সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

সাতবাহন

সাতবাহন

শান্তনু ভৌমিক

জুলাই ২৪, ২০২১ ২১৭

ভূমিকা

ভারতের ইতিহাসচর্চায় মৌর্য সাম্রাজ্যের এবং গুপ্ত সাম্রাজ্যের মধ্যবর্তী সময়ের ভারত অপেক্ষাকৃত অবহেলিত। অথচ সেই সময়কার অর্থাৎ সাধারণ পূর্বাব্দের দ্বিতীয় শতকের প্রথম ভাগ থেকে সাধারণ অব্দের তৃতীয় শতকের অন্তিম ভাগের মধ্যবর্তী সময়ের ভারতের ইতিহাস একটু খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যায় যে সেই সময় ভারতের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক পরিমণ্ডলে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছিল যার প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। সেই সময়েই তদানীন্তন ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে মধ্য এশিয়া থেকে আসে একের পর এক জাতিগোষ্ঠী; দাক্ষিণাত্যে উত্থান হয় প্রথম দক্ষিণ ভারত কেন্দ্রিক রাজশক্তির; শিল্প, ব্যবসা ও বাণিজ্যে ঘটে প্রভূত বিকাশ; মুদ্রা হয়ে ওঠে অর্থনৈতিক লেনদেনের প্রধান ভিত্তি; প্রাচীন ভারতের নগরায়ণ প্রক্রিয়া লাভ করে সর্বোচ্চ গতিবেগ।

সাতবাহনরা ছিলেন এই মৌর্য সাম্রাজ্যের এবং গুপ্ত সাম্রাজ্যের মধ্যবর্তী সময়ের ভারতবর্ষের এক উল্লেখযোগ্য রাজশক্তি। বস্তুত তাঁরাই হলেন ভারতবর্ষের প্রথম দক্ষিণ-ভারত কেন্দ্রিক রাজশক্তি, প্রায় ৩০০ বছর ধরে দাক্ষিণাত্য এবং মধ্য ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল শাসন করেছিলেন। তাঁদের সমসাময়িক অন্যান্য উল্লেখযোগ্য রাজশক্তিগুলি ছিল উত্তর এবং উত্তর পশ্চিম ভারতে কুষাণেরা, পশ্চিম ভারতে শকেরা (এঁরা সম্ভবত কুষাণদের করদ রাজা ছিলেন), কলিঙ্গ অঞ্চলে চেদিরা এবং সুদূর দক্ষিণে – আজকের তামিলনাড়ু এবং কেরালা অঞ্চলে চোল, চের এবং পাণ্ড্যরা।

কারা ছিলেন সাতবাহন?

এই বিষয়ে দুই’টি মত আছে।

প্রথম মতটি হল যে পুরাণে বর্ণিত ‘অন্ধ্রভৃত্য’রা হলেন সাতবাহন। দ্বিতীয় মতটি হল যে সাতবাহনেরা হলেন সম্রাট অশোকের শিলালেখতে এবং সঙ্গম সাহিত্যে উল্লিখিত সাতিযাপুত্রদের বংশধর। এই সমস্যা তৈরি হওয়ার মূল কারণ হল যে সাতবাহনদের যে সমস্ত লেখ এবং মুদ্রা পাওয়া গিয়েছে সেগুলিতে সাতবাহনের নিজেদের শুধু ‘সাতবাহন’ বলেই উল্লেখ করেছেন। কোথাও তাঁরা নিজেদেরকে ‘অন্ধ্রভৃত্য’ বা ‘সাতিযাপুত্রদের বংশধর’ বলে উল্লেখ করেননি। দ্বিতীয় মতের যাঁরা প্রবক্তা অর্থাৎ যাঁরা সাতবাহনদের ‘সাতিযাপুত্রদের বংশধর’ বলে মনে করেন, তাঁদের যুক্তিগুলি হল: (১) অন্ধ্র অঞ্চলের অবস্থান দাক্ষিণাত্যের পূর্বভাগে। সাতবাহনরা যদি ‘অন্ধ্রভৃত্য’ই হন তাহলে সাতবাহনদের প্রথমদিকের সমস্ত লিপি এবং মুদ্রা কেন অন্ধ্রের জায়গায় মহারাষ্ট্রে পাওয়া গিয়েছে; (২) সাতবাহনদের কোনো লেখ বা মুদ্রায় তাঁদের ‘অন্ধ্রভৃত্য’ বলে উল্লেখ করা নেই; এবং (৩) অন্ধ্রের ভাষা তেলেগু কিন্তু সাতবাহনদের সমস্ত লেখ এবং মুদ্রা লেখা হয়েছিল প্রাকৃতে। এই সব কারণে এই মতাবলম্বীরা মনে করেন যে পুরাণে যে সমস্ত রাজারা অন্ধ্র বা অন্ধ্রভৃত্য বলে উল্লিখিত হয়েছেন তাঁরা সাতবাহন নন। এই মতের বিপক্ষে প্রথম মতের অর্থাৎ ‘সাতবাহনের হলেন পুরাণে বর্ণিত অন্ধ্রভৃত্য’ এই মতের প্রবক্তারা যে যুক্তিগুলো দেন সেইগুলি হল এইরকম: (১) অন্ধ্রের লোকেরা শুধু পূর্ব দাক্ষিণাত্যেই থাকতো এমন নয়। মধ্যপ্রদেশের বস্তার অঞ্চলে, উত্তর কর্ণাটকে, মহারাষ্ট্রের বেশ কিছু জায়গায় এমনকি ওড়িশাতেও অন্ধ্রজাত লোকদের বসতি ছিল; (২) সাতবাহনদের মুদ্রা এবং লেখতে ‘অন্ধ্রভৃত্য’র উল্লেখ না পাওয়ার কারণ যে লেখ এবং মুদ্রাতে রাজারা নিজের বংশের নাম উল্লেখ করতেন, জাতির নয়; (৩) সাতবাহনদের সমস্ত লেখ এবং মুদ্রা প্রাকৃত ভাষায় লেখার কারণ তখন প্রাকৃত ছিল রাজভাষা; (৪) প্রাচীন ভারতে ক্ষমতার কেন্দ্র মগধ থেকে সরে যাওয়ার পর যেসব পুরাণ লেখা হয়েছে সেইগুলিতে বিভিন্ন আঞ্চলিক রাজশক্তিগুলিকে বংশনামের জায়গায় অঞ্চল বা জাতির নামে উল্লেখ করা হয়েছে; (৫) সাতবাহনদের মহারাষ্ট্র, বিদিশা এমনকি পাটলিপুত্র জয়ের স্বপক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়, কিন্তু অন্ধ্র জয়ের স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না, যদিও অন্ধ্র সন্দেহাতীতভাবে সাতবাহন সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর কারণ হল, সাতবাহনরা ছিলেন অন্ধ্রের ভূমিপুত্র। তাই তাঁদের আলাদা করে অন্ধ্র জয় করার দরকার পড়েনি; (৬) এবং পুরাণে ‘অন্ধ্রভৃত্য’ বংশের রাজাদের যে সব নাম পাওয়া গিয়েছে, সাতবাহনদের লেখ এবং মুদ্রায় সেই একই নামের রাজাদের উল্লেখ আছে। যদি পুরাণে উল্লিখিত ‘অন্ধ্রভৃত্য এবং সাতবাহন এক না হয় তাহলে মেনে নিতে হবে যে একই সাথে ‘অন্ধ্রভৃত্য  এবং সাতবাহন এই দু’টি বংশের রাজত্ব চলছিল এবং দুই বংশে একটি নামের রাজা ছিল, যা অসম্ভব। 

বর্তমানে প্রথম মত’টি অর্থাৎ  সাতবাহনেরা হলেন পুরাণে বর্ণিত ‘অন্ধ্রভৃত্য’ – এই মতটি অধিকতর স্বীকৃত। প্রসঙ্গত, সম্রাট অশোকের লেখতেও অন্ধ্রদের উল্লেখ আছে – তবে তাঁর শাসনাধীন জনগোষ্ঠী হিসাবে, কোনো বিজিত রাজ্য হিসাবে নয়।

কোথায় হয়েছিল সাতবাহন সাম্রাজ্যের শুরু?

এই বিষয়ে চারটি মত আছে।

প্রথম মতটি হল যে সাতবাহনেরা তাঁদের রাজত্ব শুরু করেছিলেন কর্ণাটকের বেল্লারি অঞ্চলে। এই মতের ভিত্তি হল মাকেদোনিতে পাওয়া শেষ সাতবাহন রাজা চতুর্থ পুলময়ির লেখতে এবং হিরহানদাগল্লিতে পাওয়া প্রথমদিকের এক পল্লব রাজার তাম্রশাসনে ‘সাতবাহন আহারা’ এবং ‘সাতবাহন রাষ্ট্র’ এই দুই শব্দের উপস্থিতি। এই মতের প্রবক্তাদের যুক্তি হল যে যেহেতু অন্য কোথাও পাওয়া লেখ বা মুদ্রাতে ‘সাতবাহন আহারা’ বা ‘সাতবাহন রাষ্ট্র’ এই শব্দ দু’টি পাওয়া যায় না, তাই ধরে নিতে হয় যে কর্ণাটকের বেল্লারি অঞ্চলে শুরু হয়েছিল সাতবাহন সাম্রাজ্যের পথচলা।

