্থায় দলবাহাদুর ছিলেন শান্ত, ধীর প্রকৃতির ও মিতবাক। শিক্ষকরা তাঁকে বিশেষ স্নেহ করতেন। মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচিত দলবাহাদুর স্কুল শিক্ষা শেষে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নিজের বিদ্যালয়েই প্রথমে অস্থায়ী শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন। তবে কিছুদিনের মধ্যেই এই কাজ ছেড়ে তিনি দার্জিলিং-এর জলপাহাড়ে স্টেশন স্টাফ হসপিটালে করণিকের কাজে যোগ দেন। এরপর ক্রমশ কর্মক্ষেত্রে তাঁর উন্নতি হয়। পাহাড়ের তৎকালীন ডেপুটি কমিশানার চেয়েছিলেন তিনি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পদে নিযুক্ত হোন। বাকি সব যোগ্যতা পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হলেও বাধ সাধল স্বাস্থ্য। স্বাস্থ্য পরীক্ষায় আটকে গিয়ে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট না হতে পারা দলবাহাদুরের জীবনের অন্যতম ক্ষতি। অবশ্য একদিক থেকে এ ছিল পাহাড়ের স্বদেশপ্রেমিক মানুষের লাভ। কারণ ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হলে তাঁর হয়তো স্বাধীনতা সংগ্রামে জড়িয়ে পড়া হত না।
১৯১০ সাধারণাব্দে দলবাহাদুর গিরি বিবাহ করেন কৃষ্ণমায়া ছেত্রীকে। এর পরেই তিনি সিকিম রাজদরবারে প্রধান করণিকের পদে যোগ দেন। দেশের বাইরে গেলেই মানুষ দেশের টান অনুভব করে। সিকিমে কাজ করতে করতেই দলবাহাদুর উপলব্ধি করলেন, তিনি দেশকে ঠিক কতটা ভালোবাসেন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের চরিত্রও তাঁর কাছে ক্রমে স্পষ্ট হচ্ছিল। সিকিম তখন ছিল ব্রিটিশ সরকারের করদ রাজ্য। অর্থনৈতিক বহু বিষয়েই ব্রিটিশ সরকার নিযুক্ত আধিকারিকরা নাক গলাতেন। দলবাহাদুর আবিষ্কার করলেন এই আধিকারিকরা তহবিল তছরূপ করছ যথেচ্ছ ভাবে। বিপদ বুঝে তাঁকে দলে টানার চেষ্টা হল। লুঠের ভাগ পেলেই দলবাহাদুর খুশি এমন ভাবলেন আধিকারিকরা। ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যাত হল তাঁদের এই প্রস্তাব। দলবাহাদুর বললেন, ‘ধন ভন্দা, ইমান বড়’। উৎকোচ দিয়ে ক্রয় করতে না পেরে তাঁকে সিকিম থেকেই বহিস্কার করার চেষ্টা করতে লাগলেন ব্রিটিশ আধিকারিকরা। ওদিকে দলবাহাদুর যে সিকিমের রাজতন্ত্রের সমর্থক অভিজাত ও জমিদারদেরও খুব নেক নজরে ছিলেন, এমন নয়। জমিদারদের নানা দুর্নীতির প্রতিবাদ তিনি করতেন। কৃষকদের অভিযোগ শুনতেন গুরুত্ব দিয়ে। জনৈক জমিদারের এক হাজার টাকার উৎকোচ তিনি মুখের উপর ছুঁড়ে ফেলে দেন। কৃষকদের প্রতি তাঁর বিশেষ সহানুভূতি ও জমিদারদের প্রতি নেতিবাচক মানসিকতা দিনে দিনে তাঁর শত্রু বাড়িয়ে তুলল। রাজতন্ত্রের অংশ অভিজাত ও জমিদাররাও তাই সচেষ্ট হল দলবাহাদুরকে রাজ্য ছাড়া করতে।
