সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

মদনাবতীতে বাংলাভাষা প্রেমী উইলিয়াম কেরী

মদনাবতীতে বাংলাভাষা প্রেমী উইলিয়াম কেরী

মানবেশ চৌধুরী

আগস্ট ১৬, ২০২৫ ৩১৫ 0

১৭৬১ সালে বিলেতে উইলিয়াম কেরীর জন্ম। ১৭৯৩ সালে এদেশে এসে থেকে গেলেন, আর বিলেতমুখো হলেন না। এই দেশেই তাঁর জীবনাবসান হল ১৮৩৪ সালে। ৪১ বছর ধরে একনাগাড়ে এই দেশে থেকে গেছেন তা কী দেশটাকে না ভালবাসলে সম্ভব হত!

(১)

তিনি অনেক জায়গায় ঘুরেফিরে, তারপর মদনাবতী মেঘডম্বুর দিঘির পাড়ে এসে থিতু হন ১৭৯৪-র প্রথম দিকে। টমাস নামে একজন জাহাজের ডাক্তার আগেই এসে এসব এলাকা ঘুরে গিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে কেরী প্রথমে নামলেন কলকাতার জাহাজ ঘাটায়। তারপর হুগলীর ব্যাণ্ডেল, তারপর নদীয়ার নবদ্বীপে। নবদ্বীপে এসে খুব লাভ হল; কারণ এই জায়গাটা তখনও সাহিত্য-সংস্কৃতির পীঠস্থান—সংস্কৃত আর বাংলা, উভয় ভাষার।

সেখানকার বুধমণ্ডলীর অনেকে তাঁকে সেখানেই থেকে যেতে বলছিলেন। কিন্তু কিছু অসুবিধা হওয়ায়, নবদ্বীপ থেকে আবার কলকাতায় ফিরে এলেন। নীলু দত্ত নামে এক ব্যক্তির সহৃদয়তায় কলকাতার মানিকতলার বাগান বাড়িতে কিছুদিন, তারপর সুন্দরবন অঞ্চলের দেবহট্টায় থাকলেন। এই অঞ্চলে কেন! আসলে তাঁর সঙ্গী মুনশি রামরাম বসুর কাকার বাড়ি এখানে। কেরীর হাতে তখনও কিছু টাকা-কড়ি আছে। এখানে কিছু জমিজিরেত কিনলেন। কিন্তু ভালো লাগল না জায়গাটা; আবহাওয়াও খারাপ। এদিকে টমাস সেই যে কলকাতা পর্যন্ত এসেছিলেন, তারপরেও কিছুদিন কেরীর সঙ্গেই ছিলেন। কেরী বাংলা শিখছিলেন টমাসের কাছে জাহাজে, আর টমাস হিব্রু শিখছিলেন কেরীর কাছে। পাঁচ মাস জাহাজ-যাত্রার সময়ে এভাবে তাঁরা সময়গুলোকে কাজে লাগিয়েছিলেন।

(২)

কলকতায় আসার পরেও কেরীর মন জুড়ে ভাষাশিক্ষার আকাঙ্ক্ষা। তবে সংসারে তো আরও অনেকে আছেন। স্ত্রী ডরোথি আছেন, আছেন শ্যালিকা ক্যাথেরিন, আছে চার ছেলে—ফেলিক্স, উইলিয়াম, পিটার আর জ্যাবেজ। জ্যাবেজ তো তখন একেবারে সদ্যোজাত শিশু। কলকাতাতে সংসার দেখেছেন কে! টমাস সেই প্রাথমিক কাজটা পালন করেছিলেন।

কলকাতায় নেমে, টমাসের আগে থেকে পরিচিত ও বাংলাভাষা শিক্ষার গুরু, মুনশি রামরাম বসু নতুন আগত কেরী পরিবারকে সঙ্গ দিতে শুরু করেছেন। উইলিয়াম কেরী বিলেতে থাকতে খুব পড়াশুনা করতেন। কলম্বাসের অজনা বিদেশ আবিষ্কারের ঘটনার বিবরণ তাঁকে টানতো। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল খ্রিস্টধর্ম প্রচারের আকাঙ্খা। সাহসী ছিলেন—অচেনা অজানা দেশের উদ্দেশ্যে মাত্র ৩২ বৎসর বয়সে সপরিবারে পাড়ি জমিয়েছেন! কিন্তু তবুও বলব, এই মুনশি না থাকলে তাঁরা কোন অকূলে ভাসতেন, তা চিন্তা করলেও ভয় হয়!

