সাঁওতালদের ‘দুয়ার বাপলা’ ও বাঙালির বিবাহরীতি: শিকড়ের অনুসন্ধান
প্রাক কথা
দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত বাংলা জুড়ে অস্ট্রো-এশিয়াটিক জনগোষ্ঠীর বাস। অস্ট্রো-এশিয়াটিক জনগোষ্ঠী আর দ্রাবিড় ভাষাভাষী মানুষের সহাবস্থান আর মিশ্রণে গড়ে ওঠা আরণ্যক গ্রামীণ সভ্যতার সঙ্গে মিশে গিয়েছে বৈদিক সভ্যতা। আজও এই অঞ্চলের সংস্কৃতি খুব গভীরে বহন করে চলছে অস্ট্রো-এশিয়াটিক জনগোষ্ঠীর রীতিনীতি। পুজো কিংবা বিবাহের লোকাচারের দিকে তাকালে আজও খুঁজে পাওয়া যায় সেই প্রাচীন ঐতিহ্যকে।
বাঙালি এমনিতেই মিশ্র জাতি। দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার সীমান্তে অস্ট্রো-এশিয়াটিক জনগোষ্ঠী ও দ্রাবিড় ভাষাভাষী মানুষেরা এই অঞ্চলের বাঙালির সঙ্গে অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় একটু বেশিই মিশেছে। মানুষে মানুষে যেমন মিশ্রণ ঘটেছে তেমনই কোনো সংস্কৃতিই অবিমিশ্র নয়। এমনকী বৈদিক সংস্কৃতির সঙ্গেও আদান প্রদান হয়েছে দেশজ সংস্কৃতির। এই দেশে বৈদিক সভ্যতার সঙ্গে যেমন হরপ্পীয় সভ্যতার মিশ্রণ আছে, তেমনই অস্ট্রো-এশিয়াটিক জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক দানকেও অস্বীকার করা যায় না। আবার বৃহত্তর এই মিশ্রণ আঞ্চলিক ক্ষেত্রগুলোতে ভিন্ন ভিন্ন রূপ নিয়েছে। আসলে মূল রূপ অজস্র শাঁখা প্রশাঁখা বিস্তার করে বিভিন্ন আঞ্চলিক রূপ ধারণ করেছে। এই মিশ্রণ আর তার শিকড়কে খুঁজতে গেলে, এই ঐতিহ্যকে বুঝতে পারলে আমাদের বাহ্যিক বিভেদের অপ্রয়োজনীয়তাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
অস্ট্রো-এশিয়াটিক জনগোষ্ঠী হলেন মুণ্ডা, সাঁওতাল, লোধা, ভূমিজ, হো, বিরহর, কোড়া মাহালি প্রভৃতিরা। দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত বাংলায় সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর বিবাহ সংস্কৃতির কথায় এবার আসা যাক। আমরা দেখব দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত বাংলায় সাঁওতাল জনগোষ্ঠী আর এই অঞ্চলের বাঙালির বিবাহ আচারের মিল।
১
বিবাহের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবার, সমাজ। পরিবারের জন্যে বিবাহপ্রথার সূচনা হল একটি আদি চাহিদা। বলা যায় ‘পরিবার গঠন করে স্ত্রী–পুরুষের একত্র বাস করা থেকেই বিবাহপ্রথার উদ্ভব হয়েছে, বিবাহপ্রথা থেকে পরিবারের সূচনা হয়নি।’১ একসময় বিবাহ এবং পরিবার মিশে গেছে৷ আরেকটি আদি চাহিদা হল ‘বেশি বেশি সন্তান উৎপাদন’। বিবাহের রীতিনীতির সঙ্গে নারী-পুরুষের একত্র যাপনের থেকেও বড়ো হয়ে ওঠে সন্তান কামনা। মনে রাখতে হবে আদিতম ভাবনা অনুয়ায়ী সন্তানের বৃদ্ধি সেই পরিবারের জনসংখ্যা বৃদ্ধি করত আর জনসংখ্যাবৃদ্ধি প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার জন্য উপযোগী ছিল।
