বিবাহ, সংসার, দাম্পত্য—রোমক নারী জীবনের এক খণ্ডচিত্র
কথামুখ
রোমের ইতিহাসে সাধারণ পূর্ব ৪৯ থেকে ৪৫ অব্দ ছিল এক বৈপ্লবিক সময়—ইতিহাসের জলবিভাজিকা। জুলিয়াস সিজার বনাম পম্পেই (পম্পেইয়াস ম্যাগনাস)-এর দ্বৈরথ দ্বিধা বিভক্ত করে দিয়েছিল রোমক সমাজকে। ভাইয়ে ভাইয়ে, আত্মীয়ে আত্মীয়ে, রোমকে রোমকে সংঘাত শুরু হয়েছিল চতুর্দিকে। গৃহযুদ্ধের চিরন্তন বিয়োগান্তক পরিণতিই হল জ্ঞাতি সংঘাত। সিজার ও পম্পেই নিজেরাও এই পরিণতির ঊর্ধ্বে ছিলেন না। সিজার তাঁর বড়ো আদরের কন্যা জুলিয়ার বিবাহ দিয়েছিলেন পম্পেইয়ের সঙ্গে।
ইতিহাস লেখে পম্পেই তাঁর স্ত্রী-কে একই সঙ্গে ভালোবাসতেন, ভক্তিও করতেন। এর আগে যখনই রোমের সর্বাগ্রগন্য দুই পুরুষের মধ্যে সংঘাতের সৃষ্টি হয়েছে, মাঝে এসে দাঁড়িয়ে শান্তিপূর্ণ মিটমাট করে দিয়েছেন জুলিয়া। কিন্তু এই বার জুলিয়া ছিলেন না। সিজার ও পম্পেই দীর্ঘ সময় ধরেই রোমক রাজনীতিতে বিপরীত পক্ষে রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রাজনীতির যে স্বাভাবিক সংঘাতের প্রবণতায় জুলিয়া বাধা হয়ে ছিলেন, সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় অকালমৃত্যু সেই বাধা সরিয়ে দিয়েছিল। ইতিহাসের মূল গতি নির্ধারিত হয় অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক শক্তিগুলির পারস্পরিক সংঘাত ও মেলবন্ধনের মধ্যে দিয়ে। ব্যক্তির ভূমিকা তাতে বিপুল পরিমাণে থাকে, এমন নয়। কিন্তু কিছু প্রভাব যে থাকে, জুলিয়া তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
এই কালপর্বেই আরেক নারীর মৃত্যু রোমের আরেক অগ্রগণ্য নাগরিকের জীবনে এনেছিল শোকের ছায়া। রোমের সর্বাগ্রগণ্য বাগ্মী, তুখড় আইনজীবী, রোমের একদা দোর্দণ্ড প্রতাপ কনসাল, মার্কাস টুলিয়াস সিসেরো, তখন আর রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে মূল নায়কের ভূমিকায় নেই। ক্যাটিলিন ষড়যন্ত্র থেকে রোমক প্রজাতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য একদা তাঁকে ‘দেশের পিতা’ বলেও ডাকতেন অনেকে। কিন্তু চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়। যে সময়ের কথা হচ্ছে, তখনও সিসেরোর প্রভাব ও সম্মান রয়েছে। কিন্তু রাজনীতির ঘোড় দৌড়ে তিনি আর সামনের সারিতে নেই। তা নিয়ে সিসেরো খুব যে অসন্তুষ্ট ছিলেন, এমন নয়। খ্যাতি, অর্থ, সম্মান সবই রয়েছে। স্ত্রী টেরেন্টিয়া তিরিশ বছরের জীবনসঙ্গী। তিনি সংসার চালান ঘড়ির কাঁটার মতো (আর সেসব নিয়ে কিছু ভাবতে হয় না বলেই সিসেরো লেখালেখি করার আর বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগ পান)। আদরের মেয়ে টুলিয়াকে কিছুদিন আগেই বিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু এই গৃহযুদ্ধ সমগ্র রোম দেশে অমঙ্গল বহন করে এনেছে, দেশের পিতা কি সেই অমঙ্গলের ছোঁয়া থেকে মুক্ত থাকতে পারেন?
