সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

সন্তুর

সন্তুর

কুন্তল রায়

ডিসেম্বর ১৩, ২০২৫ ১৫৬ 0

ভারতবর্ষ এমন একটি ভূখণ্ড যেখান থেকে সাহিত্য, ধর্ম, দর্শন, প্রযুক্তি, খাদ্যবস্তু ইত্যাদির প্রভাব সারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল ও আজও তা হয়ে চলেছে। তবে এই চলন কোনও বড়ো দেশের ক্ষেত্রেই একমুখী হয় না। এই দেশেও এসেছে নানান নতুন জিনিস; তেমনই এক জিনিস নিয়ে আজকের গল্পের অবতারণা।

পারস্যের এক কিংবদন্তির রাজা ছিলেন জামসেদ। তাঁর গল্প রচিত আছে নানান প্রাচীন লোককথায়। যেমন, তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এমন একটা গল্প যা দিয়ে শুরু করলে হয়তো বিষয়টা একটু তরল হতে পারে। পারস্যের কিংবদন্তি অনুসারে, রাজা জামসেদ তাঁর হারেমের এক মহিলাকে সেখান থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এর ফলে সেই মহিলা এতটাই হতাশ হয়ে পড়েন যে আত্মহত্যা করতে চান। রাজার গুদামঘরে গিয়ে মেয়েটি ‘বিষ’ চিহ্নিত একটি পাত্র খুঁজে বের করেন। এতে কিছুটা আঙ্গুরের রসের অবশিষ্টাংশ ছিল, মনে করা হয়েছিল সেই রস নষ্ট হয়ে গিয়েছে এবং পান করার অযোগ্য ভেবে তাকে বিষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। তিনি জানতেন না যে আসলে আঙ্গুরের রস গেজে গিয়ে অ্যালকোহলে পরিণত হয়েছিল। মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষায় এই তথাকথিত ‘বিষ’ পান করার পর হারেম-পরিত্যক্ত সেই মেয়েটি একটা মনোরম আনন্দ আবিষ্কার করলেন এবং সমস্ত গ্লানি মুছে উজ্জীবিত হয়ে উঠলেন। এরপর তিনি রাজার দরবারে উপস্থিত হন এবং সেখানে তার আবিষ্কারকে চেখে দেখার অনুরোধ জানান। রাজা সে জিনিসের স্বাদ গ্রহণের পর এই নতুন পানীয়ের প্রতি এতটাই মুগ্ধ হয়ে পড়েন যে তিনি কেবল মেয়েটিকে তার হারেমে ফিরিয়েই নেননি, সেই সঙ্গে আদেশ দেন এরপর থেকে যেন পার্সিপোলিসে জন্মানো সমস্ত আঙ্গুর ওয়াইন তৈরির জন্য ব্যবহার করা হয়। যদিও এই গল্পটিকে খাঁটি কিংবদন্তি হিসেবেই দেখা হয়, তবুও যে সমস্ত প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ রয়েছে তা থেকে জানা যায় পারস্যের রাজাদের কাছে মদ অত্যন্ত পরিচিত তো ছিলই, তার পাশাপাশি ব্যাপকভাবে এর ব্যবসা চলত।

এই উত্তেজক পানীয়ের সঙ্গে এই লেখার কোনও সম্পর্ক নেই কিন্তু। সুরা বাদে রাজা জামসেদ দ্বিতীয় যে কারণে পরিচিত হয়ে আছেন তা হল গান-বাজনা। মনে করা হয় পারস্যের দরবারে সংগীতের স্রষ্টা ছিলেন তিনিই। সে যাই হোক, এই দেশের অতীতকালের বিভিন্ন সময়ের যেটুকু নথিপত্র পাওয়া যায় তা থেকে প্রমাণিত হয় যে প্রাচীন পারস্যের অধিবাসীরা একটি সমৃদ্ধ সংগীত সংস্কৃতির অধিকারী ছিলেন।

