সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

ইতিহাস ও বিবর্তনে বাংলার উমা-মহেশ্বর মূর্তি

ইতিহাস ও বিবর্তনে বাংলার উমা-মহেশ্বর মূর্তি

কুণালকান্তি সিংহ রায়

আগস্ট ২, ২০২৫ ৪১১ 1

ভারতীয় উপমহাদেশের ভাস্কর্য শিল্পে, বিশেষত শৈব ভাস্কর্যগুলির মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিগ্রহ হল উমা-মহেশ্বরের মূর্তি। মূর্তিশাস্ত্রের পরিভাষায় উমা-মহেশ্বরের ভাস্কর্যটি হল, দেবী উমা এবং দেবাদিদেব মহাদেবের (মহেশ্বর বা শিব) ঐশ্বরিক দাম্পত্য জীবনের অলোকসামান্য রূপের একটি ক্লাসিক প্রতিচ্ছবি। মৎস্যপুরাণ, ভাগবত পুরাণ, বিষ্ণুধর্মোত্তর উপপুরাণ, অপরাজিতপৃচ্ছা, রূপমণ্ডন প্রভৃতি শিল্পশাস্ত্রের লিখিত বিধিকে মান্যতা দিয়ে ভারতীয় শিল্পীরা উমা-মহেশ্বরের মূর্তি সৃজনের জন্য অনন্ত যৌবনের অধিকারী এক দম্পতির উষ্ণ আলিঙ্গনকে অপরূপভাবে চিত্রায়িত  করেছেন কঠিন প্রস্তর ও ধাতুতে অথবা গুহার কন্দরে-কন্দরে। প্রকৃতপক্ষে  উমা-মহেশ্বর ভাস্কর্যের মধ্যে জগৎ-মাতা উমার সাথে বিশ্বপিতা শিবের মিলনের এক অপূর্ব মণিকাঞ্চনযোগ দৃশ্যমান। প্রখ্যাত গবেষক ড. এ.এল. শ্রীবাস্তব এই প্রসঙ্গে লিখেছেন যে, পুরুষ ও প্রকৃতির এই মিলন ক্রমশ বংশবৃদ্ধির অভিমুখে নিয়ে যায় এবং সৃষ্টির চক্রকে তার সঠিক আবর্তনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। সেই কারণে ভারতীয় ঐতিহ্যে উমা এবং শিবকে সার্বজনীন পিতামাতা হিসাবে গণ্য করা হয়, যার অবিস্মরণীয় অভিব্যক্তি ঘটেছে মহাকবি কালিদাসের রঘুবংশম্ নাটকের (১.১) অসামান্য সূচনায়: “জগতঃ পিতরৌ বন্দে পার্বতী পরমেশ্বরৌ।”

শিবের রূপকল্পনার বিবর্তন

ভারতীয় উপমহাদেশে উদ্ভুত সুপ্রাচীন ধর্মমত গুলির মধ্যে অন্যতম ছিল শৈবধর্ম। এই ধর্মের প্রধান দেবতা শিব হলেন সর্বব্যাপী ব্রহ্মা। স্কন্দ পুরাণ অনুসারে, দিগন্ত বিস্তৃত অসীম মহাকাশের বৃত্তাকার উচ্চতা হল তাঁর মস্তক, অনন্ত আকাশের প্রগাঢ় অন্ধকার হল তাঁর বিপুল কেশরাশি এবং গভীর অন্ধকার আকাশে হীরকের ন্যায় সৌন্দর্য ও ঔজ্জ্বল্য প্রদানকারী অদ্বিতীয় চন্দ্র হল দেবতার মস্তকরত্ন। তিনি একাধারে সর্বজ্ঞানী, মহান তপস্বী এবং দেবতাদের মধ্যে পরমশ্রেষ্ঠ। তাঁর ত্রিনয়ন হল তিন বেদের প্রতীক – “নমামি বেদাত্রয় লোকনম্ হি তম্।”

বস্তুতপক্ষে, খ্রিস্ট জন্মের বহু পূর্বে এদেশে প্রাচীনতম ধর্ম-সম্প্রদায় ছিল দুটি, যথা — বৈষ্ণব ও শৈব। বৈষ্ণব ধর্মের প্রধান দেবতা বিষ্ণু ছিলেন বৈদিক দেবতা। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর সুবিখ্যাত গ্রন্থ ঋগ্বেদে (রচনাকাল : আনুমানিক ১৫০০ — ১২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) তিনি ১০৪ বার উচ্চারিত হয়েছেন। অন্যদিকে শিবের প্রাচীনত্বের শিকড়টি সুদূর প্রাগৈতিহাসিক কালদিগন্তে প্রসারিত। ঋগ্বেদীয় সংস্কৃতির বহু পূর্ব যুগে হরপ্পা সভ্যতা এবং তারও পূর্বে মেহেরগড় সভ্যতায় (বর্তমানে পাকিস্তানে) শিবের প্রাচীনত্ব নিহিত ছিল। পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের অন্তর্ভুক্ত মোগল-ঘুণ্টাই ও পেরিয়ানো-ঘুন্টাই নামে দুটি প্রত্নস্থলে লিঙ্গ প্রতীকের (সময়কাল : আনুমানিক ৩০০০ — ২৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) শিবের নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে। আবার সিন্ধু সভ্যতার মহেঞ্জোদারোয় প্রাপ্ত যোগাসনে উপবিষ্ট (সম্ভবত কুর্মাসনে) পুরুষমূর্তির সিলমোহরটিও শিবসদৃশ দেবতার ইঙ্গিত দেয়, যাকে বিখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক স্যার জন মার্শাল এবং পরবর্তীকালে ঐতিহাসিক এ. এল. ব্যাসাম ‘আদিশিব’ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন।