সাতবাহন সাম্রাজ্যের উৎপত্তিস্থল হিসাবে দ্বিতীয় যে জায়গাটির নাম উঠে আসে তা হল বিদর্ভ। নাসিকে পাওয়া সাতবাহনদের অন্যতম প্রভাবশালী রাজা গৌতমীপুত্র সাতকর্ণীর মা গৌতমী বালাশ্রী’র লিপিতে গৌতমীপুত্র সাতকর্ণীকে ‘বেনাটাকার অধিপতি’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। অনেকে মনে করেন যে বেনাটাকা ছিল বিদর্ভর মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া ওয়েনগঙ্গা নদীর তীরবর্তী কোন অঞ্চল। এছাড়াও হাতিগুম্ফা লিপি অনুযায়ী খারবেল সাতবাহন রাজা প্রথম সাতকর্ণীর বিরুদ্ধে অভিযানে পশ্চিম দিকে কান্নাবেনা পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিলেন। অনেকের মতে কান্নাবেনা হল নাগপুরের কাছে কাননের নদী। এর ভিত্তিতে এবং যেহেতু প্রথম সাতকর্ণী ছিলেন সাতবাহনদের প্রথম দিকের রাজা এবং বিদর্ভ কলিঙ্গর ঠিক পশ্চিমে অবস্থিত, কিছু ঐতিহাসিক মনে করেন যে সাতবাহন সাম্রাজ্যের উৎপত্তি হয়েছিল বিদর্ভে।

সাতবাহন সাম্রাজ্যের উৎপত্তিস্থল সম্পর্কে তৃতীয় মতটি হল যে সাতবাহন রাজ্য প্রথমে স্থাপিত হয়েছিল পশ্চিম দাক্ষিণাত্যে, মহারাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানা সংলগ্ন অঞ্চলে। সেখান থেকে সময়ের সাথে সাথে রাজত্বের প্রসার ঘটে – প্রথমে উত্তর এবং দক্ষিণ মহারাষ্ট্রে এবং তারপরে মালব অঞ্চলে (বর্তমানের মধ্যপ্রদেশ)। পরবর্তীকালে অন্ধ্র অঞ্চল সাতবাহন রাজত্বের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং তখন তাঁরা অন্ধ্র রাজবংশ হিসাবের অভিহিত হন। এই মতের স্বপক্ষে যুক্তিগুলি হল: (১) পুরাণে সাতবাহনদের অন্ধ্রজাতি বলা হয়েছে, অন্ধ্রদেশীয় নয়; (২) সাতবাহন সাম্রাজ্যের উৎপত্তির সময় অন্ধ্র কলিঙ্গর অংশ ছিল; (৩) সাতবাহন রাজাদের নামের শুরু মায়ের নাম দিয়ে হওয়া এবং প্রাকৃত ভাষার ব্যবহার মহারাষ্ট্রীয় বৈশিষ্ট্য; এবং (৪) সাতবাহনদের রাজধানী ছিল প্রতিষ্ঠানাতে (অধুনা মহারাষ্ট্রের পৈঠান), সর্বোপরি সাতবাহনদের প্রথম দিকের মুদ্রা এবং লিপি পাওয়া যায় মহারাষ্ট্রে।

এই বিষয়ে চতুর্থ এবং শেষ মতটি হল যে, যে সাতবাহন রাজত্ব প্রথম শুরু হয়েছিল অন্ধ্র অঞ্চলে, পূর্ব উপকূলের কৃষ্ণা এবং গোদাবরী নদীর ব-দ্বীপে। সেখান থেকে তাঁরা গোদাবরী নদী বরাবর পশ্চিম দিকে রাজ্য বিস্তার করতে থাকেন। এইভাবে দাক্ষিণাত্যের পশ্চিমভাগ একসময় চলে আসে তাঁদের অধীনে এবং তাঁরা গোদাবরী নদীর তীরে প্রতিষ্ঠানায় স্থাপন করেন রাজধানী। এই মতের ভিত্তি হল যে অন্ধ্রপ্রদেশের কোন্দাপুর এবং কোটালিঙ্গালায় সাতবাহনদের যেসব মুদ্রা পাওয়া গিয়েছে সেগুলি সাতবাহনদের রাজত্বের একদম প্রথম দিকের। কোটালিঙ্গালায় পাওয়া প্রায় একশ’টি মুদ্রার মধ্যে সাতটি ছিল সাতবাহনদের প্রতিষ্ঠাতা সিমুকের।

সাতবাহনদের সাম্রাজ্যের উৎপত্তিস্থল নিয়ে এই চারটি মতের মধ্যে প্রথম এবং দ্বিতীয় মতটি সেইভাবে বৈধতা পায়নি। প্রথম মতের বিপক্ষে বক্তব্য হল যে যদিও মাকেদোনি হিরহানদাগল্লিতে পাওয়া দুই লেখ থেকে প্রমাণিত হয় যে কর্ণাটকের বেল্লারি অঞ্চল সাতবাহন রাজত্বের শেষ দিকে এই সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। কিন্তু, এই দুই লেখ থেকে এটা কোনভাবেই প্রমাণিত হয় না যে, সাতবাহন সাম্রাজ্যের সূচনা বেল্লারিতে হয়েছিল। ওই দুই লেখ তৈরি হয়েছিল সাতবাহন সাম্রাজ্যের সূচনার প্রায় চারশ’ বছর পরে। তাছাড়া দাক্ষিণাত্যের অন্যান্য অনেক জায়গাতেও সাতবাহনদের নামাঙ্কিত জায়গা এবং পাহাড় আছে।

দ্বিতীয় মতের বিরোধীদের বক্তব্য হচ্ছে যে বেনাটাকা বা বেনাকাটাকা ছিল ধন্যকাটাকা (বর্তমানের ধরণীকোটা; অন্ধ্রপ্রদেশের রাজধানী অমরাবতীর অন্তর্ভুক্ত) এবং কান্নাবেনা নদী হচ্ছে অন্ধ্রে অবস্থিত কৃষ্ণাবেনি নদী। সাতবাহনেরা ছিলেন দক্ষিণাপথপথি অর্থাৎ পুরো দাক্ষিণাত্যের অধিপতি এবং বিদর্ভ হল দাক্ষিণাত্যের একটা অংশ। সুতরাং খারবেল সাতবাহন রাজা প্রথম সাতকর্ণীর বিরুদ্ধে অভিযানে পশ্চিম দিকে গিয়েছিলেন তার ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় না এমনকি অনুমানও করা যায় না যে, সাতবাহন সাম্রাজ্যের সূচনা বিদর্ভে হয়েছিল।

বর্তমানে চতুর্থ মতটি অর্থাৎ ‘সাতবাহন সাম্রাজ্যের সূচনা হয়েছিল অন্ধ্র অঞ্চলে’ অধিকতর গৃহীত। তবে সাতবাহন সাম্রাজ্যের সূচনা হয়েছিল মহারাষ্ট্রে – এই মতের স্বপক্ষেও এক বড় অংশের ঐতিহাসিকদের মত আছে।

সাতবাহনদের বংশানুক্রম, রাজত্বকাল এবং রাজনৈতিক ইতিহাস

সাতবাহনদের রাজত্বকাল এবং বংশানুক্রম নিয়ে মূল তথ্যসূত্র হল পুরাণ। ১৮টি মহাপুরাণের মধ্যে, পাঁচটি পুরাণে সাতবাহনদের (অন্ধ্রভৃত্য) সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। এই পাঁচটি পুরাণ হল – মৎস্য, বায়ু, বিষ্ণু, ভাগবত এবং ব্রহ্মানন্দ। কিন্তু সমস্যা হল যে সাতবাহনদের মোট রাজত্বকাল এবং মোট রাজার সংখ্যা নিয়ে এই পাঁচটি পুরাণে প্রদত্ত তথ্যের মধ্যে কোন তালমিল নেই। যেমন মৎস্য পুরাণে এক জায়গায় বলা হয়েছে যে সাতবাহনদের ২৯ জন রাজা ছিলেন এবং তাঁরা সবমিলিয়ে মোট ৪৬০ বছর রাজত্ব করেছিলেন। আবার এই একই মৎস্য পুরাণের অন্য জায়গায় লেখা রয়েছে যে সাতবাহনদের মোট ৩০ জন রাজা ছিলেন এবং তাঁরা সব মিলিয়ে ৪৪৮.৫ বছর রাজত্ব করেছিলেন। বায়ু পুরাণে এক জায়গায় লেখা আছে সাতবাহনদের ৩০ জন রাজা হয়েছিলেন এবং তাদের সম্মিলিত রাজত্বকাল ছিল ৪৪১ বছর। আবার ওই একই বায়ু পুরাণে অন্য জায়গায় বলা হয়েছে যে সাতবাহনদের মোট ১৭ জন রাজা ছিলেন এবং তাঁদের মোট রাজত্বকাল ছিল ২৭২.৫ বছর। বিষ্ণু এবং ভাগবত পুরাণ মতে সাতবাহনদের মোট ৩০ জন রাজা ছিলেন এবং তাঁদের সম্মিলিত রাজত্বকাল ছিল ৪৫৬ বছর। তবে একটি বিষয়ে উপরোল্লিখিত পাঁচটি পুরাণের মধ্যে মিল আছে। তা হল যে এই পাঁচটি পুরাণ মতেই সাতবাহন বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সিমুক। অবশ্য মৎস্যপুরাণে সিমুককে অভিহিত করা হয়েছে সিসুক ব’লে, বায়ু পুরাণে সিঁদনুক ব’লে এবং বিষ্ণু পুরাণে সিপরাকা ব’লে। সাতবাহনদের (অন্ধ্রভৃত্য) সম্পর্কে পুরাণ থেকে পাওয়া আর একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল যে, পুরাণ মতে মগধের কানভা শাসনের পতন হয়েছিল সাতবাহনদের হাতে।

সাতবাহনদের কত জন রাজা ছিলেন এবং তাঁদের সম্মিলিত রাজত্বকাল কতদিন ছিল, এই সম্পর্কিত একাধিক পৌরাণিক তথ্যের মধ্যেকার অসামঞ্জস্যের সমাধান হয়তো করতে পারত সাতবাহনদের লেখগুলি থেকে প্রাপ্ত তথ্যাদি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সাতবাহনদের লেখগুলির সঠিক সময়কাল নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। অতএব লেখগুলি থেকে প্রাপ্ত তথ্যাদির ভিত্তিতে কোনো সুনিশ্চিত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব হয়নি। ফলত সাতবাহন বংশের কালানুক্রম এবং মোট রাজত্বকাল নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে একাধিক মত আছে।