নারীর সন্তান উৎপাদনের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে বিবাহের আচার। বলা ভালো, বিবাহের বিভিন্ন রীতিনীতিতে সন্তান উৎপাদনকে কেন্দ্র করে প্রতীকী অবস্থান রয়েছে।
এই প্রসঙ্গে বলা যায় সাদৃশ্যমূলক জাদু ভাবনার কথা। প্রাগৈতিহাসিক জাদুবিদ্যায়, সাদৃশ্যমূলক সূত্রটি বলে যে, একে অপরের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ জিনিসগুলির একটি মৌলিক সংযোগ রয়েছে এবং তারা একে অপরকে প্রভাবিত করতে পারে। এখানে পূর্ববর্তীর সঙ্গে পরবর্তীর সংযোগ হচ্ছে মূল কথা। ফ্রেজারের সহানুভূতিশীল (Sympathetic Magic) জাদু ভাবনার সঙ্গে সাদৃশ্যমূলক জাদু ভাবনার সম্পর্কটির দিকে একবার চোখ রাখা যাক।২ প্রাচীন এবং আধুনিক উভয় জাদুর অনেক ঐতিহ্যে সহানুভূতিশীল জাদুর ধারণা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই নীতিগুলির প্রথমটি, অর্থাৎ সাদৃশ্যের সূত্র থেকে, জাদুকর সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি কেবল অনুকরণ করেই প্রভাব তৈরি করতে পারেন৷ দ্বিতীয়টি থেকে তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, তিনি কোনো বস্তুর সঙ্গে যা-ই করুন না কেন, তা সেই ব্যক্তির উপর সমানভাবে প্রভাব ফেলবে যার সঙ্গে বস্তুটি একবার সংস্পর্শে এসেছিল৷
দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত বাংলার সাঁওতাল সম্প্রদায়ের বিবাহ প্রথার সঙ্গে এই অঞ্চলের বাঙালির বিবাহ প্রথার একাত্মতার ভেতর আমরা যেমন সাদৃশ্যমূলক জাদু ভাবনাকে প্রত্যক্ষ করি, তেমনই এর ভেতরে মানুষের আদি শিকড়টিকে দেখতে পাই।
২
সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষেরা ১২টি গোত্রে বিভক্ত। হেমব্রম এমনই একটি গোত্র। এই গোত্রের ধর্মীয় প্রতীক হচ্ছে সুপারি। হেমব্রমদের সুপারি গোত্রের সঙ্গে এই অঞ্চলের বাঙালিদের বিবাহের নিমন্ত্রণে সুপারির ব্যবহারের মিল পাওয়া যাচ্ছে। এই অঞ্চলের বাঙালিদের শুভ অনুষ্ঠানের নিমন্ত্রণে সুপারির ব্যবহার আত্মীয়তার চিহ্ন বহন করে।
ঝাাড়গ্রাম জেলার সদ্য মফস্বল হয়ে ওঠা শ্রীপাট গোপীবল্লভপুর থেকে ছাতিনাশোল গ্রাম পেরিয়ে পড়বে পড়াশিয়া গ্রাম। শান্ত স্নিগ্ধ গ্রামটিতে বাস করেন বেশ কিছু সাঁওতাল পরিবার। নিকানো উঠোন, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন মাটির বাড়ি গাছ-গাছালির ছায়া দিয়ে ঘেরা। তবে খড়ের চাল এখন আর নেই—টিনের চাল। কথা হচ্ছিল শিবসত্য হেমব্রমের সঙ্গে। প্রায় ১৩/১৪ রকমের বিবাহ আছে এই সম্প্রদায়ের মানুষদের। এই সম্প্রদায় বলতে শুধু হেমব্রম গোত্রের মানুষেরা নয়, সমগ্র সাঁওতাল সম্প্রদায়ের কথাই বলছি। এরই মধ্যে সম্মানের বিয়ে হচ্ছে ‘দুয়ার বাপলা’। বাপলা অর্থ হল বিয়ে।