সাধারণপূর্ব ৪৫ অব্দে সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে সিজার কন্যা জুলিয়ার মতোই প্রাণ হারান টুলিয়া। শোকে বিহ্বল হয়ে যান সিসেরো। গৃহিণীর সঙ্গে দীর্ঘ দাম্পত্যের বোঝাপড়াও নষ্ট হয়ে যায়। টেরেন্টিয়া-র সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদ হয় তাঁর। এর কিছুদিন পরে ষাটোর্ধ সিসেরো বিবাহ করেন তাঁর মেয়ের থেকেও কম বয়সী পুবলিলিয়া-কে। প্রাচীন রোমের সমাজে মেয়েদের বিবাহ দেওয়া হত অল্প বয়সেই। কিন্তু তাদের কাছেও এই বিবাহ ছিল অত্যন্ত দৃষ্টিকটু। রোমক সমাজে এই নিয়ে রীতিমতো ঢি-ঢি পড়ে গেল। এমন এক সময় ছিল, যখন লোকমত নিয়ে সিসেরো খুব মাথা ঘামাতেন। এই বার কিন্তু ঘামালেন না। বিয়ে হল। বিয়ের কয়েক সপ্তাহ পরেই তিনি নব পরিণীতাকে তার মায়ের কাছে রেখে এলেন। ‘দেশের পিতা’-র হঠাৎ এই মতিভ্রম হল কেন? তিনি দীর্ঘ দাম্পত্য ভাঙলেন কেন, মেয়ের থেকে কম বয়সী এক পাত্রীকে বিবাহ-ই বা করলেন কেন, আবার বিবাহের পর সেই বালিকা বধূকে মায়ের কাছে রেখে এলেনই বা কেন? এই প্রসঙ্গ সামনে রেখেই প্রবেশ করা যাক সাধারণপূর্ব প্রথম শতকে রোমের বিবাহের চালচিত্রে।
১
সে যুগে রোমক বিবাহ ছিল একান্ত একটি ব্যক্তিগত বিষয়। আধুনিক যুগের মতোই এতে রাষ্ট্রের বিশেষ ভূমিকা থাকত না। এক পুরুষ ও নারী যদি দাবি করতেন তাঁরা বিবাহিত, সমাজ (ও রাষ্ট্র) মেনে নিত তাঁরা বিবাহিত। একই ভাবে তাঁরা যদি দাবি করতেন তাঁদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে গেছে সমাজ (ও রাষ্ট্র) সেই কথাতেই শিলমোহর দিত। এই উভয় পক্ষের সম্মতি প্রদান ও একত্রে দুই পরিবারের খানাপিনার একটা অনুষ্ঠান—এই ছিল শতকরা নিরানব্বই শতাংশ রোমক নাগরিকের বিবাহ কাহিনি। বাকি শতকরা এক শতাংশের বিবাহের বিষয়টা কিন্তু এত সহজ ছিল না। রোমের অভিজাত পরিবারের মেয়েরা, সাধারণ ঘরে জন্মগ্রহণ করা তাঁদের সহোদরাদের থেকে অনেক বিষয়েই ছিলেন ভাগ্যবতী। কিন্তু জীবন সঙ্গী বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে রোমের সাধারণ ঘরের মেয়েদের যে স্বাধীনতা থাকত, অভিজাত পরিবারের মেয়েদের তা থাকত না। বিভিন্ন অভিজাত ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী পরিবারগুলির রাজনৈতিক ঘুঁটি সাজানোর একটি অন্যতম হাতিয়ার ছিল বিবাহ এবং খুব স্বাভাবিকভাবেই তাতে বোড়ে হতেন বাড়ির মেয়েরা। মোটামুটি বছর পাঁচেক বয়স হলেই কোনো মেয়ের বাগদান করা যেতে পারত। দশ-এগারো বছরের আগে অবশ্য এই প্রকার বাগদানের বিবাহে পরিবর্তিত হওয়ার নজির নেই। সাধারণভাবে মেয়ের বিবাহে ছেলের সঙ্গে মেয়ের দশ বছরের ব্যবধান রাখার রেওয়াজ ছিল। পনেরো বছরের মেয়ে পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের যুবককে বিবাহ করছে এই ছিল রোমের সাধারণ বিবাহ চিত্র। পাত্র-পাত্রীর মধ্যে বয়সের এই ব্যবধান দুই দশক পর্যন্ত হতে পারত। ব্যবধান এর বেশি হলে তা রোমক সমাজে নানা রঙ্গ তামাশার বিষয় হত, যেমন হয়েছিল ষাট বছরের সিসেরোর সঙ্গে পনেরো বছরের পুবলিলিয়ার বিবাহে। সর্বোচ্চ পনেরো বছর অবধি বিবাহের জন্য পিতা সমাজসম্মত ভাবে অপেক্ষা করতে পারতেন। তার পরেও মেয়েকে অবিবাহিত রেখে দেওয়া সমাজের চোখে নিন্দনীয়। বিবাহ না করার স্বাধীনতা মেয়েদের থাকত না, মনে করা হত সমাজে মেয়েদের ভূমিকা হল গৃহিণী ও মাতা রূপে দায়িত্ব পালন। রোমের নানা লোকগাথা ও কাহিনিতে আদর্শ গৃহিণী ও মাদের ভূয়সী প্রশংসা পাওয়া যায়।
এর একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল গৃহ ও পরিবারের দেবী ভেস্তার পুরোহিতরা। একমাত্র কুমারী মেয়েরাই ভেস্তার পুরোহিত হতে পারতেন। যে সমস্ত মেয়েদের বিবাহে আগ্রহ ছিল না (অথবা যাদের স্বাধীনচেতা মানসিকতায় কোনো পরিবার বিড়ম্বনায় থাকত) তারা এই ভেস্তার পুরোহিতের পদই বেছে নিতেন (বা নিতে বাধ্য করা হত)।

চিত্র ১ রোমক বিবাহ অনুষ্ঠানের একটি ভাস্কর্য; চিত্র সৌজন্য – অ্যাড মেস্কেন্স
অভিজাতদের বিবাহ ছিল খরচসাপেক্ষ বিষয়। আগেই বলা হয়েছে, কোনো সাধারণ রোমকের বিবাহের ক্ষেত্রে পাত্র ও পাত্রীর সম্মতি, উভয় পক্ষের পরিবার ও বন্ধুবর্গের উপস্থিতি এবং সাধ্য অনুসারে প্রীতিভোজন—এই ছিল বিবাহ। কিন্তু অভিজাতদের ক্ষেত্রে পরিণয় ছিল একটি রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রকল্প। তাই তা কিছুটা বৈবাহিক অনুষ্ঠানকে উপলক্ষ করে চুক্তি ও সমঝোতার রূপরেখায় শীলমোহর দেওয়ার অনুষ্ঠানের রূপ নিত। পাত্রী ঐতিহ্য মেনে হলুদ বসন পরে মাথা ঘোমটায় ঢেকে সখি পরিবেষ্টিত হয়ে যখন পাত্রের বাড়িতে প্রবেশ করছে, সেই হট্টগোল এবং গান-বাজনার আড়ালেই ভেতরের ঘরে বসে দুই পরিবারের কর্তা হয়তো তখন দরাদরি করছেন সেনেটের আগামী সভাগুলিতে কী কী বিষয়ে তাঁরা একে অপরকে সমর্থন করবেন, কোন পরিবারের কোন সদস্যকে কোন পদের উমেদার হিসেবে যৌথভাবে সমর্থন করা হবে, কে কার থাকে কত সেসেরটি ধার নিতে পারবেন ইত্যাদি।
এই দরাদরির মধ্যে থাকত পণ প্রসঙ্গও। প্রাচীন রোমে পণপ্রথা ছিল। কন্যার পরিবারকে বিপুল পরিমাণ পণ পাত্রকে দিতে হত। কিন্তু এতে এই শর্তও থাকত, পাত্রীর কোনো দোষ ছাড়াই পাত্র যদি বিবাহ বিচ্ছেদের পথে হাঁটে, তাহলে পণ ফেরত দিতে হবে। সিসেরোর পনেরো বছরের পুবলিলিয়া-কে বিবাহ করার রহস্য এখানেই লুকিয়ে রয়েছে। টরেন্টিয়ার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শীতল হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু রোমক রীতি অনুসারে তিনি কোনো দোষ করেননি। তাই এই বিবাহ বিচ্ছেদের সময় সিসেরোকে টরেন্টিয়াকে তিরিশ বছর আগে বিবাহের সময় তিনি যে পণ নিয়েছিলেন সবটাই ফিরিয়ে দিতে হয়। এই অর্থনৈতিক ধাক্কা তিনি সামাল দেন পুবলিলিয়া-কে বিবাহ করে প্রাপ্ত পণ থেকে।
