সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস

দীপরাজ দাশগুপ্ত

জুন ৪, ২০২২ ১২৩

মুক্তির দাবি মানুষের আজন্ম লালিত স্বপ্ন। কিন্তু মুক্তির স্বাদ অত সহজে পাওয়া যায় না। মুক্তির পথ চির কঠিন। মুক্তি কেউ কাউকে হাতে তুলে দিতে পারে না বা দেয় না। চরম মূল্য দিয়ে তাকে অর্জন করে নিতে হয়। সে মূল্য দেশ-কাল-সময়-সমাজ বিশেষে পৃথক হতে পারে। স্বাধিকার আদায়ের লক্ষ্যে, স্বাধীনতা অর্জনের উদ্দেশ্যে গণ সংগ্রামই মুক্তির সাধনা। শেকল ভাঙার গানই মুক্তি। শোষকের বিরুদ্ধে ন্যায়সঙ্গত অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে শোষিতের প্রতিরোধের ভাষাই মুক্তি। মানব সভ্যতার উষালগ্ন থেকে মানুষের শৃঙ্খল মোচনের বাসনাই মুক্তির স্বপ্ন।

বাংলা, বাঙালি ও বাংলাদেশ

বাঙ্গালা বা বাংলা ভাষাভাষী মানুষেরা বর্তমানে স্বাধীন বাংলাদেশ (পূর্ববঙ্গ), ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা রাজ্য এবং আসামের কিছু অংশ জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে। এদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা বাঙালি রাজ্য। আর পূর্ববঙ্গ তথা বাংলাদেশ বাংলা ভাষা ভিত্তিক স্বাধীন বাঙালি জাতি রাষ্ট্র। ধর্মীয় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ভাষার ভিত্তিতে দেশ প্রতিষ্ঠার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বাংলাদেশ। এবং তা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। সেই মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর প্রসঙ্গের আলোচনার মাধ্যমে এর ইতিহাস অনুসন্ধানের চেষ্টা করা যাক। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ও মুক্তি সংগ্রামে বিজয়ের পঞ্চাশতম বার্ষিকীতে এই আলোচনা প্রাসঙ্গিক বোধ করি।

বঙ্গভঙ্গ ও তারপর

১৯০৫ সালে হওয়া বঙ্গভঙ্গ অবিভক্ত বাংলাকে শাসনতান্ত্রিক ও ধর্মীয় ভাবে দ্বিধাবিভক্ত করে। বাংলার অধিকাংশ বাঙালি হিন্দু এর তীব্র বিরোধিতা করলেও অধিকাংশ বাঙালি মুসলমান (বিশেষত পূর্ববঙ্গের) বঙ্গভঙ্গের পক্ষে ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ বঙ্গবঙ্গের বিরোধিতায় এই সময়েই ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি রচনা করেন, যা ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গৃহীত হয়। তীব্র গণ আন্দোলনের মুখে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করা হয়। বঙ্গভঙ্গের সূত্র ধরেই বাঙালি হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে রাজনৈতিক বিভক্তি প্রকট হয়ে ওঠে। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করেও এ বিরোধ চলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরবর্তীকালে বাংলাদেশের নানা আন্দোলন সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯০৬ সালে নবাব সলিমুল্লার উদ্যোগে ঢাকায় মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই দলটির মাধ্যমে উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্য প্রণোদিত অপরাজনীতির সূত্রপাত ঘটে। যার ফলশ্রুতিতে ভারত তথা বাংলা বিভক্ত হয়।

দেশভাগ: অসম মিলন

১৯৪৭ সালে দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তান নামে একটি ধর্ম ভিত্তিক রাষ্ট্রের জন্ম হয়। মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। পূর্ববঙ্গের নতুন নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে শুধুমাত্র ধর্মীয় মিলটুকু আর কোনো মিল ছিল না। ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাত্রা সব কিছুই ছিল পৃথক। একই দেশের দুটি অংশের মধ্যে ছিল হাজার মাইলের ব্যবধান। পশ্চিমের শাসক গোষ্ঠী বরাবরই পূর্ব অংশের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করত। অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল অত্যন্ত প্রকট। সাংস্কৃতিক বৈষম্য এতটাই প্রকট আকার ধারণ করেছিল যে, ঢাকা রেডিওতে রবীন্দ্র সঙ্গীত পরিবেশন ও রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালনে সরকারি ভাবে বাধাদান করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের প্রতি উর্দু শাসক শ্রেণির অবিশ্বাস ছিল বরাবরই। পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের প্রথম সংঘাত সৃষ্টি হয় ভাষাগত প্রশ্নে। ১৯৪৮ সালের প্রথম দিকে পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল হিসাবে মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ ঢাকা সফরে আসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের এক সভায় জিন্নাহ উর্দুকে সমগ্র পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসাবে ঘোষণা করেন। সভায় উপস্থিত ছাত্ররা এর প্রতিবাদ জানায়। এরপর পাকিস্তান গণপরিষদের সভায় সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উর্দুর সাথে বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন করলে তা প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খান কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়। ১৯৪৮ সাল থেকেই পূর্ব পাকিস্তানে ভাষা আন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলন পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ঐক্যের ভিত্তিকে ক্রমশ দুর্বল করে দেয়।

