সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

ইসাসের প্রান্তরে—একটি সংঘাতের উপাখ্যান

ইসাসের প্রান্তরে—একটি সংঘাতের উপাখ্যান

অর্কপ্রভ সেনগুপ্ত

জানুয়ারি ৩১, ২০২৬ ১১৫ 0

স্থান—আনাতোলিয়া।

কাল—সাধারণপূর্ব ৩৩৩ অব্দ৷

আদি পর্ব

পূর্ব শতাব্দীগুলিতে এই আনাতোলিয়ার উপর দিয়েই পারসিক বাহিনি অভিযান চালিয়েছে পশ্চিমে। তাদের মূল প্রতিপক্ষ – গ্রিক নগর-রাষ্ট্র সমূহ। এই আনাতোলিয়ার উপর দিয়েই গ্রিসের অভিমুখে ধাবিত হয়েছে শাহেনশাহ্‌ প্রথম দারায়ুস আর জারাক্সিজের বাহিনি। আমরা যে সময়ের কথা বলছি, তখন সেনাবাহিনির পদচালনায় আবারও কেঁপে উঠছে আনাতোলিয়ার মাটি। কিন্তু সেনাবাহিনির গতি এইবার উল্টো দিকে—গ্রিস থেকে পারস্যের অভিমুখে। বিগত এক বছর ম্যাকেডোনিয়ার তরুণ রাজা আলেকজান্ডার পারস্য সাম্রাজ্যের মাটিতে অভিযান চালাচ্ছেন, এই বাহিনি তার-ই। তার পতাকা তলে সমবেত হয়েছে গ্রিসের বিভিন্ন নগররাষ্ট্রের সেনা। পারস্যের সঙ্গে শক্তি পরীক্ষায় তারা উদগ্রীব।

আপাত দৃষ্টিতে অবশ্য এই শক্তি পরীক্ষা কিছুটা ডেভিড বনাম গোলায়াথের দ্বৈরথের মতো মনে হওয়া সম্ভব। সাধারণপূর্ব পঞ্চম শতকের মধ্যভাগ থেকেই পারসিক সাম্রাজ্য আত্মপ্রকাশ করেছিল প্রাচীন বিশ্বের এক মহাশক্তি হিসেবে। একিমেনিড (ভারতের বাসিন্দারা বলতেন হখামনীষীয়) সম্রাটদের প্রজারা ছড়িয়ে ছিলেন মিশর থেকে সিন্ধু পর্যন্ত। এই বহু-জাতিক ও বহু-ভাষিক সাম্রাজ্যের ব্যাবিলন অথবা পার্সেপোলিসের সামনে এথেন্সের মতো সমৃদ্ধ গ্রিক নগরকেও মনে হত নিছক মফঃস্বল। শুধু অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দিক থেকে নয়, সামরিক শক্তির নিরিখেও গ্রিক নগররাষ্ট্রগুলির সঙ্গে পারস্যের কোনো তুলনাই চলে না। কিন্তু এও সত্য, সামরিক আর অর্থনৈতিক দিক দিয়ে এত শক্তিশালী হয়েও পারস্য গ্রিস জয় করতে পারেনি। বারে বারে এই সংগ্রামে তাকে ব্যর্থ হয়ে ফিরতে হয়েছে। বিপদের মুখে গ্রিক নগররাষ্ট্রগুলির বিভেদ ভুলে একত্রিত হওয়ার ক্ষমতা, রণকুশলী দক্ষ সেনাপতি ও পেশাদার সেনাবাহিনি বারে বারে সাফল্য এনে দিয়েছে গ্রিক পক্ষকে। এর উপর ভর করেই গ্রিক বিজয়ের শঙ্খ ধ্বনিত হয়েছে ম্যারাথনের প্রান্তর থেকে সালামিসের সাগরে। তরুণ রাজার সেনাবাহিনির হ্রদয়ে এই ঐতিহাসিক সত্য নিশ্চয়ই আশার সঞ্চার করেছিল। কিন্তু এর পাশাপাশি এটাও সত্য, পারসিকরা যেমন গ্রিস জয় করতে পারেনি, গ্রিকরাও তেমনই এর পূর্বে কখনও পারসিকদের তাদের মাটিতে পরাজিত করেনি। যখনই পারসিক শক্তি পিছু হটেছে, তখনই আবার একতা ভুলে গ্রিক নগররাষ্ট্রগুলি লিপ্ত হয়েছে নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে।

পারস্যের সঙ্গে সমানে সমানে লড়ে জিততে গেলে আগে গ্রিকদের ঐক্যবদ্ধ হতে হয়। এর এই কঠিন কাজটিই করেছিলেন রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ। সাধারণপূর্ব তৃতীয় শতকে ম্যাকেডোনিয়ার অধিপতি ফিলিপ বাহুবলে বাঁধলেন গ্রিক নগর রাষ্ট্রগুলিকে এক পতাকার তলায়। তার দৃষ্টি ছিল পশ্চিমে; পারস্যের দিকে। যে খাঁড়া বিগত দুই শতক ধরে গ্রিসের মাথার উপর ঝুলছিল, তিনি তার বিনাশ চেয়েছিলেন। ভাবনাকে কাজে পরিণত করার সময় অবশ্য ফিলিপ পাননি।