ঋগ্বেদে ‘শিব’ নামে কোনো দেবতার উল্লেখ পাওয়া যায় না। কিন্তু ‘রুদ্র’ নামে এক ভয়ংকর দেবতার অস্তিত্ব প্রবলভাবে বিরাজমান। ঋগ্বেদে ইনি অতি উগ্র ও বলশালী এবং ভয়াবহ জন্তুর মতো ধ্বংসকারীরূপে বর্ণিত হয়েছেন। যজুর্বেদে তিনি মুক্তিদাতা ও ভিষক্ এবং অথর্ববেদেও তিনি ভীষণ ধ্বংসের দেবতা। আবার ঋগ্বেদে তাঁকে মরুৎ-গণের পিতা রূপেও উল্লেখ করা হয়েছে। ইতিহাসবিদ নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের গবেষণা থেকে জানা যায় যে, বৈদিক সাহিত্যের রুদ্রদেবতার সঙ্গে কালক্রমে প্রাগৈতিহাসিক শিবের সঙ্গে অভিন্ন সমীকরণ ঘটেছিল। শেষপর্যন্ত গুপ্তযুগে (৩০০ — ৬০০ খ্রিস্টাব্দ) যে ‘ত্রিমূর্তি’ তত্ত্ব কল্পিত হয়েছিল, যার সৃষ্টিকর্তা ছিলেন ব্রহ্মা, পালনকর্তা বিষ্ণু এবং তাঁদের সঙ্গে সংহারকর্তা হিসাবে শিব বা মহেশ্বরকে সংযুক্ত করে তাকে সম্পূর্ণ রূপ প্রদান করা হয়।

প্রাচীন বঙ্গদেশে শিব ছিলেন গুরুত্বের দিক থেকে দ্বিতীয় দেবতা, অর্থাৎ বিষ্ণুর পরেই ছিল তাঁর স্থান। পাল যুগে (আনুমানিক ৭৫০ – ১১৭৫-৭৬ খ্রিস্টাব্দ) শিবের অসংখ্য মূর্তি নির্মাণ করা হয়েছিল। পাল-নৃপতিদের মধ্যে প্রায় তিনজন সম্রাট ছিলেন শৈব ধর্মাবলম্বী। পাল পূর্ব যুগে বাংলার ‘প্রথম সার্বভৌম নৃপতি’ শশাঙ্ক ছিলেন শিবের উপাসক। এমনকি পাল-পরবর্তী, পরম বৈষ্ণব সেননৃপতি লক্ষণসেনের (১১৭৯ – ১২০৫ খ্রিস্টাব্দ) শক্তিপুর তাম্রশাসনে (মুর্শিদাবাদ জেলায়) সদাশিবের মূর্তি সহ ‘শিবম্ ওঁ নমো নারায়ণায়’ খোদিত রয়েছে।

উমা-মহেশ্বরের মূর্তি

খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে মনুষ্য রূপকল্পে শিবের পূজা-অর্চনা শুরু হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, মনুষ্য মূর্তির তুলনায় শিবের লিঙ্গ প্রতীক ভক্তদের মননে অধিক প্রাণবন্ত, যেমন লিঙ্গপুরাণে (১৮.১৫) বলা হয়েছে: “লিঙ্গং সাক্ষান্মহেশ্বরঃ” অর্থাৎ লিঙ্গই সাক্ষাৎ মহেশ্বর।১০ খ্রিস্টিয় ষষ্ঠ শতকে অর্থাৎ গুপ্তযুগের শেষ দিকে লিঙ্গ ও যোনি প্রতীকের সমন্বয়সাধন সম্পূর্ণ হয় এবং গৌরীপট্টসহ শিবলিঙ্গ বর্তমান রূপ পরিগ্রহ করে।১১

মূর্তিশাস্ত্র অনুসারে, শিবের মনুষ্যমূর্তিকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়, যথা – সৌম্য ও রুদ্র। অন্যদিকে এ.এল. শ্রীবাস্তব শিবের প্রতিমা বিগ্রহগুলিকে নিম্নলিখিত পাঁচটি শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন: ১) সংহারমূর্তি, ২) উগ্রমূর্তি, ৩) অনুগ্রহমূর্তি, ৪) সৌম্যমূর্তি ও ৫) নৃত্যমূর্তি।১২

শিবের সৌম্য মূর্তিগুলি ভারতীয় উপমহাদেশে বিভিন্ন অঞ্চলে পাওয়া গিয়েছে, যার মূর্তিতাত্ত্বিক রূপ গুলি হল চন্দ্রশেখর মূর্তি, আলিঙ্গনমূর্তি, সোমস্কন্ধ, অর্ধনারীশ্বর, কল্যাণসুন্দর, উমা-মহেশ্বরমূর্তি ইত্যাদি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তবে শিবের সৌম্য রূপকল্পনার অনবদ্য প্রকাশ ঘটেছে উমা-মহেশ্বরের প্রতিমায়। আদি-মধ্যযুগের পূর্বভারতে তথা অবিভক্ত বঙ্গে বিপুল সংখ্যক উমা-মহেশ্বরের প্রস্তর নির্মিত বিগ্রহের নিদর্শন পাওয়া যায়। বিখ্যাত পণ্ডিত নলিনীকান্ত ভট্টশালী শিব ও পার্বতীর এই জাতীয় ভাস্কর্যকে ‘উমালিঙ্গন মূর্তি’ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন।১৩

মূর্তিশাস্ত্রে উমা-মহেশ্বর

উমার সর্বপ্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় কেনোপনিষদে (৩/১২ এবং ৪/১)। এখানে তিনি ‘উমা-হৈমবতী’ নামে উচ্চারিত।১৪ আদি-মধ্যযুগে কাশ্মীরে রচিত বিষ্ণুধর্মোত্তর উপপুরাণে দ্বিভুজ শিব ও উমার ঐশ্বরিক যুগল মূর্তির বর্ণনা রয়েছে।১৫ এখানে শিব জটাজুটধারী ও অর্ধচন্দ্রশোভিত। তাঁর একটি হস্ত উমার স্কন্ধে এবং অপর হস্তে পদ্ম ধারণ করে থাকবেন। অন্যদিকে উমার দক্ষিণ হস্ত থাকবে শিবের স্কন্ধে এবং বাম হস্তে থাকবে দর্পণ।

উমা-মহেশ্বর মূর্তির নির্মাণ-শৈলীর বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় মৎস্যপুরাণে (রচনাকাল: ২৫০ — ৫০০ খ্রিস্টাব্দ)। এই মহাপুরাণের ২৬০তম অধ্যায়ের উমা-মহেশ্বর মূর্তি প্রসঙ্গে বর্ণিত বক্তব্যকে মোটা দাগে সাজালে হবে এইরকম:১৬