ঐতিহাসিক দীনেশ চন্দ্র সরকার, ১৯৫১ সালে, সাতবাহন রাজাদের যে কালানুক্রম পেশ করেন তা হল এইরকম: সিমুক (৩০ সাধারণ পূর্বাব্দ) -কৃষ্ণ – প্রথম সাতকর্ণী – (কালানুক্রমে ছেদ – সম্ভবত অপিলকা, হল ) – গৌতমীপুত্র সাতকর্ণী (১০৬-১৩০  সাধারণ অব্দ) – বশিষ্টিপুত্র প্রথম পুলমায়ি (১৩০-১৫৯ সাধারণ অব্দ) – বশিষ্টিপুত্র শিবশ্রী সাতকর্ণী (১৫৯-১৬৬ সাধারণ অব্দ) – শিবাস্কন্দ সাতকর্ণী (১৬৭-১৭৪ সাধারণ অব্দ) – গৌতমীপুত্র যজ্ঞ (শ্রী) সাতকর্ণী (১৭৪-২০৩ সাধারণ অব্দ) – গৌতমীপুত্র বিজয় – চন্দ্রশ্রী –  বশিষ্টিপুত্র পুলমায়ি।

ঐতিহাসিক নীলকান্ত শাস্ত্রী, ১৯৬৬ সালে, সাতবাহন রাজাদের যে কালানুক্রম পেশ করেন তা অনুযায়ী হল এইরকম : সিমুক (২৩০ সাধারণ পূর্বাব্দ) -কৃষ্ণ (২০৭-১৮৯ সাধারণ পূর্বাব্দ) – প্রথম সাতকর্ণী – (কালানুক্রমে ছেদ – সম্ভবত অপিলকা, হল) – গৌতমীপুত্র সাতকর্ণী (৮০-১০৪ সাধারণ অব্দ) – বশিষ্টিপুত্র প্রথম পুলমায়ি (১০৫-১২৮ সাধারণ অব্দ) – (?)- গৌতমীপুত্র যজ্ঞ (শ্রী ) সাতকর্ণী (১৭০-১৯৯ সাধারণ অব্দ) – গৌতমীপুত্র বিজয় – চন্দ্রশ্রী –  বশিষ্টিপুত্র পুলমায়ি। মূলত পৌরাণিক তথ্যের আধারে, ঐতিহাসিক নীলকান্ত শাস্ত্রী এই বংশানুক্রম নির্মাণ করলেও, এই মতের স্বপক্ষে তাঁর আর একটি প্রমাণ ছিল নাসিকের সন্নিকটে পাণ্ডবলেনি গুহায় প্রাপ্ত সাতবাহনদের দ্বিতীয় রাজা কৃষ্ণর (‘কানহা’ বলেও পরিচিত) লেখর আনুমানিক প্রাচীনত্ব। প্রাচীন ভারতীয় ভাষা এবং আইন সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ জার্মান অধ্যাপক জর্জ বুহলারের (জুলাই ১৯, ১৮৩৭ – এপ্রিল ৮, ১৮৯৮) মতে এই লেখটি লেখা হয়েছিল সাধারণ পূর্বাব্দের দ্বিতীয় শতকের প্রথম দিকে যা মৌর্য সাম্রাজ্যের অন্তিমপর্বের বা শুঙ্গ শাসনকালের শুরুর সমসাময়িক।

ঐতিহাসিক পরমব্রহ্ম শাস্ত্রী ১৯৯৯ সালে সাতবাহনদের যে কালানুক্রম প্রস্তাব করেন তা হল এইরকম: সিমুক (৫৩-৩০ সাধারণ পূর্বাব্দ) -কৃষ্ণ (২৯-১২ সাধারণ পূর্বাব্দ) – প্রথম সাতকর্ণী (১২ সাধারণ পূর্বাব্দ – ৪৪ সাধারণ অব্দ) – (?)- গৌতমীপুত্র সাতকর্ণী (৬১-৯০ সাধারণ অব্দ) – বশিষ্টিপুত্র প্রথম পুলমায়ি (৯১-১১৮ সাধারণ অব্দ) – বশিষ্টিপুত্র শিবশ্রী সাতকর্ণী – শিবাস্কন্দ সাতকর্ণী (১৫৬-১৭০ সাধারণ অব্দ) – গৌতমীপুত্র যজ্ঞ(শ্রী ) সাতকর্ণী (১৭১ -১৯৯ সাধারণ অব্দ) – গৌতমীপুত্র বিজয় (২০০-২০৫ সাধারণ অব্দ) – চন্দ্রশ্রী (২০৬-২১৫ সাধারণ অব্দ) –  বশিষ্টিপুত্র পুলমায়ি (২২৬-২৩২ সাধারণ অব্দ)। অন্ধ্রপ্রদেশের কোটালিঙ্গালা এবং মধ্য-দাক্ষিণাত্যে প্রাপ্ত সাতবাহনদের মুদ্রা থেকে প্রাপ্ত তথ্য হল এই বংশানুক্রমের ভিত্তি।

বর্তমানে পরমব্রহ্ম শাস্ত্রীর মতটিই অধিকতরভাবে গৃহীত। প্রসঙ্গত, সাতবাহন বংশের কালানুক্রম নিয়ে অন্যান্য আরও মত আছে।

সাতবাহন বংশের প্রতিষ্ঠাতা সিমুকের পরে সিংহাসনে বসেন তাঁর ভাই কৃষ্ণ। মহারাষ্ট্রের নাসিকের সন্নিকটে পাণ্ডবলেনি গুহাতে কৃষ্ণর শিলালেখ পাওয়া গিয়েছে। এই শিলালেখ অনুযায়ী শক এবং অভিরাস (আহির)-রা ছিলেন সাতবাহনদের মুখ্য প্রতিদ্বন্দ্বী রাজশক্তি/গোষ্ঠী।

কৃষ্ণর পর সিংহাসনে আসীন হন সিমুকের পুত্র প্রথম সাতকর্ণী। বায়ু পুরাণে প্রথম সাতকর্ণীকে সাতবাহন বংশের তৃতীয় রাজা হিসাবে উল্লেখ করা হলেও, মৎস্য পুরাণ অনুসারে প্রথম সাতকর্ণী ছিলেন সাতবাহন বংশের ষষ্ঠ রাজা। প্রথম সাতকর্ণী ছিলেন সাতবাহনদের প্রথম পরাক্রমশালী রাজা। তাঁকে ‘প্রতিষ্ঠানার অধিপতি’ বলে অভিহিত করা হত। তাঁর সময়ে ইন্দো-গ্রিকদের আক্রমণের কারণে উত্তর ভারতে রাজনৈতিক অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছিল। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রথম সাতকর্ণী মালবের পশ্চিম ভাগ, অনুপা (নর্মদা উপত্যকার মাহিস্মতি সন্নিহিত অঞ্চল) এবং বিদর্ভ সহ দাক্ষিণাত্যের অধিকাংশ অঞ্চলকে সাতবাহন রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে নেন। মধ্যপ্রদেশের সাঁচীতে পাওয়া এক লেখতে তাঁকে “রাজন শ্রী সাতকর্ণী” বলে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। এর পরে তিনি দক্ষিণের দিকে নজর দেন। গোদাবরী উপত্যকা অধিকার করার পর তিনি “দক্ষিণ অঞ্চলের অধিপতি” উপাধি নেন। তাঁর সম্পর্কে আরও দাবি করা হয় যে তিনি ‘খতিয়া’দের ধ্বংস করেছিলেন। তবে কারা ছিলেন এই ‘খতিয়া’ তা নিয়ে মতভেদ আছে। একটি মত হচ্ছে যে খতিয়ারা  ছিলেন টলেমি বর্ণিত খাত্রিআইওই জনগোষ্ঠী। অন্য মতে, খতিয়া শব্দের মাধ্যমে তদানীন্তন ক্ষত্রিয়দের বোঝানো হয়েছিল এবং প্রথম সাতকর্ণী দ্বারা এঁদের ধ্বংস হওয়ার অর্থ হল ক্ষত্রিয় গোষ্ঠীতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে সাতবাহনদের বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা।

বর্তমান ওড়িশার ধৌলির কাছে পাওয়া হাতিগুম্ফা শিলালেখ অনুযায়ী চেদিবংশের তৃতীয় এবং সবচেয়ে পরাক্রমশালী রাজা খারবেল ছিলেন প্রথম সাতকর্ণীর সমসাময়িক। এই একই হাতিগুম্ফা শিলালেখ অনুযায়ী, খারবেল সাতবাহন রাজ্যে তাঁর সেনাবাহিনীও পাঠিয়েছিলেন। তবে সেই অভিযানের পরিণতি কি হয়েছিল তা নিয়ে কোন তথ্য পাওয়া যায়নি।

