সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

যেখানে গান ছিল জীবনের ভাষা

যেখানে গান ছিল জীবনের ভাষা

পল্লব বৈরাগ্য

জুলাই ১৮, ২০২৬ 0

সংস্কৃতি এক প্রবহমান নদী। তার রূপান্তর আছে, কিন্তু মৃত্যু নেই। মানুষের জীবনচর্চা, বিশ্বাস, অভ্যাস, স্মৃতি, শিল্পবোধ, মূল্যবোধ এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চারিত জীবনানুভূতির সম্মিলিত প্রকাশই সংস্কৃতি। মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন, আচার-অনুষ্ঠান, লোকবিশ্বাস, শিল্পরুচি, নীতি-নৈতিকতা, ভাষা ও মনন—সব মিলিয়ে গড়ে ওঠে একটি সমাজের সাংস্কৃতিক পরিচয়। তাই সংস্কৃতিকে কোনো একক সংজ্ঞার সংকীর্ণ পরিসরে আবদ্ধ করা যায় না। দেশ, কাল, সমাজ, ভাষা ও ধর্মের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সংস্কৃতিও নিত্য নতুন রূপ ধারণ করে।

বাংলা ও বাঙালির সংস্কৃতিও এই চিরন্তন বিবর্তনেরই অংশ। গবেষকদের একাংশ বাংলার সংস্কৃতিকে সাধারণত তিনটি ধারায় বিভক্ত করেছেন। নগর সংস্কৃতি, লোকসংস্কৃতি এবং আদিম সংস্কৃতি। আধুনিক শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর নাগরিক জীবনের পরিসরে যে সংস্কৃতির বিকাশ, তাকে বলা হয় নগর সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতি মার্জিত ও পরিশীলিত হলেও তুলনামূলকভাবে নবীন; এর ভিত্তি প্রাচীন ঐতিহ্যের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতার চেয়ে আধুনিকতার প্রভাব ও অনুকরণে অধিক নির্মিত। অন্যদিকে আদিম সংস্কৃতি বহন করে বাংলার সুদূর অতীতের কৌমসমাজ ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনস্মৃতি। এই আদিম সাংস্কৃতিক উপাদানের সঙ্গে বাংলার লোকসংস্কৃতির রয়েছে গভীর ও সুদীর্ঘ আত্মীয়তা।

প্রকৃতপক্ষে লোকসংস্কৃতিই বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মূলধারা। আবহমান বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সমাজজীবন ও সভ্যতার গভীরতম ছাপ সংরক্ষিত রয়েছে এই লোকজ ধারার মধ্যেই। পরিকল্পিত নগরায়ণের ইতিহাস এদেশে তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক; ফলে আজও বাংলার বহু শহর ও নগরের অন্তরালে গ্রামীণ সমাজজীবনের স্মৃতি ও সংস্কৃতি সুস্পষ্টভাবে বিদ্যমান। জীবন-জীবিকা এবং প্রকৃতিই সংস্কৃতির প্রধান নিয়ামক। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি, নদীমাতৃক ভূপ্রকৃতি এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামসমাজ যুগে যুগে বাংলার সংস্কৃতির ভিত্তি নির্মাণ করেছে। সেই অর্থে গ্রামই ছিল বাংলার সংস্কৃতির জন্মভূমি, লালনক্ষেত্র এবং বিকাশের প্রধান কেন্দ্র। এই গ্রামকেন্দ্রিক লোকসংস্কৃতির মধ্যেই নিহিত রয়েছে বাংলা ও বাঙালির আত্মপরিচয়ের গভীরতম উৎস। তাই যেমন কৃষ্ণকে বাদ দিয়ে বৈষ্ণব পদাবলীর পূর্ণতা কল্পনা করা যায় না, তেমনি লোকসংস্কৃতিকে উপেক্ষা করে বাঙালির ইতিহাস, সমাজ ও ঐতিহ্যের প্রকৃত স্বরূপ অনুধাবন করাও অসম্ভব।