বিবাহের জন্যে কন্যা নির্দিষ্ট হলে, সেই কন্যাকে এই অঞ্চলে ‘বাহা’ বলা হয়। আসলে ছেলের জন্যে মেয়ে খোঁজার সময় থেকেই ‘বাহা’ কথাটি বলা হয়ে থাকে। ‘বাহা’ অর্থ ফুল। সাঁওতালদের পবিত্র উৎসব ‘বাহা’। ‘বাহা’ পরব ফাল্গুন মাসের শুক্ল পক্ষের দ্বাদশী তিথি থেকে শুরু হয়। এই পরব বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানটি দু’দিনের। ‘বাহা’ পরবের ‘বাহা’ পুজো না হওয়া অব্দি সাঁওতাল নারীরা শালফুল পরেন না, মহুয়া ফল খান না। বছরের নতুন ফলও এই পুজোর পর থেকে খাওয়া শুরু হয়।
আসলে ‘বাহা’ তো ফুলের উৎসব—ফুল আর প্রেম যে এক হয়ে আছে চিরদিনই। বসন্তের উৎসব আর প্রেমের কথা প্রসঙ্গে আমরা দেখে নিতে পারি এডওয়ার্ড ওয়েস্টারমার্ক–এর লেখার একটি অংশ,
‘The Hos, an Indian Hill tribe, have, as we are informed by Colonel Dalton every Year a great fest in January, “when the granaries are full of gaon, and the people, to use their own expression, full of devilry. They have a strange notion that at this period, men and women are so over-charged with vicious propensities, that it is absolutely necessary for the safety of the person to letter off steam by allowing for a time full vent to passions. The festival, therefore, becomes a saturnalia, during which servants forget their duty to masters, children their reverence for parents, men their respect for women, and women all notions of modesty, delicacy, and gentleness” Men and women become almost like animals in the indulgence of their amorous propensities, and the utmost liberty is given to the girl.৩
এই অংশটিতে যদিও হো সম্প্রদায়ের কথা বলা হয়েছে কিন্ত এখানে ‘স্যাটার্নালিয়া’-র উল্লেখ রোমান উৎসবের কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছে। বসন্ত পৃথিবীর আদি যুগ থেকেই উৎসবের এবং মিলনের পরিপূরক হয়ে রয়েছে মানব জীবনের অন্তঃস্থলে। সময়টা হল শস্য, ফুল ও ফলের সময়। তাই তো এই সময় মানুষের প্রাকৃতিক চাহিদা ‘খাদ্য’ ও ‘যৌন কামনা’ প্রকৃতিকে কেন্দ্র করেই উৎসবময়, প্রতীকী হয়ে ওঠে আদিতম অবস্থান থেকে।
ফুল সেই আদি মনসত্ত্বে উৎপাদনশীলতার প্রতীক। মনে পড়ে গেল, আমরাও তো বলি ‘বিয়ের ফুল ফুটেছে’। এখানেই সাদৃশ্যমূলক জাদু ভাবনার প্রকাশ ঘটেছে। মনস্তত্ত্বের জটিল ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় বারবার উঠে এসেছে প্রকৃতি। ফুল সুন্দরের আধার এবং বিস্ময়েরও। আদিম অবস্থানেই মানুষ দেখেছিল ফুল থেকে ফল হয়। ফলের মধ্যে থাকা বীজ থেকে জন্ম হয় নতুন উদ্ভিদের। ফলে ফুলের গুরুত্ব তারা লক্ষ্য করেছেন। এছাড়া ফুলের পাপড়ির সঙ্গে স্ত্রী যৌনাঙ্গের সাদৃশ্য থাকায় ফুল, উৎপাদন চিহ্নের সঙ্গে একাত্ম হয়েছে। আর ঠিক সেকারণেই ফুল মানুষের সমবেত মননে উৎপাদন শক্তির (নিষেক) প্রতীক হিসেবে গৃহীত হয়েছে।
এসব কথা ভাবতে ভাবতে মনে পড়ল দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত বাংলা অঞ্চলের বাঙালিরাও বিয়েকে বলে ‘বাহা’। বিয়েবাড়িকে বলে ‘বাহা ঘর’। অদ্ভুত, তাই না?
