সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

‘অন্নদামঙ্গল’এর পথ ধরে, ঈশ্বরী পাটনী’র দেশে

‘অন্নদামঙ্গল’এর পথ ধরে, ঈশ্বরী পাটনী’র দেশে

চন্দ্রশেখর মণ্ডল

মে ২৪, ২০২১ ৮৩

অন্নদামঙ্গলের পথ ধরে চলুন যাই, ঈশ্বরী পাটনীর দেশ থেকে ঘুরে আসি। দেখে আসি, সত্যই কি ঈশ্বরী পাটনীর খেয়া ঘাট এখনো আছে? কিম্বা কেমন যত্নে রেখেছে আজকের বাংলার মানুষ, কাব্যে উল্লিখিত ‘গাঙ্গিনী’ নামের অতীতের সেই সুন্দর নদীটিকে।

কিভাবে জায়গাটিকে খুঁজে পেলাম  একটু বলি, কর্মসূত্রে প্রায়শই আমাকে বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়। সেরকমই একটি কার্যোপলক্ষ্যে গিয়েছিলাম আন্দুলিয়া’তে। জায়গাটি কৃষ্ণনগর – করিমপুর বাস রুটে, চাপড়া থেকে ১১ কিমি দূরে। ওখানে, রাস্তার পাশে একটি চায়ের দোকানে এক ভদ্রলোকের সাথে পরিচয় হয়, যিনি বাড়ি ফেরার গাড়ির অপেক্ষায় অনেকক্ষণ ধরে বসে ছিলেন। আলাপচারিতায় জানতে পারি ওনার বাড়ি বড়গাছি গ্রামে। বড়গাছি নামটা খুব চেনা চেনা লাগছিল। কিন্তু পূর্বে কখনো তো এখানে আসিনি। স্মৃতির পাতা হাতড়াতে থাকলাম। অবশেষে মনে পড়লো :–

“ধন্য ধন্য পরগনা বাগুয়ান নাম।

গাঙ্গিনীর পূর্বকূলে আন্দুলিয়া গ্রাম।।

তাহার পশ্চিমপারে বড়গাছি গ্রাম।

যাহে অন্নদার দাস হরিহোড় নাম।।”

একসময়ে মাধ্যমিকের সিলেবাসে কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত ছিল। তখন ভেবেছিলাম অন্নপূর্ণার মহিমাকীর্তনে স্থান কাল পাত্র সবই কবি কল্পিত। কিন্তু এই নামের কোনো স্থান বাস্তবে থাকতে পারে ভাবিনি। আর তর সইছিল না, অচেনার আনন্দে।

বড়গাছিতে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা আমার আগে থেকে ছিল না, তবুও সদ্যপরিচিত ভদ্রলোকটিকে বললাম, ‘আমিও ঐ দিকেই যাব, আপনি ইচ্ছা করলে আমার বাইকে যেতে পারেন’। সত্যি বলতে, অচেনা গন্তব্যে আমার একজন নির্ভরযোগ্য পথপ্রদর্শক দরকার ছিল, তাই এই প্রস্তাব। দীর্ঘ অপেক্ষায় বিরক্ত তিনি, আমার প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলেন।

যাত্রাপথে একটি নদী পার হতে হল। নদী পার হয়ে আরো ৪/৫ কিমি যাওয়ার পর, বড়গাছিতে পৌঁছালাম। কিন্তু জমিদার হরিহোড়ের বাড়ি কোথায়? সাথী ভদ্রলোক বললেন, ‘তাঁদের আর কিছুই নেই। গ্রামের মধ্যে অনেকটা জায়গা জুড়ে উঁচু একটা স্তূপ আছে। ওটাই রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ।’

যখন রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম, দেখলাম মাটি ব্যবসায়ীরা ধ্বংসাবশেষ টুকুকেও ছাড় দেয়নি, বেশিরভাগ অংশটুকু কেটে নিয়ে গেছে। কেটে নেওয়া অংশে ছড়িয়ে আছে রাশি রাশি প্রাচীন ইটের টুকরো। অবশিষ্টাংশে মাটির ভিতর থেকে উঁকি দিচ্ছে প্রাচীন ইট নির্মিত ভিতের অংশ। প্রাচীন ভিত সংলগ্ন অন্যাংশে আছে একটি বৈষ্ণব আশ্রম।