লোকসংস্কৃতির অন্যতম প্রাণপ্রবাহ হল লোকসঙ্গীত। এটি কেবল গান নয়; একটি সমাজের জীবনবোধ, শ্রম, অনুভূতি ও সামষ্টিক স্মৃতির সুরেলা প্রকাশ। লোকসমাজের মুখে মুখে, কোনো একক রচয়িতার অধিকার ছাড়াই, স্বতঃস্ফূর্তভাবে জন্ম নেয় এই সঙ্গীত। সাধারণত কৃষিকাজ, শ্রম, প্রেম, উৎসব, আচার কিংবা উৎপাদনকে কেন্দ্র করেই এর সৃষ্টি। লিখিত গ্রন্থ নয়, মানুষের স্মৃতিই এর প্রধান আশ্রয়। সেই কারণেই লোকসঙ্গীতের ভাষা সহজ, সুর অনাড়ম্বর, অথচ তার অন্তর্নিহিত জীবনদর্শন গভীর ও সুদূরপ্রসারী। মানুষের সুখ-দুঃখ, আশা-নিরাশা, মিলন-বিরহ, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির বেদনা, এমনকি সৃষ্টি ও জীবনের চিরন্তন রহস্যও লোকসঙ্গীতের বাণী ও সুরে অনায়াসে ধরা পড়ে। মাটির গন্ধে ভরা এই সঙ্গীত তাই কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা কালের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকে না; তার আবেদন হয়ে ওঠে সর্বজনীন।

লোকসাহিত্যের অন্যান্য শাখার মতো লোকসঙ্গীতেরও মানুষের বাস্তব জীবনের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। অধিকাংশ লোকগানের জন্ম হয়েছে শ্রমপ্রক্রিয়া, কৃষিকাজ, উৎপাদনব্যবস্থা এবং গ্রামীণ সমাজজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে। কৃষিনির্ভর বাংলার মানুষের জীবনযাত্রা, ঋতুচক্র, নদী, মাঠ, প্রকৃতি এবং সামাজিক সম্পর্ক লোকসঙ্গীতের প্রধান অনুষঙ্গ। ফলে লোকসঙ্গীত কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি গ্রামীণ জনসমাজের চেতনা, মানসিকতা ও জীবনসংগ্রামের এক বিশ্বস্ত দলিল। মুখে মুখেই রচিত ও পরিবেশিত হওয়ায় লোকসঙ্গীত সর্বদাই পরিবর্তনশীল, তবু তার মূল জীবনসত্য অপরিবর্তিত থাকে। এই সঙ্গীত কোনো ব্যক্তির নয়; এটি সমগ্র লোকসমাজের সম্মিলিত সম্পদ।

মানবসভ্যতার প্রাচীন পর্বে লিখিত ভাষা ও তথ্যসংরক্ষণের সুসংগঠিত ব্যবস্থা গড়ে ওঠার পূর্বে গান ছিল স্মৃতি সংরক্ষণের অন্যতম কার্যকর মাধ্যম। গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, পৌরাণিক কাহিনি, বীরগাথা, সামাজিক শিক্ষা কিংবা ধর্মীয় বিশ্বাস – এসবই সহজ ভাষা ও সুরের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে প্রচারিত হতো। সুরের সঙ্গে যুক্ত থাকায় সেই কাহিনিগুলি সাধারণ মানুষের পক্ষে সহজে মনে রাখা এবং প্রজন্মান্তরে বহন করা সম্ভব হতো। সে সময় গান কেবল বিনোদনের উপকরণ ছিল না; বরং ছিল জ্ঞান, ইতিহাস, অভিজ্ঞতা ও সামাজিক মূল্যবোধ সংরক্ষণ ও প্রচারের এক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক মাধ্যম।