যাইহোক, আবার একটু আগের কথায় ফিরে যাই। টমাস সেই ১৭৮৩ সালে এসেছেন এ দেশে। ডাক্তারি ছেড়ে পাদরির দায়িত্ব সামলেছেন। বাংলা শিখেছেন; বাংলায় ভাষণও দিতে পারতেন। রামরাম বসুর সহায়তা তিনি পুরোমাত্রায় বাংলাভাষা এবং বাংলাদেশের ভূগোল শিখে নিয়েছিলেন। দিনাজপুরের মহিপালের নীলকুঠির মালিক ‘জর্জ উডনি’-র সঙ্গে তাঁর আগের থেকেই পরিচয় ছিল। সেই পরিচয়ের সূত্রে তিনি মহিপালে ম্যানেজারের কাজ জুটিয়ে নিলেন। বন্ধু কেরীর সমস্যা তিনি ভালোই জানেন। স্ত্রী কিছুটা অপ্রকৃতিস্থ হয়ে গিয়েছেন। দেবহট্টায় জমি কিনে টাকাও ফুরিয়ে এসেছে। কেরীর অবস্থা তখন প্রায় ‘ভোজনং যত্রতত্র শয়নং হট্টমন্দিরে’। এত কষ্টের মধ্যেও বাংলা ভাষা শিখে যাচ্ছেন। নিজের শেখার সুবিধার জন্য বাংলা শব্দকোষ ও বাংলা ব্যকরণ তৈরি করে নিয়েছেন।

ভাবলে অবাক হতে হয়!

টমাস কিন্তু নিজেরটাই শুধু ভাবেননি। উডনি-কে আবেদন করলেন, কেরীরও কাজের সংস্থান করে দেবার জন্য। কাজের জোগাড় হলে, মুনশি রামরাম বসুকে সঙ্গে নিয়ে উইলিয়াম কেরী সপরিবারে নৌকা যোগে ইছামতী, জলঙ্গী, গঙ্গা, পদ্মা ও মহানন্দা হয়ে টাঙ্গন নদীর পুব ধারে মদনাবতীতে এলেন। এটি ছিল উডনি-র অপর নীলকুঠি। এলেন ম্যানেজারের পদ নিয়ে, তবে এই কাজের সঙ্গে মূল কাজ ধর্মপ্রচারকের।

(৩)

উইলিয়াম কেরী কিন্তু শিকড়ছিন্ন কোনো মানুষ নয়। বিলেতে তাঁর বাবা ছিলেন তাঁতি। পরে হলেন শিক্ষক। এই যে শিক্ষকের ছেলে হিসাবে কেরী উন্নিত হলেন—এটা তাঁর উন্নত মানস গঠনে সহায়তা করেছিল। শিক্ষকের সন্তান, কিন্তু গরিব। জীবিকার জন্য বেচারাকে ১২ বৎসর বয়সেই কৃষি কাজে হাত লাগাতে হয়েছিল। আর প্রায় ৬ বৎসর ধরে তাঁকে নিযুক্ত হতে হয়েছিল জুতো সেলাইয়ের কাজে। জুতো সেলাইয়ের কাজ যেখানে করতেন, সেখানে ছিল অনেক বইপত্র। কাজের ফাঁকে ফাঁকে তিনি ল্যাটিন, হিব্রু, গ্রিক শিখে নিলেন। যত ভাষা শেখা যাবে, তত জ্ঞানের ভাণ্ডার বাড়বে—এ তো জানা কথা। তাই অল্প বয়সেই তাঁর জ্ঞানভাণ্ডার বেশ বৃদ্ধি পেল। ভাষা শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে খ্রিস্টান ধর্ম বিষয়ক জ্ঞানও হতে থাকল। কিন্তু সঙ্গদোষে চরিত্রে কিছু গোলমাল দেখা দিল !

