সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

আল্লাজীর দুই জাইত

আল্লাজীর দুই জাইত

মানবেশ চৌধুরী

ফেব্রুয়ারি ৭, ২০২৬ ১৪৮ 2

(এক) সৈয়দ খোদাবক্স শাহ ফকিরের কথা  

পীর সৈয়দ করম আলী শাহ ফকির-এর আদি বাড়ি বিষয়ে কিঞ্চিত ভ্রান্তি নিরসনের জন্য এসেছিলাম কটকিহারি গ্রামে সৈয়দ মহম্মদ আলী শাহ ফকির-এর কাছে।

বাইর বাড়িতে তখন তাঁর পুত্র সৈয়দ আলী সংসারের টুকটাক কাজ করছেন। চুলায় বাঁশ-পাতারি দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে আতব চাল গুড়োর গোলা দিয়ে চালের রুটি বানাচ্ছেন তাঁর স্ত্রী। সামনে কয়েকজন নারী বসে আছেন, বুঝতে পারলাম তারা এই বাড়িরই সদস্য। চালের গোলার রুটি সাধারনত শক্ত হয়, কিন্তু এই রুটিগুলো মনে হচ্ছে নরম। সেই রুটি সাধারণত পাতলা হয়, কিন্তু এগুলো মোটা এবং হলুদ। রুটি খাবার লোভ হল। চাইতেই, কয়টা রুটি দিল খেতে। চিবিয়ে দেখি নরম বটে, কিন্তু ঝাল এবং লবণাক্ত। অন্যান্য মসলাও তাতে দেওয়া আছে। আমি চিনি বা গুড় চাইলাম। সৈয়দ আলী নিয়ে এল গুড়ের ছোটো ছোটো চৌকোনা কিউব। গোয়া থেকে বাড়ি ফেরার সময় নিয়ে এসেছে। সে পরিযায়ী শ্রমিক। আবার চলে যাবে কাজের জায়গায়।

আলী জানালো তার বাবা শতবর্ষ উত্তীর্ণ—প্রায় চলচ্ছক্তিহীন। তাই সে বাবার কাছে যা শুনেছিল, তাই জানালো—

কমপক্ষে শ’দুয়েক বছর আগে একদা দিনাজপুর, এখনকার পশ্চিম দিনাজপুর জেলার গঙ্গারামপুর থানার কটকিহারি গ্রামে, তার ভাষ্য অনুযায়ী পশ্চিম দেশ থেকে ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য জিন্দাপীর সৈয়দ খোদাবক্স শাহ ফকির এসেছিলেন। এই গ্রামের মানুষ জন আগে থেকেই ‘সৈয়দ’ ও ‘শাহ ফকির’ তাঁদের নামের সঙ্গে লিখতেন কিনা তা আমরা জানি না। তবে, এই পাড়ার সকল বাসিন্দাই এখন এরকম লেখেন। যেমন, সৈয়দ জলিলুর রহমান শাহ ফকির, সৈয়দ মিজানুর রহমান শাহ ফকির। লেখকের নিজের ধারনা, সৈয়দ খোদাবক্স শাহ ফকির দীক্ষিত করে এখানকার বাসিন্দাদের ওই পদবী দান করেন।

যাহোক, সৈয়দ করম আলী শাহ ফকির নামে এক যুবক হলেন তাঁর ধর্মপুত্র। স্বাভাবিক ভাবেই শিক্ষা-সাধনা পীর সাহেবের কাছ থেকে তিনি ভালোই পেলেন।

পীরের একটা গুণ ছিল। তিনি ধনীলোকদের পছন্দ করতেন না। পাশের রায়পুর হাটখৈর জোতদার অধ্যুষিত গ্রাম। সেই গ্রামের জোতদাররা মাঝে মাঝে দীক্ষা নেবার জন্য তাঁর কাছে আসতেন। তিনি পাত্তা দিতেন না। ওরা বড়লোক, শান-শওকত আলাদা। একদিন দেখা করতে আসা ঐরকম একজনকে এক গেলাশ পানি (জল) দিতে বললেন। তিনি সেই আদেশ/অনুরোধ পালন করলেন না। ওই কর্তব্য পালন করলেন, করম আলী শাহ ফকির। পীর সাহেব বললেন, দেখলি তো ওদের দেমাক! ওদের এতে ভালো হবে না।

