সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

নদীয়াভাগ: স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি

নদীয়াভাগ: স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি

লিপিকা ঘোষ

জুলাই ৩১, ২০২১ ৬২০ ১৯

নীল কমিশনের সামনে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে নদীয়ার চাষি হাজি মোল্লা বলেছিলেন- ‘ভিক্ষা করে খাব তবু নীল বুনব নি’। দিনু মণ্ডল বলেছিলেন- ‘আমার গলা কেটে ফেললেও নীল বুনব না’। নীলকর সাহেবদের মধ্যে এই নদীয়ার নিরক্ষর, সহজ, সরল চাষিদের ঠকানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল সেই ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই। নীল বিদ্রোহের সময় জেলার হিন্দু মুসলমান চাষিরা একজোট হয়ে সিপাহী বিদ্রোহের নিভে যাওয়া মশাল নতুন করে জ্বালিয়েছিলেন। জেলার মালিয়াপোতার খ্রিস্টান চাষিরাও একজোট হয়েছিল নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধে। ১৮০০ থেকে ১৮৬০ এর মধ্যে মোট তিনটি ধাপে বিদ্রোহ করে সারা বাংলার নীলচাষীদের জাগিয়ে তুলেছিল। জেলার গ্রাম্য নিরক্ষর চাষিরা দেখিয়ে দিয়েছিল তারা ইতিহাস পড়তে না জানলেও ইতিহাস গড়তে জানে। পরাধীন ভারতের অবিভক্ত বাংলার কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, রানাঘাট, কৃষ্ণনগর মহকুমা নিয়ে তখন বিরাট নদীয়া জেলা।

শুধু নীলবিদ্রোহ নয় জেলার আনাচে কানাচে স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস ছড়িয়ে আছে। কুষ্টিয়ার যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় বিপ্লবী তৈরির কারখানা গড়েছিলেন জেলার বিভিন্ন প্রান্তে পাঠাগার, অনুশীলন সমিতির আড়ালে। বাঘাযতীন বাঘের সঙ্গে শুধু লড়াই করেননি, বাঘমারা হাতের ভারি থাপ্পরে একাধিক ব্রিটিশের চোয়াল ভেঙ্গেছেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন জার্মানের কাছ থেকে তিন জাহাজ অস্ত্র আদায় করেছেন। প্রাণ দিয়েছিলেন দেশের জন্য বুড়িবালামের তীরে ব্রিটিশ পুলিশের সঙ্গে লড়াই করে- সে কথা সবার জানা। কৃষ্ণনগরের বীণা দাস ১৯৩২-এর ৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতার সেনেট হলে ভাষণরত গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাক্সনকে উদ্দেশ্য করে গুলি চালিয়েছেন। বঙ্গ ভঙ্গ আন্দোলন, আইন অমান্য আন্দোলনও কৃষক আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে। এই জেলার সঙ্গে ছিল সুভাষ চন্দ্র বসুর সঙ্গে প্রাণের যোগ। ১৯৩২ এ বড় আন্দুলিয়ার সভায় মহিলারা তাঁর হাতে সোনার গয়না তুলে দিয়েছে। পরাধীন ভারতের অবিভক্ত নদীয়ার হিন্দু মুসলমান কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছে নীলকরদের সঙ্গে, ব্রিটিশদের সঙ্গে। অথচ স্বাধীনতার পর ভারতের মানচিত্র থেকে এহেন নদীয়া জেলা বাদ পড়ল।

একশো নব্বই বছর পর ব্রিটিশ সরকার ভারতকে স্বাধীনতা দেবার পরিকল্পনা করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি ব্রিটিশের ভিতকে তখন নড়বড়ে করে দিয়েছে। ক্রমাগত রাজনৈতিক চাপে পড়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এটলী ১৯৪৭ এর ২০ ফেব্রুয়ারি ঘোষণা করলেন, যাই ঘটুক না কেনো ১৯৪৮ এর জুনের মধ্যে ভারতকে স্বাধীনতা দেওয়া হবে। এমন কি ঐ সময়ের মধ্যে ভারতীয় রাজনীতিকরা সংবিধানের ব্যাপারে একমত না হতে পরলেও তারা ভারত ছাড়বে। এটলীর ঘোষণার ৩৪ দিন পরে লর্ড ওয়েভেলের জায়গায় লুই মাউন্ট ব্যাটনকে ভারতের বড়লাট পদে আনা হল দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্যই। দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তরের সিদ্ধান্তের প্রকৃত কারণ ভেবে দেখার অবকাশ পায়নি ভারতীয়রা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আর্থিক ক্লেশ, নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের ক্রমাগত অভাব, দাঙ্গার পরিস্থিতি থেকে নিষ্কৃতি পাবার একমাত্র উপায় স্বাধীনতা বলে মনে হয়েছিল ভারতীয় রাজনৈতিক নেতাদের কাছে। তখনও ভারতজুড়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার দগদগে ঘায়ের অভিজ্ঞতা কেউ ভোলেনি, না হিন্দু না মুসলমান। ততদিনে ব্রিটিশরা দেশটার শরীরে সাম্প্রদায়িকতা নামক কর্কট রোগের বীজাণু ভরে দিয়েছে সুপরিকল্পিত ভাবে। মুসলিম লীগ আলাদা রাষ্ট্র দাবি করায় পরিস্থিতি জটিল হলেও সেই জট ছাড়ানোর মত যথেষ্ট সময় দেওয়া হয়নি ভারতের রাজনৈতিক দলগুলিকে। মাউন্টব্যাটেন ঘোষিত সময়ের নয় মাস আগেই ক্ষমতা হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিলেন আর জাতীয় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের নেতৃত্বের সঙ্গে ৪২ দিনে ১৩৩ বার মিটিং করলেন। দেশভাগ অবধারিত হল। বাংলা আর পাঞ্জাবের মুসলমান অধ্যুষিত এলাকা নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র হবার সিদ্ধান্তও হল। ক্ষমতা হস্তান্তরের তাড়া এমন ছিল যে ৮ জুলাই ব্রিটিশ আইনজীবী সিরিল রেডক্লিফকে এনে মাত্র পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে নতুন ত্রিখণ্ডিত ভারতের মানচিত্র তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হল। অতটা সময়ও নিলেন না তিনি। ৯ই আগস্ট বাংলা ভাগের রিপোর্ট পেশ করলেন। ভাগ্য নির্ধারিত হল লক্ষ লক্ষ বাঙ্গালীর। জাতীয় কংগ্রেস ভারতে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গড়তে চাইলেও মুসলিম লীগ পাকিস্তানে মুসলিম রাষ্ট্র গড়তে চাইল। বহু আলোচনা পর্যালোচনার পর ৪৭ এর ১৫ই আগস্ট যখন স্বাধীনতা এল তখন স্বাধীন হবার আনন্দ দেশভাগের দুঃখে চাপা পরে গেল। আর পঞ্জাব আর বাংলার লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে স্বাধীনতা হয়ে উঠল প্রহসন।

