সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

সম্পাদকীয়

অক্টোবর ৪, ২০২৬

ভারতের ইতিহাস

দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের বিদ্যাচর্চার মাধ্যমে ইতিহাস সম্পর্কে নানা রকম বোধ এবং উপলব্ধি সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। ইতিহাসের প্রতিষ্ঠিত ধারণাগুলো মাঝে মধ্যে পরবর্তীকালে ভুল প্রমাণিত হয়েছে, নতুন ধারণা এসেছে, আবার কালক্রমে হয়তো সেই ধারণাও পরিত্যক্ত হয়েছে। এর সহজবোধ্য কারণ রয়েছে। প্রথমত, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নানা নতুন তথ্য উদঘাটিত হয়। দ্বিতীয়ত, পুরানো তথ্যকে নতুন করে বিশ্লেষণের হাতিয়ার আমাদের আয়ত্তাধীন হয়।

কিছুদিন আগেও আমরা সম্যকভাবে জানতাম না এই বহু পুরাতন দেশের প্রাচীন ইতিহাস। মাত্র দু’শ বছর আগেও প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের উপাদান খুঁজে পাওয়া ছিল কষ্টকর। তখন প্রাচীন ভারত সম্পর্কে জানবার প্রধান উপাদান ছিল উত্তর ভারতের কিছু বৌদ্ধ স্থাপত্য, দক্ষিণ ভারতের মন্দির, বৈদিক ও বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ, সাহিত্য, পুরাণ এবং বৈদেশিক পর্যটকদের কিছু বিবরণ। ঊনবিংশ শতকে যখন অশোকের শিলালেখ ও স্তম্ভলেখগুলি একে একে আবিষ্কৃত হল এবং তার গায়ে ব্রাহ্মী লিপিতে লিখিত লেখগুলির পাঠোদ্ধার করা গেল, তখন ভারতবর্ষের ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায় সম্পর্কে সকলে অবহিত হলেন।

তখন ভারতীয় ইতিহাস চর্চায় জোর দেওয়া হতে থাকে বৈদিক যুগ ও তার পরবর্তী মৌর্য বংশের সময়কালে। তার আগে ছিলাম আদিম। আসলে তার আগের ভারতবর্ষ সম্পর্কে কোনো ধারণা তখন ইতিহাসবিদ ও বিদ্বানদের মধ্যেও ছিল না। তারপরে ১৯২০ সাল থেকে প্রত্নতাত্ত্বিকদের প্রবল অধ্যবসায়ে বর্তমান পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে খননের ফলে প্রাচীন হরপ্পীয় সভ্যতার মূল প্রত্নস্থলগুলি আবিষ্কৃত হয়। ভারতবর্ষের ইতিহাসের মাইলস্টোন এক ধাক্কায় অনেকটা পিছিয়ে যায়। এই উপমহাদেশের ইতিহাস শুরু হয়ে যায় ব্রোঞ্জ যুগ থেকে। তৎকালীন পৃথিবীর অন্যতম প্রথম নগরসভ্যতা তৈরি হয়েছে সিন্ধু নদের তীরে। অবশ্য পরবর্তীকালে প্রত্নতাত্ত্বিকদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় বোঝা গেছে যে, ওই সভ্যতা শুধু সিন্ধু নদের তীরে নয়, ছড়িয়ে গিয়েছিল সারা উত্তর ও পশ্চিম ভারতে।

পুরাতাত্ত্বিক নতুন পদ্ধতি ও প্রকরণের ব্যবহার ইতিহাস ও প্রাগিতিহাস সম্পর্কে আমাদের পুরাতন ধারণাকে প্রশ্নায়িত করে ও নতুন ধারণাকে প্রত্যায়িত করে।

এছাড়াও ইতিহাস রচনা ও ইতিহাস ব্যাখ্যাতে ব্যাখ্যাকারের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির ছাপ পড়ে। রচয়িতার ব্যক্তিত্ব একই ইতিহাসকে অন্যভাবে দেখতে সাহায্য করে।

এই জন্যই ইতিহাস চর্চাতে লেখকের সামাজিক অবস্থান, তাঁর রচনার সময়কাল ও প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। তবে গ্রহণযোগ্য, বুদ্ধিগ্রাহ্য তথ্য ছাড়া এবং তার সত্যনিষ্ঠ ব্যাখ্যা ছাড়া, কোনো ইতিহাসবিদই খুব বেশিদূর অগ্রসর হতে পারেন না। শুধুমাত্র বিশ্বাসের ভিত্তিতে ইতিহাস লেখা চলে না। বিশেষ করে যখন সেই বিশ্বাসীর তত্ত্ব প্রমাণিত সত্যের বিরোধিতা করে, তখন সেই বিশ্বাস হয়ে ওঠে অন্ধবিশ্বাস। অন্ধবিশ্বাস থেকে ইতিহাস লিখতে চেষ্টা করলে তা বেশিদিন ধোপেও টেকে না।