প্রথম সাতকর্ণী’র শাসনকালের পর থেকে গৌতমীপুত্র সাতকর্ণী সিংহাসনে আসীন হওয়ার আগে পর্যন্ত সাতবাহনদের ইতিহাস খুব একটা পরিষ্কার নয়। পুরাণে এবং সেই সময়কার মুদ্রায় শুধুমাত্র কয়েকজনের রাজার নাম পাওয়া যায়, যেমন- লম্বোদর, অপিলাকা, হল ইত্যাদি পাওয়া যায়। সাধারণ অব্দের প্রথম শতকে লেখা ‘পেরিপ্লাস অফ দি এরিথ্রিয়ান সি’ গ্রন্থেও এই সময়কার কয়েকজন সাতবাহন রাজার নাম পাওয়া যায় – সুন্দর (সানদানাস) এবং চকরা (সারাগেন্স)। এই সময়ে সাতবাহনরা বেশ দুর্বল হয়ে পড়েন। একই সময়ে পশ্চিম ভারতে শকেরা শক্তিশালী হয়ে ওঠে নহপানের নেতৃত্বে। নহপান ছিলেন শক ক্ষত্রপ বংশের সন্তান। এই ক্ষত্রপ বংশের প্রথম যে রাজার নাম পাওয়া যায় তিনি হলেন ভূমাকা, যদিও ভূমাকার সাথে নহপানের ঠিক কি পারিবারিক সম্পর্ক ছিল তা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। নহপান ছিলেন বড় যোদ্ধা এবং সুদক্ষ সেনানায়ক। মহারাষ্ট্রের নাসিকে তাঁর নামাঙ্কিত মুদ্রা পাওয়া গিয়েছে। এছাড়াও নাসিকে, কারলা এবং জুন্নারে পাওয়া গিয়েছে নহপানের জামাতা উৎসবদত্ত এবং মন্ত্রী অয়ামা’র লিপি যা অনুযায়ী অনুপা, অপরান্তা, আকারা, অবন্তী, সুরাথ এবং কুকুরা এইসব রাজ্যগুলি ছিল নহপানের অধীনে। এর থেকে মনে করা হয় যে সাধারণ অব্দের প্রথম শতকের প্রথম ভাগে নহপান মহারাষ্ট্রের উত্তরভাগ এবং কোঙ্কন উপকূল অধিকার করে নিয়েছিলেন সাতবাহনদের কাছ থেকে এবং তখন গুজরাট, কাথিয়াবাড়, কোঙ্কন এবং মহারাষ্ট্রের উত্তরভাগ জুড়ে ছিল শক রাজ্য।

সাতবাহনদের পুনরুত্থান ঘটে গৌতমীপুত্র সাতকর্ণী-এর সময়ে। মৎস্য পুরাণ অনুযায়ী গৌতমীপুত্র সাতকর্ণী ছিলেন সাতবাহন বংশের তেইশতম রাজা। তাঁর সাথে যুদ্ধে নহপান পরাজিত হন এবং খুব সম্ভব মারা যান। উৎসবদত্ত এবং অয়ামার লেখতে যে সমস্ত অঞ্চল নহপানের অধীনস্থ বলে উল্লিখিত হয়েছিল, পরবর্তীকালের গৌতমীপুত্র সাতকর্ণীর মাতা ‘গৌতমী বালা শ্রী’র নাসিক লেখতে সেই সমস্ত অঞ্চল গৌতমীপুত্র সাতকর্ণীর অধিকারে ছিল বলে বলা হয়েছিল। এর থেকে মনে করা হয় যে গৌতমীপুত্র সাতকর্ণী নহপানকে যুদ্ধে হারিয়ে উত্তর মহারাষ্ট্র এবং কোঙ্কন, নর্মদা উপত্যকা এবং সৌরাষ্ট্র, মালব এবং পশ্চিম রাজপুতানা পুনরায় সাতবাহনদের অধিকারে নিয়ে আসেন। প্রসঙ্গত গৌতমী বালা শ্রী এই লেখ লিখিয়েছিলেন গৌতমীপুত্র সাতকর্ণীর মৃত্যুর পর – গৌতমীপুত্র সাতকর্ণীর পুত্র অর্থাৎ গৌতমী বালা শ্রী’র পৌত্র বশিষ্টিপুত্র প্রথম পুলমায়ির শাসনকালের অষ্টাদশ বর্ষে। এই লেখ অনুযায়ী, গৌতমীপুত্র সাতকর্ণী শকদের সাথে সাথে যবন এবং পহলবদেরও পরাজিত করেছিলেন।

নহপানের বিরুদ্ধে নিজ বিজয়কে স্মরণীয় রাখতে গৌতমীপুত্র সাতকর্ণী নহপানের নামাঙ্কিত রৌপ্য মুদ্রার ওপর নিজের নাম পুনর্মুদ্রণ করেন। ১৯০৬ সালে নাসিকের নিকটবর্তী জোগালথাম্বি গ্রামে নহপানের ১৩,২৫০টি রৌপ্য মুদ্রা আবিষ্কৃত হয় যার মধ্যে ৯,২৭০টি মুদ্রায় গৌতমীপুত্র সাতকর্ণীর নাম পুনর্মুদ্রিত ছিল। গৌতমীপুত্র সাতকর্ণীকে ঋষিকা, অসমকা, মুলাকা, সৌরাষ্ট্র, কুকুরা, অপরান্তা, অনুপা, বিদর্ভ, আকারা এবং অবন্তী এইসব প্রাচীন অঞ্চলের অধিপতি বলা হত। তাঁর সময়ে সাতবাহন রাজ্য উত্তরে বিদর্ভ (বেরার) থেকে দক্ষিণে অধুনা কর্ণাটকের বৈজয়ন্তী (অধুনা বনবাসী) পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। তবে অন্ধ্রদেশে সম্ভবত তখনও সাতবাহন রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়নি। সেই সময় পূর্বদিকে সাতবাহন সাম্রাজ্য সম্ভবত কলিঙ্গ রাজ্যের সীমানা পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছিল।

গৌতমীপুত্র সাতকর্ণীর পর সিংহাসনে বসেন তাঁর পুত্র বশিষ্টিপুত্র প্রথম পুলমায়ি। তাঁর উল্লেখ পাওয়া যায় সাধারণ অব্দের দ্বিতীয় শতকে লেখা টলেমির বিবরণীতে – বৈঠানার (পৈঠান) রাজা সিরো পোলেমাইওস বলে। তিনি ২৪ বছর রাজত্ব করেছিলেন। ঐতিহাসিকদের মতে গৌতমীপুত্র সাতকর্ণী এবং তাঁর পুত্র বশিষ্টিপুত্র প্রথম পুলমায়ির সময়ে সাতবাহন সাম্রাজ্যের আয়তন সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছেছিল। করমণ্ডল উপকূলের গোদাবরী এবং গুন্টুর জেলায় এবং আরও দক্ষিণের কুড্ডালোরে বশিষ্টিপুত্র প্রথম পুলমায়ির নামাঙ্কিত মুদ্রা পাওয়া গিয়েছে। এর থেকে মনে করা হয় যে তাঁর সময়ে দাক্ষিণাত্যের পূর্ব ভাগ, আজকের কৃষ্ণা-গুন্টুর অঞ্চল সাতবাহন সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। তবে সাতবাহন সাম্রাজ্যের পূর্বদিকে তাঁর সামরিক অভিযানে ব্যস্ত থাকার সুযোগ নিয়ে তাঁর সমসাময়িক শক রাজা কর্দমাকা বংশের চাসথানা পশ্চিম রাজপুতানা এবং মালব পুনর্দখল করে নেয়। টলেমির দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী চাসথানার রাজধানী ছিল উজ্জয়িনী।

বশিষ্টিপুত্র প্রথম পুলমায়ির পর সিংহাসনে বসেন যথাক্রমে শিব শ্রী এবং শিবস্কন্দ, যাঁরা দুজনেই সাত বছর ধরে রাজত্ব করেছিলেন। এঁদের সঙ্গে সংঘাত চলে চাসথানা এবং তাঁর পুত্র জয়দমন-এর। এই লড়াইয়ে শকরা ছিলেন প্রবলতর প্রতিপক্ষ। যদিও জয়দমন সম্ভবত সাতবাহনদের সঙ্গে যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছিলেন। জয়দমনের অকাল মৃত্যু হওয়ায় শকদের সিংহাসনে বসেছিলেন তাঁর পুত্র রুদ্রদমন, আনুমানিক ১৩০ সাধারণ অব্দে। তবে তাঁর রাজত্বকালের প্রথমদিকে তিনি এবং তাঁর দাদু চাসথানা সম্ভবত যৌথ ভাবে রাজ্যশাসন করতেন। তাঁর সাথে সাতবাহনদের দু’বার যুদ্ধ হয় এবং দু’বারই সাতবাহনরা যুদ্ধে হেরে যান। ফলে অপরান্তা (উত্তর কোঙ্কন) এবং অনুপা (নর্মদা উপত্যকা) চলে যায় শকদের অধীনে। সাতবাহন সাম্রাজ্য সংকুচিত হয়ে অন্ধ্র অঞ্চলে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়।

মুম্বাই শহরতলীর কানহেরি গুহা থেকে প্রাপ্ত এক লেখ অনুযায়ী রুদ্রদমনের মেয়ের সাথে সাতবাহন বংশের জনৈক বশিষ্ঠীপুত্র সাতকর্ণীর বিবাহ হয়েছিল। সাতবাহন এবং শকদের মধ্যে স্থাপিত এই বৈবাহিক সম্পর্কের পিছনে কি কারণ ছিল – তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে দ্বিমত আছে। একটা মত হচ্ছে যে শকদের সাথে শান্তি স্থাপন করার জন্য সাতবাহনরা এই বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। যদিও এতে রুদ্রদমনের সাতবাহন সাম্রাজ্যের ওপর আক্রমণ বন্ধ হয়নি, কিন্তু এই বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে রুদ্রদমন সাতবাহনদের সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করেননি। অন্য মতটি হচ্ছে যে বশিষ্ঠীপুত্র সাতকর্ণী ছিলেন সাতবাহন সিংহাসন অভিলাষী কিন্তু রাজা হতে পারেননি। পুরাণে অন্ধ্রবংশীয় রাজাদের যে তালিকা পাওয়া যায় তাতে এই বশিষ্ঠীপুত্র সাতকর্ণীর নাম নেই। সাতবাহনদের এই পারিবারিক টানাপোড়েনকে কাজে লাগানোর জন্য রুদ্রদমন তাঁর মেয়ের বিয়ে দেন বশিষ্ঠীপুত্র সাতকর্ণীর সাথে এবং তাঁকে নিজের দিকে টেনে নেন। ঊনবিংশ শতকের প্রথমদিকে মহারাষ্ট্রের নানঘাটে আবিষ্কৃত এক লেখ অনুযায়ী, যা এই বশিষ্ঠীপুত্র সাতকর্ণীর রাজত্বকালের ত্রয়োদশ বর্ষে লেখা হয়েছিল, বশিষ্ঠীপুত্র সাতকর্ণী তাঁর শ্বশুর রুদ্রদমনের অনুমতিক্রমে অপরান্তার শাসক হয়েছিলেন।