সূচনা পর্ব

মাত্র ছেচল্লিশ বছর বয়সে গুপ্ত ঘাতকের হাতে ফিলিপ যখন নিহত হলেন, তখন তার পুত্র ও উত্তরাধিকারী আলেকজান্ডারের বয়স মাত্র কুড়ি। ফিলিপ বাহুবলে যে গ্রিক নগররাষ্ট্রগুলিকে এক পতাকার তলায় এনেছিলেন, তারা ‘বর্বর’ ম্যাকেডোনিয়ান রাজার মৃত্যুতে স্বাধীন হওয়ার সুযোগ দেখল। তারা মনে করেছিল যুবক আলেকজান্ডার অপরিপক্ক শাসক, তাকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কিন্তু অচিরেই আলেকজান্ডার দেখালেন ফিলিপ এমনি এমনি অ্যারিস্টটলের মতো পন্ডিতের হাতে তার শিক্ষার ভার দেননি—তার বয়স কম হলেও তিনি যুদ্ধ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় পিতার থেকে কম দক্ষ নন। তার দুর্দান্ত রণকৌশলের সামনে এথেন্স, থেসালি, করিন্থের মতো শক্তি মাথা নত করল। থিবস নগরী বশ্যতা স্বীকার করতে রাজি না হওয়ায় আলেকজান্ডার সেই অতি প্রাচীন ও ঐতিহ্যময় শহর জয় করে মাটিতে মিশিয়ে দিলেন। এই নৃশংসতা বেপরোয়া ছিল না, ছিল হিসেবি। লম্বা সময় ধরে গ্রিক নগররাষ্ট্রগুলির সঙ্গে সংঘাতে যাওয়ার মতো সময় বা ক্ষমতা আলেকজান্ডারের ছিল না। থিবসের ধ্বংস গ্রিক নগররাষ্ট্রগুলির মধ্যে এমন ভীতির সঞ্চার করল, যে লম্বা লড়াইয়ের রাস্তা পরিত্যাগ করে তারা অতি দ্রুত মাথা নত করল নবীন রাজার সামনে।   

গ্রিসে নিজের রাজনৈতিক ও সামরিক অবস্থান সুনিশ্চিত করে আলেকজান্ডার তার বাহিনি নিয়ে হেলিসপন্ট (আধুনিক দার্দানেলিস প্রণালী) অতিক্রম করে পা রাখলেন আনাতোলিয়ায়। প্রথমে এই ভুঁইফোড় আক্রমণকারীকে পারসিকরা তেমন পাত্তা দেননি। তৃতীয় দারায়ুস তখন পারস্যের সম্রাট, তিনি ভেবেছিলেন স্থানীয় ক্ষত্রপরাই এই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী যুবককে তার ঔদ্ধত্যের শিক্ষা দিয়ে দিতে পারবেন। কিন্তু গ্রানিকাসের যুদ্ধে আলেকজান্ডারের বাহিনির সামনে স্থানীয় ক্ষত্রপদের পারসিক বাহিনি ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। আলেকজান্ডারের উদ্দেশ্য ছিল পারসিকরা পরাজয়ের ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই আনাতোলিয়ার দখল নেওয়া, বিশেষ করে সমুদ্র উপকূলবর্তী শহরগুলির। কিন্তু এই অপ্রতিরোধ্য জয়যাত্রার কর্মসূচীতে জল ঢেলে দিলেন পারসিকদের অন্যতম সেনাপতি মেমনন। তার কৌশলী নৌ-অভিযানের ফলে মূল গ্রিক ভূ-খন্ড থেকে সেনা আর রসদ সরবরাহ প্রবল ভাবে ব্যহত হতে লাগল। জাতিতে গ্রিক হওয়ায় মেমনন জানতেন অধিকাংশ গ্রিক নগররাষ্ট্রই এই ভুঁইফোড় ম্যাকেডোনিয়ান রাজাটিকে পছন্দ করে না। তাই তিনি রাজনৈতিক কূট-কৌশলে গ্রিসে আলেকজান্ডার বিরোধী বিক্ষোভ বেশ পাকিয়ে তুললেন। যুদ্ধে না হেরেও আলেকজান্ডারকে গ্রিসে ফিরতে হবে, এমন পরিস্থিতি দেখা দিল। এজিয়নে নৌ-অভিযান চলাকালীন আকস্মিকভাবে মেমননের মৃত্যু না হলে, আলেকজান্ডারের বিখ্যাত দিগ্বিজয়ের হয়তো এখানেই ইতি পড়ে যেত। সুদক্ষ এই গ্রিক সেনাপতিটিকে পারসিকরা অনেকেই পছন্দ করতেন না। তাঁরা সম্রাট তৃতীয় দারায়ুসের কাছে ধর্না দিলেন মেমননের রণকৌশল আর অনুসরণ না করার। এই আর্জি গৃহীত হল। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন আলেকজান্ডার।

আলেকজান্ডারের সেনা দ্রুত ভূমধ্যসাগরের উপকূলবর্তী শহরগুলির দখল নিল। মূল পদাতিক সেনার সঙ্গে রাজা নিজে অগ্রসর হতে লাগলেন ইসাস উপসাগরের ধার ঘেঁসে, আমানুস পর্বতের দিকে। এর পাশাপাশি সেনাপতি পার্মেনিয়নকে দায়িত্ব দিলেন সওয়ারদের নিয়ে অগ্রসর হয়ে মেসোপটেমিয়া আর সিরিয়া থেকে আগত পারসিক বাহিনির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে। এই কাজে পার্মেনিয়নকে বিশেষ বেগ পেতে হয়নি।