বহু মানুষের পরিশ্রমে ইতিহাসের জ্ঞানভাণ্ডার গড়ে ওঠে, এই কাজ কোনো একজনের দ্বারা, কোনো একদিনে হয় না। এই অর্জিত, গ্রাহ্য, যুক্তিযুক্ত ও নথিবদ্ধ জ্ঞানভাণ্ডারকে যথাযথ বিচার-বিশ্লেষণ ব্যতিরেকে অগ্রাহ্য করার কাজটি সৎ ঐতিহাসিকের কুললক্ষণ নয়। শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গির জন্য ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক থাকবে। আবার এই বিতর্কমূলক বিষয়গুলো নিয়ে তথ্য ও যুক্তির সাহায্যে নিজের মতামত প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্ব ইতিহাসবিদদেরই নিতে হবে। বিভিন্ন ধারার জ্ঞানের আদানপ্রদান, প্রশ্ন-প্রতিপ্রশ্ন ইতিহাসের কোনো বিশেষ উপস্থাপনাকে গ্রহণযোগ্য করে তোলে। এই কথাগুলো মনে রেখে আমরা ভারতের ইতিহাস নিয়ে আমাদের স্থানটি নির্ণয় করার চেষ্টা করব।

আজকে অবশ্য বিজ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত গবেষকরাও ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেন, তথ্য দিয়ে নানা বিতর্কের নিষ্পত্তির চেষ্টা করেন। নিষ্পত্তি করার এই পদ্ধতি প্রচেষ্টা একটা নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তাই আজকে ইতিহাসবিদ, প্রত্নতাত্ত্বিক ও নৃতত্ববিদরা প্রত্নস্থলে থাকেন, আবার গবেষণাগারেও পাওয়া যায় আরেকদল বিজ্ঞানী-ইতিহাসবিদদের। বাস্তবিকই এখন আর শুধুমাত্র সাবেকি ধ্যানধারণা ও প্রকৌশলের ওপরে নির্ভর করে ইতিহাস লেখা যায় না। বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে প্রত্নতত্ত্ববিদ্যা, নৃতত্ত্ববিদ্যা, তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ববিদ্যা ইত্যাদি ছাড়াও আধুনিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা যেমন জিনতত্ত্ববিদ্যা, প্রত্ন-জিনতত্ত্ববিদ্যা, ভূতত্ত্ববিদ্যা ইত্যাদির সাহায্যে প্রাচীন ইতিহাস নতুন করে লেখা হচ্ছে।

জিনতত্ত্ববিদ্যার সাহায্যে প্রচুর পরিমাণে নতুন তথ্য সংগ্রহ করা যায়। সেই আহৃত তথ্য ইতিহাস ও প্রাগিতিহাস চর্চার বোধকে সাম্প্রতিককালে পাল্টে দিয়েছে। কারণ এই বিদ্যা শুধু যে বিজ্ঞানসম্মত তাই নয়, এখানে প্রথামাফিক যুক্তিনির্ভর অনুমানের থেকে বেশি গুরুত্ব পায় বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্যের সাহায্যে সিদ্ধান্ত। তাই ইতিহাসবিদরাও আজ জিনবিদদের দেওয়া তথ্যকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ইতিহাস লিখছেন।

এক সময়ে ভারতবর্ষে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর আগমন, তার সময়কাল ও মিশ্রণ নিয়ে নানা বিতর্ক হয়েছে, তারপরে জিনতত্ত্ববিদ্যার সাহায্যে টাটকা তথ্য পাওয়ার পরে এই অঞ্চলে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী গঠন নিয়ে বিতর্কের অবসান হবার আশা অনেকে করেছেন। এখন ভারত সহ সারা পৃথিবীর জিনতত্ত্ববিদ ও ইতিহাসবিদ মহলের গরিষ্ঠ অংশ ভারতীয় উপমহাদেশের বাইরে থেকে এই অঞ্চলে নানা সময়ে একাধিকবার অন্য অঞ্চলের মানবগোষ্ঠীর আগমন ও ভারতীয় নানা জাতি গোষ্ঠী গঠনের মূল রূপরেখার সঙ্গে সহমত পোষণ করেন।

আগে ইতিহাসের যুক্তিকে তাচ্ছিল্য করে, এড়িয়ে গিয়ে নিজের অন্ধবিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে একটা অংশের মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেওয়া যেত। কিন্তু যতই বিজ্ঞান ইতিহাসচর্চার অংশ হয়ে যাচ্ছে, ততই বিজ্ঞানের তথ্যকে ঠেলে দূরে সরিয়ে দেওয়া কঠিন হয়ে গেছে।

‘হাত দিয়ে বলো সূর্যের আলো রুধিতে পারে কি কেউ?’

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।