সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

ধর্মের চোরাগলিতে আবদ্ধ ছিল বাংলাদেশের বিপ্লববাদের প্রথম পর্যায়: প্রথম পর্ব

ধর্মের চোরাগলিতে আবদ্ধ ছিল বাংলাদেশের বিপ্লববাদের প্রথম পর্যায়: প্রথম পর্ব

শিবাশীষ বসু

মার্চ ১৯, ২০২২ ৩০২

(এক)

ঊনবিংশ শতকের শেষ দশকে মহারাষ্ট্রে বালগঙ্গাধর তিলকের উদ্যোগে এক নব্য হিন্দু জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সূত্রপাত হয়, সার্বজনীন গণপতি উৎসব প্রচলনের ভিতর দিয়ে। দশদিন ধরে চলা এই উৎসবে তিলক মারাঠা জাতির অতীত গৌরবময় দিনগুলি স্মরণ করা এবং শিবাজী মহারাজের বিভিন্ন কীর্তিকলাপ, ধর্মপ্রীতি ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনাচক্রের ব্যবস্থা করতেন। তিলকের রাজনৈতিক চরিতকার স্ট্যানলি ওলপার্ট মন্তব্য করেছেন, “Ironically enough Tilak predicted that the Ganapati festival ‘will more or less aid in Society’s currant tendency to function more harmoniously.’ By ‘society’ he meant Hindu society alone. In sponsoring the Ganapati festival he was in fact furthering his ambition of providing an institutional framework to which to channe regularly the mass of orthodox opinion heretofore awakened only intermittently.” প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, এই সময়ে (১৮৯৩) তিলক ‘গোরক্ষণী সভা’ আন্দোলন অর্থাৎ গোরক্ষা সম্বন্ধে হিন্দুদের ধর্মীয় সংস্কারকে জাগিয়ে তুলে তাদের মধ্যে জাতীয় ঐক্যবোধ সৃষ্টি করতে চাইলেন। নেপাল মজুমদারের মতে, “বলা বাহুল্য, — এই গোরক্ষা আন্দোলন রাজনীতিবিদদের চোখে নিঃসন্দেহে অত্যন্ত প্রতিক্রিয়াশীল বলিয়া বিবেচিত হইবে কিন্তু ঐতিহাসিক দিক হইতে বিচার করিলে সে যুগে এটাকে হিন্দু জাতীয়তাবাদী আন্দোলনেরই অংশ বলে গণ্য করতে হবে।” গোরক্ষিণী সমিতির বাড়াবাড়িতে এমনকি পরবর্তীকালে স্বামী বিবেকানন্দের মতো তুলনামূলকভাবে রক্ষণশীল ব্যক্তিত্বও ১৮৯৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কলিকাতায় প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে গোরক্ষা প্রচার সমিতির প্রচারকের কথা শুনে বিরক্তভরে বলে ওঠেন, “হাঁ গরু আমাদের যে মা, তা আমি বিলক্ষণ বুঝেছি — তা না হলে এমন সব কৃতী সন্তান আর কে প্রসব করিবেন?” অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বোম্বাই বিহার এবং উত্তরপ্রদেশে গোরক্ষাকে কেন্দ্র করে দাঙ্গার সৃষ্টি হল। ১৮৯৩ সালের আগস্ট মাসে বোম্বাইতে ঘটিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জন্য বোম্বাই-এর ইংরেজ গভর্নর গোরক্ষণী সভার অত্যুৎসাহী সদস্যদের বাড়াবাড়িকেই দায়ী করেছিলেন।

এরই পটভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ ‘ইংরেজের আতঙ্ক’ প্রবন্ধে লিখলেন, “ইতিমধ্যে ইংরাজের ভারতশাসনক্ষেত্রে আর-একটা নূতন ভয় আসিয়া দেখা দিয়াছে। সেটা আর কিছু নয়, গোরক্ষণী সভা। যাহাদিগকে রক্ষা করিবার জন্য এই সভাটা স্থাপন করা হইয়াছে তাহারা যতটা নিরীহ, সভাটাকে ততটা নিরীহ বলিয়া ইংরাজের ধারণা হইল না। কারণ, ইংরাজ ইহা বুঝিয়াছে যে স্বদেশ ও স্বজাতি রক্ষার জন্য যে-হিন্দু এক হইতে পারে না, গোষ্ঠ এবং গোজাতি রক্ষার জন্য চাইকি তাহারা এক হইতেও পারে। স্বাধীনতা স্বদেশ আত্মসম্মান মনুষ্যত্ব প্রভৃতি অনেক শ্রেষ্ঠতর পদার্থের অপেক্ষা গোরুকে রক্ষা করা যে আমাদের পরমতর কর্তব্য, এ-কথা হিন্দু ভূপতি হইতে কৃষক পর্যন্ত সকলেই সহজে বুঝিবে। গোহত্যা-নিবারণ সম্বন্ধে নেপালের গুর্খা হইতে পঞ্জাবের শিখ পর্যন্ত একমত।” সমস্ত প্রবন্ধটি পাঠ করলে বোঝা যায় যে, গো-রক্ষা আন্দোলন নিয়ে রবীন্দ্রনাথের কোনও আগ্রহ অথবা সহানুভূতি নেই বরং এই আন্দোলনের বাহানাতে ব্রিটিশ সরকার যে সব অপকৌশল অবলম্বন করেছিল, তিনি তারই সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু এর পরেও কয়েকটি প্রশ্ন থেকে যায়। যে রবীন্দ্রনাথ ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসে নিখিলেশের মুখ দিয়ে বলিয়েছেন, “এদেশে মহিষেও দুধ দেয় মহিষেও চাষ করে, কিন্তু তার কাটামুণ্ড মাথায় নিয়ে সর্বাঙ্গে রক্ত মেখে যখন উঠে নিময় নৃত্য করে বেড়াই তখন ধর্মের দোহাই দিয়ে মুসলমানের সঙ্গে ঝগড়া করলে ধর্ম মনে মনে হাসেন, কেবল ঝগড়াটাই প্রবল হয়ে ওঠে। কেবল গোরুই যদি অবধ্য হয় আর মোষ যদি অবধ্য না হয় তবে ওটা ধর্ম নয়, ওটা অন্ধ সংস্কার।” সেই রবীন্দ্রনাথের সম্বন্ধে তাঁর রাজনৈতিক চরিতকার নেপাল মজুমদার অত্যন্ত আক্ষেপ করে বলেছেন, “…গোরক্ষার মতো একটি কুসংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করিয়া যখন হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও মনোমালিন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্ররোচিত এবং উত্তেজিত হইতেছে, এবং যে সময়ে নাকি হিন্দু-মুসলিম জাতীয় ঐক্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বিবেচিত হইতেছে, তখনও তিনি ইহার প্রতিবাদ করিলেন না।” অথচ আমরা আগেও দেখেছি, এই জাতীয় ধর্মীয় কুসংস্কারজনিত প্রতিক্রিয়াশীল মতবাদকে রবীন্দ্রনাথ বরাবরই শাণিত যুক্তি দ্বারা কেটেছেন। নেপালবাবুর মতে, তিলকের প্রতি ব্যক্তিগত শ্রদ্ধাবশতই রবীন্দ্রনাথ এই আন্দোলনের সমালোচনা করেন নি।

