সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

মহাভারতের অনন্য উত্তরাধিকার—তমসা উপত্যকার জৌনসার-বাওয়ার

মহাভারতের অনন্য উত্তরাধিকার—তমসা উপত্যকার জৌনসার-বাওয়ার

নবাঙ্কুর মজুমদার

জুলাই ৩, ২০২১ ২৩৪ ১৫

তমসা…, রুইসারাগাড এবং ‘হর কি দুন’ নালার মিলিত প্রবাহধারা তমসা। গাড়োয়াল হিমালয়ের জনপ্রিয় ট্রেকরুট ‘হর কি দুন’র যাত্রাপথের নিত্যসঙ্গী তমসা। তমসা কেবল নদীমাত্র নয়। ভারতের নৃতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের প্রাকৃতিক মহাফেজখানাও বটে। মহাকাব্য মহাভারতের গৌরবগাথা সর্বাঙ্গে জড়িয়ে যেন শীতঘুমে রত তমসা উপত্যকা।

ভণিতা অনেক হলো, এবার বরং একটা গল্প বলি।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শেষ। দুর্যোধন প্রাণভয়ে সটান দ্বৈপায়ন হ্রদের তলায় গিয়ে আত্মগোপন করেছেন। এগারো অক্ষৌহিণী কুরুসৈন্যের বেশির ভাগই মৃত। বাকি সৈন্যরা নিশ্চয়ই ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়েছে। তো পালিয়ে গেল কোথায়? এমন তো হতেই পারে যে তাদের মধ্যেকার একদল সৈন্য প্রাণভয়ে সোজা হিমালয়ে চলে গিয়েছিল; দুর্গম জায়গা। এখানে নিশ্চয়ই পাণ্ডবরা তাড়া করে আসবে না। ধরে নেওয়া যাক স্ত্রী পুত্র পরিবার নিয়ে সেই পরাজিত সৈন্যদল উচ্চ তমসা উপত্যকায় এসে ঘর বাঁধলো। কুরু সৈনিক তারা। দুর্যোধন, দুঃশাসন এমনকি মহাবীর কর্ণের প্রতি তাদের আনুগত্য প্রশ্নাতীত। ফলে তারা পালিয়ে এসেও কুরু রাজকুমারদের এবং কর্ণের প্রতি ভক্তিশ্রদ্ধা বজায় রাখলো; তাঁদের মন্দির বানিয়ে পুজো করতে লাগলো।

অপরদিকে পাণ্ডবরাও একসময় রাজ্যভার অভিমন্যু পুত্র পরীক্ষিতের হাতে দিয়ে যাত্রা করলেন হিমালয়ের পথে। জ্ঞাতিহত্যার পাপস্খালনের জন্য এই তমসা উপত্যকা ধরে তাঁরা স্বর্গারোহণের পথে এগোলেন, যার সাক্ষ্য দেয় আজকের স্বর্গারোহিণী। স্বয়ং পাণ্ডুপুত্রদের হিমালয় যাত্রা বলে কথা! লোকলস্কর তো সঙ্গে যাবেই। গেলও তাই। কিন্তু তা ব’লে কি আর এতো লোকলস্কর নিয়ে স্বর্গে যাওয়া যায়! নিঃসঙ্গ অবস্থায় যেতে হবে কেবলমাত্র পাঞ্চালী ও পাণ্ডুপুত্রদেরকেই। ফলে বাকি পাণ্ডবপক্ষীয় লোকজন থেকে গেল নিম্ন তমসা উপত্যকায়। তারা এসেই লক্ষ্য করলো পরাজিত কুরু সৈন্যরাও এখানে একটু ওপরের দিকে ঘাঁটি গেড়ে বসেছে। রাগে তাদের শরীর জ্বলে গেল। কিন্তু কি আর করা যাবে। হতচ্ছাড়া কুরুসৈন্যদের জন্য তো আর এতো উর্বর ভূখণ্ড ছেড়ে চলে যাওয়া যায় না! তারাও যথারীতি পাণ্ডবদের মন্দির বানিয়ে পরিবার নিয়ে সুখে বসবাস শুরু করলো নিম্ন তমসা উপত্যকায়।