একদিকে ব্রিটিশ আধিকারিক অন্যদিকে রাজতন্ত্রী অভিজাত ও জমিদার, সিকিমের রাজনীতিতে সাধারণত বিবাদমান দুই পক্ষ, তাঁদের মিলিয়ে দিলেন দলবাহাদুর গিরি। সিকিমের শাসক ‘চোগিয়াল’ কিন্তু এই সৎ রাজকর্মচারীকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। কিন্তু এই যৌথ চাপে নিরুপায় হয়ে তাঁকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হল। প্রথমে দলবাহাদুরকে গ্রেপ্তার করা হল, তারপর ১৯১৬ সালে তিনি বহিষ্কৃত হলেন সিকিম থেকে। এই সামগ্রিক ঘটনা দলবাহাদুর গিরির রাজনৈতিক যাত্রাপথ নির্ধারণ করে দিল। তিনি স্থির করলেন, পাহাড় থেকে ব্রিটিশ শাসন উচ্ছেদ না হলে এই অঞ্চলের মানুষের উন্নতি সম্ভব নয়।
দার্জিলিং-এ ফিরে পাহাড়ে রাজনৈতিক কাজকর্ম শুরু করলেন দলবাহাদুর। চা শ্রমিকদের মধ্যে গড়ে তুললেন সংগঠন। এই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ফাঁকেই ১৯১৮ সালে কলকাতায় জাতীয় কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হচ্ছে বলে তিনি খবর পেলেন। কংগ্রেসের কথা জানা থাকলেও তার কর্মসূচী সম্পর্কে দলবাহাদুর গিরির কোনো স্পষ্ট ধারণা ছিল না। তবে এটা তিনি ক্রমশ উপলব্ধি করতে পারছিলেন যে বৃহত্তর কোনো জাতীয় মঞ্চের সঙ্গে পাহাড়ের সংগ্রামকে যুক্ত করতে হবে। একক ভাবে পাহাড়ের মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় জগদ্দল ব্রিটিশ শাসনকে উচ্ছেদ করা। ব্রিটিশ বিরোধী লড়াই আদতে জাতীয় লড়াই। এই লড়াই তাই লড়তে হবে জাতীয় পরিসরের বৃহত্তর আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে।
কলকাতায় গেলেন দলবাহাদুর গিরি। কংগ্রেসের অধিবেশনে সেই প্রথম পা রাখলেন কোনো পাহাড়ের প্রতিনিধি। গান্ধিজির সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হল। বহু আলাপ আলোচনা শেষে দলবাহাদুর যখন ফেরার পথ ধরলেন, তখন তিনি মনে প্রাণে গান্ধি অনুগামী। কলকাতা থেকে পাহাড়ে নিয়ে গেলেন কংগ্রেসের পতাকা আর সদস্যপদ সংগ্রহের চার আনার বিল।
পাহাড়ে এসেই জাতীয় কংগ্রেসের সংগঠন বিস্তারে ও জাতীয় আন্দোলনকে ছড়িয়ে দিতে সর্বশক্তি নিয়োজিত করলেন দলবাহাদুর। সংগঠক হিসেবে তাঁর বিশেষ দক্ষতা ছিল। যে কোনো সংগঠকের মতোই তিনি তুলে আনলেন একঝাঁক তরুণ কর্মীকে—অগম সিং গিরি, প্রতিমান সিং লামা, গাগা ছিড়িং। এঁরা প্রত্যেকেই কালক্রমে হয়ে উঠবেন পাহাড়ের বিখ্যাত নেতা। দার্জিলিং জেলার পেডং অঞ্চলে গড়ে উঠল কংগ্রেসের মূল কার্যালয়। ১৯১৯ সালে কংগ্রেসের বোম্বে অধিবেশনেও পাহাড়ের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন দলবাহাদুর। ১৯২০ সালের নাগপুর অধিবেশনে যখন অহিংস অসহযোগের প্রস্তাব গৃহীত হয়, তখন তিনি তার উৎসাহী সমর্থক ছিলেন।