এই অঞ্চলের সাঁওতালরা বিয়ের কনেকে ‘বাহা’ বলেন। আবার এই অঞ্চলের বাঙালিরা বিয়েকে ‘বাহা’ আর বিয়ের অনুষ্ঠানকে ‘বাহা ঘর’ বলেন। অবশ্য এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে ওড়িয়া ভাষায় বাহাঘরা মানে বিয়ের অনুষ্ঠান এবং সুবর্ণরেখা নদী সংলগ্ন দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত বাংলার ভাষা ও সংস্কৃতিতে মিশে আছে উড়িষ্যা ও ঝাড়খণ্ডের ভাষা-সংস্কৃতি। তবুও বলতে পারি, এই শব্দের আদি অনুসন্ধানে আমাদের অস্ট্রো-এশিয়াটিক জনগোষ্ঠীর কাছেই ফিরতে হবে। ঠিক এ জায়গায় বলা যায়, এই অঞ্চলের সাঁওতালদের বিয়ের কনেকে ‘বাহা’ সম্বোধন ও এই অঞ্চলের বাঙালিদের বিয়েকে ‘বাহা’ বলা একাত্মতার ইঙ্গিতকে বহন করছে। আদি মনস্তত্ত্বের শিকড়টিকে আমরা অনুধাবন করতে পারছি। ফুল বা ‘বাহা’ এবং বাঙালির বিয়ের ভাষাগত এবং প্রতীকীভাবে মিলে যাওয়ার ব্যাপারটা শুধুমাত্র তখন আর আঞ্চলিকতায় সীমাবদ্ধ থাকছে না, তা সর্বজনীন আদি প্রতীকী মনস্তত্ত্বকে তুলে ধরছে।
এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো এই অঞ্চলে পাত্রী নির্বাচনের পরে বিয়ের কনেকে ‘বাহা’ বলা হলেও অন্য অঞ্চলে ‘বাহা’ ছাড়াও বিভিন্ন নামে ডাকা হয়। সে যাই হোক না কেন ফুল ও বিবাহের একাত্মতা আদিতম অবস্থানে নারীর উৎপাদন শক্তির ভাবনাটাকেই স্পষ্ট করে।
৩

বিবাহ অনুষ্ঠান
এবার দেখা যাক সাঁওতাল সম্প্রদায়ের ‘দুয়ার বাপলা’তে কী কী আচার অনুষ্ঠান হয়। ‘দুয়ার বাপলা’তে বাঙালিদের মতোই বরই বিয়ে করতে যায় মেয়ের বাড়িতে। বিয়ের আগের দিন সাধারণত সন্ধেতে বরের বাড়ি থেকে আসা বরের গায়ে দেওয়া হলুদ দিয়ে ‘গায়ে হলুদ’ হয় মেয়ের। বাঙালি নিয়মও তাই। আমরা জানি, ‘আজ অধিবাস কাল বিয়ে’। তবে এই অঞ্চলেও বাঙালিদের কিন্ত বিয়ের দিন সকালে গায়ে হলুদ হয় আর নিয়ম অনুযায়ী লাল পাড়, সাদা শাড়ি পরে ‘গায়ে হলুদ’ হয়ে থাকে। লাল পাড়, সাদা শাড়ি আর সাঁওতাল সম্প্রদায়ের একাত্মতা তো রয়েইছে।
বিয়ের সময় সিঁদুর দান করা হয়। এই সিঁদুরদানের ক্ষেত্রে অতীতে সিঁদুরের পরিবর্তে ধুলো দিয়ে এই প্রক্রিয়াটি করা হত। ধুলো প্রকৃতির অংশ। আদি অবস্থানে প্রকৃতি আর মানুষের একাত্মতাটিকে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। ধুলো আর সিঁদুর সময়ের বিবর্তনে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষেরা বিয়ের সময় শাঁখা, পলা আর লোহা পরিয়ে দেন। নতুন বরই তার বউকে শাঁখা, পলা লোহা পরায়। নাহ! বাঙালিদের মতো বেনারসি পরে ওদের বিয়ে হয় না। অবশ্য আদি যুগে বাঙালিও তো বেনারসি পরত না।