সাতবাহনদের দ্বিতীয়বার পুনরুত্থান ঘটে সাধারণ অব্দের দ্বিতীয় শতকের শেষের দিকে, গৌতমীপুত্র যজ্ঞ(শ্রী) সাতকর্ণীর নেতৃত্বে। তিনি শকদের কাছ থেকে কিছু অঞ্চল পুনরুদ্ধার করেন। শকদের মুদ্রার অনুকরণে নির্মিত তাঁর রৌপ্য মুদ্রা পাওয়া গিয়েছে। মনে করা হয় যে শকদের থেকে পুনরাধিকার করা অঞ্চলগুলির জন্য এই ধরনের মুদ্রা চালু করা হয়েছিল।

গৌতমীপুত্র যজ্ঞ(শ্রী) সাতকর্ণী ছিলেন সাতবাহনদের শেষ শক্তিশালী রাজা। তাঁর মৃত্যুর কয়েক দশকের মধ্যে সাধারণ অব্দের তৃতীয় শতকের প্রথমার্ধে সাতবাহন রাজত্বের যবনিকা পতন হয়। তাঁর পরবর্তী যেসব সাতবাহন রাজার নাম পাওয়া যায় তাঁরা হলেন গৌতমীপুত্র বিজয়, যাঁর নামাঙ্কিত মুদ্রা পাওয়া গিয়েছে মহারাষ্ট্রের আকোলাতে, চন্দ্রশ্রী – যাঁর লিপি পাওয়া গিয়েছে কলিঙ্গতে এবং মুদ্রা পাওয়া গিয়েছে গোদাবরী এবং কৃষ্ণা জেলায় এবং বশিষ্টিপুত্র তৃতীয় পুলমায়ি, যাঁর লিপি পাওয়া গিয়েছে কর্ণাটকের বেল্লারি জেলাতে। এরপর থেকে সাতবাহনদের মূল বংশের কোনো উল্লেখ আর পাওয়া যায়নি। কিন্তু বিভিন্ন লেখ এবং মুদ্রায় প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে মনে করা হয় যে পরবর্তীকালে কর্ণাটক (কুন্তলা), দক্ষিণ মহারাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রদেশে সাতবাহনদের জ্ঞাতি বংশের শাসন ছিল।

সাতবাহন সাম্রাজ্যের সীমা এবং রাজধানী

সাতবাহন রাজ্যের সীমানা ঠিক কি ছিল তা নিয়েও ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে। অনেকের মতে পুরো দাক্ষিণাত্যই ছিল সাতবাহনদের অধীনে। রাজ্য বিস্তারের চূড়ান্ত পর্যায়ে সাতবাহনদের অধীনে ছিল উত্তরে রাজস্থান থেকে দক্ষিণে কৃষ্ণা নদী এবং পশ্চিমে সৌরাষ্ট্র থেকে পূর্বে কলিঙ্গের মধ্যবর্তী অঞ্চল। আবার অনেকের মতে সাতবাহন শাসন ছিল মূলত দাক্ষিণাত্যের পশ্চিমভাগে এবং দাক্ষিণাত্যের বাকি অংশ নিয়ন্ত্রণ করতেন বিভিন্ন গোষ্ঠী/উপজাতি, যাঁরা সাতবাহনদের বশ্যতা স্বীকার করে নিলেও – বলপ্রয়োগের দ্বারা এবং ক্ষেত্র বিশেষে বৈবাহিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে, মোটামুটি স্বাধীনভাবেই নিজেদের এলাকা শাসন করতেন। প্রসঙ্গত সাতবাহনদের প্রথম প্রভাবশালী রাজা প্রথম সাতকর্ণীর স্ত্রী নয়নিকা (নামভেদে ‘নাগানিকা’) ছিলেন একজন মহারথিকা – রথিকা গোষ্ঠীপতির মেয়ে।

সাতবাহন সাম্রাজ্যের সীমানা – বিস্তৃতির চূড়ান্ত পর্যায়ে

সাতবাহনদের রাজধানী কোথায় ছিল তা নিয়েও একাধিক মত আছে। যাঁরা মনে করেন যে সাতবাহন সাম্রাজ্যের শুরু অন্ধ্র অঞ্চলে হয়েছিল তাঁদের মতে সাতবাহনদের রাজধানী প্রথমে ছিল ধন্যকাটাকাতে এবং পরবর্তীকালে যখন মহারাষ্ট্র সাতবাহনদের রাজধানী চলে যায় গোদাবরীর তীরস্থ প্রতিষ্ঠানাতে। যাঁরা মনে করেন যে সাতবাহন সাম্রাজ্যের শুরু হয়েছিল মহারাষ্ট্র অঞ্চলে, তাঁদের মতে প্রথম থেকেই প্রতিষ্ঠানা ছিল সাতবাহনদের রাজধানী। এই নিয়ে তৃতীয় মত হল যে, সাতবাহনদের রাজধানী প্রথমে ছিল বর্তমান মহারাষ্ট্রের জুন্নার-এ এবং পরবর্তীকালে শকদের আক্রমণের জন্য তা পূর্বদিকে সরে গিয়ে প্রতিষ্ঠানায় চলে যায়।

শাসনব্যবস্থা

সাতবাহনদের শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে যে সমস্ত তথ্য পাওয়া গিয়েছে তার ভিত্তিতে মনে করা হয় যে সাতবাহন শাসনব্যবস্থায় কেন্দ্রীকতার ঝোঁক খুব একটা ছিল না। সাতবাহন রাজারা কোনো রাজকীয় উপাধি গ্রহণ করেননি। এর সম্ভাব্য কারণ হল যে সাতবাহনরা গোষ্ঠীতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করলেও, গোষ্ঠীপতিরা তখন বেশ ক্ষমতাশালী ছিল এবং এঁদের ওপর সাতবাহন রাজাদের নিয়ন্ত্রণ নিরঙ্কুশ ছিল না। রাজ্যের কিছু অংশের শাসনভার ছিল এই করদ রাজা/গোষ্ঠীপতিদের হাতে এবং সেখানে কেন্দ্রীয় শাসন বিশেষ একটা লাগু হত না। করদ রাজা/গোষ্ঠীপতিদের শুধু কেন্দ্রীয় আধিকারিকদের কিছু নির্দেশ মান্য করতে হত। এই রাজা/গোষ্ঠীপতিদের আবার তিনটি শ্রেণীবিভাগ ছিল – রাজা (এঁরা নিজেদের নামাঙ্কিত মুদ্রা চালু করতে পারতেন), মহাভোজ (ভোজ জনগোষ্ঠীর নেতা) এবং মহারথী (রথিকা জনগোষ্ঠীর নেতা)।

রাজ্যের যে অংশটি প্রত্যক্ষ কেন্দ্রীয় শাসনের অধীনে ছিল সেটিকে আবার কয়েকটি প্রশাসনিক অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়েছিল। এই প্রশাসনিক অঞ্চলগুলিকে বলা হতো ‘আহারা’। শাসনের সুবিধার্থে, রাজ্যকে অনেকগুলি আহারাতে বিভক্ত করার এই রীতিটি উদ্ভূত হয়েছিল সম্রাট অশোকের সময়। এর থেকে বোঝা যায় যে সাতবাহন প্রশাসনে মৌর্য শাসনব্যবস্থার বেশ প্রভাব ছিল। আহারার প্রশাসনিক দায়িত্ব থাকতো মন্ত্রীদের ওপর (‘অমাত্য’)। পদমর্যাদায় অমাত্যদের স্থান ছিল মহাভোজ এবং মহারথীদের নিচে। প্রত্যেকটি আহারায় থাকতো নিদেনপক্ষে একটি কেন্দ্রীয় নগর এবং একাধিক গ্রাম যা ছিল সাতবাহন প্রশাসনের নিম্নতম স্তর। গ্রামের দায়িত্বে থাকতেন গ্রামপ্রধান (গ্রামিকা), যাঁদের অধীনে থাকতো নয়টি রথ, নয়টি হাতি, পঁচিশ জন অশ্বারোহী এবং ৪০ জন পদাতিক বিশিষ্ট সৈন্যদল যারা গ্রামিকাদের শাসন কার্যে সাহায্য করত। সাতবাহন শাসনের শেষের দিকে একটি নতুন প্রশাসনিক পদ তৈরি হয়েছিল – মহাসেনাপতি। এই মহাসেনাপতিদের কেউ কেউ রাজ্যের দূরবর্তী অংশের দায়িত্বে থাকতেন আবার কেউ কেউ রাজধানীতে কেন্দ্রীয় প্রশাসনের সাথে যুক্ত থাকতেন। এছাড়াও সেই সময়কার বিভিন্ন লেখ থেকে আমরা আরও যে সমস্ত প্রশাসনিক পদের কথা জানতে পারি সেগুলি হল কোষাধক্ষ এবং গোমস্তা, স্বর্ণকার এবং মুদ্রা প্রস্তুতকারক, মহামাত্র, হিসাবরক্ষক, রাজদূত ইত্যাদি।