তবে দুনিয়ায় ভালো মানুষের সংখ্যা বেশী। এক ভালো বন্ধুর সহায়তায় সেই দোষ কেটেও গেল। ওদিকে টমাসও, এই দেশ প্রথমবার ঘুরে গিয়ে তখন বিলেতে। তিনি টাকা তুলছেন; আবার ধর্ম প্রচারে বাংলায় আসবেন। কীভাবে যেন কেরীর কানে তাঁর কথাটা গিয়েছে। কেরী তখন পুরোমাত্রায় ধর্ম নিয়ে ভাবনা করছেন। বাংলায় আসবেন মনস্থির করে নিয়েছেন। ধর্ম সমিতিতে সিদ্ধান্ত হল, টমাসের সঙ্গে এ দেশে তিনি আসবেন। সেই অনুযায়ী তাঁর অকূল দরিয়ায় ভাসা এবং এক সময় তখনকার দিনাজপুর জেলার বংশীহারী থানার, অধুনা মালদা জেলার বামনগোলা থানার এই মদনাবতীতে আগমন। মদনাবতী যে গ্রামে অবস্থিত, সেই গ্রাম পঞ্চায়েতের নামও মদনাবতী।

(৪)

বিলেতে থাকতেই কেরীর নতুন নতুন ভাষা শিক্ষার দক্ষতা দেখেছি। যে পাঠ শুরু হয়েছিল জাহাজে টমাসের কাছে, সে পাঠ এগোচ্ছে মদনাবতীতে মুনশি রামরাম বসুর সান্নিধ্যে। পাদরির কাজ করতে যাচ্ছেন গ্রামে গ্রামান্তরে। পরিচয় হচ্ছে মানুষের সঙ্গে। ফলে বাংলাভাষা শিক্ষা সহজতর হচ্ছে। ধর্ম পুস্তকের অনুবাদ কাজ শুরু করেছেন। মুনশি রামরাম বসু আবার তাঁর লেখা ঠিকঠাক করে দিচ্ছেন, ‘Which Moonshee afterwards corrects’; কেরীর ডায়েরিতে লেখা আছে ।

১৭৯৪-র জুন মাসে এসেছেন মদনাবতীতে। ৬ মাস যেতে না যেতেই একটা ছাপাখানা করার ইচ্ছা হল তাঁর। তার জন্য বিলেত থেকে বাংলা হরফ করিয়ে আনতে চাইলেন। ১৭৯৫- র ৬ জানুয়ারি দিচ্ছেন বাংলা হরফের জন্য চিঠি, তার পর দিনই চিঠি দিচ্ছেন ছাপার মেশিনের জন্য। ঐ ’৯৫ সালেই তাঁকে শব্দকোষ আর মহাভারত নিয়ে চর্চা করতে দেখছি ।

এ দিকে একটা খারাপ ঘটনা ঘটল। মুনশি রামরাম বসু এমন একটা আচরণ করলেন যে, তাঁকে কেরী বিদায় দিতে বাধ্য হলেন। সজনীকান্ত দাসের ভাষায়, ‘সব কাজ একসঙ্গে বন্ধ হইয়া গেল’। কিন্তু ঐ যে জানি, ভালো মানুষের সংখ্যা আজও বেশি! তাই যেন ‘জন ফাউন্টেন’-কে দেখলাম মদনাবতীতে। ‘আবার নতুন উদ্যম’(সজনীকান্ত) অনুবাদ চলতে থাকল। ১৭৯৬-এ আবার ছাপার যন্ত্র আর হরফের জন্য চিঠি। এবার একজন দক্ষ মুদ্রাকরকে পাঠানোর জন্য অনুরোধ।

সরেজমিনে তদারক করবার জন্য কেরী নিজেই ডিসেম্বর মাসে কলকাতায় রওনা দিলেন। অনেক টাকা লাগবে শুনে অবশ্য বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে আসতে বাধ্য হলেন। কিন্তু ভাষাশিক্ষা বন্ধ হল না। জানতে পারছি তাঁর একটা চিঠিতে, ১৭৯৭ সালে তিনি সংস্কৃত-বাংলা-ইংরেজী অভিধান রচনা করছেন।

১৭৯৪-তে এসেছেন মদনাবতীতে। কিন্তু পরের টানা তিন বছর ধরে চলেছে, হয় খরা না হলে অতিবর্ষণ। নীলকুঠি তো আর চলে না! কিন্তু উডনি মানুষটা কেরীর প্রতি কৃপাপরবশ ছিলেন, আর ধর্মে ছিল তাঁর মতি। তাই তিনি আরও ২/১ বছর কুঠির কাজ চালাবেন বলে ঠিক করলেন। কেরী দুশ্চিন্তামুক্ত হলেন।

