সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

ভারতীয় পূর্বপুরুষদের নববিন্যাস: একটি প্রস্তাবনা

ভারতীয় পূর্বপুরুষদের নববিন্যাস: একটি প্রস্তাবনা

তুষার মুখার্জী

আগস্ট ২৩, ২০২৫ ৬৭৪ 0

আফ্রিকা থেকে আগত ভারতের প্রথম জনগোষ্ঠী প্রাকৃতিক নিয়মেই বিলুপ্ত। পরে আসা বিভিন্ন জনগোষ্ঠী এই ভূখণ্ডের বিশালত্ব ও ভূবৈচিত্র্যের দরুণ অন্য জনসম্প্রদায়কে সম্পূর্ণ প্রতিস্থাপনে সক্ষম হয়নি। এই বৈচিত্র্যময় বিশালত্বের দরুন বিভিন্ন জনগোষ্ঠীগুলি নিজেদের বিচ্ছিন্ন রাখতে সক্ষম হয়েছে। কোনো একক জাতি বা জনগোষ্ঠী নয় বরং ভারতবর্ষ নামের ভূখণ্ডে বসবাসকারী বহুজাতিক জনসমষ্টিই ভারতীয়। এই বহুজাতিক জনসমষ্টি এক সাংস্কৃতিক বন্ধন ও মাতৃকুলের নাড়ির বাঁধনে আবদ্ধ।


জেনেটিক সূত্রে মাতৃকুলের পরিচিতির হদিস পাই ‘মাইটোকন্ড্রিয়ার ডি.এন.এ. হ্যাপ্লোগ্রুপ’ থেকে। পিতৃকুলের হদিস পেতে প্রয়োজন হবে ‘ওয়াই-ক্রোমোজোমের ডি.এন.এ হ্যাপ্লোগ্রুপ’।

জেনেটিক বিজ্ঞানের সাহায্যেই জেনেছি ভারতীয়রা এক নয়, একাধিক জাতির সমষ্টি। জনগোষ্ঠীগুলোকে চিহ্নিত করার কাজে একেবারে গোড়ায় ব্যবহার করা হয়েছিল মা থেকে মেয়েতে প্রবাহিত মাইটোকন্ড্রিয়া ডি.এন.এ হ্যাপ্লোগ্রুপ। ভারতীয়দের মধ্যে মাইটোকন্ড্রিয়া হ্যাপ্লোগ্রুপ-এম খুব বেশি থাকায় ধারনা জন্মেছিল ভারতীয়রা একটি একক জনগোষ্ঠী। অথচ পিতা থেকে পুত্রে প্রবাহিত ওয়াই-ক্রমোজোমের হ্যাপ্লোগ্রুপ বিশ্লেষণ করে দেখা গেল ভারতীয়দের মধ্যে ওয়াই-ডি.এন.এ-র হ্যাপ্লোগ্রুপে রয়েছে বিশাল বৈচিত্র্য। তথ্য প্রমাণ করে ভারতীয় জননীরা ছিল বরাবর ভারতবাসী। দেখা গেছে অজস্র জাতি ধর্ম বর্ণ ভাষা আর তার বিভেদে বিভক্ত ভারতীয়দের মাইটোকন্ড্রিয়া হ্যাপ্লোগ্রুপ অতি সামান্য কয়েকটি। সামান্যের মধ্যেও একা হ্যাপ্লোগ্রুপ-এম প্রায় ৪০-৬০ শতাংশ। তাছাড়া হ্যাপ্লোগ্রুপ–এন, আর, ইউ আছে। প্রাচীন হলেও তুলনামূলক নবীন ইউ হ্যাপ্লোগ্রুপ পশ্চিম ইয়োরেশীয় অঞ্চল থেকে পরে এসেছে।

এছাড়া আরো সামান্য কয়েকটি ভিন্ন হ্যাপ্লোগ্রুপ পাওয়া গেলেও প্রধানত এই কয়টি জননী হ্যাপ্লোগ্রুপই আপামর ভারতীয়দের চিরন্তন নাড়ীর বাঁধন। ভারতে পিতৃকুল ছিল বিভিন্ন সময়ের বহিরাগত জনগোষ্ঠী। অথচ আমরা পিতৃতান্ত্রিক বিশ্বের বাসিন্দা। তাই জননী হ্যাপ্লোগ্রুপের চেয়ে বেশি উৎসাহ পিতৃ হ্যাপ্লগ্রুপের তথ্যে। এমনিতেই বলা হয় ‘পূর্বপুরুষ’। অর্থাৎ অতীতের পুরুষ-জনগোষ্ঠীর তথ্যই আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতীয় পূর্বপুরুষদের নিয়ে কিছুকাল যাবত নানা অনুসন্ধান হলেও সর্বজনমান্য তত্ত্ব এখনও অধরা। কিঞ্চিৎ বিতর্কিত হলেও আপাতত স্বীকৃত ভারতীয় পূর্বপুরুষের জনবিন্যাসের একটি কাঠামো ছিল। ইদানিং সেই কাঠামো নিয়ে আরেক দফা বিতর্কের মেঘ জমেছে।

চিত্র কৃতজ্ঞতা: প্রিয়া মুরজানী

আপাতত স্বীকৃত কাঠামো

(১) আন্দাজ ৬০-৭০ হাজার বৎসর আগে আফ্রিকা থেকে আসা আধুনিক স্যাপিয়েন্স ও তৎপরবর্তী অধুনা বিলুপ্ত, আদিম শিকারি-সংগ্রাহক জনগোষ্ঠী,

(২) পরের ধাপে অ্যানসিয়েন্ট অ্যান্সেস্ট্রাল সাউথ ইন্ডিয়ান। (এ.এ.এস.আই.)

এরপরে পাব দুটি প্রধান জনসমষ্টি,

(৩.১) অ্যান্সেস্ট্রাল সাউথ ইন্ডিয়ান (এ.এস.আই.)

(৩.২) অ্যান্সেস্ট্রাল নর্থ ইন্ডিয়ান। (এ.এন.আই.)