ভারতীয় লোকসঙ্গীতের প্রাচীনত্বও সুদীর্ঘ। বৈদিক সাহিত্যে, বিশেষত সামবেদে, সুর ও গীতধর্মী ঐতিহ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়, যা ভারতীয় সঙ্গীতচর্চার প্রাচীন ভিত্তির পরিচায়ক। যদিও আজকের লোকসঙ্গীতকে সরাসরি বৈদিক যুগের সঙ্গে একাত্ম করা যায় না, তবু এ বিষয়ে অধিকাংশ গবেষক একমত যে, ভারতীয় উপমহাদেশে লোকসঙ্গীতের বিভিন্ন ধারা বহু সহস্রাব্দ ধরে প্রবহমান। তারই একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ মধ্যভারতের পাণ্ডবনি’ লোকগাথা, যা মহাভারতের কাহিনিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। ছত্তিশগড়, ওডিশা, মধ্যপ্রদেশ ও অন্ধ্রপ্রদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আজও এই লোকসঙ্গীত পরিবেশিত হয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মৌখিক পরম্পরায় টিকে থাকা এই গাথা প্রমাণ করে যে, লোকসঙ্গীত কেবল সুরের ঐতিহ্য নয়; এটি ইতিহাস, স্মৃতি এবং সমাজচেতনারও এক জীবন্ত ধারক।

দুঃখের বিষয়, আজকের দিনে ‘লোকসঙ্গীত’ বলতে ঠিক কী বোঝায়, সে প্রশ্নেরই যেন নতুন করে উত্তর খুঁজতে হয়। বহু লোকসঙ্গীত গবেষক আবেগমিশ্রিত ভাষায় বলেছেন, যেমন বাংলার অসংখ্য নদীর কলধ্বনি কিংবা পাখির কাকলিতে প্রকৃতি মুখর হয়ে থাকে, তেমনি আবহমানকাল ধরে বাঙালির জীবনও মুখর ছিল গানে। ‘গোলা ভরা ধান, গলায় গলায় গান’—এই বহুলপ্রচলিত প্রবাদবাক্যও সেই সাংস্কৃতিক বাস্তবতারই স্মারক। যদিও এতে কিছুটা কাব্যিক অতিরঞ্জন রয়েছে, তবু একথা অস্বীকার করার উপায় নেই, বাংলার কৃষিজীবনের সঙ্গে লোকগানের সম্পর্ক ছিল অবিচ্ছেদ্য। একসময় বাংলায় শত শত দেশি ধানের জাত চাষ হতো; আধুনিক কৃষিব্যবস্থার চাপে যেমন তাদের অধিকাংশই আজ বিলুপ্ত, তেমনি হারিয়ে গেছে সেই ধানকে ঘিরে গড়ে ওঠা অসংখ্য লোকগানও। কোনো কোনো গবেষকের মতে, বাংলায় প্রায় আড়াইশো ধরনের লোকগানের অস্তিত্ব ছিল। অথচ আজ তার অর্ধেকেরও কম ধারা জীবন্ত রয়েছে।

ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, জারি, সারি, বাউল, মুর্শিদি, মারফতি, কবিগান কিংবা কীর্তন—এই নামগুলি এখনও উচ্চারিত হয়, কিন্তু সব ধারাই আর সমানভাবে প্রবহমান নয়। অনেক ক্ষেত্রেই লোকসঙ্গীত তার স্বাভাবিক সামাজিক পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কেবল মঞ্চনির্ভর বা গণমাধ্যমকেন্দ্রিক শিল্পরূপে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। আধুনিকতার নামে এমন এক সাংস্কৃতিক প্রবণতা তৈরি হয়েছে, যেখানে লোকজীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বিচ্ছিন্ন শহুরে নির্মাণকেও কখনও কখনও ‘লোকসঙ্গীত’-এর পরিচয় দেওয়া হয়। ফলে মাটি, মানুষ ও শ্রমের সঙ্গে যে গভীর সম্পর্ক লোকসঙ্গীতের প্রাণশক্তি ছিল, তা ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে।

সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে লোকসঙ্গীতের জন্মপরিবেশও আমূল বদলে গেছে। যে ভৌগোলিক ও সামাজিক বাস্তবতায় বাংলার লোকগীতির সৃষ্টি হয়েছিল, সেই বাস্তবতা আজ আর আগের মতো নেই। একসময় ভাটিয়ালি ছিল মাঝির একাকী নদীযাত্রার সঙ্গী; কিন্তু বৈঠাচালিত নৌকার পরিবর্তে যখন শ্যালো ইঞ্জিনচালিত নৌকা নদী দখল করে নেয়, তখন ইঞ্জিনের অবিরাম শব্দের মধ্যে সেই সুরের অবকাশও হারিয়ে যায়। ভাওয়াইয়া ছিল গাড়িয়াল, মৈষাল কিংবা সীমান্তভূমির মানুষের গান; গরুর গাড়ি ও মহিষপালনের অবলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে সেই জীবনযাপনও বদলে গেছে। সারিগান ছিল নৌকাবাইচ কিংবা সম্মিলিত শ্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ; আজ সেই শ্রমপ্রক্রিয়াই প্রায় লুপ্ত। একসময় ক্ষেতে কাজ করতে করতে কৃষকেরা যে গান গাইতেন, আজ সেই জায়গা দখল করেছে মোবাইল ফোনের রেকর্ড করা জনপ্রিয় গান।