সৈয়দ আলী শাহ ফকির বললেন, সত্যিই তাই৷ রায়পুর হাটখৈরেরা হল অহংকারী। এখনও নিজেদের মধ্যে জমি-জায়গা–সম্পত্তি নিয়ে মালিমামলা লেগেই আছে।

এটা গ্রাম্য সামন্ত ধনীদের মধ্যে হতে বাধ্য। কিন্তু পীর সাহেবের কথাটা ফলছে—সৈয়দ আলী এই বিশ্বাস করেন।

একদিন পীর সাহেব (সৈয়দ খোদাবক্স শাহ ফকির) করম আলীকে বললেন, তোকে তো দীক্ষা দিলাম। এখন তুই নতুন জায়গায় যা। এই গঙ্গারামপুর থানারই ধলদিঘির দক্ষিণ পারে কয়েক ঘর মানুষ বাস করেন। পীর সৈয়দ করম আলী শাহ ফকির ওই গ্রামে এসে ঠাঁই নিলেন।

চিত্র ১-কটকিহারির পীরের প্রাচীন মাজার।

কটকিহারি থেকে ফিরে আসবার আগে, আমরা সৈয়দ আলীর পিতা কটকিহারির পীরের সেবাইতে বৃদ্ধ সৈয়দ মহম্মদ আলী শাহ ফকিরের সঙ্গে দেখা করতে ভেতর বাড়িতে এলাম। তিনি ঘরের মলিন বারান্দার বাইরে উঠানে একটা চটে পা’দুটি লম্বা করে মেলে বসে আস্তে আস্তে মুড়ি খাচ্ছেন। শীত কাল—সে সময়টায় ছিল ভয়ঙ্কর ঠাণ্ডা। গায়ে তেমন কিছু পোষাক নেই। পূবের সুর্যের দিকে মুখ করে তিনি বসেছিলেন। আমাদের সঙ্গে কথা বলতে পারলেন না। 

(দুই) দেবকোট পরগনার নারায়ণপুর গ্রাম ও মধ্যযুগের বাংলার ইতিহাসের এক খণ্ড অংশ

গঙ্গারামপুরের দেবকোট পরগনার নারায়ণপুর গ্রামে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি (১২০৪-১২০৫ সাধারণাব্দ) মালদহের নউদিয়া থেকে এসে কিছুদিন ঠাঁই করেন, তারপরে তিব্বতের দিকে অভিযান করেন। পথে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। ভিন্ন মতও আছে। তিনি বিশ্বাসঘাতক দ্বারা নিহত হন। তাকে নারায়নপুরে সমাধিস্ত করা হয়। পরে কী কারণে জানি না, তাকেও গ্রামের মানুষ ‘পীর’ হিসাবে মানেন। কালে দিনে এই জায়গাটার নাম হয় নারায়ণপুর পীরপাল। তিনি যে এখানে ছিলেন, তা মিনহাজের ‘তবাকাত-ই-নাসিরী’তে তা লিখিত আছে। তবাকাত-ই-নাসিরী-র সুত্র মতে ১২০৬ খ্রিস্টাব্দের ১৩ মার্চ বখতিয়ার দেবকোটে মৃত্যুবরণ করেছিলেন।

চিত্র ২-নারায়ণপুর পীরপালে ইখতিয়ার উদ্দিন বখতিয়ার খিলজির মাজার।

দেশভাগের অনেক আগে থেকে এ তল্লাটে অনেক মানুষ কর্মব্যপদেশে বা অন্য কারণে এখানে আসতেন৷ তাদের ইন্তেকাল হলে, এখানেই গোর দেওয়া হত। এই লেখকও আজ থেকে প্রায় ষাট বছর আগে কবরে ইংরেজি ফলক পড়েছিলেন। কবরগুলো, ফলকগুলো এমনকি কবরের প্রাচীরগুলো—দুষ্টু ছেলেরা ভেঙ্গে ফেলে দেয়। দেশি-বিদেশি পর্যটক বা কৌতুহলী কোনো গবেষক আসেন না আর। বাংলার ইতিহাস বিষয়ক বইতেও এখানকার কোনো ছবি কি আছে?