(৪) আধুনিক ভারতবাসী। এ.এস.আই. ও এ.এন.আই. মিশ্রণে গঠিত।

এই কাঠামোর প্রবক্তা ডেভিড রাইখ। তবে এই কাঠামো তিনি পাঁচ বৎসরের ব্যবধানে প্রকাশিত দুটি গবেষণাপত্রে (২০১৩ ও ২০১৮) স্থির করেন। এবং ইদানিং আবার পরবর্তী পাঁচ বৎসরের ব্যবধানে ডেভিড রাইখের সহযোগী প্রিয়া মুরজানী সেই কাঠামোকে বদলে দেবার প্রস্তাব রাখলেন। এই লেখায় এই তিনটি প্রস্তাবনাই আলোচ্য।


পূর্বপুরুষেয় জনবিন্যাসের কাঠামো নির্ণয়ের প্রথম ধাপ “জেনেটিক এভিডেন্স ফর রিসেন্ট পপুলেশন মিক্সার ইন ইন্ডিয়া” গবেষণাপত্রে প্রকাশিত হয় ২০১৩ সালে। এই গবেষণাপত্রে অ্যানসিয়েন্ট অ্যান্সেস্ট্রাল সাউথ ইন্ডিয়ান নেই। ছিল আন্দামানি শিকারি-সংগ্রাহক গোষ্ঠীর সাথে দূরসম্পর্কে সম্পর্কিত অ্যান্সেসস্ট্রাল সাউথ ইন্ডিয়ান (এ.এস.আই.)। আর ছিল পশ্চিম-ইউরেশীয় (মধ্য এশীয়, মধ্যপ্রাচ্য, ককেশীয় ও ইউরোপীয়) জনগোষ্ঠীর মিশ্রণ অ্যান্সেস্ট্রাল নর্থ ইন্ডিয়ান (এ.এ.আই.)। এ.এস.আই. ও এ.এন.আই. জনগোষ্ঠীর মিশ্রণে এল আধুনিক ভারতীয় জনগোষ্ঠী। এই দুই জনগোষ্ঠী ও তাদের মিশ্রণের থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল বহু ছোটো ছোটো জাতিগোষ্ঠী হাজার হাজার বৎসর ধরে। গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে এ.এস.আই. ও এ.এন.আই. মিশ্রণের কাল আনুমানিক ৩০০০ থেকে ৪২০০ বংসর আগের ঘটনা। তারই সাথে গবেষণাপত্রে এও বলা হয় ৮০০০-৯০০০ বংসর আগে উত্তর-পশ্চিম ভারতের মেহেরগড় এলাকায় কৃষিকাজ আরম্ভের কালে বাইরে থেকে লোক প্রবেশ করতে শুরু করে। এবং দক্ষিণ ভারতে কৃষিকাজ আরম্ভ হয় ৪৬০০ বৎসর আগে; মুগডাল, ছোলা, মিলেট এইসব দিয়ে।

প্রাচীন ভারতীয়দের পরিচয় জানার অন্য পন্থা

বৈচিত্র্যে ভরা পিতৃকুলের হ্যাপ্লোগ্রুপ ভিত্তিক পরিচয় নির্ধারণ করাটা আমাদের কাছে বেশ সমস্যার। কারণ ভারতের মাটি-জলবায়ু প্রাচীন কঙ্কালকে টিকে থাকতে দেয় না। থাকলেও তার ডি.এন.এ. নষ্ট হয়ে যায়। ডি.এন.এ. না পেলেও কঙ্কালের দাঁত থেকে জনগোষ্ঠীর প্রাথমিক পরিচিতি অনুমান করা সম্ভব। আলোচিত প্রাচীন দাঁতের নমুনা সংগ্রহ করেছেন প্রখ্যাত ওডন্টোলজিষ্ট জন লুকাস, হেমফিল ও নৃতত্ত্ববিদ কেনেথ কেনেডি। এই ত্রয়ীর একটি প্রবন্ধ থেকে কিছু তথ্য জানা যায়-

(১)প্রত্নক্ষেত্র: আট-দশ হাজার বৎসর আগেকার, মেসোলিথিক যুগের, সরাই-নহর-রাই, দমদমা আর মহাদহ (উত্তরপ্রদেশ)।

(২)প্রত্নক্ষেত্র: আট হাজার বৎসর আগেকার নব্যপ্রস্তর যুগের মেহেরগড়।

>> এই দুই এলাকার জনগোষ্ঠীর  মধ্যে নৃতাত্ত্বিক সম্পর্ক নেই।

(২) প্রত্নক্ষেত্র: ৬০০০ পূর্বাব্দ নব্যপ্রস্তর যুগের মেহেরগড়।

(৩) প্রত্নক্ষেত্র: ১৬০০ পূর্বাব্দের মহারাষ্ট্রের ইনামগাঁও।

>> এই দুই এলাকায় ছিল একই নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী।

(২) প্রত্নক্ষেত্র: ৬০০০ পূর্বাব্দ নব্যপ্রস্তর যুগের মেহেরগড়।

(৪) প্রত্নক্ষেত্র: ৪৬০০ পূর্বাব্দ তাম্রযুগে মেহেরগড়।

>> এই দুই জনগোষ্ঠী নৃতাত্ত্বিক সম্পর্কহীন।

(৪) প্রত্নক্ষেত্র: ৪৬০০ পূর্বাব্দ তাম্রযুগের মেহেরগড়।

(৫) প্রত্নক্ষেত্র: হরপ্পা শহরের আর-৩৭ কবর।

>> এই দুই এলাকায় ছিল একই নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী।

(৫) প্রত্নক্ষেত্র: হরপ্পা শহরের আর-৩৭ কবর (২৩২৭পূর্বাব্দ)।

(৬) প্রত্নক্ষেত্র: হরপ্পা শহরের সিমেট্রি-এইচ (১৭০০ পূর্বাব্দ)।

>> এই দুই এলাকায় ছিল একই নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী।

(৬) হরপ্পা শহরের সিমেট্রি-এইচ ১৭০০ পূর্বাব্দের কবর।

(৭) হরপ্পা শহরের সিমেট্রি-এইচ ১৩০০ পূর্বাব্দ কবর (মাটির পাত্রে রাখা দেহাস্থি)।

>> এই দুই জনগোষ্ঠী নৃতাত্ত্বিক সম্পর্কহীন।

৬০০০ আর ৪৬০০ পূর্বাব্দের মেহেরগড়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যে সম্পর্ক না থাকলেও একটা ন্যূনতম সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা ছিল। কিন্তু ১৭০০ পূর্বাব্দের হরপ্পার সিমেট্রি-এইচ আর ১৩০০ পূর্বাব্দের সিমেট্রি-এইচ এর সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতাও ছিল না; যা বলে তারা ভিন্ন জনগোষ্ঠী ছিল।

