সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

স্বাধীনতার পরে ভারত: রামচন্দ্র গুহ’র চোখে

স্বাধীনতার পরে ভারত: রামচন্দ্র গুহ’র চোখে

সৌভিক ঘোষাল

জুন ২৬, ২০২১ ৮৭

(গ্রন্থ নাম : India After Gandhi: The History of the World’s Largest Democracy; লেখকের নাম : রামচন্দ্র গুহ; প্রকাশকের : পিকাডর ইন্ডিয়া)

কোনও কোনও বই একবার পড়ে মন ভরে না। আবার ফিরে পড়তে ইচ্ছে করে সময় সুযোগ হলে। লকডাউনের গৃহবন্দী দশায় গত কিছুদিন ধরে আবার পড়লাম রামচন্দ্র গুহ’র লেখা স্বাধীন ভারতের ইতিহাসের এক বিপুল কলেবরের বই – ‘ইন্ডিয়া আফটার গান্ধী’। সেই পাঠের সূত্রে মনে আসা কথাগুলো আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া যাক।

রামচন্দ্র গুহ এই বইটির প্রথম অংশটি লেখেন সময়ের ধারাবাহিকতা মেনে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭৭ – প্রথম তিরিশ বছর এই আঙ্গিকে লেখার পর পরের তিরিশ বছরের ইতিহাস, যা সমসাময়িকতার মধ্যে এসে যাচ্ছে প্রচলিত মত অনুযায়ী, সেই ১৯৭৭ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত সময়ের ইতিহাস তিনি লিখেছেন বিভিন্ন প্রসঙ্গকে ভিত্তি করে, যেমন সাম্প্রদায়িকতা, জাতপাতের দ্বন্দ্ব ইত্যাদি।

এটা বোঝা যায় রামচন্দ্র গুহর রাজনীতি ভাবনায় সবচেয়ে শ্রদ্ধার আসনে যে মানুষটি আছেন তিনি নেহরু। আরো অনেকের মত তিনিও মনে করেছেন বহু সীমাবদ্ধতা এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভুলভ্রান্তি সমেত ভারত যে অখণ্ডতা ও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিতের ওপর দাঁড়াতে পেরেছে কোনও একক ব্যক্তি হিসেবে তার সবচেয়ে বেশি কৃতিত্ব নেহরুই পাবেন। স্বাধীনতার পর তুলনায় কম দিন যারা কাজ করতে পেরেছিলেন, কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে কাজ করেছিলেন – এমন দুজন ব্যক্তির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে ভারত নির্মাণে – এরকমটা গুহ মনে করেছেন। একজন ডঃ বি. আর. আম্বেদকর, যিনি ভারতের সংবিধান প্রণয়নের মূল কারিগর, যে সংবিধান ভারতকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ এবং ইনক্লুসিভ চরিত্র দিতে পেরেছে, যা শেষ পর্যন্ত তার অনন্যতার কারণ হয়েছে। অন্যজন সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেল, যিনি স্বাধীনতার সময়ের দেশভাগ জনিত প্রশাসনিক সমস্যাকে যেমন দক্ষতার সঙ্গে সামলেছিলেন, তেমনি অন্যদিকে অসামান্য ভূমিকা পালন করেছিলেন রাজন্য শাসিত রাজ্যগুলিকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করে তাকে এক দৃঢ়বদ্ধ ‘নেশন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার ক্ষেত্রে। অবশ্যই এই ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হয় ভি. পি. মেননের মত আমলার অসামান্য কাজকে। প্যাটেলের সহযোগী সেনাপতি হিসেবে তাঁর এই কাজের নিজস্ব এক স্বাদু ইতিহাসও তিনি লিখেছেন।

স্বাধীন ভারতের সামনে দেশভাগ প্রথম বড় সমস্যা হিসেবে আসে। তারপরেই আসে রাজন্য শাসিত অঞ্চলগুলিকে ভারতের মানচিত্রে যুক্ত করার বিষয়টি। বস্তুতপক্ষে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রক্রিয়াটি সহজভাবে সমাধানসূত্র খুঁজে পেলেও কয়েকটি ক্ষেত্রে দেখা দিয়েছিল বিশেষ জটিলতা। এর মধ্যে হায়দ্রাবাদের প্রসঙ্গটি কয়েক বছরের মধ্য একটি সমাধান বিন্দুতে পৌছয়, কিন্তু পরবর্তী ষাট সত্তর বছর বা আগামী ভবিষ্যতের জন্যও যে সমস্যাটি রয়ে গেল তা হল কাশ্মীরের ভারতভুক্তির অধ্যায়টি। কাশ্মীর বিভিন্ন দশকে সমস্যা ও সম্ভাবনার নতুন নতুন চেহারায় সামনে এসেছে এবং তার বিভিন্ন পরতকে রামচন্দ্র গুহ বারবার তার এই ইতিহাস গ্রন্থে সামনে এনেছেন।