নিত্যানন্দ প্রভুর শিষ্য বিহারীকৃষ্ণ দাস এই আশ্রমটি প্রতিষ্ঠা করেন। বিহারীকৃষ্ণ ছিলেন জমিদার হরিহোড়ের পুত্র। নিত্যানন্দ প্রভু যে এখানে এসেছিলেন, আশ্রমের একজন প্রবীণ আশ্রমিক সেই সংক্রান্ত একটি বইও আমাকে দেখালেন।

বড়গাছি পেলাম, দেখলাম জমিদার বাড়ির ধ্বংসাবশেষ; আন্দুলিয়াকে তো আগেই পেয়েছি, এবার গন্তব্য ঈশ্বরী পাটনী। সাথী ভদ্রলোকের আত্মীয়হেন ব্যবহারে মুগ্ধ আমি, তাঁর মধ্যাহ্ন ভোজনের আমন্ত্রণ সযত্নে সবিনয়ে ফিরিয়ে দিয়ে, বেরিয়ে পড়লাম গন্তব্যে।

ফিরে আসার পথে, বেশ কয়েকজন প্রবীণ মানুষের সাথে কথা বলে জানার চেষ্টা করছিলাম, বড়গাছি থেকে আন্দুলিয়া যেতে দ্বিতীয় আর কোনো খেয়া ঘাট আছে কিনা, ঈশ্বরী পাটনীর ঘাট বলে এখানে কিছু আছে কিনা এবং থাকলে সেটা কোন দিকে। সব্বাই ঘাটটিকে চেনে এবং বলল কাছাকাছি দ্বিতীয় আর কোনো খেয়াঘাট নেই। এই রাস্তাটি ধরে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।

অবশেষে পৌঁছে গেলাম ঘাটে, যে ঘাট দিয়ে একটু আগেই পার হয়েছিলাম। রোমাঞ্চিত আমি, ‘এটিই তাহলে সেই ঘাট!’

পারানি সংগ্রাহকের দিকে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতেই, তিনি বললেন, ‘এটাই ঈশ্বরী পাটনীর ঘাট, আমরাই তাঁর বংশধর’। শুকদেবের সাথে কথা হচ্ছিল, যিনি পদবি হিসাবে পাটনীটিকেই বেশি পছন্দ করেন।

“প্রণমিয়া পাটনী কহিছে জোড় হাতে।

আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।।

তথাস্তু বলিয়া দেবী দিলা বরদান।

দুধে ভাতে থাকিবেক তোমার সন্তান।।”

দেবী অন্নপূর্ণার মহিমা প্রচারে, এই কাব্যে অনেক পৌরাণিক আখ্যান সংযোজিত করে, সুকৌশলে সেগুলোকে বাস্তব চরিত্রের সাথে জুড়ে দিয়ে বিষয়টিকে আরো আকর্ষণীয় করে তোলার চেষ্টা করেছেন কবি। উপরে উল্লেখিত কাব্যাংশটুকুও তাই। তবুও কৌতূহলবশতঃ বিষয়টি নিয়ে শুকদেবের সাথে কথা বলে যেটা বুঝলাম, খুব সচ্ছলতা না থাকলেও অনটনে নেই তাঁরা। খেয়া পারাপারের পাশাপাশি পাটনীরা মিলে একটি বাঁশের সেতু তৈরি করেছে। যেটা দিয়ে অনায়াসে ভ্যান রিক্সা বা বাইকও পার হয়ে যেতে পারে। অল্পকিছু জমি জায়গা চাষবাস আছে আর খেয়া থেকে যেটুকু আসে তাতেই এদের সংসার চলে যায়।

এবার চলুন নদীটির বিষয়ে একটু খোঁজখবর নিই-

নদীটি পদ্মা থেকে বেরিয়ে প্রবাহ পথে ভীষণ রকম এঁকে বেঁকে দীর্ঘ ২২০ কিমি পথ পাড়ি দিয়ে নবদ্বীপে মায়াপুরের কাছে ভাগীরথীতে মিলিত হয়েছে। ভাগীরথী আর পদ্মা, গঙ্গার দুটি স্রোতধারা। সে হিসাবে এই নদীটি গঙ্গার এক স্রোতধারায় সৃষ্টি হয়ে গঙ্গার অন্য স্রোতধারায় মিলিত হয়েছে। সে জন্য অতীতে এটিকে গাঙ্গিনী/গাংনী নামে অভিহিত করা হয়ে থাকতে পারে অথবা গাঙ্ থেকেও গাঙ্গিনী হতে পারে।

“পাটনী বলিছে মাগো বৈস ভাল হয়ে।

পায়ে ধরে কি জানি কুমিরে যাবে লয়ে।।”