আমার কথাটি ফুরোলো, নটে গাছটি মুড়োলো বলতে পারলে ভালো লাগতো, কিন্তু তা তো হবার নয়। আগেই স্বীকার করে নিয়েছি এ গল্প কথা। অনুমান মাত্র। আর ইতিহাস কখনো অনুমান নির্ভর হতে পারে না। তাই এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের প্রেক্ষিতটা একটু আলোচনা করা দরকার।

তমসা উপত্যকার কালসী গ্রাম। মৌর্য যুগের এক গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। স্বয়ং সম্রাট অশোকের শিলালিপি পাওয়া গেছে এখানে। ১৮৫০ সাধারণ অব্দে আলেকজান্ডার কানিংহ্যাম কালসী প্রস্তরলেখ খুঁজে পান। ব্রাহ্মী হরফে প্রাকৃত ভাষায় লেখা এই প্রস্তরলেখটি খুব গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে; এখানেই প্রথম গ্রিকো-ব্যাকট্রিয়ান রাজ্যের হেলেনিয় রাজাদের বর্ণনা পাওয়া যাচ্ছে। ২৬০ থেকে ২৩০ সাধারণ পূর্বাব্দের মধ্যে লেখা কালসী লেখতে আলেকজান্ডারের উত্তরাধিকার রূপে যে হেলেনিয় রাজ্যগুলি ছিল সেসব রাজ্যের ভৌগোলিক বিন্যাস, গ্রিক দুনিয়ার সাথে সম্রাট অশোকের অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের ইঙ্গিত রয়েছে। গ্রিকো-ব্যাকট্রিয়ান রাজা দ্বিতীয় আন্টিওকোস, দ্বিতীয় টলেমি, দ্বিতীয় এন্টিগোনাস গোনাটাস, সাইরিনের মগাস এবং এপিরাসের দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের নাম উল্লেখ আছে কালসী লেখতে। পরবর্তীকালে হিউয়েন সাংয়ের বিবরণীতেও কালসীর উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে। তিনি কালসী ভ্রমণ করে লিখছেন, এখানে ১০০টি মন্দির, ৫০টি হীনযানিদের সংঘারাম, যেখানে হাজারের বেশি বৌদ্ধ ভিক্ষুর বাস, এবং ভগবান তথাগতের চুল ও নখের ওপর নির্মিত এক সুদৃশ্য বৌদ্ধস্তূপ রয়েছে।

বহুদিন কালসী সিরমৌর রাজ্যের রাজধানী ছিল। বর্তমান হিমাচল প্রদেশ ও গাড়ওয়ালের কিছু অংশ নিয়ে ১০৯৫ সাধারণ অব্দে সোবা রাওয়াল নামে এক ব্যক্তি নাহান রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে নিজে রাজা সুবংশ প্রকাশ নাম ধারণ করেন। অনেকদিন পরে ১৬২১ সাধারণ অব্দে রাজা করম প্রকাশ নাহান রাজ্যের নতুন নামকরণ করেন সিরমৌর। তমসা উপত্যকা সিরমৌর রাজ্যের অংশ থাকলেও তা কিন্তু উপেক্ষিতই থেকে গেছে। এমনকি একসময় এ অঞ্চলে সিরমৌরের রাজকীয় মদতে দস্যুরা নিয়মিত লুঠপাট চালাতো। গাড়োয়াল রাজ হঠাৎ একবার অঞ্চলটি অধিকার করে নেন। তখনো সিরমৌরের তরফে লুণ্ঠনে কোনো ভাটা পড়েনি। বাধ্য হয়ে গাড়োয়াল রাজ মহিপত শাহ তাঁর সেনাপতি লোদি রিখোলাকে শান্তি স্থাপনের জন্য প্রেরণ করেন। লোদি রিখোলা তমসা ও দুন উপত্যকা থেকে লুঠেরাদের শুধু বিতাড়িতই করেননি, পিছু ধাওয়া করে সিরমৌরে ঢুকে তাদেরকে পরিবার সমেত নৃশংস ভাবে হত্যা করে আসেন। এ ঘটনার পরে সিরমৌর রাজারা আর কখনো এই অঞ্চলে হাত বাড়াতে সাহস করেননি। অঞ্চলটি পাকাপাকি ভাবে গাড়োয়াল রাজ্যের অংশ হয়ে যায়।

