সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ ও বাংলার বিজ্ঞানীরা

বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ ও বাংলার বিজ্ঞানীরা

শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়

জুন ১৩, ২০২৬ ১০৮ 0

উনিশ শতকে বাংলায় নবজাগরণের হাত ধরে নানা ধরনের সভা সমিতি গড়ে উঠেছিল। এই ধারার অন্যতম ফসল বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ। বাংলা ৮ শ্রাবণ, ১৩০০ বঙ্গাব্দ (ইং ২৩ জুলাই, ১৮৯৩) শোভাবাজারের রাজা বিনয়কৃষ্ণ দেবের বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘দি বেঙ্গল একাডেমি অফ লিটারেচার’। একাডেমির উদ্দেশ্য ছিল বাংলা ও সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে অধ্যয়ন, সেই সম্পর্কে আলোচনা এবংআলোচনা বিষয়ক সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা। সেই সময়ে একাডেমি একটি বাংলা অভিধান সংকলনেরও উদ্যোগ নিয়েছিল। কয়েক মাস পরে ১৭ বৈশাখ, ১৩০১ বঙ্গাব্দ (ইং ২৯ এপ্রিল, ১৮৯৪) থেকে এই সমিতিই পরিচিত হয় ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ’ নামে। রাজবাড়ির চৌহদ্দি এবং পরবর্তীকালে কর্নওয়ালিশ স্ট্রিট-এর (অধুনা বিধান সরণি) ভাড়া বাড়ি ছেড়ে ইং ৬ ডিসেম্বর, ১৯০৮ তারিখে পরিষৎ উঠে আসে তার নিজস্ব ভবন, ২৪৩/১ আপার সার্কুলার রোডে (অধুনা আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রোড)।

বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সঙ্গে যুক্ত হলেন সেকালের বাংলার সারস্বত সমাজ—কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, গবেষকবৃন্দ। এই ধারার কিয়দংশ এখনও বহমান। তবে যে প্রসঙ্গে এই লেখার অবতারণা তা হল এক ভিন্ন অঙ্গনের গুণীজনেরাও যুক্ত হলেন এই সাহিত্য গবেষণা কেন্দ্রের সঙ্গে। তৎকালীন বিজ্ঞানীরা যুক্ত হয়েছিলেন সাহিত্য পরিষদে। সভাপতি, সহ সভাপতি, সম্পাদক প্রভৃতি পদে বৃত থেকে তাঁরা বাংলা সাহিত্যকেও যেমন সমৃদ্ধ করেছেন, তেমনই সমৃদ্ধ হয়েছে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ।

১৩২৩ থেকে ১৩২৫ বঙ্গাব্দ পরিষদের সভাপতি ছিলেন আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু। ১৩১৮ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাসে পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মিলন ময়মনসিংহ অধিবেশনে জগদীশচন্দ্র যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তা ছিল মূলত বিজ্ঞান বিষয়ক। তাঁর আলোচনায় সহজ সাধারণ বোধ্য ভাষায় বর্ণিত হয়েছিল ‘অদৃশ্য আলোক’, ‘বৃক্ষ জীবনের ইতিহাস’, ‘বনচাঁড়ালের নৃত্য’ ইত্যাদির কথা। তবে কবিতা ও বিজ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্ক বিষয়ে তাঁর অভিমত বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রাপ্তি—’বৈজ্ঞানিকের পন্থা স্বতন্ত্র হইতে পারে কবিত্ব-সাধনার সহিত তাঁহার সাধনার ঐক্য আছে।’

চিত্র ১ – আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু।

প্রফুল্লচন্দ্র রায়, বিখ্যাত রসায়নবিদ, ওতপ্রোতভাবে যুক্ত হয়ে গেছিলেন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের প্রাত্যহিক কাজকর্মের সঙ্গে। ১৩০৮, ১৩১০, ১৩১৬-১৭, ১৩৩৪-৩৭ এই চারটি পর্বে সহ সভাপতি এবং ১৩৩৮-৪১ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন প্রফুল্লচন্দ্র। ১৩১৫ বঙ্গাব্দে রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মিলনে প্রফুল্ল চন্দ্রের অভিভাষণের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল সাহিত্য, ভাষাতত্ত্ব, বিজ্ঞানের পরিভাষা সংকলন ইত্যাদি। তিনি সাহিত্য সম্মেলনের কর্তাব্যক্তিদের বৈজ্ঞানিক পরিভাষা প্রণয়নের জন্য বিশেষভাবে উদ্যোগী হতে বলেছিলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বাংলায় জীববিদ্যার প্রথম বই ‘সরল প্রাণীবিজ্ঞান’ লিখেছিলেন প্রফুল্লচন্দ্র। বাংলার সমাজ-সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, বিজ্ঞানের ইতিহাস বিষয়ক একগুচ্ছ রচনা প্রফুল্লচন্দ্রের সাহিত্য রচনার উল্লেখযোগ্য কীর্তি। ১৩১৩ বাঙ্গাব্দে তাঁর বিখ্যাত বাংলা বই ‘নব্য রসায়নী বিদ্যা ও তাহার উৎপত্তি’ বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ থেকে প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথই বোধ হয় ঠিকমতো চিনেছিলেন প্রফুল্লচন্দ্রকে। একটি চিঠিতে কৌতুক করে তাঁকে লিখেছিলেন, ‘… ভাবছি স্বামী শ্রদ্ধানন্দের মত শুদ্ধির কাজে লাগব, যে সব জন্ম-সাহিত্যিক গোলমালে ল্যাবরেটরির মধ্যে ঢুকে পড়ে, জাত খুইয়ে বৈজ্ঞানিকের হাটে হারিয়ে গিয়েছেন তাদের ফের জাতে তুলব। আমার এক একবার সন্দেহ হয় আপনিও বা সেই দলের একজন হবেন; কিন্তু আর বোধ হয় উদ্ধার নেই।…’