ভাষা আন্দোলন

বাংলা ভাষার মর্যাদার দাবিতে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের ডাকে ছাত্র জনতা আন্দোলন শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ছাত্র-ছাত্রীরা এই আন্দোলনে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল। আন্দোলনের অংশ হিসাবে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি শিক্ষার্থীরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ঢাকার রাজপথে মিছিল বের করলে পুলিশ সেই মিছিলে গুলি চালায়। এতে রফিক, জব্বার, শফিউর ও বরকত নামে বেশ কয়েকজন শহীদ হয়। ভাষার জন্যে রক্তদানের মাধ্যমে ৫২’র ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৭১-এর পথ তৈরি করে। এই বাংলা ভাষা আন্দোলনই মুক্তিযুদ্ধের বীজ বপন করে। একুশ না হলে একাত্তর হত না। ভাষা আন্দোলন পূর্ববঙ্গের মানুষের মনে পাকিস্তানকে নিয়ে গভীর সংশয় ও অবিশ্বাস তৈরি করে। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষেরা ভাষা আন্দোলনের সূত্র ধরে বাঙালি পরিচয়ে গর্বিত হয়ে উঠতে থাকে। ভাষার অধিকারের প্রশ্নে ধর্মীয় ঐক্যের পরিচয় গৌণ হয়ে যায়, মুখ্য হয়ে ওঠে মাতৃভাষার মর্যাদা।

আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিবুর রহমান

১৯৪৯ সালের ২৩শে জুন ঢাকায় গঠিত হয় আওয়ামী মুসলিম লীগ। পরবর্তীকালে শেখ মুজিবুর রহমান এই দলের সভাপতি নির্বাচিত হলে ১৯৫৫ সালে তিনি দলের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে এই দলের সদস্যপদ অমুসলিমদের জন্যে উন্মুক্ত করে দেন। এই ঘটনাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ দলটি অনেকটা ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের মতো ভূমিকা পালন করেছিল। শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নানা আন্দোলন গড়ে তোলেন। পাকিস্তানের মুসলিম লীগ কিংবা সামরিক শাসক গোষ্ঠীর সঙ্গে আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্ব ছিল ব্যাপক। শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের জন্য সমান অধিকার দাবি করতেন, আর করাচি কিংবা ইসলামাবাদের শাসকেরা তাঁকে ও তাঁর দলকে ভারতীয় দালাল বলে অভিহিত করতেন। তখন যে কোনও কারণে খুব সহজেই পাকিস্তান বিরোধীর তকমা দিয়ে দেয়া হত।

শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্রজীবনে জিন্নাহর পাকিস্তান আন্দোলনের সমর্থক ও মুসলিম লীগের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন তাঁর রাজনৈতিক গুরু। শেখ মুজিব ভারতীয় মুসলমানদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রশ্নে জিন্নাহর পাকিস্তান দাবিকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করেন এবং বাঙালি মুসলমানদের জন্যে পূর্ববঙ্গের পাকিস্তান ভুক্তির প্রচারক ছিলেন। পাকিস্তানের প্রতি তাঁর মোহভঙ্গ হতে থাকে ১৯৪৮ সাল থেকে। বাংলা ভাষার উপর আঘাত ও উর্দু চাপিয়ে দেয়ার প্রতিবাদে তিনি মাতৃভাষা আন্দোলনকে সমর্থন করেন। জিন্নাহর মৃত্যুর পর পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতি শেখ মুজিব হতাশ হয়ে পড়তে থাকেন। পাকিস্তানে বাঙালি মুসলমানদের স্বার্থ যে কখনোই রক্ষিত হবে না তা তিনি অনুধাবন করেছিলেন। আওয়ামী লীগের মাধ্যমে তাঁর নতুন পথচলা শুরু হয়। সেই পথ পাকিস্তান ভেঙ্গে নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথ। এই ইতিহাস তাঁর ধর্ম ভিত্তিক পাকিস্তানের সমর্থক থেকে ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস। শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনীর’ পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে এইসব দিনের কথা।

শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের জন্য পশ্চিম পাকিস্তানের মত সুযোগ-সুবিধা দাবি করেছিলেন। পাকিস্তানের সব প্রদেশের মধ্যে আর্থিক ও রাজনৈতিক ভাবে সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের জন্য স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। তাঁর এই স্বায়ত্তশাসনের দাবি ছয় দফা দাবি নামে পরিচিত। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার এই দাবিকে বিচ্ছিন্নতাবাদী দাবি বলে অভিহিত করে। ফলে শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগ নেতারা শাসকদের রোষানলে পড়ে বারবার কারারুদ্ধ হতে থাকেন। এর মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ জনগণের সমর্থন আওয়ামী লীগের দিকে চলে যায়। আর শেখ মুজিবুর রহমান হয়ে ওঠেন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের অবিসংবাদিত জননেতা।

পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচন

১৯৫৮ সালে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইস্কান্দার মির্জাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে পাকিস্তানে সামরিক একনায়কতন্ত্র জারি করেন। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ সরকার অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও শাসনতান্ত্রিক ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। একটি লিখিত সংবিধান প্রণয়নে তাদের ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত সময় লাগে। সেই সংবিধানও দু’বছরের মধ্যে সামরিক শাসকের দ্বারা স্থগিত করা হয়। ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বরে জিন্নাহ’র মৃত্যু ও ১৯৫০ সালে রাওয়ালপিন্ডির জনসভায় প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খান নিহত হওয়ার পর থেকেই পাকিস্তানের দলীয় সরকারের ভিত্তি ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। খুব কম সময়ের মধ্যে একের পর এক প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন হতে থাকে। সদ্য সৃষ্ট পাকিস্তানের রাজনীতিতে তখন অস্থিরতা বিরাজ করছে। এরই সুযোগ নিয়ে ইস্কান্দার মির্জা পাকিস্তানে সামরিক আইন জারি করেন এবং আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করেন। দুই পাকিস্তানে প্রবল গণ অভ্যুত্থানের মুখে ১৯৬৯ সালে আইয়ুব খানের ১১ বছরের সামরিক শাসনের অবসান ঘটে। ক্ষমতায় আসেন জেনারেল ইয়াহিয়া খান। তার অধীনে ১৯৭০ সালে পাকিস্তানে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৬০টি আসন পেয়ে শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ৮৬টি আসন পেয়ে জুলফিকার আলী ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) দ্বিতীয় স্থানে আসে। পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। পশ্চিম পাকিস্তানে ভুট্টোর দল পিপিপি তুলনামূলক ভাবে ভালো ফল করে। কিন্তু ভুট্টোর পরামর্শে রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের হাতে ইসলামাবাদের শাসন ক্ষমতা তুলে দিতে রাজি হয় না। ন্যাশানাল অ্যাসেম্বলির অধিবেশন ডাকার ক্ষেত্রে অহেতুক দেরি করা হতে থাকে। চক্রান্ত বুঝে শেখ মুজিব ঢাকায় অসহযোগ আন্দোলন শুরু করেন। এবং ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জনসভা ডাকেন।

“কি পেলাম আমরা?

১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর সেই বিখ্যাত ভাষণে তীব্র ক্ষোভে বলেছিলেন – “কি পেলাম আমরা?” এই ক্ষোভ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকদের প্রতি, পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের হতাশার বহিঃপ্রকাশ। ১৯৪৭ সালের আগস্ট থেকে ১৯৭১ সালের মার্চ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের প্রতি পশ্চিমা শাসকবর্গের শোষণ বঞ্চনার কথা শেখ মুজিবের ভাষণে উঠে আসে। ভাষণের এক পর্যায়ে তিনি বলেন, “কি পেলাম আমরা?” তাঁর এই কথার মধ্যে দিয়ে ফুটে উঠেছিল ২৩ বছরের বঞ্চনার ইতিহাস। পাকিস্তান পূর্ববঙ্গের বাঙালি মুসলমানদের আশা আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়েছিল। শেখ মুজিব তাঁর ১৮ মিনিটের ভাষণে ৪৭ থেকে ৭০ সাল পর্যন্ত শোষণের ধারাবাহিকতা তুলে ধরেন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল ঘোষণা করেন। তিনি সামরিক বাহিনীর গুলিতে নিহতদের জন্যে সুবিচার দাবি করেন। পাক সেনাদের রাজপথ ছেড়ে ব্যারাকে ফিরে যেতে বলেন। পশ্চিম পাকিস্তানী রাজনীতিবিদদের সংকীর্ণ মনোভাবের কঠোর সমালোচনা করেন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে উদ্দেশ্য করে ভুট্টোর সমালোচনা করেন। বাঙালিদের সর্বাত্মক প্রতিরোধের ডাক দিয়ে তিনি বলেন, “যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো।” “রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব।” “আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না।” সবশেষে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি বলেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।” তাঁর এই ভাষণ থেকে এটা সুস্পষ্ট যে, তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের ডাক দিয়েছিলেন। সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি কোন দিকে যেতে পারে, তা অনুধাবন করেই পরোক্ষ ভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তাই মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই ৭ই মার্চের ভাষণ খুব গুরুত্বপূর্ণ।

২৫শে মার্চের কালো রাত্রি

মার্চের প্রথমদিকে শেখ মুজিবের সাথে আলোচনার জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসেন। কিন্তু দফায় দফায় আলোচনা ব্যর্থ হয়। প্রকৃতপক্ষে এইসময় আলোচনার আড়ালে সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি চলতে থাকে। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানে বিপুল সংখ্যক সেনা ও প্রচুর গোলা বারুদ আনা হয়। অবশেষে ৭১-এর ২৫শে মার্চ রাতে ঢাকায় অপারেশন সার্চলাইট নামে সেনা অভিযান শুরু হয়। ঢাকা শহর জুড়ে চলে নির্বিচারে গণহত্যা। রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে হামলা চালানো হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কোয়ার্টার ও ছাত্রাবাসগুলোতে অভিযান চালিয়ে অসংখ্য নিরপরাধ মানুষকে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়।