এই উপত্যকার সমৃদ্ধি বহিরাগতদেরও নজর কেড়েছিল। মুঘল রাজ্যে তখন চরম ডামাডোল। সম্রাট দ্বিতীয় আলমগীরকে হত্যা করে এবং আহমেদ শাহ বাহাদুরকে অন্ধ করে দিয়ে কারাগারে নিক্ষেপ করে মুঘল দরবারের বকলমে শাসক হয়ে উঠেছেন ইমাদ উল মুল্ক। তিনি রোহিলা সর্দার নাজিব উদ দৌলাকে ১৭৫৭ সাধারণ অব্দে বাওয়ানি মহাল (বর্তমান সাহারানপুর) এর মুঘল শাসনকর্তা নিয়োগ করেন। নিয়োগ করেন না বলে নিয়োগ করতে বাধ্য হন বলাই ভাল হবে। তার কারণ, প্রথমদিকে মুঘলদের অনুগত থাকলেও নাজিব উদ দৌলা আহমেদ শাহ আবদালির ভারত আক্রমণের সময় দল বদল করে তাঁর দিকে ভিড়ে যান। ফলস্বরূপ আবদালি দিল্লি লুণ্ঠন করে ফিরে যাবার সময় নাজিব উদ দৌলাকে মুঘল সম্রাটের মীর বক্সী পদে বসিয়ে দিয়ে যান। ঠিক সময় দলবদল করে ঠিক দলে যেতে পারলে যে প্রচুর লাভবান হওয়া যায় তা আমাদের পূর্বজ রাজনীতিবিদরা দেখিয়ে দিয়ে গেছেন। মহাজনো যেন গতঃ স পন্থাঃ ইত্যাদিতে মন দেবার দরকার নেই, বরং মূল প্রসঙ্গে ফেরা যাক। নাজিব উদ দৌলা বাওয়ানি মহালের শাসনকর্তা হয়েই নজর দিলেন উর্বর দুন উপত্যকার দিকে। দেরাদুন সহ সন্নিহিত সমস্ত পাহাড়ি অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার ও সেই সাথে সমানে লুঠতরাজ চলতে লাগলো। তিনি এবং তার পৌত্র গোলাম কাদির এসব অঞ্চলে রীতিমত রাজত্ব করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত মারাঠারা এসে এদের উৎখাত করে। পরবর্তীকালে কিছুদিনের জন্য এসব অঞ্চলে শিখ অধিকার স্থাপিত হয়। আবার গাড়োয়াল রাজ্যে ফিরে এলে গোর্খা আক্রমণের সময় গাড়োয়াল রাজ বাধ্য হয়ে ইংরেজদের সাহায্য প্রার্থনা করলে ১৮১৪ সাধারণ অব্দের ইঙ্গ-গোর্খা যুদ্ধের পরে চুক্তি অনুযায়ী অঞ্চলটি ব্রিটিশ অধিকারভুক্ত হয়ে যায়।