কালস্রোতে ভেসে যায় জীবন যৌবন ধন মান।

ধলদিঘি গ্রামের মানুষজন নিজেদের নামে সৈয়দ ও শাহ ফকির লেখেন। তাঁরা বেশিরভাগ পীর সৈয়দ করম আলী শাহ ফকিরের বংশধর। আজ থেকে অন্তত দুশো বছর আগে, করম আলী শাহ ফকির দিঘির দক্ষিণপাড়ে এক মেলা বসান।

কিংবদন্তি আছে, অতি প্রাচীন কালে এই অঞ্চলে ধল রাজার রাজত্ব ছিল। সেইসময় মৌলানা আতাউল্লা শাহ নামে একজন দরবেশ নানাস্থানে ভ্রমণ করে এখানে এসে হাজির হন। আতাউল্লা ধলদিঘির পাড়ে নিজের আস্তানা গড়েন। দিঘির পাড়ে আতাউল্লা শাহর মাজার আজও বিদ্যমান। পীর আতাউল্লা সাহেব, সৈয়দ খোদাবক্স শাহ ফকিরের কয়েক শতাব্দী আগে (সঠিক সময় জানতে পারলাম না) ইরান বা ইরাক থেকে এসেছিলেন এবং এখানে অনেক বছর ছিলেন।

অর্থাৎ সৈয়দ করম আলী শাহ আসবার আগেই এখানে পীর-দরবেশদের যাতায়াত ছিল।

চিত্র ৩-ধলদিঘির উত্তর পারের পীর আতাউল্লা সাহেবের মাজার এবং বাসস্থানের এক অংশ।

তার কবরস্থানের আশেপাশের অনেকটা জায়গা, ধলদিঘির বিস্তীর্ণ ঘাট, প্রাচীরের ধ্বংসাবশেষ দেখে তা সহজেই বোঝা যায়।

(তিন) পীর করম আলী শাহ ফকির

পীর করম আলী শাহ ফকির ছিলেন একজন সুফি সাধক। তিনি হিন্দু-মুসলমান উভয়ের জন্য সহজিয়া জীবন দর্শন প্রচারের জন্য রচনা করলেন পয়ার ছন্দে এক পুস্তক। ‘মারফত বিচার’। তাঁর জীবনাদর্শের নামও দিলেন ‘মারফত বিচার’। তাঁর বংশধর সৈয়দ হুরমত আলি শাহ ফকির এর রক্ষক ছিলেন। তিনি মারা যাবার পর ওই পুস্তকেরও কোনো হদিশ নেই।

আজ থেকে বহুদিন আগে, জেলা সংস্কৃতি অফিসার, সুলেখক অরুণ কুমার মজুমদার মহাশয়, ধলদিঘিতে এসে সৈয়দ হুরমত আলি শাহ ফকিরের সঙ্গে আলাপ করে হাতেলেখা বইটির হদিশ পান। কিন্তু তিনি বইটি দিতে নারাজ হন। বইটি নেড়েচেড়ে কয়েকটা লাইন অরুণবাবু লিখে নেন। তাঁর নিবন্ধ পড়ে দু’টো লাইন আমরা জেনেছি। সেই দুটি লাইন—

‘আল্লাজীর দুই জাইত (জাতি) হিন্দু মুসলমান/ দুই জাইতের (জাতির) দুই দলিল কোরাণ আর পুরাণ’।  

পীর করম আলী শাহ ফকিরের শিষ্য উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যেই ছিল—হিন্দুদের মধ্যে, মুসলমানের মধ্যে। তিনি গঙ্গারামপুর থানার নীলডাঙ্গায় কান্ত গোঁসাই নামে এক শিষ্যের বাড়িতে মারা যান। ওই গ্রামের হিন্দু শিষ্যরা খোল-মন্দিরা বাজাতে বাজাতে মৃতদেহ তাঁর ধলদিঘির আবাস স্থলে নিয়ে এলে, তাঁর দেহকে সেখানে সমাধিস্ত করা হয়।