২৬শে মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধের সূত্রপাত

২৫ মার্চ মধ্যরাতে শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। দুদিন পর তাঁকে পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে পাঠানো হয়। গ্রেফতার হতে পারেন এমন আশঙ্কা করে তিনি সংক্ষিপ্ত লিখিত বিবৃতির মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং সর্বস্তরের বাঙালিদের দেশ মাতৃকার মুক্তির জন্য যুদ্ধের নির্দেশনা দেন। পরদিন চট্টগ্রাম থেকে আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নান ও একজন জুনিয়র বাঙালি সেনা কর্মকর্তা মেজর জিয়াউর রহমান বেতারে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেছিলেন। এরা ছিলেন ঘোষক মাত্র। ২৬ তারিখ থেকে মূলত মুক্তিযুদ্ধের সূত্রপাত হলেও মুক্তিবাহিনীর বৃহৎ গেরিলা যুদ্ধের তখনও দেরি ছিল।

প্রবাসী সরকার গঠন ও যুদ্ধ পরিচালনা

শেখ মুজিবের গ্রেফতার ও অপারেশন সার্চলাইট শুরু হওয়ার পর শীর্ষস্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ গোপনে ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেন। ১৭ই এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার সীমান্তবর্তী বাংলাদেশের তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলায় প্রবাসী অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার শপথ গ্রহণ করে। শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করা হয়। এছাড়া সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপরাষ্ট্রপতি, তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন। একটি অস্থায়ী মন্ত্রীসভা গঠিত হয়। ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলি ও কামরুজ্জামান সহ আরো অনেকে এর সদস্য হন। কর্নেল এম এ জি ওসমানীকে মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত করে যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়। পুলিশ, আধাসেনা ও পাক সেনাবাহিনীর বাঙালি সদস্যরা বিভিন্ন পথে ভারতে আশ্রয় নিয়ে পরবর্তী পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। ভারত সরকারের সহযোগিতায় বাংলাদেশের কাছাকাছি বিভিন্ন সীমান্তবর্তী ভারতীয় এলাকায় মুক্তিবাহিনীকে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হতে থাকে। মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকাংশই ছিল সাধারণ বাঙালি ছাত্র-জনতা। বাংলাদেশকে মোট ১১টি সেক্টর ও বিভিন্ন সাব সেক্টরে ভাগ করে গেরিলা যুদ্ধ শুরু হয়। কর্নেল ওসমানীর নেতৃত্বে মেজর কে এম শফিউল্লাহ, মেজর খালেদ মোশাররফ, মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর চিত্তরঞ্জন দত্ত প্রমুখ মুক্তিবাহিনীর বিভিন্ন সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত হয়েছিলেন। বাংলাদেশ সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ কলকাতা কেন্দ্রিক প্রবাসী সরকার পরিচালনা ও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাঁর ব্যক্তিগত সততা ও দক্ষতা ছিল প্রশ্নাতীত। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের ছিল একটি উপদেষ্টা পরিষদ; মাওলানা ভাসানী, কমরেড মণি সিংহ, আবু সাঈদ চৌধুরী ও অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ছিলেন এর অন্তর্ভূত।

মুক্তিবাহিনীর গঠন ও প্রশিক্ষণ

ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর অধীনে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরার বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠে মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। মুক্তিবাহিনীর অধিকাংশ সদস্যই জীবনে প্রথমবার অস্ত্র হাতে নিয়েছিল। এর আগে এদের যুদ্ধের কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। এরা কেউ ছিল সাধারণ কৃষক, কেউ শ্রমিক, কেউ ছাত্র, কেউ বা শিক্ষক। নারীদের একটি বড় অংশগ্রহণ ছিল। বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ ছিল মুক্তিযুদ্ধে। এরা শুধুমাত্র দেশপ্রেমের উপর নির্ভর করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিল। এদের সামনে হয় মুক্তি না হয় মৃত্যু -এছাড়া আর কোনও বিকল্প পথ ছিল না। ডিসেম্বর মাসে ভারতীয় মিত্রবাহিনী প্রত্যক্ষ ভাবে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার আগে পর্যন্ত এই মুক্তিযোদ্ধারাই আট মাস ধরে গেরিলা পদ্ধতিতে সুপ্রশিক্ষিত ও বিপুল অস্ত্রসম্ভারে সুসজ্জিত পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছিল। একের পর এক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আক্রমণ চালিয়ে পাক বাহিনীর মনোবল দুর্বল করে দিয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের হাতিয়ার ছিল হালকা মেশিনগান, গ্রেনেড, রিভলবার ইত্যাদি। অস্ত্র, খাদ্য ও পোশাকের পর্যাপ্ত সংস্থান ছিল না। শুধু প্রবল দুঃসাহসে ভর করে এগিয়ে চলা। মুক্তিবাহিনীর সূর্য সন্তানদের অপরিসীম আত্মত্যাগের মহিমায় ভাস্বর একাত্তরের মুক্তিসংগ্রামের যুদ্ধ প্রান্তর।

মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থীদের ভূমিকা

বিংশ শতাব্দী ছিল বিশ্বের এক বৃহৎ অংশ জুড়ে বামপন্থার উত্থান ও বিস্তারের কাল। শোষণ মুক্তির হাতিয়ার হিসাবে বামপন্থা বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে খুব আকর্ষিত করেছিল। পাকিস্তান সৃষ্টির পর এর রূপ দেখে হতাশ হয়ে শেখ মুজিব বামপন্থার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠেছিলেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম সংবিধানে মূলনীতি হিসাবে সমাজতন্ত্রকে অন্তর্ভুক্ত করা এবং পঁচাত্তর সালে জাতীয় কর্মসূচি হিসাবে বাকশাল গঠন করা এর উদাহরণ। মুসলমানদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রশ্নে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাকে সমর্থন করলেও মুসলিম লীগ সরকার দলটিকে নিষিদ্ধ করে। পাকিস্তান আমলে মণি সিংহ ও সত্যেন সেনের মত কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দ বারবার গ্রেফতারের শিকার হতে থাকেন। তেভাগা আন্দোলনকে লীগ সরকার নিষ্ঠুর ভাবে দমন করে। কমিউনিস্ট চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের রাজনৈতিক সুসম্পর্ক থাকলেও দেশের অভ্যন্তরে তা ছিল না। পাকিস্তানে সরকারি ভাবে বামপন্থী রাজনীতিকে কঠোরভাবে দমন করা হত। পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী তাদের বিরোধীদের হয় ভারতীয় চর নাহয় কমিউনিস্ট হিসাবে আখ্যায়িত করত। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা পূর্ব বাংলাদেশের গণ আন্দোলনে বামপন্থীদের পরোক্ষ ভূমিকা ছিল। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক তরুণদের মধ্যে বামপন্থা জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। তারা লুকিয়ে মার্কসবাদী দর্শনের চর্চা করত। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’ পড়ে জানা যায় তাঁর বড় ছেলে বিখ্যাত গেরিলা যোদ্ধা শহীদ শাফী ইমাম রুমীর বামপন্থায় আগ্রহের কথা। একাত্তরে বাংলাদেশের মানুষের উপর পাক বাহিনীর নির্মম গণহত্যার ভয়াবহতা বিশ্বের পৌঁছে দেয়ার জন্য চিত্র পরিচালক ও লেখক জহির রায়হানের নির্মিত তথ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’ শুরু হয়েছিল রুশ বিপ্লবের নেতা লেনিনের বিখ্যাত একটি উক্তি উদ্ধৃত করে, যাতে তিনি বিপ্লবের মাধ্যমে শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। ভারত সরকার বিশেষ করে ইন্দিরা গান্ধির অনুরোধে সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ালেও মাও জে দং এর গণপ্রজাতন্ত্রী চীন পাকিস্তানকে সমর্থন করে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করে এতে সাহায্য করার চেষ্টা করে। এক্ষেত্রে বাঙালি কমিউনিস্টরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বামপন্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল একথা অস্বীকার করা যায় না।

শরণার্থী শিবিরের কথা

১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ থেকে শুরু হয় পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ববঙ্গ ছেড়ে ভারত সীমান্ত অভিমুখে আতঙ্কিত শরণার্থীদের যাত্রা। প্রথম দিকে কিছুটা কম হলে খুব দ্রুতই শরণার্থীদের নিজ ভূমি ছেড়ে পলায়নের হার আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যায়। প্রায় ১ কোটি মানুষ শরণার্থী হয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয় ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরায়। সবচেয়ে বেশি সংখ্যক শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছিল ভারতের বাঙালি রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে। কম সংখ্যক মানুষ বার্মার (বর্তমান মায়ানমার) রাখাইন (আরাকান) রাজ্যে আশ্রয় নিয়েছিল। শরণার্থী শিবিরগুলোতে ছিল উপচে পড়া ভীড়। বহু মানুষ মাইলের পর মাইল হেঁটে সীমান্তে এসে কিংবা শরণার্থী শিবিরের দ্বারে এসে মারা গেছেন। অনেকে তাদের বৃদ্ধ মা-বাবাকে কাঁধে নিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসেছিলেন। অনেকে তাদের সন্তানকে আর না পেরে পথেই ফেলে গেছেন। প্রাণ ও মান রক্ষার জন্য সামান্য অবলম্বন হাতে নিয়ে অগণিত মানুষ শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। অত্যধিক চাপে শরণার্থী শিবিরগুলোর অবস্থা ভালো ছিল না। খাদ্য, বস্ত্র আর চিকিৎসা ব্যবস্থার সংকট ছিল প্রবল। তবুও কেন্দ্রীয় ভারত সরকার এবং রাজ্য সরকার গুলো এই বিশাল সংখ্যক শরণার্থী সমস্যার সমাধানে সাধ্যমত চেষ্টা করেছিল। সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর সাধারণ মানুষেরা শরণার্থীদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। ভারতের সরকার ও জনগণ সে সময় পূর্ববঙ্গ থেকে আগত শরণার্থীদের প্রতি যে মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, তা বিশ্বের যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তৎকালীন শরণার্থী পরিস্থিতি কেমন ছিল, কবি অল্যান গ্রিন্সবার্গ তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ এ মর্মস্পর্শী ভাবে তা তুলে ধরেছেন। আমার মা শৈশবাবস্থায় নিজের পরিবারের সাথে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থেকে রামগড় সীমান্ত দিয়ে ত্রিপুরার সাব্রুমের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। আমার দিদিমার মুখে বহুবার শুনেছি একাত্তরে তাদের নয় মাসের শরণার্থী জীবনের মর্মস্পর্শী কাহিনি। আমার বাবা তার দশ বছর বয়সে পরিবারের সাথে কক্সবাজারের উখিয়া থেকে টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে বার্মার পাহাড়ি রাখাইন অঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে শরণার্থী জীবনের এমন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তাই আমার পরিবারেই রয়েছে।