তমসা উপত্যকা দুটি ভাগে বিভক্ত। ওসলা থেকে মোরি পর্যন্ত অঞ্চলকে বলা হয় উচ্চ তমসা উপত্যকা বা বাওয়ার। মোরি থেকে হরিপুর ব্যাস বা জালালিয়া পর্যন্ত নিম্ন তমসা উপত্যকার বিস্তৃতি। এ অঞ্চলকে জৌনসার বলা হয়। জৌনসারি বা পাশিরা পাণ্ডবভক্ত, তাই এই দিককার প্রতিটি গ্রামে আছে পাণ্ডবদের মন্দির। এখানকার এক বিখ্যাত গ্রাম ওসলা। অপরদিকে বাওয়ারি বা ষাঠিরা, যাদের বাস উচ্চ তমসা উপত্যকা জুড়ে– তারা কিন্তু দুর্যোধন ও কর্ণের পুজো করে। সীমা এ অঞ্চলের এক গুরুত্বপূর্ণ গ্রাম। এদিককার গ্রামগুলিতে কুরুবীরদের মন্দিরে দুর্যোধন প্রমুখ নিত্যপূজা পান। দেওড়া গ্রামে কর্ণের মন্দির আছে। আর দেওড়ার এক মাইল নীচে নৈটয়ার থেকে দুর্যোধনের রাজত্ব শুরু। এখানকার ১৩টি গ্রাম দুর্যোধনের অধীন। মহারাজ দুর্যোধনের শীতকালীন আবাস কোটগাঁও এবং গ্রীষ্মাবাস শাকড়িতে। দুর্যোধনের মূর্তি যখন শীতের শেষে এবং পুনরায় গ্রীষ্মকাল শেষ হলে কোটগাঁও এবং শাকড়ির মধ্যে যাতায়াত করে তখন পথিমধ্যের সমস্ত গ্রামগুলিতে আনন্দ উৎসবেরধূম লেগে যায়। স্বয়ং মহারাজ তাদের গ্রামে বছরে মাত্র দুবার আসেন বলে কথা! উৎসব তো হবেই!

আবার জৌনসার অঞ্চলের প্রতিটি গ্রামেই আছে “পাণ্ডবচৌরি”। পাণ্ডবচৌরিতে প্রতীকী অস্ত্রশস্ত্র রাখা থাকে। প্রত্যেক মাসের সংক্রান্তিতে এই অস্ত্রগুলিকে বীরপূজা করা হয়। জৌনসার অঞ্চলে বৈরাটগড় ও লাখামণ্ডল দুটি উল্লেখযোগ্য গ্রাম। ঐতিহাসিক হরিশঙ্কর রতুড়ি তাঁর History Of Gahrwal বইতে দাবি করেছেন, বৈরাটগড় ছিল বিরাট রাজার রাজধানী এবং পাণ্ডবদের অজ্ঞাতবাস স্থল। লাখা মণ্ডলে দুর্যোধন লাক্ষাগৃহ বানিয়ে পাণ্ডবদের পুড়িয়ে মারার ষড়যন্ত্র করেছিলেন বলে বিশ্বাস।

হলোল গ্রামে আছে খ্রিস্টীয় নবম শতকে নির্মিত মহাসু দেবতা নামে এক লৌকিক দেবতার মন্দির। এই মহাসু দেবতাকে মহাশিবের লৌকিক রূপ বলে মনে করা হয়। স্থানীয় লোকবিশ্বাস অনুযায়ী হূন রাজা মিহিরকুল মহাসু দেবতা মন্দির নির্মাণ করেন। এই নিয়ে তথ্যের অভাব থাকলেও ‘হূন ভট’ (শব্দটির অর্থ হূন যোদ্ধা)-এর বিকৃতি হয়ে হলোল নামটি এসেছে বলে মনে করা হয় (সূত্র: অমর উজালা সংবাদপত্র; ১৪ই জুন, ২০১৭ সংখ্যা)। চারজন দেবতা মিলে মহাসু দেবতার সৃষ্টি। এঁরা হলেন বাসিক মহাসু, পবাসিক মহাসু, বুঠিয়া মহাসু এবং চালদা মহাসু।