১। মহেশ্বর বা শিবের মূর্তি হবে চতুর্ভুজ অথবা দ্বিভুজ এবং তাঁর জটাভার চন্দ্রভূষণে বিভূষিত থাকবে।

২। তিনি ত্রিনয়ন। তাঁর একটি হস্ত উমার দক্ষিণ স্কন্ধে ন্যস্ত থাকবে এবং বামহস্ত উমার কুচ বা স্তনের উপর রক্ষিত থাকবে।

৩। দেবী উমা মহাদেবের বামাংশ স্পর্শ করবেন এবং তাঁর দক্ষিণ বাহু মহেশ্বরের দক্ষিণ পার্শ্ব অতিক্রম করে প্রসারিত হবে।

৪। যুগল মূর্তির উভয় পার্শ্বে জয়া, বিজয়া, কার্তিকেয়, গণপতি, মালাহাতে বিদ্যাধরগণ এবং বীণা হাতে অপ্সরাগণ দণ্ডায়মান থাকবেন।

খ্রিস্টিয় দ্বাদশ শতকে ভুবনদেব কর্তৃক রচিত ‘অপরাজিতপৃচ্ছা’ নামক একটি শিল্পশাস্ত্রে উমা-মহেশ্বর ভাস্কর্যের বিবরণের সঙ্গে বিষ্ণুধর্মোত্তর উপপুরাণের প্রদত্ত বর্ণনার অনেক সাদৃশ্য পাওয়া যায়। তবে শিব এখানে দ্বিভুজ নন ; তিনি চতুর্ভুজ। ভাস্কর্যের নিম্নভাগে গণপতি ও কার্তিকেয় এবং শিবের অনুচর নন্দী ও ভৃঙ্গী বিরাজমান থাকবেন।১৭

আবার খ্রিস্টিয় পঞ্চদশ শতকে রাজস্থানে রচিত ‘রূপমণ্ডন’ গ্রন্থে সূত্রধার মণ্ডন উমা-মহেশ্বর প্রতিমার যে বর্ণনা দিয়েছেন, তার সঙ্গে  মৎস্যপুরাণ ও অপরাজিতপৃচ্ছা-র বর্ণনার সাদৃশ্য অত্যন্ত বেশি। তবে এখানে শিবের চতুর্ভুজ এবং উমার দ্বিভুজ রূপের কল্পনা করা হয়েছে। রূপমণ্ডনের চতুর্থ অধ্যায়ে এই মর্মে বলা হয়েছে যে, শিবের দক্ষিণ হস্তদ্বয়ে ত্রিশূল ও মাতুলিঙ্গ ফল থাকবে এবং একটি বাম হস্তে উমাকে আলিঙ্গন করবেন এবং অপর বাম হস্তে থাকবে নাগেন্দ্র বা সর্প। অন্যদিকে উমার একটি হাত শিবের স্কন্ধে এবং অপর হাতে থাকবে দর্পণ।১৮ এছাড়া ত্রয়োদশ শতকে রচিত হেমাদ্রির ‘চতুর্বর্গ-চিন্তামণি’ এবং ঊনিশ শতকের ‘শ্রীতত্ত্বভানিধি’ নামক শিল্পশাস্ত্রেও পরোক্ষভাবে উমা-মহেশ্বর ভাস্কর্যের উল্লেখ রয়েছে।

অবিভক্ত বঙ্গের রংপুর সাহিত্য পরিষদ পত্রিকায়  লিখিত এক সন্দর্ভে পণ্ডিত বিপিনচন্দ্র কাব্যরত্ন একটি অজ্ঞাতনামা পুরাণ থেকে উমা-মহেশ্বর মূর্তির প্রসঙ্গে যা লিখেছিলেন তার মূল বক্তব্য হল – শিব হবেন চতুর্ভুজ। তিনি উপরের বাম হাতে ত্রিশূল ধারণ করবেন এবং নীচের হাত দেবীর বক্ষস্পর্শী হবে। ঊর্ধ্বের দক্ষিণ বাহু নাগপাশ বা খট্টভাঙ্গকে ধারণ করবে এবং অপর দক্ষিণ হস্তে তিনি দেবীর চিবুককে স্পর্শ করবেন।১৯

সাহিত্যে উমা-মহেশ্বর

উপরোক্ত শিল্পশাস্ত্রগুলি থেকে শুধুমাত্র উমা-মহেশ্বরের ভাস্কর্য নির্মাণ করার নির্দেশিকা পাওয়া যায়। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই ধরনের ভাস্কর্ষের উৎপত্তির উৎস কী? অথবা শিল্পী কীভাবে উমা-মহেশ্বরের এই রূপটি তৈরি করার অনুপ্রেরণা পেলেন? এই প্রশ্নগুলির উত্তর পেতে আমাদের প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যের মধ্যে অনুসন্ধান করতে হবে।

উমা-মহেশ্বরের প্রতিমার ভাবনার সর্বপ্রথম সামান্য প্রতিফলন পাওয়া যায় কবিবর শূদ্রক প্রণীত মৃচ্ছকটিক নাটকে। খ্রিস্টিয় প্রথম শতকে রচিত এই সংস্কৃত নাটকের প্রথম অঙ্কের নান্দীমুখ অংশে বলা হয়েছে : “বিদ্যুতের রেখার ন্যায় সুন্দরী গৌরীদেবীর বাহুলতার সংস্পর্শে সুশোভিত এবং নবজলধরসদৃশ্য নীলবর্ণ, নীলকন্ঠের কণ্ঠপ্রদেশ তোমাদিগের মঙ্গল করুন”।২০

