সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

ভীমবেটকায় প্রাগৈতিহাসিক মানুষের চিত্র বৃত্তান্ত

ভীমবেটকায় প্রাগৈতিহাসিক মানুষের চিত্র বৃত্তান্ত

মধুশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়

ডিসেম্বর ৬, ২০২৫ ২১৬ 2

প্রাক কথা

মধ্যপ্রদেশের পশ্চিম অংশে আছে মালওয়া মালভূমি—মালওয়া মালভূমি প্রায় ৬ কোটি বছর আগে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে তৈরি হয়েছিল। কালো মাটির দেশ। সেখানে গিয়েছিলাম ভীমবেটকার গুহাশিল্প দেখতে।

ভীমবেটকা গুহাগুলিতে ভারতবর্ষের প্রাগৈতিহাসিক মানুষের অন্যতম প্রাচীন গুহাশিল্প পাওয়া গেছে। চারিদিকে ঘন বন। তার মাঝে পাহাড়, সেখানে আছে প্রাচীন মানুষের প্রাকৃতিক শিলাশ্রয়স্থল (রক শেল্টার)। শিলাশ্রয়স্থল হল প্রাকৃতিক, অগভীর গুহার মতো খোলা জায়গা। এই আশ্রয়স্থলগুলি প্রাগৈতিহাসিক মানুষের জন্য ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ — এখানে তারা পেত হিংস্র পশু আর রুক্ষ আবহাওয়া থেকে সুরক্ষা। আবার পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে শিলাশ্রয়স্থলগুলি থেকে পাওয়া গেছে মানুষের কঙ্কাল, প্রাগৈতিহাসিক চিত্রকলা যা তাদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে আমাদের বেশ কিছু তথ্য দেয়। ভীমবেটকাতে প্রাকৃতিক শিলাশ্রয়গুলির পাঁচটি আলাদা স্তবক (ক্লাস্টার) রয়েছে।

জঙ্গলের কোর এরিয়াতে অবস্থিত আজকের ভীমবেটকার পরিবেশ দেখেও মনে হয় প্রাগৈতিহাসিক কালে চলে গেছি। প্রকৃতির মধ্যে সেই প্রাচীন আশ্রয়স্থলগুলিতে আছে হরেক রকমের ছবি। সেই ছবি তারা সাজিয়ে তুলেছিল রং দিয়ে। সেখানে আছে শিকারের গল্প, নৃত্যরত মানুষ আর অজস্র পশু। মানুষ সঙ্গে মিশে ছিল পশু ও প্রকৃতি।

ভীমবেটকা বর্তমানে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট৷

সময়ের সাক্ষ্য

প্রথমে আলোচনা করা যাক এর সময়কাল নিয়ে।

ভীমবেটকা থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে মধ্যপ্রদেশে নর্মদা নদীর তীরে ‘হাথনোরা’তে এক বিলুপ্ত মানবের কিছু জীবাশ্মের টুকরো পাওয়া গেছে। এখানে একটি খুলি পাওয়া গেছে, সম্ভবত সেটি ‘হোমো ইরেক্টাস’-এর। একে ‘নর্মদা ম্যান’ বলা হয়, ‘নর্মদা ম্যান’-এর সময়কাল ছিল ৩-১.৫ লক্ষ বছর আগে। অঞ্চলটিতে ‘হোমো সেপিয়েন্স’-এর আগে ‘হোমো ইরেক্টাস’-রা থাকত। ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের অনুমান নর্মদার তীরে ভীমবেটকা অঞ্চলে বিভিন্ন হোমো গণের মানব অন্তত ১ লক্ষ বছর আগে থেকে আছে।

কিছু শিলাশ্রয়স্থল কেন্দ্রে প্রাগৈতিহাসিক গুহাচিত্র রয়েছে এবং প্রাচীনতমটি অন্ততপক্ষে ১২ হাজার বছরের পুরানো, অর্থাৎ ভারতীয় মেসোলিথিক যুগে। ভারতে মেসোলিথিক যুগ ছিল ‘পুরা প্রস্তর যুগ’ (প্যালিওলিথিক) এবং ‘নব্যপ্রস্তর যুগ’-এর (নিওলিথিক) মধ্যে একটি ক্রান্তিকাল, যা প্রায় ১১-৫ হাজার বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল।