ইন্দিরা গান্ধির অবদান

১৯৭১ সালের বাংলাদেশর স্বাধীনতা সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধে তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছিলেন। বিশাল সংখ্যক শরণার্থীদের নয় মাস ধরে আশ্রয় ও খাদ্যের ব্যবস্থা করা, আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দকে আশ্রয় প্রদান, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার গঠনে সাহায্য করা, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, গেরিলা যুদ্ধে সাহায্য করা, পাক বাহিনীর নির্মমতার বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ করা, বাংলাদেশের মানুষের জন্যে বিশ্ব দরবারে প্রচারাভিযান, পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থন আদায় করা, মুক্তিযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর মাধ্যমে সরাসরি অংশগ্রহণ করা, পাকিস্তানের কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির দাবি জানানো, স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারকে সাহায্য প্রদান ও যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ গঠনে সহায়তা প্রদান করা – এই সমস্ত কিছুর পেছনে ছিলেন শ্রীমতী গান্ধি। তাঁর সদিচ্ছা ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের ফলে এবং ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে বিশ্বের বুকে একটি নতুন স্বাধীন জাতি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছিল। রাজধানী ঢাকার ‘ইন্দিরা রোড’ আজও সেই স্মৃতি ধরে রেখেছে। বছর দশেক আগে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার দেশের স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় বিদেশি বন্ধুকে ‘বাংলাদেশ স্বাধীনতা সম্মাননা’ প্রদান করে তাঁর ঐতিহাসিক অবদানকে সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করে। ইন্দিরা গান্ধি হয়তো একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থন করেছিলেন পাকিস্তানের বিপক্ষে ভারতীয় স্বার্থের কথা মাথায় রেখেই। পূর্ব পাকিস্তানের বিলুপ্তির ফলে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠায় ভারত রাজনৈতিক ভাবে লাভবান হয়েছিল। পূর্ব সীমান্তে স্থিরতা ও একটি নতুন মিত্র প্রতিবেশী লাভ করেছিল। তবুও বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির জন্য তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়।

সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকা

পশ্চিমাদের কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে সমর্থন চেয়ে এক প্রকার ব্যর্থ হয়ে ইন্দিরা গান্ধী মস্কোর সহায়তা লাভে সক্ষম হন। ভারতের দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের দৃঢ় সমর্থন নিশ্চিত হওয়ার পর শ্রীমতী গান্ধি মুক্তিযুদ্ধে সামরিক হস্তক্ষেপ করার জন্য অগ্রসর হয়েছিলেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশে পক্ষে ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করে আমেরিকা, চীন ও পাকিস্তানের আনা একের পর এক প্রস্তাব বাতিল করে দেয়। পাকিস্তানের সাহায্যে পাঠানো মার্কিন সপ্তম নৌ বহরকে বঙ্গোপসাগরে নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করে সোভিয়েত রাশিয়া। তাই মুক্তিযুদ্ধে ভারতের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের অবদান অনস্বীকার্য।

রণাঙ্গনের একটি চিত্র

গেরিলা পদ্ধতিতে লড়া হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ। ভারী সমরাস্ত্রে সুসজ্জিত পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সক্ষমতা মুক্তিযোদ্ধাদের ছিল না। তবুও অসীম মনোবলে বলীয়ান হয়ে মুক্তিযোদ্ধারা নয় মাস যুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছিলেন। জেনারেল জে. আর. জ্যাকব লিখেছেন, মুক্তিযোদ্ধারা না থাকলে ডিসেম্বরে মাত্র দু’সপ্তাহের মধ্যে পাক বাহিনীকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যেত না। রাস্তায় চলা পাকিস্তানী ট্যাংকের উপরে গাছের ডাল থেকে বুকে বোমা বেঁধে বাঙালি তরুণরা অবলীলায় ঝাঁপিয়ে পড়ত। দেশকে স্বাধীন করা ছাড়া তাদের সামনে আর কোনও উদ্দেশ্য ছিল না।

মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অবদান

দু’লক্ষ বীরাঙ্গনার সম্মানের বিনিময়ে দেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল। এঁরাও মুক্তিযোদ্ধা। শরণার্থী শিবিরে সেবিকা হিসাবে, রণাঙ্গনে অস্ত্র হাতে বাংলার নারীরা অসামান্য সাহসের স্বাক্ষর রেখেছিলেন। নারীদের অংশগ্রহণ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ সফল হতে পারত না। মুক্তিযুদ্ধে নীরবে তাঁরা তাঁদের অবদান রেখে গিয়েছিলেন। জননী সাহসিকা কবি সুফিয়া কামাল, শহীদ জননী জাহানারা ইমাম, তারামন বিবি বীরপ্রতীক, বাসন্তী গুহ ঠাকুরতা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে উজ্জ্বল কয়েকটি নাম।