এইভাবে ধর্মীয় মেরুকরণের যে কাজটি তিলক শুরু করেছিলেন, তাকে সম্পূর্ণতা দিতেই ১৮৯৫ সালে রায়গড়ে তিনি প্রবর্তন করলেন শিবাজী উৎসব। লক্ষ্য ছিল, মারাঠা বীর শিবাজীর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা — স্পষ্টতই, জাতীয় মুক্তি আন্দোলনকে তিলক ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েই কল্পনা করেছিলেন। জাতীয় ঐক্য আর হিন্দুর ঐক্য ছিল তিলকের কাছে সমার্থক। শিবাজিকে হিন্দু জাতীয়তাবাদী প্রতীক হিসেবেই দেখেছিলেন তিলক — “The people of no other country in the world  would have forgotten the great man who laid the foundation of our empire, who upheld our self respect as Hindus, and who gave particular direction to our religion.” তাই পরবর্তীকালে তিনি যখন বলেন, “The Shivaji festival is not celebrated to alienate or even to irritate the Mahomedane. Times are changed, and, as we observed above, the Mahomedans and the Hindus stand in the same boat or on the same platform so far as the political condition of the people is concerned. Can we not both of us derive some inspiration from the life of Shivaji under these circumstances?” তখন তাঁর এই আবেদন বস্তুত কুমিরের কান্নার মতো শোনায় !

তিলকের সম্বন্ধে একটি খুব লাগসই কথা বলেছেন সুরজিৎ দাশগুপ্ত তাঁর ‘ভারতবর্ষ ও ইসলাম’ গ্রন্থে, “টিলকের অকপট জাতীয়তাবাদী সাধনাকে এক কথায় বলা যায় তীব্র দেশপ্রেমের সঙ্গে উগ্র সাম্প্রদায়িকতার সমীকরণ সম্পন্ন করার প্রাণান্ত প্রয়াস এবং এক্ষেত্রে তাঁর সাফল্য অবিসংবাদিত।” তিলক ঘোষণা করেছেন, স্বরাজ আমাদের জন্মগত অধিকার, কিন্তু ‘কেশরী’ পত্রিকার প্রবন্ধেই হোক বা বক্তৃতাতে, ‘স্বরাজ’ বলতে তিনি বুঝিয়েছেন ‘হিন্দু স্বরাজ’এর আদর্শকে, যেখানে অহিন্দুদের স্থান নেই। প্রথমে সার্বজনীন গণপতি উৎসব, তারপর গোরক্ষিণী সভা এবং অবশেষে শিবাজি উৎসব প্রবর্তনের ফল অচিরেই দেখা গেল, ১৮৯৫ সালে পুনাতে আয়োজিত কংগ্রেসের সম্মেলনে স্থানীয় মুসলমানরা যোগ দিলেন না, কারণ কংগ্রেসের হিন্দুদের প্রতি তাঁদের বিশ্বাস ততদিনে শিথিল হয়ে গেছে। রবীন্দ্র জীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় স্পষ্টভাবে লিখেছেন, “ইহার জন্য দায়ী ছিলেন লোকমান্য টিলক।” সুরজিৎ দাশগুপ্ত জানিয়েছেন, “কংগ্রেসের ভিতর থেকেই যখন কোনও উদারপন্থী নেতা টিলককে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সমালোচনা করেন তখন টিলক তার উত্তর দেন, ‘There was nothing wrong in providing a platform for the Hindus of all high and low classes to stand together and discharge a joint national duty.’ স্পষ্টতই টিলকের জাতীয়তাবাদ প্রকৃতপক্ষে হিন্দুধর্মবাদ।” ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের শেষ দিনগুলি নিয়ে আলোচনাকালে তিলকের ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সমালোচনা করে মাইকেল এডওয়ার্ডস যথার্থই লিখেছিলেন, “Tilak had been first to recognise the power of religious feeling as a weapon against the British, Jinnah learned the lesson and turned it against Congress.”