হলুদ থান কাপড় পরে বিয়ে করেন সাঁওতাল রমণী। এই শাড়িকে ‘সিঁদুর শাড়ি’ বলা হয়। সাদা শাড়িকে কাঁচা হলুদের জলে ডুবিয়ে শুকিয়ে প্রস্তুত করা হয় এই শাড়ি। একেই ‘সিঁদুর শাড়ি’ বলা হয় জানতে পারলাম স্থানীয়দের কাছ থেকে। বিয়ের দিন সকাল থেকে বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত বর ও কনের সঙ্গে উপোস করে বর ও কনের মা-বাবাও। বিয়ের দিন যে কোনো সময়ে বিয়ে হতে পারে। বাঙালিদের মতো এখানে লগ্ন নেই।
বিয়ের উৎসবে প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ হাঁড়িয়া।
এই প্রসঙ্গে আরেকটি কথা না বললেই নয়, বিবাহের সময়, সিঁদুর দানের আগে বর ও কনে পরস্পরের দিকে আতপ চাল ছোঁড়ে। এই অঞ্চলে বাঙালিরা জল সইয়ের সময় গঙ্গা দেবীকে উদ্দেশ্য করে আতপ চাল দেয়। এছাড়া সাঁওতাল সম্প্রদায়ের কনেকে বড়ো ডালা (ঝুড়ি) করে আনা হয়। আমার মনে হয় এই ডালা, ডালাতে ভরে শস্য আনার ইঙ্গিত দেয়। সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষেরা কনের সিঁথিতে সিঁদুর লেপে দেয়। এই অঞ্চলের বাঙালিরা ছোটো ধামা (কাঠা) দিয়ে সিঁদুর পরায়।এই ধামাও কিন্তু শস্য রাখার আধার। যদিও বর্তমানে এই অঞ্চলের বাঙালিরা অনেকেই রুপোর কয়েন দিয়ে বা আংটি দিয়ে সিঁদুর পরায়। তবে অতীত নিয়মের মধ্যে কৃষির সংগলগ্নতা বজায় রয়েছে।
সুদূর অতীতে কৃষি আবিষ্কারের সময়ে অস্ট্রো-এশিয়াটিক জনগোষ্ঠী নিজেদের শিকার জীবনকে বজায় রেখেই কৃষির সঙ্গে একাত্ম হয়েছিলেন। এদের বিবাহ, উৎসব, পুজো-পার্বনের উপাচার পদ্ধতির দিকে খেয়াল করলে বোঝা যায় এদের কৃষির প্রতি নির্ভরতা এবং শষ্য কেন্দ্রিকতা। এই অঞ্চলে দূরতম অতীতে কৃষিসভ্যতার বিস্তারও এই কারণেই সম্ভবপর হয়েছিল।
বিবাহের আচারের মধ্যে কৃষির উল্লেখ রয়েছে। শস্য উৎপাদন আর বধূ এখানে মিশে গেছে। আতপ চালও কিন্ত শস্যের আরাধনা বোঝাচ্ছে। নববধূ যখন বিয়ের পরে বরের বাড়িতে পা রাখেন, তখন মা-বাবার বাড়ি থেকে সঙ্গে করে ধান নিয়ে আসেন।
দক্ষিণ–পশ্চিম সীমান্ত বাংলা অঞ্চলের বাঙালিরা একদিন কনকাঞ্জলির পরে সেই চালের পাত্র প্রদীপ জ্বালিয়ে নিয়ে যায় শ্বশুরবাড়িতে। কথা বলছিলাম, শ্রুতি দণ্ডপাটের সঙ্গে। তিনি জানালেন আজও তাঁদের পরিবার বজায় রেখেছে এই প্রথা। সাঁওতাল সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে ধান নিয়ে নববধূর বরের বাড়িতে যাওয়া আর বাঙালি পরিবারের চালের গামলা বা ধামা নিয়ে বরের বাড়িতে পা রাখা একই প্রথার দুই রূপকে চিহ্নিত করে।
৪