প্রাচীনকালের দুই গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাস এবং জেনোফোন উল্লেখ করেন যে মেডিস (৯০০-৫৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) এবং আখামেনিডস্‌ (৫৫৯-৩৩১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) রাজবংশের সময় ইরানের যুদ্ধ, সামাজিক অনুষ্ঠান এবং ধর্মীয় কাজে সংগীতের ব্যবহার দেখা যায়। আখামেনিডদের সময় চীন থেকে মিশর এবং গ্রিস পর্যন্ত পারস্য শাসকরা একটি সাধারণ সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল তৈরি করেছিলেন। ৩৩১-২৩৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত হেলেনিক যুগে ম্যাসেডোনীয়রা দুর্বল পারস্য সাম্রাজ্যের উপর রাজত্ব করলেও এই সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলটি অপরিবর্তিত ছিল। পরবর্তীতে ম্যাসেডোনীয়রা ইরানীদের দ্বারা পরাজিত হয়েছিল এবং পার্থিয়ান রাজবংশ ২৩৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ২২৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত শাসন করে। এই সময় এক ধরণের জনপ্রিয় সংগীতজ্ঞের আবির্ভাব ঘটে যাঁরা তাৎক্ষণিকভাবে কবিতা বা সংগীত রচনা করতেন এবং তা তাৎক্ষণিকভাবেই পরিবেশন করতেন। প্রাচীন পারস্যে সংগীতের শ্রেষ্ঠ সময়কাল হিসেবে ধরা হয় সাসানীয় রাজবংশের সময়কালকে (২২৪-৬৫২ খ্রিস্টাব্দ)। বিশেষ করে এই যুগে পারস্য যে একটি প্রাণবন্ত সংগীত ঐতিহ্যের ইঙ্গিত বহন করে, সে বিষয়ে প্রচুর প্রমাণ রয়েছে। বারবোদ, নাকিশা, রামতিন প্রমুখ সাসানীয় আমলের সংগীতজ্ঞরা বিরল প্রতিভার অধিকারী ছিলেন বলে মনে করা হয়। সংগীত জগতে বারবোদ ছিলেন এমন এক অমর প্রতিভা, যিনি খোসরো পারভেজের দরবারকে সংগীতে আলোকিত করে রেখেছিলেন। তিনি সপ্তাহের সাতদিনের প্রতিটি অনুযায়ী একটি করে ঠাট (খোসরাভানি) ও সেই মতো মাসের তিরিশ দিনের জন্য তিরিশটি রাগ (লাহন) এবং বছরের প্রতিটি দিনের জন্য তিনশো ষাটটি সুর (দাস্তান) তৈরি করেন। এই সময়কালে সংগীত এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে বাহরাম-এ-গুর (৪২১-৪৩৯ খ্রিস্টাব্দ) নামে একজন পারস্যের রাজা তাঁর দরবারের সংগীত অনুষ্ঠানে অবদান রাখার জন্য ভারত থেকে ১২০০ জন সংগীতজ্ঞকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।

সপ্তম শতাব্দীতে ইসলামের আবির্ভাবের ফলে পারস্যের সংগীতধারা অন্যান্য পারসিক সংস্কৃতির মতই ‘ইসলামী ঐতিহ্য’ নামে পরিচিতি লাভ করে এবং সংস্কৃতির মূল গঠনমূলক উপাদান হয়ে ওঠে। ফার্সি সংগীতজ্ঞ এবং সংগীতবিদরা মুসলিম সাম্রাজ্যের সংগীত ইতিহাসে অপ্রতিরোধ্য আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। কেবল নিজের অঞ্চলেই নয়, তাঁদের সংগীত ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর নানা প্রান্তে। উস্তাদ জারিয়াব তার সন্তানদের নিয়ে পারস্য থেকে স্পেনে এসেছিলেন বাদ্যযন্ত্র, কণ্ঠ এবং নৃত্যের কৌশল শেখানোর জন্য। তিনি স্পেনে পার্সি ল্যুট অর্থাৎ বারবাত ( যাকে উদ-ও বলা হয়) নামক একটি বাদ্যযন্ত্র নিয়ে আসেন যা থেকে পরবর্তীতে গিটার তৈরি হয়েছিল বলে কেউ কেউ মনে করেন। ফারাবি, ইবনে সিনা, রাজি, ওরমাভি, শিরাজি এবং মারাকি ইসলামের প্রথমদিকের বিশিষ্ট ফার্সি সংগীত পণ্ডিতদের মধ্যে মাত্র কয়েকটি নাম, বাকি নামের সংখ্যাটা বিপুল। ষোড়শ শতাব্দীতে সাফাভি রাজবংশের (১৪৯৯-১৭৪৬) শাসনকালে পারস্য সভ্যতার সংগীতের একটি নতুন স্বর্ণযুগের সূচনা হয়। তবে, সেই সময় থেকে বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশক পর্যন্ত, ফার্সি সংগীত ধীরে ধীরে তার চরিত্র পরিবর্তন করে উপভোগ্য শিল্পে পরিণত হয়, এই সময়ে সৃজনশীলতার বিকাশ বা সংগীত নিয়ে পাণ্ডিত্যপূর্ণ গবেষণার বিকাশের খুব বেশি সুযোগ সেদেশে ছিল না। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিক থেকে আবারও পারস্যের সংগীত বিস্তৃত মাত্রা খুঁজে পেতে শুরু করে। আজকের দিনে ইরানের মৌলিক সংগীত হিসেবে যা স্বীকৃত তা আসলে উনিশ শতকের ঐতিহ্য।