এই সূত্রে বিবাহ-বিচ্ছেদ প্রসঙ্গে কয়েকটি কথা বলা যেতে পারে। প্রাচীন রোম এই একটি বিষয়ে ছিল অত্যন্ত উদার। বিবাহ-বিচ্ছেদকে একটি স্বাভাবিক বিষয় বলেই ধরা হত। কিঞ্চিৎ সামাজিক পরনিন্দা-পরচর্চার বিষয় হওয়া ছাড়া বিবাহ-বিচ্ছেদের জন্য আর কোনো অত্যাচার বা নিন্দা কোনো মেয়েকে সহ্য করতে হত না। এমনকি সেইটুকুও হত না যদি সমাজের চোখে বৈধ কারণ ছাড়াই বা স্বামীর কোনো দোষের কারণে এই বিবাহ বিচ্ছেদ হয়, উদাহরণ স্বরূপ মার্ক অ্যান্টনি অক্টাভিয়ার সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদ করলে সমগ্র রোমের সহানুভূতি ছিল অক্টেভিয়ার দিকে। এই বিশেষ উদাহরণে অবশ্য অক্টেভিয়ার প্রতি রোমক জনতার সহানুভূতি নির্মাণে তাঁর দাদা অক্টেভিয়াস, ভবিষ্যৎ সম্রাট অগাস্টাসেরও ভূমিকা ছিল। বিবাহের মতো, বিবাহ বিচ্ছেদও, উচ্চকটি সমাজে, রোমের রাজনীতিতে ছিল এক বৈধ রাজনৈতিক হাতিয়ার। যাই হোক, বিবাহ বিচ্ছিন্না নারী সামাজিক সম্মান অনেকটাই বজায় রাখতে পারতেন। পুনর্বিবাহ সমাজের চোখে ও আইনিভাবে বৈধ ছিল। বিশেষ করে অভিজাত মেয়েদের মধ্যে পুনর্বিবাহের চল ছিল খুবই বেশি। তিন-চার বার বিবাহ একেবারেই স্বাভাবিক বিষয় বলে ধরা হত। এই ‘প্রগতিশীলতা’ তৎকালীন সমাজের প্রেক্ষিতে নজর কাড়া হলেও সামগ্রিক ব্যবস্থাটি পিতৃতন্ত্রের বাইরে ছিল না। স্বামী যে কোনো কারণে তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে বিবাহ-বিচ্ছেদ করতে পারতেন। অর্থাৎ বিচ্ছেদের ক্ষমতাটি থাকত মূলতঃ পুরুষের হাতে। গুরুতর বৈধ কারণ ছাড়া এই কাজ করলে তাঁকে পণ ফেরত দিতে হত—এইমাত্র। এছাড়া পরিবারের কর্তা (পাটের ফামিলিয়াস) চাইলে বিবাহ বিচ্ছেদ হতে পারত। দুই পরিবারের মধ্যে সংঘাতের পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে অনেক ক্ষেত্রেই পাটের ফামিলিয়াস-রা এই জাতীয় নির্দেশ জারি করতেন। এ ব্যতীত অন্যান্য বৃহত্তর রাজনৈতিক প্যাঁচ-পয়জারের বলি হত অনেক বিবাহ। নির্দেশ দেওয়া হত, অমুকের সমর্থকরা তমুকের সমর্থকদের বিবাহ করতে পারবে না, এইরকম সম্পর্ক যদি কারোর থাকে তাহলে এখনই বিবাহ বিচ্ছেদের ব্যবস্থা কর। এতে স্ত্রী-র (অনেক ক্ষেত্রে স্বামীরও) কিছু করার থাকত না।
২