অধিবেশন থেকে ফিরেই দার্জিলিং, কার্শিয়াং, কালিম্পং-এর প্রত্যন্ত অঞ্চলেও অহিংস অসহযোগের বার্তা ছড়িয়ে দিলেন দলবাহাদুর ও তাঁর অনুগামীরা। এদিকে ডেপুটি কমিশানারের মদতে স্থানীয় রাজভক্ত ব্যক্তিরা সরকারী সাহায্য নিয়ে ‘রিং’ নামক এক চলচিত্র প্রেক্ষাগৃহে বৈঠক ডাকে। এই বৈঠকে চা-বাগানের সর্দারদেরও ডাকা হয়। উদ্দেশ্য, দলবাহাদুরের বিরুদ্ধে প্রথমে সর্দারদের এবং পরে তাদের মাধ্যমে কুলিদের দলবাহাদুরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়া। এই পরিকল্পনার খবর পেয়ে বৈঠক চলাকালীন দলবাহাদুর এসে উপস্থিত হলেন ‘রিং’-এ। স্বয়ং ডেপুটি কমিশানারের সঙ্গে তিনি তীব্র বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়লেন। রাজভক্ত পাহাড়ি নেতারা ঘাড় ধরে তাঁকে সভা থেকে বের করার চেষ্টা করলে রুখে দাঁড়ায় চা-বাগানের সর্দাররা। পুরো ঘটনায় ব্রিটিশ সরকার ও সরকারের অনুগত নেতারা যা চেয়েছিলেন, ফল হল তার বিপরীত। চা-বাগানের সর্দার আর শ্রমিকদের মধ্যে দলবাহাদুরের প্রভাব হ্রাস পাওয়ার পরিবর্তে বহুগুণ বেড়ে গেল।
দলবাহাদুরের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তায় শঙ্কিত ডেপুটি কমিশানার আর উপায় না দেখে তাঁকে দার্জিলিং থেকে বহিষ্কারের আদেশ দিলেন। তাঁর ভয় ছিল দলবাহাদুর বিনা বাধায় পাহাড়ে আর কাজ করার সুযোগ পেলে এই অঞ্চলে ব্রিটিশ শাসন টলে যাবে। এই আদেশের জবাব এক বাক্যে দিলেন দলবাহাদুর,
‘মেরো প্রাণ গয়ে পনি ম মেরো জন্মভূমি ছাড়নে ছৈন’ (আমার প্রাণ গেলেও জন্মভূমি আমি ত্যাগ করতে পারব না)।
এই পরিস্থিতিতে সরকার ১৯২১ সালের জানুয়ারি মাসে তাঁকে গ্রেফতার করে কারাবন্দি করে। কিন্তু দলবাহাদুরকে কারারুদ্ধ করেও পাহাড়ের আন্দোলন স্তব্ধ করা গেল না। মানবাহাদুর ও অগম সিং গিরি, দিলবাহাদুর ছেত্রী, রামচন্দ্র গিরি, লক্ষণ গিরির মতো দলবাহাদুরের অনুগামীরা পাহাড়ের অসহযোগ আন্দোলনের তীব্রতা বজায় রাখলেন। দলবাহাদুর এদিকে কারাগারের মধ্যে অন্যান্য বন্দিদের সংগঠিত ও স্বদেশমুক্তির আদর্শে দীক্ষিত করতে লাগলেন। ভীত সরকার তাঁকে স্থানান্তরিত করল কলকাতার সেন্ট্রাল জেলে।
কিছুদিন পর দলবাহাদুর মুক্তি পেলেন। কিন্তু ইতিমধ্যে মহাত্মা গান্ধি নিজে কারারুদ্ধ হয়েছেন। তাঁর এবং আলি ভ্রাতৃদয়ের মুক্তির দাবীতে ১৯২১ সালের নভেম্বর মাসে দার্জিলিং-এর চকবাজারে দলবাহাদুরের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হল এক বিশাল জনসভা। ইতিমধ্যে ‘প্রিন্স অফ ওয়েলস্’ দার্জিলিং-এ আসছেন এই খবর পেয়ে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দলবাহাদুরকে নির্দেশ দেন এই সভা বানচাল করতে। এর প্রস্তুতি নেওয়ার মাঝেই দলবাহাদুর দ্বিতীয় বারের মতো গ্রেফতার হন। তাঁকে প্রেরণ করা হয় হুগলি জেলে। এই কারাবাসের সময়ই তাঁর সঙ্গে আলাপ ও বন্ধুত্ব হয় সহবন্দি সুভাষচন্দ্র বসুর। জেলের অস্বাস্থ্যকর পরিস্থিতিতে দলবাহাদুর গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। কারাগারেই তাঁর মৃত্যু হতে পারে, এই ভয়ে সরকার তাকে মুক্তি দেয়। অহিংস অসহযোগ আন্দোলনও তখন প্রত্যাহার করা হয়েছে। তাই রাজনৈতিক ভাবে সরকারের ভীতিও অনেকটা কমে এসেছিল।