হরপ্পা আর-৩৭ কবরে এবং ৪৬০০ পূর্বাব্দের তাম্রযুগীয় মেহেরগড়ে পাওয়া দাঁতের নমুনায় মিল থেকে অনুমান সম্ভব, এরাই কালক্রমে হরপ্পা সভ্যতার জনক হয়েছিল। কিন্তু এখানে এসে আরেকটা ছোটো সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। জন এফ. কেনয়ের, ন্যান্সি লোভাল এবং বেঞ্জামিন ভ্যালেন্টাইন, কেনয়ের, বসন্ত সিন্ধের করা দাঁতের আইসোটোপ-এর দুটি ভিন্ন যৌথ গবেষণা বলছে হরপ্পার আর-৩৭ কবরের সমস্ত নারী-পুরুষদের শৈশবে হিমালয়ের পটোয়ার ভ্যালী থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল। একইভাবে ফারমানা প্রত্নক্ষেত্রেও পুরুষদের পটোয়ার ভ্যালী থেকে আর মেয়েদের রাজস্থানের ক্ষেত্রী থেকে শৈশবেই আনা হয়েছিল। এর ফলে হরপ্পা শহরের প্রতিষ্ঠাতাদের প্রকৃত পরিচয় খানিক বিতর্কিতই থেকে গেল, সম্ভবত বরাবরের জন্য। লক্ষণীয় রাখিগড়ির দেহাবশেষের দাঁতের আইসোটোপ পরীক্ষা হয়েছিল কি না তা অজানা।

ডেভিড রাইখের দ্বিতীয় গবেষণাপত্র ও বসন্ত সিন্ধের রাখিগড়ি গবেষণাপত্র

নানাবিধ আনুমানিক ও সম্ভাব্যের বিতর্ক থেকে উদ্ধার করে প্রয়োজনীয় জেনেটিক তথ্য দেবার প্রথম আশা জাগিয়েছিল ডেভিড রাইখের ২০১৩-তে প্রকাশিত গবেষণাপত্রটি। কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে এটি খুব একটা আলোচিত হল না। আলোচনায় এল ডেভিড রাইখেরই পাঁচ বৎসর পরের গবেষণাপত্র “দি জেনোমিক ফর্মেশন অফ সাউথ অ্যান্ড সেন্ট্রাল এশিয়া” (৩১ মার্চ, ২০১৮)। অনেক বিশদ এই গবেষণায় সিন্ধু অববাহিকায় বা গোটা হরপ্পা সভ্যতা এলাকায় প্রাচীন ডি.এন.এ. না পাওয়াতে, ইরান ও মধ্যএশিয়ার থেকে পাওয়া ১১টি ডি.এন.এ.-র ভিত্তিতে একটি হরপ্পা সভ্যতার বহিঃপ্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বের সম্ভাবনার কথা বলেন তিনি। নামাকরণও করেন “ইন্ডাস পেরিফেরিয়াল ক্লাইন”। জানালেন এরাই  সম্ভবত হরপ্পা সভ্যতার জনক।


এরপরের উল্লেখযোগ্য ঘটনা: সেপ্টেম্বর, ২০১৮। বসন্ত সিন্ধে ও নীরজ রাই ইকনমিক টাইমস এবং আউটলুক-এর সাংবাদিকদের সুখবর দিলেন যে রাখিগড়ির কোড নম্বর আই৪৪১১(I411) দেহাবশেষের পুরুষটির ওয়াই-ডি.এন.এ.-র মধ্যে স্তেপের আর১এ১ (R1a1) হ্যাপ্লোগ্রুপ জিন নেই। (প্রসঙ্গত, এই হ্যাপ্লোগ্রুপকেই আমরা সাধারণ আলোচনায় আর্য-জিন বলে থাকি।) আই৪৪১১ পুরুষটির অটোজোম বলছে তার পূর্বপুরুষে মধ্যএশীয় জিন নেই। এবং পূর্বজদের সাথে দক্ষিণ ভারতের নীলগিরি এলাকার ইরুলাদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সম্ভাবনাই বেশি। ২০১৩ গবেষণাপত্র অনুযায়ী এদের আমরা আন্সেষ্ট্রাল সাউথ ইন্ডিয়ান বলতে পারি। স্বভাবতই দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় আলোচনা শুরু হল দক্ষিণ ভারতীয়রাই হরপ্পা সভ্যতার জনক।

এক বৎসর বাদে ২০১৯ সেল (CELL) বিজ্ঞান পত্রিকায় প্রকাশিত হল রাখিগড়ির ডি.এন.এ. বিশ্লেষণের গবেষণাপত্র। সেখানে এক বৎসর আগে মুখে বলা আই৪৪১১ (I4411) পুরুষটি বদলে এসেছে নারী, কোড আই৬১১৩ (I6113)। নারীর মাইটোকন্ড্রিয়া হ্যাপ্লোগ্রুপ ইউ.টু.বি.টু (U2b2)। যেহেতু মহিলা তাই ওয়াই-ক্রমোজোমের তথ্য অলভ্য। আই৬১১৩ নারীর অটোজোম থেকে পূর্বপুরুষেয় তথ্যে জানা গেল এখানেও তথাকথিত আর্য-জিন বা হ্যাপ্লোগ্রুপ আর১এ১ (R1a1) নেই। এবং নারীটির পূর্বপুরুষ ছিল আনুমানিক ৯০ শতাংশ ইরান-সম্পর্কিত জনগোষ্ঠী আর আনুমানিক ১০শতাংশ অ্যানসিয়েন্ট অ্যান্সেস্ট্রাল সাউথ ইন্ডিয়ান। বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যায় এই ইরান-সম্পর্কিত জনগোষ্ঠী প্রায় ১২ হাজার বৎসর আগে আসে। প্রাচীনত্বের খাতিরে এদের ভারতীয় বলা যেত, কিন্তু তথ্যের ভিত রক্ষার খাতিরে ইরানের অজ্ঞাত স্থান ও অজ্ঞাত পূর্বপুরুষ থেকে উদ্ভূত এই জনগোষ্ঠীকে ‘ইরান-সম্পর্কিত জনগোষ্ঠী’ নাম দেওয়া হল। গবেষণাপত্রে বলা হল, এরা ভারতে এসে অ্যানসিয়েন্ট অ্যান্সেস্ট্রাল সাউথ ইন্ডিয়ানদের সাথে মিশ্রিত হয়ে ভারতীয় পূর্বপুরুষ জনগোষ্ঠীর সৃষ্টি করে। দাঁতের নমুনার বিচারে পাওয়া তথ্যে ছিল, মেসোলিথিক গঙ্গা-অববাহিকার লোকেরা নব্যপ্রস্তরযুগীয় মেহেরগড়ের সাথে সম্পর্কহীন। এই সম্ভাব্য মিশ্রিত মেহেরগড়বাসীদের ১৬০০ পূর্বাব্দের ইনামগাঁওতেও পেলাম। এখন ২৬০০ পূর্বাব্দের রাখিগড়িতেও পেলাম। রাখিগড়ির গবেষণাপত্র প্রকাশ উপলক্ষে সংবাদমাধ্যমে বসন্ত সিন্ধে ঘোষণা করেন রাখিগড়ির এই ইরান-সম্পর্কিত জনগোষ্ঠীই প্রকৃত হরপ্পান, এরাই হরপ্পা সভ্যতার জনক ও সকল ভারতবাসীর প্রকৃত পূর্বপুরুষ। সমস্যা হল একই গবেষণাপত্রের সহ-গবেষক ডেভিড রাইখের মতে হরপ্পা সভ্যতার জনক ইন্ডাস ক্লাইন জনগোষ্ঠী।