অবশ্য ১৯৯৬ সালে রবার্ট জি বেডনারিক লিখেছিলেন, এখানকার অডিটোরিয়াম গুহায় ৭-২.৯ লক্ষ বছর আগের ‘ভীমবেটকা পেট্রোগ্লিফস’ পাওয়া গেছে—সেরকম কিছু দেখতে পেলাম না, গাইডও এই বিষয়ে কিছু জানেন না। এখানকার ছবিগুলি মূলত ‘মেসোলিথিক যুগ’-এ তৈরি। আমরা ‘মেসোলিথিক যুগ’ থেকে শুরু করে ঐতিহাসিক কাল পর্যন্ত আঁকা ছবি দেখেছি।

‘মেসোলিথিক যুগ’-এ মানুষ কৃষিকাজ শেখেনি, পশুপালন জানত না — পেশা ছিল শিকার ও সংগ্রহ করা। দু’য়ের জন্যই তারা জঙ্গলের উপরে নির্ভরশীল ছিল। তবে সময়টা দীর্ঘ — পরবর্তী ‘নব্যপ্রস্তর যুগ’ এবং ঐতিহাসিক যুগের প্রচুর ছবি এখানে আছে। তখন কৃষিকাজ হত, পশুপালন করা হত।

ভীমবেটকা গুহাশিল্প কিন্তু ভারতবর্ষ স্বাধীন হবার পরে আবিষ্কৃত হয়েছে, এই বিষয়ে কৃতিত্ব দিতে হয় মরাঠি ইতিহাসের অধ্যাপক বিষ্ণু শ্রীধর ওয়াকনকার-কে। ১৯৫৭ সাল থেকে প্রাথমিকভাবে নিজের প্রচেষ্টায় তিনি কিছু গুহা খুঁজে পেয়েছিলেন। তারপরে অবশ্য দায়িত্ব নেয় ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ (Archaeological Survey of India)।

রং রসায়ন

প্রত্নতাত্ত্বিকরা ভীমবেটকা গুহার শিল্প নিয়ে বিশেষ চর্চা করেছেন, তবে এই ছবি গুলিতে রং এবং রঞ্জক ব্যবহার বিষয়ে পদ্ধতিগত বৈজ্ঞানিক গবেষণার অভাব রয়েছে।

আঁকা চিত্রগুলি একরঙা, বেশিরভাগই লাল এবং সাদা, কখনো কখনো বিভিন্ন রঙের সংমিশ্রণে করা হয়েছে (চিত্র ১)। প্রস্তর যুগের ভারতীয় শিল্পীরা তাদের চিত্রে প্রধানত দুটি রঙের ব্যবহার করেছেন—প্রাকৃতিক কালো (চারকোল বা ‘ম্যাঙ্গানিজ অক্সাইড’) এবং প্রাকৃতিক লাল (‘হেমাটাইট’ বা লাল গিরিমাটি)। মধ্যপ্রদেশের গোয়ালিয়র, কাটনি এবং রেওয়া জেলাতে লাল গিরিমাটির ঢিপি পাওয়া গেছে। এছাড়াও পাশাপাশি অঞ্চলগুলির মধ্যে রাজস্থান, অন্ধ্রপ্রদেশ; গুজরাট, কর্ণাটক এবং মহারাষ্ট্রে লাল গিরিমাটির ঢিপি পাওয়া গেছে। লাল গিরিমাটি প্রস্তুত করার জন্য, উপকরণগুলিকে সূক্ষ্মভাবে গুঁড়ো করে জলের সঙ্গে মেশানো হত। মোটা দানা থিতিয়ে পড়লে পাতলা তরলের মধ্যে উদ্ভিদের রস বা পশুর চর্বি ‘বাইন্ডার’ হিসেবে মেশান হত।