এই পর্যন্ত পাঠ করে পাঠকের মনে হতে পারে, এই ধরণের বিবাহ ছিল অত্যন্ত কেজো গোছের। মনে হতে পারে, দাম্পত্য বলতে যে ছবিটি আমাদের মনে ভাসে, তার সঙ্গে রোমক অভিজাত বিবাহ ও দাম্পত্যের কোনো মিল নেই। এটা কিন্তু ঠিক ধারণা হবে না। এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ যা দিয়ে প্রবন্ধ শুরু হয়েছিল। সিজার তাঁর কন্যা জুলিয়ার সঙ্গে পম্পেইয়ের বিবাহ দিয়েছিলেন রাজনৈতিক চুক্তির অংশ হিসেবে। কিন্তু পম্পেই জুলিয়ার এমনই প্রেমে পড়ে গেলেন যে পরবর্তী কালে সিজার ও পম্পেইয়ের মধ্যে রাজনৈতিক শীতলতা ও দূরত্ব তৈরি হলেও জুলিয়া যতদিন বেঁচে ছিলেন তা প্রত্যক্ষ সংঘাতে যায়নি। এই বিষয়টি যে খুব অভিনব ছিল, এমনও নয়। সিজার স্বয়ং এর উদাহরণ। একনায়ক সুলা ফেলিক্স তরুণ সিজারকে আদেশ দিয়েছেলেন পত্নী কর্নেলিয়াকে পরিত্যাগ করতে। সতর্ক করেছিলেন, এই আদেশ অমান্য করলে শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড। সিজার দীর্ঘকাল সুলার হাত থেকে বাঁচতে ছদ্মবেশে ভবঘুরের মতো ঘুরে বেড়িয়েছেন, প্রবল দুঃখ কষ্ট সহ্য করেছেন, তাঁর ধন-সম্পত্তি ও পদ কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তাঁর পেছনে ঘুরেছে গুপ্ত ঘাতকের বাহিনি—কিন্তু তবুও তিনি বিবাহ-বিচ্ছেদের আদেশ মানতে রাজি হননি। অবশ্য আবার এ থেকে এই সিদ্ধান্তেও আসা উচিৎ নয় যে সব বিবাহই সিজার-কর্নেলিয়া বা পম্পেই-জুলিয়ার মতো আদর্শ প্রেম ও দাম্পত্যের আকার নিত। অধিকাংশ বিবাহতেই প্রেম ও ভালোবাসার থেকে কর্তব্য ও দায়িত্বের উপরেই জোর দেওয়া হত। গৃহিণী আদর্শ মা হবেন, ঘর সামলাবেন আর বাড়ির কর্তার আছে বাইরের জগত—এমনই ছিল আদর্শ রোমক পরিবারের ভাগাভাগি।
তবে রোমক সমাজে পত্নীর বাইরের সামাজিক জগতে ভূমিকা একেবারেই থাকত না, এমন নয়। তিনি বাড়িতে নানা উৎসব অনুষ্ঠানের আয়োজনের ও আতিথিয়তার দায়িত্বে থাকতেন। অনান্য মহিলাদের সঙ্গে সখ্যতা পাতাতেন। বাড়ির নানা অর্থনৈতিক দিক সামলাতে তাঁকে নানা জায়গায় যেতেও হত। রোমক মেয়েরা পর্দানশীন ছিলেন না। তাঁরা আড্ডা দিতেন, বাজারে দরদাম করতেন, সার্কাসে ঘোড় দৌড় দেখতে যেতেন, নাটক বা কবিতা পাঠের আসর শুনতে যেতেন।
সমসাময়িক গ্রিক মেয়েদের বরং বাইরের জগতে মেলামেশার সুযোগ ছিল অনেক কম। বিশেষ করে সম্ভ্রান্ত ঘরের মহিলারা বাইরের কোনো পুরুষের সামনে বের হতেন না। দুই সভ্যতার সংস্কৃতির পার্থক্যটি এই কালপর্বের এক ঘটনা বর্ণনা করলে স্পষ্ট হবে। সাধারণপূর্ব ৮০ অব্দ নাগাদ গ্রিক রীতি সম্পর্কে অজ্ঞ জনৈক রোমক নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গ্রিস-এর এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির বাড়িতে গিয়ে সটান ঢুকে পড়েছিলেন অন্তঃপুরে। রোমক অনুষ্ঠানে বাড়ির গৃহিণীই আয়োজনের মূল হোতা, প্রথমে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কুশল জিজ্ঞাসাই রীতি। আমাদের রোমক ভদ্রলোকটিও তাই করেছিলেন। হতভম্ব গৃহিণী অন্তঃপুরে হঠাৎ আগত অচেনা পুরুষের কুশল জিজ্ঞাসার কোনো উত্তর তো দেনই নি, বরং সটান মূর্ছিত হয়ে যান। এরপর তাঁর গ্রিক স্বামী খোলা তরবারি হাতে অতিথিকে তাড়া করেন। এই ঘটনার পরে যখন বিচার হয়, রোমক বিচারক কিছুক্ষণ বিশ্বাসই করতে চাননি যে গ্রিক (বিশেষ করে এথেনিয়) রীতিতে সম্ভ্রান্ত পরিবারের মহিলা অচেনা পুরুষের সঙ্গে কুশল বিনিময় দূরে থাক, দেখা অবধি করেন না।