মৃচ্ছকটিক নাটক ব্যতীত কালিদাসের কুমারসম্ভব কাব্যে, ভাগবতপুরাণ ও স্কন্দপুরাণে পাওয়া যায়। কুমারসম্ভব কাব্যে (সময়কাল: আনুমানিক পঞ্চম শতক) বর্ণিত হয়েছে যে, বিবাহোৎসব সমাপ্ত করে নবপরিণীতা উমাকে নিয়ে স্বয়ং শিব মধুচন্দ্রিমার জন্য ভ্রমণে শুরু করলেন – মেরু, কৈলাস, মন্দর ও মলয়পর্বতে। সেখানে শিব তাঁর নববধূকে আকাশবাহিনী গঙ্গা ও নন্দনকানন দর্শন করান। অবশেষে গন্ধমাদনপর্বতে দীর্ঘদিন অতিবাহিত হল উমা-মহেশ্বরের মিলিত জীবন। কালিদাসের বর্ণনায় (৮/২২):

মেরুমেত্য মরুদাশুবাহনঃ পার্ব্বতীস্তনপুরস্কৃতঃ কৃতী ।

হেমপল্লববিভঙ্গসংস্তরানন্বভূৎ সুরততৎপরঃ ক্ষপাম্‌ ॥

(অনুবাদ: সেই সুদক্ষ মহেশ্বর বায়ুবৎ বেগগামী বৃষ-হনে পার্ব্বতীকে পুরোভাগে আরোহণ করাইয়া, তাঁহার স্তনদ্বয় আলিঙ্গন পূর্বক সুমেরূপর্ব্বতে আগমন করিলেন; তথায় হেমপল্লবখণ্ড দ্বারা শয্যা রচনা পূর্বক সুরত-ব্যাপারে নিরত হইয়া রাত্রিযাপন করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। – শ্রীশরচ্চন্দ্র চক্রবর্তী)২১

আবার কুমারসম্ভব-এর অষ্টম সর্গের ২৯তম শ্লোকে রয়েছে :

তত্র কাঞ্চনশিলাতলাশ্রয়ো, নেত্রগম্যমবলোক্য ভাস্করম্।

দক্ষিণেতরভুজব্যপাশ্রয়াং, ব্যাজহার সহধর্ম্মচারিণীম্ ॥

(অনুবাদ: তথায় স্বর্ণময় শিলাপটে আশ্রয়গ্রহণ পূর্ব্বক ভাস্করদেবকে দর্শনযোগ্য দেখিয়া সহধর্মিণী পার্ব্বতীকে বামবাহুপাশে ধারণ করিয়া বলিতে লাগিলেন। — শ্রীশরচ্চন্দ্র চক্রবর্তী)২২

কুমারসম্ভব কাব্যের অষ্টম সর্গ ব্যতীত নবম সর্গের ৩১-৩৬ পর্যন্ত শ্লোকগুলির  অপরূপ মুহূর্তগুলিই ভারতীয় শিল্পীদের গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, কুমারসম্ভব-এর ১৭টি সর্গ পাওয়া গেলেও কালিদাসের টীকাকার মল্লিনাথের মতে প্রথম আটটি সর্গই মহাকবির নিজস্ব।

এছাড়া খ্রিস্টিয় দশম শতকে রচিত ভাগবতপুরাণের ষষ্ঠ অধ্যায়ে এই ঐশী দম্পতির প্রেমালিঙ্গন পর্বের একটি চমৎকার বর্ণনা এবং স্কন্দ পুরাণের (সময়কাল : ৭০০ – ১১৫০ খ্রিস্টাব্দ) অবন্তীখণ্ডের অন্তর্গত কুন্দেশ্বর-মাহাত্ম্য অধ্যায়ে উজ্জয়িনির মহাকালবনের কাহিনিটিও শিল্পীদের প্রেরণা যুগিয়েছিল।২৩

উমা-মহেশ্বর ভাস্কর্যের রূপায়ণ

ভারতীয় উপমহাদেশে উমা-মহেশ্বর ঐশ্বরিক রূপকল্পনার সর্বপ্রথম বাস্তবায়ন ঘটে খ্রিস্টিয় দ্বিতীয় শতকে কুষাণ বংশীয় নৃপতি হুবিষ্কের (আনুমানিক ১৫০ – ১৯০ খ্রিস্টাব্দ) স্বর্ণমুদ্রায়।২৪ অতঃপর খ্রিস্টিয় ষষ্ঠ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ অর্থাৎ গুপ্ত যুগের শেষ দিকে, বিশেষত এলিফ্যান্টা গুহা এবং ইলোরা গুহায় শৈব ধর্মের বিষয়গুলিকে চিত্রিত করার মধ্যে দিয়ে উমা-মহেশ্বর ভাস্কর্যের জনপ্রিয়তা সূচিত হয়।

অন্যদিকে প্রখ্যাত নেপালি শিল্প-গবেষক লেন সিং বঙ্গদেল তাঁর “দ্য আর্লি স্কাল্পচার্স অফ নেপাল” (The Early Sculptures of Nepal) গ্রন্থে এই মর্মে দেখিয়েছেন যে, নেপালে কতিপয় উমা-মহেশ্বর প্যানেল খ্রিস্টীয় তৃতীয়, চতুর্থ এবং পঞ্চম শতাব্দীতে নির্মিত হয়েছিল। তবে এই সময়ে শিব ছিলেন দ্বিবাহু। তাঁর মতে, খ্রিস্টীয় এবং ষষ্ঠ শতাব্দীর পর থেকে নেপালের সর্বত্রই তিনি চতুর্ভুজ দেবতা।২৫

সুতরাং  ভারতে উমা-মহেশ্বর ভাস্কর্যের রূপায়ণের সূচনার অনতিকাল পরেই ‘হিমালয় কন্যা’ নেপালে এই বিগ্রহ-খোদাইয়ের কাজ শুরু হয়েছিল। পাশাপাশি এটাও সত্য যে, নেপালে শৈব ধর্ম প্রবর্তনের আগেই এটি ভারতের মাটিতে সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল। এই প্রসঙ্গে বিশিষ্ট গবেষক কৃষ্ণ দেব সঠিকভাবেই বলেছেন যে, নেপালি শিল্পীরা উমা-মহেশ্বরের ভারতীয় উপস্থাপনা দ্বারাই প্রভাবিত হয়েছিলেন।২৬