স্বাধীনতার পর ভারতের মানচিত্রে এই নদীয়া জেলা আর রইল না। সে তখন পূর্ব পাকিস্তানের। তাই পাকিস্তানের পতাকা উড়ল সারা জেলায়। বস্তুত তদানীন্তন নদীয়া জেলার পাঁচটির মধ্যে তিনটি মুসলমান অধ্যুষিত ছিল। কৃষ্ণনগর ও রানাঘাটে হিন্দু অধ্যুষিত। এখানকার হিন্দু রাজা ও জমিদাররা নিজেদের পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করতে চাননি। দেশ স্বাধীন হবার পর নদীয়াকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করা সহজ নয় জেনেও কৃষ্ণনগরের রাজা সৌরীশচন্দ্র রায়ের প্রতিনিধি দরবার করেন নতুন ভারতের গভর্নর জেনারেল সেই মাউন্টব্যাটেনের কাছেই। শুরু হল নতুন করে হিসাব। নদীয়ার তিনটি মহকুমা মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা মুসলমান অধ্যুষিত হওয়ায় পাকিস্তানে গেল, কৃষ্ণনগর ও রানাঘাট ভারতে এল। মেহেরপুর আর চুয়াডাঙ্গা মহকুমার কয়েকটি থানা হিন্দু অধ্যুষিত হওয়ায় ভারতের অন্তর্ভূক্ত হল। অবিভক্ত নদীয়ার মেহেরপুর মহকুমা থেকে করিমপুর, তেহট্ট থানাকে কৃষ্ণনগর মহকুমার অন্তর্ভুক্ত করা হল। করিমপুর ও মেহেরপুরের দৌলতপুর থানার সীমানা মাথাভাঙ্গা নদীর ধরা হল। কারণ নতুন নোটিশের নির্দেশিকায় তখন কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা (কৃষ্ণগঞ্জ থানা বাদে) ও মেহেরপুর (করিমপুর ও তেহট্ট থানা বাদে) নিয়ে গড়ে উঠল পূর্বপাকিস্তানের কুষ্টিয়া জেলা। কৃষ্ণনগর (করিমপুর, তেহট্ট থানা সহ) আর রানাঘাট মহকুমা এবং কৃষ্ণগঞ্জ থানা নিয়ে জন্ম হল নতুন নবদ্বীপ জেলার। ১৮ই আগস্ট নতুন করে ভারতে অন্তর্ভুক্ত হওয়া নবদ্বীপ জেলায় স্বাধীনতা দিবস পালিত হল। ১৯৪৮ এর ২৩শে ফেব্রুয়ারিতে ভারতের পশ্চিমবাংলার নবদ্বীপ জেলার নাম পাল্টে হল নদীয়া জেলা। আর নদীয়া থানার নাম পাল্টে হল নবদ্বীপ থানা।

স্বাধীনতার পর নদীয়া জেলা ভাগ হয়ে দুটো রাষ্ট্রে চলে যাওয়ায় তাৎক্ষনিক কিছু মানুষ স্বস্তি পেলেও নদীয়ার মেঠো-পথে ভেসে বেড়ানো বাউল আর কীর্তনের সুর দুর্ভাগ্যজনক ভাবে ভাগ হয়ে গেল। মানবতাবাদী বাউল-সাধক লালন ফকিরের কুষ্টিয়ার আখড়া আর নবদ্বীপের শ্রীচৈতন্যদেবের প্রেম-ধাম হয়ে গেল দুটি আলাদা জেলার এমন কি আলাদা রাষ্ট্রের সম্পদ। লালন ফকিরের মানবতাবাদের মোহে আকৃষ্ট হয়েছিল হিন্দু মুসলমান সবাই, মহাপ্রভু সমাজে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি গড়ে তুলছিলেন বৈষ্ণবধর্ম প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে। তাঁদের সেই সর্বধর্ম সমন্বয়ের জেলা শেষপর্যন্ত ধর্মের ভিত্তিতেই ভাগ হল।