আধুনিক ভারতের ভেতর থেকে যে সমস্ত বিষয়ে বড় ধরণের বিদ্রোহ উঠেছে, তা নতুন ‘নেশন-স্টেট’টিকে মাঝে মাঝেই বড় ধরণের চ্যালেঞ্জের সামনে ফেলেছে। বস্তুতপক্ষে এটা বোঝাই যায় রামচন্দ্র গুহ’র এই ইতিহাসটি নেশন স্টেটের দৃষ্টিকোণ থেকেই লেখা, যদিও তার সীমাবদ্ধতাগুলি মনে রেখে, তার সম্পর্কে সমালোচনাগুলি উল্লেখ করে। ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এই পর্বের এই ভূমিখণ্ডের ইতিহাস লেখা অবশ্যই সম্ভব, বিশেষত জন অধিকার বা কৃষক, শ্রমিক, আদিবাসী জনগণের অধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে।

নেশন স্টেটের সামনে আসা এই চ্যালেঞ্জগুলোর অন্যতম ছিল ভাষার প্রশ্ন এবং রাজ্য বিন্যাসের প্রশ্ন। দক্ষিণের রাজ্যগুলি থেকে মূলত হিন্দির আধিপত্যকে কেন্দ্র করে জোরালো প্রতিবাদ এসেছিল। মহারাষ্ট্র ও অসমে এই সূত্রে বিভিন্ন সময়ে বিক্ষোভ হয়েছে। জমি, জীবিকার প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই তাতে জড়িয়ে থেকেছে, কখনো প্রকাশ্যে, কখনো আড়ালে। ভাষা বা জাতিসত্তাকে কেন্দ্র করে বড় বড় বিদ্রোহ হয়েছে এবং ভারতের রাজ্য বিন্যাস তথা মানচিত্রকে এর মধ্য দিয়ে বদল করতে হয়েছে।

ভারতের উত্তর-পূর্বে প্রথমে নাগা ও পরে মিজোদের ও অন্যান্য জাতিসত্তার সশস্ত্র বিদ্রোহ সত্তর দশক পর্যন্ত নিয়মিতভাবে চলেছে। আশির দশকে শান্তিচুক্তিগুলি করা হলেও কোনও কোনও গোষ্ঠী বিক্ষুব্ধ কার্যকলাপ চালিয়ে গেছে। কখনো দেশের মধ্যে থেকে, কখনো বাইরে থেকে। অন্যদিকে পশ্চিমে পাঞ্জাবে খালিস্থানি আন্দোলনের মধ্যে শিখদের ধর্মীয় ও জাতিসত্তাগত অনুভূতি সক্রিয় থেকেছে। ভারতের বাইরের জাতিসত্তার আন্দোলনও আমাদের দেশের রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে, অন্তত দেশের কোনও কোনও অংশকে। যেমন শ্রীলঙ্কার উত্তরের অধিবাসীদের তামিল জাতিসত্তার আন্দোলন। তামিলনাড়ু ছুঁয়ে জাতীয় রাজনীতিতেও তার প্রভাব প্রবল।

দেশের মধ্যে আর. এস. এস., বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও তার রাজনৈতিক মুখ জনসঙ্ঘের উত্তরাধিকারী বিজেপির মন্দির আন্দোলন ও আগ্রাসী হিন্দু জাতীয়তাবাদ ক্রমশই বিস্তৃত হয়েছে এবং তা গত শতাব্দীর শেষ দু’ দশকে ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উত্তর ও পশ্চিম ভারত পেরিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে ক্ষমতাসীন হয়েছে। এই সময়েই আবার সামনে এসেছে দলিত ও নিম্নবর্ণের বিভিন্ন জাতিগুলির আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম। কমণ্ডলু রাজনীতির পাশাপাশি মণ্ডল রাজনীতি দেশের চেহারা চরিত্রকে বদলে দিয়েছে।