আমরা মুহম্মদ শহীদুল্লাহ-এর ‘আমাদের ভাষা সমস্যা’ নিবন্ধ পড়ে জেনেছি, আনোয়ারী, ফেরদৌসী, সাদী, হাফিজ, নিযামী, জামী, সানাই, রুমি প্রমুখ কবি ও সাধক অমর সাহিত্য কীর্তি রেখে গিয়েছেন ইরানে। মূলত ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি-র বাংলায় আসবার পর থেকে, তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণকারী পীর আউলিয়া সুফি সাধকরা আসতে থাকেন পারস্য বা ইরান থেকে। বৃহত্তর বাংলা জুড়ে নানা পীরের মাজারে মাটির ঘোড়া দেওয়া হয়; ওই পীর আউলিয়া, সুফি সাধকরা এদেশে আসতেন ঘোড়ায় চড়ে। তারই কোনো ধারা একদা আসে উল্লিখিত কটকিহারি গ্রামে।

হিন্দু-মুসলমান উভয় কবিদের মধ্যেই মিলনের বার্তা পাওয়া যায়; প্রসঙ্গত বলা যায় কালীপ্রসন্ন বিদ্যারত্নের কথা (ইং -১৮৪০-১৮৭১)। তাঁর লেখা সত্য নারায়ণ পাঁচালিতে দেখতে পাই,

‘যেই রাম সেই রহিম নাম একই হয়/ ত্রিলোকে নাহিক দুই জানিবে নিশ্চয়।।’

অন্যান্য পাঁচালিকারদের মধ্যেও এই মনোভাব বিরাজ করতে দেখেছি। সত্যপীরের গানে শুনেছি; গায়ক গাইছেন,

হিন্দুর নারায়ণ তুমি/ মুসলমানের পীর/ দুই কড়া সিরনি দিব/ করিও জাহির। 

এখানে বলার গ্রামীণ হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের যারা খেটে খায়, যারা অর্থনৈতিক ভাবে নিম্নবর্গীয় তাদের মধ্যে একাত্মতা থাকে বেশি। সহজ সাবলিল মিলিত জীবন চর্য্যার মূল্যবোধ নিয়ে তারা চলেন। 

বর্তমানে প্রদর্শনবাদী ‘ধর্ম’এর দৌরাত্মে তা অনেকটা ম্লান হলেও একেবারে শেষ হয়নি। 

(চার) পীর করম আলী শাহ ফকিরের মেলা

ধলদিঘি মেলা পীর করম আলী শাহ ফকির প্রতিষ্ঠা করেন ১৮৫৩-১৮৫৪ সাধারণাব্দে। এরকম বিশাল একটা মেলার বিলুপ্তি ঘটে ১৯৮২ অর্থাৎ ১৩৭৫ বংগাব্দ নাগাদ। মনে মনে অনেকেই বেদনা অনুভব করি।

পীর করম আলী শাহ ফকিরের পুত্রগণ ও বংশধররা মেলা চালিয়ে যান। কালেদিনে ধলদিঘি মেলা বিভাগপুর্ব বাংলার সর্ববৃহৎ মেলায় পরিণত হয়। ওদিকে পূর্ব-দক্ষিণের (পুরাতন) গঙ্গারামপুর, এদিকে পশ্চিম-দক্ষিনের গঙ্গারামপুর হাইস্কুলের উল্টো দিকে পদ্মপুকুরের পূর্ব পার পর্যন্ত। পাঁচ কিলোমিটারের মতো লম্বায়, প্রস্থও কম নয়। আমি দেশ বিভাগোত্তর মেলা দেখেছি টানা ২৪ বছর। তখনও আড়ে-বহরে এই মেলার বিশালত্ব ও রকমারিত্ব কম ছিল না। 