স্বাধীনতা সারা ভারতে লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তুর জন্ম দিল পূর্বপুরুষের ভিটে ছেড়ে, জমি জায়গা ছেড়ে সামান্য সম্পদ সঙ্গে নিয়ে ‘স্বদেশ’ ছেড়ে ‘স্বদেশে’ পাড়ি দিল তারা। পথে কত লোক লুণ্ঠিত হল, মেয়েরা ধর্ষিত হল। কেউ গরুর গাড়ি, লঞ্চে বা স্টিমারে, কেউ ট্রেনে-বাসে, কেউ পায়ে হেঁটে মাইলের পর মাইল জঙ্গল পেরিয়ে এদেশে এসে পৌঁছালো। কেউ অনাহারে, কেউ রোগাক্রান্ত হয়ে মারা গেল পথের মধ্যেই। প্রিয়জনের মৃতদেহ কোলে নিয়ে আবার চলল একটু আশ্রয়ের আশায়। পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা হিন্দুরা কেউ কেউ স্থান পেল রিফিউজি ক্যাম্পে। কেউ রইল স্টেশনে, কেউ রাস্তার ধারে পরিত্যক্ত জলা জঙ্গলে। একই ভাবে ভিটে মাটি ছেড়ে মুসলমানরাও পাড়ি দিল পাকিস্তানে। দেশভাগের পর পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দুরা যখন ভারতে এল, আর মুসলমানরা ভারত ছেড়ে ‘নিশ্চিত আশ্রয়’ পাকিস্তানে গেল তখন রাষ্ট্রের কাছে তারা যতটা না মানুষ, তার চেয়ে বেশি হিন্দু বা মুসলমান।

পূর্ব পাকিস্তান থেকে যারা এই নতুন নবদ্বীপ জেলায় এল তাদের একাংশ এই জেলারই ছিল, ছিল অবিভক্ত নদীয়া জেলার মানুষ। দেশভাগ আর স্বাধীনতার প্রহসনে তারা তখন উদ্বাস্তু হল নিজের জেলায়। রাণাঘাট, ধুবুলিয়া, অশোকনগর, বিজয়গড় সহ বহু জায়গায় ততদিনে শতাধিক ক্যাম্প খোলা হল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর রানাঘাটের গোডাউনে করা হল কুপার্স ক্যাম্প, হল রূপশ্রী ক্যাম্প। জেলায় শতাধিক ক্যাম্প তৈরি হলেও তা ছিল বিপুল সংখ্যক উদ্বাস্তুর তুলনায় অকুলান।

  • ১৯৫১ সালের গণনা অনুযায়ী ১৯৪১ এর পর নদীয়ার জনসংখ্যা বেড়েছিল ৩৬.৩ শতাংশ।
  • সেখানে পরের দশ বছরে জনসংখ্যা বেড়েছিল ৪৯.৬৫ শতাংশ।
  • আবার অন্যভাবে দেখলে ১৯৪১ সালের জেলার বহিরাগতর সংখ্যা ছিল ১০৫৭৩ জন, সেখানে ১৯৫১ সালে বহিরাগতর সংখ্যা দাঁড়ায় ৪,২৬, ৯০৭ জন।
  • যদিও ১৯৪৭ থেকে ১৯৫১ সালের মধ্যে মুসলমানরা দেশত্যাগ করে ১,০,৭৫৫ জন।

এত বেশি সংখ্যক লোক এপারে এল যে জায়গার অভাবে কলকাতার শিয়ালদা স্টেশনে, পরিত্যক্ত জায়গায়। ছড়িয়ে পড়ল অন্যান্য জেলাতেও। ক্যাম্পগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণে জল, শৌচাগার, স্নানাগার না থাকায় দুরবস্থা চরমে উঠল। প্রচণ্ড গরমে আর তীব্র ঠাণ্ডায় বহু মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়লে সময়ে পর্যাপ্ত ওষুধ না পেয়ে প্রাণ হারাল হাজার হাজার মানুষ। ওপার থেকে এসে বাস্তুহারা মানুষগুলো ক্যাম্পের নারকীয় জীবনযন্ত্রণা সহ্য করতে হল। মেয়েদের জীবন হয়ে উঠল আরও দুঃসহ। সম্মানরক্ষা হয়ে উঠল দুষ্কর। সহায় সম্বলহীন মেয়েদের শেষ পর্যন্ত জায়গা হল ‘পার্মানেন্ট লায়াবিলিটি’ হিসাবে রিফিউজি ক্যাম্পে। দেশ, মাটি,  স্থাবর, অস্থাবর সব খুইয়ে তাদের কাছে স্বাধীনতার স্বাদ তখন তিক্ত। নতুন করে খণ্ড খণ্ড দাঙ্গা বাধল, একদেশ থেকে ট্রেনভর্তি লাশ পৌঁছালো আর এক দেশে। এই ছিল তাদের দেখা স্বাধীনতা।                     