মন্দিরটির স্থাপত্য শৈলী অসাধারণ। কাঠকুনি বা কোটি বানাল নামে একধরণের নির্মাণ শৈলী ব্যবহার করা হয়েছে এখানে, যা আদতে নাগরশৈলীর অংশ। মোট ৩২ টি কর্নার একে অপরের কাছাকাছি। তিনটি ছত্রাকার শীর্ষ, যার কাঠের কাঠামো আর স্লেট পাথরের ছাদ দুভাগে শঙ্কু আকৃতির ক্যানপি করা। সবার উপরে সরু শিখর কলস। ছাদ যেখানে অভ্যন্তরীণ বারান্দার কাছে শেষ হচ্ছে সেটি ঝুলন্ত ঘন্টার দ্বারা অলংকৃত যা সামান্য হাওয়াতেও দোল খেয়ে এক সুর মূর্ছনার সৃষ্টি করে। মন্দিরটিতে পাথর ও দেবদারু কাঠের অপূর্ব মেলবন্ধন লক্ষ্য করা যায়, আর জোড়গুলিকে সুরক্ষিত করা হয়েছে বিউলি ও মুসুরি ডালের পেস্ট ব্যবহার করে। মহাসু দেবতার অদ্ভুত ধারণাকে কেউ আবার বৌদ্ধ দেবদেবীর হিন্দু ধর্মে আত্ত্বিকরণের ফল বলে মনে করছেন। প্রতি বছর রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে নাকি এই মন্দিরে লবণ ভেট আসে (সূত্র: অমর উজালা, ১৪ই জুন ২০১৭ সংখ্যা)। আর নৈটয়ারে আছে পখু দেবতার মন্দির। ইনিও এক লৌকিক দেবতা। তমসা উপত্যকার ন্যায় বিচারের  ভার এঁর উপর। পেছন ফিরে তাঁকে প্রণাম করার রীতিটিও ভারী অদ্ভুত।

জৌনসারি সমাজে অন্যান্য ভারতীয় সমাজের মত জাতিভেদ প্রথা প্রকট। উঁচু জাতির মধ্যে খস সমাজের অংশ ব্রাহ্মণ ও রাজপুতরা। আবার তথাকথিত নিচুজাতি বলে যাদের দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে, তাদের মধ্যে আছে ডোম, ঢাকি বা বাজগি, লোহার, কোলটা প্রমুখ জাতিগোষ্ঠী। জৌনসারি ভাষা পাহাড়ি ভাষাগোষ্ঠীর এক উপভাষা, টাকরি লিপিতে লিখিত হয়। এই ভাষায় ছোড়ে, ভারত, বাকণা নামের লোকগানগুলিতে কেবলমাত্র পাণ্ডবদের বীরগাথা গীত হয়। এছাড়াও পাশিরা বরদা নটি ও হারুল নামে দু’ধরণের লোকনৃত্যও করে। সমগ্র তমসা উপত্যকার সবচেয়ে বড় উৎসব মাঘমেলা। এই উৎসবে মারোজ নামে এক রাক্ষসকে কোনো এক পশুর মধ্যে কল্পনা করে তাকে বলি দেওয়া হয়। যেকোনো উৎসব উপলক্ষে লোকেরা থলকা বা লোহিয়া নামে পারম্পরিক পোশাক পরে নাচ গানে মেতে ওঠে। শীতপ্রধান দেশে শীতকালে প্রধান উৎসব হওয়াটা অত্যন্ত বিরল এক ঘটনা। এদের অপর এক বড় উৎসব দিয়াই, যা দীপাবলির একমাস পরে অনুষ্ঠিত হয়। দিয়াই উৎসবে “থাটি মাটি” পুজো হয় যা পাণ্ডবদের সময় থেকে চলে আসছে বলে জনশ্রুতি। এটি আসলে ভাইয়েদের মধ্যে জমি ভাগাভাগি না হওয়ার উৎসব।

মহাভারতে পাই, ধৃতরাষ্ট্র ও পাণ্ডুর জন্ম হয়েছিল তাঁদের পিতার মৃত্যুর পরে, নিয়োগ প্রথার মাধ্যমে। কুন্তী ছয় দেবতার ‘বিশেষ আশীর্বাদে’ কর্ণ সমেত ছয় পুত্রের জননী হয়েছিলেন। আবার দ্রৌপদী একত্রে পঞ্চস্বামীকে বরণ করে নিয়েছিলেন।