চিত্র-১

ভীমবেটকায় কিছু রেখা চিত্র দেখা যায়। তার রং সবুজ বা গাঢ় লাল। এই প্রাচীন শিল্পে বাইসন, হাতি, বাঘ, গণ্ডার এবং শুয়োরের মতো বড়ো প্রাণীর মূর্তি, লাঠির মতো মানুষের মূর্তিগুলির পাশাপাশি আঁকা হয়েছে।

এম. সিং ভীমবেটকার রঞ্জকগুলি পরীক্ষা করে বলেছেন, এখানে ক্যালসাইট, জিপসাম, হেমাটাইট (লাল গিরিমাটি) এবং ‘গোয়েথাইট’ ব্যবহার করা হয়েছে। ‘গোয়েথাইট’ হল একটি লৌহ খনিজ যৌগ।

চিত্র নিয়ে কিছু আলোচনা

ভীমবেটকা এলাকায় কোনো খোদাই চিত্র চোখে পড়েনি। সবই রঙের চিত্র। সেগুলো তিনটি ভিন্ন কৌশলে আঁকা হয়েছে —

১) বেশ অনেকটা জল দিয়ে স্বচ্ছ রঞ্জক মিশিয়ে মিশ্রণটিকে সরাসরি প্রয়োগ করা হয়েছে। একে বলে স্বচ্ছ রং তৈরির পদ্ধতি,

২) অস্বচ্ছ কৌশল অনুযায়ী জলে বিভিন্ন অস্বচ্ছ রঞ্জক ব্যবহার করা হয়েছে,

৩) দেওয়ালে সরাসরি রঞ্জক দিয়ে আঁকা হয়েছে। একে বলে ক্রেয়ন কৌশল।

প্রথম দিকে স্বচ্ছ কৌশল অনুযায়ী রং করা হয়েছে। সবুজ চিত্রগুলি দ্বিতীয় প্রযুক্তির অন্তর্গত।

এখানে মোট পাওয়া গেছে পুরুষদের ২০৭৬টি, নারীদের ৭১টি চিত্র; বালক ২৪; বালিকা মাত্র ২ এবং শিশু ৬। নারীদের চিত্র চোখে পড়ার মতো কম। মানুষের তুলনায় প্রাণীর ছবি পাওয়া গেছে কম — সব মিলিয়ে ১৩৭৭ প্রাণী। ৩টি সিংহ, ১৫টি বাঘ, ২৫টি প্যান্থার, শুধুমাত্র ১টি চিতা৷ আছে ১টি গণ্ডার, ৮৮টি বন্য মহিষ, ২টি ষাঁড়, ৬৬টি গরু সহ ৫টি বাছুর, ২টি বাইসন, ৬টি নীলগাই, ২৯টি চিঙ্করা, ১টি কালো হরিণ, ২৮টি সম্বর এবং ১৭টি বারসিঙ্গা হরিণ, ১১৩টি চিতল হরিণ, ৩টি বার্কিং ডিয়ার, ১৭টি ছাগল, ১টি স্লথ ভালুক, ২৩টি বুনো শুয়োর, ১টি হায়েনা, ১টি নেকড়ে, ২১টি কুকুর, ৩২টি ল্যাঙ্গুর (কালো মুখের বানর), ১টি বানর। হাতির ৬১টি ছবির মধ্যে ৩৬টি তাদের মাহুত সহ (বোঝাই যাচ্ছে পরবর্তী সময়ের)—আসলে শুধুমাত্র ১১টি প্রাগৈতিহাসিক হাতি — বাকিগুলো ঐতিহাসিক কালের। ঘোড়ার ৫৬১টি ছবি পাওয়া গেছে, স্বভাবতই এইগুলো সব ঐতিহাসিক সময়ের অন্তর্গত। পাখির ছবি আছে মোট ২৪টি।