এদিকে কলকাতায় বাংলা হরফের একটা কারখানা তৈরি হয়েছে। পঞ্চানন কর্মকার তার কারিগর। তিনিও এক প্রতিভাধর শিল্পী। ১৭৯৭-র ডিসেম্বরে খবরটা এল মদনাবতীতে। কেরী তো এটাই চাইছিলেন! ১৭৯৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে একটা ছাপার যন্ত্র কিনে উডনি উপহার দিলেন কেরীকে। যন্ত্র তো এসে গেল! এখন ছাপা শুরু করতে হবে! তাই ১৭৯৯-র প্রথম দিকে কেরী নিজেই ছুটলেন কলকাতায় টাইপের অর্ডার দেবার জন্য। সেই টাইপ কী এসেছিল মদনাবতীতে! বোধহয় আসেনি। কারণ কলকাতা থেকে ফিরেই বিপদে পড়লেন, ‘জর্জ উডনির নিকট হইতে মদনাবাটী কুঠির কাজ বন্ধ করিবার আদেশ আসিল।’(সজনীকান্ত)

কেরী তখন কী করলেন? এতদিনের সঞ্চিত সমস্ত অর্থ দিয়ে পাশের খিদিরপুরে একটা নীলকুঠি কিনে সপরিবারে ফাউন্টেনকে সঙ্গে নিয়ে এলেন। ‘মুদ্রণযন্ত্রটি লইয়া সেখানে নতুন সংসার পাতিলেন।’(সজনীকান্ত) খিদিরপুর গ্রামটাও তখন বংশীহারী থানার মধ্যেই। মদনাবতী থেকে কয়েক মাইল উজিয়ে, উত্তর দিকে এসে টাঙ্গন নদীটা পার হলেই খিদিরপুর। মদনাবতী নদীর পূব দিকে, আর খিদিরপুর নদীর পশ্চিম দিকে। এই গ্রামটার নাম এখন ছোট খিদিরপুর।

হিসাব করলে দেখা যায়, ফেব্রুয়ারি/মার্চ মাস থেকে ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত তাঁরা সেখানে ছিলেন। তখন তাঁর পাশে আছেন ফাউনন্টেন, দক্ষ ব্যক্তি। আর কেরী নিজে তো একজন করিতকর্মা, কাজপাগল মানুষ।

ইতিমধ্যে বাংলা হরফ নিশ্চয়ই এসে গিয়েছিল। কেরী ও ফাউন্টেন ছাপাখানা, হরফ আর বই ছাপানো নিয়ে মশগুল। আমাদের অনুমানের সাক্ষ্যও পাচ্ছি ১৯১৩ সালে প্রকাশিত দিনাজপুর গেজেটিয়ারের একটা পরিচ্ছদে। তাতে বলছে, কেরী সেখান থেকে একটা ধর্মীয় বাংলা পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন। প্রখ্যাত গবেষক দিনাজপুরের মেহেরাব আলি বলছেন, ওই পত্রিকাটি মহিপাল, সাদামহল ও দিনাজপুরের মিশনারীদের কাছে যেত। আমাদেরও মেহেরাব আলিকে সমর্থন করতে ইচ্ছা করে। আমরা দেখেছি, ‘মুদ্রাযন্ত্রটি লইয়া কেরী ও ফাউন্টেন শেখানে নতুন সংসার পাতিতে গেলেন।’(সজনীকান্ত) পাঠক লক্ষ্য করুন, ‘মুদ্রাযন্ত্রটি লইয়া’এই বাক্যবন্ধটির দিকে। কারণ, আমরা কিছু পরে দেখব, ‘১৮০০ সালের জানুয়ারি থেকে শ্রীরামপুর মিশনের কাজ আরম্ভ হইল। … ওয়ার্ড, ব্রাসটন, ও কেরীর প্রথম পুত্র ফেলিক্স ছাপাখানা লইয়া পড়িলেন।’(সজনীকান্ত)