ফলে লোকসঙ্গীত আজ মাঠ, নদী, বিল, হাওর কিংবা খেতখামারের স্বাভাবিক পরিবেশ ছেড়ে ক্রমশ উঠে এসেছে শহরের আলোকোজ্জ্বল মঞ্চে, টেলিভিশনের পর্দায় এবং ডিজিটাল মাধ্যমে। বেতারের যুগে ‘পল্লীগীতি’ ছিল শহর ও গ্রামের সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধনের এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষ যেমন আগ্রহ নিয়ে সে গান শুনতেন, তেমনি শহুরে মধ্যবিত্ত সমাজও তার মধ্যে খুঁজে পেত বাংলার মাটির গন্ধ। কিন্তু বাণিজ্যিক সম্প্রচারমাধ্যমের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে সেই পরিসরও ক্রমশ সংকুচিত হয়েছে; লোকগানের জায়গা দখল করেছে জনপ্রিয় চলচ্চিত্রসংগীত ও বিনোদননির্ভর অনুষ্ঠান।

অন্যদিকে দেশে সঙ্গীতশিক্ষার নানা প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে সঙ্গীত বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হলেও, প্রকৃত লোকসঙ্গীতচর্চা সেই অনুপাতে সমৃদ্ধ হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমে সংগীতের কারিগরি দক্ষতা অর্জন সম্ভব হলেও লোকসঙ্গীতের প্রাণ নিহিত থাকে আঞ্চলিক উচ্চারণ, ভাষার স্বরভঙ্গি, সামাজিক অভিজ্ঞতা এবং জীবনযাপনের অন্তরঙ্গতার মধ্যে। এই উপাদানগুলি কেবল শ্রেণিকক্ষে শেখানো যায় না; এগুলি অর্জিত হয় দীর্ঘ সামাজিক সহাবস্থান ও সাংস্কৃতিক অনুশীলনের মাধ্যমে। তাই অনেক সময় শুদ্ধতার নামে আঞ্চলিক উচ্চারণ মুছে গিয়ে লোকগানের স্বকীয়তা নষ্ট হয়ে যায়।

এই প্রসঙ্গে প্রখ্যাত লোকসঙ্গীতশিল্পী ও গবেষক হেমাঙ্গ বিশ্বাসের একটি মন্তব্য বিশেষভাবে স্মরণীয়লোকসঙ্গীতের ঘরানা নেই, আছে বহিরানা।’ অর্থাৎ লোকসঙ্গীতের প্রকৃত পরিচয় তার মুক্ত পরিবেশ, জনসমাজ এবং জীবনযাপনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের মধ্যেই নিহিত। সেই সঙ্গীতকে যদি তার সামাজিক পরিসর থেকে বিচ্ছিন্ন করে কেবল মঞ্চ বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তবে তার সুর হয়তো বেঁচে থাকবে, কিন্তু তার প্রাণশক্তি ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হবে।

বর্তমান বাংলার লোকসঙ্গীতের পরিসরে বাউলগানই সম্ভবত সবচেয়ে পরিচিত ও বহুল জনপ্রিয় ধারা। গ্রাম থেকে শহর সব বয়সের শ্রোতার কাছেই এই গানের আবেদন আজও অম্লান। তবে জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির পাশাপাশি বাউলগানের আদি সাধনধারা নিয়ে উদ্বেগও ক্রমশ বাড়ছে। প্রবীণ গবেষক ও বাউলসাধকদের মতে, একসময় বাউলগান ছিল মূলত আখড়াকেন্দ্রিক সাধনসঙ্গীত; যেখানে গুরু তাঁর শিষ্যদের দেহতত্ত্ব, আত্মসাধনা ও জীবনদর্শনের শিক্ষা দিতেন গানের মধ্য দিয়েই। ফলে গান সেখানে কেবল পরিবেশনার বিষয় নয়, বরং সাধন-অনুশীলনেরও একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।