ইতিমধ্যে দলবাহাদুর গিরির সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হয়েছে, আর এমনিতেও বাজেয়াপ্ত হওয়ার আগে তার একটি বড় অংশ তিনি জাতীয় আন্দোলনের জন্য ব্যয় করেছিলেন। প্রায় কপর্দক শূন্য অবস্থায় ও ভগ্ন স্বাস্থ্যে দলবাহাদুর দার্জিলিং-এ ফিরে এলেন। তাঁর এই অবস্থা সম্পর্কে জানতে পেরে বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়ের মাধ্যমে সুভাষচন্দ্র কিছু অর্থ প্রেরণ করে তাঁর প্রতি বন্ধুকৃত্য করেন। শুধু তাই নয়, দলবাহাদুরের সাহায্যের জন্য তিনি জনমত গড়ে তুলতে প্রয়াসী হন। ‘সারথি’ পত্রিকায় তিনি জনসাধারণের উদ্দেশ্যে লেখেন,
‘দেশপ্রেমিক অক্লান্ত কর্মী দলবাহাদুর গিরি আজ রোগশয্যায় পড়িয়ে রহিয়াছেন, অথচ আজ পর্যন্ত দেশবাসী তাঁহার দুঃস্থ পরিবারের ও এই ত্যাগী দেশনেতার সাহায্যের জন্য একটুও চঞ্চল হয় নাই। আজ বিনা চিকিৎসায় মহাপ্রাণ কর্মী কষ্ট পাইতেছেন। দেশবাসী কি তাহাতে কষ্ট অনুভব করিতেছেন না? দলবাহাদুর গিরি হাসপাতাল হইতে নিজ গৃহেই অবস্থান করিতেছেন। যাঁহার শক্তিতে যতটুকু কুলাইবে তিনি ততটুকুই সাহায্য করুন।’
কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, সুভাষের এই আহ্বানে বিশেষ সাড়া পড়েনি। ১৯২৪ সালের ৯ নভেম্বর সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দলবাহাদুর গিরি কালিম্পং-এ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণের সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি যুগের অবসান হয়।
দলবাহাদুর গিরির মৃত্যুতে জাতীয় নেতারা প্রায় সকলেই শোক প্রকাশ করেন। নরেন্দ্র নারায়ণ চক্রবর্তী তাঁকে অভিহিত করেন ‘পাহাড়ি দার্জিলিং কংগ্রেসের একচ্ছত্র নেতা’ হিসেবে। মহাত্মা গান্ধি ‘ইয়ং ইন্ডিয়া’ পত্রিকায় দলবাহাদুর গিরির কৃতিত্ব স্মরণ করে ১৯২৪ সালের ১৩ নভেম্বর লেখেন,
‘Many readers of Young India know Sjt. Dal Bahadur Giri by name only. Some may not have even heard his name. Yet he was one of the braves of national workers.’
১৯২৪ সালের কংগ্রেসের বেলগাঁও অধিবেশনে তাঁর সম্বন্ধে শোকপ্রস্তাব পাঠ হয়। দলবাহাদুর গিরির মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী ও সন্তানরা অসহনীয় দারিদ্র্যের সম্মুখীন হন। গান্ধি স্বয়ং এই পরিস্থিতি জানতে পেরে সবরমতিতে তাঁদের আশ্রয় দেন।
দলবাহাদুর গিরির মৃত্যুতে কিন্তু পাহাড়ের আন্দোলন থেমে গেল না। তাঁর শূন্যস্থানে নেতা হিসেবে উঠে এলেন তাঁরই হাতে তৈরি প্রতিমান সিং লামা, গাগা ছিড়িং, ভক্তবীর লামা ও জঙ্গবীর সাপকোটার মতো নেতারা। এইখানেই ছিল দলবাহাদুর গিরির কৃতিত্ব। দূরদর্শী নেতা তাঁর পরবর্তী প্রজন্মকে তৈরি করে দিয়ে যান, যাতে আন্দোলনের মশাল রিলে দৌড়ের ব্যাটনের মতো সেই প্রজন্ম তুলে নিতে পারে। দলবাহাদুর এই কাজটি করেছিলেন অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে। ক্রমে ব্রিটিশ শাসকরাও উপলব্ধি করে, দলবাহাদুর পাহাড়ে যে সংগঠন তৈরি করে দিয়ে গেছেন, তা ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়। এক ব্যক্তির মৃত্যুতে এটি উচ্ছেদ করা যাবে না। এই উপলব্ধি থেকে তারা আশ্রয় নেয় পৃথক পন্থার, পাহাড়ি জনজাতিগুলির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির পন্থার। সেই প্রসঙ্গ অবশ্য এই প্রবন্ধের আলোচনার বিষয় নয়।