অসংখ্য মানুষের কাছে তখন স্বাধীনতার অর্থ গৃহহীন, অন্নহীন, বস্ত্রহীন, নিরাপত্তাহীন, সম্পদহীন, প্রিয়জনহীন, পরিবারহীন, আব্রুহীন, ইজ্জতহীন একপদ্মা চোখের জল। তাদের স্মৃতির খাতায় রক্তের কালিতে লেখা হল-

“আমার মুখে অন্তহীন লাঞ্ছনার ক্ষত

আমার বুকে পালানোর পালানোর আরও

পালানোর দেশজোড়া স্মৃতি”।

স্বাধীনতার প্রস্তুতি পর্বে সুদূর পশ্চিম পাকিস্তান থেকে কীভাবে পূর্ব পাকিস্তান শাসন করা সম্ভব হবে এই প্রশ্নেই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করা সম্ভব হত। প্রশ্ন যে ওঠেনি তা নয়, কিন্তু প্রতিবাদ হয়নি। হলে দেশভাগের এই মর্মান্তিক সিদ্ধান্ত হয়ত তখনই ঠেকান যেত। ব্রিটিশরা প্রশাসনিক সুবিধার অজুহাত দেখিয়ে বার বার স্বার্থসিদ্ধি করেছে। ১৮৭৪ সালে বাংলাকে ভেঙ্গে আসাম প্রদেশ গড়েছে, অথচ বাংলাভাষী সিলেটকে আসামের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে। আবার ১৮৯৭ সালে লুসাই পর্বত বাংলা থেকে আসামের অন্তর্ভুক্ত করেছে। কখনও বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিকে ভেঙ্গে উড়িষ্যা, বিহারকে আলাদা প্রদেশ করেছে। কখনও ঢাকা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম আসামের অন্তর্ভুক্ত করে বাংলাকে ছোট করতে চেয়েছে। পাবনা, বগুড়া, রংপুরকে আসামের অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছে। পরে আবার রাজশাহী, দিনাজপুর, মালদা, জলপাইগুড়ি, কোচবিহারকেও আসামের সঙ্গে যুক্ত করার কথা ভেবেছে। লর্ড কার্জন মুখে প্রশাসনিক সুবিধার কথা বললেও তাঁর অভিসন্ধি ছিল “assisting Congress to a peaceful demise”। ভারত সচিব ব্রডরিককে লিখেছিলেন গোপন চিঠি –

“বাঙালি নিজেদের একজাতি বলে মনে করে এবং এমন একটা ভবিষ্যতের স্বপন দেখে যেখানে দেশ থেকে ইংরেজরা বিতাড়িত হয়েছে। … আমরা যদি দুর্বলতা বসত তাদের হট্টগোলের কাছে নতিস্বীকার করি তবে কোনোদিনই আর বাংলা হ্রাস বা বাংলা ব্যবচ্ছেদ সম্ভব হবে না। এ পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে আপনি ভারতবর্ষের পূর্ব সীমান্তে এমন একটি শক্তিকে সংহত ও সুদৃঢ় করবেন যা এখনি প্রচণ্ড এবং ভবিষ্যতে তা সু-নিশ্চিতভাবেই ক্রমবর্ধমান অশান্তির উৎস হয়ে উঠবে।“

তাই ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন লর্ড কার্জন। বাংলায় প্রবল প্রতিবাদের ঝড় উঠলে জনগণের সমর্থন পেতে ১৯০৫ সালে ফেব্রুয়ারি মাসের কঠিন শীতে মৈমনসিংহ, চট্টগ্রাম, ঢাকার গ্রামে গিয়ে সভা করেন এবং বক্তৃতা দিলেন। ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহকে ১৪ লক্ষ টাকা স্বল্প সুদে পরিকল্পনা মাফিক ধারও দিলেন। নতুন আসাম প্রদেশের নবাব করার প্রতিশ্রুতি দিলেন। যদিও ঢাকার নবাব ও তাঁর কিছু  সমর্থক ছাড়া আর কারো সমর্থন আদায় করতে পারেননি তবু ওই বছর ১৬ অক্টোবর থেকে বঙ্গভঙ্গ কার্যকরী হল। বাংলা জুড়ে হিন্দু মুসলমান একসঙ্গে আন্দোলন করলে সে যাত্রা বঙ্গ ভঙ্গ রদ করা সম্ভব হল। চট্টগ্রাম, ঢাকা, মৈমনসিংহ আসাম অন্তর্ভুক্তি থেকে বেঁচে যায় রাজা পঞ্চম জর্জের দয়ায়। তিনি ১৯১১ সালে দিল্লির দরবারে ঘোষণা করেই দিলেন ‘বাংলা ভাষাভাষীরা একসঙ্গে থাকবে’ বলে। তবু বারবার প্রশাসনিক কাজের সুবিধার অজুহাতে বাংলার একতা ভাঙ্গতে চেয়েছে ব্রিটিশ সরকার। আর ভারতের জন প্রতিনিধিরা প্রশাসনের অসুবিধা হবে জেনেও ভারত ভেঙ্গেছেন। পার্থক্য এটাই ওরা শত্রুকে দুর্বল করার জন্য দেশভাগ করেছে আর আমরা দেশভাগ করে নিজেদের দুর্বল করেছি।