একটু অপ্রাসঙ্গিক হলেও এখানে তিলক সম্বন্ধে আর একটি কথা বলবার আছে। ১৯০৬ সালের ১১ ডিসেম্বর নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির সভায় তিলক বলেছিলেন, “নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে আমাদের বিশ্বাস নেই একথা ঠিক নয়। আমরা ইংরেজ সরকারের উচ্ছেদও চাই না। কিন্তু রাজনৈতিক অধিকারের জন্য লড়াই করতে হবে। নরমপন্থীরা ভাবেন আবেদন নিবেদন করে এই অধিকার লাভ করবেন — আমরা ভাবি প্রবল চাপ সৃষ্টি করলেই তা পাওয়া যাবে।” জানিয়েছেন বিমলানন্দ শাসমল। “I may state, once for all, that we were trying in India, as the Irish Home Ruler has been doing in Ireland, for the reform of a system, and not for the overthrow of Government ; …” এই হল সেই তথাকথিত ‘স্বরাজ’এর স্বরূপ, যার স্বপ্ন বাল গঙ্গাধর তিলক ভারতবাসীকে দেখিয়েছিলেন।

(দুই)

যাই হোক, ১৯০৪ সালে সখারাম গণেশ দেউস্কর শিবাজী উৎসবকে বাংলায় প্রবর্তনে সক্রিয় হলেন। এই প্রসঙ্গে ‘জাতীয় আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথ’ গ্রন্থে প্রফুল্লকুমার সরকার লিখেছেন, “১৯০৪ সালের আর একটি স্মরণীয় ঘটনা কলিকাতায় ‘শিবাজী উৎসব’। ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়, বিপিনচন্দ্র পাল প্রভৃতি নব জাতীয়তাবাদীদের উদ্যোগে এই শিবাজী উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। মহারাষ্ট্র-নেতা লোকমান্য বালগঙ্গাধর তিলক এই উৎসবে যোগ দিবার জন্য পুণা হইতে কলিকাতায় আসেন। এই শিবাজী উৎসবের একটা প্রধান অঙ্গ ছিল শক্তিরূপিণী ভবানীর পূজা। ছত্রপতি শিবাজী মোগলের দাসত্বমুক্ত যে স্বাধীন ভারতের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন, তাহারই আদর্শ জাতির সম্মুখে ধরিবার জন্য এই শিবাজী উৎসবের পরিকল্পনা হইয়াছিল।”

সখারাম দেউস্কর ‘শিবাজীর দীক্ষা’ নামে একটি পুস্তিকা লিখলেন এবং এই দেউস্করেরই ব্যক্তিগত অনুরোধে রবীন্দ্রনাথ এর ভূমিকাস্বরূপ ‘শিবাজী উৎসব‘ কবিতাটি লিখে দিলেন এবং উৎসব উপলক্ষে কলিকাতা টাউন হলে যে বিরাট সভা হল, রবীন্দ্রনাথ তাতে কবিতাটি পাঠ করলেন। কবিতাটির শেষাংশে আছে —

“তোমারে চিনেছি আজি, চিনেছি চিনেছি, হে রাজন,

তুমি মহারাজ।

তব রাজকর ল’য়ে আটকোটি বঙ্গের নন্দন

দাঁড়াইবে আজ।

সে-দিন শুনিনি কথা — আজ মোরা তোমার আদেশ

শির পাতি’ লবো।

কণ্ঠে কণ্ঠে বক্ষে বক্ষে ভারতে মিলিবে সর্ব্বদেশ

ধ্যানমন্ত্রে তব।

ধ্বজা করি’ উড়াইব বৈরাগীর উত্তরী’ বসন

দরিদ্রের বল।

‘এক-ধর্ম্ম-রাজ্য হবে এ ভারতে’ এ মহাবচন

করিব সম্বল।

মারাঠীর সাথে আজি, হে বাঙালী, এক কণ্ঠে বলো

‘জয়তু শিবাজি।’

মারাঠীর সাথে আজি, হে বাঙালী, এক সঙ্গে চলো

মহোৎসবে আজি।

আজি এক সভাতলে ভারতের পশ্চিম-পূরব

দক্ষিণে ও বামে

একত্রে করুক ভোগ এক সাথে একটি গৌরব

এক পুণ্য নামে।”

প্রশ্ন একটাই, শিবাজী তথা মারাঠাজাতির গুণগান গাইবার আগে, “মারাঠীর সাথে আজি, হে বাঙালী, এক সঙ্গে” চলবার আগে, রবীন্দ্রনাথের একবারও বাংলার নারীপুরুষের উপর করা মারাঠী বর্গিদের অকথ্য অত্যাচার আর ধর্ষণের কথা মনে পড়লো না? “এক-ধর্ম্ম-রাজ্য” কি এতোটাই মহিমময়? রবীন্দ্রনাথ কি আদৌ বোঝেননি যে, শিবাজীর বীরত্বের যে গাথা, তা তৈরি হয়েছে মুসলমান শাসকদের বিরুদ্ধে তাঁর লড়াইয়ের জন্যেই এবং স্বভাবতই এই উৎসবে মুসলমান সম্প্রদায় যোগদান করবে না? এর জবাব হল, আসলে কবি তখনও সনাতন বৈদিক ধর্মের আদলেই ভারতের জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠবে — এই তত্ত্বে বিরাজমান। বিবেকানন্দ, বঙ্কিমচন্দ্র ব্রহ্মবান্ধবের মাধ্যমে যে হিন্দু জাতীয়তাবাদ বাংলাদেশে পরিপুষ্ট হয়ে চলেছিল, রবীন্দ্রনাথ তখনও তা থেকে মুক্ত হতে পারেননি।