চিত্র ১ -বাউল গীতবাদ্য যন্ত্র তৈরি হচ্ছে, সূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স।

বর্তমান সময়ে সেই আখড়াভিত্তিক পরিবেশের পরিবর্তে বাউলগান ক্রমশ মঞ্চ, গণমাধ্যম এবং বাণিজ্যিক সংগীতজগতের অংশ হয়ে উঠেছে। এর ফলে পরিবেশনা-পদ্ধতি, বাদ্যযন্ত্র, তাল-লয় এবং গায়কীতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। দর্শক-শ্রোতার রুচি ও সময়ের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অনেক শিল্পী দ্রুততর লয়, আধুনিক বাদ্যযন্ত্র কিংবা ফিউশনধর্মী উপস্থাপনার আশ্রয় নিচ্ছেন। এই পরিবর্তনকে কেউ সংস্কৃতির স্বাভাবিক বিবর্তন হিসেবে দেখেন, আবার অনেক গবেষকের মতে এর ফলে বাউলগানের আদি সুর, ভাষা ও সাধনতাত্ত্বিক গভীরতা ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে পড়ছে। ফলে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এই টানাপোড়েন আজ বাউলগানের অন্যতম আলোচ্য বিষয়।

একে নিছক অবক্ষয় বললেও ভুল হবে, আবার একে ইতিবাচক রূপান্তর বলাও কঠিন। সময়ের সঙ্গে শিল্পের পরিবর্তন অনিবার্য; কিন্তু সেই পরিবর্তনের মধ্যেও ঐতিহ্যের মৌলিক বৈশিষ্ট্য সংরক্ষিত থাকা প্রয়োজন। এখনও বহু প্রবীণ বাউল গুরু গুরুপরম্পরায় প্রাপ্ত বাণী ও সুর অক্ষুণ্ণ রেখে সাধনার অংশ হিসেবেই গান পরিবেশন করে চলেছেন। অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের একাংশ মঞ্চ ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে এই সংগীতকে আন্তর্জাতিক পরিসরে পৌঁছে দিচ্ছেন। এই দুই প্রবণতার মধ্যেই সমকালীন বাউলচর্চার বাস্তব চিত্র প্রতিফলিত হয়।

একই পরিবর্তন লক্ষ করা যায় বাংলার অন্যান্য লোকসঙ্গীত ধারাতেও। কবিগান, কীর্তন, অষ্টক, জারি, সারি কিংবা গম্ভীরার মতো ধারাগুলি আজ আর আগের সামাজিক প্রেক্ষাপটে পরিবেশিত হয় না। কৃষিজীবন, নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি এবং গ্রামীণ সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই গানগুলির বিষয়বস্তু ও পরিবেশনার ধরনও বদলে গেছে। গম্ভীরায় কৃষিজীবনের পরিবর্তে এখন সামাজিক সমস্যা, প্রশাসনিক উদ্যোগ কিংবা জনসচেতনতামূলক বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে। পটগানও ধর্মীয় আখ্যানের গণ্ডি ছাড়িয়ে পরিবেশ সংরক্ষণ, স্বাস্থ্যসচেতনতা, নির্বাচন কিংবা সামাজিক প্রচারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অর্থাৎ লোকসঙ্গীত বিলুপ্ত না হয়ে বহু ক্ষেত্রে নতুন সামাজিক প্রয়োজনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে।