ধলদিঘি মেলার আগের দিন প্রতি বছর ২৪ মাঘ কটকিহারিতে ‘ডগা পূজা’ হত পীরের উদ্দেশ্যে। পীর সৈয়দ খোদাবক্স শাহ ফকিরের মাজার বা স্মৃতিসৌধ, যা এখন ভেঙে ভেঙে ক্ষীয়মান, তার পেছনে, পরে নির্মিত দুটি ঘর, তার সামনে বকুল গাছ। সেই বকুল গাছের সামনে ওই অনুষ্ঠান হয়। সেদিন বিভিন্ন গ্রামের যাদের মানসিক করা ছিল, তারা শিরনি দেন। গুগলে মেলা অঞ্চলের নাম হয়েছে ছিন্নি মেলা। তারা খাসি, মুরগি, খুড়মা, চাল, তেল, মসলাপাতি ইত্যাদি নিয়ে আসেন। পোলাও মাংস রান্না হয়। বেলা একটার দিকে সবাই বসে মোনাজাত বা প্রার্থনা করেন। তারপর খেয়ে দেয়ে বাড়ি যান।

এই ‘ডগা পূজা’তেও হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য সাধনার বার্তা পাওয়া যায়। সেদিন হাজার হাজার মানুষ মনস্কামনা পূরণের আশা নিয়ে আসতেন। হাজারো মানুষের বিরাট আয়োজন। বিরাট বিরাট ডেগ বা দেগে পোলাও রান্না হত। পীরের উদ্দেশ্যে সমর্পণ করে সবাই তার প্রসাদ পেত। হুড়োহুড়িতে কারও হাত পুড়ে যেত, কিঞ্চিত ধাক্কাধাক্কি বা তার থেকে একটু বেশি ঘটনাও ঘটত। হিন্দু–মুসলমান উভয় সম্প্রাদায়ের মানুষ পীরের উদ্দেশ্যে তাঁর মাজারের সামনে পোলাও মাংস ছাড়াও ভাণ্ডারা দিতেন পোড়া মাটির ঘোড়া, মোমবাতি, ধুপকাঠি, বাতাসা, মুরকি, গজা, খুরমা, নিমকি, মণ্ডা, সন্দেশ।

আনুষ্ঠানিক মেলা বন্ধ হয়ে গেলেও এখনও অনেকে দিয়ে থাকেন। মেলা উঠে গেলেও এখনও ২৫ মাঘ পুরুষ-নারী-সন্তানাদি সবাই গ্রাম-গ্রামান্তর থেকে পরিবার নিয়ে মেলায় আসেন। মেলা মাঠের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে এখানে ওখানে রান্না হয় পোলাও-মুরগির মাংস। দিনের একটা সময় সুঘ্রাণে সারা চরাচর ম ম করতে থাকে। মাজারে তার ভোগ দিয়ে সবাই বনভোজনের মতো আনন্দ করে খায়।

মাজারের প্রাচীর ঘেঁসে দক্ষিন দিকে পোড়া মাটির ঘোড়া, মোমবাতি, ধুপকাঠি, বাতাসা, মুরকি, গজা, খুরমা, নিমকি, মণ্ডা, সন্দেশের দোকান এখনও বসে। আগে যেমন মূলত হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ ভাণ্ডারা দিতেন, এখনও দিয়ে থাকেন। উল্লিখিত বাতাসা ইত্যাদির দোকান দেশ বিভাগপুর্ব কাল থেকে বসিয়ে আসছেন এখনকার বাংলাদেশের দিনাজপুর জেলা অন্তর্গত বিরল গ্রামের মোদকরা। আমি কয়েক বছর আগে গিয়েও দেখেছি, মোদক বংশের অধস্তন পুরুষ কানাই লাল মোদককে দোকান দিতে। তাঁরা বিরল থেকে এপার বাংলার অধুনা দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বংশিহারী থানার শিহলে বাস উঠিয়ে এনেছিলেন। দু’বছর আগে গিয়ে দেখি ওঁর জামাই সঞ্জিত কুণ্ডু দোকান দিয়েছে।