জৌনসারি বাওয়ারি সমাজে এই মহাভারতীয় লোকাচার আজও বেঁচে আছে কিংবদন্তির মতো। পরিবারের বড়ো ভাই যাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করে, বাকি ভাইদেরও সেই মেয়েটির সাথেই বিয়ে হয়। বহুপতি প্রথায় যে সন্তানেরা জন্মায় তাদের ওপর সব বাবাদেরই সমান অধিকার থাকে, মাতৃপরিচয়ে বড়ো হয় তারা। পারিবারিক জমিজমা যাতে ভাগ না হয় সেদিকে লক্ষ্য রেখেই এই প্রথার প্রচলন বলে মনে হয়। থাটি মাটি উৎসব এই বন্ধনকে আরো দৃঢ় করে।

মহাভারতীয় নিয়োগ প্রথার অনুরূপ “ঠেকা” প্রথা আজও প্রচলিত আছে জৌনসারি বাওয়ারি সমাজে। বিধবা বা বিবাহবিচ্ছিন্না নারী এই প্রথার মাধ্যমে মাতৃত্বের স্বাদ পেতে পারে। সমাজে কন্যাপণ প্রচলিত আছে, আর আছে “স্যুচেলা” প্রথা। নারী যদি স্বামী পরিত্যাগ করে দ্বিতীয় বিবাহ করে তবে দ্বিতীয় স্বামী প্রথম স্বামীকে কন্যাপণের চাইতেও বেশি অর্থ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে দ্বিগুণ অর্থ দিতে বাধ্য থাকে।

আরেকটা মজার ব্যাপার এই যে, পাশি এবং ষাঠিরা আজও পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ ভাবাপন্ন। কোনো আত্মীয়তা, সামাজিকতা এমনকি বন্ধুত্বও এই দুই সমাজের মধ্যে বিরল।

মহাভারতের সমাজব্যবস্থা, বীরগাথা, কিংবদন্তি বুকে ধারণ করে অপার রহস্যের অন্তরালে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছে তমসা উপত্যকা। প্রকৃত ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের অপেক্ষায় আজও প্রতীক্ষারত সে। জানি না তার এই প্রতীক্ষার অবসান কবে হবে! তার আগেই আধুনিক সভ্যতার বিষবাষ্পে কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে না তো তমসা উপত্যকার সামাজিক প্রত্নঐশ্বর্য? সাধু সাবধান!!

তথ্যসূত্র: 

১. K. Man, Tribal Women: On The Threshold Of Twenty -first Century, MD Publications, 1996.

. Ritual Complex & Social Structure in Jaunsar-Bawar (Census of India 1971, series I, India), Office of the Registrar general, India, 1974

৩. Madhu Jain, Art & Architecture of Uttarakhand, OC Handa, Pentagon Press, 2009.

৪. S. Dhammika, The Edicts of King Ashoka, The Wheel Publication, Kandy, Sri Lanka, Net edition, 1994.

৫. Berreman, Gerald D, Himalayan Polyandry: Structure, Functioning & Culture Change, A Field Study of Jaunsar-Bawar: https://doi.org/10.1525/ae.1975.2.1.02a00070

৬. D. N. Majumdar, Himalayan Polyandry, Asia Publishing House, 1962.

৭. William Irvine, Later Mughal, Atlantic Publisher & Distributors, 1991.

৮. H. G. Keene, The Fall Of The Moghul Empire of Hindustan (NajibudDaula at Dehli), A Word To The Wise Publisher, 2014.

৯. Ajay S. Rawat, Garhwal Himalayas: A Study in Historical Perspective, Indus Publishing, 2002.

মন্তব্য তালিকা - “মহাভারতের অনন্য উত্তরাধিকার—তমসা উপত্যকার জৌনসার-বাওয়ার”

  1. ভ্রমণ কাহিনীতে হাল্কাভাবে পড়েছিলাম।এখন অনেকটাই জানলাম ইতিহাসের হাত ধরে।সুন্দর।

  2. জৌনসারী সম্পর্কে ভাসা ভাসা জানতাম। তবে মহাভারতের সঙ্গে এই দুই জাতির সম্বন্ধ জানতাম না। আপনার লেখা পড়ে আরও গভীরভাবে জানতে ইচ্ছে করছে। 🙏