অর্থনৈতিক অবস্থা – কৃষি, হস্তশিল্প ও বাণিজ্য

সাতবাহন অর্থনীতির মূল ভিত্তি ছিল হস্তশিল্প এবং বাণিজ্য।

সাতবাহনদের সময় হস্তশিল্প এবং বাণিজ্যের প্রভূত বিকাশ হয়। পুরো দাক্ষিণাত্যে বিশেষ করে দাক্ষিণাত্যের পূর্বভাগে হস্তশিল্প এবং বাণিজ্যে জোয়ার এসেছিল, এই সময় যা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল সাধারণ অব্দের দ্বিতীয় শতকের শেষের দিকে। সাতবাহন শাসনাধীন দাক্ষিণাত্যের প্রায় ৩০০ বছর ধরে চলা রাজনৈতিক অখণ্ডতা এবং স্থিতিশীলতা এই শিল্পবাণিজ্য বিকাশের জন্য অনুকূল পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল। তবে হস্তশিল্প এবং বাণিজ্যের এই বিকাশ যে শুধুমাত্র সাতবাহন শাসিত অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল এমনটা নয়। কুষাণ এবং শক শাসিত অঞ্চল সহ তদানীন্তন ভারতবর্ষের একটা বড় অংশে এই সময়পর্বে হস্তশিল্প এবং বাণিজ্যের প্রভূত বিকাশ হয়েছিল। বস্তুত পুরো প্রাচীন যুগের মধ্যে এই সময়কালেই সারা ভারতে শিল্প এবং বাণিজ্যের সর্বাধিক বিকাশ হয়েছিল। ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবিধার্থে একই বৃত্তির লোকজন নিগম গঠন করতে শুরু করেন। নিগমের শীর্ষকর্তাকে বলা হত শ্রেষ্ঠী। নিগমের দফতরকে বলা হত নিগমসভা, যেখানে ব্যবসায়ীদের মধ্যে হত আর্থিক লেনদেন।

সাতবাহন সময়কালে অনেক নতুন বৃত্তির উদ্ভব হয়। প্রাক-মৌর্য যুগে লেখা ‘দীর্ঘনিকায়’-এ উল্লেখ করা হয়েছিল ১২টি বৃত্তির। আর এই সময়কার লেখা গ্রন্থ ‘মহাবস্তু’ অনুযায়ী রাজগীরে ৩৬টি বৃত্তির কারিগর বাস করতেন এবং সেই তালিকাও ছিল অসম্পূর্ণ। ‘মিলিন্দপঞ্‌হ’ (মিলিন্দার প্রশ্ন) গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে ৭৫টি বৃত্তির। বস্ত্র, পশমের বুনন, অস্ত্র এবং বিলাস-সামগ্রী ইত্যাদি শিল্প গড়ে উঠেছিল এই সময়ে। সোনা, রুপা, সীসা, টিন, তামা, পিতল, লোহা এবং রত্ন ও গহনা সম্বন্ধীয় আটটি কারুশিল্পের প্রচলন ছিল। এছাড়াও অনেক কারুশিল্পে দস্তা,  অ্যান্টিমনি এবং লাল আর্সেনিক ব্যবহৃত হত। এর থেকে মনে করা হয় যে খনিবিদ্যা এবং ধাতুবিদ্যায় বিশেষ অগ্রগতি হয়েছিল এই সময়ে। লৌহজাত দ্রব্য নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তির বিশেষ উন্নতি হয়েছিল। এই বিষয়ে তেলেঙ্গানা অঞ্চল ছিল অগ্রগণ্য। তেলেঙ্গানার করিমনগর এবং নালগোন্দায় প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য চালিয়ে লৌহ নির্মিত অস্ত্রশস্ত্রর সাথে সাথে কোটরযুক্ত কুড়াল এবং কোদাল, কাস্তে, মাপনী, হাতা ইত্যাদি পাওয়া গিয়েছে। এইসব বস্তু এবং খাওয়ার কাঁটা-চামচ ইত্যাদি এখন থেকে রপ্তানি হত আবিসিনিয়ান বন্দরে এবং পুরো পশ্চিম এশিয়া জুড়ে এইসব দ্রব্যসামগ্রীর বিশেষ চাহিদা ছিল।

সাতবাহনদের সময়ে, তাঁদের সক্রিয় সহযোগিতায় ইন্দো-রোমান নৌবাণিজ্যের প্রভূত বিকাশ হয়। উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম ভারত এবং দাক্ষিণাত্যের সাথে রোমান সাম্রাজ্যের নৌপথে পণ্য আমদানি-রপ্তানি হত বারিগাজা (আজকের বারুচ), সুপারকা (সোপারা), কল্যাণ এই সব বন্দর দিয়ে। উত্তর ভারত থেকে পণ্যসামগ্রী উজ্জয়িনী থেকে এবং দাক্ষিণাত্য থেকে পণ্যসামগ্রী প্রতিষ্ঠানা থেকে সড়কপথে এসে পৌঁছতো এই বন্দরগুলিতে এবং সেখান থেকে নৌপথে রপ্তানি হত রোমান সাম্রাজ্যাধীন মিশরে। এই বন্দরগুলি ছিল সাতবাহন শাসনাধীন অঞ্চলে এবং এই বন্দরগুলির বিকাশ হয়েছিল সাতবাহনদের সময়ে। যদিও সোপারাতে প্রাপ্ত সম্রাট অশোকের প্রস্তর শাসনের ভগ্নাবশেষ থেকে অনুমান করা হয় যে এই নৌবাণিজ্য শুরু হয়েছিল মৌর্যদের সময়ে, বন্দর এবং নৌবাণিজ্য সম্পর্কিত অন্যান্য পরিষেবার জন্য জমি প্রদান করে সাতবাহনরা এই বন্দরগুলির বৃদ্ধিতে সাহায্য করেছিলেন। সাতবাহনদের বেশ কিছু মুদ্রায় জাহাজের ছবি দেখে তাঁদের কাছে এই নৌবাণিজ্য কত গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা বোঝা যায়।

নানঘাট গিরিপথ – সাতবাহনদের গুরুত্বপূর্ণ শহর এবং শিল্পকেন্দ্র জুন্নার এবং প্রতিষ্ঠানা (পৈঠান) থেকে পশ্চিম উপকূলের বারিগাজা, কল্যাণ এবং সোপারা বন্দরে পৌঁছনোর সংক্ষিপ্ততম পথ ছিল নানঘাট গিরিপথ

পশ্চিম উপকূলের বন্দর দিয়ে রোমান সাম্রাজ্যের সাথে বাণিজ্যের পাশাপাশি পূর্ব উপকূলের বন্দর দিয়ে সুদূর প্রাচ্যের সুমাত্রা, আরাকান, চম্পা ইত্যাদি অঞ্চলের সাথেও নৌবাণিজ্য চলতো সাতবাহন শাসনাধীন অঞ্চলের। মাইসোলিয়া (আজকের মছলিপত্তনম) ছিল পূর্ব উপকূলের প্রধান বন্দর।

সাতবাহনদের প্রভাব-প্রতিপত্তির বৃদ্ধির পিছনে উপরোল্লিখিত শিল্প-বাণিজ্যের বিকাশের একটা বড় ভূমিকা ছিল। সেই সময় উত্তর ভারতের সাথে দক্ষিণ ভারতের মধ্যে রাজনৈতিক সংযোগ সেভাবে স্থাপিত না হলেও বাণিজ্যিক এবং ধর্মীয় আদান-প্রদান, যা শুরু হয়েছিল মৌর্যদের সময়, ছিল যথেষ্ট সক্রিয়। উত্তর ভারতের সাথে দক্ষিণ ভারতের সংযোগকারী সমস্ত অন্তর্দেশীয় সড়কপথ যেত সাতবাহন রাজ্যের ওপর দিয়ে। সেই সময়কার অতীব গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্দেশীয় বাণিজ্যপথ ‘দক্ষিণাপথ’ ছিল সাতবাহনদের নিয়ন্ত্রণাধীন, যে কারণে সাতবাহনরা নিজেদের ‘দক্ষিণাপথ-পতি’ বলে অভিহিত করতেন। এই বাণিজ্যপথগুলি এবং উপরোক্ত বন্দরগুলি থেকে আদায়ীকৃত শুল্ক ছিল সাতবাহন রাজ্যের অর্থনীতির একটি মূল স্তম্ভ।

নানঘাট গিরিপথে আদায়কৃত শুল্ক রাখার ভাণ্ড

বস্তুত, দাক্ষিণাত্যের পশ্চিমভাগের অধিকার নিয়ে সাতবাহনদের সাথে শকদের নিরন্তর যুদ্ধবিগ্রহের অন্যতম কারণ ছিল পশ্চিম উপকূলের বন্দরগুলির নিয়ন্ত্রণ এবং তা থেকে শুল্ক আদায়ের অধিকার। সাধারণ অব্দের প্রথম শতকে লেখা ‘পেরিপ্লাস অফ দি এরিথ্রিয়ান সি’ গ্রন্থ অনুযায়ী, নহপনের সময় (‘নাম্বানুস’ নামে উল্লিখিত), যখন বারিগাজা বন্দর শকদের অধীনে চলে যায় তখন শকরা সাতবাহনাধীন কল্যাণ বন্দর অভিমুখী জাহাজকে দিক পরিবর্তন করে বারিগাজা বন্দরে যেতে বাধ্য করতো।  সেই সময় সাতবাহনাধীন বন্দর কল্যাণ এবং সোপারা অনেকাংশে বাণিজ্যিক গুরুত্ব হারিয়েছিল বারিগাজা বন্দরের কাছে।

বাণিজ্যশুল্কের সাথে সাথে, কৃষিজাত দ্রব্য থেকে আদায়ীকৃত শুল্কও ছিল সাতবাহন অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। সেই সময়ের এক বড় অংশের মানুষের মূল জীবিকা ছিল কৃষিকাজ এবং মোটের ওপর কৃষির অবস্থা ছিল বেশ ভালোই। যা কৃষিজাত দ্রব্য উৎপাদিত হত তার ছয়ভাগের একভাগ যেত রাজকোষাগারে শুল্ক হিসাবে। লবণ উৎপাদন ছিল রাষ্ট্রের এক্তিয়ারভুক্ত।