কিন্তু পরবর্তীকালে বিশেষত বঙ্গভঙ্গ পরবর্তী ভারতীয় রাজনীতিতে সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনা হল রবীন্দ্রনাথের বিবর্তন, চরমপন্থী রাজনীতি যা ক্রমেই হিন্দু জাতীয়তাবাদের সঙ্গে সমার্থক হয়ে যাচ্ছিল, তার প্রতি ক্রমেই বিরুদ্ধ মনোভাব দেখাতে আরম্ভ করলেন রবীন্দ্রনাথ। ‘বন্দে মাতরম’, ‘সন্ধ্যা’ ও ‘যুগান্তর’-এর পাতাতেও ক্রমেই হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির প্রতিচ্ছবি দেখা দিচ্ছিল। ফলে ‘সঞ্জীবনী’ এবং ‘প্রবাসী’র মতো ব্রাহ্ম-সম্পাদিত পত্রিকাগুলিও এই বিবর্তিত রাজনীতির সমালোচনা আরম্ভ করলো — প্রবাসীর জ্যৈষ্ঠ ১৩১৩ (এপ্রিল ১৯০৬) সংখ্যায় শিবনাথ শাস্ত্রী লিখলেন, “যে জাতি নিজ পূর্ব গৌরবের অভিমানে স্ফীত হইয়া বর্ত্তমানের উন্নতি সাধনে বিমুখ তাহারাও অশ্রদ্ধেয় এবং তাহাদের অতীতানুরাগ ব্যাধিবিশেষ।” রবীন্দ্র জীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়  বলেছেন, একটু দেরীতে হলেও রবীন্দ্রনাথ বুঝতে পেরেছিলেন যে, “শিবাজী উৎসব আন্দোলন হিন্দু জাতীয়তাবোধ হইতে উদ্ভূত ; শিবাজী মহারাজ মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিয়া হিন্দুরাজ্য স্থাপন করেন। সুতরাং শিবাজী সম্বন্ধে গৌরববোধ হিন্দুদেরই হওয়া সম্ভব, মুসলমানদের নহে; সুতরাং, বিংশ শতাব্দীতে এই শ্রেণীর কোনও বীরকে অখণ্ড ভারতের স্বাধীনতার প্রতীকরূপে গ্রহণ করা সম্ভব নহে। রবীন্দ্রনাথ বোধ হয় এই কবিতাটির দুর্বলতা কোনখানে তাহা আবিষ্কার করিতে পারিয়াছিলেন। এবং তজ্জন্য তাঁহার কোনও কাব্যগ্রন্থে স্থান দেন নাই।” সম্ভবত একই কারণে সরলা দেবী প্রবর্তিত ‘প্রতাপাদিত্য উৎসব’-কেও বিন্দুমাত্র সমর্থন করলেন না রবীন্দ্রনাথ। এমনকি একসময়ে যে শিবাজী উৎসবে তিনি যোগদান করেছেন, শিবাজীর নামাঙ্কিত কবিতা লিখে উৎসবে পাঠ করেছেন সেই রবীন্দ্রনাথকে দেখা গেল তৎকালীন হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে শিবাজীকে অসাম্প্রদায়িকরূপে প্রতিপন্ন করবার এই অনৈতিহাসিক প্রয়াসে যথেষ্ট বিরক্ত হয়ে ১৯০৬ সালের ৩ জুন সুবোধচন্দ্র মজুমদারকে লেখা চিঠিতে মন্তব্যে করতে — “এক লক্ষ্মীছাড়া শিবাজী মেলা নিয়ে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত আটক পড়েছে।”

ঘটনাটি হল এইরকম — ১৯০৬ সালের ৪ জুন থেকে ১২ জুন বাংলার চরমপন্থী ‘স্বদেশী মণ্ডলী’ কলকাতায় কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিটে ফিল্ড এ্যাণ্ড একাডেমির পান্তির মাঠে মহাসমারোহে শিবাজী উৎসব ও ভবানী পূজার আয়োজন করলো। অশ্বিনীকুমার দত্তের সভাপতিত্বে মুল অনুষ্ঠানটি হয় ৫ জুন। এই উৎসবে বাল গঙ্গাধর তিলক, গণেশ কৃষ্ণ খাপার্দে এবং বালকৃষ্ণ শিবরাম মুঞ্জে উপস্থিত ছিলেন। শ্যামসুন্দর চক্রবর্তী রবীন্দ্রনাথের লেখা ‘শিবাজী উৎসব’ কবিতাটি পাঠ করলেন। সচরাচর স্বদেশ পর্যায়ের যে কোনও উদ্যোগে ব্রিটিশ সরকার নানা রকমের বাধা সৃষ্টি করতো। কিন্তু মহারাষ্ট্র এবং বাংলায় শিবাজী উৎসব নিয়ে ব্রিটিশরা কার্যত নীরব ছিল। শিবাজীর কল্পিত ‘অখণ্ড হিন্দুভারত’ চেতনা, যা ‘শিবাজী উৎসবে’-এর মাধ্যমে তুলে ধরা হচ্ছিল, সেই রাজনীতি সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে ওঠেন রবীন্দ্রনাথ। সিদ্ধান্ত নিলেন শিবাজী উৎসবে যোগ না দেওয়ার। গিরিজাশঙ্কর রায়চৌধুরী জানিয়েছেন, “কিন্তু স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ, ব্রাহ্ম কৃষ্ণকুমার মিত্র এই শিবাজী উৎসবে যোগ দিলেন না। কেননা মূর্ত্তি গড়িয়া ভবানী পূজা হইয়াছে।” গৌতম রায় অনুমান করেছেন যে, মুঞ্জে — ইত্যাদিদের সাম্প্রদায়িক চিন্তা এবং ধর্মান্ধ মানসিকতা সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাই কোনো সাম্প্রদায়িক মানসিকতাসম্পন্ন ব্যক্তির সঙ্গে একমঞ্চে থাকতে তিনি রাজি হননি। শিবাজী হিন্দুর আত্মসম্মানকে তুলে ধরেছিলেন বলেই তাঁকে ঘিরে এই উৎসব — একথা খুব পরিস্কারভাবেই তিলক প্রকাশ্যে বলেছিলেন।” প্রশান্তকুমার পালের মতে, “রবীন্দ্রনাথ দেশজননীকে ‘মাতৃমূর্তি’তে বন্দনা করলেও স্বদেশী আন্দোলনে ক্রমশ হিন্দু পৌত্তলিকতার অনুপ্রবেশে শঙ্কা বোধ করছিলেন, জাতীয়তাবাদী মুসলমানদের মধ্যেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছিল।” গিরিজাশঙ্কর বাবু লিখেছেন, “মুসলমান-বর্জ্জিত, মুসলমান ধর্ম-বিরোধী এই প্রকার উৎসবকে তিলক-অরবিন্দ-বিপিনচন্দ্র-ব্রহ্মবান্ধব প্রভৃতি চরমপন্থী নেতারা সেদিন প্রাণপণে যেরূপ জাতীয়তার বেদীতে প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন, তাহা তো ধর্ম-নিরপেক্ষ জাতীয়তা নয়, …ইহা নির্জ্জলা পৌত্তলিক হিন্দুত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত হিন্দু জাতীয়তা। ইহা বঙ্কিম-প্রদর্শিত এবং বঙ্কিম অনুপ্রাণিত জাতীয়তা।” কৃষ্ণকুমার মিত্রের ‘সার্কুলার বিরোধী সমিতি’ তাঁর অসংখ্য মুসলমান কর্মী ও সমর্থকদের কথা বিবেচনা করে এই উৎসব বয়কট করেন। কারণ এটিই ছিল একমাত্র ধর্মনিরপেক্ষ সমিতি — এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন লিয়াকত হুসেন, আবুল হোসেন, দেদার বক্স ও আবদুল গফুরের মতো বিশিষ্ট ধর্মনিরপেক্ষ মুসলমান নেতারাও। পরের বছর ৭ এপ্রিল ১৯০৭, চরমপন্থী বিপ্লবীদের মুখপত্র ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় লেখা হয়েছিল, “একদল সনাতন প্রথামত বক্তৃতা করিয়াই শিবাজীর স্মৃতি রক্ষা করা যথেষ্ট মনে করিলেন ; আর একদল ভগবানের পূজাভিন্ন ভক্তির পূজা অসম্পূর্ণ জানিয়া শিবাজীর সহিত সিংহবাহিনীর অর্চ্চনা করিয়া ধন্য হইলেন। একটা উচ্চ আদর্শ জনসাধারণের মধ্যে কেমন করিয়া প্রচার করিতে হয় তাহারও কতকটা মীমাংসা হইয়া গেল। আমাদের দেশের রাজনীতি যে ধর্ম্ম হইতে পৃথক করিলে জনসাধারণের মধ্যে আদৃত হইবে না তাহাও অনেকে বুঝিল।” রাজনীতির সঙ্গে ধর্মকে মিশ্রিত করলে অদূর ভবিষ্যতে যে ঘোরতর সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে, এই জ্ঞানটাই অধিকাংশ জাতীয়তাবাদী নেতা ও কর্মীদের ছিল না।