ব্রিটিশরা শুধু দেশ ভাগ নয় ধর্মের ভিত্তিতে মানুষের হৃদয়ের বিভাজন করতে যে সুপরিকল্পিত চক্রান্তের পথ বার করেছিল সেই পিচ্ছিল পথে বার বার পা হড়কেছে ভারতীয়দের। হিন্দু মুসলমান জোট ভাঙ্গতে তাদের যথেষ্ট অবদান ছিল এ কথা সত্য তবে সেই সম্পর্ক মেরামতের সুযোগ যে আসেনি তা নয়, একাধিক বার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি গড়ে তোলার সুযোগ এসেছে। কিন্তু সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পারেনি তৎকালীন রাজনৈতিক দলগুলি। রবীন্দ্রনাথ পাবনা সম্মেলনে যথার্থই বলেছিলেন ‘শনি ছিদ্র না পাইলে প্রবেশ করিতে পারে না।’

চিত্তরঞ্জন দাশের আন্তরিক চেষ্টায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে দুটি সম্প্রদায়ের নেতৃত্বদের মধ্যে সম্প্রীতির সম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর অকাল প্রয়াণের পর সে সম্পর্কে ধীরে ধীরে আবার শিথিলতা এসেছে। তাঁর উত্তরসূরি জে. এম. সেনগুপ্ত বাংলাচুক্তি বজায় রাখার চেষ্টা করলেও কিছুদিনের মধ্যে তা বাতিল করতে বাধ্য হলেন কংগ্রেস কর্মীসঙ্ঘের অমতের কারণে। চিত্তরঞ্জনের মুসলমান সহযোগীরা ধীরে ধীরে সাম্প্রদায়িক দলে যোগ দিলেন। ১৯৩৭ সালে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বাংলার বিধান সভায় নির্বাচিত হলে কে পি পি কংগ্রেসের যুক্ত সরকারকে সমর্থন জানাতে চাইলে ফজলুল হকের সঙ্গে তদানীন্তন জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দ সরকার গড়তে না চাওয়ায় সেটা সম্ভব হল না। ১৯৪১ সালে সংযুক্ত সরকারে যোগদান করলেও দুই সম্প্রদায়ের নেতৃত্বের প্রবল অনিচ্ছা আর হার্বার্টের নেতৃত্বে শ্বেতাঙ্গ কর্মচারীদের ষড়যন্ত্র সে পরিকল্পনা সফল হল না।১০

চিত্তরঞ্জনের সুযোগ্য উত্তরসূরি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু সবচেয়ে শক্তিশালী অসাম্প্রদায়িক নেতা হলেও তার হঠাৎ অন্তর্ধানে ভারতের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ক্ষতিগ্রস্ত হল। তবে ১৯৪৫ এর ৫ নভেম্বর আই. এন. এ. এর বিচার শুরু হলে আবার সারা ভারত জুড়ে হিন্দু মুসলমান একসঙ্গে আন্দোলন শুরু করল। জাতীয় কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, ফরওয়ার্ড ব্লক ও কমিউনিস্ট পার্টি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আন্দোলন করল। ১৯৪৬ সালের প্রথম দিকে রশিদ আলির বিচার উপলক্ষে কলকাতায় এতটাই উন্মাদনা শুরু হল যে পুলিশের সঙ্গে মাঝেমাঝে খণ্ডযুদ্ধও হল। এতে প্রায় দুপক্ষ মিলিয়ে ৮০ জন মারা গেল, প্রায় ৩০০ জন আহত হল।১১ ভারতবর্ষের রাজনীতিকে আই. এন. এ.  যতটা প্রভাবিত করেছে, তার চেয়ে ঢের বেশি প্রভাবিত করেছে আই. এন. এ. এর বিচার। যেন দেশবন্ধু আর সুভাষচন্দ্রের স্বপ্ন আই এন এ বিচারের মধ্য দিয়ে সফল হতে চলেছে। এই সময়ের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির শিকড়ে ভর দিয়েও অখণ্ড ভারতবৃক্ষ রোপণ করার সুযোগ এসেছিল। কিন্তু এর কয়েকমাস পরে ১৬ আগস্ট কলকাতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হল কোন চক্রান্তে সে প্রশ্ন মনে আসতেই পারে। এই দাঙ্গাই  দেশভাগ নিশ্চিত করেছিল। এরপর শেষ পেরেক ঠুকেছে লর্ড মাউন্টব্যাটেনের স্বাধীনতা দেবার তাড়াহুড়ো। এক বছরের কাজ মাত্র পাঁচ সপ্তাহে শেষ করেছেন। এবারেও সেই তাড়াহুড়োর পিচ্ছিল পথে দরকষাকষি করে পা হড়কেছে জননেতারা। অবধারিত হয়েছে দেশভাগ, হয়েছে পাঞ্জাব আর বাংলার খামখেয়ালিপূর্ণ মানচিত্র। নতুন মানচিত্রের কথা ভাবতে ভাবতে মানুষ গুলো কথাই ভাবা হয়নি। কারণ রবীন্দ্রনাথের ‘ব্যাধি ও প্রতিকারে’র ভাষায় বলা যায়, “আমরা শিক্ষিত কয়েকজন এবং আমাদের দেশের বহুকোটি লোকের মাঝখানে একটা মহাসমুদ্রের ব্যবধান।“ ব্যবধান এখানেই যারা দেশভাগ করেছে তারা কেউ দেশভাগের ফল ভোগ করেনি। যারা দেশভাগের মর্মান্তিক ফলভোগ করেছে তারা দেশভাগ চাইনি। তাই শেষপর্যন্ত ভুগেছে অতিসাধারণ মানুষগুলোই।