দ্বাদশ শতকে ভয়ঙ্কর মঙ্গোল আক্রমণ শুরু হওয়ার ফলে পারস্য সংগীতের ধারা পূর্ব দিকে আসে। এই প্রভাবে যে যে বাদ্যযন্ত্র আমরা ভারতবর্ষে দেখতে পাই সন্তুর তাদের মধ্যে অন্যতম। সন্তুর দেখতে গণিত বইয়ের ট্রাপিজিয়ামের মতো। উপর নীচের সীমান্তরেখা সমান্তরাল কিন্তু পাশের দুই ধার চওড়া থেকে ক্রমশ সরু (মিশরের ‘কানুন’ নামক প্রায় একই ধরনের বাদ্যটির আকৃতি খানিকটা আলাদা)। পারস্যের সন্তুর ভারতের তুলনায় অনেক বেশি চওড়া হয়ে থাকে। এই বাদ্যটি ইরান থেকে কেবল যে ভারতবর্ষে এসেছে তাই নয়, চীনে এর তুতো-ভাইয়ের নাম ইয়াংকিন (Yangqin), থাইল্যান্ডে খিম (Khim), ভিয়েতনামে ড্যান ট্যাম থ্যাপ ল্যুক (Đàn tam thập lục), কোরিয়ায় ইয়াজ্ঞেউম (yanggeum), গ্রিসে সানতৌরি, ইংল্যান্ডে ডোলসিমার, ফ্রান্সে দৌহ্‌সেমেলে (doulcemelle), দক্ষিণ জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও সুইৎজারল্যান্ডে হ্যাকব্রেথ, ইউক্রেনে তিসেমব্লে (tsymbaly), রোমানিয়ায় তাম্বাল, হাঙ্গেরিতে সিম্বালাম, পূর্ব ইউরোপের কিছু জায়গায় সিম্বল (tsimbl) প্রভৃতি এমন নানা পরিচয় রয়েছে। সময়ের সঙ্গে যেমন বাদ্যের পরিবর্তন হয় সেই সঙ্গে আঞ্চলিক সংগীতের রীতি অনুযায়ী সুর বাঁধা ও আকৃতিতে কিছু পার্থক্য অবশ্যই দেখা যায়। তবে পারস্যে সন্তুরকে যতটা গুরুত্ব দেওয়া হয় বাকি অঞ্চলে হয় কিনা জানা নেই। ইরাক ও ইরানে সন্তুরশিল্পী মাঝে বসেন ও কণ্ঠসংগীত শিল্পী সহ বাকি শিল্পীদের লিড করেন।

সন্তুর কোলে নিয়ে অর্ধ-পদ্মাসনে বসে বাজানোই রেওয়াজ। কোন কোন দেশের নিজস্ব রীতির সন্তুরে স্ট্যান্ড থাকে। কাঠের তৈরি যে দুটো দণ্ড দিয়ে এটি বাজানো হয় তাকে বলে মেজরাব। সন্তুর যেমন সাধারণত আখরোট গাছের কাঠ দিয়ে বানানো হয়, এই মেজরাবটিও সেই কাঠেই হয়, আর এর ওজন হয় খুব হালকা। ভারতবর্ষে তৈরি দামী মেজরাব চন্দন কাঠেও তৈরি হয় (এখানে একটা কথা বলার, ভারতের বাদ্যযন্ত্রের যে কারিগর তা সারা পৃথিবী-বিখ্যাত, এবার ভারতের জায়গায় কলকাতাও পড়তে পারেন)। ঢাকে যেমন কাঠি লাগে সন্তুরেও তেমন মেজরাব নামক কাঠি দিয়েই বাজাতে হয়, পার্থক্য হল ঢাকে চামড়ার ছাউনি আর কাঠিও তেমনই কঠিন, আর এখানে চারটে বা তিনটে তারের উপর আলতো ছোঁয়া, একটু জোরে হলেই বিগড়ে যাবে তারের টিউন। সন্তুরের প্রতি চার গাছা তারের জন্য একটি করে ব্রিজ বরাদ্দ। ওভারহেডের মোটা তারকে তুলে ধরে রাখতে ফাঁকা মাঠের মধ্যে যেমন উঁচু লোহার পিলার দেখা যায়, সন্তুরের উপরের ব্রিজকে তেমনই ভেবে নিতে পারেন। ভারতীয় সন্তুরে বাঁদিক ও ডানদিক মিলিয়ে মোট ৩০টি ব্রিজ থাকে, তাহলে সহজেই বোঝা যায় তারের সংখ্যা ৯০ থেকে ১২০টার মত। আর পারস্যের সন্তুরে মোট ১৮টি ব্রিজ থাকে তাই তার থাকতে পারে ৯২টি। বাম ও ডানদিকে যে ব্রিজ থাকে এর উপর তারগুলি হয় আলাদা ধরনের, বামদিকের তারগুলি ব্রাস বা তামার হয় আর ডানদিকের তার স্টিলের। আর এর সঙ্গে থাকে একটি হাতলওয়ালা টিউনার।