চিত্র ২ – স্যার প্রফুল্লচন্দ্র রায়।

এর পর যাঁর কথা বলতে হয় তিনি রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী। রামেন্দ্রসুন্দর ১৮৮১ সালে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। ১৮৮৬ সালে  প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বি. এ. পরীক্ষায় বিজ্ঞানে অনার্সসহ প্রথম স্থান লাভ করেন। ১৮৮৭ সালে এম. এ. পরীক্ষাতেও  বিজ্ঞানে স্বর্ণপদক ও পুরস্কারসহ প্রথম স্থান অধিকার করেন। অবশেষে ১৮৮৮ সালে পদার্থবিদ্যা ও রসায়নে প্রেমচাঁদ-রায়চাঁদ বৃত্তি লাভ করেন। কর্মজীবনে রিপন কলেজ-এ (অধুনা সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) পদার্থবিদ্যা ও রসায়নের অধ্যাপক ও শেষে স্থায়ী অধ্যক্ষ হন। কলেজের পাশাপাশি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ ছিল তাঁর দ্বিতীয় কর্মক্ষেত্র। বাংলা সাহিত্য জগতে সাহিত্য পরিষদের গুরুত্বের মূলে তাঁর কর্মপ্রচেষ্টা ও আত্মত্যাগ স্মরণীয়। বিভিন্ন সময়ে পরিষদের সভাপতি, সহ সভাপতি, সম্পাদক প্রভৃতি পদে অধিষ্ঠিত থেকে তিনি পরিষদের নানা গুণগত উৎকর্ষ সাধন করেছেন। বিজ্ঞানের ছাত্র বা শিক্ষক হলেও তিনি ছিলেন বিজ্ঞান-সাহিত্যিক।

বিজ্ঞানের আর এক কৃতী ছাত্র এবং বেঙ্গল কেমিক্যালের ম্যানেজার রাজশেখর বসু ১৩৪০ এবং ১৩৪১ বঙ্গাব্দে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। সাহিত্য পরিষদের সাহচর্যে ১৯৩০ সালে বাংলা ভাষায় তাঁর অসামান্য কীর্তি বাংলা অভিধান ‘চলন্তিকা’ প্রকাশিত হয়। তাঁর রামায়ণ, মহাভারততের অনুবাদ গ্রন্থ আজও বাঙালির ঘরে ঘরে স্থান পায়। পরশুরাম ছদ্মনামে লেখা রসরচনা তাঁকে তৎকালীন বিদগ্ধ মানুষের কাছে পরিচিত করে তুলেছিল। রবীন্দ্রনাথ তাঁর সম্পর্কে প্রফুল্লচন্দ্রকে লিখেছিলেন, ‘আমি রস যাচাইয়ের নিকষে আঁচড় দিয়ে দেখলেম আপনার বেঙ্গল কেমিক্যালের এই মানুষটি একেবারেই কেমিক্যাল গোল্ড নন, ইনি খাঁটি খনিজ সোনা।’

চিত্র ৩ – রাজশেখর বসু।

সাহিত্য পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন আর এক বিজ্ঞানমুখী মানুষ যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি। ১৮৮৩ সালে উদ্ভিদবিদ্যায় এম. এ. পাস করে তিনি কটকের র‍্যাভেনশ কলেজের লেকচারার হন এবং একটানা ৩০ বছর অধ্যাপনা করেন। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের কর্মকান্ডে তাঁর নিবিড় যোগাযোগ ছিল।

রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়কে আমরা প্রত্নতাত্ত্বিক হিসেবেই জানি। ১৯১১ সালে তিনি ভারতীয় পুরাতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণে যোগ দেন। হরপ্পীয় সভ্যতার মূল কেন্দ্র মহেঞ্জোদাড়ো আবিষ্কারের মূল কৃতিত্ব তাঁর। রাখালদাস বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন। হরপ্পীয় সভ্যতার খননকার্যে পাওয়া বিভিন্ন ঐতিহাসিক সামগ্রী রাখালদাস বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে দান করেন। এগুলি সংগ্রহশালার অমূল্য সম্পদ। এ ছাড়াও বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক সামগ্রীর এক অমূল্য সংগ্রহ বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে রক্ষিত আছে। এই কাজ সম্ভব হয়েছিল রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের সক্রিয় উদ্যোগে।