ভীমবেটকা শিলাশিল্পে অসংখ্য রঙিন চিত্র চোখে পড়েছে। তার মধ্যে শিকার, লড়াই, নাচ (চিত্র-২) এবং পারিবারিক জীবনের ছবি আছে । আছে ঘোড়সওয়ার ও মাহুত সহ হাতি (চিত্র-৩)। সম্ভবত শিকার ও যুদ্ধের ছবি প্রতুল থাকায় নারী চিত্র এত কম। আবার ঐতিহাসিক যুগের বেশ কিছু ছবি থাকার ফলে হয়তো নারী ছবি কম আঁকা হয়েছে।

কিছু বড়ো চিত্র আলেখ্যে কয়েকটি ছবি পরপর আছে, কিছুতে আছে কয়েক শত বাস্তব, জ্যামিতিক বা আলংকারিক ছবি। এগুলোর মাপ পাঁচ সেন্টিমিটার থেকে প্রায় পাঁচ মিটার পর্যন্ত। শৈলী অনুসারে চিত্রগুলি একটির সঙ্গে আরেকটি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত — এগুলো মূলত আঞ্চলিক মধ্য ভারতীয় ‘রক পেইন্টিং শৈলী’। শোনা গেল, এই অঙ্কন শিল্পের সঙ্গে জঙ্গলের বাফার এরিয়াতে আজকে যে জনজাতি সম্প্রদায় থাকেন তাঁদের আঁকার মিল আছে।

চিত্র-২

চিত্র-৩

মূল গুহা বর্ণনা

জনসাধারণের জন্য খোলা ১৫টি শিলা আশ্রয়ের মধ্যে, অডিটোরিয়াম গুহা বা ‘গুহা ৩’ হল বৃহত্তম (চিত্র ৪)। অডিটোরিয়াম গুহা প্রায় ২৫ মিটার দীর্ঘ, এটি যেন একটি উঁচু ছাদ সহ বিরাট এক টানেল—এটির দুই মুখই খোলা। মূল প্রবেশপথ পূর্ব দিকে। প্রবেশদ্বারের কাছে একটি পাথরের চাঁই (বোল্ডার) রয়েছে যা একটু আলাদা হয়ে রয়েছে। পাথরটিকে ‘চিফ’স রক’ বা ‘কিং’স রক’ নামে অভিহিত করা হয়েছে, কেন এই নামকরণ হয়েছে তা অবশ্য বুঝতে পারলাম না।

চিত্র-৪

ভীমবেটকা শিলা আশ্রয়কেন্দ্রের মধ্যে সবচেয়ে ঘনভাবে আঁকা গুহাটিকে বলে ‘জু রক’ — ‘চিড়িয়াখানা গুহা’ (চিত্র-৫)। খেয়াল রাখতে হবে প্রাগৈতিহাসিক চিত্রের বিভিন্ন স্তর রয়েছে, অনেক সময়ে একটা স্তরের উপরে আরেকটি স্তরের প্রাণীদের আঁকা হয়েছে। এই গুহাটি শত শত গুহা চিত্রের মধ্যে অন্যতম প্রধান। ‘চিড়িয়াখানা গুহা’য় মানুষ, পাখি, পশু এবং কিছু অসম্পূর্ণ ছবি সহ মোট ২৫০টি স্বতন্ত্র প্রজাতির প্রাণীকে আঁকা হয়েছে। গবেষকরা বলছেন, এই চিত্রগুলির মধ্যে কয়েকটি প্রাণীর গর্ভধারণ চক্রের ছবি আছে। অবশ্য রশির বাইরে দাঁড়িয়ে সেসব বোঝা সম্ভব নয়। বোঝা যায়, কিছু ছবি  প্রাণী শিকারের ঠিক আগের মুহূর্তকে বোঝাতে চেষ্টা করেছে।

চিত্র

দেখলাম হাতি, বড়সিঙ্গা, বাইসন এবং হরিণ। ধনুক, তির, তলোয়ার এবং ঢাল বহনকারী শিকারীদের সঙ্গে শিকারের দৃশ্যগুলি সময়ের স্থির চিত্র। একটি গুহাতে, একটি বাইসনকে শিকারির পিছনে ছুটতে দেখলাম, তার দুই সঙ্গী কাছাকাছি অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। যেন মৃত্যুর আগের মুহূর্তে মানুষের চিরকালীন অসহায়তা মূর্ত হয়ে রয়েছে।