নগরায়ণ 

উপরোক্ত শিল্প বাণিজ্যের বিকাশ এবং ফলস্বরূপ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কারণে সমগ্র প্রাচীন যুগের মধ্যে এই সময়ে (সাধারণ পূর্বাব্দের দ্বিতীয় শতক থেকে সাধারণ অব্দের দ্বিতীয় শতক) ভারতবর্ষে নগরায়নের গতি ছিল সর্বাধিক। সেই সময়ে সাতবাহন রাজ্যের উল্লেখযোগ্য শহর/নগরগুলি ছিল প্রতিষ্ঠানা, টাগারা, জুন্নার, কারাহাতাকা, নাসিক এবং বৈজয়ন্তী। এই শহরগুলির প্রত্যেকটিই ছিল পশ্চিম দাক্ষিণাত্যে। পূর্ব দাক্ষিণাত্যেও বেশ কয়েকটি শহর গড়ে উঠেছিল যেমন ধন্যকাটাকা, বিজয়পুরা, নরসেলা ইত্যাদি তবে এই শহরগুলি পশ্চিম দাক্ষিণাত্যের শহরগুলির মত গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। প্লিনির বিবরণী অনুযায়ী সেই সময় অন্ধ্র অঞ্চলে ৩০টি প্রাচীরঘেরা শহর ছিল। শহরগুলি মধ্যেই থাকত কেল্লা। শহরে প্রবেশের মূল দরজাগুলি হত তোরণ বিশিষ্ট।

মুদ্রাব্যবস্থা

রোমানদের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রভাবে, তৎকালীন সমস্ত ভারতীয় রাজশক্তিগুলি – কুষাণ, সাতবাহন, শক ইত্যাদিরা নিজেদের নামাঙ্কিত প্রচুর মুদ্রা ছাপিয়েছিলেন। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন থেকে পাওয়া মুদ্রার ভিত্তিতে মনে করা হয় যে সমসাময়িক অন্যান্য শাসকদের তুলনায় সাতবাহনরা মুদ্রার ব্যবহার বেশি করতেন। এঁদের প্রথমদিকের মুদ্রাগুলি ছিল, মৌর্য যুগের মুদ্রার ন্যায়, ‘post-punch-marked’ পর্যায়ের, মূলত সীসা, তামা এবং টিন দিয়ে তৈরি। কিছু কিছু মুদ্রা ছিল ব্রাহ্মীলিপিতে লেখা বিবরণী সহ। পরের দিকের মুদ্রাগুলি ছিল অনেক উন্নতমানের, রোমান মুদ্রার মত ‘minted and die-cast’। সাতবাহন সময়কার একটি মুদ্রা তৈরির ছাঁচ পাওয়া গিয়েছে, যাতে একই সাথে আধ-ডজন মুদ্রা তৈরি করা যেত। পরের দিকের সাতবাহন মুদ্রা তৈরি হতো মূলত সীসা দিয়ে। সাধারণ অব্দের প্রথম এবং দ্বিতীয় শতকে, সম্ভবত শকদের রৌপ্য মুদ্রা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে, সাতবাহন রাজারা নিজেদের চিত্র যুক্ত দ্বিভাষিক রৌপ্য মুদ্রা প্রচলন করেছিলেন।

নয়নিকার চিত্রাঙ্কিত সাতবাহন মুদ্রা

ধর্মীয় পরিমণ্ডল

সাতবাহনের ছিলেন বৈদিক ধর্মাবলম্বী। নানঘাটে আবিষ্কৃত প্রথম সাতকর্ণীর স্ত্রী নয়নিকার লিপি থেকে জানা যায় যে প্রথম সাতকর্ণী এবং নয়নিকা অশ্বমেধ এবং রাজসূয় যজ্ঞ করেছিলেন, যাতে ব্রাহ্মণদের প্রভূত পরিমাণে গরু, ঘোড়া, হাতি, রৌপ্য মুদ্রা উপহার হিসাবে দেয়া হয়েছিল। ইন্দ্র, বাসুদেব, সূর্য, চন্দ্র, শিব, বিষ্ণু, কৃষ্ণ, গণেশ এবং পশুপতি ছিলেন সেই সময়কার মুখ্য আরাধ্য দেবতা। সাতবাহন রাজা হলের লেখা ‘গথ সত্তসাই’ গ্রন্থে পশুপতি ও  গৌরী, রুদ্র ও  পার্বতী এবং লক্ষ্মী ও নারায়ণের উল্লেখ আছে।

নানঘাট গুহায় প্রথম সাতকর্ণীর স্ত্রী রানী নয়নিকার লিপি

বৈদিক ধর্মাবলম্বী হলেও তাঁরা বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতাও করেছিলেন যা তাঁদের ধর্মসহিষ্ণুতার পরিচয় দেয়। নাসিকের পান্ডবলেনি, মুম্বাই শহরতলীর কানহেরি এবং এবং পুণের নিকটস্থ কালরার গুহাগুলিতে প্রাপ্ত শিলালিপিতে সাতবাহন রাজাদের বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতার উল্লেখ পাওয়া যায়। সাতবাহন সাম্রাজ্যের নাসিক, কারলা, ভেজা, ভেডসে, অজন্তা, অমরাবতী, নাগার্জুনকোন্ডা, যাজ্ঞপেটা – এই সব জায়গায় প্রচুর বৌদ্ধ চৈত্য এবং স্তূপ নির্মিত হয়। বস্তুতপক্ষে দাক্ষিণাত্যে বৌদ্ধধর্মের সত্যিকারের প্রসার সম্রাট অশোকের সময়ে হয়নি, হয়েছিল সাতবাহনদের সময়ে। বৌদ্ধ ধর্মগুরু নাগার্জুন লাভ করেন গৌতমীপুত্র যজ্ঞ(শ্রী) সাতকর্ণীর বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতা। অন্ধ্র অঞ্চল হয়ে ওঠে মহাযান বৌদ্ধধর্মের এক প্রাণকেন্দ্র। তবে, দাক্ষিণাত্যে বৌদ্ধ ধর্মের এই প্রসারে সাতবাহন রাজবংশের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ এবং বণিক সম্প্রদায়ও প্রচুর পৃষ্ঠপোষকতা করেছিল।   

সাতবাহনরা নিজেরা বৈদিক ধর্মের অনুসারী হয়েও যে বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন, তার পিছনে কিছু আর্থ-সামাজিক কারণও ছিল। সাতবাহন শাসকরা বৈদিক ধর্মাবলম্বী হলেও, তাঁদের প্রজারা ছিল মূলত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। দ্বিতীয়ত, বাণিজ্য বিকাশের জন্য সুদীর্ঘ বাণিজ্যপথে রাত্রিবাসের ব্যবস্থা করা দরকার ছিল। আর এই প্রয়োজন মেটানোর সবচেয়ে উপযুক্ত দাওয়াই ছিল বৌদ্ধবিহারগুলি, যেখানে বণিকরা রাত কাটাতেও পারতেন আবার দিনের শেষে ধর্মচর্চাও করতে পারতেন। সম্ভবত এই সব কারণেই সাতবাহনরা রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষত পশ্চিমঘাট পর্বতমালায় বৌদ্ধ বিহার এবং চৈত্য নির্মাণে সক্রিয় সহায়তা করেন।

সামাজিক অবস্থা

সাতবাহনরা নিজেদের বর্ণাশ্রম প্রথার রক্ষক এবং দ্বিজদের পৃষ্ঠপোষক বলে গৌরবান্বিত বোধ করতেন। নাসিক লিপি অনুসারে গৌতমীপুত্র সাতকর্ণীকে উপাধি দেওয়া হয়েছিল ‘একবামহানাস’ যার অর্থ ‘এক মাত্র ব্রাহ্মণ’ অথবা ‘ব্রাহ্মণদের একমাত্র রক্ষক’।

সাতবাহনরা নিজেদের বর্ণাশ্রম প্রথার রক্ষক বললেও, বর্ণাশ্রম প্রথা যে খুব কঠোরভাবে মানা হত, এমন নয়। সেই সময় শক এবং যবনদের বহুলভাবে ভারতীয় সমাজে আত্তীকরণ করা হয়েছিল। এঁদের কেউ কেউ বৌদ্ধ ভিক্ষু হয়ে যান, কেউ বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করেন, আবার আবার কেউ পতিত ক্ষত্রিয় হয়ে, যা তদানীন্তন সামাজিক শ্রেণীবিন্যাসে নিচু জাত বলে গণ্য করা হত, ভারতীয় সমাজের অংশ হয়ে গিয়েছিলেন। সাতবাহনদের লিপিতে শক, যবন এবং পার্থিয়ানদের পতিত ক্ষত্রিয় বলে উল্লেখ করা আছে। এমনকি সাতবাহনরা নিজেরাই রাজনৈতিক প্রয়োজনে এই বর্ণাশ্রম প্রথা ভঙ্গ করতেন। শকদের সাথে তাঁদের বৈবাহিক সম্পর্কের স্থাপন তারই পরিচায়ক। ভোজ এবং রথিকা জনগোষ্ঠীর সাথেও সাতবাহনদের বৈবাহিক সম্পর্ক ছিল।

সাতবাহনদের সময়ে সমাজের জাতিবিন্যাসে যে বহুল পরিবর্তন ঘটেছিল তার আর একটা কারণ ছিল শিল্পের বিকাশ। নতুন নতুন বৃত্তি উদ্ভূত হওয়ায়, তৈরি হয়েছিল বিভিন্ন বৃত্তিনির্ভর উপজাতি, যেমন- গোলিকা (পশুপালক), হালিকা (কৃষক), কোলিকা (তন্তুবায়), শেঠি (বণিক), কুলারিকা (মৃৎশিল্পী), ধন্নিকা (শস্য ব্যবসায়ী) ইত্যাদি।