নির্মলকুমার বসু সাহিত্য পরিষদের সম্পাদক ছিলেন। তিনি নৃতত্ত্ববিদ্যার কৃতি ছাত্র। ১৯৩১ সালে তিনি ভূতত্ত্ববিদ্যা নিয়ে বি.এস.সি পাশ করেন এবং  ১৯৩৫ সালে নৃতত্ত্ববিদ্যাতে  এম.এস.সি পাশ করেন। তাঁর পাণ্ডিত্যের খ্যাতি ছিল সারা বিশ্বে। এদেশে নৃতত্ত্ববিদ্যা, প্রত্নতত্ত্ববিদ্যা, সমাজবিজ্ঞান, ভূতত্ত্ববিদ্যা, লোকসংস্কৃতি প্রভৃতি জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা ক্ষেত্রে তাঁর অবদান উল্লেখ করার মতো। সাহিত্য পরিষৎ প্রকাশিত পাঁচ খণ্ডের ‘ভারতকোষ’-এর অন্যতম সৃজক ছিলেন নির্মলকুমার। ভারতকোষের কাজে বিজ্ঞান বিষয়ক টীকাগুলি লিখবার জন্য বিশিষ্ট বিজ্ঞানসাধকেরা পরিষদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু, ত্রিগুণা সেন, পদ্মনাভ দাশগুপ্ত, কপিল ভট্টাচার্য, মনীষা বসু, পশুপতি ভট্টাচার্য প্রমুখ।

চিত্র ৪ – নৃতত্ত্ববিদ নির্মলকুমার বসু।

এ ছাড়াও বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানী বিভিন্ন সময়েবঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। উল্লেখ করা যায় কয়েকজনের পরিচয়—প্রখ্যাত রসায়নবিদ চুনীলাল বসু ও পঞ্চানন নিয়োগী, চিকিৎসক-গবেষক এবং কলজ্বরের ওষুধ আবিষ্কারক উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী, বিশিষ্ট মনোবিদ গিরীন্দ্রশেখর বসু প্রমুখ। বাংলায় চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জীববিদ্যার পরিভাষা রচনায় সাহিত্য পরিষদের কর্মকাণ্ডে নিজেকে যুক্ত করেছিলেন ডা. একেন্দ্রনাথ ঘোষ। বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞান বিষয়ক লেখক গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য, রসায়নের অধ্যাপক ও বিজ্ঞান বিষয়ক লেখক ক্ষেত্রপ্রসাদ সেনশর্মা পরিষদের সহ সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ল্যাডলিমোহন মিত্র লিখিত রসায়নের বিখ্যাত ইংরাজি পাঠ্যপুস্তক প্রথম বাংলায় অনুবাদ করেন ক্ষেত্রপ্রসাদ।

পরিষদের কার্যনির্বাহক সমিতির সদস্য হিসেবে এক সময়ে যুক্ত ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান কলেজের ‘প্রফুল্ল চন্দ্র অধ্যাপক’ বিশিষ্ট বিজ্ঞান লেখক শ্যামল চক্রবর্তী। সাম্প্রতিক সময়ে পরিষদের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন পদার্থবিদ্যার বিশিষ্ট গবেষক ও সাহিত্য সাধক নির্মল নাগ, বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. শঙ্কর কুমার নাথ প্রমুখ।

এঁদের সকলের অংশগ্রহণে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ গবেষণা, পরিভাষা রচনা এবং বহুমুখী চিন্তার বিস্তারে নতুন মাত্রা পেয়েছে, সমৃদ্ধ হয়েছে।

তথ্যসূত্র:

১. অশোক উপাধ্যায়, বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ: ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার (২০১৬)৷

২. সংসদ বাঙালি চারিতাভিধান, প্রথম খণ্ড, সম্পা: সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত, অঞ্জলি বসু, (সাহিত্য সংসদ, পঞ্চম সংস্করণ, ২০১৬)৷

৩. সভাপতির অভিভাষণ, বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মিলন (১৩১৪-১৩৪৫), সংকলন ও সম্পাদনা: অমরনাথ করণ, (লালমাটি, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ)৷

৪. সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকা, ১৩২ বর্ষ, ৩-৪ সংখ্যা, (১৪৩২)৷

বিজ্ঞান আন্দোলনের কর্মী ও বিজ্ঞান লেখক। উল্লেখযোগ্য সম্পাদিত বই: প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের প্রবন্ধ সংগ্রহ, স্মৃতি - সত্তায় আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র, প্রফুল্লচন্দ্র রায় : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা, বিজ্ঞান বিস্ময়, নানা চোখে বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু, প্রবাসীর প্রফুল্লচন্দ্র ইত্যাদি

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।