    1. পড়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। এই মিসিং লিংক গুলোই তো ভারতীয় সভ্যতাকে অনন্য করে তুলেছে।

  3. আপনার লেখা পরে তমসা উপত্যকায় জৌনসারী সম্পর্কে ধারনা পেলাম। পাশি ও ষাঠী জাতি বিষয়ে জানলাম।
    শুভকামনা আপনার জন্য।

  4. আপনার লেখা পরে তমসা উপত্যকায় জৌনসারী সম্পর্কে ধারনা পেলাম। পাশি ও ষাঠী জাতি বিষয়ে জানলাম।
    শুভকামনা আপনার জন্য।

  5. আলোচনা অসাধারণ। জৌনসারীদের সম্পর্কে অল্প জানতাম। এত সুন্দর বিশ্লেষণ করে আলোচনা ভারাক্রান্ত লাগেনি একটুও । তবে একটা বিষয় নজরে পড়ল এখানে আছে কুন্তীর ছয়পুত্রের জননী হয়েছিলেন। মহাভারতে কুন্তীর চার পুত্র জন্মায় চার দেবতার আশীর্বাদে। মাদ্রীর দুজন অশ্বিনীভাতৃদ্বয় এর আশীর্বাদে। অবশ্য অন্য কোনো মহাভারতে যেমন ‘জৈমিনী ভারত’ এরকম উল্লেখ থাকলে তা উল্লেখ করলে ভালো হয়। অবশ্য বৃহদার্থে কুন্তী ছজনেরই মাতা হয়ে উঠেছিল। যাই হোক আলোচনা দারুণ লাগল।

    1. মনোযোগ দিয়ে পড়ার জন্য অশেষ ধন্যবাদ। ঠিকই ধরেছেন, কুন্তীর ছয় পুত্র লেখার সময় আমি ব্যাপক অর্থেই তা ধরেছি। মাদ্রী অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের বিশেষ আশীর্বাদে নকুল সহদেবের গর্ভধারিনী হলেও তা কুন্তীর প্রভাবেই হয়েছিল, আবার কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আগের দিন সমস্ত দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে কর্ণ কুন্তী সংবাদ মুহূর্তে কুন্তী ছয় পুত্রের মাতৃত্বের দাবি যে মুহূর্তে উপস্থাপিত করলেন তখন থেকেই তিনি যে ষড় পুত্র গরবিনী হলেন।
      সংকীর্ণ অর্থে তিনি তো অবশ্য করেই চার পুত্রের জন্ম দিয়েছিলেন।

  6. মহাভারত আমি পড়ি নি। কিন্তু তোমার এ লেখা পড়ে ইতিহাস জানলাম। অনবদ্য শৈল্পিক রেখায় টানা এক অজানা ইতিহাস। ধন্যবাদ ভাই। সত্যিই ভালো লেগেছে। আরও লেখ।

    1. অনেক অনেক ধন্যবাদ দাদা। মহাভারত আপনি তথাকথিত ভাবে না পড়েও মহাভারতের গল্প অনেকের চাইতে বেশি জানেন তা আমি জানি। আর এই শুভেচ্ছা বার্তাই আমার পাথেয়।

  7. পড়ে সমৃদ্ধ হলাম। ভ্রমণ পিপাসু মন যেতে চাইছে। ওদের উৎসব এর সঠিক দিনক্ষণ কিভাবে পেতে পারি জানলে করোনাকাল কেটে গেলে একবার যেতে চাই। দারুন উপভোগ্য লেখা, অামার মত সাধারন পাঠকের এই অভিব্যক্তি। ধন্যবাদ।

    1. প্রথমেই আপনাকে ধন্যবাদ জানাই। জৌনসারিদের দিয়াই উৎসব দীপাবলির এক মাস পরে হয়, আর মাঘমেলা মাঘ মাসে। নির্দিষ্ট বছরের সঠিক তারিখের জন্য গুগলের উপর নির্ভর করা ছাড়া উপায় নেই যে! ভাল থাকবেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।