সাতবাহন শাসনাধীন সমাজে মহিলাদের স্থান ছিল উচ্চ মর্যাদার। সাতবাহনদের বিভিন্ন লিপি এবং সেই সময়কার বিভিন্ন তথ্যাদি তারই সাক্ষ্য দেয়। তাঁরা নিজেদের ইচ্ছেমত দানধ্যান করতে পারতেন এবং স্বামীর উপাধি, যেমন ‘মহাতালাভরি’, গ্রহণ করতে পারতেন। সেই সময়কার বিভিন্ন স্থাপত্যে মহিলাদের স্বল্পবসনা এবং অলংকারশোভিত রূপ দেখা যায়। শেষ দিকের সাতবাহন রাজাদের নিজের নামের আগে মায়ের নামের ব্যবহারও সমাজে নারীর সম্মান ও মর্যাদার পরিচয় ফুটে ওঠে।

ভাষা, সাহিত্য, শিল্প এবং স্থাপত্য

সাতবাহনদের প্রধান ভাষা ছিল প্রাকৃত এবং লিপি ছিল ব্রাহ্মী। সাতবাহনদের যতগুলি লেখ পাওয়া গিয়েছে, তার প্রায় সবগুলিই প্রাকৃতে লেখা।

সাতবাহনদের সময়ের উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে পড়ে কাতন্ত্র, বৃহৎকথা এবং গথ সত্তসাই। কাতন্ত্র লেখা হয়েছিল সংস্কৃত ব্যাকরণের ওপর। লিখেছিলেন জনৈক সর্ববর্মন, যিনি সম্ভবত ছিলেন রাজা হলের মন্ত্রী। বৃহৎকথা রচিত হয়েছিল পৈশাচি প্রাকৃতে। রচয়িতা ছিলেন গুণাঢ্য। গথ সত্তসাই ছিল ৭০০টি প্রেমের কবিতার সংকলন। গথ সত্তসাই লেখা হয়েছিল মহারাষ্ট্রী প্রাকৃতে এবং এর রচয়িতা ছিলেন সাতবাহন রাজা হল। তবে মহারাষ্ট্রী প্রাকৃতে রচিত হলেও গথ সত্তসাইতে প্রচুর স্থানীয় শব্দ পাওয়া যায়। এই সময়ের আর একটি উল্লেখযোগ্য রচনা হল ‘লীলাবতী পরিণয়ম’ যা রাজা হলের বিবাহের ওপর রচিত। এই গ্রন্থের রচয়িতা কে তা অবশ্য জানা যায়নি।

সাতবাহন শাসনের শেষের দিকে সংস্কৃত প্রধান ভাষা হয়ে ওঠে। মহাযান বৌদ্ধধর্মের প্রধান গুরু নাগার্জুনের সমস্ত রচনাই লেখা হয়েছিল সংস্কৃতে।

সাতবাহন শাসনকালে পুরো দাক্ষিণাত্যে বৌদ্ধ ধর্মীয় স্থাপত্যকীর্তির বিশেষ বিকাশ ঘটে। দাক্ষিণাত্যে সবচেয়ে পুরোনো যে সমস্ত বৌদ্ধ স্থাপত্যকীর্তি পাওয়া যায় সেইগুলির সবই সাতবাহনদের সময়কার। এইগুলির মধ্যে আছে স্তূপ, চৈত্য, বিহার এবং সংঘরাম এবং এগুলি সাতবাহন সাম্রাজ্যের পূর্ব এবং পশ্চিম – দুই অঞ্চলেই গড়ে উঠেছিল। সাতবাহন সাম্রাজ্যের পূর্বাংশে যে সমস্ত স্তূপ, যেমন ভাট্টিপরলু এবং অমরাবতীর স্তূপ, বা চৈত্যগৃহ, যেমন চেজারেলা এবং নাগার্জুনকোন্ডার চৈত্যগৃহ, তৈরি হয়েছিল সেইগুলির নির্মাণ হয়েছিল ইট দিয়ে। ভাট্টিপরলু এবং অমরাবতীর স্তূপ দক্ষিণ ভারতের সবচেয়ে প্রাচীন ইটের স্তূপ। পক্ষান্তরে সাতবাহন সাম্রাজ্যের পশ্চিম অংশে, পশ্চিমঘাট পর্বতমালার বিভিন্ন জায়গায়, যেমন- নাসিক, কারলা, ভাজা, ভেডসে ইত্যাদিতে যে সমস্ত গুহা, চৈত্য এবং বিহার গড়ে উঠেছিল সেগুলি সবই তৈরি হয়েছিল পাহাড় কেটে।

নাসিকের পান্ডবলেনি গুহা

তৎকালীন দাক্ষিণাত্যের বৌদ্ধ ধর্মচর্চার মূলকেন্দ্র অমরাবতীতে এই ধর্মীয় স্থাপত্যশৈলীর বিশেষ বিকাশ ঘটে এবং অমরাবতী স্তূপ ছিল এই উৎকর্ষতার প্রকৃষ্টতম উদাহরণ।

অজন্তার প্রথমদিকের হীনযান গুহাচিত্রগুলিও সাতবাহনদের সময়কার।

উপসংহার

প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে সাতবাহনদের গুরুত্বের কারণ হল যে – (১) সাতবাহনরাই প্রথম দাক্ষিণাত্যে গোষ্ঠীতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন, (২) তাঁরা কয়েক শত বছর ধরে দাক্ষিণাত্যের রাজনৈতিক অখণ্ডতা এবং স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছিলেন, যা শুধু দাক্ষিণাত্যের শিল্প এবং বাণিজ্যের বিকাশের সহায়ক হয়েছিল তাই নয়, উত্তর ভারত এবং দক্ষিণ ভারতের মধ্যে বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় আদান-প্রদানের জন্য অনুঘটকের কাজ করেছিল, (৩) রাজ্য চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন, (৪) রাজ্য চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় উদ্বৃত্ত সম্পদ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে কৃষি, শিল্প এবং বাণিজ্য বিকাশের প্রয়াস নিয়েছিলেন, (৫) উদ্বৃত্ত সম্পদ আদায়ের জন্য রাজস্ব চালু করেছিলেন, এবং (৬) নিজস্ব মুদ্রা প্রচলন করেছিলেন। 

সাতবাহনদের পতনের পর দাক্ষিণাত্যের রাজনৈতিক অখণ্ডতা ভেঙ্গে যায়। বর্তমানের মধ্যপ্রদেশ অঞ্চলে সাতবাহনদের বংশধররা কিছুদিন রাজত্ব করেন। তারপর সেখানে চালু হয় বাকাটক রাজত্ব। সাতবাহন রাজ্যের উত্তর-পশ্চিম ভাগ চলে যায় অভিরাসদের অধীনে। কুন্তলা অঞ্চল (আজকের কর্ণাটক) শাসন করতে শুরু করেন বনবাসীর চুটুরা। এই চুটুদের সাথেও সাতবাহনদের সম্ভবত পারিবারিক সম্পর্ক ছিল। পরবর্তীকালে চুটুদের প্রতিস্থাপিত করেন কদম্বরা। বর্তমানের অন্ধ্রপ্রদেশ অঞ্চলে উঠে আসেন ইক্ষাকুরা। এঁদের রাজত্ব চলে প্রায় একশ’ বছর, পল্লবদের উত্থানের আগে পর্যন্ত। দাক্ষিণাত্যের রাজনৈতিক অখণ্ডতা বহুলাংশে পুনর্স্থাপিত হয় সাতবাহনদের পতনের প্রায় তিনশ’ বছর পরে, সাধারণ অব্দের ষষ্ঠ শতকে, বাদামির চালুক্যদের উত্থানের মধ্য দিয়ে।

তথ্যসূত্র:

১. K. A. Nilakanta Sastri, The Illustrated History of South India: From Prehistoric Times to the Fall of Vijayanagar, Oxford India Press, 2009.

২. Noboru Karashima (Ed.), A Concise History of South India, Issues and Interpretations, Oxford India Press, 2014.

৩. Durga Prasad, History of the Andhras, upto 1565 A.D., P.G. Publishers, Guntur – 10, 1988.

৪. Romila Thapar, The Penguin History of Early India, From Origins to AD 1300 (Kindle Edition).

৫. John Keay, India – A History: From the Earliest Civilisation to the Boom of the Twenty-First Century, Harper Press, 2010.

৬. Upinder Singh – A History of Ancient and Early Medieval India: From the Stone Age to the 12th Century, Pearson, 2009 .

৭. R.S.Sharma, India’s Ancient Past, Oxford University Press, Seventh impression, 2009.

লেখক মুম্বাইতে স্বনিযুক্ত শান্তনু কারিগরিবিদ্যায় স্নাতক এবং ফিনান্স'এ এম.বি.এ। পেশার বাইরে শান্তনু'র শখ হলো নতুন জায়গা ঘুরে দেখা এবং ইতিহাসচর্চাকরা।

মন্তব্য তালিকা - “সাতবাহন”

  1. সাতবাহনদের সম্বন্ধে অজানা বহু তথ্য পেলাম। দক্ষিণ ভারত নিয়ে বাংলায় ইতিহাস লেখন খুব সীমিত। সাতবাহনদের পূর্ববর্তী সময়ের ইতিহাস প্রায় পাওয়ায় যায়না। আপনার কাছে দক্ষিন ভারত নিয়ে আরো ইতিহাস জানার অপেক্ষায় থাকলাম। ধন্যবাদ🙏✍️

  2. লেখাটি পড়ে এবং ছবিগুলো দেখে শিহরিত হলাম। বাংলা ভাষায় সাতবাহনদের নিয়ে এমন বিস্তারিত চর্চা আমার চোখে পড়েনি। সেদিক থেকে দেখতে গেলে আপনার প্রভূত পরিশ্রমের ফসল এ প্রবন্ধ বাংলা ভাষায় ইতিহাস চর্চায় সাতবাহনদের ক্ষেত্রে এক আকরের ভূমিকা নেবে বলে আমার বিশ্বাস।
    অনবদ্য।।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।