স্বাধীনতার পর প্রথম তিন দশক কেন্দ্রে এবং বিভিন্ন রাজ্যে কংগ্রেসের শাসন প্রায় নিরঙ্কুশ ছিল। কোথাও কমিউনিস্টরা, কোথাও ভাষাভিত্তিক জাতিসত্তার আন্দোলনকারীরা শক্তিশালী হচ্ছিলেন, কিন্তু জাতীয় স্তরে কংগ্রেসের কর্তৃত্ব অমলিন ছিল। ইন্দিরা গান্ধীর প্রধানমন্ত্রীত্বের সময় কংগ্রেস দলের মধ্যে প্রথমে বিভাজন হয় এবং তারপর ইন্দিরা কংগ্রেস জমানার স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া আন্দোলন কেন্দ্রে প্রথম অকংগ্রেসী সরকারকে ক্ষমতায় নিয়ে আসে। ১৯৮৯ সাল থেকে শুরু হয় একক পার্টির পরিবর্তে জোটবদ্ধ শাসনের কাল। মূলত কংগ্রেস বা বিজেপির নেতৃত্বে বিভিন্ন রাজ্যের প্রভাবশালী দলগুলি একত্রিত হয়ে কেন্দ্রীয় সরকার চালাতে থাকে। একক শক্তির ক্ষমতার বদলে আঞ্চলিক শক্তিসমূহের জোট এর শাসন কেন্দ্র রাজ্য সম্পর্কে এবং রাজ্যগুলির পারস্পরিক সম্পর্কে এক মৌলিক বদল আনে।

১৯৯১ সাল থেকেই শুরু হয়ে যায় আর্থিক উদারনীতির পালা। বর্ণ নিরপেক্ষ কেন্দ্রীয় সরকারগুলি শুধু নয়, রাজ্যে ক্ষমতাসীন আঞ্চলিক সরকারগুলিও এই নীতিমালা মেনে নেয়, এমনকি কমিউনিস্ট দল শাসিত সরকারগুলিও।

বিদেশ নীতির ক্ষেত্রেও আসে চোখে পড়ার মত পরিবর্তন। নেহরু আমলের জোট নিরপেক্ষ নীতির সময় থেকে ইন্দিরার সোভিয়েত ঘনিষ্ঠতার পর্ব পেরিয়ে সে ক্রমশ মার্কিন ঘনিষ্ঠ বৃত্তে ঢুকে পড়ে। এই পর্বের অর্থনীতি ও তারই সূত্রে সমাজ-মানসের বদলে যাওয়ার বেশ কিছু ছবি রামচন্দ্র গুহ হাজির করেছেন, যেখানে রয়েছে আশ্চর্য বৈপরীত্য। ব্যাঙ্গালোর বা হায়দ্রাবাদ এর মত নয়া অর্থনীতি ও প্রযুক্তির সুফলপ্রাপ্ত দ্রুত বিকশিত ও সমৃদ্ধ শহরের পাশাপাশি উড়িষ্যা বা ছত্তিশগড়ের অনেক অঞ্চলের কথা জানা যায়, যেখানে অনাহার, মৃত্যু প্রতিদিনের বাস্তব। আশেপাশের দেশের বিপ্রতীপে গণতান্ত্রিক কাঠামোটা বজায় রেখে যাওয়াটা নিঃসন্দেহে ভারতের সাফল্য, বিশেষ করে ভাষা, ধর্ম, জাতপাত, সংস্কৃতি ও আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য ইত্যাদির পার্থক্যের পরেও। কিন্তু এর দারিদ্র, অসাম্য, অপুষ্টি আর সময়ে সময়ে বিদ্রোহ দমনে রাষ্ট্রযন্ত্রের বাড়াবাড়ি রকম নির্মমতাগুলি গণতন্ত্রের মধ্যেকার ক্ষতস্থানকে দেখিয়ে দেয়।

সব মিলিয়ে রামচন্দ্র গুহ’র এই বইটি এখনো পর্যন্ত ১৯৪৭ পরবর্তী ভারতের সবচেয়ে বিস্তৃত ও মনোজ্ঞ ইতিহাস। আশা করা যায় ৪৭’-এর পরে ইতিহাসের সমাপ্তি আর সমাজতত্ত্ব ও রাজনীতিতত্ত্বর শুরু – এই প্রচলিত ধারণাকে বদলাতে বইটি সাহায্য করবে।

মন্তব্য তালিকা - “স্বাধীনতার পরে ভারত: রামচন্দ্র গুহ’র চোখে”

  1. ইতিহাস তথ্য ও তর্ক পোর্টালটি খুবই কাজের । অধ্যাপক ,গবেষক , ছাত্র -ছাত্রী এবং সকল ইতিহাস অনুরাগীদের ঋদ্ধ করবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।