অতীতে নদীটি অনেক বড় ও স্রোতস্বিনী ছিল, এমনকি হয়তো কুমিরও ছিল। নদীটির গতিপথে এখনো কোথাও কোথাও এর পরিত্যক্ত খাত, এর বিশালতার প্রমাণ দেয়। এটিকে আমরা এখন জলঙ্গী নামেই চিনি।

“আবার আসিব আমি

বাংলার নদী মাঠ ক্ষেত ভালবেসে

জলাঙ্গীর ঢেউয়ে ভেজা বাংলার

এ সবুজ করুণ ডাঙায়।”

শুধু অতীতের মঙ্গল কাব্যে নয়, জীবনানন্দের কবিতায়ও উল্লেখ আছে নদীটির। কোথাও কোথাও নদীটির বাঁক এতো মনোমুগ্ধকর, যেন পটে আঁকা ছবি। যে কোনো প্রকৃতি প্রেমী মানুষই এর প্রেমে পড়ে যাবে।

এই নদীটিই একদিন, এর তীরে বসবাসকারী মৎস্যজীবীদের সংসার চালিয়েছে, চাষের জল জুগিয়েছে দু’পারের চাষিদের, অতীতে যখন রাস্তা-ঘাটের এত উন্নতি হয়নি তখন নদী তীরবর্তী অধিবাসীদের যাতায়াতের মাধ্যম ছিল এই নদীপথ, ব্যবসা বাণিজ্যও চলেছে এ নদীপথে।

এতসব উপকারের প্রতিদানে, আমরা দিনের পর দিন নদীটিকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছি। কৃষ্ণনগরের কাছে ৩৪ নং জাতীয় সড়কে একটি ব্রীজ ও পাশে দুটি রেল ব্রীজ আছে, যা নদীটির স্বাভাবিক জলপ্রবাহকে বিঘ্নিত করেছে। জাতীয় সড়ক সম্প্রসারণের জন্য আরো একটি নতুন ব্রীজের কাজ চলছে।

প্রচুর ইটভাটা নদীটির দুই পার বরাবর। এরা ক্রমশঃ নদীটিকে গ্রাস করে নিচ্ছে। এসব জায়গা গুলোতে নাব্যতা আরো কমে যাচ্ছে। ঈশ্বরী পাটনীর ঘাটের খুব কাছেই একটি ইট ভাটার পাশে নদীটির প্রায় মধ্যভাগ অবধি মাটি ফেলে রাস্তা তৈরি করে ফেরী ঘাট করা হয়েছে। যেখানে ট্রলিতে ইট পার হচ্ছে। পলাশীপাড়া নামক জায়গার কাছেও এই নদীতে আরো একটি ব্রীজ আছে।

নাব্যতা হারিয়ে যাওয়া নদীটিকে কোথাও কোথাও স্থানীয় মানুষজন দখল করে চাষের জমিতে পরিণত করেছে। এসব কারণেই ২২০ কিমি মোট দৈর্ঘ্যের মধ্যে ৪৮ কি.মি. নদীর আর কোনো অস্তিত্ব নেই। মৎস্যজীবীরা কোথাও কোথাও লিজ্ নিয়ে মাছের চাষ করছে, এই প্রাচীন নদীটি সেসব জায়গাতেও অবরুদ্ধ হয়ে পড়ছে।

পৃথিবীর প্রাচীন সভ্যতাগুলো একদিন গড়ে উঠছিল নদীকে কেন্দ্র করে, আর হয়তো নদী মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় তাঁরাও একদিন ধ্বংস হয়েছে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিলে, পরবর্তী তালিকায় আমরা আছি।

তথ্যঃ

১) নদীয়া জেলার পুরাকীর্তি – মোহিত রায়।

২) পশ্চিমবঙ্গের পূজা পার্বণ মেলা – অশোক মিত্র।

৩) http://archives.anandabazar.com/…/1111219/19jibjagat1.html

৪) https://eisamay.indiatimes.com/…/amp…/68222707.cms)

(কভারফটোটি চন্দ্রশেখর মণ্ডলের নিজের আঁকা)

মন্তব্য তালিকা - “‘অন্নদামঙ্গল’এর পথ ধরে, ঈশ্বরী পাটনী’র দেশে”

  1. লেখাটির জন্য লেখকের ধন্যবাদ প্রাপ্য । কিন্তু তাঁর আকস্মিক প্রয়াণের পর তাঁকে স্মরণ করে শ্রদ্ধা জানিয়ে এই নিবন্ধটিকে পোর্টালে স্থান দেবার জন্য সম্পাদককে ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।