এই প্রসঙ্গে বছর বিশেক পরে ঘটা চট্টগ্রাম যুববিদ্রোহের অন্যতম নেতা অনন্ত সিংহের সঙ্গে সর্বাধিনায়ক মাষ্টারদা সূর্য সেনের প্রথম পরিচয়ের অভিজ্ঞতাটি বিবৃত করা যেতে পারে। অনন্ত সিংহ কর্ণফুলী নদীর তীরে পাথরঘাটা পল্লীর নিকটে একটি খড়ের কুঠিরে প্রথমবার সূর্য সেনের সাক্ষাত পান, কুঠিরের বর্ণনা দিতে গিয়ে তার মধ্যে একটি কালীমূর্তির অবস্থানের কথা বলেছেন অনন্ত। শিষ্যকে মাষ্টারদার উপদেশ ছিল, “দেবী চৌধুরানী পড়, আনন্দমঠ পড় — আমার কথা বুঝতে পারবে আরো ভালো করে।” তাও তো মাস্টারদার অবস্থান ছিল তখনকার বিপ্লবীদের মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষ ব্লকে !

(তিন)

বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভ থেকেই বাংলাদেশে যে নূতন বৈপ্লবিক প্রচেষ্টা দেখা দেয় তারই পরিণতি হিসেবে একাধিক গুপ্ত সমিতির সৃষ্টি হল। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল অনুশীলন সমিতি। ঐতিহাসিক সুমিত সরকার লিখেছেন, “… the group destined to greatest importance and frame was of course the Anushilan Samiti founded on 24 March, 1902 by Satischandra Basu as a physical culture society …” বিপ্লবী ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর ‘ভারতের দ্বিতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম’ গ্রন্থের পরিশিষ্টে সতীশচন্দ্র বসুর বিবৃতি উদ্ধৃত করে জানিয়েছেন, মদন মিত্র লেনে তাঁরা একটি লাঠিখেলার ক্লাব স্থাপন করলে তাঁর অনুরোধে নিউ ইন্ডিয়ান স্কুলের হেডমাস্টার নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য ক্লাবটির ‘অনুশীলন সমিতি’ নামকরণ করেন। তেঘরিয়ার শশী চৌধুরী ক্লাবের সদস্যদের ব্যারিস্টার প্রমথনাথ মিত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন। সতীশচন্দ্র জানিয়েছেন, “তাঁহাকে সব কথা বলিলে তিনি exited হইয়া আমাকে জাপটাইয়া ধরিলেন ; পরে তিনি ক্লাবের Commander-in-chief (পরিচালক) হইলেন। সাতদিন বাদে তিনি আমাকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘বরোদা হইতে একটা দল আসিয়াছে — তোমাদের উদ্দেশ্য অনুযায়ী উদ্দেশ্য তাহাদেরও। সর্ব্বপ্রকারের training (সামরিক শিক্ষা) তাহারা দিবে। তাহাদের সহিত তোমাদের amalgamate (সংযোগ) করিতে হইবে।’ আমরাও রাজী হইলাম। … তাহার ফলে যে দল গঠিত হইল তাহার সভাপতি হইলেন প্রমথনাথ মিত্র, সহকারী সভাপতি হইলেন চিত্তরঞ্জন দাস (পরে দেশবন্ধু দাস) ও অরবিন্দ ঘোষ, কোষাধ্যক্ষ সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর।” অরুণচন্দ্র গুহ ‘অরবিন্দ এ্যান্ড যুগান্তর’ গ্রন্থে লিখেছেন, “… the starting of Jugantar was the beginning of Yugantar as a separate group — actively dedicated to the cause of a revolutionary movement.” বারীন ঘোষ যুগান্তর নামে একটি দল তৈরি করে ছাত্র ভাণ্ডার, আত্মোন্নতি সমিতি ইত্যাদির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করলেন।