আলেকজান্ডার যখন গ্রানিকাসের বিজয়ের পর আনাতোলিয়ার দখল নিতে ব্যস্ত ছিলেন, তখন দারায়ুস নিশ্চুপ হয়ে বসে ছিলেন না। তিনি ব্যাবিলনে একত্রিত করলেন এক বিশাল বাহিনি। সাম্রাজ্যের প্রতিটি অংশ থেকে ধুলো উড়িয়ে সেখানে হাজির হল একের পর এক সেনাদল। এই বিপুল বাহিনি নিয়ে দারায়ুস ব্যাবিলন থেকে যাত্রা করলেন আনাতোলিয়ার উদ্দেশ্যে। সিরিয়ার সোকিতে ছাউনি পড়ল সম্রাটের। তার আর আলেকজান্ডারের বাহিনির মধ্যে শুধু আমানুস পাহাড়শ্রেণি। সেই খবরই আলেকজান্ডারকে এনে দিলেন পার্মেনিয়ন। আলেকজান্ডার অনুমান করলেন, পারসিক বাহিনিকে সিরিয়া থেকে আনাতোলিয়ায় প্রবেশ করতে হলে হয় বেইলান গিরিপথ নয়তো আর্মেনিয়ান গিরিপথের রাস্তা ধরতে হবে। এর মধ্যে বেইলান গিরিপথের রাস্তাটাই সব থেকে সহজ রাস্তা। এই গিরিপথেই তিনি পারসিক বাহিনির মুখোমুখি হবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন। তার যুক্তি ছিল, দারায়ুসের বিপুল বাহিনি সংকীর্ণ গিরিপথের মধ্যে দিয়ে আসার সময় স্বাভাবিক ভাবেই বিশৃঙ্খল হয়ে যাবে। খোলা প্রান্তরে এই বাহিনির মুখোমুখি হওয়া যে সহজসাধ্য নয়, তা তিনি স্পষ্ট বুঝেছিলেন। তাই পারসিক বাহিনি যখন বিশৃঙ্খল অবস্থায় বেইলান পার হবে তখন তার উপর তিনি অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়বেন; এই ছিল রাজার পরিকল্পনা। এই সিদ্ধান্ত অনুসারে ইসাস শহরে আহত সৈনিকদের রেখে আলেকজান্ডার ইসাস উপসাগরের উপকূল ধরে আমানুস পাহাড় শ্রেণিকে বামে রেখে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হতে শুরু করলেন।

ভাগ্যদেবী আলেকজান্ডারের সহায় ছিল না। দারায়ুস দুর্দান্ত সামরিক বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে বেইলানের পরিবর্তে আর্মেনিয়ান গিরিপথের রাস্তা ধরলেন এবং অচিরেই আলেকজান্ডার খবর পেলেন শত্রুসৈন্য তার দক্ষিণে নয়, বরং তার উত্তরে। দারায়ুস আলেকজান্ডারের মূল রসদ ঘাঁটি ইসাসের দখল নিলেন। এই শহরের আহত ম্যাকেডোনিয়ান আর গ্রিক সৈনিকদের প্রায় সকলেরই একটি হাত পারসিক সাম্রাজ্যকে আক্রমণ করার শাস্তি হিসেবে কেটে নেওয়া হল। এরপর তিনি বিপুল বাহিনি সহ যাত্রা করলেন দক্ষিণে।

আলেকজান্ডারের রসদ ও সৈন্য সংগ্রহের পথ বন্ধ করে দিয়েছিলেন দারায়ুস। তার পক্ষেও উত্তরে যাত্রা করা ছাড়া উপায় ছিল না। সাধারণপূর্ব ৩৩৩ অব্দের নভেম্বর মাসে অবশেষে এল প্রতিক্ষিত সংঘাতের প্রহর। ইসাস শহরের দক্ষিণে পিনারাস নদীর তীরে দুই বাহিনি পরস্পরের মুখোমুখি হল। গিরিপথে লড়াই করার যে সুবিধা, তা আলেকজান্ডার পেলেন না বটে, কিন্তু দারায়ুস স্বয়ং যুদ্ধের জন্য যে জমি বেছে নিলেন সেখানেও পারসিকদের পক্ষে তাদের বিপুল সংখ্যাকে কাজে লাগানো কঠিন ছিল। এই রণক্ষেত্রের একদিকে ছিল ইসাস উপসাগরের সমুদ্র আর আরেকদিকে পাহাড়। তার উপর দুই বাহিনির মাঝখানে ছিল বহমান পিনারাস নদী। একটা খোলা মাঠে একশো জন লোক তিরিশ জনকে খুব সহজেই হারিয়ে দিতে পারে। কিন্তু সরু গলিতে একই লড়াইয়ে তিরিশ জন একশো জনকে রুখে দিতে পারে। ইসাসের প্রান্তর ছিল তেমনই সরু গলি।

চিত্র ১ – ‘উদ্যোগপর্ব’-যুদ্ধের পূর্বে আলেকজান্ডার ও তৃতীয় দারায়ুসের বাহিনির গতিবিধি (সৌজন্য-The Department of History, United States Military Academy).