কয়েক মাস পরেই ফেলিক্স ছাপাখানার কাজে যুক্ত হয়েছেন, তার তো মদনাবতী-খিদিরপুরের শেষ পর্বে অন্তত ১৬ বৎসর বয়স। তিনি কি আর কেরী-ফাউন্টেনকে খিদিরপুরে ছাপাখানার কাজে সাহায্য করেননি! আর একটা কারণ, মহিপালে তখনও টমাস আছেন। খিদিরপুর থেকে মহিপালের দূরত্ব আরও কম। তাঁর সঙ্গে কেরীর সম্পর্ক ছিল। কারণ, টমাস যেহেতু ডাক্তার, তাই কেরী আর টমাস মিলে একটা চিকিৎসাকেন্দ্র মহিপালে আগেই গড়ে তুলেছেন। তাই স্বাভাবিক যে, সেই টমাসও এই ধরনের পত্রিকা প্রকাশে সাহায্য করবেন।

২৫ ডিসেম্বর ১৭৯৯ সাল, পাততাড়ি গুটিয়ে উইলিয়াম কেরী রওনা দিলেন শ্রীরামপুরের উদ্ধেশ্যে। ১৫ জুন, ১৭৯৪ থেকে ২৫ ডিসেম্বর, ১৭৯৯ অবধি কেরী মদনাবতী আর পাশের খিদিরপুরে ছিলেন—সাড়ে পাঁচ বছরের মতো। স্ত্রী অর্ধ উন্মাদ। তার উপরে মদনাবতীতে আসবার সাড়ে তিন মাসের মধ্যে তৃতীয় সন্তান পিটার মারা গেল। বাচ্চাটার জন্য মন খারাপ! আসুন একটু সমবেদনা জানাই তার উদ্দেশ্যে। সম্প্রতি তার কবরের জায়গাটা বাঁধানো হয়েছে। তাকে আরও মর্যাদাপূর্ণ করে তুলবার দায়িত্ব আমাদের সবার।

সেই যে মদনাবতী-খিদিরপুর পর্বে তিনি বাংলাভাষার উন্নয়নে ব্রতী হয়েছিলেন, শ্রীরামপুর মিশন ও ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে যুক্ত হয়ে সেই কাজটিই আরও বিশদে করতে থাকলেন।

(৫)

কেরীর বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসা জন্মে গিয়েছিল। সেই জাহাজে থাকতেই টমাসের সহায়তায় তাঁর মধ্যে এই প্রীতির সঞ্চার হয়। ২১-৩-১৭৯৪-এ তাঁর ডায়েরিতে দেখি, ‘I however am daily employed in learning the Language…now begin to see that Bengali is a language which is very copious and abounds with beauties.’ তিনি অপর একটা জায়গায় লিখেছেন, ‘On these, and many other accounts, it may be esteemed one of the most expressive and elegant languages of the east.’ আর্থিক অনটনের অজুহাতে যখন ফোর্ট উইলিয়াম কর্তৃপক্ষ বাংলা ভাষা বিভাগ উঠিয়ে দিচ্ছেন, তখন কেরীর আকুল আবেদনটির মধ্যে বাংলা ভাষার প্রতি তাঁর মানসিক সংযুক্তির পরিচয় পাওয়া যায়, ‘Convinced as I am that the Bengali language is superior in Point of intrinsic merit to every language spoken in India, and in point of real utility yields to none.’

ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ব্রিটিশরাজ স্থাপন করেছিল সিভিলিয়ানদের এই দেশ ও এদেশের ভাষা সম্পর্কে একটা প্রাথমিক ধারণা দেবার জন্য। কেরী হলেন এই কলেজে প্রাচ্য ভাষা, বিশেষ করে বাংলা এবং সংস্কৃতের অধ্যাপক। তিনি এই কাজটাকে খুব বড় করে নিলেন। মুনশি রামরাম বসুকেও দেখছি এই পর্বে। অর্থাৎ তিনি ক্ষমা পেয়ে গিয়েছেন কেরীর কাছ থেকে। গোলক নাথ শর্মা, তারিণীচরণ মিত্র, রাজীব লোচন মুখোপাধ্যায়, চণ্ডীচরণ মুন্সী, রাম কিশোর তর্কচুড়ামণি, হরপ্রসাদ রায়, কাশীনাথ তর্কপঞ্চানন, রামরাম বসু, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার আর স্বয়ং উইলিয়াম কেরীকে নিয়ে একটা বিশাল তারকামণ্ডলী তখন তৈরি হয়েছে। তিনি, তাদের দিয়ে পুস্তক লিখিয়ে নিচ্ছেন, নিজেও লিখছেন। তার মধ্যে মৃত্যঞ্জয় তর্কালঙ্কার লিখেছিলেন ৪টি বই। অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, ‘বিদ্যাসাগরের পূর্বে যথার্থ ভাষাশিল্পী হলেন…মৃত্যুঞ্জয়।’কেরী লিখেছিলেন ২টি বই। ১৮০১-তে ‘কথোপকথন’ আর ১৮১২-তে ‘ইতিহাস মালা’।

কেউ কেউ সন্দেহ প্রকাশ করেন, এগুলির লেখক মৃত্যুঞ্জয় নন তো! খুব অনুচিত এ ভাবনা!