তবে এই ‘স্বাধীনতা’-রও সীমাবদ্ধতা ছিল। আইনত, মেয়েদের সব কাজকর্মের জন্যই একজন ‘অভিভাবক’ বা ‘টিউটর’ লাগত। সম্রাট অগাস্টাসের আমলে মুক্ত নাগরিক পরিবারের কোনো মেয়ে তিনটি এবং প্রাক্তন দাস পরিবারের কোনো মেয়ে চারটি সন্তানের জন্ম দিলে সরকারিভাবে ‘অভিভাবক’ মুক্ত হতেন। অবশ্য তার আগেই চিরদিনের জন্য বহু মেয়ে মুক্তি লাভ করে যেতেন। আধুনিক চিকিৎসার সুযোগ তখন ছিল না। তাই সন্তান জন্ম দেওয়া ছিল এক অত্যন্ত দুরহ ও বিপজ্জনক কাজ, জন্মদান কালে মৃত্যুহার ছিল আকাশ ছোঁয়া। সৌভাগ্যের বিষয়, ঐতিহাসিক সাক্ষ্য প্রমাণ দেখে বলা চলে এই ‘টিউটর’ বিষয়টি মূলতঃ খাতায় কলমেই থাকত, মূলতঃ রোমের রক্ষণশীল গোষ্ঠীকে খুশি রাখতে। এই গোষ্ঠীর বক্তব্য ছিল রোমের মেয়েরা অতিরিক্ত স্বাধীনতা ভোগ করে। এই ‘স্বাধীনতা’-র জন্যই মেয়েদের ‘বাড়াবাড়ি’ মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। তাঁরা আঙুল তুলতেন ভলুমনিয়া সিথেরিস অথবা ক্লডিয়ার মতো স্বাধীনচেতা (তাঁদের মতে উচ্ছৃঙ্খল) মেয়েদের দিকে। সিসেরো ক্লডিয়াকে ডাকতেন ‘প্যালেটাইনের মিডিয়া’ নামে (প্যালেটাইন হল রোমের সেই পাহাড় যেখানে অধিকাংশ অভিজাতদের আবাস ছিল। মিডিয়া গ্রিক পুরাণের বিখ্যাত ডাকিনী)।
পরবর্তীকালে সম্রাট অগাস্টাস এই প্রভাবশালী রক্ষণশীল গোষ্ঠীকে খুশি রাখতে মেয়েদের জন্য কড়া আইন চালু করেন। অগাস্টাসের স্ত্রী লিভিয়ার উপর নির্দেশ ছিল বাড়ির সামনে বসে সুতো কাটার। সম্রাটের স্ত্রী-কে থাকতে হবে যথেচ্ছাচারের (সমাজের চোখে) সন্দেহের ঊর্ধ্বে। ভাগ্যের পরিহাস, সম্রাটের একমাত্র প্রাণপ্রিয় কন্যা জুলিয়া পরবর্তী কালে সম্রাটেরই পাশ করা আইন দ্বারা যথেচ্ছাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে শেষ জীবন কাটান নির্বাসনে। তবুও রক্ষণশীল গোষ্ঠীর আশ মেটেনি। ‘রোমিউলাসের আমলে এগ্নিটিয়াস মেটেলাস সুরা পান করার জন্য তাঁর স্ত্রীকে পিটিয়ে মেরে ফেলেছিলেন, আহা সে ছিল রোমক ঐতিহ্যের স্বর্ণ যুগ। আর এখন কি অধঃপতন !’ এমন হাহাকারও শোনা গেছে সাধারণাব্দের প্রথম শতকের জনৈক লেখকের কলমে। সালুস্তের মতো বিদ্বান ইতিহাসবিদ, যিনি অন্য অনেক বিষয়ে ইতিহাসবিদ সুলভ সংযম ও নিরপেক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন, রোমের বহু দুর্ভাগ্যের জন্য দায়ী করেছেন মেয়েদের ‘যথেচ্ছাচার’-কে।