‘উদ্যোগ পর্ব’

যুদ্ধের দিন আলেকজান্ডার তার বাহিনিকে তিন ভাগে ভাগ করলেন। বাঁ দিকে তিনি রাখলেন পার্মেনিয়নের নেতৃত্বে অপেক্ষাকৃত কম প্রশিক্ষিত সওয়ার বাহিনিকে। মধ্যভাগে সাজালেন অত্যন্ত প্রশিক্ষিত ও পেশাদার ম্যাকেডোনিয়ান পদাতিক বাহিনি। এই বাহিনি লড়াই করত প্রায় ছয় মিটার বা কুড়ি ফুট লম্বা বর্শা নিয়ে। প্রত্যেক পদাতিক সেনার ঢাল তার পাশের জনকে রক্ষা করত এবং তারা অগ্রসর হত একসাথে। বর্শার দেওয়ালের মতো ব্যূহ পরিচিত ছিল ‘ফ্যালাঙ্কস্‌’ নামে। এই ব্যূহ গ্রিকদের মধ্যে দীর্ঘকাল প্রচলিত থাকলেও, আলেকজান্ডারের পিতা ফিলিপ একে আরও নিখুঁত রূপ প্রদান করেন। সামনা সামনি লড়াইয়ে এই ব্যূহকে হারানো প্রায় অসম্ভব ছিল। একমাত্র পাশ থেকে বা পিছন থেকে আক্রমণ করলে তবেই কোনো ‘ফ্যালাঙ্কস্‌’-এর সঙ্ঘবদ্ধতা ভাঙা যেত।

চিত্র ২ – ‘ফ্যালাঙ্কস্‌’–ম্যাকেডোনিয়ান বর্শা প্রাচীর (সৌজন্য–পিটার কনোলি)৷

এই বূহ্যকে সাহায্য করবার জন্য  বাহিনির মধ্যভাগে আলেকজান্ডার নিয়োজিত করেন তিন ধরনের সৈন্য:

ক) ‘হিপাস্‌পিস্ট’-ছোটো তরবারি ও খাটো বর্শায় সজ্জিত অত্যন্ত প্রশিক্ষিত এই পদাতিক বাহিনির দায়িত্ব থাকত ‘ফ্যালাঙ্কস্‌’ ব্যূহের দুই উন্মুক্ত পার্শ্বভাগ রক্ষা করা,

খ) ‘পেল্টাস্ট’-হালকা ঢাল, গুলতি আর বল্লমে সজ্জিত এই বাহিনির দায়িত্ব থাকত মাঝারি দূরত্ব থেকে শত্রু সৈন্যের দিকে পাথর আর বল্লম নিক্ষেপ করা, আর

গ) ক্রিট দ্বীপ থেকে আগত তিরন্দাজ বাহিনি – এদের অব্যর্থ নিশানার খ্যাতি ছিল সমগ্র ভূমধ্যসাগরীয় বিশ্বে।

এছাড়াও শুধু ঢাল ও ছোটো বর্শা সম্বলিত গ্রিক ‘হোপলাইট’ বাহিনিকেও মধ্যভাগে রাখা হয়।

সেনাবাহিনির একেবারে ডান পাশে আলেকজান্ডার সাজান তার ভারি অশ্বারোহী বাহিনিকে। ‘হেটাইরয়’ নামে পরিচিত এই বাহিনিতে ম্যাকেডোনিয়ান অভিজাত সন্তানরা সাধারণতঃ ঠাঁই পেত। অত্যন্ত প্রশিক্ষিত, যুদ্ধে পারদর্শী এই বাহিনির নামের ছিল অর্থ ছিল ‘সহচর’ বা ‘কম্প্যানিয়ন’। এই বাহিনির অনেকেই আক্ষরিক ভাবে ছিলেন আলেকজান্ডারের শৈশব ও কৈশোরের সহচর এবং বাল্যবন্ধু। এই বাহিনির দায়িত্ব স্বয়ং আলেকজান্ডার গ্রহণ করেন।

চিত্র ৩ – ‘হেটাইরয়’-রাজা ও তার সহচর (সৌজন্য-পিটার কনোলি)৷

ম্যাকেডোনিয়-গ্রিক বাহিনির সর্বশ্রেষ্ঠ অংশ ছিল তার পদাতিক সেনা। ‘হেটাইরয়’ ছাড়া আলেকজান্ডারের অশ্বারোহী বাহিনি বিশেষ উন্নত মানের ছিল না। তিরন্দাজ বাহিনি ছিল তার পদাতিক বাহিনির সর্বাপেক্ষা কম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভারি বর্ম ও ঢালে সজ্জিত ‘হোপলাইট’ আর বর্শা ফলকের দেওয়াল ‘ফ্যালাঙ্কস্‌’ ব্যূহকে সমর্থনের বাইরে এদের রণক্ষেত্রে বিশেষ কোনো ভূমিকা ছিল না।