১৯৫৪ সালে আন্তর্জাতিক লোকসঙ্গীত পরিষদ (International Folk Music Council) ‘Folk Song’-এর যে সংজ্ঞা প্রস্তাব করে, তার মূল ভিত্তি ছিল তিনটি ধারণা—Continuity (ধারাবাহিকতা), Variation (বৈচিত্র্য) এবং Selection (জনসমাজের গ্রহণযোগ্যতা)। অর্থাৎ লোকসঙ্গীতের প্রকৃত স্বরূপ নিহিত রয়েছে ঐতিহ্য রক্ষা, সময়োপযোগী রূপান্তর এবং সমাজের স্বীকৃতির মধ্যে। এই সংজ্ঞা ভারতেও বিশেষভাবে পরিচিতি লাভ করে এবং আকাশবাণীর প্রচারের মাধ্যমে ‘লোকসঙ্গীত’ শব্দটি সর্বজনগ্রাহ্য হয়ে ওঠে। তবে এর পাশাপাশি শহুরে পরিবেশে গ্রামীণ সুরের অনুসরণে রচিত নতুন ধরনের গানও ‘লোকসঙ্গীত’ পরিচয়ে প্রচারিত হতে থাকে, যা লোকসঙ্গীতের সংজ্ঞা ও সীমা নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়।

এসব পরিবর্তন সত্ত্বেও বাংলার লোকসঙ্গীত আজও জীবন্ত। টেলিভিশনের প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রম, গবেষণা, সাংস্কৃতিক উৎসব এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির মাধ্যমে লোকসঙ্গীত নতুন প্রজন্মের কাছেও পৌঁছে যাচ্ছে। কিছু ধারা হয়তো স্তিমিত হয়েছে, কিছু বিলুপ্তির মুখে; কিন্তু আবার অনেক ধারা নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। সংস্কৃতির ইতিহাস আমাদের শেখায়—যা সত্যিকার অর্থে জনজীবনের সঙ্গে যুক্ত, তা কখনও সম্পূর্ণ হারিয়ে যায় না; বরং সময়ের সঙ্গে নিজের রূপ বদলে টিকে থাকে। সেই অর্থে বাংলার লোকসঙ্গীতও আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে—একদিকে ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার, অন্যদিকে পরিবর্তনশীল সমাজের নতুন বাস্তবতা। এই দুইয়ের সুষম সমন্বয়ের মধ্যেই নিহিত রয়েছে বাংলার লোকসঙ্গীতের ভবিষ্যৎ।

প্রচ্ছদ চিত্র পরিচিতিঃ বাংলার বাউল লোকশিল্পী, মীর এম হক, সূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স

তথ্যসূত্র

  1. সুধীর চক্রবর্তী; বুদ্ধিজীবীর নোটবই, প্রথম সংস্করণ, ৬০০-৬০৩ (ফেব্রুয়ারি ২০১০, নবযুগ প্রকাশনী)৷
  2. আবুল হাসান চৌধুরী, ‘বাংলাদেশের লোকসঙ্গীতচর্চার বর্তমান অবস্থা’, ডিজিট্যাল বিশ্ব, ২ অক্টোবর, ২০১৭৷ 
  3. পাপিয়া দেবী অশ্রু, ‘বর্ণময় ও বৈচিত্র্যে ভরা ঐতিহ্যময় ভারতীয় লোকসঙ্গীত’, roarmedia, ২৮ জুলাই, ২০১৮৷
  4. অনুপ সাদি, ‘লোকসঙ্গীত গ্রামীণ সঙ্গীতের ধারা যা বিশ শতকের লোক পুনর্জাগরণের সময়ে উদ্ভুত’, রোদ্দুরে, ১৪ মে, ২০২০৷
  5. আবুল আহসান চৌধুরী, ‘লোকসংস্কৃতির বাংলা’, প্রথম আলো, ১৪ এপ্রিল, ২০২১৷ 
পল্লব বৈরাগ্য ইতিহাসের ছাত্র। তিনি রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যামন্দির থেকে ইতিহাসে স্নাতক এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। আধুনিক ভারতবর্ষের ইতিহাস, আঞ্চলিক ইতিহাস, উত্তর-ঔপনিবেশিকতাবাদ, সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ এবং ফিল্ম স্টাডিজ তাঁর গবেষণার প্রধান আগ্রহের ক্ষেত্র। ইতিহাসের প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার পাশাপাশি লোক ঐতিহ্য, স্মৃতি, ভূগোল ও সংস্কৃতির আন্তঃসম্পর্ক অনুসন্ধানেও তিনি আগ্রহী। তাঁর গবেষণামূলক প্রবন্ধ ও নিবন্ধ একাধিক পত্র-পত্রিকা ও সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।