দেশাচার-কালাচারের এইসব বিবাহরীতির নানা রূপান্তর ঘটেছে। এমনকী পরিবারে পরিবারেও বহু রীতিনীতির গ্রহণ বর্জন ঘটে। তবুও অনুসন্ধান করলে কোথাও না কোথাও অতীতের রেশ থেকে যায়। বর্তমানে বেশ কিছু বাঙালি পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, এই চাল নিয়ে যাওয়ার প্রথা তাদের পরিবারে আজ আর নেই। বাঙালি পরিবারের নতুন প্রজন্মের অনেকে এই বিষয়ে জানেও না। তবে চাল নিয়ে যাওয়ার প্রথা এবং গৃহ ছেড়ে যাওয়ার আগে মায়ের আঁচলে চাল দিয়ে যাওয়ার সঙ্গে কোথায় যেন মিলে যাচ্ছে দেবী দুর্গার বিসর্জনের দিন হওয়া কনোকাঞ্জলির মূল অর্থ। বাঙালির বিশ্বাসে দেবীও মর্ত থেকে (বাবার বাড়ি থেকে) স্বর্গে (পতিগৃহে) যাওয়ার পূর্বে ধরিত্রীকে (মর্ত) শস্যপূর্ণ হওয়ার আশীর্বাদ করে যান। এমনটাই বাংলার মানুষের প্রাচীনতম সংস্কার। বলতে পারি, কনোকাঞ্জলির সঙ্গে মাতৃঋণ শোধ করার সম্পর্ক নির্ধারিত হয়েছে প্রাচীন অবস্থানের পরবর্তীতে, ব্রাহ্মণ্যধর্মের পুরুষতান্ত্রিকতার বেড়াজালে।
সাঁওতাল সম্প্রদায়ের নববধূর ধান নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে শস্যের কামনা যেমন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, তেমনই বাঙালি নববধূর চাল দিয়ে যাওয়ার মধ্যেও রয়েছে মাতৃগৃহও যেন শস্যে পূর্ণ থাকে, এই কামনাটি। কনকাঞ্জলির সময় যে ধামার মতো পাত্র থেকে মায়ের আঁচলে কিছুটা চাল ছুঁড়ে দেওয়া হয়, সেই বাকি চালই ধামার (এক্ষেত্রে কাঁসার তৈরি গোলাকার গামলা) মধ্যে কাঁচাকলা সহ শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে আসে। কলা কিন্তু পুরুষ যৌনাঙ্গের প্রতীক। এই প্রতীকী ব্যঞ্জনায় আবারও শস্য উৎপাদনের সঙ্গে সন্তান কামনা চিহ্নিত হচ্ছে। আগেই বলেছি এই চাল-কলার পাত্রের সঙ্গে জ্বালানো থাকে প্রদীপ। প্রদীপ আর শস্য আরাধনা মিলেমিশে গেছে। দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত বাংলার এই রীতি আদি অবস্থানটিকে, আদি চাহিদাটিকে ধরে রেখেছে। এই অঞ্চলের কৃষি সভ্যতা, শস্য আর সন্তানের আকুতি নিয়ে নারীর সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেছে।
সাঁওতাল সম্প্রদায়ের বিবাহ রীতির কিংবা বাঙালি বিয়ের বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে এ বার দেখে নেওয়া যাক আরও কিছু রীতিনীতি।
৫
সাঁওতাল সম্প্রদায়ে ছেলের জন্যে মেয়ে খোঁজা, দেখতে যাওয়ার সময়েও ‘রায়বারের’ গুরুত্ব অপরিসীম। বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ না হওয়া পর্যন্ত ‘রায়বার’কে প্রয়োজন পড়ে। এই ‘রায়বার’ই বাঙালিদের ঘটকমশাই। দিন ঠিক করে মেয়ে দেখতে যাওয়ার আগে ছেলের বাবা গ্রামের পাঁচজনকে জানাবে। ‘রায়বার’ মেয়ের বাড়িতে খবর দেবে। মেয়ের বাবাও গ্রামের পাঁচজনকে জানাবে। নির্দিষ্ট দিনটিতে ছেলের বাড়ির লোকেরা মেয়ের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে সরাসরি মেয়ের বাড়ির গ্রামে যায় না। রায়বার গিয়ে মেয়ের বাড়িতে খবর দেবে তারপর মেয়ের বাড়ি থেকে লোক গিয়ে তাদের নিয়ে আসবে। নিয়ম অনুযায়ী মেয়ে সেদিন লালপাড় সাদা শাড়ি পরলেও আজকাল যে কোনো রঙের শাড়ি পরে। এই লালপাড় সাদা শাড়ি বাঙালির রীতিনীতিতে ঢুকে গেছে বিবাহের গায়ে হলুদ ও বিভিন্ন পুজোর অনুষঙ্গে।