ঘাতক-দালাল-রাজাকার

পাক বাহিনী তাদের সুবিধার্থে দেশীয় কিছু দালালকে দিয়ে রাজাকার বাহিনী গঠন করে। সশস্ত্র এই বাহিনীর সদস্য সংখ্যা প্রায় পঞ্চাশ হাজার। এঁদের আল শামস ও আল বদর বাহিনী নামেও ডাকা হতো। মূলত পাকিস্তানপন্থী গোঁড়া ধর্মান্ধ দলগুলো এর নেতৃত্বে ছিল। দেশীয় রাজাকাররা মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান, আওয়ামী লীগের লোকজন এবং সংখ্যালঘু হিন্দু জনগোষ্ঠীর মানুষের বাড়িঘর, পরিচয় ইত্যাদি বিষয়ে খবরাখবর পাক বাহিনীর কাছে পৌঁছে দিত। রাজাকারদের অত্যাচারের কথা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অন্যতম মর্মন্তুদ ঘটনা। এক্ষেত্রে বিহারীরাও রাজাকারদের সমকক্ষ ছিল। রাজাকাররা পথ দেখিয়ে পাক বাহিনীকে বাংলার প্রতিটি কোণায় নিয়ে গিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর নির্মম নির্যাতন চালিয়ে ছিল। যদি এই রাজাকার বাহিনী না থাকত, তবে মুক্তিযুদ্ধে এত বেশি প্রাণহানি কখনোই ঘটত না। সারা দেশে আজও  অসংখ্য গণকবর এদের পাপের সাক্ষ্য বহন করছে। মুক্তিযুদ্ধের চল্লিশ বছর পর এই যুদ্ধাপরাধী রাজাকারদের অনেকের বিচার ও শাস্তি হয়েছিল মানবতা বিরোধী অপরাধ আইনে।

একাত্তরে হিন্দু জনগোষ্ঠী

১৯৪৭ সাল থেকে পূর্ববঙ্গের বৃহৎ সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিন্দুরা পাকিস্তানে চরম দুর্ভোগের শিকার হতে থাকে। ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ফলে ব্যাপক হারে হিন্দুরা দেশ ত্যাগ করে ভারতে চলে যায়। একাত্তরে ভারতে চলে যাওয়া শরণার্থীদের মধ্যে একটি বৃহৎ অংশ ছিল হিন্দুদের। পাক বাহিনী ও রাজাকারদের সহজ শিকার ছিল এই জনগোষ্ঠী। বিনা অপরাধে শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের জন্য মুক্তিযুদ্ধের সময় হিন্দুরা সীমাহীন নিপীড়ন ও গণহত্যার শিকার হয়েছিল। হিন্দুদের জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করা, তাদের সম্পদ লুটপাট করা এসময় স্বাভাবিক ব্যাপারে পরিণত হয়ে গিয়েছিল।

স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র ও সাংস্কৃতিক লড়াই

একাত্তরে একটি মুক্তিযুদ্ধ লড়া হচ্ছিল রণাঙ্গনে। আর একটি সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মাধ্যমে। কলকাতায় আকাশবাণীর মাধ্যমে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়। বেতারে নিয়মিত মুক্তিযুদ্ধের খবর, কবিতা ও গান পরিবেশন করে মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বৃদ্ধি করা এবং বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে এর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। মুক্তিযুদ্ধকালীন চিত্র পরিচালক জহির রায়হানের করা তথ্যচিত্র, কবিদের লেখা মর্মস্পর্শী কবিতা, গীতিকার আর সুরকারদের করা অসামান্য সব গান, গণসংগীত সবই বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। আমেরিকার নিউ ইয়র্ক সিটির ম্যাডিসন গার্ডেন স্কোয়ারে আয়োজিত পন্ডিত রবিশঙ্কর ও জর্জ হ্যারিসন এর যৌথভাবে করা ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ পশ্চিমা বিশ্বে বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের কথা তুলে ধরেছিল।

মধ্য ডিসেম্বরে অর্জিত বিজয়

ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে পাকিস্তান সরাসরি ভারতকে আক্রমণ করলে দু’দেশের মধ্যে সম্মুখ যুদ্ধ শুরু হয়। ফিল্ড মার্শাল শ্যাম মানেকশ’-এর নেতৃত্বে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতীয় সামরিক বাহিনী প্রবল যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। পূর্ব পাকিস্তানে ভারতীয় বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বয়ে মিত্র বাহিনী গঠন করে ব্যাপক আক্রমণ শুরু হয়। এদিকে ভুটান ও ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান করে। ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে পাকিস্তান পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। ১৪ই ডিসেম্বর পাক ও রাজাকার বাহিনী স্বাধীন হতে যাওয়া দেশকে মেধাশূন্য করতে বেছে-বেছে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে। অবশেষে ১৬ই ডিসেম্বর মিত্র বাহিনীর হাতে ঢাকার পতন ঘটে। ৯৩ হাজার সৈন্য সহ পাক বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান জেনারেল এ কে নিয়াজী মিত্রবাহিনীর প্রধান জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে আত্মসমর্পণ করে। ১৬ই ডিসেম্বর বিকেলে রেসকোর্স ময়দানে এভাবেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয় প্রায় ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে। শীতের পড়ন্ত বিকেলে সবুজের বুকে লাল সূর্য উদিত হয়েছিল।