গোলমাল কোথায়? ডেভিড রাইখের ব্যাখ্যায় ইন্ডাস ক্লাইন জনগোষ্ঠীই প্রধান জনগোষ্ঠী। রাখিগড়ির হরপ্পানরা হল তাদেরই একটা অংশ। অর্থাৎ ইন্ডাস ক্লাইন আর হরপ্পান একই জনগোষ্ঠী। এবং তারা প্রাচীন ইরান থেকে আসা ও যৎসামান্য অ্যানসিয়েন্ট অ্যান্সেস্ট্রাল সাউথ ইন্ডিয়ান জিন বহনকারী।

এখানে প্রশ্ন জাগে, যদি রাখিগড়ির পুরুষ আই৪৪১১(I411)কে গবেষণাপত্রে রাখা হত তবে হরপ্পান তথা ভারতীয়দের পূর্বপুরুষ নীলগিরির ইরুলা জনগোষ্ঠী না ইন্ডাস ক্লাইন হত?

ইন্ডাস ক্লাইন ও হরপ্পানদের পাশে সরিয়ে অন্যদিকে তাকাই। রাখিগড়ি গবেষণাপত্রে বলা ছিল মেহেরগড়ে আনাতোলীয় কৃষকদের ছাড়াই স্বাধীনভাবে কৃষিকাজ শুরু হয়েছিল। তবে মেহেরগড়ে প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন গম ও বার্লি বীজে কৃষিকাজ শুরু হলেও পরবর্তীকালে ব্যবহার হত সেই আনাতোলীয় উচ্চফলনশীল বীজ। এই বীজ এলো কবে? কাদের মাধ্যমে?

জন লুকাসের বক্তব্য অনুযায়ী ৬০০০ পূর্বাব্দের আর ৪৬০০ পূর্বাব্দের মেহেরগড়ের জনগোষ্ঠী ভিন্ন ছিল। তার অর্থ ৪৬০০ পূর্বাব্দের কিছু আগেই নতুন জনগোষ্ঠী মেহেরগড়ে এসেছিল। সম্ভবত এরাই আনাতোলিয়ার উচ্চ ফলনশীল বীজ নিয়ে এসেছিল। ডেভিড রাইখের ২০১৮ গবেষণাপত্রে এই সম্ভাবনার কথা, নির্দিষ্ট তথ্যের অভাবে, জোর দিয়ে বলা নেই। ডেভিড রাইখের মতে ৬৫০০ পূর্বাব্দের ইউরোপের মত বিশাল সংখ্যায় আনাতোলীয় কৃষকরা ভারতে হয়ত আসেনি। তবে অল্প লোকসহ ও অন্যভাবে শস্যবীজ আসতেই পারে। সেই অল্প লোকদের পরিচয় কি? যেহেতু প্রাচীন তাই ভারতীয় পূর্বপুরুষ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এদেরও কোনো ভূমিকা আছে কি?

উপরে আলোচিত তথ্যাবলীর সারমর্ম অনুযায়ী ইরান-সম্পর্কিত জনগোষ্ঠী ভারতের উত্তর পশ্চিমাংশে ১২ হাজার বৎসর আগে প্রবেশ করে। কালক্রমে তারা অ্যানসিয়েন্ট অ্যান্সেস্ট্রাল সাউথ ইন্ডিয়ানদের সাথে মিশ্রিত হয়। ৬০০০ পূর্বাব্দে মেহেরগড়ে কৃষিকাজ শুরু হয়। ৪৬০০ পূর্বাব্দে মেহেরগড়ে একটি ভিন্ন জনগোষ্ঠীর আবির্ভাব হয়। এই নতুন গোষ্ঠীর সাথে হরপ্পা শহরের কবরের লোকের মিল আছে। ১২ হাজার বৎসর আগে আসা ইরান-সম্পর্কিত জনগোষ্ঠী ৮ হাজার বৎসর আগের গঙ্গা অববাহিকার লোকের সাথে সম্পর্কহীন হলেও ১৬০০ পূর্বাব্দের ইনামগাঁও-এর ও ২৬০০ পূর্বাব্দের রাখিগড়ির লোকের সাথে সম্পর্কিত। অর্থাৎ ইরান-সম্পর্কিতরা দক্ষিণ ভারতের দিকে বিস্তার লাভ করেছিল অতি ধীর গতিতে। গঙ্গা অববাহিকার দিকে বিস্তার নিয়ে কোনো তথ্য নেই। পূর্ব ভারত এই আলোচনায় আদৌ আসেনি। ৪৬০০ পূর্বাব্দে আসা জনগোষ্ঠীর তথ্যও অজানা। আনুমানিক ২০০০ থেকে ১৫০০ পূর্বাব্দে ইয়োরেশীয় স্তেপে থেকে লোকদের আগমন ও উত্তর ভারতীয়দের সাথে মিশ্রণ উপরে উল্লিখিত তিনটি জেনেটিক গবেষণাপত্রেই রয়েছে।

এই অবস্থায় শুধুই ইরান-সম্পর্কিত-মিশ্রিত জনগোষ্ঠীকেই সমগ্র ভারতবাসীর পূর্বপুরুষ আখ্যা দেওয়া যায়?


২০২৪-এর প্রিয়া মুরজানীদের গবেষণাপত্র

 
২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গবেষক প্রিয়া মুরজানী, এলিস কোরানডাফ ও সহযোগীদের একটি গবেষণাপত্র বিজ্ঞানপত্রিকা দপ্তরে জমা পড়েছে, প্রি-প্রিন্ট কপি, এখনও পিয়ার–রিভিউ হয়নি। তথাপি ভারতে প্রচারের আলো দেখে তৎক্ষণাৎ। প্রিয়া মুরজানী ডেভিড রাইখের ২০১৯-এর গবেষণাপত্রেও ছিলেন।