মোটামুটিভাবে একই সময়ে মেদিনীপুরেও একটি গুপ্তসমিতি গড়ে ওঠে জ্ঞানেন্দ্রনাথ বসুর নেতৃত্বে। হেমচন্দ্র কানুনগো, সত্যেন্দ্রনাথ বসু (পরবর্তীকালে আলিপুর জেলে  নরেন গোঁসাইয়ের হত্যাকারী) ইত্যাদি এই সভার সভ্য ছিলেন। জ্ঞানেন্দ্রনাথ অরবিন্দ ঘোষের পূর্ব পরিচিত ছিলেন, সেই সূত্রে যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতা থেকে মেদিনীপুরে এসে দলটির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপর শোনা যাক হেমচন্দ্রের জবানীতে — “১৯০২ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি এক দিন ‘অ’-বাবুর কাছে শুনলাম ‘ক’-বাবু বাংলাদেশে সিক্রেট সোসাইটি স্থাপনের চেষ্টা করছেন। বাংলাদেশ ছাড়া ভারতের সর্ব্বত্র সিক্রেট সোসাইটি হয়ে গেছে। …দিন কতক পরে ‘ক’-বাবুর একজন ভীমাকৃতি সহকারী এসে হাজির হলেন। এঁকে ‘খ’-বাবু বলে উল্লেখ করবো। …তিনি যা আওড়েছিলেন, তার সারমর্ম্ম যা মনে পড়ল, তাই লিখছি। সমস্ত ভারত ইংরেজ তাড়াবার জন্য তয়ের। করদ রাজ্যগুলি এবং প্রত্যেক প্রদেশের লক্ষ লক্ষ সৈন্য তলওয়ার বানাচ্ছে। এমনকি নাগা, গারো, ভীল প্রভৃতি অসভ্য জাতিদের হাজার হাজার লোক পাঁয়তারা দিচ্ছে ; খালি বাংলা প্রদেশ তয়ের নয় বলে আটকে বসে আছে।” হেমচন্দ্র কানুনগোর এই বক্তব্যের সমর্থন পাওয়া যায় ভূপেন্দ্রনাথ দত্তের লেখনীতে — “শ্রদ্ধাষ্পদ অরবিন্দ ঘোষ ও তাঁহার ভ্রাতা বারীন্দ্রকুমার ঘোষ একটি ‘আষাঢ়ে গল্প’ দ্বারা বঙ্গে প্রচার করিলেন যে নর্ম্মদাকুলের সাধুরা যোগবলে স্থির করিয়াছেন যে, রাজপুতানার কোন সূর্য্য-বংশীয় কুলে ভারতের ভবিষ্যৎ সম্রাট জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। …তাঁহাকে দলপতি মানিয়া লইয়া একটা ভারতব্যাপী বৈপ্লবিক গুপ্ত-সমিতি স্থাপিত হইয়াছে। মহারাষ্ট্রে ইহার বিশেষ আড্ডা। ১৯০৬ খৃষ্টাব্দে ভারতব্যাপী বিপ্লব হইবে, কিন্তু কাপুরুষ বাঙালী কিছু করিতেছে না। … উপরোক্ত গল্পটি আমি স্বকর্ণে ১৯০৩ বা ৪ সালে অরবিন্দ ঘোষ মহাশয়ের মুখ হইতে শুনিয়াছি। …যে সব বাঙালী বরোদা হইতে আসিয়াছিলেন সকলেই এই গল্পটি প্রচার করিতেন।” প্রশান্তকুমার পাল লিখেছেন, “… বারীন্দ্রের হরেকরকম বাগবিস্তার ও পরিকল্পনা-পরিবর্তনের যে বিবরণ হেমচন্দ্র দিয়েছেন তাতে অরবিন্দ প্রমুখ তথাকথিত বিপ্লবতত্ত্বাভিজ্ঞ নেতারা কেন বারীন্দ্রের উপর আস্থা স্থাপন করে নিশ্চিত ছিলেন ভাবলে আশ্চর্য হতে হয়।”

এইখানে ভারতবর্ষের বিশেষত বাংলাদেশের বিপ্লববাদ নিয়ে কয়েকটি কথা বলা দরকার। সর্বাঙ্গীণ বিদ্রোহ বলতে যা বোঝায়, তেমন বিপ্লব ঘটানোর কোনও প্রচেষ্টা এখানে কখনই কেউ করেননি। আমাদের দেশে যে বিপ্লববাদের প্রচলন ছিল তার আদর্শ কোনোদিনই এমন ছিল না, যে সমস্ত দেশজুড়ে অথবা নিদেনপক্ষে দেশের কিছুটা অঞ্চল জুড়ে এক সশস্ত্র অভ্যুত্থানের সূচনা করে, অন্ততপক্ষে রাসবিহারী বসু এবং সূর্য সেনের আগে। এইসব গুপ্ত-সমিতিগুলির সন্ত্রাসবাদের আদর্শ মুষ্টিমেয় কিছু কর্মী-গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, যাঁরা ভাবতেন কিছু আক্রমণাত্মক ঘটনার মাধ্যমে তাঁরা ব্রিটিশ সরকারকে ভয় দেখিয়ে এদেশ থেকে উচ্ছেদ করতে পারবেন।