ভীমবেটকা বোর রক-এর নাম বিশাল শুয়োরের মতো প্রাণীর চিত্র থেকে এসেছে (চিত্র-৬)। চিত্রিত শুয়োরটির মাথা বড়ো, শিঙের পিছনের লোম খাড়া খাড়া হয়ে আছে। শুয়োরটি একটি মানুষের দিকে তেড়ে যাচ্ছে বলে মনে হল ৷ শুয়োরের আয়তন মানুষের থেকে বহুগুণ বড়ো। কেন এই আয়তনের হেরফের? বুনো শুয়োরের শক্তি বোঝাতে? অথবা এই পশুটি কি পৌরাণিক কোনো কাল্পনিক পশুর ছবি?

চিত্র-৬

কিছু আলোচনা

আগেই বলা হয়েছে এক বিরাট সময়কাল ধরে ভীমবেটকা রক শেল্টার-এ চিত্রগুলো আঁকা হয়েছে। ইউনেস্কো বলেছে — “It displays archaeological evidence of habitation and lithic industry from the Palaeolithic and Mesolithic periods, through the Chalcolithic to the medieval period. …These settlements also still manage to maintain an ecological balance with the surrounding forests, which have been a key resource for the peoples associated with the rock shelters over the past 100,000 years.” (“এটি প্যালিওলিথিক এবং মেসোলিথিক সময়কাল থেকে চ্যালকোলিথিক হয়ে মধ্য যুগ পর্যন্ত বাসস্থান এবং লিথিক শিল্পের প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ। ….(জঙ্গলের বাফার অঞ্চলের) এই বসতিগুলি এখনও আশেপাশের বনগুলির সঙ্গে একটি পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রেখেছে, যা গত ১ লক্ষ বছর ধরে শিলা আশ্রয়ের সঙ্গে যুক্ত জনগণের জন্য একটি মূল্যবান সম্পদ।”)

“The nomination says that ‘the site complex is a magnificent repository of rock paintings within natural rock shelters.” (“ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের মনোনয়নে বলা হয়েছে যে ‘সাইট কমপ্লেক্সটি প্রাকৃতিক শিলা আশ্রয়কেন্দ্রের মধ্যে রক পেইন্টিং-এর একটি দুর্দান্ত ভাণ্ডার’।”)

“No detailed inventory is provided of the painted rock shelters, (although the nomination states that 133 painted shelters have been documented) nor an analysis of the scope or contents of the paintings – so only the following generalities can be given.”

এখানে বলা হয়েছে, ১ লক্ষ বছর আগে থেকে ১ হাজার সাধারণাব্দ পর্যন্ত রক শেল্টার-এ মানুষ বসবাস করেছে। এতটা বিস্তারিত ভাবে আমি ইউনেস্কো রিপোর্ট থেকে তুলে দিলাম, কারণ গুহাগুলির সামনে যে বিবরণ আছে, তা সাধারণ কিছু বর্ণনা মাত্র। চিত্রের সময়কাল বা বিশেষত্ব সুনির্দিষ্টভাবে গুহার সামনের প্লেট-এ বলা হয়নি। অধিকাংশ চিত্রই ঐতিহাসিক সময়কালের।