আগে এ মেলা হিন্দু-মুসলুমান সবার মেলা ছিল, মেলা ভেঙে যাবার পরেও তেমনই আছে।

(পাঁচ) বর্তমানে করম আলী শাহ ফকিরের মাজার

সৈয়দ করম আলী শাহ ফকির মারা যাবার পর তাঁর সমাধি স্থলটিকে বাঁধানো হয়। চারিদিকে গড়ে ওঠে সুরম্য প্রাচীর ঘেরা একটা ঘর। সামনের কিছুটা খোলা জায়গা অপেক্ষাকৃত ছোটো প্রাচীর দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়।

চিত্র ৪- আঞ্চলিক মানচিত্র।

আমরাও দেখেছি, মেলার দিনগুলোতে, তাঁর শিষ্য কান্ত গোঁসাইয়ের বংশধরদের হিন্দু শিষ্যরা একটা দালান ঘরে এসে থাকতেন। কীর্তানাদি চলতো মেলার মাস দেড়েক ধরে। প্রতিদিনই কোনো না কোনো গ্রামের শিষ্যরা আসতেন। কান্ত গোঁসাই ছাড়াও, মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে পীর করম আলী শাহ ফকিরের যে শিষ্যরা ছিলেন, তাঁদের বেশিরভাগ বংশধরেরা এখন বাংলাদেশের দিনাজপুরের বিভিন্ন জায়গায় বাস করেন।

কান্ত গোঁসাই নীলডাঙ্গা থেকে নারায়ণপুরে চলে যান। তাঁর বংশধররা এখন নারায়ণপুর গ্রামে থাকেন। আর নীলডাঙ্গায় আসেন পূর্ববঙ্গ থেকে কয়েক ঘর মানুষ। তাঁরাও পীর সৈয়দ করম আলী শাহ ফকিরের স্মরণে প্রতিদিন তাঁর ভিটায় প্রদীপ জ্বালান।

আমরা ছোটোবেলায় যে পলেস্তেরা না দেওয়া সম্মুখ-খোলা ইটের ঘরটায় হিন্দু সম্প্রদায়ের শিষ্যদের থাকতে ও কীর্তন গাইতে দেখতে পেতাম, এখন সেটা মাটির শক্ত দেওয়ালের মজবুত ও সুন্দর ঘরে রূপান্তরিত হয়েছে।

বছর দুয়েক আগে ২৭ মাঘ যখন গেলাম, দেখি সেই ঘরের সামনে পীরের মাজারের প্রাচীরের দক্ষিণ ঢালুতে মাছের তরকারি রান্না হচ্ছে। আর ঘরের সামনে কয়েকজন রাজবংশী নারী। কয়েকজন পুরুষ। কুশমণ্ডির আমিনপুর বটতলি থেকে তাঁরা এসেছেন। কৃষ্ণ গোঁসাইয়ের শিষ্যের পরম্পরা। ঘরের ভেতরে গিয়ে দেখি সেখানে সর্বেশ্বর রায় বসে আছেন, আশেপাশে আরও কয়েকজন নারী-পুরুষ। তাঁরা নারায়ণপুর গ্রামের। সর্বেশ্বর রায় কান্ত গোঁসাইয়ের বংশধর এখনও গোঁসাইগিরি করেন। নারায়ণপুর ও আমিনপুর মিলে ২০ জন মতো এখানে আগেরদিন এসেছেন, ভাণ্ডারা দিয়েছেন। সেদিন বিকালে চলে যাবেন। এঁরা এসেছেন, কান্ত গোঁসাইয়ের বংশধরের শিষ্য হিসাবে, কান্ত গোঁসাইয়ের গুরু অর্থাৎ পরমগুরু পীর সৈয়দ করম আলী শাহ ফকিরের কাছে।

এখনও এ পাড়ার পীর সৈয়দ করম আলী শাহ ফকিরের বর্তমান বংশধরদের বাড়িতে সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত একবেলা নিরামিষ রান্না হয়। তার মধ্যেই মাংস পোলাও রান্না হয়। তা সিন্নি হিসাবে পীর করমালি শাহ ফকিরের উদ্দেশ্যে নিবেদন করার পর, সন্ধায় তাঁরা সেই খাবার খান।