তবে একথা অস্বীকার করনার কোনও জায়গা নেই যে, দেশপ্রেম এবং কষ্টসহিষ্ণুতার মাপকাঠিতে এই সমস্ত বিপ্লবীদের তুলনা হয় না, গর্ব করে ভুপেন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছেন, “স্বদেশী আন্দোলন বিপ্লববাদের সৃষ্টি করে নাই; বরং মফঃস্বলে স্বদেশী আন্দোলন বিপ্লববাদীদের দ্বারাই পরিচালিত ও পরিপোষকতা প্রাপ্ত হইত। স্বদেশী আন্দোলনের বেগ ও বৃদ্ধি বিপ্লববাদী সমিতির সাহায্য দ্বারা পরিপুষ্টি লাভ করিয়াছিল। স্বদেশী আন্দোলন কেবল সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, বিপিনচন্দ্র পাল ও কংগ্রেসওয়ালাদের বক্তৃতার গরমে কৃতকার্য্য হয় নাই; বরং প্রত্যেক জায়গায় বিপ্লববাদীরা কেন্দ্রস্বরূপ হইয়া স্বদেশী আন্দোলনকে পরিচালিত করতেন ও তাহাকে কৃতকার্য্য করিবার যথেষ্ট চেষ্টা করিতেন।” তবুও বলতে হয়, বিপ্লবী নেতাদের দূরদৃষ্টির অভাব, অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত, সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং অহেতুক রোমান্টিসিজম তাঁদের কর্মকাণ্ডকে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ করেছিল। অর্থের প্রয়োজনে এঁরা রাজনৈতিক ডাকাতির আশ্রয় নিতেন যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সফল হত না, হলেও সেই অর্থ তছরুপও হয়েছে। ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত জানিয়েছেন, “ইহার জন্য নিজেদের মধ্যে দলাদলি হয় এবং দুঃখের বিষয় এই যে, যাঁহাদের নিকট টাকা লুকাইয়া রাখা হইত তাঁহারা গচ্ছিত অর্থ অনেক স্থলে আত্মসাৎ করিয়াছেন।” রাজনৈতিক ডাকাতির তীব্র বিরোধী রবীন্দ্রনাথ ৬ জুলাই ১৯০৮, জামাতা নগেন্দ্রনাথকে লেখেন, “বিধবার ধন লুঠ করিয়া চুরি ডাকাতি খুন ও মিথ্যাচরণ করিয়া দেশের মঙ্গলসাধন করিব ইহা যদি সম্ভব হয় তবে জগতে মনুষ্যত্ব একটা ফাঁকি মাত্র …।” রাজনৈতিক ডাকাতির চরম বিরোধী ছিলেন চট্টগ্রাম যুববিদ্রোহের নায়ক অনন্ত সিংহও। তাঁর মতে, “রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য অন্যের বাড়ি থেকে টাকা ছিনিয়ে আনবার অধিকার আমাদের তখনই হবে যখন আমরা ত্যাগস্বীকার করে আমাদের নিজ নিজ বাড়ি থেকে টাকা এনে দিতে পারবো।”

এইসব সংগঠনের আর একটি সীমাবদ্ধতা হল, এই গুপ্তসমিতিগুলির যাঁরা নেতৃস্থানীয় ছিলেন তাঁরা বিশ্বাস করতেন, ভারত যেরকম ধর্মপ্রাণ দেশ তাতে ধর্মের ভিতর দিয়ে ব্যতীত কোনো নূতন ভাব এ দেশ গ্রহণ করতে পারবে না। সিদ্ধযোগী, সাধু সন্ন্যাসীর অলৌকিক মাহাত্মে অগাধ বিশ্বাসী এই নেতারা বিপ্লবটাকে ধর্মের সাথে মিশিয়ে ফেললেন। ঐতিহাসিক অমলেশ ত্রিপাঠীর ভাষায়, “চরমপন্থীরা এমন এক আদর্শভারত রচনা করতে চেয়েছিল যার ধমনীতে আর্যরক্ত প্রবাহিত, যার বর্ণ-হিন্দি ঐতিহ্যাশ্রিত, শ্রীকৃষ্ণের মত অতিমানব ও শিবাজীর মত যোদ্ধা গড়েছেন যার গৌরবময় ইতিহাস। … তাদের বিশ্বদর্শনে পশ্চিমী সভ্যতা বস্তুবাদের বিষে জীর্ণ। তাকে পুনরুজ্জীবিত ভারতীয় আধ্যাত্মবিদ্যার ভেষজ চাই।” স্বদেশী আন্দোলনকে হিন্দুত্ববাদী রূপ দেওয়ার অদূরদর্শী প্রচেষ্টার সূত্রপাত এইভাবেই। আমরা দেখেছি, রবীন্দ্রনাথও এই ধরণের চিন্তাভাবনার মোহে পড়েছিলেন এককালে, কিন্তু গোরা উপন্যাসের নায়কের মধ্যে দিয়ে ‘শতাব্দীর সূর্য’ মেঘের আড়াল থেকে বার হয়ে আসেন। মৌলনা আজাদ এই সময়ে কলকাতার বাসিন্দা এবং বিপ্লবী শ্যামসুন্দর চক্রবর্তীর সূত্রে সেই সময়কার প্রখ্যাত বিপ্লবীদের সংস্পর্শে এসেছিলেন। তিনি জানিয়েছেন, “সে সময়ে শুধুমাত্র মধ্যবিত্ত হিন্দুদের ভেতর থেকেই বিপ্লবী কর্মী সংগ্রহ করা হত। বিপ্লবী দলে যোগদান করবার পরে আমি দেখতে পাই, সব বিপ্লবী দলই মুসলমানদের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করে।” বামপন্থী গবেষক গোপাল হালদারও ‘রিভলিউশনারি টেররিজম’ শীর্ষক প্রবন্ধে মন্তব্য করেছেন, “It must be said that revolutionary terrorism had failed in only one vital matter, it could not enlist active Muslim supporter. It failed to resolve the religio-social conflicts of the Indian life and the Bengali life as a part of it, and to evoke the courage, patriotism and dynamism of our Muslim countrymen in the cause of freedom.”