প্রাচীন বঙ্গে উমা-মহেশ্বর

বাংলায় উমা-মহেশ্বর মূর্তির যুগলরূপের অজস্র ভাস্কর্য পালনৃপতিদের রাজত্বকালে (আনুমানিক সময়কাল: ৭৫০ – ১১৭৫-৭৬ খ্রিস্টাব্দ) নির্মিত হয়েছিল। সমকালের শ্রুতকীর্তি কবি সন্ধ্যাকর-নন্দীর ২২০টি শ্লোকের উপর প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক কাব্য ‘রামচরিত’-এ পাওয়া যায় যে, কৈবর্ত বিদ্রোহের নায়ক দিব্য বা দিব্যোক-এর ভ্রাতুষ্পুত্র ভীমের আরাধ্য দেবতা ছিলেন এই উমা-মহেশ্বর মূর্তি।২৭

এখন প্রশ্ন হল, আদি-মধ্যযুগের বঙ্গে বিপুল সংখ্যায় উমা-মহেশ্বরের মূর্তি কেন তৈরি হয়েছিল? এবিষয়ে বিখ্যাত ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদার, জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও নীহাররঞ্জন রায় এবং সাম্প্রতিক কালে এনামূল হকের গবেষণা থেকে জানা যায় যে, সমগ্র বঙ্গদেশ তথা পূর্ব ভারতে উমা-মহেশ্বরের ঐশ্বরিক উপাসনার পিছনে মুখ্য কারণ ছিল তান্ত্রিক সাধনার তীব্র প্রাবল্য। এই প্রসঙ্গে জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন: “One of the threefold vows undertaken by Tantric worshippers of Tripurasundari is to concentrate the mind on the Devi as sitting on the lap of Siva in the mahapadmavana, and it is no wonder that initiates into the Sakti cult will have requisitioned these images as aids to concentration of mind.”২৮ (ভাবানুবাদ: ত্রিপুরাসুন্দরী দেবীর তান্ত্রিক উপাসকদের ত্রিবিধ শপথগুলির মধ্যে একটি হল মহাপদ্মাবনে শিবের ক্রোড়ে বসা দেবীর প্রতি মনকে কেন্দ্রীভূত করা এবং এই চিত্রগুলি শাক্ত ধর্মে দীক্ষিতদের মনের একাগ্রতার সহায়ক হিসাবে কাজ করবে, তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই।)

একই বক্তব্য অনুরণিত হয়েছে রমেশচন্দ্র মজুমদার কণ্ঠেও। ‘বাংলা দেশের ইতিহাস’ গ্রন্থে তিনি লিখেছেন: “সম্ভবত তান্ত্রিক ধর্মমতের প্রভাবেই বাংলায় এই মূর্তির (উমা-মহেশ্বর মূর্তির) বহুল প্রচার হইয়াছিল। কারণ তন্ত্রমতে সাধকগণকে শিবের ক্রোড়ে উপবিষ্টা দেবী মূর্তিকে ধ্যান করিতে হয় এবং এই প্রকার মূর্তি সম্মুখে রাখিলে এই ধ্যানযোগের সুবিধা হয়।”২৮ অনুরূপভাবে ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস: আদি পর্ব’ গ্রন্থে ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায়ও উমা-মহেশ্বরের যুগল মূর্তি সৃজনের পিছনে তন্ত্রসাধনার বিশেষ গুরুত্বের কথা উল্লেখ করেছেন।২৯

আবার নলিনীকান্ত ভট্টশালীকে অনুসরণ করে বাংলাদেশের প্রখ্যাত মূর্তি-বিশেষজ্ঞ এনামুল হক এই প্রসঙ্গে সেননৃপতি লক্ষণসেনের মাধাইনগর তাম্রশাসন ও ভাওয়াল তাম্রশাসনের উপর আমাদের বিশেষ  দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।৩০ বঙ্গীয় নৃপতি লক্ষ্মণসেনের (আনু. ১১৭৯ – ১২০৫ খ্রিস্টাব্দ) মাধাইনগর তাম্রশাসনের প্রথম পঙক্তিতে এই মর্মে রয়েছে যে, স্বয়ং শিব তাঁর স্ত্রী গৌরীকে শরতের মেঘে বিদ্যুতের মতো কোলে নিয়েছিলেন। আবার ভাওয়াল তাম্রশাসনেও উমা-মহেশ্বরের অনুরূপ বর্ণনা রয়েছে।

উমা-মহেশ্বর মূর্তির বৈশিষ্ট্য

অবিভক্ত বাংলায় যে সমস্ত উমা-মহেশ্বর মূর্তির নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে, সেগুলিকে মোটা দাগে সাজালে হবে এইরকম:

১) সময়কালের বিচারে বাংলার উমা-মহেশ্বর মূর্তিগুলি পাল-সেন শাসনামলের (আনু. ৭৫০ – ১২৫০ খ্রিস্টাব্দ) সৃষ্টি।

২) এখানকার প্রতিটি ভাস্কর্যে শিব হলেন চতুর্ভুজ এবং উমা দ্বিভুজ। তাঁরা উভয়েই পদ্মের উপর উপবিষ্ট এবং শিবের বাম জানুর উপর দেবী সুখাসনে উপবিষ্টা।  প্রতিমার নিম্নে শিবের বাহন নন্দী এবং দেবী উমার বাহন সিংহ খোদিত রয়েছে।

৩) হরগৌরী উভয়কেই শিল্পীরা বৈচিত্র্যময় অলংকারে ভূষিত করেছেন। শিব জটা-মুকুটে এবং দেবীর শিরোমাল্য বিভূষিত হয়েছে উত্থিত কবরীতে। এছাড়া শিব দম্পতি কুণ্ডল, নূপুর, কোমরবন্ধ প্রভৃতি অলংকারে সুসজ্জিত থাকেন।

৪) প্রতিটি বিগ্রহের উপরের দুদিকে মালা হাতে বিদ্যাধরদ্বয় মেঘের কোলে উৎকীর্ণ রয়েছেন। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ এ. এল. ব্যাসাম তাঁদের ‘স্বর্গের জাদুকর’ আখ্যা দিয়েছেন।৩১ মূলত স্বর্গীয় সৌন্দর্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই তাঁদের সৃষ্টি।