প্রশ্ন উঠেছে যে ঘোড়াগুলি আঁকা হয়েছে, সেগুলি কোন সময়ের? আমি এবার পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের ইউনেস্কো-কে দেওয়া নথি থেকে তুলে দিলাম – “Pictorial narratives of events such as large processions of men on caparisoned horses and elephants, battle scenes depicting spears, bows, arrows, shields and swords highlight the Historical period. Inscriptions painted in white and red, and engraved on the rock surface in Sunga Brahmi (second century BC), post-Gupta Brahmi and Sankha Lipi (first century BC – seventh century AD) and later paintings, also bear testimony to the use of the shelters in the Historical and Mediaeval periods.” (“ঘটনার সচিত্র বর্ণনা যেমন বড়ো ঘোড়া এবং হাতি চড়ে পুরুষদের মিছিল, চিত্রিত যুদ্ধের দৃশ্য — বর্শা, ধনুক, তির, ঢাল এবং তলোয়ার ঐতিহাসিক সময়কে তুলে ধরে। সাদা, লাল রং দিয়ে আঁকা শুঙ্গ ব্রাহ্মী (দ্বিতীয় সাধারণ পূর্বাব্দ) শিলালিপি পাথরের পিঠে খোদাই করা হয়েছে। গুপ্ত-পরবর্তী ব্রাহ্মী ও শঙ্খ লিপি (প্রথম সাধারণ পূর্বাব্দ-সপ্তম সাধারণাব্দ) এবং পরবর্তী চিত্রকর্ম, ঐতিহাসিক এবং মধ্যযুগীয় সময়ে শিলা আশ্রয় ব্যবহারের সাক্ষ্য বহন করে।”)

দ্বিতীয় একটি বিষয় চোখে লেগেছে। পরিক্রমা শুরু হবার সময়ে মানব বিবর্তন বিষয়ক যে প্লেটটি পুরাতত্ত্ব বিভাগের থেকে লাগানো হয়েছে তা অন্তত ২০ বছর আগের হবে, তারও আগের হতে পারে। সেগুলিতে দেওয়া তথ্য আজকে প্রাসঙ্গিক নয়। বলা যায় ভুল তথ্য। গাইডরা সেগুলোই আওড়াচ্ছেন, যদিও তাঁদের দোষ দিই না। পুরাতত্ত্ব বিভাগের হয়তো আরেকটু যত্ন নেওয়া দরকার।

আরেকটি বিষয় উল্লেখ না করে পারছি না। বিভিন্ন গাছের শিকড় কিছু গুহাকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলেছে যে কোনো সময়ে গুহার ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। অবশ্য পুরো প্রত্নস্থলটি পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন। একটি প্লাস্টিকের বোতল কোথাও চোখে পড়েনি। এইজন্য অবশ্যই ধন্যবাদ প্রাপ্য প্রত্নস্থলটির তত্ত্বাবধায়কের। ভীমবেটকা রক শেল্টার-এ বিদেশীদের আসতে দেখলাম না। গাইড বললেন, এখানে বিদেশি আসেন, তবে তা মধ্য প্রদেশের অন্য ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ স্থানের তুলনায় অনেক কম।

শেষে একটা মজার কথা বলি। একটি গুহাতে মেসোলিথিক কালের এক বাচ্চার হাতের ছাপ পাওয়া গেছে। বোর্ডে লেখা আছে সেই হাতের ছাপের সঙ্গে দর্শকদের হাত মেলাতে। আমার হাতের পাঞ্জা ১০ হাজার বছর আগের বাচ্চার ছাপের সমান। তবে প্রশ্ন আছে। ওই হাতের পাঞ্জা বাচ্চার — এ কথা মনে করবার কারণ কী! আমার মতো এক নারীরও তো হতে পারে। সারা পৃথিবীতেই সব হাতের ছাপকে কিশোরদের বলে একেবারে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমার এই বিষয়ে গভীর সন্দেহ আছে।

প্রাগৈতিহাসিক চিত্রগুলি গুহা সাজানোর জন্য বা বিনোদন খোঁজার জন্য আঁকা হয়েছিল এমন মনে হয় না। তারা অতিপ্রাকৃত সত্তার প্রতি ভক্তি দেখাতে সম্ভবত ছবিগুলো এঁকেছিল। এখানে কিছু চিত্রের মানুষকে শামান হিসেবে অনেকে চিহ্নিত করেছেন।

ইউনেস্কো বলছে, এখানকার রক শেল্টারে পাওয়া পেইন্টিংগুলির সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার কাকাডু ন্যাশনাল পার্কে আবিষ্কৃত চিত্রগুলির প্রচুর সাদৃশ্য রয়েছে। শুধু তাই নয় কালাহারি মরুভূমিতে বুশমেনের গুহা চিত্র এবং ফ্রান্সের প্রস্তর যুগের লাসো (lascaux) গুহা চিত্রগুলির সঙ্গেও মিল আছে।