শেষ করা যাক কয়েকটি কথা বলে। দলবাহাদুর গিরি দেশের জনতাকে এতটাই ভালোবাসতেন, তিনি তাঁর অনুগামীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন মৃত্যুর পর শ্রাদ্ধশান্তি বা ব্রাহ্মণ ভোজন না করে দরিদ্র জনতাকেই যেন নারায়ণ জ্ঞান করে একবেলা দু-মুঠো খাওয়ানো হয়। গণদেবতার প্রতি এই প্রবল ভক্তির কারণেই তিনি সিকিমের করণিকের আরামের চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়া মেনে নিয়েছিলেন, কিন্তু উৎকোচ নিয়ে প্রজাদের সঙ্গে বেইমানি করার কথা ভাবেননি। এই দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি পাহাড়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠন ও গণ-আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন এবং তাকে যুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন বৃহত্তর জাতীয় আন্দোলনের সঙ্গে।
এর পরিবর্তে এই মহান দেশপ্রেমিকের প্রাপ্তি কী ছিল ? দুই বার কারাবাসের পর কপর্দক শূন্য অবস্থায় ভগ্ন স্বাস্থ্যে মৃত্যুবরণ। যদি মহাত্মা গান্ধি ও সুভাষচন্দ্রের মতো ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তাঁর সখ্যতা না থাকত, তাঁর পরিবারের অবস্থা শোচনীয় হত। এই মহৎ আত্মত্যাগের প্রতিদান আমাদের পক্ষে দেওয়া সম্ভব না। তবুও প্রতিদানের প্রচেষ্টা হিসেবেই আমরা আজকের দিনে স্মরণ করতে পারি স্বাধীনতা সংগ্রামের এই অকুতভয় পদাতিককে যিনি আরও অনেকের মতো মুক্তির মশাল প্রজ্বলিত করতে সর্বস্ব দিয়ে নিমজ্জিত হয়েছেন বিস্মৃতির আঁধারে।
প্রচ্ছদ চিত্র পরিচিত: দলবাহাদুর গিরি (সৌজন্যে – দ্য দার্জিলিং ক্রনিকলস্)
তথ্যসূত্র
- A. S., Giri, ‘Swargiya Shri Dal Bahadur Giriko Sanchipta Jivani.’ Dal Bahadur Giri (Smriti Grantha), R. P. Lama and Jagat Chettri (ed.), (Nepali Sahitya Sammelan, 1988.). [In Nepali].
- Kamala Sankrityayan, ‘Bharatko Swadhinata Sangramka Vismrit Yoddha Shri Dal Bahadur Giri’ Dal Bahadur Giri (Smriti Grantha), R. P. Lama and Jagat Chettri (ed.), (Nepali Sahitya Sammelan, 1988). [In Nepali].
- আনন্দগোপাল ঘোষ, ‘স্বাধীনতা আন্দোলনে দার্জিলিং জেলার নেপালিদের ভূমিকা’, ইতিহাস অনুসন্ধান – ৩, গৌতম চট্টোপাধ্যায় (সম্পা.), (পশ্চিমবঙ্গ ইতিহাস সংসদ, ১৯৮৮)।
- প্রবাল সেনগুপ্ত, ‘দলবাহাদুর গিরি – এক ভুলে যাওয়া স্বাধীনতা সৈনিক’, ইতিহাস অনুসন্ধান – ৩৬, অরুণ বন্দ্যোপাধ্যায় (সম্পা.), (পশ্চিমবঙ্গ ইতিহাস সংসদ, ২০২৩ )।
সুন্দর মনোগ্রাহী রচনা। আজ স্বাধীনতা দিবসে একজন বিস্মৃত অজানা স্বাধীনতা সংগ্রামীর জীবন সম্পর্কে জেনে খুব ভালো লাগল।