দারায়ুসের পারসিক বাহিনির চরিত্র ছিল সম্পূর্ণ উল্টো।

পারসিকদের প্রশিক্ষিত পদাতিক বাহিনি ছিল একমাত্র রাজকীয় রক্ষী বাহিনি যারা ‘আথানাটয়’ নামে পরিচিতি। শব্দটির অর্থ ‘মৃত্যুহীন’ বা ‘ইমোর্টাল’, এই বাহিনির সংখ্যা ছিল দশ হাজার আর এই সংখ্যা কখনও কমতে দেওয়া হত না। সরাসরি রাজার অধীনে থাকা এই বাহিনি বর্শা আর তির-ধনুক নিয়ে লড়াই করত। এছাড়া বাকি পারসিক পদাতিক সেনা সংখ্যায় বিশাল হলেও প্রশিক্ষিত ছিল না। এই কারণে পারসিকরা পদাতিক যুদ্ধের বিষয়ে গ্রিক যুদ্ধব্যবসায়ীদের উপরই অধিক নির্ভর করত।

ইসাসের প্রান্তরেও ‘আথানাটয়’-দের পরেই পারসিকদের সব থেকে দক্ষ পদাতিক সেনা ছিল তাদের পক্ষে থাকা গ্রিক যুদ্ধব্যবসায়ী ‘হোপলাইট’-এর দল। অন্যদিকে অশ্বারোহী বাহিনিতে পারসিকরা ছিল তুলনাহীন। রথের ব্যবহারেরও তাদের জুড়ি মেলা ভার ছিল। ইসাসের প্রান্তরে দারায়ুস পার্মেনিয়নের সওয়ার বাহিনির মুখোমুখি সেই শক্তিশালী অশ্বারোহী সেনাকেই খাড়া করলেন। ম্যাকেডোনিয়ার পদাতিক বাহিনির বিপরীতে সাজালেন নিজের পদাতিক বাহিনিকে। আর আলেকজান্ডারের নেতৃত্বাধীন ‘হেটাইরয়’-দের মুখোমুখি সাজালেন অবশিষ্ট পদাতিক ও তিরন্দাজ বাহিনিকে।

চিত্র ৪ – ‘মৃত্যুহীন’-পারসিক রাজকীয় পদাতিক (সৌজন্য–উইকিমিডিয়া কমনস্‌)৷

চিত্র ৫ – ‘সম্রাটের একান্ত অনুগত’-পারসিক অশ্বারোহী বাহিনি (সৌজন্য–উইকিমিডিয়া কমনস্‌)৷

এই ‘উদ্যোগ পর্ব’ সমাপ্ত হওয়ার পর সাধারণপূর্ব ৩৩৩ অব্দের ৫-ই নভেম্বর দুই পক্ষের যুদ্ধ শুরু হল।

যুদ্ধের বিবরণ

আলেকজান্ডার চাইছিলেন দারায়ুস যাতে পিনারাস নদী অতিক্রম করে তার দিকে আসেন। তিনি বাহিনিকে একটু করে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিয়েই আবার থামতে বলছিলেন। উদ্দেশ্য, এই পর্যায়ক্রমে এগোনো আর থেমে যাওয়ার বিরক্ত হয়ে যদি পারসিকরা নদী পার করার প্রচেষ্টা করে। তার এই উদ্দেশ্য আংশিক সফল হল। ডান দিকে পার্মেনিয়ন দেখলেন বর্মে সজ্জিত রণকুশলী পারসিক সওয়ার বাহিনি পিনারাস অতিক্রম করে তার অশ্বারোহীদের দিকেই আসছে। কিন্তু পারসিক পদাতিক সেনা নদী পেরোয়নি। আলেকজান্ডার জানতেন পার্মেনিয়নের নেতৃত্বাধীন তার বাহিনির বাম ভাগের অত ক্ষমতা নেই যে সুশিক্ষিত পারসিক ঘোড়সওয়ারদের পরাজিত করে। পার্মেনিয়নের কাছে নির্দেশ ছিল তার কাজ হবে এই বাহিনিকে হারানো না—তাকে ব্যস্ত রাখা।

আলেকজান্ডার এ-ও জানতেন, এই কাজ পার্মেনিয়ন খুব বেশি সময় ধরে করতে পারবেন না। পারসিক অশ্বারোহী বাহিনি পার্মেনিয়নের সওয়ারদের হারিয়ে ঘুরে মধ্যভাগের পদাতিক ‘ফ্যালাঙ্কাস্‌’ আর ‘হোপলাইট’-দের আক্রমণ করার আগেই তাঁকে যুদ্ধ জিততে হবে। তিনি তাই দেরি না করে পদাতিক বাহিনিকে দ্রুত নদী পার হওয়ার নির্দেশ দিলেন। বাহিনির প্রত্যেক সেনাপতি, উপ-সেনাপতি, এমনকি সাধারণ সৈনিকদেরও নাম ধরে ধরে ডেকে তিনি উৎসাহিত করলেন। ম্যাকেডোনিয়ানদের স্মরণ করিয়ে দিলেন তারা রাজা ফিলিপের প্রশিক্ষিত সেনা, তাদের সাফল্যর উপর ম্যাকেডোনিয়ার গৌরব নির্ভর করছে। গ্রিকদের মনে করালেন প্রথম দারায়ুস আর জারাক্সিজের গ্রিস অভিযানের কথা, বললেন এই সুযোগ তার প্রতিশোধ গ্রহণের। লুন্ঠনপ্রিয় থ্রেসিয়ান যুদ্ধ ব্যবসায়ীদের মনে করালেন, পশ্চিম এশিয়ার ধনীতম সম্রাটের ব্যক্তিগত শিবির আর তাদের মাঝখানে বাধা হিসেবে রয়েছে শুধু সামনের ওই বাহিনিটি।

চিত্র ৬ – ‘ইসাসের যুদ্ধ’-ঈগলের চোখে রণক্ষেত্রের গতিবিধি (সৌজন্য – The Warfare History Network).