বাংলার উদ্বাস্তুদের প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের অবহেলা এবং সরকারি কর্মচারীদের দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে  ক্যাম্পগুলিতে। নদীয়ার রানাঘাটের কুপার্স ক্যাম্পে বাড়তে থাকে অসন্তোষ। বাংলার উদ্বাস্তুদের অসন্তোষ থেকে জন্ম নিল ‘সম্মিলিত কেন্দ্রীয় বাস্তুহারা পরিষদ’। এই সুযোগে হাতছাড়া করল না কংগ্রেসের বিরোধী পার্টিগুলিও। একত্রিত হয়ে উদ্বাস্তুদের পাশে এসে দাঁড়াল আর এস পি, ফরওয়ার্ড ব্লক, সি. পি. আই. সব বামপন্থী দলগুলি। ‘৪৬ নোয়াখালী দাঙ্গার পর এদেশে পালিয়ে আসা মানুষগুলোর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেছিল যারা তারা এবারেও নদীয়ার হিন্দু উদ্বাস্তু এবং তথাকথিত সংখ্যালঘুরা একসঙ্গে মিলেমিশে বাস করতে পারে সে চেষ্টাও করল। যেসব মুসলিম পরিবার মাটির টানে এ দেশে রয়ে গিয়েছিল, তাদেরকে নিয়ে একসঙ্গে মিলে মিশে থাকতে চেয়েছে এই জেলার মানুষগুলো তখনও।

এর পর অনেক জল পদ্মা দিয়ে বয়ে গেল। ১৯৬৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানে আবার দাঙ্গা হল, আবার দলে দলে ওদেশ থেকে এদেশে হিন্দুরা এল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের কঠিন লড়াই পাকিস্তানের কাছ থেকে প্রাণের বিনিময়ে, ধর্ষণের বিনিময়ে কেড়ে আনল আর এক নতুন রাষ্ট্র, বাংলাদেশ। আবারও দলে দলে উদ্বাস্তু হয়ে এপারের বাঙলায় এল মানুষ।  উদ্বাস্তু হয়ে রাস্তায়  ঘুরল, খাদ্য-বস্ত্রের জন্য হাহাকার করল। দেশভাগের সুদূর প্রসারী ফলাফল ক্রমাগত ফলেই চলল। যে জেলায় নীলচাষীরা, স্বাধীনতা সংগ্রামীরা হাতে হাত ধরে আন্দোলন করেছে, রক্ত ঝড়িয়েছে, সেই জেলার মানুষগুলোই নিজের জেলায় উদ্বাস্তু হল। প্রবীণদের মুখে শোনা সেদিনের সেই অভিজ্ঞতার কথা কবিতার ভাষা হয়ে প্রাণে বাজে..

“বুকের ভেতর রাগ…তুলে দিই সব কাঁটাতার!

রক্ত দিয়ে মুছে দিই দেশভাগ এপার ওপার।”

এক রত্নগর্ভা মায়ের কথাই স্মরণ করা যাক, কৃষ্ণনগর বোমা মামলায় (১৯৩১) ধৃত তেহট্টের আব্দুল মান্নানের মা প্রসঙ্গত ছেলের কাজের প্রশংসা করে বলেছিলেন, “ও কাজেরও দরকার আছে, থাবা দিয়ে তো স্বাধীনতা আসে না”। হ্যাঁ, থাবা দিয়ে স্বাধীনতা আসেনি, স্বাধীনতা আনতে হাজার হাজার বীর-বিপ্লবী প্রাণ দিয়েছেন, রক্ত ঝড়িয়েছে, কখনও ফাঁসিকাঠে গলা দিয়েছেন, ঘোড়ার খুড়ের নীচে বুক পেতেছেন, পুলিশের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়েছেন আবার কখনও নারী পুরুষ নির্বিশেষে জেলের ‘থার্ড গ্রেড’এর নির্মম অত্যাচার সহ্য করেছেন, অথচ সেই স্বাধীনতা বয়ে এনেছে কাঁটাতারের আঁচড়। এই আঁচড়ে দেশ, জেলা, গ্রাম ভাগ হয়েছে। এই আঁচড় খেয়ে নদীয়ার মত আরও কয়েকটি জেলার রেডক্লিফ লাইনের দুপাশের গ্রামগুলির দূরত্ব বেড়েছে। হাহাকার আর আর্তনাদে ভাগ হয়েছে জাতি।