তথ্যসূত্র:

১. গোলাম মুরশিদ, “মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর একটি নির্দলীয় ইতিহাস”; ঢাকা: প্রথমা প্রকাশন, ২০১০।

২. মঈদুল হাসান, “মূলধারা ৭১”; ঢাকা: দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ১৯৮৬।

৩. আহমদ রফিক, “দেশবিভাগ: ফিরে দেখা”; ঢাকা: অনিন্দ্য প্রকাশ, ২০১৪।

৪. শেখ মুজিবুর রহমান, “অসমাপ্ত আত্মজীবনী”; ঢাকা: দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ২০১২।

৫. জাহানারা ইমাম, “একাত্তরের দিনগুলি”; ঢাকা: সন্ধানী প্রকাশনী, ১৯৮৬।

৬. সালাহউদ্দীন আহমদ ও অন্যান্য সম্পাদিত, “একাত্তরের চিঠি”; ঢাকা: প্রথমা প্রকাশন, ২০০৯।

৭. আফসান চৌধুরী সম্পাদিত, “হিন্দু জনগোষ্ঠীর একাত্তর”; ঢাকা: দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ২০২০।

৮. মুনতাসীর মামুন, “যে দেশে রাজাকার বড়”; ঢাকা: পার্ল পাবলিকেশন্স।

৯. এম আর আখতার মুকুল, “আমি বিজয় দেখেছি”; ঢাকা: সাগর পাবলিশার্স, ১৯৯৩।

মন্তব্য তালিকা - “মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস”

  1. বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে চিত্র পরিচালক জাহির রায়হানকেও হত্যা করে লাস গুম করেছিল।
    বেশ গুছিয়ে লেখা। ভালো লাগল।

    1. ধন্যবাদ। চিত্র পরিচালক ও লেখক জহির রায়হান অনন্য সাধারণ এক মানুষ ছিলেন। স্বাধীনতার উষায় তাঁর রহস্যজনক মৃত্যু বাংলাদেশের জন্য দুর্ভাগ্যজনক ছিল। প্রতিভাপ্রতিভাধর এই মানুষটি বেঁচে থাকলে এ দেশের চলচ্চিত্র শিল্প অনেক উন্নত হতে পারত। কিন্তু গুপ্ত ঘাতকের কালো হাত তা হতে দেয়নি।

  2. সোভিয়েত ইউনিয়নেব ভূমিকা অনেক শক্ত ছিল,স্বাধীনতার পরে রাশা’র মাইন সুইপারের সহায়তায় চট্টগ্রাম বন্দর ব্যাবহার উপযোগি হয়,২জন মাইনের আঘাতে মারা যায়,,সুন্দর লিখনী,

    1. অনেক ধন্যবাদ। সোভিয়েত ইউনিয়নের অবদান ভোলার নয়। তা ইতিহাস স্বীকৃত।

  3. ধন্যবাদ। চিত্র পরিচালক ও লেখক জহির রায়হান অনন্য সাধারণ এক মানুষ ছিলেন। স্বাধীনতার উষায় তাঁর রহস্যজনক মৃত্যু বাংলাদেশের জন্য দুর্ভাগ্যজনক ছিল। প্রতিভাপ্রতিভাধর এই মানুষটি বেঁচে থাকলে এ দেশের চলচ্চিত্র শিল্প অনেক উন্নত হতে পারত। কিন্তু গুপ্ত ঘাতকের কালো হাত তা হতে দেয়নি।

    1. আরেকটু সতর্ক হয়ে লেখা উচিৎ। কয়েকটা যায়গায় তথ্যবিভ্রাট আছে।

      ১) দেশভাগের পর থেকে ১৯৫৬ পর্যন্ত পূর্বাঞ্চলের নাম ছিলো ‘পূর্ব বাংলা’। ৫৬ সালের সংবিধানে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নাম দেয়া হয়।

      ২) ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকে অন্যতম দাপ্তরিক ভাষা করার প্রস্তাব তোলেন। আর জিন্নাহ ঢাকায় আসেন সেবছরের জুন মাসে।

      ৩) ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন যেই দলটা গঠিত হয়, তার নাম ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’। এখানে উল্লেখ্য, প্রদেশের নাম পূর্ব বাংলা হলেও, দলের নামে পূর্ব পাকিস্তান রাখা হয়। ‘পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ তৈরী হয় আরো পরে, ৫০ সালে। আর ৫১ সালে দুই অংশের আওয়ামী লীগ একত্রিত হয়ে ‘নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ তৈরী হয়।
      ৪) ১৯৫৫ সালে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ বাদ যাওয়ার সময় শেখ মুজিবুর রহমান সভাপতি নন, সাধারণ সম্পাদক। তিনি ১৯৬৬ সালের কাউন্সিলে প্রথম সভাপতি হন।