আমরা মদনাবতী পর্বেই দেখেছি গ্রামে গ্রামান্তরে কেরীর বিচরণ, আর সহজিয়া মানুষের সঙ্গে তাঁর সংযোগ। তাই তাঁর পক্ষে গ্রাম্য শব্দাবলি চয়ন করতে সুবিধা হয়েছে। আর অসিতবাবুর কথায় (কিছুটা তাচ্ছিল্যভরেই যেন কথাটা তিনি বলেছেন), ‘নামে ইতহাসমালা হলেও এতে বেশীরভাগ কাহিনী অনৈতিহাসিক গল্প মাত্র’। ঠিকই; কিন্তু বইটিতে আছে চমৎকার সব গল্প। এ বই যখন প্রকাশিত হচ্ছে, তখন ১৮১২ সাল। তখন কেরীর বঙ্গদেশে ১৯ বৎসর বাস হয়ে গিয়েছে। তিনি তো অর্ধেক বাঙালিই হয়ে গিয়েছেন।

‘ইতিহাসমালা’ বইগুলি গুদামে ছিল, পুড়ে যায় সব। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ আর জাতীয় গ্রন্থাগারে এর কপি মিলেছে অনেক পরে, ১৯৭২ সালে। ফাদার দ্যতিয়েন সে বছর তার পুনঃপ্রকাশ করেন। তারপর তিনি পূর্ণাঙ্গ বিস্তৃত ব্যাখ্যা করেন, প্রত্যয়সিদ্ধ ভাবে বলেন, কী কারণে এই বই কেরীরই লেখা। তাঁর এই ব্যাখ্যার পর সব সন্দেহ দূর হয়ে যায়। এসব বই থেকে কিছু বাক্য তুলে ধরতে পারলে ভালোই হত। কিন্তু তাতে লেখার কলেবর বাড়বে। উৎসাহীরা পড়েই নিন না কেন!

সজনীকান্ত যথার্থই বলেছেন, (কেরী) ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ বিদেশিক সহায়ক।’ যথার্থই বলেছেন, ‘কেরীকে স্বীকার করার মধ্যে আমাদের পূর্ব-পুরুষকে স্মরণ করার পুণ্য আছে।’ মদনাবতীর কাল, সজনীকান্তের কথায়, কেরীর ‘আত্ম প্রস্তুতির কাল।’

এখানে এসেই তিনি গ্রামে পাঠশালা খুলেছিলেন। তিনি এখানকার মানুষের অসুখবিসুখ নিবারণের জন্যও প্রচেষ্ট হয়েছিলেন। গ্রামে গ্রামান্তরে ঘুরেছেন। দেখেছেন তথাকথিত ‘পুণ্য লাভের’ জন্য ‘শিশুহত্যা’ প্রথা। মনে ব্যথা পেয়েছেন। ১৮০৪ সালে শ্রীরামপুরে লিখলেন কর্তৃপক্ষের কাছে এ প্রথা নিবারণের দাবি নিয়ে।

আর চাষাবাদ। বিলেতে সেই সদ্য কিশোর ১২ বছরের কেরী কৃষিকাজে যুক্ত হয়েছিলেন, তিনি পড়েছেন পশুপক্ষী আর বৃক্ষলতা বিষয়ক রচনাদি। তাই প্রকৃতি বিজ্ঞান আর কৃষিকাজ বিষয়ে মানসগঠন তাঁর তখনই হয়ে গিয়েছে। মদনাবতীতে আসার সুবাদে ব্যবহারিক জ্ঞান লাভ হল। নিবিড়ভাবে দেখলেন এখানকার মাটি, তার প্রকৃতি, বিচার করলেন তার গুণাগুণ, গবেষণা করলেন কী ফসল কোথায় হতে পারে। মানুষটা যে কী বিপুল পরিশ্রমী ছিলেন তা ভাবনা করে কূল-কিনারা পাওয়া যায় না।