এই বাদ্যের বর্ণনা করা হল খুব সংক্ষেপে, আসল গুরুত্ব পাবে তার ইতিহাস। ভারতের বাকি বাদ্যের মতই সন্তুরের উৎপত্তি নিয়েও রয়েছে নানান গল্প। কেউ রাবণকে বাজাতে দেখেছেন, তো কেউ বেদে এর নাম পেয়েছেন, তো কেউ আবার প্রচার করেন সংস্কৃত ভাষায় ‘শত-তার’ থেকেই নাকি সন্তুর! সন্তুর যে পারস্য থেকে এই দেশে এসেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে আবারও স্মরণ করতে হয় এত বছরে ভারতীয় সংগীতের ধরণ ও যন্ত্রীদের উদ্ভাবনী দক্ষতায় পারস্যের আকার ও স্কেলের তুলনায় এর পরিবর্তন দেখা যায়। গিফোর্ডের মতে পারস্য বা তুর্কী ‘সন্তুর’ শব্দটির আগমন হয়েছে আরবীয় ‘সান্তির’-এর রূপান্তর হয়ে। আরবেও এই শব্দটি এসেছে গ্রিক ‘স্যালতেরি’ (psaltery) থেকে, যার অর্থ ‘টানা’। স্যালতেরি বলতে প্রাচীন গ্রিসে ট্রাপিজয়েডাল আকৃতির একটি বাদ্যযন্ত্রকে বোঝানো হত। চতুর্দশ শতকে নাম না জানা এক লেখকের রচনা ‘কাশফ আল-ঘুমুম’-এ দেখা যায় যে সেখানে লেখা রয়েছে সিরিয়ানরা যাকে ‘সান্তির’ নামে জানে তেমনই একটি বাদ্য মিশরে ‘কানুন’ নামে পরিচিত।

গিফোর্ড অবশ্য গবেষণা করেছেন ডোলসিমার মত সন্তুরের ইউরোপীয় তুতো-ভাইকে নিয়ে, তবে পারস্যের এই বাদ্যের প্রতি তিনি যতটা আগ্রহ দেখিয়েছেন সেটাও আমাদের মুগ্ধ করে। তাঁর লেখা থেকেই জানা যায় তুরস্কের হারেমের মেয়েদের ‘চেঙ্গিজ’ বলা হত, কারণ চেঙ্গ বা বীণার মত এক প্রকার বাদ্য বাজিয়ে তারা গান গাইতেন ও নাচতেন। পরবর্তীতে হারেমের বাদ্যে পরিবর্তন হয়, সন্তুরের প্রবেশ ঘটে। এই কারণে বাদ্যটির কৌলীন্য খানিকটা কমে গেলেও বাজনদার বৃদ্ধি পায় বলেই মনে হয়। আমাদের দেশে এই একই পরিস্থিতি হয়েছিল সারেঙ্গী নামের বাদ্যটির। ছাউনি বা তারের জন্য পশুর চামড়া ও নাড়িভুঁড়ি শুকিয়ে ব্যাবহারে কিন্তু সংগীত-প্রেমীদের আপত্তি ছিল না, ছিল এই বাদ্যের নিষিদ্ধপল্লীতে প্রবেশের কারণে। অথচ সারেঙ্গীর মত করুণ-রসে সিক্ত করতে আর কে-ই বা পারে? সেই কারণে তাকে অনুসরণ করে তৈরি হয়েছিল এসরাজ। তুরস্কে যাই হোক, ভারতবর্ষে সন্তুরের ক্ষেত্রে এমন কোন ঘটনা ঘটেনি।