স্বাধীনতার কিছুদিন পর নদীয়ার চাপড়া, তেহট্ট থানার ও মেহেরপুর সংলগ্ন গ্রামগুলির মাঝে রেডক্লিফ লাইন চিহ্নিত হল। মাথাভাঙ্গা নদী এখানে সীমান্ত নির্ধারণ করেনি। সে অনেক উত্তরে করিমপুরের কাছে কুষ্টিয়া ঢুকেছে আবার অনেক দক্ষিণে নদীয়ার মাঝদিয়ার গোবিন্দপুর দিয়ে ফিরেছে। ভৈরবী নদীর পূর্বদিকে কোথাও গ্রামের, কোথাও পাড়ার, এমনকি বাড়ির মাঝ বরাবর চলে গেল কাঁটাতার! সীমান্তের এই নিম্নবিত্তের মানুষগুলোর কাছে ব্যাঘ্রসংকুল জঙ্গল, নদী আর চাষের জমি ছিল সম্পদ। ভৈরবী নদীর পাশে বেতাই এর নীলকুঠি সহৃদয় ব্যক্তি সিভিল সাহেবের ছিল। বিপদে আপদে চাষির পাশে দাঁড়ানো এই নীলকর সাহেবের উল্লেখ বসুমতী পত্রিকার সম্পাদক দীনেন্দ্রকুমার রায়ের ‘হেমন্তের পল্লী’ প্রবন্ধে পাই। স্বাধীনতার পর সিভিলসাহেবের ছেড়ে যাওয়া নীলকুঠি তখন উদ্বাস্তুদের প্রধান আশ্রয় হয়ে উঠেছিল। এর পাশেই আদিবাসীদের গ্রাম আজও ঊনবিংশ শতাব্দীর নীল বিদ্রোহকে মনে করিয়ে দেয়। নীল বিদ্রোহের সময় বাংলার চাষিরা নীলচাষ করতে অস্বীকার করলে নীলকরসাহেবরা বাংলার বাইরে থেকে আদিবাসীদের এনেছিল নীলচাষের প্রয়োজনেই। সীমান্তে রেডক্লিফ লাইনকে জিরো পয়েন্ট ধরে একশো মিটার পর্যন্ত ভারতের ‘নো ম্যান্স ল্যান্ড’এ যেসব বসতবাড়ি অন্তর্ভুক্ত হল তারা কেউ পাকিস্তানে গেল কেউ ভারতে সরে আসতে বাধ্য হল। দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে হল জমি বিনিময়, মানুষ বিনিময়।

আজও এই সহজ সরল নিম্নবিত্তের মানুষগুলি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখেছে আগের মতই- ঠিক যেমন নীল বিদ্রোহের সময়, স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় হাতে হাত ধরে ছিল একে অপরের। এই গরিব মানুষগুলোর কাছে সবচেয়ে আপন তার সাতপুরুষের ভিটে আর প্রতিবেশীর মুখ। নিম্নবিত্তের ‘নুন আনতে পান্তা ফুরান’ জীবনে তারা সব সুখ দুঃখ ভাগ করে ধর্ম বর্ণ ভুলে। এ সীমান্তের গির্জা, পীরের দরগা আর যশাইতলার মেলায় সব ধর্ম মিলে মিশে এক হয়। ন্যাংসাতলার পীরের দরগায় মুসলমানের চেয়ে হিন্দুরাই বেশি আসে, বটবৃক্ষে নয়, যেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির গোড়ায় পানি/জল ঢেলে তাকে জিইয়ে রাখার উৎসব হয়। বড়দিনের উৎসবে গির্জা সাজায় মুসলমানে। আর হিন্দুর যশাইতলার পুজো যখন ‘নো ম্যান্স ল্যান্ড’ এ হয় তখন নিরীহ মানুষগুলির সম্প্রীতির ধাক্কায় খুলে যায় সীমান্তের দরজা। দুই দেশের মানুষ শুধু উৎসবে নয় পুনর্মিলনের আনন্দে মেতে ওঠে। তখন তারা কেউ হিন্দু, মুসলমান বা খ্রিস্টান নয় তারা শুধুই মানুষ। সীমান্তের অতি সাধারণ মানুষগুলো তাদের নীরব জীবনযাপনের মধ্যদিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পতাকা বয়ে চলেছে আজও- যাদের কাছে রাষ্টের নির্দেশ সহজে পৌঁছায় না আবার তাদের চাহিদাও রাষ্ট্রের কানে পৌঁছায় না। যেমন পৌঁছায়নি তেভাগা আন্দোলনের সময় রংপুর, মৈমনসিংহের চাষিদের মিছিলের স্লোগান, “আমরা বাংলাকে ভাগ করব না। আমরা ভাই ভাইকে পরস্পর হত্যা করব না”।

প্রথমদিকে না হলেও নব্বইএর দশকের পর ডবল পিলার আর কাঁটাতারের বলয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহ দিয়ে মজবুত করা হয়েছে সীমান্ত। এখন সীমান্তের এপারে বি এস এফ ক্যাম্প, ওপারে বি জি বি ক্যাম্প, মাঝে  গ্রামগুলির দূরত্ব বেড়েই চলেছে। বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকারের ভারতমালা সড়ক পরিকল্পনা এ দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দেবে সন্দেহ নেই। চুয়াত্তর বছর ধরে দেশভাগের যন্ত্রণা ভাটিয়ালি সুর হয়ে কাঁটাতার পারাপার করে-

“বুকের ভেতরে আমি আগলে রাখি ভাঙাবুক!