এই গবেষণার তথ্যের উৎস ছিল ভারত সরকারের উদ্যোগে গঠিত জেনোম ভাণ্ডার। এতকাল গোটা পৃথিবীতেই জিন গবেষণার প্রয়োজনীয় তথ্যভাণ্ডার ছিল ইউরোপ ও আমেরিকার ‘থাউজেন্ড জেনোম’ সহ আরো কয়েকটি তথ্য ভাণ্ডার। সমস্যা ছিল এগুলোতে এশিয়া বা আফ্রিকার জেনোম খুব কম থাকত। এই অসুবিধা দূর করতে এবং আমেরিকান-ইয়োরোপীয় তথ্যভাণ্ডারের নির্ভরশীলতা কমাতে ভারত সরকার একটি বিকল্প জেনোম ভাণ্ডার গড়ার কাজে হাত দেয়। ভারতীয়দের চিকিৎসার কাজেও এই তথ্য ভাণ্ডার হবে এক বিশাল হাতিয়ার। অধ্যাপক থঙ্গরাজ নমুনা হিসাবে জানাচ্ছেন, ভারতীয়দের কম বয়সে হার্ট অ্যাটাকের জন্য দায়ী মিউটেশন এমওয়াইবিপিসি৩ (MYBPC3), প্রাণঘাতী চর্মরোগের মিউটেশন এলএমবি৩(LAMB3) যা রয়েছে ৪ শতাংশ মাদুরাইবাসীর মধ্যে, অথচ বৈশ্বিক জেনোম তথ্য ভাণ্ডারে নেই। এই গবেষণায় ব্যবহৃত জেনেটিক তথ্য ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিকেল রিসার্স থেকে অনুমতি পাওয়া। এই জেনোম বিশ্লেষণের কাজ সবটাই হয়েছে ব্যাঙ্গালোরে।

ভারতের অধিবাসী, বয়স ষাটের বেশি, এমন ২৭৬২ জনের জেনেটিক তথ্য নিয়ে গড়া ভারত সরকারের তথ্য ভাণ্ডার নিয়েই মুরজানীদের এই গবেষণা। এই ২৭৬২জন ভারতের প্রতিটি রাজ্যের ভাষাগোষ্ঠী জাতি ও জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে। অবশ্যই ভারতের ৫০০০ নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর আক্ষরিক অর্থে প্রতিটিকে প্রতিনিধিত্ব করে না, তবে প্রধান গোষ্ঠীগুলোকে করে।

মুরজানীদের গবেষণাপত্রে নিয়েন্ডারথল ও ডেনিসোভান জিনের কথা:

এই গবেষণাপত্র জানাচ্ছে আফ্রিকা থেকে আধুনিক মানুষরা ৬০-৭০ হাজার বৎসর আগে আসেনি। ৫৩,৯৩২ বৎসর আগে এসেছিল। ৭৪ হাজার বৎসর আগের টোবা আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরণের আগে ও পরের স্যাপিয়েন্স ব্যবহৃত হাতিয়ার ভারতে পাওয়া গেলেও তাদের জেনেটিক কোনো চিহ্ন বর্তমান ভারতবাসীদের মধ্যে নেই।

বার্কলের এই গবেষণাপত্র অনুযায়ী ভারতীয় পূর্বপুরুষের জনবিন্যাস তত্ত্ব আগেকার ডেভিড রাইখদের বর্ণিত জনবিন্যাসের কিছুটা সমর্থন করলেও অনেকটাই বিরোধও করে। এবার বৃহত্তর জনসংখ্যার ডি.এন.এ তথ্য ও উন্নততর সফ্টওয়ারের দৌলতে যোগ হয় বেশ কিছু নতুন তথ্য। সেই নতুন তথ্যে প্রথমেই পাই, ভারতীয়দের মধ্যে নিয়েন্ডারথল ও ডেনিসোভন অ্যান্সেস্ট্রি রয়েছে। নিয়েন্ডারথল জিন ১-২ শতাংশ হলেও বৈচিত্র্যে তাবৎ নিয়েন্ডারথল, জেনোমের ৯০ শতাংশই ভারতীয়দের মধ্যে রয়েছে। যেহেতু ভারতে নিয়েন্ডারথল, ডেনিসোভান দেহাবশেষ একেবারেই নেই তাই বিজ্ঞানীদের আলাদা ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে।

(১) নিয়েন্ডরথল ও ডেনিসোভান দেহাবশেষ পাওয়া না গেলেও তারা ভারতেই ছিল এবং সেই প্রাচীন মানবরা ভারতের প্রাচীন শিকারি-সংগ্রাহক পূর্বপুরুষদের সাথে মিলিত হয়েছে।

(২) পরবর্তীকালে প্রাচীন শিকারি-সংগ্রাহক পূর্বপুরুষদের জিনের হারের ভিন্নতা আধুনিক ভারতীয়দের মধ্যে এই প্রাচীন মানবদের জিনের হারকেও নিয়ন্ত্রণ করেছে।

(৩) পরবর্তীকালে ভারতের সামাজিক-বৈবাহিক সম্পর্কহীন বিচ্ছিন্নতার প্রথাই প্রাচীন মানবদের জিন বৈচিত্র্যকে টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে।

(৪) পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতে ডেনিসোভান জিনের হার সর্বাধিক। তারপরেই আসবে দক্ষিণ ভারত। তুলনায় উত্তর ভারতে ডেনিসোভান জিন খুবই কম। দক্ষিণ ভারতের তুলনায় উত্তর ভারতের পূর্বপুরুষে প্রাচীন-শিকারি-সংগ্রাহক জিনের হার কম থাকায় তাদের মধ্যে প্রাচীন মানবদের জিনও কম।

(৫) উত্তর-পূর্ব ও পূর্ব ভারতে ডেনিসোভানরা দুই দফায় মিলিত হয়েছিল। দক্ষিণে কিন্তু একবারই।

(৬) উত্তর-পূর্ব ভারতের ডেনিসোভান জিনের উৎস পূর্ব এশিয়া। পূর্ব ও দক্ষিণ ভারতের ডেনিসোভান জিনের উৎস আলাতাই পার্বত্য এলাকা। 

বার্কলে গবেষণাপত্র অনুযায়ী ভারতীয় পূর্বপুরুষের স্তরবিন্যাস:


(১). প্রাচীন ভারতীয় শিকারি-সংগ্রাহক:

হাজার হাজার বৎসর যাবত ভারতবর্ষে বাস করা এই জনগোষ্ঠীর সাথে আন্দামানি শিকারি-সংগ্রাহকরা দূরসম্পর্কে সম্পর্কিত।

(২) ৪৭০০ ও ৩০০০ সাধারণ পূর্বাব্দ:

ইরানি কৃষক জনগোষ্ঠীর ভারতে প্রবেশ। এই জনগোষ্ঠী লুকাসের ও রাইখের অনুমান-প্রসূত তবে পরিচিত অজানা ছিল। এরা প্রারম্ভিক নব্যপ্রস্তরযুগীয় সারাজম এলাকার জনগোষ্ঠী। সারাজম, অ্যানিউ ও নামজাগা -কাছাকাছি এই প্রত্নক্ষেত্রগুলির জেনেটিক তথ্য যাচাই করেই নিশ্চিত করা গেছে, ভারতে এসেছিল সারাজমের লোকেরাই। সারাজমে একটি দেহাবশেষে ভারতীয় জিনের অস্তিত্ব পাওয়া ছাড়া হরপ্পা সভ্যতার গয়না এবং শাঁখা সারাজমবাসীদের কবরে পাওয়াতে নিশ্চিত যে সারাজম ও ভারতের যোগাযোগ ছিল।

(৩) ইন্দাস পেরিফেরি ক্লাইন:

প্রাচীন শিকারি-সংগ্রাহক ও ইরানি কৃষক জনগোষ্ঠী মিলনে সৃষ্ট। কিন্তু এদের কোনো প্রত্নপ্রমাণ ভারতে নেই। এদের অস্তিত্ব শুধুই ভারতের বাইরে পাওয়া ১১টি দেহাবশেষের ডি.এন.এ.-তে সীমাবদ্ধ।

(৪) ইউরেশিয়ান স্তেপের পশুপালকরা:

এরা ১৯০০ থেকে ১৫০০ সাধারণ পূর্বাব্দে ভারতে প্রবেশ করে। ৩০০০ সাধারণ পূর্বাব্দ নাগাদ মধ্য ইউরেশিয়ান স্তেপে থেকে নানা দিকে ছড়িয়ে প’ড়ে কালক্রমে তারা ভারতে প্রবেশ করে। (এই পশ্চিম ইউরেশিয়ান স্তেপেবাসীদের সামাজিক পরিচিতি নিয়ে ডেভিড রাইখ বলেছিলেন, ‘যারা এসেছিল তারা নয়, তাদের পূর্বপুরুষরা পশুপালক ছিলেন।’)

(৫) অ্যান্সেস্ট্রাল সাউথ ইন্ডিয়ান:

ভাষা দ্রাবিড়। প্রাচীন ভারতীয় শিকারি-সংগ্রাহক জনগোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কিত। দক্ষিণ ভারতের প্রাচীন ভারতীয় শিকারি-সংগ্রাহক ও ইন্দাস ক্লাইনের মিলনে সৃষ্ট। পশ্চিম ইউরেশীয় স্তেপের থেকে আগতদের সাথে জেনেটিক সম্পর্ক ক্ষীণ।

(৬) অ্যান্সেস্ট্রাল নর্থ ইন্ডিয়ান:

ভাষা ইন্দো-ইউরোপীয়। ইন্দাস ক্লাইন ও পশ্চিম ইউরেশিয়ান স্তেপের পশুপালক জনগোষ্ঠীর মিলনে সৃষ্ট। পশ্চিম ইউরেশীয় স্তেপ থেকে আগতদের সাথে জেনেটিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ।

(৭) আধুনিক ভারতীয় তথা ইন্ডিয়ান ক্লাইন:

ভাষাগতভাবে ইন্দো-ইউরোপীয় অথবা দ্রাবিড় ভাষী। অ্যান্সেস্ট্রাল সাউথ ইন্ডিয়ান ও অ্যান্সেস্ট্রাল নর্থ ইন্ডিয়ান মিলনে সৃষ্ট।

(৮) পূর্ব-মধ্য ভারতীয়:

পূর্ব ও আংশিক মধ্য ভারতীয় অস্ট্রো-এশিয়াটিক ও ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষী। প্রধানত ওড়িশাবাসী। এরা প্রধানত অ্যান্সেস্ট্রাল সাউথ ইন্ডিয়ান ঘেঁষা।

(৯) পূর্ব এবং উত্তর-পূর্ব ভারতীয়:

অ্যান্সেস্ট্রাল সাউথ ইন্ডিয়ান, তার সাথে কিছুটা প্রধানত পূর্ব-এশীয় জিন মিশ্রিত।

সমগ্র ভারতের জনবিন্যাসের কাঠামো:

ভারতের ভৌগোলিক এলাকার সাথে তাল মিলিয়ে জনসমষ্টি কাঠামোতে দৃশ্যমান মূলত তিনটি প্রধান জনগোষ্ঠী।


(১) উত্তর ভারতীয় পূর্বপুরুষ ও দক্ষিণ ভারতীয় পূর্বপুরুষ মিশ্রণে: ইন্দো-ইয়োরোপীয় দ্রাবিড় ভাষী ইন্ডিয়ান ক্লাইন। এই ইন্ডিয়ান ক্লাইন জেনেটিকালি আন্দামানের শিকারি সংগ্রাহকদের সাথে দূর সম্পর্কে সম্পর্কিত প্রাচীন ভারতীয় শিকারি-সংগ্রাহক, এবং ইরানি কৃষক ও স্তেপে পশুপালকদের জিন বহন করছে।

(২) মধ্য ও পূর্ব ভারতে (প্রধানত ওড়িশা) আছে দক্ষিণ ভারতীয় পূর্বপুরুষ ঘেঁষা অস্ট্রো-এশিয়াটিক ও ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষী জনগোষ্ঠী।

(৩) পূর্ব উত্তর-পূর্ব ভারত: এখানকার বাসিন্দারা প্রধানত পূর্ব-এশীয়দের সাথে সম্পর্কিত। পশ্চিমবাংলার তথ্য বলছে এখানে পূর্ব-এশীয় জিন প্রায় ১০ শতাংশ।

মুরজানীর গবেষণাপত্রের আলোচনা:

(১) বসন্ত সিন্ধে, ডেভিড রাইখের বলা ১২ হাজার বৎসর আগের ইরান-সম্পর্কিত মানুষের আগমনের কোনো উল্লেখই নেই মুরাজানীর গবেষণায়।। অথচ বসন্ত সিন্ধে-ডেভিড রাইখ রাখিগড়িতে সেই জিন পেয়েছিলেন। তাহলে কোথায় গেল সেই জেনেটিক তথ্য? সেটা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য হল কেন? প্রসঙ্গত মুরজানি রাখিগড়ি গবেষণায় যুক্ত ছিলেন না। কিন্তু সেটা তো তথ্য অস্বীকার করার কারণ হতে পারে না।