আলেকজান্ডার সাধারণতঃ যুদ্ধ করতেন তার অতি প্রিয় ঘোড়া বৌকেফেলাসের পিঠে চড়ে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে ভাষণের পরেই রাজা নেমে পড়লেন ঘোড়া থেকে। বাছাই করা কিছু ‘হিপাস্‌পিস্ট’-কে সঙ্গে নিয়ে আলেকজান্ডার দ্রুত গতিতে পায়ে হেঁটে পার হলেন পিনারাস নদী। পুরো ঘটনাক্রম এতটাই অপ্রত্যাশিত ছিল এবং ঘটেছিল এত দ্রুততার সঙ্গে যে উল্টো দিকে থাকা পারসিক তিরন্দাজরা এক-দুই বারের বেশি তির বর্ষণ করার সুযোগ পায়নি। ‘হিপাস্‌পিস্ট’-দের পিছু পিছু দ্রুত গতিতে নদী পার হল ম্যাকেডোনিয়ান ‘ফ্যালাঙ্কস্‌’ আর গ্রিক ‘হোপলাইট’-দের দল। ভারি পাথরের মতো সমগ্র পদাতিক সেনা আছড়ে পড়ল মধ্যভাগে থাকা পারসিক সৈন্যের উপর। এই ডামাডোলের সুযোগ নিয়ে ইতিমধ্যে ‘হেটাইরয়’-রা নদী পার করেছে।

যুদ্ধরত পদাতিক সৈন্যদের আরেক দফা উৎসাহ দিয়ে বৌকেফেলাসের পিঠে চড়ে সেই সুদক্ষ অশ্বারোহী বাহিনির নেতৃত্ব হাতে নিলেন আলেকজান্ডার। জ্যা মুক্ত তিরের মতো সওয়ার বাহিনি ছুটে গেল পারসিকদের বাম ভাগের পদাতিক সেনা ও পারসিক তিরন্দাজদের দিকে। অতি সহজেই তাদের ছত্রভঙ্গ করার পর আলেকজান্ডার তৃপ্তির সঙ্গে লক্ষ্য করলেন, তার পরিকল্পনা সফল।

  • পারসিক বাহিনির বাম ভাগ তার সওয়ার বাহিনির আক্রমণে সম্পূর্ণ ছত্রভঙ্গ।
  • মধ্য ভাগ ম্যাকেডোনিয়ান বর্শা ফলকের ধাক্কা সামলাতে ব্যতিব্যস্ত।
  • ডান ভাগের অশ্বারোহীদের পার্মেনিয়ন তখনও ঠেকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছেন।

অর্থাৎ, রণক্ষেত্রের দাবাখেলায় সম্রাট দারায়ুস সম্পূর্ণ অরক্ষিত ও তার ‘হেটাইরয়’ বাহিনির আড়াই চালের পাল্লায়-‘শাহ-মাত’ শুধু সময়ের অপেক্ষা।

তরুণ রাজার নেতৃত্বে ‘হেটাইরয়’-রা এবার সেই মাতের চালই চালল। প্রায় অপ্রতিরোধ্য ভাবে তারা মধ্যভাগের মূল পদাতিক সংঘাতকে পাশ কাটিয়ে আক্রমণ করল পারসিক সম্রাটের মূল রক্ষী বাহিনিকে। প্রবল আক্রমণে সেই বাহিনি পিছু হটতে থাকল।

এরপর যে ঘটনা ঘটল, সেই দৃশ্যকে ভাবীকালের জন্য অমর করে রেখেছে পম্পেই নগরীর একটি মোজাইক। তাতে দেখা যাচ্ছে বৌকেফেলাসে সওয়ার আলেকজান্ডার দারায়ুসকে প্রায় ধরে ফেলেছেন। যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যেও রাজার পাখির চোখে শুধু সম্রাট দারায়ুস। অন্যদিকে দারায়ুস হতভম্ব, ঘটনা পরম্পরা বিশ্বাস করতে পারছেন না, তিনি হাত তুলে আলেকজান্ডারকে যেন থামতে বলছেন। যুদ্ধের বহু কাল পরে নির্মিত হওয়ার কারণে মোজাইকে কিছু ঐতিহাসিক ত্রুটি আছে, তাছাড়া শিল্পীর সত্য আর ঐতিহাসিকের সত্য এক হয় না। তা সত্ত্বেও ঘটনার মূল মেজাজ মোজাইকটিতে ধরা দিয়েছে চমৎকার ভাবে। দারায়ুস ধরাই পড়তেন, কিন্তু সম্রাটকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলেন তার ভাই অক্সিয়াথ্রেস। তিনি ও তার নেতৃত্বাধীন কিছু পারসিক সেনার বীরত্ব দারায়ুসকে সুযোগ করে দিল রথে উঠে রণক্ষেত্র থেকে পলায়ন করার।