৫) ভাস্কর্যের একেবারে শীর্ষে খোদিত থাকে গর্জনরত সিংহের ভয়ংকর মুখাকৃতি, যা মূর্তিশাস্ত্রে ‘কীর্তিমুখ’ বা The Face of Glory নামে সুপ্রসিদ্ধ। সাধারণত গর্জনরত সিংহ শক্তির প্রতীক হিসাবে ব্যবহৃত হয়।

৬) উমা-মহেশ্বরের অধিকাংশ বিগ্রহই কষ্ঠি পাথর বা ব্যাসাল্ট শিলায় নির্মিত হয়েছিল, যার প্রাপ্তিস্থান ছিল রাজমহল পাহাড়।

সমকালীন শিল্পরীতির সঙ্গে তুলনা

পাল-সেন যুগের সমকাল অথবা তার অনতিকাল পরবর্তী সময়ে, দাক্ষিণাত্যের মহীশূরে (বর্তমানে কর্ণাটক রাজ্য) হোয়শাল সাম্রাজ্যের নৃপতিরা রাজত্ব করছিলেন। খ্রিস্টিয় দ্বাদশ থেকে চতুর্দশ শতকে হোয়শালদের শাসনাধীনে প্রায় ৮০টির মতো মন্দির নির্মিত হয়েছিল, যার মধ্যে বেলুরের চেন্না কেশব মন্দির (প্রতিষ্ঠা: ১১১৭ খ্রিস্টাব্দ), হালোবিড়ের হোয়শালেশ্বর মন্দির (প্রতিষ্ঠা: ১১২১ – ১১৬০ খ্রিস্টাব্দ) এবং সোমনাথপুরমের কেশব মন্দির (প্রতিষ্ঠা: ১২৬৪ খ্রিস্টাব্দ) হল সুপ্রসিদ্ধ। এই মন্দিরগুলি বেসর রীতিতে নির্মিত হলেও মন্দির-গাত্রের ভাস্কর্যগুলি অতুলনীয়।৩২

হোয়শাল শিল্পরীতিতে মন্দির-গাত্রে অসংখ্য ব্রাহ্মণ্য দেবদেবীর ভাস্কর্য নির্মিত হয়েছিল, যার মধ্যে উমা-মহেশ্বরের প্রায় দুই ধরনের ভাস্কর্য দেখা যায়। প্রথম ভাস্কর্যে বৃহদাকার নন্দীর উপর উমা-মহেশ্বর উভয়েই উপবিষ্ট। এখানে শিব চতুর্বাহুবিশিষ্ট। তাঁর বাম ক্রোড়ে আলিঙ্গনরত অবস্থায় উমা উপবিষ্ট রয়েছেন। তাঁরা উভয়ইে ভারী অলংকারে বিভূষিত। তবে বিদ্যাধরদ্বয় ও কীর্তিমুখ এখানে অনুপস্থিত। পরিবর্তে ভাস্কর্যের চালির অংশটি লতাপাতা ও পুষ্প দ্বারা পরিবেষ্টিত রয়েছে। মহাকবি কালিদাসের কুমারসম্ভব কাব্যের অষ্টম সর্গের শ্লোকগুলি এখানে অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক।

দ্বিতীয় ভাস্কর্যে শিবের বাহন নন্দী অনুপস্থিত। পরিবর্তে শিল্পীরা মহেশ্বরের বাম ক্রোড়েই তাঁর প্রিয়তমা পত্নী উমাকে আলিঙ্গন মুদ্রায় বসিয়েছেন। এখানেও শিব চতুর্ভুজ। তাঁর পশ্চাতের দক্ষিণ ও বাম হস্তে যথাক্রমে ত্রিশূল ও ডমরু ভূষণ এবং সম্মুখের দক্ষিণ হস্তে অক্ষমালা এবং বাম হস্ত উমার স্কন্ধে বিদ্যমান। এখানেও বিদ্যাধরদ্বয় ও কীর্তিমুখ অনুপস্থিত। তবে দেবীর চরণতলে গোধিকা বিরাজমান।

সুতরাং, পাল-সেন শিল্পরীতির সঙ্গে হোয়শাল রীতির উমা-মহেশ্বর ভাস্কর্যের মূল পার্থক্য হল ভাস্কর্যের গড়ন ও ভঙ্গিমায়। পাল-সেন রীতিতে হরগৌরীর মুখমণ্ডলে স্মিত হাস্য বিদ্যমান। কিন্তু হোয়শাল ভাস্কর্যে উমা-মহেশ্বরের মুখমণ্ডলে স্মিত হাসি অনুপস্থিত। পরিবর্তে উভয় দেবদেবীকে যেন কিছুটা কঠোর মনোভঙ্গিমায় শিল্পীরা দর্শকদের সম্মুখে উপস্থাপিত করেছেন। দ্বিতীয়ত, হোয়শাল রীতিতে দেবী উমার বাহন হিসাবে সিংহ অদৃশ্য। তবে দেবীর পদতলে গোধিকা বিদ্যমান। সর্বোপরি, হোয়শাল শিল্পরীতিতে দেবদেবীর অলংকারের আতিশয্য এবং বৃক্ষ ও লতা-পুষ্পের আচ্ছাদনের বাহুল্য পাল-সেন শিল্পরীতিতে একেবারেই  অনুপস্থিত।

উপসংহারের পরিবর্তে

সুতরাং সুদীর্ঘ আলোচনার পরে কয়েকটি বিষয় সংক্ষেপে রেখে বক্ষমান প্রবন্ধের সমাপ্তি টানবো। প্রথমত, উমা-মহেশ্বরের মূর্তি হল ঐশ্বরিক দম্পতি শিব ও পার্বতী বা উমার অন্তরঙ্গ দাম্পত্য মিলনের অলোকসুন্দর প্রতিচ্ছবি। ফলস্বরূপ ভারতীয় ভাস্কর্য শিল্প দু’দিক থেকে বিশেষ উপকৃত হয়েছিল, যথা –