(ছয়) কেন মেলা আর বসে না

না, মেলা আর বসে না ১৯৮২ সাল থেকে। কিন্তু আগেই বলেছি, সেই দিনটায়, ২৫ মাঘ, যেদিন মেলা বসতো সেদিন এখনও ডগা পূজার মাধ্যমে, হাজার হাজার মানুষের মিলন হয়। 

মেলা ভেঙে যাওয়ার কারণ কী! মেলার প্রয়োজনীয়তা ধীরে ধীরে কমছিল। মেলায় যা পাওয়া যায়, বাজারে নিত‍্যদিন তাই পাওয়া যেতে লাগল। কয়েক দশক আগে থেকে ওই রকম মেলার প্রয়োজনীয়তা আর রইল না। তাই দেখবেন, এখন কোথাও আর ধ্রুপদী মেলা হয় না। এই মেলা উঠে যাবার পেছনে আরও একটা অনুঘটক ছিল, গঙ্গারামপুর শহরের কয়েকজন বড় দোকানদার বাদ সাধল, এমনকী মেলায় আগমনেচ্ছু সার্কাসের দলকে ভয় দেখাল। এটাও ধলদিঘি মেলা উঠে যাবার অন্যতম কারণ।

(সাত) শেষের কথা

সুফি সাধকরা সাধারণত রাষ্ট্র ও শাসকদের প্রতি আচরণে শাসকশ্রেণী থেকে দূরত্ব বজায় রাখতেন। এর মূল কারণ হল তারা জনসাধারণ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চাননি। অনেক সময় তারা সুলতানের অন্যায় কাজে হস্তক্ষেপ করেছেন। এর জন্য শাস্তিও তারা পেয়েছেন, কিন্ত নিজেদের পথ ও মত থেকে তারা অধিকাংশ সময়েই সরে আসেননি। এইসব কারণে মুসলিম শাসকদের চেয়ে পীর, ফকির ও দরবেশদের প্রতি দিনাজপুর জেলার সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালবাসা ছিল; আজও তা কিছুটা রয়ে গেছে।

মুকুন্দরাম ও বিজয়গুপ্তের লেখা থেকে জানা যায়, সুলতানি আমলে সুফিরা স্থানীয় মানুষের কাছে পীর অর্থাৎ আধ্যাত্মিক গুরু হিসাবে পরিচিত ছিলেন। হিন্দু অবতারবাদের সঙ্গে পীরবাদের বিস্তর মিল রয়েছে। দিনাজপুর জেলায় কেবলমাত্র ধর্মমত ছাড়া লোকাচার এবং সংস্কৃতির ক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে পার্থক্য তুলনায় কম। এখানকার বিভিন্ন পার্বণ, উৎসব, আতিথেয়তা ও লোকাচারে একটা সমন্বয়ের ছাপ দেখা যায়।

এই নিবন্ধ ক্ষেত্র সমীক্ষার ভিত্তিতে লিখিত, সবে সামান্য সূত্র যুক্ত করা হয়েছে নিচের গ্রন্থ দুটি থেকে।

  • উৎপল চক্রবর্তী, বিলুপ্ত রাজধানী, অমর ভারতী, ১৯৯০।
  • ধনঞ্জয় রায়, দিনাজপুর জেলার ইতিহাস, কে পি বাগচী এন্ড কোম্পানি।
লেখক প্রগতির পক্ষে এক পথিক, জীবনের সঙ্গে সংপৃক্ত থাকতে তিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার পুরাকৃর্তিগুলির বিষয়ে তিনি আগ্রহী অন্বেষক।

মন্তব্য তালিকা - “আল্লাজীর দুই জাইত”

  1. ‌বেশ লাগ‌লো পড়‌তে। বৃহৎ ভার‌তে হিন্দু মু‌স‌লিম দুই জা‌তের মিল‌নের একটা উপলক্ষ ছিল পীর প্রথা। মেলা বন্ধ হ‌য়ে যাওয়ার কার‌লে সম্প‌র্কেও টান পড়‌ছে। এই ইতিহাস বি‌জে‌পির পাঠ করা উচিৎ। লেখক‌কে অসংখ‌্য ধন‌্যবাদ।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।