চিত্র ৭ – ‘ধরে রাখা সময়’ – পম্পেইয়ের ইসাস মোজাইক (সৌজন্যে–উইকিমিডিয়া কমনস্‌)৷

ঐতিহাসিক রণকৌশল

আলেকজান্ডারের বাহিনি ও দারায়ুসের বাহিনির মধ্যে সংখ্যা, রণকৌশল ও সেনাদের হাতিয়ারের ধরণে নিঃসন্দেহে তফাৎ ছিল। কিন্তু সবথেকে বড় তফাৎ ছিল সেনা বাহিনির নেতৃত্ব দানের কায়দায়। ম্যাকেডোনিয়ান/গ্রিক রীতি অনুসারে প্রত্যাশিত ছিল রাজারা যুদ্ধ করবেন একদম সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে। এই রীতিতে রাজার পক্ষে যুদ্ধ চলাকালীন সেনা পরিচালনা কঠিন ছিল। তাই মূল রণ-কৌশল আগে থেকেই বাকি সেনাপতিদের বৈঠক করে বুঝিয়ে দেওয়া হত আর তাদের হাতে পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া থাকত অবস্থা বুঝে রাজার আদেশের অপেক্ষা না করেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার।

আলেকজান্ডার যখন পদাতিক সংঘাত এড়িয়ে দারায়ুসকে ধরার জন্য ধাবমান, তখন রণক্ষেত্রের মধ্য ভাগের ‘ফ্যালাঙ্কস্‌’ ব্যূহের একটি পাশ পারসিকদের পক্ষে লড়াই করা গ্রিক যুদ্ধ ব্যবসায়ীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়। তারা ব্যূহের এই বিশেষ দুর্বলতার কথা জানত। এই আক্রমণ এতই সফল হয়, সাময়িক ভাবে মনে হয়েছিল ‘ফ্যালাঙ্কস্‌’-এর দুর্ভেদ্য বর্শার প্রাচীর বুঝি ধ্বসে যাবে। যুদ্ধের ঠিক আগে রণক্ষেত্রের ডান দিকের পাহাড়ে কিছু পারসিক তিরন্দাজের উপস্থিতি লক্ষ্য করে আলেকজান্ডার জনৈক সেনাপতিকে কিছু বাছাই করা অশ্বারোহী সহ পাঠিয়েছিলেন তাদের ছত্রভঙ্গ করার জন্য। সেই বাহিনি দায়িত্ব পালন করে যুদ্ধক্ষেত্রে ফেরত এসে যখন দেখে বর্শা প্রাচীরের ব্যূহ আক্রান্ত, তখন রাজার আদেশের জন্য অপেক্ষা না করেই পারসিক পক্ষের গ্রিক পদাতিকদের আক্রমণ করে।

এই স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার জন্য আলেকজান্ডারের বাহিনির মধ্যভাগ বড় বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পায়।

অপরদিকে পারসিক রীতি অনুসারে সম্রাট হলেন দেবতার সমান। তিনি নিজে রণক্ষেত্রে লড়াই করবেন, একথা অকল্পনীয়। সম্রাট বাহিনির পেছনে কোনো উঁচু স্থানে বসে পুরো রণক্ষেত্রের উপর নজর রাখবেন ও দূতের মাধ্যমে বিভিন্ন সেনাপতিকে নির্দেশ দিয়ে সৈন্য পরিচালনা করবেন—এই ছিল পারসিক রেওয়াজ। শাহের আদেশ ছাড়া সাধারণত সেনাপতিরা কোনো স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতেন না। তাই দারায়ুসের পলায়ন ছিল কার্যত পারসিক বাহিনির শিরোচ্ছেদ।

সম্রাট রণক্ষেত্র ছেড়ে চলে গেছেন এই খবর চাউর হতেই পারসিক পদাতিকদের মধ্যে ব্যপক চাঞ্চল্য দেখা দেয়। ইতিমধ্যে আলেকজান্ডার দারায়ুসকে কিছুক্ষণ ধাওয়া করে আবার রণক্ষেত্রে ফিরে এসেছেন (যদিও সম্রাটের পশ্চাৎধাবনে ক্ষিপ্রতম কিছু অশ্বারোহী নিযুক্ত করার পরে)। তিনি লক্ষ্য করলেন, মধ্য ভাগের পারসিক পদাতিক সেনার মধ্যে চাঞ্চল্য দেখা গেলেও তারা তখনও লড়াই করার পরিস্থিতিতে আছে। এদিকে পার্মেনিয়ন পারসিক অশ্বারোহীদের আর আটকে রাখতে পারেননি, তাঁরা মধ্যভাগের পদাতিক সংঘাতের দিকে ধেয়ে আসছে। এই দুই বাহিনি মিলিত হলে জেতা লড়াই হেরে যাওয়ার সম্ভবনা আছে। জয়ের মুখ থেকে পরাজয় ছিনিয়ে নেওয়ার মতো মানুষ আলেকজান্ডার ছিলেন না।