তবে দুঃখের কথাও কিছু বলতেই হয়। আফগানিস্তানের প্রায় পশ্চিম প্রান্তের একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ শহর হেরাত। অঞ্চলটি ইরানের কাছে হওয়ায় সংগীতে পারস্যের প্রভাব থাকাটাই স্বাভাবিক। হেরাতের পশ্চিম প্রান্তের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে সন্তুরের চল ছিল ১৯২০-এর সময়েও। ১৯৪০ সালের দিকে এর প্রতি আগ্রহ কমতে শুরু করল, আর ১৯৭০ সাল নাগাদ সেখানকার মানুষের স্মৃতির বাইরে যন্ত্রটির আর কোন অস্তিত্বই রইল না!

ভারতে, বিশেষত কাশ্মীরে সন্তুর ব্যবহার করতেন মূলত সুফি গায়করা। এছাড়াও সুফিরা সেতার, ডোকরা, সাজ ইত্যাদি নানা ধরণের বাদ্য বাজাতেন। সুফি গানে কথা যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, বাজনাও ছিল সমান আগ্রহের। বিশেষ করে কাশ্মীরে বছরের একটা বড়ো সময় বরফ ঢাকা থাকায় তাদের প্রাত্যহিক কাজের বা চাষবাসের সুযোগ ছিল না। ফলে গান ও সেই সঙ্গে বাজনা তাদের আপন হয়ে উঠেছিল; বাদ্য হিসেবে সন্তুরও। আবার সন্তুরের মূল ঘাঁটি কাশ্মীরে হওয়ায় খুব যে তা ছড়িয়ে পড়তে পেরেছিল তাও না, সেই সঙ্গে বাজনার ক্ষেত্রেও নিপুণতা কমতে থাকে। ঠিক কবে থেকে কাশ্মীরে সন্তুরের সূচনা হয় তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। চার্লস রাসেল ডে সেই ১৮৯১ সালে এক বই লিখেছিলেন ‘Music And Musical Instruments Of Southern India’ নামে। সেখানে একটা কেলো করে ফেলেছিলেন এবং ‘সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে’। তাঁর মনে হয়েছিল সংস্কৃত গ্রন্থে রচিত ‘কাত্যায়ণী বীণা’ বা ‘শততন্ত্রী বীণা’ থেকেই সন্তুরের উৎপত্তি। তিনি এও উল্লেখ করেন যে আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে লঙ্কার রাজা রাবণ প্রথম বাদ্যে ব্যবহারের জন্য ছড় আবিষ্কার করেন, সেই কারণে বেহালাও তারই সৃষ্টি। (পৃ. ১০২) তবে এটা যে নেহাতই গল্পকথা তা বুঝতে সমস্যা হয় না।

কাশ্মীরের ফার্সি ভাষী মুসলমান শাসকগণ পারস্যের সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী ছিলেন এবং পঞ্চদশ শতকে এই অঞ্চলে তার প্রভাব লক্ষ করা যায়। তথ্য প্রমাণের দিকে দেখলে অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে সপ্তদশ শতকের শুরুর দিকে রচিত জাহাঙ্গিরের আত্মজীবনী; সেখানে কাশ্মীরের রাজা মির্জা হায়দার দুঘলৎ-এর শাসনকালে দরবারে বহু ধরণের বাদ্যযন্ত্রের কথার উল্লেখ রয়েছে, যার মধ্যে সন্তুরের অবস্থিতির ধারণা পাওয়া যায়, তবে নাম হিসেবে সন্তুরের জায়গায় ‘কানুন’-এর (মিশরীয় সন্তুর) দেখা মেলে। এরই পুনরাবৃত্তি দেখা যায় মোল্লা তোঘরার একটি হাতে লেখা বইতে। তাঁর মৃত্যু হয় ১৬৬৭ সালে, অর্থাৎ এর কিছু আগেই তিনি লিখে থাকবেন। ১৮৯১ সালে চার্লস ডে যখন তাঁর বইটি লিখছেন তখনও তিনি উল্লেখ করছেন যে সন্তুর খুব যে একটা পরিচিত যন্ত্র এমন নয়। কাশ্মীরে এই বাদ্যটি কি দীর্ঘদিন টিকে ছিল, নাকি প্রথমে মিশরের প্রভাবে এদেশে আসে ও পরে পারস্য থেকে তার পুনরাবির্ভাব হয়, তা বলা কঠিন। আমরা যাকে ভারতের সন্তুর শিল্পীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলে মনে করি, অর্থাৎ পণ্ডিত শিবকুমার শর্মা, তার পিতা ছিলেন উমা দত্ত শর্মা। তিনি এই যন্ত্রটির বিশেষ পরিবর্তন ঘটিয়ে বর্তমান রূপ দেন। তাঁর সুযোগ্য পুত্র পণ্ডিত শিবকুমার শর্মার কারণে সন্তুর সারা ভারতে তো অবশ্যই এমনকি দেশের বাইরেও অত্যন্ত পরিচিত একটি বাদ্যযন্ত্র হয়ে উঠেছে। ১৯৭০ সালের পর থেকে ভারতের বড়ো বাদ্য নির্মাতা কোম্পানিরা সন্তুর তৈরি শুরু করেছে।