ভাঙা বাংলা জোড়া লাগলে সেরে যাবে আমার অসুখ।”

দেশ জোড়া যে লাগেনি তা তো নয়! বার্লিনের প্রাচীর, দুই জার্মান! সে ইতিহাস তারা জানেও না হয়ত! শুধু সম্প্রীতির টানে মানুষগুলো যেন আজও অপেক্ষা করে আছে কাঁটাতার উপড়ে ফেলে দুই বাংলা আর একজাতির মিলেমিশে এক হবার মাহেন্দ্রক্ষণের।

তথ্যসূত্র –

১)  স্বাধীনতা সংগ্রামে নদীয়া –  কৃষ্ণনগর নাগরিক পরিষদ।পৃঃ ৬৯, ৮৪

২)  স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার নারী – পৃঃ ১২৭

৩)  স্বাধীনতা সংগ্রামে নদীয়া – কৃষ্ণনগর নাগরিক পরিষদ।পৃঃ ১৬২

৪)  আধুনিক ভারত – ডঃ সুমিত সরকার পৃঃ ৩৮৬

৫) বঙ্গভূমি ও বাঙালির ইতিহাস – ডঃ নীতিশ সেনগুপ্ত পৃঃ ৪৩০

৬) নদীয়াঃ স্বাধীনতার রজত জয়ান্তী স্মারক গ্রন্থ – নদীয়া জেলা নাগরিক পরিষদ, প্রথম প্রকাশ ১৯৭৩ পৃঃ ৬

৭) নদীয়াঃ স্বাধীনতার রজত জয়ান্তী স্মারক গ্রন্থ – নদীয়া জেলা নাগরিক পরিষদ, প্রথম প্রকাশ ১৯৭৩ পৃঃ ৬

8) প্রাগুক্ত

৯) প্রাগুক্ত

১০) বঙ্গভূমি ও বাঙালির ইতিহাস-ডঃ নীতিশ সেনগুপ্ত পৃঃ ৩৮৪

১১) প্রাগুক্ত-পৃঃ ৩৯২

টীকা-

১.- বি এস এফ- বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স

২.- বি জি বি- বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ

৩.- আই এন এ- ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি

মন্তব্য তালিকা - “নদীয়াভাগ: স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি”

  1. অসাধারণ লেখনী আপনার। পড়ে কেমন যেন মন খারাপ হলো অথচ ঐ মন খারাপটাই ভালো লাগল। সত্যিই তো,

    বুকের ভেতর আমি আগলে রাখি ভাঙাবুক
    ভাঙা বাংলা জোড়া লাগলে সেরে যাবে আমার অসুখ।

    অসাধারণ!!!

  2. লেখার মধ্যে ছবির মতো মনের কথা বেড়িয়ে এলো। অসাধারণ লেখা। মনে থাকবে এই
    ইতিহাস টা। সত্যি লেখাটা শেষ হয়েছে যেখানে
    বারবার পড়তে ইচ্ছা হচ্ছে। অভিনন্দন লেখিকাকে।

  3. সেই কোন কলেজ বেলায়, জাতি ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার বিষয়ে, স্যার বলেছিলেন- সব চক্রান্ত ব্যার্থ করে, সব ভাঙ্গা জাতি একদিন ঠিক এক হয়, যেমন জার্মানী, যেমন ভিয়েতনাম ( যেমন অন্তত খেলা আর সংস্কৃতি নিয়ে কোরিয়ার চেষ্টা ) ।
    প্রশ্ন জাগে, আত্ম নিয়ন্ত্রণের অধিকার কি নির্মিত হয় নেতৃত্বের মোহে? ধর্মীয় উন্মাদনার কাছে বৃহৎ রাজনৈতিক বোধ কি নিরুপায়?
    এতো সুন্দর আর প্রাণবন্ত আলোচনা, অনেকটা ভাবায়।
    ধন্যবাদ আপনাকে।

    1. আপনার ভালো লেগেছে জেনে খুব খুশি হলাম। চেষ্টা করছি দেশভাগের কারণ খোঁজার । এ লেখা এক অণ্বেষণ বলতে পারেন। ধন্যবাদ নেবেন।

  4. “ভাঙা বাংলা জোড়া লাগলে সেরে যাবে আমার অসুখ”– অপূর্ব।
    নদিয়ার ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে এসেছে ভারত ভাগের ইতিহাস, নেতাদের অবিমৃষ্যকারিতার আখ্যান। যদিও বাস্তবে পুনর্মিলন সম্ভব নয় বলেই মনে হয়, তবু দেশভাগের এ যন্ত্রণার তাগিদ অখণ্ড বঙ্গ সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে সহায়ক হবে।
    খুব ভাল লাগলো।।

    1. ধন্যবাদ আপনাকেও সুন্দর মন্তব্যের জন্য । বাস্তবে সম্ভব কি না ভবিষ্যত বলবে। তবে মানুষগুলোর যন্ত্রণা চোখে দেখা। তায়ই আমাকে ভাবিয়েছে ।

  5. খুব ভাল লাগল আপনার লেখা | শ্রী চৈতন্যদেবের নদীয়া জেলারএতো ইনফর্মেশন জেনে।সমৃদ্ধ হলাম |

  6. প্রতিবেদনে দেখলাম হিন্দু-মুসলমান মিলে স্বাধীনতা সংগ্রাম করেছিল,মুসলিম আবুদুল মান্নানের নাম দেখলাম।আর নাম থাকলে জানান।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।