১) আদি মধ্যযুগে উত্তর ও পূর্ব ভারতে মূর্তি নির্মাণের পাশাপাশি দক্ষিণ ভারতীয় মন্দির শিল্পে এটি একটি জনপ্রিয় ভাস্কর্য  হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছিল। এমনকি এই ভাস্কর্যের গঠনগত সৌন্দর্য দর্শক-মননে এতটাই চিত্তাকর্ষক ও আকর্ষণীয় হয়েছিল যে, তার জনপ্রিয়তা কেবলমাত্র সমগ্র ভারতবর্ষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। নেপাল, কম্বোডিয়া ও জাপানে উমা-মহেশ্বরের ঐশ্বরিক দম্পতির বহু ভাস্কর্য নির্মিত হয়েছিল।

চিত্র-১

২) অন্যদিকে ভারতীয় শিল্পকলায় লক্ষ্মী-নারায়ণ, লক্ষ্মী-নৃসিংহ, লক্ষ্মী-বরাহ, ব্রহ্মা-সাবিত্রী, শক্তি-গণপতি প্রভৃতি ঐশ্বরিক যুগলমূর্তিগুলির সৃজনে অত্যন্ত গভীর ও বিপুল প্রভাব রেখেছিল উমা-মহেশ্বরের আলিঙ্গন মূর্তিগুলি।

দ্বিতীয়ত, ভারতীয় শিল্পশাস্ত্রগুলিতে উমা-মহেশ্বর মূর্তিতত্ত্ব অধ্যয়ন করলে দেখা যায় যে, এখানে শিব ও উমা হলেন প্রধান চরিত্র। শিব সাধারণত দ্বিভুজ ও চতুর্ভুজরূপে কল্পিত। কিন্তু উমা সর্বদাই দ্বিভুজ। কিন্তু সুদীর্ঘকাল থেকে ভারতীয় সংস্কৃতিতে বহুত্ববাদী ঐতিহ্য চির-বহমান। স্বাভাবিক ভাবেই আঞ্চলিক ঐতিহ্য এবং শিল্পীর কল্পনাকে  ভিত্তি করে উমা-মহেশ্বরের মূর্তি নির্মাণে সামান্য পরিবর্তন হয়েছে, তার অসামান্য দৃষ্টান্ত আমরা পূর্বাঞ্চলীয় শিল্পরীতি ও হোয়শাল শিল্পশৈলীতে পেয়েছি। আবার খ্রিস্টিয় দশম-একাদশ শতকে মধ্য ভারতের চান্দেল্ল শিল্পরীতিকে অবলম্বন করে  যে খাজুরাহের মন্দির নির্মিত হয়েছিল, তার মন্দির-ভাস্কর্যে রূপায়িত উমা-মহেশ্বরের মূর্তিগুলির স্বাতন্ত্র্যও বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

তৃতীয়ত, আমরা লক্ষ্য করেছি যে, আদি মধ্যযুগে বাংলায় তান্ত্রিক সাধনার বাড়বাড়ন্তের কারণে উমা-মহেশ্বর ভাস্কর্যের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছিল। ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে এই সব অলোকসামান্য ভাস্কর্যের নির্মাণকালকে আমরা আনুমানিক দশম থেকে একাদশ – দ্বাদশ শতকের সময়সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে পারি। ভারতীয় উপমহাদেশের ধর্ম-সংস্কৃতির ইতিহাসে সময়টা ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই সময়ে তান্ত্রিকতা বৌদ্ধধর্মকে এমনভাবে প্রভাবিত করেছিল যে, শেষপর্যন্ত বৌদ্ধধর্ম ভারতবর্ষ থেকে চিরকালের জন্য অন্তর্হিত হয়েছিল।

সবচেয়ে বড় কথা হল, উমা-মহেশ্বরের প্রতিটি শিল্পকর্মে ভাস্কর্য-শিল্পীরা তাঁদের কোনো নাম-পরিচয় খোদাই করেননি। এথেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, খ্যাতি বা আত্মপ্রচারের অভিলাষী তাঁরা ছিলেন না। কিন্তু তাঁদের অতুলনীয় শিল্পকীর্তি থেকে একথা প্রমাণিত হয় যে, সহস্র বছর অতীতের সেই অজ্ঞাত শিল্পীদের  উপলব্ধির জায়গাটা ছিল গভীর ও অকল্পনীয়। তাঁরা শুধুমাত্র শিল্পী নন; শিল্পের অন্তরালে যেন ভারতীয় ধর্ম-সংস্কৃতির ক্রমবিবর্তনের এক পারঙ্গম বিদ্যোৎসাহী দার্শনিক। যাঁরা তাঁদের উত্তরাধিকার সূত্রে অর্জিত সাধনলব্ধ জ্ঞানের অনপনীয় স্পর্শ রেখে আলোচ্য ভাস্কর্যগুলির প্রতিটি নকশায় ও রূপকল্পে।

তথ্যসূত্র ও ঋণস্বীকার

১. A. L. Srivastava, Uma-Mahesvara : An Iconographic Study of the Divine Couple, Kasganj (U.P.), Sukarkshetra Shodh Sansthana, 2004, Page ix.

২. A. L. Srivastava, Uma-Mahesvara, Page 1.

৩. A. L. Srivastava, Uma-Mahesvara, Page 1.

৪. পণ্ডিতপ্রবর অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ, ভারত সংস্কৃতির উৎসধারা, কলকাতা, ভারতী লাইব্রেরি, ১৩৬৭ বঙ্গাব্দ, পৃ. ৫০।

৫. কল্যাণকুমার দাশগুপ্ত, প্রতিমাশিল্পে হিন্দু দেবদেবী, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, ২০১৬, পৃ. ৪২।

৬. A. L. Basham, The Wonder that was India, London, Picador, 2004, p. 23.

৭. K. A. Nilakanta Sastri, An Historical Sketch of Saivism (Article), Editor : Haridas Bhattacharyya, The Cultural Heritage of India, Volume lV, Calcutta, The Ramakrishna Mission Institute of Culture, 2018, p. 65.