চিত্র ২ জুলিয়া-সম্রাট অগাস্টাসের ‘যথেচ্ছাচারী’ কন্যার ভাস্কর্য (চিত্র সৌজন্য – মিউজি সাঁ রেমো)
ঐতিহাসিক দ্বিজেন্দ্র নারায়ণ ঝা একদা মন্তব্য করেছিলেন, ‘অতীতে সাধারণ মানুষের জন্য স্বর্ণযুগ বলে কিছু ছিল না। সাধারণ মানুষের স্বর্ণযুগের সন্ধান করতে হবে ভবিষ্যতে, অতীতে নয়।’ এই বক্তব্যের অনুরণন তুলে বলা যায়, কৃষি বিপ্লব পরবর্তী বিশেষ আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের ফসল পিতৃ-তন্ত্রের প্রতিষ্ঠার পর থেকে কোনো সভ্যতাতেই নারীদের অবস্থা পুরুষদের তুলনায় বিশেষ সুখপ্রদ ছিল না। রোমের ইতিহাসও তার ব্যতিক্রম নয়। তবুও মেয়েরা সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই স্থান করে নিয়েছেন। জুলিয়া জীবৎকালে ঠেকিয়ে রেখেছিলেন রোমের গৃহযুদ্ধকে, টরেন্টিয়া সংসার সামলে সিসেরোকে সুযোগ দিয়েছিলেন তাঁর বাগ্মীতা ও লেখনীর চর্চার, অগাস্টাসের পাশে দাঁড়িয়ে লিভিয়া রোমক সাম্রাজ্য চালানোয় নিয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
এই চিত্র সাধারণ রোমকদের জীবনেও আমরা দেখি। সাধারণ অব্দের প্রথম শতকে অরেলিয়াস হার্মিয়া নামে এক কসাই তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে একটি যৌথ স্মৃতি লেখ নির্মাণ করেন। দুজনের মৃত্যুর পর তাঁদের সমাধির উপর এই স্মৃতিলেখ থাকবে বলে সম্ভবত স্থির হয়েছিল। অরেলিয়া ফিলেমাটিয়াম নামক ঐ স্ত্রী সম্পর্কে স্বামীর ও স্বামী সম্পর্কে স্ত্রী-র প্রশংসায় লেখটি পরিপূর্ণ। দুজনে কেউ কারোর অধীন নন, একে অপরের সহযোগী ও সহযোদ্ধা—এমন ভাবই প্রকাশিত হয়েছে লেখ ও তাতে খোদাই করা ভাস্কর্যে। প্রসঙ্গতঃ, দুজনেই ছিলেন প্রাক্তন দাস। বিবাহ ও সংসারের রক্ষণশীল বন্ধন রোমক মেয়েদের পরিণত করতে চেয়েছিল অবয়বহীন ও ব্যক্তিত্বহীন পতির ছায়াতে।
সাম্রাজ্ঞী লিভিয়া থেকে কসাই গৃহিণী অরেলিয়া তাতে আবদ্ধ থাকেননি—তাঁদের দাগ থেকে গেছে ইতিহাসে।

চিত্র ৩ যে দাম্পত্য বজায় থেকেছে মৃত্যুর পরেও – অরেলিয়াস ও অরেলিয়ার সমাধি লেখ, চিত্র সৌজন্য – দ্য ব্রিটিশ মিউজিয়াম
প্রচ্ছদ চিত্র পরিচিতি: রোমক বিবাহ অনুষ্ঠানের রিলিফ চিত্র, চিত্র সৌজন্য ক্যাপোডিমোন্টে জাদুঘর
তথ্যসূত্র
১) M Beard, SPQR: A History of Ancient Rome, (Profile Books, 2015).
২) E D’Ambra, Roman Women, (Cambridge University Press, 2006).
৩) Emily A Hemelrijk, Women and Society and the Roman World, (Cambridge University Press, 2020).
৪) Richlin, Arguments with Silence – Writing the History of Roman Women, (University of Michigan Press Amy, 2014)
কত অজানারে জানাইলে তুমি ‘ইতিহাস আড্ডা ‘।
তথ্য বহুল আলোচনা। ধন্যবাদ।