সাঁওতালরদের ক্ষেত্রে, মেয়ে পছন্দ হলে ছেলের বাড়ি থেকে মেয়েকে কাঠের মালা পরিয়ে দেওয়া হয়। এ যেন বাঙালি মেয়েদের আশীর্বাদেরই নামান্তর মাত্র।
৬
বিয়ের রীতিনীতির ক্ষেত্রে আরও একটি কথা না বললেই নয়, বিয়ের আগে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষেরাও আইবুড়ো ভাত খাওয়ায়। এই আইবুড়ো ভাত বাড়ির লোকেরাই খাওয়ায়। বিয়ের দিন অগ্নিসাক্ষীর মতোই মশাল জ্বালানো হয়। আগেই বলেছি, বউকে ঝুড়ি (ডালা)তে করে আনা হয়। এই ঝুড়ি ছেলের বাড়ি থেকে আসে। কনের ভাই থাকলে সে তাকে কাঁধে তুলে নিয়ে আসে, অপরদিকে বরকে বরের ভগ্নীপতি কাঁধে করে নিয়ে আসে। পস্পরের পাগড়ি বদল হয়। কিছু দেওয়ার থাকলে এই স য়ে জামাইকে তা দেওয়া হয়। এইসময় আমপাতা ব্যবহার করা হয়, এরই মধ্য দিয়ে কন্যাপক্ষ ও বরপক্ষ পবিত্র আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হয়।
বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরে ওইদিনই বউ বরের বাড়িতে আসে। বউ এবং ছেলেকে ছেলের মা-বাবা কোলে করে ঘরে আনে যদিও কোলে ওঠানো সম্ভব নয় বলে কোলের কাছে নিয়ে ঘরে আনে। হাত পা জল দিয়ে ধুইয়ে দেয়। ঘরে লক্ষ্মী আসে যে। লক্ষ্মীর আরাধনা সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মধ্যে নেই ঠিকই কিন্তু বধূ এখানে শস্যের পূজনীয়তে পরিণত হয়েছে। আর এই সম্প্রদায়ের মানুষের আম্রপল্লবের ব্যবহার বাঙালির বিবাহ কিংবা পুজোয় অর্থাৎ শুভ উৎসবের অংশ হয়ে থেকে গেছে।
বাঙালি বাড়িতেও বউকে বরণ করে তোলা হয়, সেও যে ঘরের লক্ষ্মী। এই অঞ্চলে বরণের মধ্যে আদি প্রথা দেখা যায়। পানপাতা, অগ্নিতাপ ও হাতে হরীতকী, আতপ চাল দিয়ে বধূকে বরণ করা হয়। আবার সেই আতপ চালের ব্যবহার দেখতে পাচ্ছি। চালের মধ্য দিয়ে শস্য ও সন্তান কামনা এক হয়ে গিয়েছে।

সাঁওতাল সম্প্রদায়ের বর-বধূকে হাতে-পায়ে জল দিয়ে ঘরে প্রবেশ করানো হয়
সাঁওতাল সম্প্রদায়ের বর-বধূকে হাতে-পায়ে জল দিয়ে ঘরে প্রবেশ করানোর মধ্যে পরিচ্ছন্নতার দিকটি যেমন স্পষ্ট হয়, তেমনই বাঙালির ঐতিহ্যের অতীতের অতিথি আপ্যায়নের দিকটিকেও তুলে ধরে।
ধীরেন্দ্রনাথ বাস্কের লেখা থেকে জানতে পারি, বিয়ে সংক্রান্ত ‘মঙ্গলকলসি’র কথা, যা বাঙালির জল সইয়ের মঙ্গলকলসির কথা মনে করিয়ে দেয়। বিবাহের ক্ষেত্রে কলসি আর জল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আসলে মঙ্গলকলসি আর মঙ্গল ঘট আবার গর্ভবতী নারীর প্রতীক। বিবাহে সন্তান কামনার প্রতীক হিসেবে উঠে আসা এই মঙ্গলকলসি আর মঙ্গলঘট স্থাপন কি অস্ট্রো এশিয়াটিক জনগোষ্ঠীর থেকে পাওয়া নয়?