৮. অমলকুমার মুখোপাধ্যায়, পৌরাণিকা, দ্বিতীয় খণ্ড, কলকাতা, ফার্মা কেএলএম প্রাইভেট লিমিটেড, ১৯৮৮, পৃ. ৫৪২।

৯. নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, ভারতীয় ধর্মের ইতিহাস, কলকাতা, জেনারেল,  ২০০০, পৃ. ১৯৯-২০০।

১০. কল্যাণকুমার দাশগুপ্ত, প্রতিমাশিল্পে হিন্দু দেবদেবী, পৃ. ৪২-৪৩।

১১. অশোক রায়, বিবর্তনের ধারায় শিব ও শিবলিঙ্গ, কলকাতা, আনন্দ পাবলিশার্স, ২০০৮, পৃ. ৮১।

১২. A. L. Srivastava, Uma-Mahesvara : An Iconographic Study of the Divine Couple, p. 5.

১৩. N. K. Bhattasali, Buddhist and Brahmanical Sculptures in the Dacca Museum, Dhaka, Bangladesh National Museum, 2008, p. 123.

১৪. অতুলচন্দ্র সেন, সীতানাথ তত্ত্বভূষণ ও মহেশচন্দ্র ঘোষ সম্পাদিত, উপনিষদ (অখণ্ড সংস্করণ), হরফ প্রকাশনী, কলকাতা, ২০১৫, পৃ. ৫২-৫৪।

১৫. T.A.G. Rao, Elements of Hindu Iconography, Vol. 2, Part : 2, Motilal Banarsidass, New Delhi, 2017, Appendix : B, p. 71.

১৬. আচার্য পঞ্চানন তর্করত্ন, মৎস্যপুরাণম্, কলকাতা, নবভারত পাবলিশার্স, ২০১৫, পৃ. ৮৯৮-৮৯৯।

১৭. A. L. Srivastava, Uma-Mahesvara : An Iconographic Study of the Divine Couple, p. 79.

১৮. ড. বলরাম শ্রীবাস্তব, রূপমণ্ডন (হিন্দি), নতুন দিল্লি, মোতিলাল বানারসিদাস, ১৯৯৬, পৃ. ১৫৭-১৫৮।

১৯. N. K. Bhattasali, Buddhist and Brahmanical Sculptures in the Dacca Museum, Dhaka, Bangladesh National Museum, 2008, p. 125.

২০. পণ্ডিতবর শ্রীরামময় শর্মা তর্করত্ন, মৃচ্ছকটিক নাটক, কলকাতা, ১৯৩১, পৃ. ১-২।

২১. পণ্ডিতবর শ্রীশরচ্চন্দ্র চক্রবর্ত্তী, কালিদাসের গ্রন্থাবলী, কলকাতা, ১৩২২ বঙ্গাব্দ, পৃ. ৯৩।

২২. পণ্ডিতবর শ্রীশরচ্চন্দ্র চক্রবর্ত্তী, কালিদাসের গ্রন্থাবলী, পৃ. ৯৪।

২৩. A. L. Srivastava, Uma-Mahesvara : An Iconographic Study of the Divine Couple, p. 24.

২৪. Suresh Pandey, Saiva Art and Iconography in Mathura, Proceedings of Indian History Congress, Vol. 61, Session 2001, p. 1248.

২৫. Lain S. Bangdel, The Early Sculptures of Nepal, Vikash Publishing House, U.P. 1982, p. 57-62.

২৬. A. L. Srivastava, Uma-Mahesvara : An Iconographic Study of the Divine Couple, p. 48.

২৭. মল্লার মিত্র ও কল্লোল দাশগুপ্ত, বাংলা ভাস্কর্যে উমা-মহেশ্বর মূর্তি (প্রবন্ধ), মূল গ্রন্থ: ইতিহাস অনুসন্ধান ২৬, পৃ. ১১১, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ ইতিহাস সংসদ, ২০১২ এবং মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিত, মেমোরিজ অব দ্য এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল, ভল্যুম III নং 1, ১৯১০, কলকাতা, পৃ. ৪৯।

২৮. Enamul Haque, Bengal Sculptures : Hindu Iconography upto C. 1250, B.D. National Museum, Dhaka, p. 153-154.

২৯. রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস, কলকাতা, জেনারেল প্রিন্টার্স য়্যান্ড পাব্লিশার্স লিমিটেড, ১৩৫২ বঙ্গাব্দ, পৃ. ১৫৮।

৩০. নীহাররঞ্জন রায়, বাঙ্গালীর ইতিহাস : আদি পর্ব, কলকাতা, দে’জ পাবলিশিং, ১৪০২ বঙ্গাব্দ, পৃ. ৫১৫।

৩১. Enamul Haque, Bengal Sculptures : Hindu Iconography upto C. 1250, p. 153-154.

৩২. A. L. Basham, The Wonder that was India, London, Picador, 2004, p. 320.

৩৩. অশোক ভট্টাচার্য, ভারতের ভাস্কর্য, কলকাতা, পারুল লাইব্রেরী প্রা. লি, ২০২১, পৃ. ১৮৬-১৮৭।

অন্যান্য সহায়ক প্রবন্ধ ও গ্রন্থ

১. শশিভূষণ দাশগুপ্ত, ভারতের শক্তি সাধনা ও শাক্ত সাহিত্য, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, ১৪০৯ বঙ্গাব্দ।

২. জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, পঞ্চোপাসনা, ফার্মা কে এল এম, কলকাতা,  ১৯৬০।

৩. কল্যাণকুমার গঙ্গোপাধ্যায়, বাংলার ভাস্কর্য, কলকাতা, সুবর্ণরেখা, ২০১৪।

৪. N. R. Banerjee, A Note on the Iconography of Uma-Maheshvara in Nepal. (প্রবন্ধ)

৫. Tejpal Singh & Sanjib K. Singh, Indian Bronze, New Delhi, National Museum, 2016.

৬. M. Rahaman, Sculpture in the Varendra Research Museum, University of Rajshahi, Bangladesh.

কৃতজ্ঞতা স্বীকার

সুভাষ পাণ্ডে (জিয়াগঞ্জ, মুর্শিদাবাদ), ও ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম (কলকাতা)।

ইতিহাসের শিক্ষক, প্রাবন্ধিক, দুই বন্ধু মিলে ‘অঙ্গাঙ্গি’ নামে একটি লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ করেন কান্দি থেকে

মন্তব্য তালিকা - “ইতিহাস ও বিবর্তনে বাংলার উমা-মহেশ্বর মূর্তি”

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।