(২) ৪৭০০ পূর্বাব্দের অজানাদের এখানে সারাজমের ইরানী কৃষক বলা হয়েছে। এবং তাদেরই মূলত ভারতের প্রধান বহিরাগত পূর্বপুরুষ গোষ্ঠী বলা হয়েছে। কিন্তু সারাজমের ডি.এন.এ. ডেভিড রাইখ আগেই বিশ্লেষণ করেছিলেন। তখন এসব কথা ওঠেনি। যদিও সেই বিশ্লেষণ তথ্য নিয়েই মুরজানী কাজ করেছেন এবং নতুন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি সারাজমবাসীদের ভারতীয়দের পূর্বপুরুষ অভিধা দিচ্ছেন কারণ তিনি তাঁর ভারতীয় জেনোম ভাণ্ডারে থাকা নানা এলাকার লোকের ডি.এন.এ-তে পেয়েছেন বিশেষ কয়েকটি মিউটেশন যা সারাজমবাসীদের মধ্যেও পাওয়া গিয়েছিল। হ্যাঁ সারাজম বাসীদের সাথে ভারতীয়দের জেনেটিক মিল ঐ কয়েকটি মিউটেশনেই সীমাবদ্ধ। অবশ্যই সরাসরি জিন বিনিময় না হলে সারাজমের একাধিক মিউটেশন ভারতীয়দের মধ্যে আসার কথা না। তবু এটাও সত্য জেনেটিক মিউটেশন পেলেই তারা পূর্বপুরুষ-উত্তরপুরুষ সম্পর্কিত হয়ত হয় না।

সারাজমের বাসিন্দারা তুর্কমেনিস্তান থেকে এসে সারাজমে বসবাস করতে থাকে। সারাজম পরিত্যক্ত হয় ভারতের হরপ্পা সভ্যতার অবনতিকালেই। বর্তমানের তুর্কমেনিস্তানে, কিছুটা লৌকিক বিশ্বাসে, অনুমান করা হয় সারাজম পরিত্যক্ত হয়েছিল আর্য আক্রমণে। শেষের দিকে সারাজমের অর্থনৈতিক দূরবস্থা বাড়তে থাকলে শহর ত্যাগ করে লোকেরা তুর্কমেনিস্তানেরই অন্য এক শহরে চলে যায়। সর্বোচ্চ তিন হাজার বাসিন্দার ছোটো শহর গঠনের প্রাক্কালে কতলোক ভারতে চলে আসবে যে গোটা ভারতের পূর্বপুরুষের মর্যাদা তারা অর্জন করে ফেলবে? সারাজম থেকে সরাসরি মেহেরগড়ের দিকে যাবার পথ নেই। সারাজম থেকে কাছে উত্তর পাঞ্জাব পাখতুনখোয়া। ঐ দিকে শেরি-খান-তারকাই প্রত্নক্ষেত্রের সাথে ইরানের অ্যানিউ ও নামজাগা নব্যপ্রস্তরযুগের সাংস্কৃতিক মিল দেখা গেছে। কাজেই সারাজমবাসীরাও ঐ পথেই আসবে। শেরি-খান-তারাকাই প্রত্নক্ষেত্রের সাথে হরপ্পা সভ্যতার কোনো যোগসূত্র পাওয়া যায়নি। লুকাসের মতে মেহেরগড়ে নতুন জনগোষ্ঠীর আগমন ৪৬০০ পূর্বাব্দে। আফগানিস্তান উত্তর পাঞ্জাব হয়ে সারাজমবাসীরা মেহেরগড়ে এসে মেহেরগড়বাসীকে প্রতিস্থাপিত করতে কত সময় লাগার কথা?


(৩) ভারতের প্রাচীন শিকারি-সংগ্রাহকদের সরাসরি কোনো ডি.এন.এ না পেলেও ভারতীয়দের মধ্যে থাকা পূর্বপুরুষেয় জিন থেকে তাদের পৃথক অস্তিত্বের কথা জানা সম্ভব হয়েছে। এখন জেনেটিক গবেষণার সফ্টওয়্যারের প্রভূত উন্নতির দরুন সরাসরি রেফারেন্স ছাড়াও একটি ভিন্ন জনগোষ্ঠীর ধারনাকে গ্রহণযোগ্য করে তোলা সম্ভব হচ্ছে।

(৪) আন্দামানের “ওঙ্গে” বা অন্য শিকারি-সংগ্রাহকদের ভারতের পূর্বপুরুষের প্রাচীন শিকারি সংগ্রাহকদের সাথে দূর-সম্পর্কিত বলা হয়েছে।

(৫) পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারত নিয়ে আলোচনা আছে। তবে সে আলোচনার সবকটি তথ্য ঠিক মনোমত হয়েছে এমনটা বলা গেল না।

(৫.১) মুরজানীর মতে অসমে পূর্ব-এশীয় জিনের হার বৃদ্ধি ঘটেছে মাত্র ২০০ বৎসর আগে ইংরেজ শাসনকালে। মুরজানী তার ব্যাখ্যায় বলছেন অসমে চা-বাগিচা শ্রমিক হিসাবে বিপুল পরিমাণে পূর্ব-এশীয়দের আনা হয়েছিল ঐ সময়ে। এটি ঐতিহাসিক ভ্রান্ত তথ্য। প্রকৃত ঘটনা হল চা-বাগিচা শ্রমিকরা পূর্ব-এশীয় নয়, তারা ছোটো নাগপুর এলাকার অস্ট্রো-এশিয়াটিক।(এখন তারা সংখ্যায় প্রায় আট লক্ষ।) দুটো ওয়াই হ্যাপ্লোগ্রুপই ওএম হলেও জেনেটিক গবেষণাপত্রে অস্ট্রোএশিয়াটিক ও পূর্ব-এশীয় গুলিয়ে যাওয়াটা অবিশ্বাস্য।

(৫.২) পশ্চিমবাংলায় পূর্ব-এশীয় জিনের আধিক্য ঘটে ৫২০ সাধারণাব্দে।

মুরজানীদের ব্যাখ্যা: ঐ সময়ে গুপ্ত সাম্রাজ্যের দুর্বলতার দরুন পূর্ব-এশীয়রা বাংলায় প্রবেশ করতে থাকে।

৫২০ সাধারণাব্দ জেনেটিক মিশ্রণের কাল হলে পূর্ব-এশীয় অনুপ্রবেশ হতে হবে তার এক দেড়শ বৎসর বা আনুমানিক ৩৫০ থেকে ৪৫০ সাধারণাব্দে। সে সময়ে গুপ্ত সাম্রাজ্য কিন্তু ক্ষমতার তুঙ্গে। এমনকি সরাসরি ৫২০ সাধারণাব্দেও হূণ বিজয়ী গুপ্ত সাম্রাজ্যের সম্রাট নরসিংহগুপ্তের গুপ্ত সাম্রাজ্য খুব কিছু দুর্বল ছিল না।