একটা সময় টমাসের সঙ্গে তিনি ভুটানেও গিয়েছিলেন। ভুটানকে তখন বঙ্গদেশের সীমানার মধ্যেই ধরা হত। মদনাবতীতে থেকে গভীরভাবে দেখার সুবাদে তিনি পরে একটা গবেষণাপত্র লিখে ফেলেন। Transactions of the Asiatic Society: Remarks on the State of Agriculture in the District of Dinajpur নামের প্রবন্ধটি ১৮০৮ সালের এশিয়াটিক রিসার্চেস-এর ১০ম খণ্ডে প্রকাশিত হয়। ডঃ শতাব্দী দাস কৃত তার সংক্ষিপ্ত একটা নোট মালদা থেকে প্রয়াত অধ্যাপক পুষ্পজিৎ রায়ের সম্পাদিত ‘জোয়ার’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। ‘জোয়ার’ ছিল এক উন্নতমানের পত্রিকা। অধ্যাপক পুষ্পজিৎ রায় ছিলেন উইলিয়ায়াম কেরী বিশারদ। ঐ লেখায় কেরী, এই এলাকার মাটির নানা বিভাগ নিয়ে আলোচনা করেছেন, বিভিন্ন এলাকায় কোন কোন গোষ্ঠীর মানুষ বাস করেন তার বিবরণ দিয়েছেন। দিনাজপুরের চাষীদের দারিদ্র্য, তাদের চাষের সরঞ্জামের ন্যূনতা, সেগুলোর নাম, লাঙ্গল-জোয়াল-যাঁতের অনুপুঙ্খ বিবরণ পাই এই গবেষণাপত্রে। কী করে লাঙ্গল চালানো হয়, বলদের দাম কেমন, মই দেওয়া, জমির জো বা বাতাল সম্পর্কে তিনি লিখেছেন। মাটি বয়ে নিয়ে যাবার ভারুয়াও তাঁর নজর এড়িয়ে যায়নি। কোন জমিতে ভাদুই, কোন জমিতে হেমত্ আর কোন জমিতে বুনা ধান হয়, কখন বীজ বোনা হয় এসব নিয়েও তিনি আলোচনা করেছেন। কেরী দেখিয়েছিলেন, এই এলাকায় কাঠ উৎপাদনের জন্য গাছের চাষ  করা সম্ভব! করা সম্ভব অনুর্বর জমিতেও খেজুর ও সাবু চাষ। এমনকী বিদেশী ফলের গাছ এনে চাষ, কমলালেবুর চাষ করা সম্ভব।

তিনি জোর দিয়েছিলন উন্নত পশুপালনে, বিশেষ করে গো পালনে আর জমির উর্বরতা বৃদ্ধির বিষয়ে।

তিনি বাংলাকে ভালোবেসে, বাংলার দরিদ্র মানুষের আপনজন হয়ে গিয়েছিলেন যে; এবং তা হয়েছিলেন অতি অল্প দিনের মধ্যেই! এখানেও উইলিয়াম কেরীর অনন্যতা।

তথ্যসূত্র

১। সজনীকান্ত দাস, উইলিয়ম কেরী, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ, (১৩৪৯)৷

২। শক্তিব্রত ঘোষ, উইলিয়ম কেরীঃ সাহিত্য সাহিত্য সাধনা, মাতৃ পাবলিশার্স৷

৩। ডঃ অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, বাংলা সাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত, বিজয় পাবলিকেশন্স (২০২৩)৷

৪। উইলিয়াম কেরী, ইতিহাসমালা, ফাদার দ্যতিয়েন সম্পাদিত, গাঙচিল৷

৫। ডঃ শতাব্দী দাস, উইলিয়াম কেরীর চোখে মালদা-দিনাজপুর জেলার কৃষিকর্ম, জোয়ার পত্রিকা৷

৬। মেহরাব আলী, দিনাজপুরের ইতিহাস সমগ্র, দিনাজপুরের ইতিহাস প্রকশনা প্রকল্প৷

৭। অধ্যাপক পুষ্পজিত রায়, মালদহ, আলোচনার মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ৷

লেখক প্রগতির পক্ষে এক পথিক, জীবনের সঙ্গে সংপৃক্ত থাকতে তিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার পুরাকৃর্তিগুলির বিষয়ে তিনি আগ্রহী অন্বেষক।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।