সাঁওতালদের সঙ্গে প্রকৃতির যোগ নিবিড়। সমস্ত বিবাহ জুড়ে প্রাকৃতিক অনুষঙ্গের ব্যবহার সেটা মনে করিয়ে দেয়। শালপাতায় মুড়ে সিঁদুর দানের সিঁদুর রাখা থাকে। তাছাড়া বিবাহের সময় বর ধরিত্রীর উদ্দেশ্যে তিনবার মাটিতে সিঁদুর ফেলে সূর্যকে সাক্ষী রেখে কনের সিঁথিতে সিঁদুর দেয়। এভাবে প্রকৃতি, নারী আর বিবাহ সংযুক্ত হয়ে যায়। এই যোগ একদিন সমস্ত মানুষেরই ছিল। এইসব অনুসন্ধানে আমরা মানব ঐতিহ্যের অতীতটাকেই খুঁজে পাই।
প্রচ্ছদ চিত্র পরিচিতি: সাঁওতাল সম্প্রদায়ের কনেকে বড়ো ঝুড়ি করে আনা হয়। ছবি: বিনোদ মারান্ডি৷
তথ্যসূত্র
১. অতুল সুর, ভারতের বিবাহের ইতিহাস, আনন্দ, ১২ (১৪২৩)৷
২. James Frazer, The Golden Bough, Penguin Book, 15 (1900).
৩. Edward Westermark, The History of Human Marriage, Double 9 Books, 29 (2023).
অন্যান্য সহায়ক গ্রন্থ
১) ধীরেন্দ্রনাথ বাস্কে, পশ্চিম বঙ্গের আদিবাসী সমাজ প্রথম খণ্ড, বাস্কে পাবলিকেশন, ২০১৮৷
২) নির্মলকুমার বসু, হিন্দুসমাজের গড়ন, বিশ্বভারতী গ্রন্থালয়৷
৩) নির্মলকুমার বসু, ভারতের গ্রাম–জীবন, বঙ্গীয়সাহিত্য পরিষৎ, পুনর্মুদ্রণ ২০১৭৷
৪) প্রবোধ কুমার ভৌমিক, সমাজ ও সম্প্রদায়, সাহিত্য প্রকাশ ভবন৷
ঋণ স্বীকার
- শিবসত্য হেমব্রম, মহেশ্বর হেমব্রম, আরতি টুডু, দুলারি মুর্মু, কবিতা বেসরা৷
- সোমা সাহু, শ্রুতি দণ্ডপাট৷
তথ্য সমৃদ্ধ ও গবেষণাধর্মী একটি মনোজ্ঞ লেখা। জনগোষ্ঠী ইতিহাস ও সংস্কৃতি পরম্পরার ওপর দাঁড়িয়ে ‘cultural relativist’ interpretation সমৃদ্ধ করলো।🙏🏻
এই গুরুত্বপূর্ণ মতামতের জন্যে অনেক অনেক ধন্যবাদ।
দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত বাংলার গবেষণামূলক কাজ সীমিত সংখ্যায় হয়েছে।বর্তমান প্রবন্ধটি সেই তালিকাভুক্ত হবে আশা রাখি।ভালো কাজ।আরও এমন ক্ষেত্রসমীক্ষা ভিত্তিক কাজ হলে ভালো হবে। শুভেচ্ছা জানাই।
দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত বাংলার গবেষণামূলক এমন কাজ সীমিত সংখ্যায় হয়েছে।বর্তমান প্রবন্ধটি সেই তালিকাভুক্ত হবে আশা রাখি।ভালো কাজ।আরও এমন ক্ষেত্রসমীক্ষা ভিত্তিক কাজ হলে মঙ্গল হবে। শুভেচ্ছা জানাই।
অনেক অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। গুরুত্বপূর্ণ মতামাত পেয়ে ভালো লাগল।
ভালো কাজ।এবিষয়ে আমার ভালো লাগার বিষয়গুলি প্রবন্ধে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।ধন্যবাদ।
এবিষয়ে আমার ভালো লাগার বিষয়গুলি প্রবন্ধে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।ধন্যবাদ।
খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি লেখা। আমাদের মধ্যে পাঠকরা উপকৃত হবে। বিবাহ সংক্রান্ত অনেক তথ্য জানতে পারলাম। লেখকের জন্য অনেক শুভেচ্ছা।
অনেক অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।