এতো গেল লেখা উপাদানের কথা। ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত দ্বাদশ শতকের হাতে লেখা একটি বইয়ের (The Psalter of Queen Melisande) প্রচ্ছদে ট্রাপিজিয়াম আকৃতির একটি বাদ্যযন্ত্র দেখতে পাওয়া যায়, যাকে সন্তুর মনে করা যেতে পারে। নিজামি রচিত ‘খামসা’ গ্রন্থে দুটি ছবি রয়েছে যেখানে দেখা যাচ্ছে রাজা বাহরাম-এ-গুর এবং তার পুত্রকে মহিলারা বিভিন্ন বাদ্য বাজিয়ে শোনাচ্ছেন, যার মধ্যে সন্তুরকে দেখা যায়। এই ছবি থেকে আন্দাজ করা যেতে পারে, তুরস্কে সন্তুর আসার আগেই ইরানে এই বাদ্যের প্রচলন ছিল এবং সপ্তদশ শতকে অটোমান দরবারে বা উনিশ শতকে পারস্যের রাজানুকূল্যে সন্তুরের দেখা পেলেও তার বহু আগে থেকেই হারেমের মহিলারা সন্তুর বাজাতেন। মোঙ্গল আক্রমণের পর যন্ত্রটি সুফিদের স্পর্শ পায়।

সন্তুর নিয়ে এলোমেলো কিছু কথা এখানে লেখা রইল। এর কিন্তু দীর্ঘ ও অঞ্চলভিত্তিক ইতিহাস লেখা হয়েছে এবং তা অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক। এই সীমাবদ্ধ পরিসরে সেসব বলা না গেলেও যে কথাটা মনে হয়, ‘ভারতীয়ত্ব’ কী, এক বাক্যে তা বলা যেমন অসম্ভব, আর বললেও তাতে ত্রুটি থেকে যাবে নিশ্চিত। তবে এই ভূখণ্ড কোনও কিছুকেই ত্যাজ্য বলে মনে করে না। হোক না বিদেশি, হোক না অন্যের, তাকে আপন করে বিপুলা এই মাটিতে আশ্রয় দিলে, এখানকার উর্বরতার গুণেই একদিন তার থেকে দ্যুতি বিচ্ছুরিত হয়, সকলের সুখস্মৃতিতে পণ্ডিত শর্মাজির হাতের সন্তুর যেমন।

টীকা ও তথ্যসূত্র

১. Farhat, Hormoz, ‘An Introduction to Persian Music, Catalogue of the Festival of Oriental Music’; University of Durham, 2012.

২. Peyman Heydarian এবং Joshua D. Reiss, ‘The Persian Music and the Santur Instrument, Conference Paper’; January 2005.

৩. ভারতবর্ষে ও ইরানের সন্তুর উচ্চারণে সামান্য পার্থক্য রয়েছে। ইরানের বাদ্যটির ইংরেজি বানানে ‘Santur’ লেখা হয় ও ভারতীয় বাদ্যটির ক্ষেত্রে ‘Santoor’ উচ্চারণ করা হয়।

৪. ডোলসিমার দুই ধরনের। একটি ‘Appalachian dulcimer’ যার সঙ্গে সন্তুরের সম্পর্ক নেই কিন্তু যাকে ইউরোপীয়রা ‘hammered dulcimer’ বলেন তা অনেকটাই সন্তুরের মত।

৫. সেতার বাজাতে যে লোহার তারের আংটি পরতে হয়, সেটাকেও মজরাব হলা হয়, যদিও দুটো আলাদা।

৬. P. M. Gifford, ‘The Hammered Dulcimer: A History’; Scarecrow Press, 2001.

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।