মুরজানী এই ৫২০ সাধারণাব্দ পেয়েছেন জেনেটিক প্রজন্মের হিসাব থেকে। তিনি জেনেটিকালি ৫০ প্রজন্ম পেয়ে প্রতিটি প্রজন্ম ২৮ বৎসর ধরে গুনেছেন ১৪০০ বৎসর। এবার বর্তমান থেকে ১৪০০ বৎসর অতীত হল ৬২৪ সাধারণাব্দ। সম্ভবত একেবারে টাইপের ভুলে ১০০ বৎসর কমে ৬২৪ হয়ে গেছে ৫২০সাধারনাব্দ। এবার বাংলার ইতিহাসে ৬২৪ সাধারণাব্দ উল্লেখযোগ্য বৎসর নয়। কিন্তু একটি মতে রাজা শশাঙ্কের শাসনকাল ৫৯০ থেকে ৬২৫ সাধারণাব্দ। মোটামুটি এরই কাছাকাছি সময়ের নিধনপুর তাম্রশাসনের সূত্রে বলা হয় বাংলার তৎকালীন রাজধানী কর্ণসুবর্ণ কামরূপ-রাজা ভাষ্করবর্মনের অধীনে ছিল। কর্ণসুবর্ণ কতদিন ভাষ্করবর্মণের অধীনে ছিল সেটা এখানে জরুরি নয়। যেটা বোঝা যায়, কামরূপ থেকে মুর্শিদাবাদ – এই বিশাল ভুখণ্ড ভাষ্করবর্মন রাতারাতি জয় করেননি বা হাতছাড়াও হয়নি। বিশেষ করে শশাঙ্কের পরের অরাজকতায় কামরূপীয় প্রভাব কতটা ও কতকাল বজায় ছিল সেটা আমাদের অজানা। তবে এটুকু অনুমান করা যায় সেই সময়ে কামরূপের পূর্ব-এশীয় জনগোষ্ঠীর পক্ষে বাংলার এক বিরাট অংশে ভালো রকম প্রভাব ফেলা সহজ ছিল। সেই অবকাশে বাংলার মানুষ আর কামরূপের পূর্ব-এশীয়দের মিশ্রণের সম্ভাবনা যথেষ্ট বেশি থাকছে। তারই ফলে মুরজানীরা পশ্চিমবাংলার জিনে ১০শতাংশ পূর্ব-এশীয় জিন পেলেন।

বাংলায় আরেকটি সম্ভাব্য পূর্ব-এশীয় প্রবেশপথ আরাকান থেকে; আরাকানের সমুদ্রপথ অথবা সিলেটের সমতল ও চট্টগ্রামের পার্বত্যপথ হয়ে। আনন্দচন্দ্র শিলালিপি অনুযায়ী ৩৫০ থেকে ৬০০ সাধারণাব্দে আরাকান রাজত্বে শক্তিশালী ভারতীয় চন্দ্রবংশ, রাজধানী ভেসালি (বৈশালী)। আরাকানের জনবসতি প্রধানত ছিল মগধ তথা বিহার থেকে যাওয়া মানুষদের। গোটা আরাকানে পূর্ব-এশীয়দের বিশেষ কোনো অস্তিত্বই ছিল না। দক্ষিণ মিয়ানমার ছিল অস্ট্রো-এশিয়াটিক মন জাতির, এবং কিছু দক্ষিণ ভারতীয় অভিবাসীর বাসস্থান। মধ্য ও উত্তর মিয়ানমারে পিউ নগর এবং রাজ্যগুলোও ভারতীয় হিন্দু ও বৌদ্ধ সংস্কৃতির প্রভাবাধীন। সেখান থেকে ভারতে প্রবেশ করলেও তা হবে অতি সীমিত এবং অসমে-মনিপুরে; বাংলায় না।

এই গবেষণাপত্রে পশ্চিমবাংলার জনবিন্যাস নিয়ে সামান্য হলেও উল্লেখ আছে। তবে পূর্বপুরুষের জিনের হার বিষয়ে পশ্চিমবাংলাকে আলাদা না দেখিয়ে পূর্বভারতের হিসাব দেখানো আছে। পূর্ব ভারতে স্তেপে জিনের হার দেখানো আছে আনুমানিক ০.১৭৫ শতাংশ। প্রাচীন ভারতীয় শিকারি সংগ্রাহকদের জিনের হার অনেকটাই বেশি; ০.৪৫-০.৫০ শতাংশ। আর সারাজম জিনের হার বলা হয়েছে ০.৪ শতাংশ। তবে আলাদা করে উল্লেখ নেই অস্ট্রোএশিয়াটিক জিনের মিশ্রণ নিয়ে। অস্ট্রোএশিয়াটিক মিশ্রণ সম্ভবত যতটা মিথ ততটা সত্য নয়। পশ্চিমবাংলার সামাজিক ভেদের কথা ভাবলে সেই মিশ্রণের সম্ভাবনা ক্ষীণই মনে হবে।

তথ্যসূত্র:-

  1. David Reich, Nick Paterson, Bonnie Berger, Prya Moorjani, Lalji Shing, Kumarasamy Thangaraj, Periasamy Govindaraj, Po-Ru Loh, ,: “Genetic Evidence for Recent Population Mixer in India”:  published in The American Journal of Human Genetics 93, Sepetember3, 2013
  2. Vasant Shinde, Neeraj Rai, Vageesh Narashimhan, Kumarsamy Thangaraj, David Reich et al.: “An Ancient Harappan Genome lacks Ancestry from Steppe Pastoralists or Iranian Farmer”. :Published in CELL.  (https//doi.org/10.1016/j.cell.2019.08,048)
  3. Brian A Hemphill, John R Luckas, K A R Kennedy: “Biological Adaptations and Affinities of Bronze Age Harappans”.:       Harappa Excavations 1986-1990 Edited by Richard H Meadow, Prehistory Press Madison, Wisconsin.
  4. David Reich: Various comment in an interview with Economic Times News. Oct 12, 2019.
  5. Sandhya Ramesh: A massive genetic study tells us about Indians’s Ancestry and perplexing presence of Neanderthals in it.: The Print 7th March 2024.
  6. Elise Kerdoneuff, Prya Moorjani, Sarmistha Dey, A.B. Dey, Nick Patterson, Wei Zhao , Yuk Yee Lueng, Jinkook Lee, Jenifer A Smith, Andrea Ganna, Sharon L R  Kadria, :   “50,000 Years of Evolutionary History of India: Insights from 2700 Whole Genome sequences.”: Department of Molecular & Cell Biology , University of California, Barkley, USA.
  7. ABP News Bureau: Who were the original Indians? There is a mystery angle to our evolutionary history. New study suggests.
  8. Times Now Digital: India Completes Sequencing 10,000 Human Genomes; here’s why Genome Sequencing Is Important For Us.
  9. Michael Price: Where Did The Indian People Come From? Massive Genetic study reveals surprises. : SCEINCE 4th March 2024.

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।