তথ্যসূত্র :

১) তিলক অ্যান্ড গোখলে : রিভোলিউশন অ্যান্ড রিফর্ম ইন মেকিং অফ মডার্ন ইন্ডিয়া – স্ট্যানলি ওলপার্ট

২) ভারতের জাতীয়তা ও আন্তর্জাতিকতা এবং রবীন্দ্রনাথ প্রথম খণ্ড – নেপাল মজুমদার

৩) বাণী ও রচনা নবম খণ্ড – স্বামী বিবেকানন্দ

৪) রবীন্দ্র রচনাবলী দশম খণ্ড – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

৫) রবীন্দ্র রচনাবলী অষ্টম খণ্ড – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

৬) বাল গঙ্গাধর তিলক : হিজ রাইটিংস এ্যাণ্ড স্পিচেস – অরবিন্দ ঘোষ সংকলিত

৭) ভারতবর্ষ ও ইসলাম – সুরজিৎ দাশগুপ্ত

৮) রবীন্দ্রজীবনী ও রবীন্দ্রসাহিত্য প্রবেশক প্রথম খণ্ড – প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়

৯) দ্য লাস্ট ডেজ অফ ব্রিটিশ ইন্ডিয়া – মাইকেল এডওয়ার্ডস

১০) স্বাধীনতার ফাঁকি – বিমলানন্দ শাসমল

১১) বাল গঙ্গাধর তিলক : এ স্টাডি – ডি পি কর্মকার

১২) জাতীয় আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথ – প্রফুল্লকুমার সরকার

১৩) পূরবী – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

১৪) আধুনিক ভারত : ১৮৮৫-১৯৪৭ – সুমিত সরকার

১৫) রবীন্দ্র জীবনী ও রবীন্দ্র-সাহিত্য প্রবেশক দ্বিতীয় খণ্ড – প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়

১৬) রবি জীবনী পঞ্চম খণ্ড – প্রশান্তকুমার পাল

১৭) শ্রীঅরবিন্দ ও বাংলায় স্বদেশী যুগ – গিরিজাশঙ্কর রায়চৌধুরী

১৮) ভারতের জাতীয় আন্দোলন ও আর এস এস – গৌতম রায়

১৯) বঙ্গভঙ্গ স্বদেশী বিপ্লববাদ – রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য

২০) অগ্নিগর্ভ চট্টগ্রাম – অনন্ত সিংহ

২১) দি স্বদেশী মুভমেন্ট ইন বেঙ্গল : ১৯০৩-১৯০৮ – সুমিত সরকার

২২) ভারতের দ্বিতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম – ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত

২৩) স্বাধীনতা সংগ্রামে কংগ্রেস – অমলেশ ত্রিপাঠী

২৪) বাংলায় বিপ্লব প্রচেষ্টা – হেমচন্দ্র কানুনগো

২৫) রবি জীবনী ষষ্ঠ খণ্ড – প্রশান্তকুমার পাল

২৬) ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম – মৌলনা আবুল কালাম আজাদ

২৭) স্টাডিজ ইন দ্য বেঙ্গলি রেনেসাঁস – অতুলচন্দ্র গুপ্ত সম্পাদিত

মন্তব্য তালিকা - “ধর্মের চোরাগলিতে আবদ্ধ ছিল বাংলাদেশের বিপ্লববাদের প্রথম পর্যায়: প্রথম পর্ব”

  1. শুরুটা বেশ ভালো এবং আকর্ষণীয় হয়েছে। কিছু কিছু জায়গায় তিলক না হয়ে টিলক লেখা হয়েছে। একটু দেখবে।

  2. অসাধারন ইতিহাস পর্যালোচনা। ভাই শিবাশিষ এত ভাল বিস্তারিত লেখা আমি আগে পড়িনি। এতদিন আমার মনে জন্মে থাকা প্রশ্নগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা আপনার লেখার মাধ্যমে জানতে পেরে পরিতৃপ্ত হলাম। আমার প্রাণভরা শুভেচ্ছা জানবেন।

    1. অনেক ধন্যবাদ দাদা। লেখার আনন্দে লিখি। আপনাদের ভালো লেগেছে শুনলে আনন্দ দ্বিগুণ হয়।

  3. বিচ্ছিন্নভাবে কোন বিষয় লেখা হলে অসম্পূর্ণ হয়। ঐ সময়টিকে সঠিকভাবে উপস্থাপিত ক‍রে বিশ্লেষণ করলে ভালো হত। ইংরেজ শাসক ভারতীয়দের দারিদ্র্য খাদ‍্যাভাবের সুযোগে গরীবদের এবং জাতিভেদ ধর্মাচরণে জাতপাতের বৈষম্যমূলক সমাজব‍্যবস্থায় ধর্মান্তরিত করেছিলেন। গোটা ভারতে ছোট ছোট রাজ‍্য, রাজণ‍্যবর্গ, বহু ভাষাভাষীদের মাঝে হাজারো গোষ্ঠীর দূরত্বে বসবাস চলছিল, যার জন্য ব্রিটিশ রাজের অধিকার করা সহজ হয়েছিল। তাই জাতীয়তার ঐক্য স্থাপনের উদ্দেশ্যে শ্রীতিলক মারাঠিদের উৎসব শুরু করেছেন।
    স্বামী বিবেকানন্দের বিখ্যাত উক্তি –” ভারতে যদি ধর্ম ছাড়িয়া দিয়া পাশ্চাত‍্যজাতির জড়বাদ সর্বস্ব সভ‍্যতার অভিমুখে ধাবিত হও , তোমরা তিন পুরুষ যাইতে না যাইতেই বিনষ্ট হইবে ” ।