কাকাডুর চিত্রগুলি মূলত লাল গিরিমাটি দিয়ে আঁকা। এই ছবিগুলির অন্তর্নিহিত কিছু অর্থ অস্ট্রেলিয়ার আজকের আদিবাসীদের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেছে। বাইরের হস্তক্ষেপ ছাড়া জনজাতি অস্ট্রেলীয়দের ৬০ হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ইতিহাস যেকোনো মানবগোষ্ঠীর মধ্যে অন্যতম দীর্ঘ এবং একনাগাড়ে তা চলেছে। সাধারণভাবে মানুষের শিল্প এবং বিশেষভাবে লাল গিরিমাটির ব্যবহারের ইতিহাস জানতে তাদের প্রথার খোঁজ করা দরকার। তাঁরা বিশ্বাস করেন, লাল গিরিমাটির আকরগুলো পৃথিবীর রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থার শিরা। ভীমবেটকাতে এরকম কোনো বিশ্বাস ছিল কিনা তা জানতে আরও কিছু কাল অপেক্ষা করতে হবে।

চিত্র পরিচিতি

চিত্র ১ – নিচের অংশের সাদা রং তৈরি করা হয়েছিল চুনাপাথরকে উদ্ভিজ্জ তেলের সঙ্গে পিষে।

চিত্র ২ – হাতে হাত ধরে প্রাগৈতিহাসিক মানুষ নাচছে।

চিত্র ৩ – ঘোড়সওয়ার ও মাহুত সহ হাতি।

চিত্র ৪ – অডিটোরিয়াম গুহা।

চিত্র ৫ – চিড়িয়াখানা গুহা।

চিত্র ৬ – বোর রক।

তথ্যসূত্র

১. Robert G. Bednarik, The Cupules on Chief’s Rock, Auditorium Cave, Bhimbetka, The Artefact, 19, 63-72 (1996).

২. A.R. Sankhyan, Hominin Fossil Remains from the Narmada Valley, Chapter 6, Gwen Robbins Schug and Subhash R. Walimben (Editors), A Companion to South Asia in the Pas, John Wiley & Sons, Inc, First Edition (2016).

৩. Rock Shelters of Bhimbetka, Continuity through Antiquity, Art & Environment, World Heritage Scanned Nomination Archaeological Survey of India (2003).

৪. Rock Shelters of Bhimbetka (PDF). UNESCO (2003), p. 16.

৫. Anjali Sharma et al., A Review on Historical Earth Pigments Used in India’s Wall Paintings. Heritage 4(3), 1970-1994 (2021).

৬. The Bhimbetka Cave Paintings from Prehistoric India. Brewminate: A Bold Blend of News and Ideas, (2022).

৭. A Sharma, et al. A Review on Historical Earth Pigments Used in India’s Wall Paintings. Heritage 4, 1970-1994 (2021).

৮. Meenakshi Dubey-Pathak, The Rock Art of the Bhimbetka Area in India, Adoranten (2014).

৯. Rock Shelters of Bhimbetka, Continuity through Antiquity, Art & Environment, World Heritage Scanned Nomination Archaeological Survey of India, (2003).

১০. Nataliia Mykhailova, et al, Horned Hunter – Shaman, Ancestor, Deity, (2018).

১১. Susi and Ruedi on tour, The Ochre Pits, (2008).

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিক্যাল ইঞ্জিনীয়ারিং বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক। বিজ্ঞান ও ইতিহাস বিষয়ক লেখক।

মন্তব্য তালিকা - “ভীমবেটকায় প্রাগৈতিহাসিক মানুষের চিত্র বৃত্তান্ত”

  1. মন্ত্রমু‌গ্ধের মত প‌ড়ে ফেললাম। মুগ্ধ। প্রাচীন মানুষ, সমাজ ও সভ‌্যতার এমন চমৎকানমর খোঁজ ভীষণভা‌বে আকৃষ্ট ক‌রে‌ছে। লেখক‌কে অ‌ভিবাদন।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।