বিন্দুমাত্র কালক্ষেপ না করে ‘হেটাইরয়’ বাহিনি জ্বলন্ত উলকার মতো আছড়ে পড়ল পারসিক পদাতিকদের অরক্ষিত পশ্চাৎ ভাগে। চাঞ্চল্য পরিণত হল আতঙ্কে। অস্ত্র ফেলে পারসিক পদাতিকরা পালাতে আরম্ভ করল। একদিকে আলেকজান্ডারের পদাতিকদের বর্শা আর অন্যদিকে তার সওয়ারদের তরবারির আঘাতে লাল হয়ে গেল ইসাসের মাটি। পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে গেছে দেখে দ্রুত মাঠ ছাড়ল পারসিক অশ্বারোহী বাহিনি।

ইসাসে দেবী ক্লিও জয়তিলক এঁকে দিলেন আলেকজান্ডারের কপালে।

যুদ্ধের পর আলেকজান্ডারের হাতে বন্দি হলেন পারসিক অভিজাতদের পরিবার, যারা স্বামী, ভাই বা আত্মীয়ের সঙ্গে যুদ্ধ দেখতে এসেছিলেন। এর মধ্যে দারায়ুসের মা, স্ত্রী ও কন্যারাও ছিলেন। আলেকজান্ডার এঁদেরকে যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন করেন। সেই সম্মান প্রদর্শনের কাহিনি কিংবদন্তী হয়ে গেছে। অবশ্য তিনি যখন রাজকীয় তাঁবুতে নাটকীয় ভাবে সেই সম্মান দেখাচ্ছিলেন তখন আশেপাশেই তার বাহিনির সেনারা, বিশেষ করে থ্রেসিয়ানরা, যে ব্যাপক লুটপাট আর ধর্ষণ চালাচ্ছিল সেই কথা আরিয়ান বা ডিওডরাসের মতো প্রাচীন ঐতিহাসিকরাই লিখে গেছেন। অবশ্য এসব অপ্রিয় কথা এক-দুই লাইনে লিখেই তারা আবার ফেরত গেছেন রাজার গুণ কীর্তনে। তাদের দোষ দেওয়া যায় না। আলেকজান্ডারের বাহিনির কাজটি ছিল সেই আমলে বিজেতা পক্ষের স্বাভাবিক আচরণ, রাজার ব্যক্তিগত আচরণটিই বরং অস্বাভাবিক (এবং তাই লিপিবদ্ধ করার যোগ্য)।

ইসাসের প্রান্তরে পারসিক বাহিনির সংখ্যা কত ছিল, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। ষাট হাজার থেকে ছয় লক্ষ—নানা প্রকার সংখ্যা পাওয়া যায়। তবে আধুনিক ইতিহাসবিদরা এক লক্ষ থেকে এক লক্ষ কুড়ি হাজারের মধ্যে সংখ্যাটি রাখেন। অপরদিকে আলেকজান্ডারের সৈন্য সংখ্যা ছিল তিরিশ থেকে চল্লিশ হাজার।

অর্থাৎ আলেকজান্ডার ইসাসের প্রান্তরে তার বাহিনির থেকে প্রায় তিন গুণ বড় পারসিক বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন।

অস্থায়ী শান্তি পর্ব

এর রাজনৈতিক প্রভাব ছিল সুগভীর। গ্রানিকাসের পর সমগ্র পূর্ব ভূমধ্যসাগরে এই বার্তা ছড়িয়ে পড়েছিল যে পারসিক শক্তির বিরুদ্ধে এই তরুণ রাজার লড়াই করার সাহস রয়েছে। কিন্তু ইসাসে পারসিক সাম্রাজ্যের মাটিতে প্রত্যক্ষ ভাবে শাহেনশাহ্‌-এর পরিচালনাধীন পারসিক বাহিনি পরাজিত হওয়ার পর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল এই খবর, আলেকজান্ডার শুধু লড়াই করার সাহসই রাখেন না, তিনি প্রবল প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সেই লড়াই জিততেও পারেন। যে সমস্ত শক্তি পারসিক সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সুযোগ খুঁজছিল, তারা মাথা তুলে দাঁড়াল। আলেকজান্ডার এই বিদ্রোহী শক্তির সমর্থনেই যাত্রা করলেন লেভান্ত হয়ে মিশরের দিকে। পারসিক সাম্রাজ্য আহত হয়েছিল বটে, কিন্তু তখনও সম্পূর্ণ পরাজিত হয়নি।

আলেকজান্ডারের সওয়ারদের চোখে ধুলো দিয়ে দারায়ুস পালাতে সক্ষম হন। তিনি পারস্যে ফিরে গিয়েই আবার যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে থাকেন। তিনি ও আলেকজান্ডার দুজনেই জানতেন, আবারও সময় আসবে শক্তিপরীক্ষা করার। তবে তা ছিল তখনও ভবিষ্যতের গর্ভে।

প্রচ্ছদ চিত্র পরিচিতি: ঘোড়ার পিঠে আলেকজান্ডার

তথ্যসূত্র

১) Philip Freeman, Alexander the Great (Simon and Schuster, 2011, New York).

২) Edward M. Anson (ed.), Brill’s Companion to the Campaigns of the Philip II and Alexander the Great (Brill, 2025, Boston).

এম.ফিল গবেষক, ইতিহাস বিভাগ, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।