সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

লেখক: মধুশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়

মধুশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিক্যাল ইঞ্জিনীয়ারিং বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক, তাঁর গ্রন্থ 'প্রাগিতিহাস-ভারতবর্ষে পরিযান ও জাতিগোষ্ঠী গঠন' মুজাফ্ফর আহমদ স্মৃতি পুরস্কার পেয়েছে। দ্বিতীয় গ্রন্থ 'ধর্ম সংস্কৃতি ও রাজনীতি-ছিন্ন চিন্তার ককটেল'। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তৃতীয় গ্রন্থ, 'প্রাগিতিহাসের আগে-প্রাণের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস'।
আরও দুই সহকর্মীর সঙ্গে একত্রিতভাবে সম্পাদনা করেছেন, ইতিহাস তথ্য ও তর্কর উদ্যোগে প্রকাশিত গ্রন্থ 'বঙ্গ ইতিহাস প্রবাহ'।
মধ্যপ্রদেশের পশ্চিম অংশে আছে মালওয়া মালভূমি—মালওয়া মালভূমি প্রায় ৬ কোটি বছর আগে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে তৈরি হয়েছিল। কালো মাটির দেশ। সেখানে গিয়েছিলাম ভীমবেটকার গুহাশিল্প দেখতে। ভীমবেটকা গুহাগুলিতে ভারতবর্ষের প্রাগৈতিহাসিক মানুষের অন্যতম প্রাচীন গুহাশিল্প পাওয়া গেছে। চারিদিকে ঘন বন। তার মাঝে পাহাড়, সেখানে আছে প্রাচীন মানুষের প্রাকৃতিক শিলাশ্রয়স্থল (রক শেল্টার)। শিলাশ্রয়স্থল হল প্রাকৃতিক, অগভীর গুহার মতো খোলা জায়গা। এই আশ্রয়স্থলগুলি প্রাগৈতিহাসিক মানুষের জন্য ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ — এখানে তারা পেত হিংস্র পশু আর রুক্ষ আবহাওয়া থেকে সুরক্ষা। আবার পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে শিলাশ্রয়স্থলগুলি থেকে পাওয়া গেছে মানুষের কঙ্কাল, প্রাগৈতিহাসিক চিত্রকলা যা তাদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে আমাদের বেশ কিছু তথ্য দেয়। ভীমবেটকাতে প্রাকৃতিক শিলাশ্রয়গুলির পাঁচটি আলাদা স্তবক (ক্লাস্টার) রয়েছে।
আদি মধ্যযুগের বাঙালি সমাজের নিম্নবর্গের মানুষের প্রাচীন ইতিহাস জানতে প্রাচীন বাংলা ভাষায় রচিত চর্যাপদ এক আকর গ্রন্থ। 'চর্যা' শব্দের অর্থ হল আচরণ— বৌদ্ধ ধর্মের সিদ্ধপুরুষেরা ‘আলো-আঁধারি’ ভাষায় এতে সাধনার জন্য পালনীয় নির্দেশ দিয়েছেন। আজ থেকে হাজার বছর আগে এই অঞ্চলের নিম্ন বর্ণের মানুষ, যারা আবার আর্থ-সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের নিম্ন প্রান্তে অবস্থান করতেন, যাদের নব-নাম সাবল্টার্ন, কেমনভাবে জীবন যাপন করতেন, সমাজ কতটা শ্রেণি বিভক্ত ছিল ইত্যাদি জানতে হলে চর্যাপদ ঘাঁটতে হয়। ১৯০৭ সালে পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপাল রাজদরবারের গ্রন্থাগার থেকে এই পুঁথি উদ্ধার করেন। তাঁরই সম্পাদনায় পুঁথিখানি ‘হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা’ নামে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ কর্তৃক ১৯১৬ সালে প্রকাশিত হয়।
একটা পুরো মহাসাগরের নাম আমাদের দেশের নামে হয়ে গেছে। পৃথিবীতে যুগে যুগে বহু ক্ষমতাধরেরা এসেছেন, সেসব দেশের পাশেও মহাসাগর আছে, কিন্তু তবু অন্য কোনো দেশ এই সৌভাগ্যের অধিকারী হয়নি, তাদের নামে একটা মহাসাগরের নাম হয়নি। ভারতের সঙ্গে এই মহাসাগর, তার নিকটবর্তী অন্যান্য সাগরগুলির সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। অতি প্রাচীন যুগ থেকে, প্রথমে পশ্চিম ও পরে পূর্ব উপকূল ধরে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এই উপমহাদেশের মানুষ সমুদ্রপথে বাণিজ্য করেছে। সেই ইতিহাস আজ হারিয়ে গেছে। ভারতবর্ষের মানুষের সেই গৌরবের কথা, সম্পদের স্মৃতিও আর নেই। তবে সেই ইতিহাস তার প্রতি বিদেশি বণিকের আকর্ষণ গড়ে তুলেছিল। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ইতিহাসে সেই বাণিজ্য ও তার সঙ্গে সাংস্কৃতিক দেনাপাওনার স্মৃতি রয়ে গেছে।